সাক্ষাৎকার

বারবারা টাকম্যান: টেলিভিশন আমাদের যা দিচ্ছে, ওসবকে আমি আবর্জনাই বলবো

রেশমী নন্দী | 13 May , 2019  


প্রখ্যাত মার্কিন ইতিহাসবিদ ও লেখক বারবারা টাকম্যান। ১৯১২ সালে নিউইয়র্কে জন্ম নেন এই ইতিহাসবিদ। মূলত বিশ শতকের মার্কিন ইতিহাসের বিশ্লেষণের জন্য বিখ্যাত বারবারা। দুবার পুলিৎজার বিজয়ী এই ইতিহাসবিদ মার্কিন ইতিহাসের সুলুক সন্ধানে তুলে এনেছেন এমন সব ভুলের গল্প যা, তাঁর ভাষ্যমতে, জটিল ধাঁধাঁর জন্ম দেয় অতীতের আমেরিকার অবস্থানকে ঘিরে। তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ হচ্ছে: The Lost British Policy: Britain and Spain Since 1700, The Guns of August, The Proud Tower: A Portrait of the World Before the War, 1890–1914, Notes from China, A Distant Mirror: The Calamitous Fourteenth Century, The March of Folly: From Troy to Vietnam এবং The First Salute: A View of the American Revolution তাঁর মৃত্যুর এক বছর আগে ১৯৮৮ সালে সাংবাদিক বিল মোয়ের্স বারাবারা টাকম্যানের এই সাক্ষাৎকারটি নেন। টাকম্যানের সাক্ষাৎকারটি ইংরেজি থেকে বাংলায় তর্জমা করেছেন অনুবাদক রেশমী নন্দী।

মোয়ের্স:আপনার সাম্প্রতিক বইয়ের (THE FIRST SALUTE ) বিষয় হিসেবে আমেরিকার বিপ্লবকে বেছে নিলেন কেন?
টাকম্যান: অনেকটা হঠাৎ করেই এটা হয়েছে। নাৎসিদের হাত থেকে হল্যান্ডের মুক্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক সভায় আমি বক্তৃতা দিচ্ছিলাম, বলার জন্য একটু নতুন কিছু খুঁজছিলাম আমি। তখন আমার মনে পড়লো প্রথমবার আমেরিকার পতাকার প্রতি একজন বিদেশী কর্মকর্তার স্যালুট দেয়ার ঘটনাটা। সেখান থেকেই আমি আমেরিকার বিপ্লবের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠি, বিশেষ করে যখন আমি জর্জ ওয়াশিংনের নেতৃত্বে সংঘটিত সেই মিছিলের কথা জানতে পারি যেটা কর্ণওয়ালিশকে ফাঁদে ফেলতে নিউইয়র্ক থেকে ভার্জিনিয়া পর্যন্ত গিয়েছিল। এমন একটা অসাধারণ অভিযান ছিল এটা, এমন সাহসী একটা পদক্ষেপ যেখানে তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে তিনি সূদুর ভার্জিনিয়া পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েছিলেন। আমি এ ঘটনা সম্পর্কে তেমন কিছু্ই জানতাম না এবং মনে হলো অন্যরাও তেমন কিছু জানেন না এ বিষয়ে।
মোয়ের্স:সেই সময়কার কোন বিশেষত্ব আপনাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে?
টাকম্যান: সম্ভবত সেসময়কার জাতিতে জাতিতে বছর জুড়ে লেগে থাকা বিবাদের ঘটনা। কেউ সেসময় ঝগড়াবিবাদ ছাড়া আর কিছু করতো না। আবার সে সময় চমৎকার একটা বিষয়ও ছিল যেটাকে বলা হতো “sociability of nations”, যেটা অবশ্যই লাগাতার ঐসব বৈরিতার একেবারে বিপরীতধর্মী একটা ধারণা। আরেকটা যে বিষয় আমাকে আকৃষ্ট করেছে তা হলো আমেরিকার বিপ্লবের ক্ষেত্রে বিদেশী সাহায্যের পরিসংখ্যান নিয়ে। সমুদ্রে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্রিটেনের অনাকাঙ্খিত হস্তক্ষেপ ও ইউরোপে তাদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা এমন সব শত্রু তৈরী করেছিল যারা কেবল ব্রিটেনের বিরোধীতার সূত্র ধরে কলোনীগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছিল। ফ্রান্সের সহযোগীতা ছাড়া আমেরিকার পক্ষে জয়ী হওয়া সম্ভব ছিল না।
মো: আমি জানি আপনি ইতিহাস থেকে পাঠ নেয়ার ব্যাপারে সতর্ক কিন্তু আমরা কি সেসময় থেকে এমন কিছু শিখতে পারি যেটা এ সময়কার আমেরিকার জীবন বুঝতে আমাদের সাহায্য করবে?
