গল্প

ফারজানা শারমীন সুরভি’র লাল গণিকারা

ফারজানা শারমীন সুরভি | 4 Jun , 2019  


মানসিক রোগীদের সাথে ডিল করা খুব বিরক্তিকর ব্যাপার! যেমন, এই মুহূর্তে একজন আমার সামনে একটা সাদা ইঁদুর নিয়ে বসে আছে। ইঁদুর দেখলে আমার বমি আসে। প্লেগ রোগের ইতিহাস মনে পড়ে। কিছুটা ভয় লাগে। রুমে ঢুকে লোকটা কাঁধের কালো ব্যাগপ্যাক খুলে একটা খাঁচা বের করেছে। এত ছোট একটা খাঁচাতে ইঁদুরটাকে রেখেছে, দেখে আমার হাঁসফাঁস লাগছে! বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী আমাকে শিখিয়েছে, কীভাবে কাউন্সেলিং করার সময়ে নন-জাজমেন্টাল মুখভঙ্গি করে শান্তভাবে মানুষের কথা শুনতে হয়। মেন্টাল হেলথ কাউন্সেলরদের অফিস মানুষের কান্নার স্থান! এখানে আমার ভূমিকা অনেকটা ঈশ্বরের মতো। চুপচাপ শুনে যাওয়া। গলার স্বরে সহানুভূতি ফুটিয়ে তোলার অভিনয় করা। তবে এই কাজটা আমি ভালোবেসে করি।

কাউচে হেলান দিয়ে বসে লোকটা কথা শুরু করে।
“একটা সিক্রেট আপনার সাথে শেয়ার করতে চাই। কিন্তু ভরসা পাচ্ছি না।”
“আপনার সিক্রেট আমার কাছে নিরাপদ। এটা নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব।”

লোকটা ঠোঁট ভিজিয়ে নেয় থুতু দিয়ে।
“কোথা থেকে শুরু করব, বুঝতে পারছি না! আচ্ছা, ছোটবেলা থেকে শুরু করি! আমার বয়স যখন সাত বছর, আমাকে রেখে মা আরেকজনের সাথে পালিয়ে যায়। তাকে নিয়ে খুব বেশি স্মৃতি নেই আমার। একটা ঘটনা শুধু মনে আছে। কতো আগের তা জানি না! মা আমাকে মারছে। অনেক মারছে। আমার ঠোঁট কেটে গিয়েছে মারের চোটে। তারপরে আমাকে টেনে-হিঁচড়ে রান্নাঘরের জ্বলন্ত চুলার উপরে ঝুলিয়ে মা হিসহিস করে বলছে – তোকে খুন করে ফেলব! শুয়োরের বাচ্চা! খানকির পোলা!”
“এখনো কি এই ঘটনার ফ্ল্যাশব্যাক হয় আপনার? দুঃস্বপ্ন বা এধরনের কিছু?”
“আমার পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার আছে নাকি বুঝার চেষ্টা করছেন?”

এ ধরনের প্রশ্নে মেন্টাল হেলথ কাউন্সেলর হিসেবে আমার মুখ তিতা হয়ে যায়। আজকাল রোগীরা গুগলে দুই লাইন পড়ে একেকজন ডাক্তার ভাবে নিজেকে! চেহারা ভাবলেশহীন রাখার দক্ষতা অসাধারণ আমার! তাই বিরক্তি প্রকাশ না করে স্মিত হাসি। “আমি আপনার কষ্ট বুঝার চেষ্টা করছি। আর কিছু না। আপনি যদি আনকমফোর্টেবল ফিল করেন, এ প্রসঙ্গে কথা বলতে হবে না। আমরা অন্য কিছু নিয়েও কথা বলতে পারি।”
“না! ঠিক আছে,” লোকটা অন্যমনস্কভাবে নাক চুলকায়। “তো যেটা বলছিলাম, মা আমাকে প্রায়ই খানকির পোলা বলে গালি দিত! এখন এটা মনে হলে বেশ মজা লাগে। আমার মা আসলেই একটা খানকি ছিল! একমাত্র খানকিরাই ঠোঁটে লাল লিপস্টিক দিয়ে, স্বামীকে আর ছেলেকে রেখে আরেক লোকের সাথে পালিয়ে যায়! মা লাল শাড়ি পরতে পছন্দ করতেন। আমি খেয়াল করেছি, বেশিরভাগ খানকি ধরনের মেয়েদের প্রিয় রঙ লাল!”
অস্বস্তিবোধ করি কিছুটা। আজকে একটা লাল রঙের সালোয়ার-কামিজ পরেছি। কণ্ঠের অস্বস্তি লুকিয়ে তবু নরম স্বরে প্রশ্ন করি, “যখন মায়ের কথা মনে পড়ে, তখন কি আপনার খুব রাগ হয়?”
“হুম, অনেক রাগ হয়। লাল রঙের জামা পরা মেয়ে দেখলে, চুলের মুঠি ধরে তাকে খানকি বলে গালি দিতে ইচ্ছা করে।”

