গল্প

হামিদা বানুর সংসার

সাঈম চৌধুরী | 8 Jun , 2019  


ছোটবেলায় বাবা-মা হারিয়ে মামার বাড়িতে বড় হয়েছে হামিদা বানু। পরের ঘরে থেকে স্বভাব হয়েছে পরগাছার মতো। নিজস্ব কিছু কোনদিন ছিলো না বলে সবকিছু নিজের করে নেবার বড় তাড়াহুড়ো তার।

আবদুল বাতেন সহজ সরল মানুষ। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। মা গত হয়েছেন বছর কয়েক আগে। বাবা মারা গেছেন এই সেদিন। মৃত্যুর সময় চৌদ্দ বিঘে জমি রেখে গেছেন। বাজারে তিনটে দোকান। মাস পেরুলে ভাড়া আসে আঠারো হাজার টাকা। জমিগুলো বর্গা দেয়া। বছর শেষে ফসল আসে। নগদ টাকা আসে। অভাব কি জিনিস জানে না আবদুল বাতেন। জীবন তার রঙের ঘোড়া দৌড়ায়। টর্চলাইটওয়ালা একটা মোবাইল নিয়েছে সে। দিন কাটে মোবাইলে বন্ধুদের সাথে রঙ-রসের আলাপে। নিয়ম করে প্রতি বিকেলবেলা মোবাইলে ফুল চার্জ দিয়ে রাখা হয়। রাত নামলে ঘর ছাড়ে। মোবাইল টর্চের রূপালী আলোয় পথ দেখে বাজারে যায়। খোকনের চায়ের দোকানে বসে চা-পিয়াজু খায়। বন্ধুদের সাথে রাষ্ট্র-সমাজ নিয়ে গুরুতর আলাপ করে। রাত গভীর হলে খোকন যখন তার দোকানের দরজায় তালা দেয়, তখন আবার রূপালী আলোয় পথ দেখে বাড়ি ফিরে আবদুল বাতেন। তার কাছে প্রতিদিন যেনো রূপালী জোছনার রাত। জীবন তার রঙের ঘোড়া দৌড়ায়। সেই জীবনে অভিশাপ হয়ে আসে হামিদা বানু। বাপ-মা হারিয়ে মামাবাড়িতে যে মেয়ে বড় হয়েছে, পরের বাড়িতে বাস করে যার হয়েছে পরগাছা জীবন!
আবদুল বাতেনের বাবা খুব আগ্রহ করে হামিদা বানুর সঙ্গে ছেলের বিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর ধারণা ছিলো, ছোটবেলায় বাপ-মা হারানো মেয়ে সংসারের মূল্য বুঝবে ভালো। কোথাও যাবার জায়গা নেই তাই কখনো স্বামীর বাড়ি ছাড়বে না। আঁকড়ে ধরে রাখবে।
হামিদা বানু মামার বাড়িতে থেকে অনেক গঞ্জনা গায়ে মেখে অষ্টম শ্রেণি পাশ করে। স্কুলে পড়ালেখার পাশাপাশি ছলাকলাও শিখে নেয়। সেবা-যতনের নামে শ্বশুরকে বশ মানায়। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত শ্বশুর পুত্রবধুর গুণে মুগ্ধ হয়ে থাকেন।
তারপর বেরিয়ে আসে হামিদার আসল চেহারা। যেনো ফণা তুলে ঘুমন্ত সাপ। কী তার কুটিল চক্রান্ত, কী তার দেমাগ!