টাকম্যান: আমার তো তা মনে হয়। কেন যেন এখন আমাদের মধ্যে উদ্যম আর লক্ষ্যে পৌঁছাতে প্রয়োজনীয় চর্চার অভাব দেখা দিয়েছে। মানুষের যখন কোন লক্ষ্য থাকে না, তখন চেষ্টায়ও কোন অভিনবত্ব থাকে না এবং সেটা জীবনকে অনেক কম আকর্ষণীয় করে তোলে।
মোয়ের্স: কিন্তু নিশ্চয় বিপ্লবীদের সে দুর্লভ লক্ষ্য ছিল যা তাদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে একটা নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কাজ করতে সাহায্য করেছে।
টাকম্যান: আমার মনে হয় না তাঁরা শুরুতে নতুন ধরনের কোন সরকারের বিষয়ে ভেবেছিল কিন্তু শিঘ্রই তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁরা যা করছেন তা শেষ পর্যন্ত সেদিকেই যাবে। এবং তাঁদের সে আবিষ্কার অসাধারণ আনন্দের, কারণ তাঁদের হাতে সুযোগ এসেছিলো শত শত বছর ধরে চলতে থাকা স্বৈরাচারী শাসকের শোষণ আর দমন নির্মূল করে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করার। নিজেদের স্বৈরশাসনের হাত থেকে মুক্ত করতে পারার এ স্বপ্ন সত্যি অসামান্য। এখন এ বিষয়টারই অভাব দেখা দিয়েছে আমাদের মধ্যে। এখন আমাদের সামনে এমন কিছুই নেই যা আমাদের উল্লসিত করতে পারে, যা আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। নেতিবাচক কোন লক্ষ্য, যেমন ধরুন, রাশিয়াকে থামানো বা অধিকার করা আসলে কাউকেই খুব বেশি উজ্জীবিত করতে পারে না।
মোয়ের্স: যদিও বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন বলেছেন, রাষ্ট্রকে রক্ষা করা একে প্রথমবার জিতে নেয়ার মতোই আনন্দদায়ক হওয়া উচিৎ।
টাকম্যান: হ্যাঁ, কিন্তু আমাদের এ মহাদেশকে আবিষ্কার করা, যেসব অসাধারণ স্থান আমাদের রয়েছে, এখানকার সম্পদ, সাগর থেকে মহাসাগরে পৌঁছে যাওয়া – এসব তো আনন্দের কাজ ছিল।
মোয়ের্স: নেতৃত্বের কথা কি বলবেন? সে সময়টা ছিল রাজনীতি ও নেতৃত্বের জন্য অসাধারণ উর্বর সময়।
টাকম্যান: তখন তো একই সময়ে অনেক প্রতিভাবান নেতার আবির্ভাব ঘটেছিল – জেফারসন, ফ্র্যাঙ্কলিন, জেই, মেডিসন, হ্যামিলটন। এখন যে একটি মাত্র বিষয় প্রতিভাধর মানুষদের আকর্ষণ করে, তা হলো ব্যবসা। তখন কিন্তু কেউ জীবন গোছাতে ব্যবসায় সফল হওয়ার কথা ভাবতো না। অবশ্য তখন ব্যবসা এমন লাভজনকও ছিল না।
মোয়ের্স: রাষ্ট্রের আওতাধীন ব্যবসা তাদের আনুগত্য ও সময় দাবি করতো।
টাকম্যান: সেজন্যই নতুন ধরনের রাজনৈতিক ধারা তৈরি তাদের কাছে ছিল সত্যিকারের গুরুত্ববাহী ও উত্তেজনাপূর্ণ এক সুযোগ।
মোয়ের্স:কিন্তু আপাতবিরোধীতার বিষয় হলো যে দুর্দান্ত নেতৃত্বের গুণসম্পন্ন এসব মানুষ সেসময়কার অনেক নৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারেন নি, যেমন ধরুন দাসপ্রথা। নারী হিসেবে আপনিও বাদ পড়ে যাচ্ছেন তখনকার সংবিধান থেকে। যদি তখন আপনি থাকতেন, এসব মানুষ সম্পর্কে কি আপনি একইভাবে মূল্যায়ন করতেন?

টাকম্যান: নিশ্চয় পুরুষরা যখন রাষ্ট্রের নানা বিষয় নিয়ে আলাপ করতো, নারীরা তখন অন্য কামরায় নির্বাসিত থাকতো। নারীরা এ ধরনের আলাপে আমন্ত্রণ পেতো না কারণ নারীরা গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিতে পারেন বা যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হতো সেগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে এমনটা ভাবা হতো না। কিন্তু আমি জানি না তখন এসব পুরুষদেরকে কেউ বোকা বা অদূরদর্শী বলে কেউ মনে করতো কিনা।
মোয়ের্স: আমার কাছে আপনার একটা লেখা আছে, মার্কিন বিপ্লবের দ্বিশতবার্ষিকীতে লেখা, যেখানে আপনি ’আমেরিকা’ এই ধারণাটি নিয়ে লিখেছেন। সামগ্রিকভাবে আমেরিকার মূল ধারণাকে আপনি কিভাবে তুলে ধরবেন?
টাকম্যান: শতশত বছর ধরে চলতে থাকা স্বৈরশাসন যেখানে শাসক হিসেবে সরকারে অধিকার ছিল কেবল রাজবংশীয়দের- সম্পদের জোরে ধনাঢ্য ব্যক্তিরা বা বংশপরম্পরায় রাজ্যশাসনের অধিকারীরাই কেবল শাসনের অধিকারী ছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, স্পেনের শাসনের আওতা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এই বিষয়ে ডাচরাও আওয়াজ তুলেছিল। আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তৈরীর প্রায় দু’শো বছর আগে লিখিত তাদের ‘oath of abjuration’ এও প্রায় একই কথা লিখিত ছিল।
মোয়ের্স: এখন হলে হয়তো এ কারণে তাদের সরকার চালানোর অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করা হতো কিন্তু তখনকার সময়ে যে কেউ অন্যের কাছ ভালো আইডিয়া ধার নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে তা ব্যবহার করতে পারতো। আপনি বলেছেন, ১৯৭৬ সালে তখনো সবার কাছে এটা খোলা প্রশ্নের মতো ছিল যে সামাজিক শৃঙ্খলা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের ধারণার সাথে গণতন্ত্রকে মেলানো যাবে কিনা। আজকের দিনে এসে এ বিষয়ে আপনার কি মনে হয়?
টাকম্যান: মোটের উপর, ক্ষমতাবানরা সত্যিকার অর্থে অবহেলিত মানুষদের জন্য কাজ করে না। এমনটা আমরা রোজ দেখছি, যেমন ধরা যাক, গৃহহীনদের কথা যাদের নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। এ সমস্যাটা এইডসের চেয়েও ভয়াবহ, কারণ এইডস একধরনের অর্জিত সমস্যা যেটা ড্রাগস নেয়া থেকে শুরু হয় বা স্বভাবদোষে। কিন্তু গৃহহীনদের পরিস্থিতি, তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের প্রয়োজনীয়তা বোঝা তো সরকারের অবশ্য কর্তব্য। তা না হলে এর জন্য আমাদের ভুগতে হবে, যেমন করে ফ্রান্সে যে সব কারণে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম গরীবদের দুর্দশা বুঝতে না পারা ও আর্থিক দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। সেদেশে বিপ্লবের শুরু হয়েছিল আমাদের দেশকে সাহায্য করতে গিয়ে আর্থিক ঘাটতির সূত্র ধরে – এটা আরেক পরিহাস।
মোয়ের্স: আপনি একবার জানতে চেয়েছিলেন যে ওয়াশিংটন, এ্যাডামস, জেফারসনের আমেরিকা কোথায় হারালো? আপনার ‘The first salute’ লেখাটাতে এ প্রশ্নটা ছিল। উত্তরটা আপনি খুঁজে পেয়েছেন কি?