ইঁদুরটা শব্দ করছে। চিঁক-চিঁক, চিঁক-চিঁক! কথার মাঝখানে লোকটা চুপ হয়ে যায়। ইঁদুরের খাঁচার দিকে তাকায়।
লাল জামার প্রসঙ্গ বদলাতে প্রশ্ন করি, “আপনার পোষা ইঁদুর?”
“হ্যাঁ, বলতে পারেন। কাঁটাবন থেকে কিনেছি। সাদা ইঁদুর ভালো লাগে। সাদা আমার পছন্দের রঙ। জানেন তো, ভালো মেয়েরা সাদা রঙ পছন্দ করে! আর খারাপ মেয়েরা লাল রঙ পছন্দ করে। দুনিয়াতে এই দুই ধরনের মেয়ে-মানুষ আছে। মাঝামাঝি ধরনের কোন মেয়ে-মানুষকে খুঁজে পাবেন না আপনি। হয় সতী-না হয় বেশ্যা!”

রাগে গা জ্বলে যায় আমার। এরকম সেক্সিস্ট একটা লোক মেয়ে কাউন্সেলরের কাছে কী জন্য এসেছে! বিরক্ত লাগে! তবু আবার কথা শুরু করি।
“আপনি ইঁদুর খুব পছন্দ করেন?”
“হ্যাঁ। ইঁদুরের সাথে আমার মিল আছে। ওরা অন্ধকার পছন্দ করে। আমিও তাই! ইঁদুর দেখলে সবার গা ঘিনঘিন করে। আমার মাও আমাকে দেখলে ঘৃণায় নাক সিটকে দূরে সরে যেত। এই মহিলা একবার এত জোরে লাথি মেরেছিল, দেয়ালে মাথা ঠুকে গিয়েছিল আমার। মাথা ফেটে রক্তে দেয়াল আর মেঝে ভেসে গিয়েছিল। এত কেঁদেছিলাম সেদিন! তবু আম্মা আমাকে আদর করেনি! জানেন তো, খানকিদের নিজের ছেলে-মেয়েদের ব্যাপারে কোন দরদ থাকে না!”
“এসব মনে পড়লে কি এখন কষ্ট হয় আপনার?”

লোকটা অস্থিরভাবে পা নাচায়। দুই হাতে মাথা টিপে ধরে। আবার কথা শুরু করে। খুব নিচু কণ্ঠে। “মায়ের কথা মনে পড়লে কষ্ট হয় না আমার। খুব ঘৃণা হয়! আমার মায়ের সাথে কখনো দেখা হলে, ওই মহিলার মুখে থুতু ছুঁড়ে মারব আমি। সরি, আবারো প্রসঙ্গ থেকে সরে গিয়েছি। কী নিয়ে জানি, কথা বলছিলাম? ওহ! মনে পড়েছে! মেয়েমানুষের লাল-সাদার দুনিয়া! যাই হোক, বড় হতে হতে কিছু নিষ্ঠূর স্বভাব দেখা যায় আমার মধ্যে। প্রথমে বাসার পোষা টিয়াটিকে আমি খুন করি। টিয়াটির সেই অর্থে কোন দোষ ছিল না। পাখিটার ঠোঁটের রঙ ছিল লাল। লাল রঙ দেখলে মায়ের লাল লিপস্টিক, লাল শাড়ি আর খানকিপনার কথা মনে পড়ত। রাগে কিছুক্ষণের জন্য অন্ধ হয়ে যেতাম। মনে হত, আমার মধ্যে থেকে আরেকটা মানুষ বেরিয়ে আসছে। সাক্ষাৎ শয়তান ভর করত আমার উপরে! তখন যে কী করতাম, পরে আর মনে করতে পারতাম না। এক ধরনের এমনেশিয়া বলতে পারেন!”

“কী ধরনের এমনেশিয়া হত আপনার? আপনি বলছেন, সাক্ষাৎ শয়তান ভর করত আপনার উপরে! এই কথা কেন বলছেন? একটু বুঝিয়ে বলবেন!”
লোকটা ঘামছে। এয়ার কন্ডিশনড রুমে বসেও ঘামছে।
“সেদিন হুঁশ হলে দেখলাম, টিয়াটার পাশে রান্নাঘরের বটিটা পড়ে আছে। কালো বটি রক্তে লাল! পাখিটার গলা কাটা। সবুজ পাখা আর লাল রক্তে বারান্দার মেঝেতে একটা কেমন যেন নকশা তৈরি হয়েছে! রান্নাঘর থেকে আমাদের বাসার কাজের মেয়ের চিৎকার শোনা যাচ্ছে- আল্লাহ, বাঁচাও! খালু আমাকে বাঁচান! এই ধরনের কিছু!”
“টিয়াটাকে কে মেরেছিল?”

