স্মৃতি

৬৪-এর দাঙ্গায় রোকেয়া হলের একটি ভয়ার্ত রাত

নবুয়াত ইসলাম পিনকি | 17 May , 2019  


ভারতবর্ষ বিভক্ত হওয়ার আগে ও পরে পূর্ববঙ্গের বিশেষতঃ ঢাকায় কম-বেশি দাঙ্গা হওয়ার কথা শুনেছি যা ঢাকাবাসীকে সম্পর্শ করেছে। সেই সব দাঙ্গার উপর বিস্তৃত লেখা পড়ার সুযোগ আমার হয়েছিলো, তবে সেখানে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল সম্পর্কে কোন উল্লেখ ছিলো না। ফলতঃ রোকেয়া হলের সেই সময়ের একজন আবাসিক ছাত্রী হিসাবে দাঙ্গার দিনগুলিতে আমাদের হলের একটি ভয়ার্ত রাতের ঘটনা লেখার তাগিদ অনুভব করি, যা অনেকের কাছে অজানা। সেই সঙ্গে অতি ছোটবেলার একটি অস্পষ্ট ভয়ের স্মৃতি আমাকে সার্বক্ষণিক তাড়িত করতো যা পঞ্চাশের দাঙ্গা নামেই অভিহিত।

১৯৫০ সাল; কতই বা বয়স আমার! মাত্র ছয় বছর। আমরা তখন কলকাতার পার্ক সার্কাসে থাকি, আমাদেরই সেজ কাকার বাড়ির একতালার একটি ফ্ল্যাটে। বাড়িটির নাম ছিলো “ইসলাম ক্যাসেল” যা এখন “ভৌমিক ক্যাসেল” নামে বিদ্যমান। আমরা সবাই ছিলাম সেখানে, বাবা-মা, মেজ বোন দিদি, দাদুমনি ছোড়দা) সেজ বোন (বুবু) আমার পিঠাপিঠি বোন জিনা। আমি ও আমার খালাতো বোন সেতারা বু।

৪৭ সালে শেষ ভাগে হলেও বাবা নিজের পৈতৃক নিবাস পূর্ববঙ্গে ফেরার কথা ভাবেন নাই। তখন আমিও জিনা শিশু বিদ্যাপীঠ স্কুলে, বুবু সাখাওয়াত মেমোরিয়ালে, দাদুমনি মিত্র ইনস্টিটিউশন স্কুলে, দিদি কলেজে, সবচেয়ে বড় ভাই দাদু রয়েল এয়ার ফোর্সে যোগদান করে লন্ডনে প্রশিক্ষণে গেছেন।