টাকম্যান: যা হারিয়েছে তা হলো ভালো কিছু করার লক্ষ্য। দেশের মানুষ সামগ্রিকভাবে গরীবদের, গৃহহারাদের সমস্যা সমাধানের কথা ভাবে না, যদিও তাদের তা করা উচিৎ। কারণ এগুলো একসময় তাদেরই স্বাভাবিক জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
তবে আমার মনে হয় এর চেয়েও আরো বেশি কিছু ঘটেছে আর তা হলো নৈতিকতাবোধের ঘাটতি, ঠিক-বেঠিকের মধ্যে পার্থক্য জানা এবং সেটা বুঝে চলা। প্রায়ই এসব আমাদের চোখে পড়বে। সকালের পত্রিকা খুললেই আমরা দেখতে পায়, কোন না কোন কর্মকর্তা অর্থ আত্মসাৎ বা দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন। লোকজন তাদের সহকর্মী বা অন্য যে কোন মানুষকে পথে ঘাটে খুন করছে। ইদানীং খুন করা কি করে এত সহজ হয়ে গেলো? বলা হয় সম্মোহিত করেও মানুষকে দিয়ে সে কাজ করানো যায় না যা সে করতে চায় না। নিজেকেই আমি প্রশ্ন করি, তাহলে কি ড্রাগস মানুষকে দিয়ে এমন কাজ করিয়ে নিতে পারে যা সে স্বভাবজাতভাবে করতে চায় না? হয়তো তা পারে। খুন করার একটা ইচ্ছা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে। অনেকে আমাকে এও বলে থাকেন, তখনকার দিনেও কি অসংখ্য সংঘাতের ঘটনা ঘটে নি? এটা ঠিক যে তখনও হানাহানি ছিল, কিন্তু সেগুলো এতটা অর্থহীন কারণে ছিল না এবং যুদ্ধের তাড়নারও একটা সীমা ছিল। কারণ তখন ধর্মীয় শিক্ষার কারণে নরকে যাওয়ার ভয়টা অনেক তীব্র ছিল। নিজেকেই আমি প্রশ্ন করি, বর্বরদের জোর বা শারীরিক ক্ষমতার তুলনায় নৈতিক অবক্ষয় কি আরো বেশি হয়েছে? আমার তো মনে হয় তাই হয়েছে। আমার মনে হয় জার্মানদের পতন হয়েছে তাদের নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে যার প্রমাণ পাওয়া গেছে নাৎসি আমলে–তারা মোটেই সভ্যতার নেতৃত্বদানকারী নয় যেমনটা তারা নিজেদের সম্পর্কে ভেবেছিল ১৯১৪ সালে। আচরণে, কর্মে, নীতিতে তাদের এ অবক্ষয় অত্যন্ত সাংঘাতিক ও ধ্বংসাত্মক ছিল- এতটা বেশি ছিল তা যে সেটা এখন কেউ স্বীকার করতে চাইবে না। এমনটা হতে পারে, যেমনটা হয়েছিল অটোম্যান শাসনামলে তুর্কিদের। নৈতিক চেতনা ও শাসনের অভাব বর্বরোচিত হিংস্রতা, নিপীড়ন ও গণহত্যার মতো বিষয়গুলোকে ডেকে আনে এবং সবশেষে পুরোপুরি ক্ষমতাহীন করে দেয়- ঠিক যেমনটা ঘটেছিল জার্মানিতে।
মোয়ের্স: নৈতিক চেতনা বলতে আপনি কি বোঝাচ্ছেন?
টাকম্যান: সহজাতভাবে কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ সেই বোধ, এবং নিজের বিশ্বাস দিয়ে ভালটিকে খুঁজে নেয়া। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ক্ষমতাবানদের দুর্নীতির ক্ষেত্রেই যে কেবল সত্য তা নয়, যেমনটা আমরা প্রতিদিনই খবরের কাগজে দেখছি, এমনকি তা সমালোচনার ক্ষেত্রেও সত্য… যেখানে শিল্প ও নাট্য-সমালোচকরা এবং বলতে দ্বিধা হচ্ছে…
মোয়ের্স: আপনি চাইলে সাংবাদিকদেরও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন।
টাকম্যান: ঠিক আছে- তারা যে কোন বিষয়কে মহৎ বলে গ্রহণ করবে তা যদি হাস্যকরও মনে হয় কিংবা তারা যদি মনে করে ওটা বিক্রি হবে অথব শিল্পের ব্যাপারীদের কাতুকুতু দিতে পারবে বা আমজনতারে কাছে আবেদন তৈরি করার মতো আকর্ষণ আছে, তা সে যত বাজেই হোক না কেন। এ ধরনের বিষয়কে গ্রহণ করে নেয়া ওই নৈতিক চেতনার অভাব থেকেই ঘটে থাকে।
মোয়ের্স: আপনি সম্প্রতি লিখেছেন যে ভুয়া কর্মকাণ্ডই এখন মার্কিন জীবনের বিদ্যমান উপাদান।

টাকম্যান: তাই তো মনে হচ্ছে। আমরা সাংসদ ও সরকারী কর্মকর্তাদের খারাপ আচরণ বা ওরকম কিছুর বিষয়ে দোষীদের খবর প্রতিনিয়ত পড়ছি। তাদের হলোটা কি? তারা কি শাস্তির ভয়ে ভীত নয় – হোক তা সামাজিক বা আইনী বা বিবেকবোধ? তাদের বিবেক কি কোনভাবে তাদের তাড়িত করে না?
মোয়ের্স: যদি মানুষের রুচি বা নৈতিক মানের পতন ঘটে, জনতার বিচার, যেমন আগে বলা হতো ’এ রাস্কেলটাকে বের করে দাও’, সে ভয় তাদের মধ্যে কমে যায়।
টাকম্যান: একেবারে ঠিক কথা। টেলিভিশন আমাদের যা দিচ্ছে, যদিও বলতে খারাপ লাগছে তবে ওসবকে আমি আবর্জনাই বলবো, তাই আমরা গিলছি। টেলিভিশন লাভের উপর জোর দিচ্ছে, ভালো দর্শকের উপর ভিত্তি করে নয়, বরং আম জনতার কথা চিন্তা করে। মানুষের কাছে সত্যভাষ্য বা গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় তুলে ধরে তাদেরকে ভাবিয়ে তোলা বা জীবনে সৃজনশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরার ক্ষেত্রে এটা কোন পথই হতে পারে না।
মোয়ের্স:খুব বেশি দিন আগে নয়, আপনি বেশ জ্বালা ধরানো কিছু প্রশ্ন তুলে ধরেছিলেন। সিনিয়রের অদক্ষতার কারণে মরে যাওয়া দুশো একচল্লিশ জন আমেরিকান নাবিকের কথা ভেবে যে রাগের বিস্ফোরণ হওয়ার কথা ছিল তা আমাদের মধ্যে কোথায়? ইউএসএস স্টার্ক-এ কর্মকর্তাদের গাফিলতির জন্য সাঁইত্রিশজনের মৃত্যুর জন্যও আমাদের রাগ হলো না কেন? ইরান-কনট্রা কেলেঙ্কারিতে দুর্নীতি আর অদক্ষতার কথা প্রকাশ হওয়ার পরও ক্ষোভে ফেটে পড়লো না কেন কেউ? এ তালিকা আরো বাড়ানো যায়- প্রতিরক্ষা শিল্পে জোচ্চুরিতে আমাদের রাগ ক্ষোভ কোথায় থাকে? আমাদের ক্ষোভ বা রাগ এসব অনুভূতি কোথায় হারিয়ে গেলো?