হামিদা বানু হয়তো কখনো আয়না দেখে না। আয়না দেখলে এতো দেমাগ হতো না। বিয়ের সময় চেহারার দিকে একবার তাকালে আরেকবার তাকাবার ইচ্ছে মরে যেতো। শ্বশুর বাড়িতে বেশুমার খাবার গিলে গায়ে-গতরে চর্বি জমে। চেহারায় খানিক রোশনাই আসে। চেহারা যত বদলায় তার চেয়ে বেশি বদলায় আচার-স্বভাব। সব কিছু গিলে খাবার প্রবণতা তীব্র হয়ে ওঠে। দুইজনের সংসার। সেই সংসারে দিনে রাতে কামলা খাটে রজব আলী আর ময়নার মা। রাজরানি হয়ে থাকার চরম বন্দোবস্ত। কিন্তু হামিদা বানু কী আর কখনো কোনদিন এমন সৌভাগ্যের কথা চিন্তা করেছিলো!
কিভাবে সুখ উপভোগ করতে হয় জানে না সে। তাই নিজে সারাদিন কামলা খাটে। কোন প্রয়োজন ছিলো না তবু বাড়ির পেছনের জংলা পরিস্কার করে। তাতে শস্য ফলায়। উঠোনে বাগান করে। কোদাল দিয়ে মাটি খুড়ে গর্ত বানায়। ময়লা আবর্জনা সেই গর্তে পুঁতে। তিন কামলার কাজ একলা করে। করুক। তাতে আবদুল বাতেনের কিছু যায় আসে না।
তবে যখন হামিদা বানু আবদুল বাতেনের জীবনের রুটিন পাল্টে দিতে চায়, তখনই সমস্যা বাঁধে। স্বামী কেনো কোনো কাজ করে না এ নিয়ে সারাদিন ঘ্যান ঘ্যান করে সে। তাতে যারপরনাই বিরক্ত হয় আবদুল বাতেন। বলে, আমি কাজ করতে যাই কুন দুঃখে! আমি তো ফকিরনির পোলা না।
হামিদা বানু বলে, কাম হইলো পুরুষ মাইনষের পরনের কাপড়। কাম ছাড়া তারে ন্যাংটা লাগে!
এমন কথা শুনে রাগে গা জ্বলে আবদুল বাতেনের। সেই রাগকে আরো তীব্র করে হামিদা বানুর নির্মম রসিকতা। একদিন সে স্বামীকে বলে, আইজ বাজারে গেলে কিছু আন্ডা কিন্যা আইনেন।
আবদুল বাতেন জানতে চায়, আন্ডা দিয়া কি হইবো?
হামিদা বানু বলে, আপনে হারাদিন ঘরে বাইয়া থাকইন, কাম নাই, কাজ নাই, বইয়া বইয়া আন্ডায় তা দিতেন!
আবদুল বাতেন নিপাট ভদ্রলোক। তাই কিছু বলে না। শুধু মনে মনে রাগ পোষে। বিপরীতে হামিদা বানুর অত্যাচার সীমা ছাড়িয়ে যায়। ভোর হলেই মোরগের ডাকের মতো আবদুল বাতেনকে ডাকে। ঘুমাতে দেয় না। এতো সকালে উঠে কী করার আছে! যাদের ঘরে ভাত নেই তারা ভাতের বন্দোবস্ত করতে ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠবে। আবদুল বাতেনের মতো মানুষেরা ঘুমাবে পাক্কা এগারোটা পর্যন্ত। ঘুমের মাঝেই তো জীবনের সুখ।
কিন্তু হামিদা বানু জানে না জীবনের সুখ, তাই অন্যের সুখ কেড়ে নিতে তার দ্বিধা হয় না।
এই যে দিনের বেলা আবদুল বাতেন বন্ধুদের সাথে মোবাইলে কথা বলে, রাতের বেলা খোকনের চায়ের স্টলে আড্ডা দেয় এটাই তো উপভোগ। কিছুদিন ধরে এইসব আনন্দেও কাঁটার বিস্তার করে হামিদা বানু। বলে, কাজ নাই তো এতো আড্ডা কিসের, যাগো সঙ্গে আড্ডা মারেন তারা বেহায়া-বেশরম কোকিল! টেকার গন্ধ পাইয়া কু-কু স্বরে ডাকে। যখন টেকা থাকবো না আপনের সঙ্গে আলাপে তাদের ঠেকা থাকবো না!