কয়েকদিন থেকে লক্ষ্য করছি বাড়ির আবহাওয়া থম থমে, ভয় ভয় ভাব সকলের, এমন কি পাড়ার অবস্থাও তাই। মা কেমন নিশ্চুপ হয়ে গেছেন। আমাদের সবার স্কুল, কলেজ যাওয়া এমনকি সামনের মাঠে খেলতে যাওয়া নিষিদ্ধ হয়ে গেলো। রাতের আঁধারে নানা রকমের ভয়ার্ত ধ্বনিতে ঘুম ভেঙে যেত। ছোট্ট বুকটা ভয়ে থর থর করে কাঁপতো। এর মধ্যে একদিন বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছি হঠাৎ দেখি একটি লোক দৌঁড়াচ্ছে, পিছন থেকে দুটি লোক তাড়া করে দৌঁড়ে জাপটে ধরে, চাকু মেরে ম্যানহোলে ঢুকিয়ে দিলো। জীবনে প্রথম আর একবারই মানুষ হত্যা দেখি, বাবা দ্রুত আমাকে নিয়ে ঘরে ঢুকে যান, এসব ভয়ার্ত দিনের এক গভীর রাতে ঘুম থেকে আমাকে ও জিনাকে তোলা হলে দেখি বড়রা গোছগাছ করছে। গোটা দুই স্যুটকেস গোছানো অবস্থায় রাখা, আমরা সবাই পাশের ফ্ল্যাটে ক্রিশ্চান আন্টির বাসায় আশ্রয় নিলাম। পরদিন দুপুরে আমাদের বড়চাচার বড়ছেলে বড়দা এসে নিয়ে গেলো তার নিরাপদ ফ্ল্যাট বাড়িতে যা ছিলো এ্যাংলো ইন্ডিয়ান পাড়ায়। তারপর দিন বড়দা তার গাড়িতে আমাদের ঢাকা যাওয়ার জন্য দমদম এয়ারপোর্টে নিয়ে গেলেন। বাবা আমাদের সাথে ছিলেন। সারা এয়ারপোর্ট জুড়ে অপেক্ষামান মানুষের ভীড়। দু’দিন দমদম এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করার পর আমাদের একটি মালবাহী প্লেনে উঠিয়ে দেওয়া হয়। জীবনে প্রথম প্লেনে ওঠার অভিজ্ঞতাটি সুখপ্রদ ছিলো না। বাবা আর দাদুমনি রয়ে গেলেন কলকাতায়। কারণ সামনে দাদুমনির ম্যাট্রিক পরীক্ষা। বাবা ও দাদুমনির জন্য কষ্ট হচ্ছিলো। এভাবেই একটি পরিবার দাঙ্গার কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। ঘন্টা খানেকের মধ্যে ঢাকা তেজঁগাও এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছালাম। এয়ারপোর্টের আশে পাশে চারিদিকে ধূ ধূ প্রান্তর। একটা ছোট্ট ছাপড়া ঘরের সামনে চেয়ার টেবিল নিয়ে বসা এক ভদ্রলোক খাতায় যাত্রীদের স্বাক্ষর নিচ্ছিলেন। দিদি আমাদের সবার হয়ে স্বাক্ষর করলেন। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে দেখলাম কচিদা (বড় চাচার ছোটো ছেলে) গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর্মানিটোলায় বড় চাচার বাসায় উঠলাম। তারপর চট্টগ্রামে বড়বোন আপীর বাসায়। শুরু হলো আমাদের ভাসমান জীবন। আমাদের সঙ্গে অনেক উদ্বাস্তু পরিবার ছিলো, সেই সব সত্যিকারের উদ্বাস্তুদের সাথে আমরাও এক উদ্বাস্তু পরিবার হয়ে ফিরলাম নিজ জন্মভূমিতে। সেই অস্পষ্ট দাঙ্গার স্মৃতি তাড়িত আমি বড় হয়েও স্বদেশে একটা দাঙ্গার স্বাক্ষী হয়ে থাকবো কোন দিন ভাবতেও পারিনি। তাই ৬৪ সালের দাঙ্গায় রোকেয়া হলের ভয়াবহ পরিস্থিতির বিষয়টি লেখার একটি তাগিত সবসময় অনুভব করেছি।