টাকম্যান: মি: মোয়ের্স, আমি জানি না কি হলো এসবের, তবে কেন যেন মানুষ এখন আর খারাপ কাজকে গুরুত্বের সাথে নিচ্ছে না। হয়তো চারপাশে খুব বেশি খারাপ ব্যাপার ঘটছে। আমরা আর কিছুতে অবাক হচ্ছি না। আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
মোয়ের্স: কিন্তু ইতিহাসের অন্যান্য সময়ের তুলনায় তা কতটা ভিন্ন? ধরুন আপনি যে বিপ্লবকাল নিয়ে লিখেছেন। সেই সময়কার আলোড়ন বা ঝড় তোলা অনেক ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে এমন সব অভিযোগ আছে যেগুলো আজকের প্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে বেশ উদ্বেগজনক। বিপ্লবী যুদ্ধে লুট হওয়া বেসরকারী নৌবাহিনী থেকে মুনাফা করেছিলেন জন হ্যানকক। স্বাধীনতার দলিলে স্বাক্ষর করা অন্যতম নেতা রবার্ট মরিস পণ্যসামগ্রীর দাম এতটা বাড়িয়েছিলেন যে সেই সময় জনগন তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। আপনি যাকে আধুনিক কালের অশুভ শক্তি বলছেন এর অস্তিত্ব সর্বকালেই ছিল না কি?
টাকম্যান: তা ছিল। কিন্তু যখন এর প্রাদুর্ভাব ঘটে, তখনই তফাতটা ঘটে। আর কোথায় গেল আমাদের মধ্যে ক্ষোভ? রাগ- ক্ষোভের অভাব দেখা দিয়েছে কারণ এধরনের অপরাধের চর্চা এখন চারপাশকে গ্রাস করেছে। আমরা এসবে এতটা অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে আমরা একদিকে যেমন এখন এসবে আর উত্তেজিত বা ক্ষুদ্ধ হই না, অন্যদিকে জনগনের মতামত বা তাদের কর্মকান্ডের উপর এর চূড়ান্ত পরিণামও বুঝতে পারছি না। সেই ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি থেকেই আমরা ভুগছি, এখন আবার এই ইরান-কনট্রা ব্যবসা নিয়ে ভুগছি।
মোয়ের্স: ওয়াটারগেট কেলেংকারি নিয়ে আলোচনা যখন তুঙ্গে তখন একটা টিভি অনুষ্ঠানে আপনার সাথে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হয়েছিলাম, আজকের মতোই। আমি ভাবতেই পারিনি যে পনেরো বছর পর আমরা সরকারের নিয়ন্ত্রণহীন চরমপন্থী আচরণ নিয়ে আবার কথা বলবো। আমি ভেবেছিলাম ইতিহাস থেকে কিছু আমরা শিখতে পারবো।

টাকম্যান: আসলে ইতিহাসের শিক্ষা অনেক ধীরে চলে। মানুষ কোন একটা সমস্যা দেখা দিলেই তা সমাধানের জন্য কাজ শুরু করে না, বরং তখনই করে যখন সেটা একেবারে সামনে চলে আসে, যখন একেবারে ঘরের মেঝে ছুঁয়ে ফেলে, তাদের জীবনযাপনকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ করে। মধ্যযুগে যখন ময়লা আবর্জনা ঠিকভাবে পরিষ্কার করা হতো না, কেউ সেটাতে তেমন নজর দিতো না। এবং ততক্ষণ এমন চলতে থাকতো যতক্ষণ পর্যন্ত না নদীর পানি ও ময়লা আবর্জনা মানুষের ঘরের দরজায় এসে পৌঁছাতো । তখন তো পরিষ্কার তাদের করতেই হতো। তেমনটাই এখন হতে শুরু করেছে, আমাদের দোরগোড়ায় এসে পড়তে শুরু করেছে সবকিছু। এর মধ্যেই তা এসেও পড়েছে, নয় কি?
মোয়ের্স: যে কেউ বলতেই পারে যে আবর্জনার পরিমাণ এখন বাড়ছে। আমাদের সময়ে ভিয়েতনামে ঘটানো মূর্খতা এবং প্রতারণার ঘটনা আছে। ওয়াটারগেইট কেলেঙ্কারির মতো হোয়াইট হাউজের নানা দুর্নীতির ঘটনা আছে। দুর্নীতির অভিযোগে রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ঘটনা আছে। কয়েক বছর আগের ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারির ঘটনা আছে। এখন চলছে প্যান্টাগন নিয়ে তোলপাড়, সম্ভবত এটাই আমেরিকাবাসীর জীবনে সবচেয়ে বড় সামরিক প্রতারণা। উচ্চ কক্ষের এমন নিষ্ফলা আর নির্বুদ্ধিতাকে কি বলা চলে?