এভাবে স্বৈরাচারের মতো আবদুল বাতেনের জীবনকে পুরোটা দখলে নিতে চায় হামিদা বানু। মেয়েটির মাঝে কী যেনো একটা কিছু আছে, মাঝে মাঝে এত রাগ হয়, মাঝে মাঝে মাথায় তুলে আছাড় দিতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু সামনে এসে দাঁড়ালে কেনো জানি চুপসে যায় আবদুল বাতেন।
বন্ধুরা এ নিয়ে হাসাহাসি করে। বলে, বউয়ের ডরে বাঘ থাইক্যা বিলাই হইছে । তা না’হলে কি স্বামীর লুকানো এক লাখ বিশ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিতে পারে কোনো স্ত্রী!
বাবা মৃত্যুর পর এক বিঘে জমি বিক্রি করে ছিলো আবদুল বাতেন। কিভাবে জানি খবরটা পেয়ে যায় হামিদা বানু। জমি বিক্রির টাকা গেলো কোথায় এ নিয়ে প্রশ্ন করে।
বাবার কিছু ধার ছিল, জায়গা বিক্রির টাকায় সেই ধার শোধ করা হয়েছে জেনে রাগ করে হামিদা বানু। বলে, বাপের জমি বেইচ্যা যে পোলায় বাপের ঋণ মারে, সেই আকামা পোলার সন্তান একদিন বাপের কাফনের টেকার লাগি ভিক্ষা করবো!
সে রাতে কড়ায়-গণ্ডায় জমি বিক্রির টাকার হিসাব নেয় হামিদা বানু। অঙ্ক করে দেখে এখনও এক লাখ বিশ হাজার টাকা খরচ হয় নি, আলমিরা থেকে চিলের মতো ছোঁ মেরে টাকাটা নিয়ে যায় সে!
শুধু ঘরে রাখা টাকায় নয় হামিদা বানুর চোখ যায় বাজারেও। তিনটে দোকানের ভাড়া আরো বেশি হওয়া দরকার এমন কথাও তুলে। যারা দোকানদার, তারা আবদুল বাতেনের বন্ধু-স্বজন। হামিদা বানু বলে, ব্যবসায় ইয়ারানা খাটে না। কী লজ্জার কথা, নারী হয়েও সে বাজারে যায়। দোকান তিনটায় নোটিশ দিয়ে আসে। বলে, ভাড়া না বাড়াইলে দুই মাস পর দোকান বন্ধ! নোটিশ পেয়ে বাধ্য হয়েই এক সপ্তাহের মধ্যে দোকানিরা ভাড়া বাড়ায়। কিন্তু এ নিয়ে আবদুল বাতেনকে কটু কথা বলতে তারা দ্বিধা করে না।
বউয়ের এমন ব্যবহারে লজ্জিত হয়, শঙ্কিত হয় আবদুল বাতেন। কিন্তু কিছু বলতে পারে না। তার জীবনকে পুরোটাই ব্যতিব্যস্ত করে রাখে হামিদা বানুর নিত্যনতুন অত্যাচার।
একদিন বাড়িতে এক ট্রাক ইট আসে সঙ্গে বারো বস্তা সিমেন্ট। অবাক হয় আবদুল বাতেন। ইট-সিমেন্টের রহস্য জানতে গিয়ে তার মাথায় ্আকাশ ভেঙে পড়ে। হামিদা বানু বলে, আপনে তো হারাদিন ঘরে বইস্যাই থাকেন। ওহন উঠানে বসবেন। আপনারে একখান দোকান খুইল্যা দেই।
আবদুল বাতেনের বিশাল বাড়ি। বড় উঠোন। সেই উঠোনের একটা অংশে দশ ফুট বাই দশ ফুট দোকানের নকশা আঁকা হয়। হামিদা বানু যুক্তি দেখায়, এক পোয়া লবণ, পাঁচ টেকার পিয়াজ কিন্যার লাইগ্যা গেরামের মানুষ আধ মাইল পথ হাইট্যা বাজারে যায়। ঘরের সামনে দোকান হইলে তারা এইখান থেকে সওদা করে!