১৯৬৪ সালে ঢাকায় অতর্কিত দাঙ্গা শুরু হয়। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। রোকেয়া হলে থাকি। এই সময়ে আমরা লক্ষ্য করছিলাম কয়েকদিন একটা চাপা উত্তেজনা ভাব থেকে ঢাকা শহর গরম ও পুরাণ ঢাকায় ভয়াবহ দাঙ্গা শুরু হয়েছে। সেখানকার হিন্দু অধিবাসীদের উপর নির্মম অত্যাচার ও হত্যার ঘটনাবলী শোনা যাচ্ছিল। দাঙ্গা প্রতিরোধ এবং হিন্দু অধিবাসীদের কিভাবে রক্ষা করা যায় এবং নিরাপদের আশ্রয়ে নেওয়া যায় এ ব্যাপারে প্রচুর আলোচনা চলছিলো, ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হচ্ছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনের আমতলায় ঘন ঘন সভা-সমাবেশ চলছে। এই পুরোনো ভবনটাকে আমরা “ওল্ড বিল্ডিং” বলতাম, যার একটু বর্ণনা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছি। বর্তমানে এটা এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের এমার্জেন্সি বিভাগ। আমাদের জন্য দুঃখজনকভাবে ৬৩ সালে পুরানো বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের কয়েকটা ডিপার্টমেন্ট যেমন পলিটিক্যাল সাইন্স, ইকোনমিক্স, ফিলোসফি, সোসিওলজি ইত্যাদি) শহীদ মিনারের উল্টোদিকে “সাইন্স এ্যানেক্স” নামে পরিচিত সদ্য তৈরী করা নতুন ভবনে স্থানান্তর করা হয়। পুরানো বিশ্ববিদ্যালয়ে (ওল্ড বিল্ডিং) রয়ে গেলো বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, আরবী, সংস্কৃতি ও পালি, ফার্সি ইত্যাদি ও লাইব্রেরী। আরও রয়ে গেলো ডাকসু’র অফিস ও মধুদার ক্যান্টিন, স্মরণ করা যেতে পারে ১৯৬৫ সালেই ওল্ড বিল্ডিং এবং সাইন্স এ্যানেক্স বিল্ডিংয়ের সব ডিপার্টমেন্ট, ডাকসু’র অফিস ও মধুদার ক্যান্টিন নীলক্ষেতে বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় ভবন যা কলাভবন নামে সর্বাধিক পরিচিত সেখানে স্থানান্তরিত হয়।

মূল কথায় আসি, দাঙ্গার কারণে স্বভাবতই বিশ্ববিদ্যালয় উত্তপ্ত চারিদিকে থম থম ভাব, গুজব ও নানা রকম কথাবার্তা। স্বাভাবিকভাবে রোকেয়া হলের ভেতরে ভেতরে উদ্বেগ চলছিলো। সেই সময়ের একটি রাতের কথাই বলছি। ঐদিন সকাল ১১টার দিকে সাইন্স এ্যানেক্স বিল্ডিংয়ে গেরাম। জানতাম ক্লাম হবে না, কিন্তু কিছু দাঙ্গার খবরতো পাওয়া যাবে। যেতে যেতেই দেখলাম ছেলেরা দলে দলে ওল্ড বিল্ডিংয়ের দিকে ছুটছে। আমতলায় মিটিং চলছে। ছাত্রী কমন রুমে গেলাম, পুরান ঢাকার কেউ এসেছে কিনা কিম্বা কোনো খবর পাওয়া যায় কিনা। দেখি কেউ আসেনি। সঙ্গীর অভাবে আমার আর ওল্ড বিল্ডিংয়ে যাওয়া হলো না। বেলা দু’টা হলে ফিরে আসলাম। ডাইনিং রুমের সাথে কমনরুম। কমনরুমে বসে পেপার পড়ছিলাম। একটু পরেই দেখি ওল্ড বিল্ডিংয়ের ছাত্রীরা ফিরে এসেছে এবং তারা দারুন উত্তেজিত। বকুলের কাছে শুনলাম পুরান ঢাকার অবস্থা ভালো নয়। আরও জানালো দাঙ্গায় বহু হিন্দু মারা গেছে। মিটিং শেষে মিছিল বার হবে। আমি লাফ দিয়ে উঠে বললাম “চল তো বকুল, ওল্ড বিল্ডিংয়ে যাই, কি হচ্ছে শুনে আসি।”