টাকম্যান: আমরা এসবে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি, এমনকি মূঢ় বা লোভী শাসক নিয়ে অনেকটা সন্তুষ্টও হয়ে পড়ছি, নির্বাচনের জন্য অর্থ সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা বাড়ার সাথে সাথে পুরো নির্বাচন পদ্ধতিকে যা নষ্ট করে দিচ্ছে। আমরা মনোরঞ্জকদের আমাদের প্রার্থী হিসেবে দেখতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, এমন কাউকে নয় যিনি প্রক্রিয়া ও অনুশীলনের মধ্যে দিয়ে আসছে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না থাকলে তো ঠিকভাবে দেশ পরিচালনা করা যায় না। প্লেটোও অনেক আগে বলে গেছেন, সরকার চালাতে প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, প্রয়োজন অনুশীলন। কিন্তু আমেরিকাবাসী এখন তো মনোরঞ্জকদের নেতা হিসেবে পেয়েই সন্তুষ্ট।

“টেলিভিশন আমাদের যা দিচ্ছে, ওসবকে আমি আবর্জনাই বলবো। টেলিভিশন লাভের উপর জোর দিচ্ছে, ভালো দর্শকের উপর ভিত্তি করে নয়, বরং আমজনতার কথা চিন্তা করে। মানুষের কাছে সত্যভাষ্য বা গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় তুলে ধরে তাদেরকে ভাবিয়ে তোলা বা জীবনে সৃজনশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরার ক্ষেত্রে এটা কোন পথই হতে পারে না।”

স্মিথসোনিয়ানে কয়েক সপ্তাহ আগে আমি একটা সেমিনারে অংশ নিয়েছিলাম। তারা ’সুপারম্যান’ আবির্ভাবের অর্ধশতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘নায়ক’ এ ধারণাটির উপর আলোচনার আয়োজন করেছিল। সেমিনারের বিষয় দেখেই আমার বোঝা উচিৎ ছিল যে আমার ‘নায়ক’ ধারণার সাথে আয়োজকদের বক্তব্যের সাথে মিলবে না। এবং আসলেই তা হয়েছিল। তারা যাকে ‘হিরো’ বলছিলেন তা খুব অদ্ভুত। সেই আলোচনায় যাকে সত্যিকারের ‘হিরো’ বলছিলেন সে হলো ছোট্ট এক বাচ্চা মেয়ে যে একটা কুয়োতে ঝাঁপ দিয়েছিল। ‘হিরো’ হবার মতো ও কিছুই করেনি, খুব বেশি হলে ‘খবর’ হিসেবে ধরা যায় এ ঘটনাকে। অন্য যাদের কথা বলা হচ্ছিল তাদের মধ্যে একজন এলভিস প্রিসলি, আরেকজনের নাম আমি কখনো শুনিনি, ম্যাডাম মেফ্লাওয়ার নামের কেউ একজন। উনি আসলে কে?
মোয়ের্স: তিনি হলেন এমন একজন যিনি নিউ ইয়র্কে আমার বাসার কাছেই একটা ব্রোথেল চালায়।
টাকম্যান: তিনি কি হিসেবে ‘হিরো’? যাই হোক, অবশেষে আমি পুরোপুরি বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালাম। বললাম যে তারা ‘জনপ্রিয়’ আর ‘কুখ্যাতি’র সাথে ‘হিরো’ শব্দটাকে গুলিয়ে ফেলেছে এবং এগুলো ’হিরো’ শব্দটাকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। তো, তারা জানালো এরাই জনপ্রিয়তার বিচারে এখন হিরো। জনতাই এদের হিরো বলে রায় দিয়েছে। আমি জানতে চাইলাম, সেক্ষেত্রে ভাষা প্রয়োগে ব্যাকরণ নিয়ে ‘পপ কালচার’ কি বলছে, তার চেয়ে এই হিরোর সংজ্ঞাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে নিচ্ছেন কেন তারা? জনপ্রিয় হিসেবে আমরা তো বলি না ‘It is me’, আমরা বলি ‘It is I’। আমরা তো আমজনতার কথা বিবেচনা করে কোন কিছুর সংজ্ঞা বদলে ফেলতে পারি না।
তাদের বীরের সংজ্ঞা সত্যিই ভয়ংকর। সৌভাগ্যবশত: আমি ওখানে যাবার আগে সতর্কতা হিসেবে অভিধান থেকে ‘হিরো’র সংজ্ঞা দেখে গিয়েছিলাম। অভিধান মতে, অর্ধেক দেবতা আর অর্ধেক মানব এবং সেই সাথে বীরত্বের কাজ ছাড়াও ‘হিরো’ হতে যা লাগে তা হলো ‘মহৎ উদ্দেশ্য’ নিয়ে কাজ করা। অভিধানে এটা উল্লেখ আছে দেখে আমার খুব ভালো লেগেছিল। কারণ নিশ্চিতভাবে এ ক্ষেত্রে মহত্বের ধারণা থাকাটা খুব জরুরি। বীর হতে হলে জীবনে কোন না কোনভাবে মহৎ উদ্দেশ্য থাকা প্রয়োজন। এর জন্য ‘Nobility of purpose’ খুব ভালো একটা শব্দাংশ। ওটা আমি সেমিনারে আমার বক্তব্যে বলেওছি। সবার অবশ্য মনে হয়েছে এই সুপারম্যান বা এসব নিয়ে আলোচনার সাথে আমার বক্তব্য অপ্রাসঙ্গিক।

মোয়ের্স: যে সমাজ ভালো–মন্দের পার্থক্য ভুলে গেছে, বীর আর জনপ্রিয় তারকার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারে না, সে সমাজের ভাগ্যে কি আছে এ বিষয়ে ইতিহাস কি আমাদের কিছু আভাস দেয়? ফ্রান্সের বার্বনদের নিয়ে আপনার একটা লেখা পড়েছি আমি। আপনি লিখেছেন, ফ্রান্সে সাধারণ মানুষের মধ্যে আদালতের ক্ষমতা নিয়ে এমন একটা ধারণা ছিল যে এর অবক্ষয় তাদের চোখেই পড়েনি যতদিন না ফরাসি বিপ্লব অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়লো।
টাকম্যান: কিন্তু তারা তো তাদের বঞ্চনা বা দুর্দশা নিয়ে উদাসীন থাকে নি। আমি সেদিনই ফরাসী বিপ্লবের শুরুর সময়টা নিয়ে পড়ছিলাম। লিয়নের বুণনশিল্পী যারা তাদের জীবন কাটিয়েছে জমকালো কাপড়, রেশম বা জড়ি তৈরি করে, যারা তাদের সারা দিনের মজুরি হিসেবে পেত মাত্র এক সাউ যা দিয়ে তাদের বেঁচে থাকার রসদ জোগানো যেতো না। সেসময় তারা বিদ্রোহ শুরু করেছিল। কিন্তু এই যে যতটুকু তাদের দেয়া হতো আর যে টাকা দিয়ে ক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রি করা হতো, এটুকুর মাঝে যা থাকতো সেটুকুই তো মালিকদের মুনাফা। ব্যবসায়ীরা এ ব্যবস্থায় কোনরকম পরিবর্তন করতে চাইলো না এবং সেখান থেকেই শুরু হলো বিদ্রোহ। তখন নেতাকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয় এবং সেখান থেকেই সূত্রপাত ফরাসি বিদ্রোহের। এরকম ঘটনা থেকে আমরা কিছুই শিখি নি। আমরা শিখি নি যে সমাজের খারাপ কিছুকে অবহেলা করলে, গৃহহীনদের, সহায়হীনদের অবজ্ঞা করলে সেসব আমাদেরই আঘাত করবে।
মোয়ের্স: কিন্তু রাজতন্ত্রের ক্ষমতা নিয়ে প্রজাদের মধ্যে এমন ধারণা গেঁথে ছিল যে বিপ্লব অবশ্যম্ভাবি হবার আগ পর্যন্ত অবক্ষয়ের মধ্যেই বার্বনদের মেনে নেয়া হয়েছিল?