রজব আলী রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি নিয়ে আসে। দেখতে দেখতে তিন ইঞ্চি গাঁথুনির একটা রুম তৈরি হয়ে যায়। আবদুল বাতেন বলে, মরে গেলেও আমি দোকানে বসুম না!
হামিদা বানু বলে, আপনে শুধু পায়ের উপরে পা তুইল্যা দোকানের ক্যাশে বইয়্যা থাকবেন, রজব আলী দোকান চালাইবো। আপনে হইবেন মহাজন সাব। লোকে কত সম্মান কইর‌্যা আপনেরে মহাজন কইবো! কথা বলতে বলতে লোভে তার চোখ চকমক করে।
‘এই মাইয়্যা টেকা ছাড়া আর কিছু বুঝে না। আর কিছু বুঝবার চায় না, খোকনের চায়ের দোকানে বসে বন্ধুদের কাছে এভাবেই স্ত্রীর গোমর-ফাঁস করে আবদুল বাতেন। বন্ধুরা বলে, এমুন বউ যার ভাগ্যে আছে তার মরণ ছাড়া গতি নাই।
আবদুল বাতেন মরে গেলেও দোকানে বসবে না জানায় বটে কিন্তু বউয়ের জেদের কাছে তাকে হার মানতে হয়।
বাজার থেকে ঠেলাভর্তি মালপত্র নিয়ে আসে রজব আলী। দোকান সাজায়। দোকানে মিলাদ হয়। পরদিন ভোরে মোরগের ঘুম ভাঙার আগে হামিদা বানুর ঘুম ভাঙে। আবদুল বাতেনকে আর বিছানায় থাকতে দেয় না। বলে, ও মহাজন সাব, আপনের দোকান খুলনের টাইম হয়।
এত ভোরে কার দায় পড়েছে বাজার-সওদা করার। কিন্তু হামিদা বানুকে উপেক্ষা করার শক্তি থাকে না আবদুল বাতেনের। কোনোরকমে মুখ-হাত ধুয়ে ছুটতে হয়। রজব আলী আগে থেকেই দোকানের দরজা খুলে রাখে। সকালের চা-নাস্তা হামিদা বানু দোকানে দিয়ে যায়। এর নাম বুঝি সংসার, এর নাম বুঝি জীবন! আবদুল বাতেন দীর্ঘশ্বাস গোপন করে।
প্রথম দিনেই জমে যায় দোকানের ব্যবসা। হাতের কাছে দুধ-চিনি-চা পাতা কেনার সুযোগ পেয়ে এদিন গ্রামের মানুষের ঘরে ঘরে সকালের চা তৈরি হয়।
ব্যবসার এমন সাফল্যে হামিদা বানু দারুণ খুশি হয়। আনন্দ তার ধরে না।
সারা দিন দোকানে বসে ক্লান্ত আবদুল বাতেন রাতে বিছানায় গা এলিয়ে দিলে হামিদা বানু কাছে আসে। বলে, আইজক্যা রাইতে আপনের মোবাইলের টর্চলাইটের দরকার নাই। আইজ আসমানে আল্লায় তার টর্চলাইট জ্বালাইছে! আহেন বাইরে আহেন। দিন রাত কামলা খেটে কাঠের মতো শক্ত হয়েছে হামিদা বানুর হাত। সেই শক্ত হাত দিয়ে টেনে আবদুল বাতেনকে বিছানা থেকে তুলে, ঘরের বাইরে নিয়ে যায়।
আকাশে মস্ত বড় একটা চাঁদ। হামিদা বানু বলে, আল্লাহর টর্চলাইটে আইজ নয়া ব্যাটারি লাগছে, দেহেন সব কেমুন ফকফকা!