আমার এই প্রশ্নে লোকটাকে বিচলিত দেখা যায়। দুই হাতে সে মুখ ঢেকে ফেলে। কিছুক্ষণ পরে মুখ থেকে হাত সরিয়ে নেয়। চোখে পানি। ভাঙ্গা স্বরে সে বলে, “আমি মেরেছিলাম!কিন্তু প্রথমে বুঝতে পারিনি যে, এই কাজটা আমি করেছি। কাজের মেয়েটার চিৎকারে আব্বা দৌঁড়ে নামাজ ফেলে ছুটে আসেন। তিনি বেশ শক্ত ধাঁচের মানুষ ছিলেন। লাফ দিয়ে কাছে এসে, এক হাত দিয়ে তিনি আমার হাত পেছনে মুচড়ে ধরেন। আরেক হাত দিয়ে মেঝে থেকে বটি তুলে নেন। এক কোপে বারান্দা্তে ঝুলে থাকা কাপড় শুকানোর দড়ি কেটে ফেলেন। দড়ি দিয়ে হাত বেঁধে, আমাকে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলেন। তারপরে একটা থাপ্পর বসিয়ে দেন গালের মধ্যে।”
“টিয়াটিকে মেরে ফেলার পরে কি আপনার মন খারাপ হয়েছিল? বা অপরাধবোধ?”
“আমি সাইকোপ্যাথ নাকি, তা বোঝার চেষ্টা করছেন?”
শান্ত স্বরে বলি, “কোন উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন করছি না। শুধু আপনাকে বোঝার চেষ্টা করছি।”

প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে, ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে লোকটা। আবার যখন কথা শুরু করে, তার স্বর ভীষণ কোমল হয়ে আসে। “আব্বা আমাকে মারতেন না কখনো। আম্মার পুরা উলটা স্বভাবের মানুষ ছিলেন আব্বা। শান্ত স্বভাবের। স্নেহ প্রকাশ করতেন না। কিন্তু প্রতি রাতে আমি ঘুমিয়ে গেলে, দোয়া পড়ে কপালে ফুঁ দিতেন। তবে সেদিন আব্বা আমাকে মারলেন। প্রচণ্ড মার! পর্দার স্ট্যান্ড খুলে পেটালেন। পেটে পাড়া দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন অনেকক্ষণ। আর পাগলের মতো চিৎকার করলেন- বল! হারামজাদা আর করবি না এমন! আব্বার পা ধরলাম মারের হাত থেকে বাঁচার জন্য। ফুঁপাতে ফুঁপাতে বললাম – আর করবো না আব্বা। আমাকে মাফ করে দেন! সেই রাতে ঘুমাতে এসে অনেক কেঁদেছিলাম। আম্মার মাইর গায়ে লাগতো না অত! সবসময় মারতো তো! কিন্তু আব্বার মাইর গায়ের চেয়েও মনে লেগেছিল বেশি! সে রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গে দেখি, মাথার পাশে আব্বা বসে আছেন। নিঃশব্দে কাঁদছেন। আর বিড়বিড় করছেন – আল্লাহ! আমার ছেলেটার কী হইলো!”
“আপনার আব্বাকে আপনি অনেক ভালোবাসতেন?”, নরম স্বরে প্রশ্ন করলাম আমি।
“হ্যাঁ। আব্বা ছাড়া আর কেউ ছোটবেলায় আমাকে ভালোবাসেনি। আর সবার কাছে আমি ছিলাম একটা বিশ্রী ইঁদুরের বাচ্চা! শুধু আব্বা আমাকে ভালোবাসতেন। যাই হোক, পরদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠিয়ে আব্বা আমাকে মসজিদে নিয়ে গেলেন। ইমামের পিছে দাঁড়িয়ে একসাথে আমরা ফজরের নামাজ পড়লাম। নামাজের পরে আব্বা মসজিদের ইমামকে অনুরোধ করলেন আমাকে কুরান শরীফ পড়া শেখাতে। সেদিন বিকাল থেকে কুরান পড়া শুরু করলাম হুজুরের কাছে। আমপারা খতম দিয়েছিলাম আগেই। সেই থেকে আমি অনেক ধার্মিক হয়ে গেলাম। বারো-তের বছর বয়স তখন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। ত্রিশটা রোজা রাখি। প্রতিদিন নামাজের পরে কুরান তিলাওয়াত করি। লাল রঙ দেখে প্রচণ্ড রাগ হওয়ার অভ্যাসটা তখনো আমার ছিল। রাগ হলেই আমি সুর করে ‘আউযুবিল্লাহ মিনাশ শাইতানির রাজিম’ দোয়াটা পড়া শুরু করতাম।”
“কাজ হতো?”
“হ্যাঁ, হতো। এরপরে আর কোন পশু-পাখিকে মারি নি আমি। আমার যখন পনেরো বছর বয়স, বাসার কাজের মেয়েটার স্বভাবে বেশ কিছু পরিবর্তন খেয়াল করলাম। মেয়েটার বয়স তখন কত, ঠিক জানি না! দেখে বিশ-একুশ মনে হত। একদিন ওযু করেছি। আছরের নামাজ পড়ব। হঠাৎ গানের শব্দ শুনতে পাই। রান্না করতে করতে গুনগুন করে একটা বাংলা সিনেমার গান গাইছে মেয়েটা। মেয়েটাকে দেখে সেই পুরানো রাগটা আবার ফিরে এলো। মাগীটা লাল রঙের একটা কামিজ পরেছে। চুলে তেল দিয়েছে। লাল ফিতা দিয়ে বেণী করেছে। ঠোঁটে বেশ্যাদের মতো লাল রঙের একটা লিপস্টিক দেয়া! রাগে অন্ধ হয়ে গেলাম প্রায়। তাড়াতাড়ি বড় করে শ্বাস নিলাম। ততদিনে হুজুরের কল্যাণে জানি, রাগ আসে শয়তানের তরফ থেকে। আমরা রেগে গেলে শয়তান দ্রুত বেগে আমাদের রক্তে ছুটাছুটি করে, আরো রাগিয়ে দেয়। ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পড়তে পড়তে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। কিন্তু রাগ থামাতে পারি না। আমার কাছে মনে হয়, এই খানকিটা লাল জামা পরে লাল ফিতা দিয়ে চুল বেঁধে বিকালে আমার আব্বাকে চা খেতে দিবে। চা দেয়ার সময়ে ইচ্ছা করে হাতের লাল চুড়ি দিয়ে শব্দ করবে। আমার ভালো মানুষ আব্বা চুড়ির শব্দে অবাক হয়ে তাকাবে। তখন খানকি মাগীটা আব্বাকে জিনার ফাঁদে ফেলবে! আবারো রাগে অন্ধ হয়ে যাই। শয়তান ভর করে ঘাড়ে। যখন জ্ঞান ফিরে আসে, দেখি দুই হাত দিয়ে মেয়েটার গলা চেপে ধরে আছি। আব্বা আমাকে টেনে হিঁচড়ে, কাজের মেয়েটার গায়ের উপর থেকে সরাচ্ছেন। আমি সরে যাওয়া মাত্র মেয়েটা ‘আল্লাগো’ বলে চেঁচানো শুরু করে।”