টাকম্যান: হ্যাঁ, রাজার এমন এক ক্ষমতা থাকে, শাসন করার এমন এক ন্যায়সঙ্গত অধিকার থাকে যে মাঝে মাঝে খুনোখুনি ঘটানো ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে অন্য কিছু করার সত্যিকারের চেষ্টা প্রজারা করে না।
মোয়ের্স: আমাদের এখানে রাজা নেই। যদিও আমার কাছে তা রূপকার্থে মনে হয়। যেমন ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি, পেন্টাগন কেলেঙ্কারি বা তোপের মুখে বিভিন্ন কর্মকর্তার পদত্যাগ, এটর্নি জেনারেলের নৈতিকতার অভাব এ সব কিছুর পরেও আমাদের এখানে রাষ্ট্রপতি থাকছেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে। যদিও আবর্জনা আমাদের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছে গেছে কিন্তু মনে হচ্ছে তা হোয়াইট হাউজের দোর গোড়ায় আসতে পারে নি।
টাকম্যান: না, তা হয় নি। ভাবলে আমার অবাক লাগে যে এটা কি ব্যক্তি নাকি প্রতিষ্ঠানের স্বভাবগত ধারণার কারণে ঘটছে? আমার তো মনে হয় দুটোই। মনে হচ্ছে রিগান এমন একজন মানুষ যার কাছে কোন ঝামেলা ঘেঁষতে পারে না। কিন্তু আমার মনে হয়, এ সমস্ত ব্যাপার ব্যক্তিকে ছুঁতে না পারলেও অফিসকে নিশ্চয় প্রভাবিত করে। এবং আমরা যদি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কেই শ্রদ্ধা হারাই তাহলে তা হবে খুব দুঃখজনক।
এই বিষয়টাই আমি আমার ‘The March of Folly’ লেখাতে পোপ সম্পর্কে লেখা পরিচ্ছদে বলার চেষ্টা করেছি। পোপের কাজকর্মের সূত্র ধরে এ পদের প্রতি আমাদের এমন শ্রদ্ধা ও সম্মানের মনোভাব তৈরি হয় যে এর ফলে সংস্কার সম্ভব হয়েছিল। সরাসরি সংস্কারের কারণ এটা না হলেও এর ফলেই রোমান চার্চকে ছুঁড়ে ফেলার ভাবনা সম্ভব হয়েছে।
মোয়ের্স: ওয়াটারগেইট কেলেঙ্কারির সময় আপনার একটা লেখার কথা মনে পড়ে গেলো। আপনি লিখেছিলেন আমেরিকার রাষ্ট্রপতিত্ব এখন মূল্যের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আপনি লিখেছিলেন, “ঠিক হোক বা ভুল, এটা এখন আর আমার দেশ নয়। তবে ঠিক হোক বা ভুল, এ রাষ্ট্রপতি আমার। এভাবে আমাদের আনুগত্য রাষ্ট্র থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তির প্রতি অর্পিত হয়েছে, প্রতিষ্ঠান থেকে সরে গেছে পদাধিকার প্রাপ্তের কাছে।”
টাকম্যান: এবং এখন কেউই এর সমর্থন করতে পারে না। একমাত্র যার ক্ষেত্রে এমনটা হতে পারতো তিনি হলেন জর্জ ওয়াশিংটন, যিনি আমার কাছে ‘বীর’ শব্দের প্রকৃত উদাহরণ। ওয়াশিংটন ছিলেন সববিষয়েই একজন অনন্যসাধারণ মানুষ–তাঁর চরিত্র, সাহস, অধ্যবসায়, নিজের প্রতি তাঁর একধরনের বিশ্বাস যে তিনি ঠিক কাজ করছেন, অসম্ভব হতাশা ও সমস্যার মধ্যেও যে তিনি টিকে থাকবেন। তাঁর সাথে তুলনা চলে আরেক বিপ্লবী নেতা নেদারল্যান্ডসের উইলিয়াম দ্য সাইলেন্ট-এর সাথে, যিনি সম্ভবত একবার বলেছিলেন, অধ্যবসায়ী হতে আশার প্রয়োজন হয় না। আমার কাছে মনে হয়, সুন্দর এক আবেগ ধারণ করে এ ভাবনা। উইলিয়াম দ্য সাইলেন্টও সফল হয়েছিলেন, যদিও এ সফল বিদ্রোহে সময় লেগেছে ৮০ বছর। ইউরোপের প্রান্তে জলবেষ্টিত এই ছোট্ট জনপদ যাদের আর তেমন কিছুই নেই নিজেদের জন্য জলাভূমি থেকে টেনে তুলা নেয়া জমিটুকু ছাড়া -এরাই সে সময়ে ইউরোপের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী রাজ্যের বিরুদ্ধে ৮০ বছর ধরে বিদ্রোহ জারি রেখেছিল। ডাচদের এ কাহিনী সত্যিই অসাধারণ।
মোয়ের্স: কিন্তু আমি ভাবছি যে কি হতো আমাদের এই টেলিভিশনের যুগে যদি ‘উইলিয়াম দ্য সাইলেন্ট’কে ‘উইলিয়াম দ্য গ্যরুলাস’ হতে হতো এবং যদি জর্জ ওয়াশিংটনকে টকশো আর রবিবারের রাজনৈতিক আলোচনায় লাগাতার জিজ্ঞাসাবাদের মুখে নিজের সম্মান রক্ষার্থে হিমশিম খেতে হতো?