দৌঁড়ে দু’জন রোকেয়া হলের গেট পার হয়ে দ্রুত হাঁটতে লাগলাম। শহীদ মিনার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারিনি, কালী মন্দিরের কাছাকাছি এসেছি, এমন সময় আমাদের পার্টির (এপসু) দু’জন ছাত্রকে এদিকে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে আসতে দেখলাম, আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞাসা করলো “ কোথায় যাচ্ছেন”? বললাম “কেন, ওল্ড বিল্ডিংয়ে?” সাথে সাথে উচ্চস্বারে বলে উঠলো– “মাথা খারাপ, শিগগির হলে ফিরে যান। এইমাত্র মিটিং শেষে ছাত্রদের মিছিল প্রেস ক্লাবের দিকে যাচ্ছে। প্রেসক্লাবে দিনরাত্রির সেল গঠন করা হয়েছে, সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং বুদ্ধিজীবীরা আছেন, সেখানে সবাই একত্রিত হয়ে মিছিল করে পুরান ঢাকার দিকে যাবে। আরও জানলাম মূল দাঙ্গার উৎস পুরান ঢাকা। আর দাঙ্গাকারীরা ছিলো ঠাটারী বাজারের কসাইরা। আরও বললো দাঙ্গাকারীরা চরম হিংস্ররূপ ধারন করেছে, আর সর্বত্র সহিংস হত্যা খুন খারাপি লুটতরাজ চলছে। আর শোনা যাচ্ছে তারা এদিকে আসতে পারে। প্রশ্ন করলাম “আপনারা মিছিলে যান নাই কেন?” তারা জানালো একটা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমাদের পাহারা দিতে হবে জগন্নাথ হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র হিন্দু ছাত্রাবাস।

আমি ও বকুল দৌঁড়াতে শুরু করলাম হলের দিকে. হলের গেটের কাছে এসে দেখি, রিকশা ও ছাত্রীদের ভীড়। ছাত্রীরা জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে যার যার লোকাল গার্জেনের বাসায় চলে যাচ্ছে। এরমধ্যে প্রভোস্ট আপা নোটিশ জারি করেছেন ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে ছটার মধ্যে ছাত্রীদের হল ত্যাগ করার জন্য।

এই অল্প সময়ের মধ্যে এতকিছু ঘটে গেছে। তার মানে দাঙ্গা ইতোমধ্যে চরমরূপ ধারন করেছে। আমি আর বকুল হলে ফিরেই রোকেয়া হল ছাত্র সংসদের সহ সভাপতি জলি আপার রুমের দিকেই ছুটলাম। দেখলাম জলি আপার কক্ষে অনেকে উদ্বিগ্ন চিত্তে বসা যাদের মধ্যে রোকেয়া হল ছাত্রী সংসদ সদস্যসহ ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক মতিয়া চৌধুরী, কমনরুম সম্পাদক জিনাত ইসলাম (জিনা), ফাহমিদা খাতুন (বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী) ও আরও ছাত্রী যাদের নাম এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে না। তবে রোকেয়া হল ছাত্রী সংসদের উপস্থিত সদস্যরা হচ্ছে সাধারণ সম্পাদক ইউ. এস. জেড. সুলতানা, সহ-সাধারণ সম্পাদক রোকেয়া সুলতানা চৌধুরী মীরা, সাহিত্য সম্পাদক হাস্না হেনা বকুল এবং সমাজ কল্যান সম্পাদক আমি নবুয়াত ইসলাম পিনকি।

স্মর্তব্য যে, ছাত্রীদের রাজনীতির পরিসরে সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়ন তথা এর একচ্ছত্র আধিপত্য ও নেতৃত্ব ছিল। সুতরাং রোকেয়া হল ছাত্র সংসদ ছিলো এপসু’র অর্থাৎ অসম্প্রদায়িক প্রগতিশীল ছাত্রীদের দখলে।

ইতোমধ্যে প্রভোস্ট আপা (মিসেস আখতারী ইমাম) জলি আপাকে ডেকে পাঠালেন। জলিআপা এসে জানালেন, “আপা বলেছেন, যে কয়জন হিন্দু ছাত্রী আজকে হল ত্যাগ করতে পারে নাই, তাদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রোকেয়া হল সংসদ সদস্যদের থাকতে হবে। আপা আরও বলেছেন আমরা রোকেযা হলের কোন বিল্ডিংয়ের কোন রুমে থাকলে ভালো হয়, এ ব্যাপারে আলোচনা করে আপাকে জানাতে হবে।”