জীবনে যা কোনোদিন ঘটেনি আজ তাই ঘটায় হামিদা বানু। স্বামীর হাত ধরে হাঁটে। বাড়ির পেছনের জংলা জায়গায় যায়। এখন আর এখানে জঙ্গল নেই। কেঁটে-ছেটে সবকিছু পরিস্কার করা হয়েছে। হাত ধরে টান দিয়ে আবদুল বাতেনকে মাটিতে বসায় হামিদা বানু। তারপর একদম ঘা ঘেঁষে পাশে বসে। গুণগুণ করে গান গায়। চাঁদনি রাতে এক অচেনা হামিদা বানুকে দেখে বিগলিত হয় আবদুল বাতেন।
অনেকক্ষণ বসে থাকে তারা। বহুদিন ধরে একটা কথা, একটা ইচ্ছা আবদুল বাতেনের মনে বাসা বেঁধে আছে। ভয়ে বলা হয়নি কখনো। আজ সেই কথাটা বলে সে। বলে, ঘরে যুদি একখান নয়া মেহমান আইতো কেমুন মজা লাগতো! ডাক্তারের কাছে যাইবা নি, পোলা মাইয়্যা ক্যান হয় না জানন দরকার।
মায়াভরা চোখে স্বামীর দিকে তাকায় হামিদা বানু। বলে, মা হওনের সুখ আমি ওহন বুঝবার পারি। আরেক বেটির পোলারে যতন কইর‌্যা বড় করি, হেই পোলায় যহন বড় হইবো, তহন আল্লায় আমার পেটে পোলা দিবো, আমার পোলায় টর্চওয়ালা মোবাইল নিয়া খেলবো! একটু সবুর করেন। সময় হইলেই আমাগো সন্তান আইবো।
কার কথা বলে হামিদা বানু, আর ‘কোন বেটির পোলা’রে সে মানুষ করে! বউয়ের হেঁয়ালি কথার কোনো মানে বুঝে না আবদুল বাতেন। আজ তার স্ত্রী বড় রহস্যময়!

প্রতিদিন মজার ঘুম ফেলে খুব ভোরে জাগতে হয় আবদুল বাতেনকে। তারপর দোকানে গিয়ে বসা। দিনে দিনে দোকানের পসার বাড়ে। ক্রেতা বাড়ে। সেই ক্রেতাদের একজন হয়ে আসে মালেকা বেগম। মুন্সি বাড়ির মেয়ে। বিয়ে হয়েছিলো বছর তিনেক আগে। স্বামীর সঙ্গে বনিবনা হয়নি। তাই গাটকি-বোচঁকা নিয়ে বাবার বাড়ি ফিরে আসে। এখন সে বৃদ্ধ বাবার সংসার দেখাশোনা করে। বাড়ির কাছে হওয়ায় এটা-ওঠা কেনার জন্য প্রায়ই দোকানে ছুটে আসে মালেকা বেগম। তাকে দেখলে আবদুল বাতেনের মন চনমনে হয়ে ওঠে। রূপ যদি হয় পরীক্ষার খাতা তবে হামিদা বানু পাবে টেনেটুনে তেত্রিশ আর মালেকা বেগম হবে লেটার মার্ক, নিদেনপক্ষে আশি! এমন সুন্দর নারীর কেনো সংসার টিকে না! এমন সুন্দর নারী কেনো হামিদা বানুর আগে তার জীবনে আসে না!