টাকম্যান: তিনি অবশ্য খুব বলিয়ে লোক ছিলেন না। কিন্তু তিনি এসবের এতই উপরে ছিলেন যে আমার মনে হয় না এসবে তিনি কাবু হতেন। তাঁর মধ্যে এমন অসাধারণ মহত্ব ছিলো যে সবাই তা অনুভব করতে পারতো-এমনকি কেবল তাঁর সাথে পরিচিত হয়ে, কেবল তাঁকে দেখে, এমনকি তখনও যখন তাঁর জেনারেলরা তাঁর সাথে দেখা করতে এসে তাঁর টেবিলে অভাবের ফিরিস্তি জমা দিতেন, জুতো নেই, অর্থ নেই, খাবার বয়ে নেয়ার ওয়াগ্যন নেই এমনকি খাবারও নেই- অত সাংঘাতিক হতাশা আর কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও। সে সময় এক জায়গায় অনেকগুলো শুকনো, ক্ষুধার্ত বাছুর ছিলো যেগুলো মাংসের চাহিদা মেটাতে রাখা ছিল, কিন্তু সেগুলো তারা কাটতে পারছিলো না, কারণ কাটা মাংসের উপর লবণ ছিটিয়ে দিতে কসাইকে যে অর্থ দিতে হবে তা তাদের ছিল না আর কসাইরা অর্থ ছাড়া এ কাজ করতে রাজি হয়নি। এরকম অনেককিছুই ওয়াশিংটনকে সামলাতে হয়েছে। আক্ষরিক অর্থে একটা বড় যুদ্ধ চালাতে হলে যা যা সইতে হয়- প্রায় সবক্ষেত্রে হতাশা-সবকিছুর অপ্রতুল যোগান থেকে শুরু করে তাঁর সহযোগী, কর্ণেল, জেনারেলদের একের পর এক ব্যর্থতা।
আর সব কিছু যখন শেষ হলো, চলচ্চিত্রের বিখ্যাত সেই দৃশ্যে যেমনটা দেখানো হয়েছিলো, তিনি দায়িত্ব থেকে অব্যহতি নিয়ে সবাইকে বিদায় জানিয়ে চশমা বের করে চোখে পড়েন – এর আগে কেউ তাঁকে চশমা পড়তে দেখে নি- সবার উদ্দেশ্যে বললেন, ” আপনাদের সেবা করতে করতে আমি বুড়ো হয়েছে, আর আমার চোখও….” ঠিক শব্দগুলো আমার মনে নেই। তাঁকে সব সৈন্যরা এত ভালবাসতো যে সবাই কাঁদছিল। আমারও কান্না পেয়েছিলো এতে। আমি অবশ্য আমার বইতে এ দৃশ্যটা রাখিনি। এতো লোক এ বিষয় নিয়ে লিখেছে যে আমার ইচ্ছে হয়নি দৃশ্যটা আবার লিখতে। কিন্তু চশমা খুলে রাখার ভঙ্গিটা আমাকে খুব আলোড়িত করে।
যখন আমার মেয়ে আমার নোটস আর রেফারেন্সগুলো গুছিয়ে রাখতো শুরু করলো বা নির্ঘন্টের জন্য প্রকাশকদের চাহিদা অনুযায়ী প্রথম নাম লেখার ঝক্কি সামলাতে সাহায্য করতে আসলো, তখন আমি বুঝতে পারলাম, আমার চোখ দুটো খারাপ হওয়ায় আমি আমার গবেষণার ব্যাপারে কতটা উদাসীন হয়ে পড়েছি। প্রকাশকদের চাহিদা অনুযায়ী নাম আমার কাছে ছিল না। আমাকে আবারো সেগুলো খুঁজে খুঁজে বের করতে হচ্ছিল। ভয়াবহ সময় গেছে সেটা আমার। সেই সময় চোখের সমস্যা নিয়েও নিদারুণ যন্ত্রণা পাচ্ছিলাম। তখন আমাদের শ্লোগান ছিল ” জর্জের কথা ভাবো।” আমরা বইটার নামও এটাই রাখবো ভেবেছিলাম।
মোয়ের্স: “জর্জের কথা ভাবো।”

“আমরা বিজ্ঞাপন দেখতে দেখতে ছলছাতুরীর মধ্য দিয়ে বড় হওয়া আমজনতা। আমরা ছোট থেকেই দেখতে দেখতে শিখেছি যে বিশেষ ধরনের সিরিয়াল খেলে আমরা সবল হয়ে উঠবো। জেনেছি যে বিশেষ ধরনের টুথপেস্ট ব্যবহার করলেই আমাদের গ্যারি কুপারের মতো কারো সাথে বিয়ে হবে কিংবা নিদেন পক্ষে অসাধারণ কোন রোমান্সের অভিজ্ঞতা হবে। অথবা বিশেষ একটা শ্যাম্পু ব্যবহার করলেই আপনি আপনার অসম্ভব সুন্দর ঝরঝরে চুল খুলে সমুদ্রতটে দৌঁড়াতে পারবেন। এ সবই একধরনের ধোঁকা। কিন্তু আমরা এসবেই অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমরা নিজেদেরকে এসবে অভ্যস্ত হতে দিয়েছি।”


টাকম্যান:
হুঁ। কারণ তিনি অসম্ভব রকমের সব সমস্যা অসাধারণ দক্ষতায় সামলেছিলেন।
মোয়ের্স: এই টেলিভিশনের যুগে এটা কি খুব রোমান্টিক ভাবনা হয়ে যাবে না বা অসম্ভব উপদেশ হয়ে যাবে না, যদি আমরা আমাদের রাজনীতিবিদদের হোয়াইট হাউজে গিয়ে জর্জ ওয়াশিংটনের কথা ভাবতে বলি?
টাকম্যান: তা তো বটেই। কে এ সব সামলাতে পারবে? তবে, হয়তো যারা ভাববেন, তারা নিজেদের মধ্যে একধরনের উদ্যম আর বিশ্বাস খুঁজে পাবেন। ওয়াশিংটনের মধ্যে সত্যিকারের অর্থে যা ছিল তা হলো বিশ্বাস। দৈবের উপর সাংঘাতিক বিশ্বাস ছিল তাঁর। দৈব অলঙ্ঘনীয়। যত কিছুই আমরা সহ্য করি না কেন, যা কিছুই ভুল হোক না কেন, তিনি বলতেন, শেষপর্যন্ত দৈবের গুণে সব ঠিক হয়ে যাবে।
মোয়ের্স: পরবর্তী সব প্রেসিডেন্ট–রোনাল্ড রিগ্যান, জিমি কার্টার, জেরাল্ড ফোর্ড, রিচার্ড নিক্সন, লিন্ডন জনসন-সবারই তো ঈশ্বরে ভক্তি ছিল।
টাকম্যান: ছিল, তবে তা বুলি আওড়ানো। কথা হলো তাদের কতটা আস্থা আছে এর উপর, কতটা বিশ্বাস আছে যে তাঁরা যা করছেন, তা ঠিক করছেন। ওয়াশিংটন যা করতেন, পূর্ণ আস্থার সাথে করতেন। যেমন ধরুন, নিউইয়র্ক থেকে পায়ে হেঁটে ওয়াশিংটন পর্যন্ত সৈন্যদলকে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। তিনি চেয়েছিলেন কর্ণওয়ালিশকে সাহায্য করতে চেসাপিকের ধারে ফরাসিদের সাথে দেখা করবেন । পুরো ব্যাপারটা সংগঠিত হয়েছিল চিঠির মাধ্যমে। টেলিফোন নেই, টেলিগ্রাফ নেই, স্যাটেলাইট নেই, কিচ্ছু ছাড়া কেবল চিঠির মাধ্যমে। এই যে তিনি ভাবলেন, পায়ে হেঁটে তাঁরা পৌঁছাতে পারবেন, ফরাসীরাও সমুদ্র পার হয়ে আসতে পারবে, ওয়াশিংটন আর ফরাসীদের ঠিক পরিকল্পনা মতো দেখা হবে। অনেক দিক থেকে ভাবতে গেলে এটা প্রায় অলৌকিক একটা ঘটনা। এই কাজে ওয়াশিংটন তাঁর খ্যাতি, তাঁর সেনাবাহিনী, বিপ্লবের পরিণতি-সবকিছুকে বাজি রেখেছিলেন। এটা অসম্ভব ধরনের একটা দুঃসাহসিক কাজ, যেটা আর কেউ করার সাহস করতেন না। কারণ, ওয়াশিংটনের মতো আত্মবিশ্বাস আর কারো ছিলো না।
মো: আমাদের এখনকার সময়ের নৈতিক পরিস্থিতির বিবেচনায় আপনি অসম্ভব একটা পরিস্থিতির উল্লেখ করলেন। আপনি কি ওয়াশিংটনকে একেবারে খাপছাড়া মনে করেন?