ততক্ষণে রোকেয়া হল নিরব হয়ে গেছে। সন্ধ্যা হয় হয়। ঠিক হলো ওদেরকে নিয়ে অর্ধচন্দ্রাকৃতি অনার্স বিল্ডিংয়ের একতালার ডানদিকে মাঝের রুমটায় থাকা হবে, পাশেই হাউজ টিউটরের রুম সন্ধ্যার পর পরই আমরা খাওয়া দাওয়া সেরে ঘরে চলে আসলাম। জানুয়ারী মাস, নিচে তোষক চাদর বিছিয়ে শোয়া বসার ব্যবস্থা করা হলো। এদিকে আমাদের বাজার সরকার বাবু এক ডজন মোমবাতি ও দেয়াশেলাই দিয়ে গেলো। ঘরের কোনায় মোমবাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা করা হলো। সব জানালা বিছানার চাদর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো।

এই বিল্ডিংটার পেছনে বড় মাঠ। চারপাশে গোলাকার দেয়াল দিয়ে ঘেরা। সামনাসামনি দেয়ালের ওপাশে রাস্তা। রাস্তার ওপারে জগন্নাথ হল। জগন্নাথ হলের ছাত্রদের নিরাপত্তায় ছিল সর্বদলীয় কমিটির ছাত্ররা আমাদের দলের (এপসু) ছাত্ররা দেয়ালের ওপাশ থেকে জানিয়ে গেল প্রয়োজনে আমরা যেন তাদের ডাক নেই। আমরা তাদের আশ্বস্ত করলাম জেগে থাকার।

সারা রোকেয়া হলের সব বিল্ডিং অন্ধকার। এর আগে হলের এত অন্ধকার এত নির্জনতা দেখি নাই। যে কোন বন্ধের সময় কম বেশি কোন ঘরে রাতে লাইট জ্বলতো, গুন গুন পড়ার ধ্বনি শোনা যেত। এই নিরবতা ছিন্ন করে আমরা সবাই মাটিতে বসে পড়লাম আর কি করা হবে তার আলোচনা শুরু হলো।

প্রথমে ঠিক হলো আগে কলেমা শেখানো হবে। ওরা দেখলাম ঝটপট কলেমাটা শিখে ফেললো। এরপর আলহামদুল্লিাহ্ সুরা শেখানো শুরু হলো। ওরে বাবা এই সুরা মুখস্থ করা তো কঠিন ব্যাপার। ততক্ষনে আমরা সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। ওদিকে জগন্নাথ হল থেকে গান ভেসে আসছে। শ্লোগান ও চলছে।

আমরা গান শুরু করলাম। প্রথমে ফাহমিদা আপা গাইলেন, এরপর মতিয়া আপাকে ধরা হলো। আজকের সবাই অবাক হবে এই ভেবে যে একবার মতিয়া চৌধুরী গান গাইতেন? সত্যি মতিয়া আপা ভালো রবীন্দ্র সংগীত গাইতেন, আমরাও সবাই কোরাস ধরলাম প্রথমেই “আমার সোনার বাংলা”, পরে “ওরে নাই নাই ভয়, হবেই হবেই জয়”, আরো অনেক গান।

রাত গভীর হতে শুরু করলো। আমাদের মধ্যে একটু ঘুম ঘুম ভাব। এসময় দূর থেকে ভেসে আসা “নারায়েতাকবীর আল্লাহুয়াকবার…” ধ্বনিতে আমরা চমকে উঠলাম। দারুণ ভাবে চমকে উঠলাম আমি। সেই ভয়ার্ত ধ্বনি যা ৫০ এর দাঙ্গায় কলকাতায় গভীর রাতে আমার ছোট্ট বুকে কাঁপন ধরাতো। দেয়ালের ওপাশ থেকে ছেলেরা চীৎকারে করে জানালো “ভয় পাবেন না আমরা আছি”। ততক্ষণে জগন্নাথ হলের গান থেমে গেছে। আমরা সবাই ভয় পেলাম। জলি আপা জোরালো গলায় হিন্দু ছাত্রীদের আশ্বাস দিলো “আমরা বেঁচে থাকতে তোমাদের কেউ কিছু করতে পারবে না, মরতে হলে আগে আমরা মরবো।”