“আপনার আব্বা কি সেবার-ও খুব রেগে গিয়েছিলেন?”

লোকটা হাই তুলে। এরপর নিরুত্তাপ স্বরে বলে, “আমার কাছে মনে হয়, রাগের চেয়ে এবার দুশ্চিন্তাটাই বেশি ছিল তাঁর মধ্যে। আব্বা ঠিক কীভাবে বিষয়টির সুরাহা করেছিলেন, জানি না। তবে পরের দিন গ্রামের বাড়ি থেকে মেয়েটার বড় ভাই তাকে নিতে আসে। মেয়েটা তার বড় ভাইয়ের সাথে গ্রামের বাড়িতে চলে যায়। এখন অনুমান করি, হয়তো মেয়েটার ভাইকে টাকা-পয়সা দিয়ে আব্বা ম্যানেজ করেছিলেন ব্যাপারটা। বাংলাদেশে গরীব মানুষদেরকে ম্যানেজ করা খুব কঠিন ব্যাপার না! যাই হউক, আব্বা আমাকে কিছু বললেন না। তবে খুব গম্ভীর হয়ে গেলেন। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা বাসায় এসে আয়াতুল কুরসি পড়ে জোরে জোরে হাত তালি দিতেন। একজন মৌলভি এসে পশ্চিম দিকের দেয়ালে একটা তাবিজ ঝুলিয়ে গেলেন। আব্বা একজন বিখ্যাত পীরের কাছ থেকে আমার জন্য তাবিজ এনে দিলেন। বিড়বিড় করে দোয়া পড়তে পড়তে, বাহুতে তাবিজ বেঁধে দিলেন।”
“তাবিজে কাজ হয়েছিল?”
“হ্যাঁ, কাজ হয়েছিল। অনেক দিন সুস্থ ছিলাম আমি। তাবিজের গুণেই হয়তো! কিংবা কে জানে, প্লেসিবো ইফেক্ট-ও হতে পারে। যাই হউক, পড়াশোনায় খুব মনোযোগী ছাত্র ছিলাম। এস এস সি আর এইচ এস সি-তে বেশ ভালো রেজাল্ট করলাম। মেডিক্যাল কলেজে এডমিশন টেস্ট দিয়ে চান্স পেলাম। আব্বা খুব খুশি হয়েছিলেন। আশেপাশের সব বাড়িতে মিষ্টি বিলি করে, দুই হাত তুলে অনেকক্ষণ আল্লার কাছে মোনাজাত করলেন। মেডিক্যাল কলেজে পড়ার জন্য ঢাকাতে আসি। ভালো ছাত্র হিসেবে ধীরে ধীরে ক্যাম্পাসে পরিচিতি পাই। সেই সময় ক্লাসে একদিন তুলতুলকে দেখি।”
“তুলতুল?”
“হ্যাঁ, তুলতুল! একটা সাদা সালোয়ার কামিজ পরে মেয়েটা প্রথম দিন ক্লাসে এসেছিল। সাদা ওড়না দিয়ে মাথায় ঘোমটা দেয়া। ঠোঁটে লিপস্টিক ছিল না। চোখে কাজল ছিল না। মুখে রঙ মাখা ক্লাসের অন্য মেয়েগুলোকে বেশ্যার মতো দেখাত। আর তুলতুলকে দেখাত একজন পবিত্র নারীর মতোন!”
“আপনি তুলতুলের প্রেমে পড়েছিলেন?”
“হ্যাঁ। প্রথম দেখাতেই প্রেম বলতে পারেন। একটা প্রজেক্টে একসাথে কাজ করার সুবাদে তুলতুলের সাথে কথা শুরু হয়। একদিন ওকে সরাসরি বলি, ‘আই লাভ ইউ’। সেই দিনটা কখনো ভুলতে পারব না। তুলতুলের সাদা গাল লাল হয়ে গিয়েছিল। মাথা নিচু করে সে বলেছিল- ‘কথা দাও, তুমি আমাকে ঠকাবে না’। ওর হাতে হাত রেখে কথা দিয়েছিলাম। বিয়ের আগে প্রেম করা আমার পছন্দ ছিল না। বিয়ের আগে ওকে চুমু খাওয়ার কোন চেষ্টাও করি নি আমি। প্রেমের চার বছর পরে সাহস করে আব্বাকে তুলতুলের কথা বলি। আব্বা খুব খুশি হন। তুলুতুলের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। তুলতুলের বাবা-মা আমাদের বিয়ের ব্যাপারে রাজি হয়েছিলেন। কোন ঝামেলা ছাড়াই বিয়ে হয়ে যায় আমাদের। অবশ্য এ ব্যাপারে আব্বার বিশাল বিষয়-সম্পত্তির একটা ভূমিকা ছিল। যাই হোক, বিয়েতে তুলতুলকে লাল শাড়ি পরতে দেইনি। আমি খুব কড়া ছিলাম এই ব্যাপারে। বিয়েতে তুলতুলকে সাদা শাড়ি পরতে হয়েছিল। তুলতুলের ফ্যামিলি কিছুটা রাগ করেছিল। কিন্তু তুলতুল কিছু বলেনি। বিয়ের দিন সাদা শাড়িতে তুলতুলকে আরো পবিত্র দেখাচ্ছিল। আমাদের বিয়ের সিদ্ধান্তে সবচেয়ে খুশি হন আব্বা। আম্মা পালিয়ে যাওয়ার পরে, আব্বা আর বিয়ে করেননি। অনেক দিন আমাদের বাসায় কোন মেয়ের ছোঁয়া পড়েনি। কাজের মেয়ে সংক্রান্ত সেই কেলেঙ্কারির পরে, আব্বা শুধু পুরুষ কাজের লোক রাখতেন ঘরে। আব্বা তুলতুলকে নিজের মেয়ের মতোন আদর করতেন। তুলতুলকে ডাক্তারি পড়াটা শেষ করতে দিয়েছিলাম আমি। কিন্তু চাকরি করতে দেইনি। যেসব মেয়েরা বাইরে চাকরি করে, ধীরে ধীরে তারা বেশ্যা স্বভাবের হয়ে যায়।”
“তুলুতুল আপত্তি করেনি?”

