গল্প

কোথাও তরণী আজ চ’লে গেছে আকাশরেখায়

লীনা দিলরুবা | 27 May , 2019  


একটি লিবিডো আক্রান্ত সকালে নিজের নির্বীর্য সত্তার উত্থান দেখতে দেখতে ঘুম থেকে জেগে উঠেছিল কে., এটি ছিল বিস্ময়কর এক উত্থান। ঠিক যেন পর্বত উঠে গেল আকাশে, রাস্তাগুলো উঠে গেল দিগন্তে, সবুজ উপত্যকার অবগুণ্ঠন ছেড়ে মৃত্তিকা উঠে গেল বৃক্ষের শিখরে। ঝরনার জল ঊর্ধ্বাকাশে, বৃষ্টির ফোঁটা মেঘের বৃত্তে, তুমুল তরঙ্গে দুলে-দুলে উঠতে লাগল পৃথিবী। সবকিছু ধাবমান, প্রকৃতির সমস্তকিছু নিজের অবস্থানকে অস্বীকার করে কোনো এক অঙ্গীকারে নিজের নিজের প্রান্তসীমা অতিক্রান্ত করে হয়ে পড়ছে গতিশীল, কে.র স্মৃতির ভেতর ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা দৃশ্যাবলীর স্থান থেকে স্থানবদল হচ্ছে : পাহাড়, নদী, বস্তু, অবস্তু সবই চলছে, ঊর্র্ধ্বমুখে। টেবিল, চেয়ার, দেয়ালঘড়ি, সোফা, বালিশ, টেবিলের উপর রাখা গতরাতের মদের গ্লাস সবকিছু একস্থান থেকে অন্যস্থানে, নি¤œ থেকে ঊর্র্ধ্বমুখে চলে যাচ্ছে, কে.র লিঙ্গের উত্থানের সঙ্গে জগতের সমস্তকিছু যেন সঙ্গত করছে, একটা ভীষণ সাঙ্গীতিক পরিবেশে কে.র নিজেকে রাজা-মহারাজা বলে মনে হতে লাগল, শাহেনশাহ। আজকের দিনের সে-ই রাজা। সমস্ত বিরক্তি, অনাসক্তি, ঔদাসিন্য, অপমান, অবহেলা, তুচ্ছতা, ক্লেদ, বিরাগ, দৌর্বল্য ঝরে পড়ছে তার শরীর থেকে, দখল করছে তুরীয় আনন্দ, হর্ষ, সন্তোষ, আহ্লাদ। কে. অনুভব করল তার সারা শরীর কাঁপছে, ভূতে পাওয়া মানুষের মতো লাগছে নিজেকে। ঘোরগ্রস্ত, নেশাগ্রস্ত, আনন্দলহরীতে তাঁর মনটি কোমল হতে লাগল, তরল, গলিত। কে. ঝরঝর করে ঝরিয়ে দিল তার চোখের জল। কতদিন, কত নির্ঘুম রাত, কত সরাব ফেনায়িত মুহূর্ত, কত নিদাঘ দুপুর কেটে গেছে নির্বীর্য অনুভূতিতে। কোনো আলিঙ্গন নেই, কোনো প্রেম নেই, কেনো ঘর্ষণ নেই, কোনো চুম্বন নেই, কোনো পিছুটান নেই, কোনো অপেক্ষা নেই, কেবল অযত্ন, অযত্ন, অযত্ন। কে. কী ফিরে পেল তার যৌন অস্তিত্ব? বীর্যবান হবে সে, নির্বীর্য সত্তা নিয়ে কুকুরের মতো বেঁচে থাকা কে.