মালেকা বেগমের প্রতি দিনে দিনে মমতা বাড়ে আবদুল বাতেনের। আড়াইশ’ গ্রাম চিনি কিনতে এলে তাকে পাঁচশ গ্রাম চিনি দেওয়া হয়! বাড়তি খাতির-যত্নে মালেকা বেগমও আগ্রহী হয়ে ওঠে। দরকারে-অদরকারে দোকানে ছুটে আসে। আবদুল বাতেনের সঙ্গে রঙ-রসের গল্প করে। হাসে। আবদুল বাতেনের তখন বড় ভালো লাগে। বড় বেশি ভালো লাগে। এর নাম যদি প্রেম হয়, তবে হ্যাঁ অবশেষে প্রেম এসেছে আবদুল বাতেনের রঙ হারানো জীবনে। আবার তার জীবন রঙের ঘোড়া দৌড়ায়।
প্রেমের কথা তারা দু‘জনের কেউ মুখে উচ্চারণ করেনি। প্রেম চিনতে মুখের ভাষা লাগে না। এমনকি রজব আলীও বুঝতে পারে, একটা কিছু ঘটছে। সাংঘাতিক একটা কিছু ঘটছে!
তখন হামিদা বানুর আসন্ন সর্বনাশের চিন্তায় অস্থির হয়ে ওঠে রজব আলী । একদিন হামিদা বানুর কাছে গিয়ে সব কথা খুলে বলে।
হামিদা বানু পরের ঘরে মানুষ। ঘর ভাঙার কষ্ট তার চাইতে আর বেশি কে বুঝে! আবদুল বাতেনের মনে যে রঙ ধরেছে কিছুটা আন্দাজ পেয়েছিলো সে। আজ রজব আলীর কাছ থেকে সব শুনে তাই বিপন্ন বোধ করে। সারাদিন কাজে মন বসে না। সারারাত ঘুম হয় না। পরদিন মুন্সিবাড়ি ছুটে যায়। মালেকা বেগমের বাবার সাথে দেখা করে। নালিশ জানায়।
কথাটা জানতে পারে মালেকা বেগম। সে ছুটে আসে আবদুল বাতেনের কাছে। কেঁদে কেঁদে নালিশের খবর জানায়।
আবদুল বাতেন চরম ক্ষীপ্ত হয়। হামিদা বানু সীমা অতিক্রম করেছে। তাকে শিক্ষা দিতে হবে। কঠিন শিক্ষা দিতে হবে। দোকান ছেড়ে বাসায় ছুটে আসে আবদুল বাতেন। হামিদা বানুর নাম ধরে ডাকে। সাড়া মিলে না। শোবার রুমে ঢুকে। এখানে নেই হামিদা বানু। রুম ছেড়ে বেরুবার পথে পায়ে একটা ছোট প্যাকেট ধাক্কা খায়। আগ্রহী হয়ে প্যাকেটটা হাতে নেয়। ওভাকন। এই বাড়িতে ওভাকন পিল কে খায়, কেনো খায়?
এই সময়ে রুমে ঢুকে হামিদা বানু। স্বামীর হাতে প্যাকেটটা দেখে ইততস্ত হয়। মালেকা বেগমের বিষয়ের চেয়ে এই মুহূর্তে ওভাকনের প্যাকেট বড় হয়ে দাঁড়ায় আবদুল বাতেনের কাছে। কেনো সংসারে নতুন অতিথি আসে না এই নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবার চিন্তা ছিলো তার। আজ ডাক্তারের কাছে না গিয়েও এতদিনের প্রশ্নের উত্তর মিলে।
আবদুল বাতেনের ভেতর তখন পুরুষ জেগে ওঠে। চোখ লাল হয়। ছুটে গিয়ে হামিদা বানুর চুলের মুঠি চেপে ধরে। ‘মাগী তুই পিল খাস, আইজ তর পিল খাওনের শখ আমি ছাড়াইয়া দেই‘ বলে হামিদা বানুকে টেনে নিয়ে যায়। বিছানার ধাক্কা মেরে ফেলে। আজ ভেতরের পুরুষ জেগে উঠেছে, আজ বুকের ভেতর একটা পশু ঘোৎ ঘোৎ করে। যে বিছানায় সব সময় আদর করে আবদুল বাতেন, আজ সেই বিছানায় হামিদা বানুর ইজ্জত নেয় সে। বলে, তর পিল খাওনের শখ আমি ছাড়াইয়া দেই!