আস্তে আস্তে দাঙ্গাকারীদের মিছিলটা হলের গেটের সামনে এসে থামলো। একটা ভয়ঙ্কর তীক্ষ্ণ গলার চীৎকারে আমাদের দম বন্ধ হয়ে গেলো। বুক কেঁপে উঠলো… “দরওয়াজা খুল দো” গেটে ছিলো নমিদা আর মুনিরুল ভাই। সাধারণত, এ দু’জন দারোয়ান রাত দশটায় গেটে তালা দিয়ে চাবি প্রভোস্ট আপার কাছে জমা দিয়ে বাড়ি চলে যেত। আর রাতের পাহারাদার ছিলেন দু’জন। অস্বাভাবিক পরিস্থিতির জন্য ওই দিন রাতে নমিদা ও মনিরুল ভাই হলেই রয়ে গিয়েছিলেন। নমিদা বিহারী ছিলেন, জন্ম এখানেই। বয়স তখন চল্লিশের মধ্যেই হবে। বাংলাদেশে জন্ম ও বড় হওয়া সত্ত্বেও একটা বাংলা শব্দও বললে পারতো না, বাংলা বুঝতোও না।

আমরা পর্দা সরিয়ে অস্পষ্ট আলোতে দেখতে পেলাম নমিদা কিছুতেই দরওয়াজা খুলছে না ওদেরকে উর্দুতে বারবার বলছে “হলে কোনও ছাত্রীই নাই। আমি দরোজা খুলবো না ” বিহারী নমিদার উর্দু শুনে তারা বিশ্বাস করলো। ফিরে গেলো দাঙ্গাকারীরা। সেদিন নমিদা ছিলো বলে বেঁচে গেলো হিন্দু ছাত্রীরা।

এবারে আমরা সবাই একদম চুপ, কেউ বলতে পারলাম না “তোমরা ভয় পেও না, আমরা আছি”, পরস্পর পরস্পরের দিকে আতঙ্কিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম। রাত তখন কত হবে, হয়তো বা চারটা। এ সময় গেট খোলার শব্দে আমরা সতর্ক হলাম, জানালার কাছে গিয়ে দেখলাম একটা গাড়ি ঢুকছে। অফিস বিল্ডিংটার সামনে গাড়িটা থামলো। বারান্দায় প্রভোস্ট আপা দাঁড়িয়ে আছেন, গাড়ির দরোজা খুলে ড্রাইভিং সীট থেকে নামলেন একজন মহিলা। চমকে উঠলাম আরে ইনিতো রোকেয়া আপা ( রোকেয়া কবীর)। সেই সময়কার একজন নামকরা প্রগতিশীল আন্দোলনের মুখপাত্র এবং বামপন্থী রাজনীতিক। রোকেয়া আপা ইডেন কলেজের জেনারেল হিস্ট্রির অধ্যাপিকা ছিলেন। আমারও জেনারেল হিস্ট্রি ছিলো। স্মার্ট, সুন্দরী এবং সুকেশধারী রোকেয়া আপা নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করতেন। প্রভোস্ট আপা দারোয়ান দিয়ে আমাদের বলে পাঠালেন।