র শরীর নির্ভার হয়ে যায় ক্রন্দন আর উত্থানে। শরীরের অস্তিত্বহীন হয়ে যাওয়া অংশের অস্তিত্ব উন্মোচনে কে. লক্ষ করল তার গৌরববোধ হচ্ছে, ভীষণ অহঙ্কার হচ্ছে, অথচ রমিতা পাশে নেই, কে. একা। নিজের নির্বীর্য সত্ত্বাকে কে. কখনোই মানতে পারে নি, আজকের এই উত্থান যেন স্বর্গচূড়ায় ওঠার মতোই বিষয়, কে. অনুভব করলো, মাথায় প্রচণ্ড মাইগ্রেনের ব্যাথা। কে. তার পুরনো নির্বীর্য সত্তাকে আজকের দিনের সত্তার বিপরীতে দেখবার চেষ্টা করে। দেখে, পেছনে পড়ে আছে একটি শুয়োপোকা, কোনোভাবে জেগে উঠবার চেষ্টা করছে। দাঁড়াতে গেলে পড়ে যাচ্ছে, উঠতে গেলে ঘুমিয়ে পড়ছে, উত্তেজনা নেই, উত্থান নেই, কেবল পতন আর পতন। সঙ্গে লেপ্টে আছে অপমান, অক্ষমতা। কে. এবার স্থান বদল করে বীর্য সত্তার কাছে পৌঁছোয়, দেখে নিতে চায় পরিবর্তনের চেহারা। কে. ভীষণ অহঙ্কারে আর গৌরবে নিজের স্থানটি দেখতে পায় একদম চূড়োয়, শরীরের উত্তাপ নিয়ে ঘুরছে অরণ্যের বাঘ। যেন সামনেই দাঁড়িয়ে আছে বনের সবচেয়ে সাহসী বাঘটি। কে. শুয়োপোকা আর বাঘের দুই সত্তাকে পাশাপাশি রেখে মাথায় প্রচণ্ডভাবে ধাক্কা দিতে থাকা মাইগ্রেনের ব্যাথা আর তলপেটে ব্লাডারের চাপ নিয়ে বাথরুমে ঢুকে যায়।
আই এম নট ইন্টারেস্টেড টু লিভ উইথ আ পারসন হু ইজ কমপ্লিটলি অবসেসড অ্যান্ড ইমপোটেন্ট। কে.র মুখের ওপর আঙুল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে যেদিন রমিতা কে. আর তার বিবাহিত সম্পর্কটার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছিল সেদিন কে. এই একই ধরনের মাইগ্রেনের ব্যাথায় আক্রান্ত হয়েছিল। মাথার ব্যাথাটা নিয়েই কে. চেষ্টা করল তাদের মধ্যকার জটিলতাগুলোকে পেছনে ফেলে, কে.র প্রতি রমিতার সমস্ত নঞর্থক ধারণাকে বদলে দিতে। কিন্তু রমিতা তার সিদ্ধান্তে অটল, সে তাদের দুজনার দশবছরের প্রেমের সম্পর্কের আর পাঁচ বছরের বিবাহিত সম্পর্কের (যেখানে প্রেমও ছিল) নৈকট্যকে (ছিল কী? থাকলে রমিতা চলে যাচ্ছে কীভাবে!) তুচ্ছ আর অসার প্রমাণিত করে সংসার ছেড়ে চলে গেল।