লোকটার চোখে-মুখে একটা তৃপ্তির ছাপ পড়ে।
কোমল স্বরে সে বলে, “না! আপনাকে আগেই বলেছি, আমি তুলতুলকে ভালবাসতাম । খুব ভালবাসতাম। তুলতুলও আমাকে খুব ভালবাসত। আর তুলতুল পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া মেয়ে। জীবনে উঁচু গলায় কথা বলেনি। আমাকে সম্মান করত খুব। আব্বাকে নিজের বাবার মতো সেবা করত। আল্লাহর উপরে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ ছিল না। দুনিয়াতে এই একজনই পবিত্র মেয়ে ছিল। আর আল্লাহ তার সাথে আমার জোড়া মিলিয়ে দিয়েছেন। এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে! নিজেকে দুনিয়ার সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষ মনে হত।”
“তুলতুলের সাথে বিয়ের পরে কি আপনার সেই রাগটা আর ফিরে এসেছিল?”
“না। কিন্তু খুব বিব্রতকর একটা ঘটনা ঘটেছিল তখন!”
“কী ঘটনা?”

লোকটা মাথা নিচু করে। দাঁত দিয়ে নখ কাটে। “তুলতুলকে আদর করার সময়ে, আমার ইরেকটাইল ডিসফাংশন ধরনের সমস্যা হচ্ছিল। ইরেকশন হচ্ছিল না। লজ্জার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম!”
“আপনি কি এই সমস্যাটা সমাধান করার চেষ্টা করেছেম কখনো?”
“না! তবে একদিন হঠাৎ করে সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।“
“কীভাবে?”
“সেই রাতে আব্বা বাসায় ছিলেন না। গ্রামের বাড়িতে একটা জমি বিক্রির কাজে গিয়েছিলেন। তুলতুল গোসল করে লাল একটা গামছা দিয়ে মাথা পেঁচিয়েছিল। ও জানতো যে, আমি লাল রঙ পছন্দ করি না। তাই ও কখনো লাল রঙের কোন শাড়ি বা কামিজ কিনত না। কিন্তু গামছা থেকে লাল রঙের ব্যাপারটা সম্ভবত কোন ভাবে তুলতুল মিস করে যায়। ওর মাথায় পেঁচানো লাল গামছা দেখে, আমার প্রচণ্ড রাগ হতে থাকে। আমার মুখ দেখে তুলতুল ভয় পেয়ে যায়। আমি তুলতুলের গলা টিপে ধরি প্রচন্ড রাগে। রাগ কমানোর জন্য জোরে জোরে ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ বলতে থাকি। এরপরে সব অন্ধকার হয়ে যায়।”

“তাহলে, এ নিয়ে আপনার জীবনে তিন বার এরকম এমনেশিয়া হলো! যাই হোক, তারপরে?”