এমন পাশবিক কাণ্ডে মুখে কোনো কথা আসে না, চোখে কোনো জল আসে না হামিদা বানুর। শুধু রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। মনে মনে ভাবে, যা ঘটছে, স্বপ্নে ঘটছে। ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন।
তবু আবদুল বাতেনের রাগ থামে না। মালেকা বেগম আর ওভাকন মিলে বহুদিন ধরে পুষে থাকা রাগ আগুনে পরিণত হয়।
হামিদা বানুকে বিছানায় ফেলে রেখে বাইরে যায় আবদুল বাতেন। দশ মিনিটের মাথায় ফিরে আসে আবার। একা নয় সে। সঙ্গে নিয়ে আসে মসজিদের মোয়াজ্জিনকে। ততক্ষণে পরণের পোশাককে কোনোরকমে ঠিকঠাক করে বিছানায় পাথর হয়ে বসে থাকে হামিদা বানু।
বাড়ির উঠোন থেকেই বড় গলায় চিৎকার করে বারান্দায় আসে আবদুল বাতেন। পেছন পেছন আসেন মোয়াজ্জিন। আবদুল বাতেন বলে, মাইনসে মসজিদের মওলানারে স্বাক্ষী রাইখ্যা বিয়া করে, আইজ আমি হেই মওলানারে সাক্ষী রাইখ্যা তালাক দিমু।
এমন কথা শুনে বাঁধা দেন মোয়াজ্জিন। বলেন, থামেন গো বাজান থামেন, যে কথা মুখে আনছেন হেইটা আল্লাহপাকের বড়ই না পছন্দ। তার পেয়ারের হাবিবেরও বড় না পছন্দ।
স্বামীর উঁচু গলা শুনে বিছানা ছেড়ে বাইরে আসে হামিদা বানু। তখনও সে বিস্মিত। তখনও সে পাথরের মতো।
মোয়াজ্জিনের কথায় আরো খেপে যায় আবদুল বাতেন। বলে, হুজুর আমারে ধর্ম শেখায়েন না। আমি যা কইবার চাই, যা বহুত দিন কইবার পারি নাই, আইজ আপনে তার সাক্ষী হন।
একটু আগে হামিদা বানুর জীবনে ঝড় বয়ে গেছে। এখন সে সেই ঝড়টাকে সামলে জ্বলোচ্ছাসকে ঠেকাতে মরিয়া হয়। মাথায় কাপড় টেনে মোয়াজ্জিনকে উদ্দেশ্য করে বলে, হুজুর আপনের পায়ে পড়ি আপনে যান, উনার মাথা গরম হইয়া আছে, আমি সামাল দিতাছি।
মোয়াজ্জিন চলে যেতে চান। ফেরার পথ ধরেন। তখন চিৎকার করে আবদুল বাতেন। বলে, যাওনের আগে শুইন্যা যান, আমি আবদুল বাতেন, পিতা আবদুল কাদের, সাং বড় গ্রাম, পোস্টাফিস রানিরবাজার, আইজ আমি আমার স্ত্রী হামিদা বানুরে তালাক দেই। এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক।
হামিদা বানুর শরীর কাঁপে। পায়ের নীচে মাটি সরে যায়, মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ে। তবু সে স্থির থাকতে চায়। তবু সে নিশ্চিত হওয়ার জন্য জানতে চায়, হুজুর তিনি যা কইছেন, তা কি হইছে, ধর্মে কি তা মানে?