রমিতা যাবার আগে যে অভিযোগটি করে গেল, অর্থাৎ, কে.র নির্বীর্য অবস্থা আর অবসেশন নিয়ে, এ-দুটো অভিযোগের কোনোটিই মিথ্যে নয়। কিন্তু রমিতা যেটি বলে নি, এই অবস্থার জন্য কে. যদি দায়ীও হয়, রমিতাও কম অভিযুক্ত নয়। সবই তো ঠিক ছিল, বিবাহিত জীবনের সবই ঠিক ভাবে চলছিল। প্রেমের সময় সম্পর্কিত অবস্থায় যেমন সারাক্ষণ বই নিয়ে আলাপ, বিয়ের পরও সেই একই। বই আর বই। দুজনেই পড়ুয়া। তবে পছন্দের ব্যাপারে দুজনার ভিন্ন পথ। কে. ভালোবাসে জীবনানন্দের কবিতা আর মার্কেসের গল্প-উপন্যাস, রমিতা পড়ে সুনীলের গল্প। শামসুর রাহমানের কবিতা। কে. যখন জীবনানন্দের ‘আট বছর আগের একদিন’ পড়ে কাতরায়, রমিতা তখন শামসুর রাহমানের- শিশিরের জলে স্নান ক’রে মন তুমি কি জানতে/বিবর্ণবহু দুপুরের রেখা মুছে ফেলে দিয়ে/চ’লে যাবে এই পৃথিবীর কোন রুপালি প্রান্তে?/ নোনাধরা মৃত ফ্যাকাশে দেয়ালে প্রেতছায়া দেখে, আসন্ন ভোরে না-পাওয়ার ভয়ে শীতের রাতেও এক-গা ঘুমেই বিবর্ণ হই/কোনো একদিন গাঢ় উল্লাসে ছিঁড়ে খাবে টুঁটি/হয়তো হিংস্র নেকড়ের পাল, তবু তুলে দিয়ে দরজার খিল/ সত্তাসূর্যে যেসাসের ক্ষমা মেখে নিয়ে শুধু গড়ি উজ্জ্বল কথার মিছিল। রমিতা ঘোরলাগা কণ্ঠে আবৃত্তি করে, কে. মন্ত্রমুগ্ধের মত শোনে। কিছু বলে না। তাদের দুজনার চোখের আলোয় সুর খেলা করে। রমিতা বাড়িয়ে দিতে চায় তার আঙুল, কে. টেনে নেয় জীবনানন্দ। বধূ শুয়ে ছিল পাশে… কে. আবৃত্তি করতে চায়। পারে না। জীবনানন্দের কবিতা আবৃত্তিযোগ্য নয়। ওর কবিতা পড়তে হয় একা হয়ে। মগ্ন হয়ে। কে. উঠে চলে যায় অন্যঘরে। রমিতা বিমূঢ় হয়ে বসে থাকে। অথচ এটিও ঘটনার শুরু নয়, মরে ভূত হয়ে যাওয়া জীবনানন্দ’র কবিতা কেন তাদের সংসার ভাঙার কারণ হবে! অবশ্য ঘটনার নেপথ্যে কিছুটা রয়েছে জীবনানন্দের দাম্পত্য-সম্পর্ক। কে. অফিস থেকে ফিরেই জীবনানন্দের বই নিয়ে বসে যায়। জীবনানন্দের কোডেড ডায়েরি পড়ে। তাঁর লেখা গল্প-উপন্যাস, জীবনী। জীবনানন্দের কবিতা। কে.র সবকিছু খুটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ার অভ্যেস। পড়েও। নিজে পড়ে তার পর স্ত্রী’কে দেখায়। রমিতা কিছু বোঝে, কিছু বুঝতে পারে না। তার এসব বড় জটিল লাগে। কবিতা না পড়ে বরং সে আগ্রহ দেখায় জীবনানন্দের দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে। কে. একদিন হালকাচালে বলে, জানো, জীবনানন্দ তাঁর কোনো বই স্ত্রীকে উৎসর্গ করেন নি। একটিও নয়। কে. আবার নিজেই বলে, অবশ্য, তিনি জীবদ্দশায় বই-ই প্রকাশ করেছেন খুব কম, লিখেছেন অনেক, কিন্তু প্রকাশ করেন নি। রমিতা অবাক হয়। একটি বইও উৎসর্গ করেন নি! প্রথম বইটি কাকে করেছেন? কে. বলে, প্রেমিকাকে। ’কল্যাণীয়াসু’, এই কল্যাণীয়াসুটা যে কে, সেই নামটি অবশ্য লেখেন নি। কিন্তু আমরা জানি তিনি কে। বিয়ের পর তো স্ত্রীকে কোনো বই উৎসর্গ করতে পারতেন, রমিতা প্রশ্ন করে। কে. হাসে। কোনো উত্তর দেয় না। এবার রমিতা জানতে চায়, ‘কল্যাণীয়সু’র পরিচয় কী? কে.র আচরণে যেন ঔদাসীন্য ভর করে, কে. বলে, এই কল্যাণীয়াসু হলেন জীবনানন্দের কাকাতো বোন। শোভনা। ডাক নাম বেবি। জীবনানন্দ তাঁর কোডেড ডায়েরির পাতায় বেবিকে নিয়ে অনেক কিছু লিখেছেন, তার নাম সংক্ষেপ করে লিখেছেন, বিওয়াই। রমিতা আরো আগ্রহী হয়। তাঁদের দুজনার বিয়ে হল না কেন? কে. এই কথার কোনো উত্তর দেয় না,বরং রহস্য করে বলে, ভালোই তো হল, বিয়ে করেন নি, করলে কী আমরা এসব কবিতা পেতাম? রমিতা জানতে চায়, কীসব কবিতা? কে. বলে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতা। বলেই কে. চোখ বন্ধ করে ফেলে। তার মুখ আরক্ত হয়ে যায়। তার মাথায় ঘুরতে থাকে, ভালোবেসে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে/অবহেলা ক’রে আমি দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে/ঘৃণা ক’রে দেখিয়াছি মেয়ে মানুষেরে;/আমারে সে ভালোবাসিয়াছে,/আসিয়াছে কাছে, উপেক্ষা সে করেছে আমারে…।