ওই কয়েকজন ছাত্রীকে নিয়ে অফিস বিল্ডিংয়ে যাওয়ার জন্য। জলি আপা ওদের নিয়ে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে ওরা জলভরা চোখে আমাদেরকে জড়িয়ে ধরলো। আমরাও নিশ্চিন্ত হলাম ওরা বেঁচে গেলো। বিষন্ন মন নিয়ে সবাই শুয়ে পড়লাম। সকালে উঠেই চা নাস্তা খেয়ে সবাই, বাসায় যাওয়ার উদ্যেগ নিলাম কারণ বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। রোকেয়া হলের গেটের কাছে এসে নমিদা ও মনিরুল ভাইকে ধরলাম, গতকাল রাত্রের ঘটনা বর্ণনা করার জন্য। মনিরুল ভাই বললো বেশ বড় মিছিল ছিলো দাঙ্গাবাজদের, সবার হাতে তলোয়ার ছিলো, কম কথার নমিদা বললেন “আরে বুবরাক, তলোয়ার নেহি, কিরিচ।” আজ ভাবি এই নমিদা সাহস করে গেট খুলেনি। উর্দুতে তর্ক করেছিলো অনেকক্ষণ। শেষে দাঙ্গাকারীদের বিদায় করেছে।

অথচ ২৫ শে মার্চের কালরাতে এই নমিদা বাঁচতে পারেনি। রোকেয়া হলের দেয়াল ভেঙে দিয়ে ট্যাংক নিয়ে ঢুকে পড়ে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী। সেদিনও গুটিকয়েক ছাত্রী ছিল। তাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল হাউজ টিউটরের বাসায়। ছাত্রীরা বেঁচে গিয়েছিলো, কিন্তু বাঁচতে পারেনি নমিদা, মনিরুল ভাই, বাসুদা পিয়ারী লাল। রোকেয়া হলের বাঁদিকে দেয়ালের ওপারে তাদের আবাস স্থলে পরিবারের সদস্যসহ সকলের প্রাণ সংহার করেছিলো হানাদার পাকিস্তানী সেনারা। হিন্দু, মুসলিম, বিহারী বাঙ্গালী সব মিলেমিশে এক বর্ণের রক্তের স্রোতে ভেসে গেলো রোকেয়া হল।

আগেই বলেছি বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরাও বাড়ি ফিরে জানতে পারলাম নারী শিক্ষা মন্দিরে দাঙ্গাকারীরা ঢুকে দু’জন শিক্ষককে এবং প্রধান কেরানী বাবুকে নির্মমভাবে হত্যা করে। আমিও জিনা নারী শিক্ষা মন্দিরের ছাত্রী ছিলাম। ওই স্কুল থেকে আমরা দুবোন ম্যাট্রিক পাশ করি, খবরের পত্রিকার পড়ে আরও জানলাম দু’জন শিক্ষকের মধ্যে একজনের নাম রাধানাথ স্যার যিনি আমাদের অঙ্ক করাতেন, আরেক জনের নাম যগজ্জীবন স্যার যার কাছে আমরা ইংরেজি পড়তাম। সেই সঙ্গে স্কুলের প্রধান কেরানী যিনি বাবু নামেই পরিচিত ছিলেন আমাদের কাছে। এই তিনজনই ছিলেন নিরীহ প্রকৃতির সদাশীব মানুষ, কষ্টে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। অশ্রুসিক্ত হয়ে তাদের কথা এখনো ভাবি এই জন্য যে, একদিন এই নারী শিক্ষা মন্দির রূপান্তরিত হয়ে গেল “শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়” নামে। অথচ নারী শিক্ষার জন্য যিনি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করেছিলেন, সেই মহিয়সী নারী লীলা নাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির নাম রেখেছিলেন নারী শিক্ষা মন্দির, কিন্তু স্বৈরাচারী মোনেম খান স্কুলটির নাম পরিবর্তন করার জন্য চাপ সৃষ্টি করলে সেই সময় কলেজ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকমন্ডলী প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে স্কুলটির নাম লীল রায় মহাবিদ্যালয়, অথবা নারী শিক্ষা ভবন কিম্বা নারী শিক্ষালয় রাখা হউক। কিন্তু প্রতিষ্ঠাটির নামকরণ কোনো কৃতিমান মহিলার নামে নয়, বরং একজন পুরুষের নামে রাখা হলো যার এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোন অবদান নাই। দুভার্গ্যজনক হলেও সত্যি আমাদের বর্তমান যুগেও সমাজ ব্যবস্থায় লিঙ্গ বৈষম্যের কি করুণ অবস্থা।