“হ্যাঁ! তিনবার! তুলতুলের হাউমাউ কান্নার শব্দে জ্ঞান ফিরে। তাকিয়ে দেখি, বিছানাতে মুখ গুঁজে তুলতুল ফোঁপাচ্ছে। ওর গায়ে শাড়িটা ওড়নার মতো করে পেঁচানো। দুই পায়ের মাঝখান থেকে রক্ত ঝরছে। আমাকে চোখ খুলতে দেখে, তুলতুল আরো জোরে জোরে কাঁদতে শুরু করে। ওকে বুকে টেনে নেয়ার জন্য হাত বাড়াই। ও ছিটকে সরে যায়! অবাক হয়ে তাকাই ওর দিকে। তুলতুল তখন চিৎকার করে বলে- তোমার উপরে শয়তান ভর করেছিল! আল্লাহর গজব পড়বে! তখন বুঝতে পারি, আমি তুলতুলকে রেপ করেছি। এটা বুঝতে পারার সাথে সাথে তুলতুলের জন্য আমার কষ্ট হয়। ওকে আমি ভালোবাসি। আবার একই সাথে খুশিও হই। আমার ইরেকটাইল ডিসফাংশনের কোন সমস্যা নেই- এই চিন্তা করে। আমার ভালো লাগে যে, আমি ইমপোটেন্ট না! সেই থেকে বলতে পারেন, আমি একজন পুরাপুরি সুখী মানুষ! রোজ রাতে তুলতুলকে বাধ্য করতাম লাল শাড়ি পরতে। ঠোঁটে লাল লিপস্টিক দিতে। তুলুতুল কাঁদতে কাঁদতে লিপস্টিক দিত। তারপরে একটা পাকা রেপিস্টের মতো তুলতুলকে রেপ করতাম! রেপ করতে করতে ওকে ‘খানকি মাগী’ বলে গালি দিতাম। পাশের রুমে ঘুমিয়ে থাকা শ্বশুর জেগে যাবে, এই ভয়ে তুলতুল দাঁতে দাঁত চেপে সব সহ্য করত। আমার রেপ করা শেষ হলে, ফরজ গোসল শেষ করে জায়নামাজে কাঁদতে বসত। আমার ওর কান্না দেখে কষ্ট লাগত! অথচ দিনের বেলা পবিত্র চেহারার তুলতুলকে দেখে, আমি উত্তেজিত বোধ করতাম না। দিনের বেলা ওকে ভালোবাসতাম, কিন্তু ওকে আমার ছুঁতে ইচ্ছা হত না। রাত হলে মানুষ থেকে একটা নেকড়ে হয়ে যেতাম! তখন তুলতুলকে আমি ভালবাসতাম না। ঘৃণা করতাম। কিন্তু একই সাথে তুলতুলের ব্যাপারে একটা পাশবিক যৌন উত্তেজনা বোধ করতাম!”

বুঝতে পারি, একজন রেপিস্টের সামনে বসে আছি। তবু কথা চালিয়ে যাই, “এই পুরাটা সময় তুলতুল কিছু বলেনি আপনাকে?”

“বলেছে। গত সপ্তাহে তুলতুল আমাকে স্পষ্ট করে বলে, ও আমাকে এখনো ভালোবাসে। কিন্তু আমার মানসিক সমস্যা আছে! আমি যদি চিকিৎসা না করাই, তবে আমাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যেতে ও বাধ্য হবে। আমি তুলতুলকে প্রমিজ করেছি, একজন কাউন্সেলরের সাথে প্রথমে কথা বলবো আমি। তারপর তার পরামর্শ অনুযায়ী সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাব। তাই আপনার কাছে আসা!”

একটু ইতস্ততঃ করে আমি বলি, “আপনি তো মেডিকেলের ছাত্র ছিলেন। আপনার সাথে সরাসরি কথা বলি তাহলে! ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডারের এর কথা তো শুনেছেন আপনি?”

লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে বলে, “হ্যাঁ!”
“ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার মূলত ‘একই শরীরে বিভিন্ন মানুষের বাস’। লাল রঙ আপনাকে ট্রিগার করছে। আপনি তখন আরেকটা মানুষ হয়ে যাচ্ছেন। সেই মানুষটা আপনি। কিন্তু আবার আপনি না! আপনার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই মানুষটা টিয়া পাখির লাল ঠোঁট দেখে রেগে যাচ্ছে। মনে করিয়ে দিচ্ছে, আপনার মায়ের কথা। ছোট বেলায় মায়ের কাছে যে এবিউজের শিকার হয়েছেন, সেই এবিউজের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে আপনার। কাজের মেয়ের লাল জামা-লাল লিপস্টিক দেখে, আপনি ট্রিগারড হচ্ছেন। আপনার ভেতরে বাস করা অন্য মানুষটা বেরিয়ে আসছে। কিন্তু এক ধরনের এমনেশিয়া হচ্ছে আপনার। তাই সেই সময়ের কথা ভুলে যাচ্ছেন! আবার যখন আপনার সেন্স ফিরে আসছে, তখন আপনার কাজের জন্য লজ্জিত হচ্ছেন।”
লোকটা ফ্যাসফ্যাসে স্বরে বলে, “তাহলে তুলতুলকে কেন রেপ করি আমি? পবিত্র তুলতুলকে আমি ভালোবাসি, কিন্তু ওকে আমার সেক্সি মনে হয় না। আমি এরাউজড হই না। লাল জামা পরা মেয়েদের আমার স্লাট মনে হয়। এই খানকিগুলোকে দেখলে আমার রাগ হয়। অথচ এই মাগীগুলোকে দেখলেই মুখ চেপে ধরে আমার সেক্স করতে ইচ্ছা করে। এরকম কেন হবে? আমি তো তুলতুলকে ভালবাসি। তুলতুলকে দেখে কেন আমার আদর করতে ইচ্ছা হবে না। কেন তুলতুলকে লাল জামা পড়ে স্লাট সাজতে হবে আমার জন্য?”

আমার তখন গুগলে থানার ফোন নাম্বার খুঁজতে ইচ্ছা হয়। মনে হয়, এই লোকটাকে পুলিশে দেয়া উচিত। তবু প্রফেশনাল থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করি। শান্তভাবে ব্যাখ্যা করি, “এক দিনেই তো আপনার সমস্যার ডায়াগনোসিস আমি করতে পারব না। আরো সেশন লাগবে। তবু আমার সন্দেহগুলো খুলে বলছি আপনাকে। আপনি নিজে যদি আপনার সমস্যাটা বোঝার চেষ্টা করেন, তবে সেটা সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ হবে। আপনাকে আরো কিছু কথা বলতে চাচ্ছি আমি। আপনি কি সব কিছু শুনতে প্রস্তুত?”

লোকটা মাথা নাড়ে, “তুলতুলের জন্য যে কোন কিছু করতে রাজি আছি আমি!”

“ওকে। তাহলে মনোযোগ দিয়ে শুনুন! ম্যাডোনা-হোর কমপ্লেক্স নামে এক ধরনের মানসিক জটিলতা আছে। এই মানসিক সমস্যা থাকলে একজন পুরুষ সব নারীকে দুই ভাগে ভাগ করেন। আপনি প্রশংসা করেন-ভালোবাসেন সাদা ওড়নায় নিজেকে মুড়ে রাখা তুলতুলকে। কারণ তুলতুলকে আপনার সতী নারী মনে হয়। ভালো মেয়ে মনে হয়। অন্যদিকে, লাল শাড়ি পরা তুলতুলকে আপনি ভালোবাসেন না। কারণ লাল শাড়ি আপনাকে মনে করিয়ে দেয়, মায়ের কথা। সেই মা, যে আপনি ছোট থাকতে সংসার ছেড়ে চলে গিয়েছিল। সেই মা, যার চরিত্রহীনতার জন্য হয়তো আপনাকে নিয়ে ক্লাসমেটরা হাসাহাসি করেছে। কিন্ত লাল শাড়ি পরা নারীদের ভালো না বাসলেও, তাদের প্রতি আপনি যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন। লাল শাড়ি পরা মেয়েরা আপনার কাছে বেশ্যা। তাদেরকে আপনি ঘৃণা করেন। কিন্তু তাদেরকে রেপ করতে ইচ্ছা হয় আপনার। আপনার যদি ‘ম্যাডোনা-হোর কমপ্লেক্স’ থাকে, তার পেছনে বিভিন্ন কারণ আছে। আমি নিশ্চিত করে এখন কিছু বলতে পারছি না। তবে ধারণা করছি, শৈশবে মায়ের কাছে অত্যাচারিত হয়েছেন আপনি। মাকে ঘৃণা করেছেন। কিন্তু মায়ের মতোন লাল শাড়ি পরা চরিত্রহীন নারীরা-ই আপনাকে আকর্ষণ করেছে। তাদেরকে রেপ করে আপনি আপনার নিজের প্রতি হওয়া অপরাধের প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করেছেন। তাই লাল শাড়ি পরা তুলতুলকে কষ্ট দিতে আপনার ভালো লাগে। একই সাথে, আপনার ধর্মপরায়ণতা আপনাকে প্রভাবিত করেছে নারীকে ম্যাডোনা কিংবা হোর ভাবতে। যেই নারী মাথা নিচু করে ভালো মেয়ে হয়ে থাকতে চায় নি, তাকেই আপনার বেশ্যা মনে হয়েছে।”