জীবনানন্দের সঙ্গে সঙ্গে মার্কেসও কে.র বড় প্রিয়। কে. মার্কেসের গল্প-উপন্যাস পড়ে, পড়তে পছন্দ করে গল্পে বা উপন্যাসে মার্কেসের যৌনতা বিষয়ক অনুভূতিগুলো। মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় মানুষকে সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে না গিয়ে লেখকদের শরণাপন্ন হবার পরামর্শ দিয়েছিলেন; সন্দীপনের এ-কথার তাৎপর্য বিবেচনা করে কে. যার সাক্ষাৎকার পড়ে চিন্তা প্রক্রিয়ার গভীরে প্রবেশের চেষ্টা করে সেই লেখকটি হচ্ছেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, যিনি যৌনতা বিষয়ে পৃথিবীকে চিন্তায় ফেলে দেবার মতো একটি বাণী দিয়েছেন। মার্কেস বলেছিলেন, সব মানুষই নিবীর্য, কিন্ত এই সমস্যা সমাধান করতে সব সময়ই এগিয়ে আসে কোনো না কোনো মহিলা। এখানে সব নির্বীর্য পুরুষকে উদ্ধারের পবিত্র আত্মা নারীকে মহিমান্বিত করা হল বলেই মনে হয়। প্রকৃতঅর্থে এটা ছিল একজন ফরাসির উক্তি যিনি বলেছিলেন, নির্বীর্য পুরুষ বলে কিছু নেই, যা আছে তা হলো হৃদয়হীন নারী। মার্কেস যৌনতার নতুন অভিজ্ঞতায় পুরুষের ভীত অবস্থাকে আমলে নিয়ে কথাটিকে তাৎপর্য দেবার চেষ্টা করেন। কে. ঠিক এই কথাটিই একটি বিশেষ মুহূর্তে রমিতাকে বলেছিল। কে. চাইছিল কিছুটা ফ্যান্টাসি। সবকিছুকে ফ্যান্টাসাইজ না করলে আসলে তার চলে না। রমিতা এটিকে ভীষণ অপমানজনক মনে করে। কে. তাকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিল, ফ্যান্টাসি ছাড়া যৌনজীবন ভীষণ ফ্যাকাসে, এই উক্তি করার পর দেখা গেল রমিতা এসব মুহূর্তে অসহযোগিতা করা শুরু করল। এবং এই সময়েই দেখা গেল কে. পুরোপুরি অক্ষম হয়ে পড়েছে। রমিতা তাকে ঘৃণা করতে শুরু করে।