রাধানাথ স্যার যগজ্জীবন স্যার ও বাবু সবারই জন্মভূমি ছিল এ দেশ। নিজের জন্মভূমিতে তাদের বাঁচার অধিকার দিলো না কেউ। যেমন এখন ভাবি, নমিদার জন্মভূমির রূপটাইতো পাল্টে গেছে। হনন, মৃত্যুচিন্তা এবং ছিন্নমূল হয়ে যাওয়ার ধারাটা রয়েই গেলো। এই হাহাকার এই শতাব্দীতে আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।


3 Responses

  1. গা কেঁপে ওঠে৷ ১৯৫০-এর কথা আমি শুনেছি৷ আমরা হাওড়াতে যে অঞ্চলে ১৯৫২-৫৩ থেকে থাকতে শুরু করি, সেই সব অঞ্চল ১৯৫০-এর আগে মুসলমান অধ্যুষিত ছিল৷ লোকমুখে শুনেছি নারকীয় দাঙ্গার কথা৷বহু মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল৷ ১৯৬৪-তে পূর্ব পাকিস্তানের দাঙ্গার কথা পিসীমার কাছে শুনেছি৷ তিনি ১৯৬৫-তে ফরিদপুর থেকে এসে ভারতে আটকা পড়ে গিয়েছিলেন৷ পিসীমা ফিরে গিয়েছিলেন বটে, কিন্তু ১৯৭১-এ যখন ফিরে এলেন, তখন রিক্ত, শূন্য৷ পিসেমশায় আওয়ামী লীগের আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তিনি খুন হয়েছিলেন রাজাকারের হাতে৷
    পুরোনো মাষ্টারমশাইদের কাছে শুনেছি, ১৯৫০-এ ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের বড় ছেলে দাঙ্গায় প্রাণ হারান৷ তিনি থাকতেন তখন শিযালদহ অঞ্চলের একটি বাড়িতে৷
    আমার মেজদাদুও আসামের বঙাল খেদা আন্দোলনের শিকার হয়েছিলেন৷ তাঁর বাড়ি অসমীয়ারা জ্বালিয়ে দিয়েছিল৷ বহু কষ্টে প্রাণে বেঁচেছিলেন তাঁরা৷
    এই বিবরণও মর্মান্তিক৷ মনুষ্যত্ববোধ সম্পন্ন মানুষ কেউ কোথাও ধর্ম দেখে না, তারা চেষ্টা করে সাহায্য করতে সেই সব মানুষকে যাদের অধিকার ভূলুন্ঠিত হচ্ছে৷
    আমার ভয় হচ্ছে অন্য কারণে৷ এখানে যদি বিজেপি-র মত দল নির্বাচনে জিতে যায়, তাহলে কি অবস্থা হবে বাঙালীদের এই কথা ভেবে৷

    • George says:

      সেই সব ইতিহাস আমাদেরকে মানুষ করে তোলার কথা ছিল। কিন্তু তা হতে পারলাম কই?

  2. joyantakj@gmail.com says:

    Some people in this world are created of different noble materials and ideology(s
    ) .No doubt, they were born to sacrifice their lives for the humanity irrespective of cast and religion. Why they made their own lives jeopardized instead of sitting idle? The reality is- in every place and in every time some good people raised their voices and participated actively to save the innocent and common people in the name of religion. Now, the unity is required in the broader meaning across the countries, across the continents and around the world to raise the voice, stand firmly and communicate with each other to this purpose to make this world more inhabitable for the next generations. Bangladesh can be the ideal place to lead and retain the ideology for the sake of humanity and to create the single platform based on the principles of communal harmony already built in and nourished over the years in its culture keeping aside the misdeeds of the past. Yes, we can.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.