লোকটা শূন্য চোখে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে কি আমার কথা শুনেছে? দ্বিধায় পড়ে যাই। কথাগুলো আমার রিপিট করব নাকি, বুঝতে পারি না।
তখন লোকটা নীরবতা ভেঙ্গে বলে, “আপনি বুঝতে পারছেন না, আমি কোন মাঝামাঝি অবস্থানে আসতে পারছি না! আমার অসুখের জন্য আমি পুরুষ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারছি। আপনি যদি চিকিৎসা করে অসুখটা সারিয়ে দেন, তখন তো তুলতুল আমার সাথে থাকবে না। ইমপোটেন্ট স্বামীর সাথে কে থাকবে বলেন? আবার আমার যদি অসুখটা না সারে, আমি তুলতুলকে কষ্ট দিয়ে যাব! তখনো ও আমাকে ডিভোর্স দিবে। আপনি আমার সমস্যাটা বুঝতে পারছেন না!”

আমার তখন মনে হয়, এই লোকটা কি শুধু তার নিজের স্ত্রীকেই ধর্ষণ করেছে?
পেশাদার স্বরে বলি, “আমি আপনাকে আমার সাধ্য মতো সাহায্য করব। আরো কাউন্সেলিং সেশন লাগবে। এরপরে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে কথা বলবেন। সব কিছু ঠিক করে ফেলতে পারবেন আপনি।”
“পারব?” লোকটা যেন মিনতি করছে!
“অবশ্য-ই পারবেন।”
এরপর জিজ্ঞাসা করব না ভেবেও লোকটাকে প্রশ্ন করি আমি। “আপনি কি শুধু আপনার ওয়াইফকেই রেপ করেছেন? নাকি অন্য কোন মেয়েকেও রেপ করেছেন? নির্ভয়ে আমাকে বলতে পারেন। আপনার জীবন সম্পর্কে যত জানতে পারব, আপনাকে বুঝতে আমার তত সুবিধা হবে।”

লোকটা প্রশ্নের উত্তর দেয় না। কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। এরপরে নীরবতা ভেঙ্গে অনুতাপহীন স্বরে বলে, “ইঁদুরদের দাঁতে অনেক ধার। দাঁত দিয়ে ওরা যে কোন কিছু কুচিকুচি করে কেটে ফেলতে পছন্দ করে। আমিও কাটাকাটি করতে পছন্দ করি। প্রতি রাতে তুলতুলের গায়ে দাঁত বসিয়ে দেই আমি।”

একটু নিচু হয় লোকটা। ইঁদুরের খাঁচার ছিটকিনিতে হাত দেয়। ঠিক তখন ভীষণ ভয় হয় আমার। ভয় লুকিয়ে কড়া স্বরে বলি, “আমার অফিস থেকে বের হয়ে যান এখুনি!”

চোখের পলকে লোকটা খাঁচা থেকে ইঁদুর বের করে ছুঁড়ে দেয় আমার দিকে। আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠি। ইঁদুরটাকে গা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চেষ্টা করি প্রাণপণে। লোকটা আমার উপরে ঝাপিয়ে পড়ে। গলা চেপে ধরে। একটু বাতাসের জন্য ছটফট করতে থাকি। চেয়ার উলটে পড়ে যাই। আমার মুখ চেপে ধরে লোকটা হিসিহসিয়ে বলে, “খানকি মাগী!”

কামিজের গলা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে আমার বুক মুচড়ে দেয়। লোকটার হাতে দাঁত বসিয়ে দেই। চিৎকার করে রিসেপশনের ছেলেটাকে ডাকি, “ফরিদ! ফরিদ!”

জ্ঞান হারানোর আগে শুনি, কে যেন সর্বশক্তি দিয়ে দরজা ধাক্কাচ্ছে!


1 Response

  1. সামিহা says:

    “আপনি তুলতুলের প্রেমে পড়েছিলেন?”
    “হ্যাঁ। প্রথম দেখাতেই প্রেম বলতে পারেন। একটা প্রজেক্টে একসাথে কাজ করার সুবাদে তুলতুলের সাথে কথা শুরু হয়। একদিন ওকে সরাসরি বলি, ‘আই লাভ ইউ’। সেই দিনটা কখনো ভুলতে পারব না। তুলতুলের সাদা গাল লাল হয়ে গিয়েছিল। মাথা নিচু করে সে বলেছিল- ‘কথা দাও, তুমি আমাকে ঠকাবে না’। ওর হাতে হাত রেখে কথা দিয়েছিলাম। বিয়ের আগে প্রেম করা আমার পছন্দ ছিল না। বিয়ের আগে ওকে চুমু খাওয়ার কোন চেষ্টাও করি নি আমি। প্রেমের চার বছর পরে সাহস করে আব্বাকে তুলতুলের কথা বলি। আব্বা খুব খুশি হন। তুলুতুলের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। তুলতুলের বাবা-মা আমাদের বিয়ের ব্যাপারে রাজি হয়েছিলেন। কোন ঝামেলা ছাড়াই বিয়ে হয়ে যায় আমাদের।

    এই কথাগুলো খুব ভালো লাগলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.