এর মধ্যে শুরু হল নতুন উপদ্রব। কে. জীবনানন্দের কবিতা শুধু নয়, পছন্দ করে ব্যক্তি জীবনানন্দকেও। রমিতা তার নিজের অফিসের কোনো এক কলিগের কাছে শুনে এসেছে, জীবনানন্দ লোক ভালো ছিলেন না। তিনি ছিলেন কাঠ বেকার। স্ত্রী লাবণ্য দাশকে কোনো সম্মান করতেন না। স্ত্রীকে অবহেলা করতেন। সারাজীবন স্ত্রীকে অবহেলা করে নিজের কবিসত্তাকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা করা কোনো কাজের কাজ নয়। রমিতা যেদিন এই গল্প নিয়ে বাসায় হাজির হলো, সেদিন কে. বেদনায় নীল হয়ে যায়। সে রমিতাকে বলে, এই জঘণ্য কথা তুমি কীভাবে বিশ্বাস করলে! জীবনানন্দ কত কষ্ট করে তাঁর সংসার চালাতেন। তিনি দীর্ঘদিন কর্মহীন ছিলেন, এটি কী তাঁর অক্ষমতা? না কি রাষ্ট্রের দায়? তাঁর মত এত শিক্ষিত একজন মানুষের কাজের সংস্থান না হবার কারণে তাঁর স্ত্রী তাঁকে চূড়ান্ত অবহেলা করেছেন। আহা! কত বড় কবি! চাকরি না পেয়ে হতাশ হয়ে নিজের কোডেড ডায়েরিতে লিখেছেন, রোজগারের জন্য কী চায়ের দোকান দেবেন? মিষ্টির দোকান? বেকারি? পোল্ট্রি? মাছ চাষ? আফিম বিক্রি? মদের দোকান? জুতো তৈরি? একজন মানুুষ এসব কখন চিন্তা করে? জীবনানন্দ দাশ তো কোনো ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক কিংবদন্তি। কত নিরীহ মানুষ ছিলেন। কারো সাতেও নেই, পাঁচেও নেই। রোজগার করতে পারতেন না বলে কত নত থাকতেন, তাঁর সম্পর্কে কি না রমিতা এসব বলছে ! এসব আবার তার নিজের অনুধাবনও নয়, কোনো কলিগ কী বলেছে সেসব সে বিশ্বাস করে এখন ঘরে এসে কে.র জীবনে যার স্থান বহুমূল্য, তাকে ব্যঙ্গ করছে ! কে. বিষাদে মরে যায়। রাতে তার আর ঘুম আসে না।
এভাবেই আসলে সম্পর্কটা মরে যেতে থাকে। কে. আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে রমিতার কাছে। দিনের পর দিন দুজন আলাদা ঘরে ঘুমাতে থাকে। কে. যেতে চায় রমিতার ঘরে, রমিতা অনুমতি দেয় না। বরং বলে, আমি তো ফ্যান্টাসি জানি না, যে জানে তার কাছে যাও। কে. লজ্জায় মরে যেতে চায়।
একদিন আর ওটুকুও থাকে না। রমিতা তাঁর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়। বিচ্ছেদ সেটি।
রমিতা চলে গেছে একবছর প্রায়। এর মধ্যে কে. নিজের নির্বীর্য অবস্থাকে স্থায়ী হতে দেখল। কামিনী ফুলের গাছটি যেন নরক খুঁজে বেড়াচ্ছে। কে. নিজের অযৌন সত্তার কাছে সমর্পিত হল।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখে মাইগ্রেনের ব্যাথাটা নেই। ব্লাডার খালি করার পর ব্যাথাটাও চলে গেছে। কে. সিদ্ধান্ত নিলো, বাড়ি যাবে। অনেক ছুটি পড়ে আছে। বসকে একটা এসএমএস করে জানালো, জরুরি প্রয়োজন, বাড়ি যেতে হবে। বস একটুও দেরি না করে অনুমতি দিয়ে ফিরতি মেসেজ পাঠালেন, যাও, সাবধানে যেও। কেন যেন বসের প্রতি কৃতজ্ঞতায় কে.র মন ভারী হয়ে ওঠে।