মোয়াজ্জিন মাথা নীচু করে উত্তর দেন, আমি সতেরো শ’ টাকা বেতনের মোয়াজ্জিন। ধর্মের বেশি ব্যাখ্যা কইতে পারি না। মনে লয়, তিনি যা কইছেন, তা হইছে, ধর্মেও তা মানছে। তয় একখান পথ থাকে গো মা, যদি আপনে পোয়াতি হন তাইলে তালাক হয় না।
তখন আবার চিৎকার করে আবদুল বাতেন। বলে, থামেন, থামেন এইখানে থামেন, এই মাইয়্যা পোয়াতি হইবো ক্যামনে, এই মাইয়া পিল খায়!

তালাকের তেরোদিনের মাথায় মালেকা বেগমকে বিয়ে করে আবদুল বাতেন। বন্ধুরা খুশি হয়। বলে, তুই ছক্কা মারছস। মালেকা বেগমের মতো রূপসী নারীরে বিয়া করছস, হামিদা বানুর মতো রাক্ষুসিরে তাড়াইয়্যা দিছস, তুই বাঘের বাইচ্চা!
আবদুল বাতেনের এখন সুখের সময়। সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে। মালেকা বেগম গুণবতী রমনী। দিনে স্বামীর মাথায় তেল মালিশ করে দেয়, রাতে পা টিপে দেয়। এখন সকালে কেউ আবদুল বাতেনের কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে দেয় না। দিনে কেউ কাজের জন্য ব্যতিব্যস্ত করে না। রাতে টর্চওয়ালা মোবাইলের রূপালী আলোয় পথ দেখে বাজারে যায় আবদুল বাতেন। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়। আবদুল বাতেন যা চেয়েছিলো তার সবকিছু হাতের নাগালে।

তবু কিছুই ভালো লাগে না তার। ভোর হলেই ঘুম ভেঙে যায়। মোবাইলে কথা বলতে মন বসে না। বন্ধুদের আড্ডায় বিরক্তি আসে। সবচেয়ে বড় কথা, এত কিছুর পর, এত আদর যত্নের পর মালেকা বেগমে মন বসে না আবদুল বাতেনের। সুখগুলো পাতলা ডালের মতো পানসে লাগে।

তারপর একদিন আসমানে আল্লাহর টর্চলাইট জ্বলজ্বল করতে দেখে আবদুল বাতেনের বুকের ভেতরে উতাল-পাতাল হয়। কাউকে কোনো কিছু না বলে সে হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে হামিদা বানুর মামা বাড়ির দরজায় গিয়ে হাজির হয়। মামাকে দেখে হাউমাউ করে কাঁদে। বলে, মামাগো হামিদা বানু কই? হেয় আমার জীবনটারে ছারখার কইর‌্যা দিছে! তারে ছাড়া সবকিছু আন্ধার লাগে, তারে ছাড়া বুকের ভেতর দম থাকে না, যা প্রায়শ্চিত লাগে আমি করি, হামিদা বানুরে শুধু একবার দেখবার দেন!

তালাকের পর এক কাপড়ে মামা বাড়িতে এসেছিলো হামিদা বানু। মামী তাকে গ্রহণ করেন নি। মামী তাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেন। মামা বলেন, হামিদা বানু বুঝি আর তোমার বাড়িত ফিরিয়া যায় নাই, তাইলে কই গেলো মেয়ে?

ছোটবেলায় বাবা-মা হারিয়ে মামার বাড়িতে বড় হয়েছে হামিদা বানু। পরের ঘরে থেকে স্বভাব ছিলো তার পরগাছার মতো। নিজস্ব কিছু কোনদিন ছিলো না বলে সবকিছু নিজের করে নেবার বড় তাড়াহুড়ো ছিলো তার। কিন্তু সবকিছু কি নিজের করে নেয়া যায়?


1 Response

  1. সামিহা says:

    বাংলাদেশের সমাজ থেকে রক্ষণশীলতা, পুরুষতন্ত্রবাদ, মৌলবাদ এগুলো মোছার সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। নারীদের দূরাবস্থা সমাজে আছে, আছে পুরুষদের দূরাবস্থাও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.