রমিতা কখনো এই বাড়িতে আসে না। কেবল একবারই এসেছিল। বিয়ের পর-পর। সে কখনো গ্রামে থাকে নি। গ্রামে বেশিরভাগ সময় বিদ্যুত থাকে না। রমিতা এসবে অভ্যস্ত নয়। তাই কে.ও কখনো চায়নি, জোর করে তাকে গ্রামের পরিবেশের সঙ্গে অভ্যস্ত করতে। বরং বাবা-মাকে এটাই বুঝিয়েছে, তোমরা তোমাদের মত থাকো, রমিতা তার মত থাকুক। বাড়িতে সে অবশ্য তার ডিভোর্সের খবরটি দেয় নি। বুড়ো বয়সে বাবা-মা’কে এই দুঃসংবাদটি দিয়ে অসুস্থ করে দিতে চায় নি বলেই সে খবরটি জানায় নি। কে. তাদের একমাত্র সন্তান। তারা জানে, তাদের ছেলে ঢাকায় স্ত্রী-সহ ভালো-ভাবেই আছে। কেবল তাদের আক্ষেপ ছিল, বিয়ের এত বছর পরও কেন কে. আর রমিতার ছেলেপুলে হয় নি। দু-একবার বলতেও গিয়েছেন, কিন্তু কে. এসবে কানে না দিয়ে প্রসঙ্গান্তরে চলে গিয়েছে। অনেকদিন পর ছেলেকে পেয়ে বাবা-মা দুজনই উৎফুল্ল। ছেলে বৌ’র খোঁজখবর নিতে গেলে অবশ্য কে. হা-হু করেছে, কিন্তু বাবা কিংবা মা’কে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদ করতে ভুল করে নি। কে. কালিবাউশ মাছ খেতে পছন্দ করে, বাবা দয়াগঞ্জ বাজার থেকে বড় একটা মাছ কিনে এনেছেন। রাতের খাবার খেয়ে জীবনানন্দের কবিতা পড়তে পড়তে আর নিজের নির্বীর্য অবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে করতে ঘোরগ্রস্ত হয়ে কে. একসময় ঘুমিয়ে পড়ে।
বাড়িতে যেভাবে শুরু হয়, ঠিক সেভাবেই শুরু হয়েছিল দিনটি, হালকা আভা ছড়িয়ে সূর্র্যটা পূর্ব দিগন্তে দেখা দিয়েছিল, কে.র ঘরের জানালায় সে বেগুনি আভা গরাদের গেরুয়া বৃত্ত-ভেদ করে ঢিমে-তালে খেলা করছিল, মায়ের বিস্বস্ত মুরগিগুলো ডাক ছাড়লো, আগু-পিছু করে নয়, তাল না হারিয়ে, এক তালে ডাক আর ডাক, বাবা মসজিদ থেকে ফিরে এসে, ‘কই গো’, ‘কোথায় গেলে’ মায়ের উদ্দেশে অয়ি প্রেমময় কথাগুলো বললেন, তেমন করেই, যেমন করে কে. তার ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছে, তারপর দুজনে মিলে বারান্দায় চা পান করবে, হ্যাঁ, কে টের পাচ্ছে যুগলের প্রাত্যহিক চা-পর্ব শুরু হয়ে গেছে, দক্ষিন দুয়ারে গরুগুলো চিঁ চিঁ করছে, সদ্যই মা-হওয়া লাল গাভীটির স্বর কিছুটা ভারী শোনাল, রাখাল ছেলেটি গরুগুলোর পিঠে হাত বুলিয়ে তাদের শান্ত করার চেষ্টা করছে, একটু পর-পর রাখালটির তাদের উদ্দেশ্যে–‘এই, এই’ ডাক শুনতে পেল কে., রাখালটি যেন সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর মতো গরুগুলোকে আদর করছে, ‘এই এই’ শব্দগুলো কে.র বড্ড ভালো লাগে, কে. একটি কান ওখানেই পেতে রাখে, উঠোনে ততক্ষণে নেমে গেছে সারারাত খাঁচায় ঘুমিয়ে ভোরের আলোয় তড়পাতে থাকা পায়রাগুলো। সাদা পায়রাগুলোর বাকুম বাকুম শব্দ কে.র অন্য কানে আছড়ে পড়ে। যেন সব ভার অতিক্রান্ত হয়েছে, কোনোও কোনো সমস্যা নেই, কে. বিছানায় শুয়ে-শুয়ে দিনের শুরুটা উপভোগ করে।
সারাদিন শুয়ে-বসেই। কখনো কবিতা কখনো গল্প পড়ে কাটিয়ে দিলো একটি পুরো দিন। বিকেলের মরা আলোয় চলে গেল পুকুর পাড়ে। বাড়ির পেছনের এ-পুকুরটির জল মিশকালো। যাকে বলে কালিগোলা অন্ধকার। দোয়াতের কালির মতো জল। প্রায়ান্ধকার এ-পুকুরের জল গাছের পাতা পড়ে পড়ে থকথকে হয়ে গেছে, এখানে কেউ স্নান করে না, বাবা দয়াগঞ্জের বাজার থেকে পোনা কিনে পুকুরে ছেড়েছেন মাস ছয়েক হল, পুকুরের কালো জলে পোনাগুলো কিলবিল করছে, অবশ্য এগুলো আর পোনা নেই, মাছ হয়ে উঠেছে, শোল-বোয়াল আরও কতো কি। কে.র চোখ মিশকালো জলে প্রদক্ষিণ করে। পুকুর ঘাটটি নড়বড়ে, শুপুরি গাছের গুড়ি দিয়ে বানানো ঘাটটা পিচ্ছিল, কে. বেশ কসরত করেই সেখানে বসে থাকে, তার চোখ জলের দিকে, মনঃসংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ইচ্ছে নেই আপাতত, কে. মাছও দেখছে, দেখছে জলের রেখা। পুকুরের একঘাটের জল হালকা ঢেউ খেলে নবোঢ়া তরুনীর মতো অন্যঘাটে চলে যাচ্ছে। তার চোখের সামনে নেচে ওঠে পুঁটির ঝাঁক, ওঠে আর ডুবে, সে তাকিয়ে থাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো, পুঁটির ঝাঁকের দিকে, ঢেউ এর দিকে।
মাছের ডিম থেকে মাছ বের হয়। পোনার ঝাঁকের ভেতর থেকে অন্য পোনা। পোনাদের বীর্য-নির্বীর্য হবার কোনো ঘটনা কী আছে? হলেও, পোনা থেকে মাছ হয়ে ওঠা অন্য মাছ কী নিজের নির্বীর্য সঙ্গীকে রেখে চলে যায়? কে. বুঝতে পারে না প্রশ্নটি সে কাকে করল। বিকেলের নিবে যাওয়া আলোয় কেবল বাঁশ গাছের একটি সবুজ পাতাকে সে দেখল ছোট ছোট ঢেউ ঠেলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে।


3 Responses

  1. Md Mahfuzul Haque says:

    Good and promising.Need more attention on long details, does such length really necessary?

  2. অমর মুদি says:

    গল্পের গঠনটি সুন্দর। জীবনানন্দের সাথে আরও কিছু ছিল কের জীবনে যা কাহিনীতে থাকা উচিত ছিল।

  3. সামিহা says:

    খুব সুন্দর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.