টাকম্যান: সমস‌্যা হলো আমাদের এখনকার সবাই এক্কেবারে মেকি। প্রযুক্তির সবচেয়ে বিধ্বংসী হাতিয়ার যার নাম টেলিপ্রম্পটার, এর প্রভাবে এই মানুষগুলো তৈরি। তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোন কথা বলেন না। আপনি কখনোই দেখবেন না তাঁরা কোন পরিস্থিতি নিজের বুদ্ধি দিয়ে মোকাবেলা করছেন। তাঁরা তাদের সামনে যা দেয়া হয় তাই পড়েন। সেসব বাক্য তাঁদের জন্য লিখে দেন জনসংযোগ কর্মকর্তারা। যারা আমাদের সামনে আসেন, তাঁদের আসল রূপটা আমরা দেখি না। এর মাধ্যমে আসলে আমরা একজন অযোগ্য, গৌণ মানুষের বিবৃতি শুনতে পাই কারণ তিনি খুব ভালো বক্তৃতা লেখক আর যিনি পড়েন তিনি এ দায়িত্ব পান কারণ তিনি ভালো অভিনেতা।
মোয়ের্স: জর্জ ওয়াশিংটনের জন্যও বক্তৃতা লেখক হিসেবে অ্যালেক্সান্ডার হ্যামিলটন ছিলেন। এতে কোন সম্পর্ক খুঁজে পান কি?
টাকম্যান: না। কারণ টেলিপ্রম্পটার এমন মানুষকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করে যিনি আসল নন। আমরা বিজ্ঞাপন দেখতে দেখতে ছলছাতুরীর মধ্য দিয়ে বড় হওয়া আমজনতা। আমরা ছোট থেকেই দেখতে দেখতে শিখেছি যে বিশেষ ধরনের সিরিয়াল খেলে আমরা সবল হয়ে উঠবো। জেনেছি যে বিশেষ ধরনের টুথপেস্ট ব্যবহার করলেই আমাদের গ্যারি কুপারের মতো কারো সাথে বিয়ে হবে কিংবা নিদেনপক্ষে অসাধারণ কোন রোমান্সের অভিজ্ঞতা হবে। অথবা বিশেষ একটা শ্যাম্পু ব্যবহার করলেই আপনি আপনার অসম্ভব সুন্দর ঝরঝরে চুল খুলে সমুদ্রতটে দৌঁড়াতে পারবেন। এ সবই একধরনের ধোঁকা। কিন্তু আমরা এসবেই অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমরা নিজেদেরকে এসবে অভ্যস্ত হতে দিয়েছি। আদতে বিজ্ঞাপনই আমেরিকার মানুষের ভাবনার পতনের জন্য অনেকটাই দায়ী।
মোয়ের্স: আপনি কি তিরিশ বা ষাট সেকেন্ডের রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন বন্ধের পক্ষে?
টাকম্যান: অবশ্যই। আমি মনে করি জনগনের সামনে সরাসরি রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে উপস্থিত হওয়া জরুরি।
মো: যাতে করে আমরা তাদের নিজস্ব ভাবনা দেখতে পাই।
টাকম্যান: হ্যাঁ, এসব সরাসরি হওয়া উচিৎ এবং অবশ্যই তিরিশ সেকেন্ডের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে হওয়া উচিৎ।
মোয়ের্স: আপনি তাহলে ব্যক্তি হিসেবে তাদের নিজস্ব ধ‌্যানধারণার প্রকাশ থেকে মেধা যাচাই করতে চাইছেন। জর্জ ওয়াশিংটনের ক্ষেত্রে সাফল্য তাঁর সঙ্গী ছিলো। সবাই জানতো, তিনি একজন সত‌্যিকারের মানুষ।
টাকম্যান: যদিও তারা তাঁকে প্রায়ই নাকোচ করে দিতেন, অপমান করতে চেষ্টা করতেন, এমনকি অনেকে তাঁকে সরিয়েও দিতে চাইতেন। এজন্য নয় যে তিনি ভন্ড ছিলেন, বরং এজন্য যে তিনি অনেক বেশি কাজের ছিলেন।
মো: আপনি কোন এক প্রসঙ্গে একবার বলেছিলেন, মিডিয়া এমন মানুষকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনীত করার দিকে আমাদের ঠেলে দেয় যারা এমনিতে পছন্দ করার মতোই মানুষ, স্নেহশীল কিন্তু টেলিভিশন তাদের পাশে না থাকলে কখনোই দায়িত্ব নেয়ার পক্ষে যোগ্য হতে পারতেন না। যেমন ধরুন, ওয়ারেন হার্ডিং।

“কেন যেন মানুষ এখন আর খারাপ কাজকে গুরুত্বের সাথে নিচ্ছে না। হয়তো চারপাশে খুব বেশি খারাপ ব্যাপার ঘটছে। আমরা আর কিছুতে অবাক হচ্ছি না। আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি।”

টাকম্যান: হ্যাঁ কিন্তু তখন তো এখনকার মতো পরিস্থিতি এতো জটিল ছিলো না।
মোয়ের্স: এ কথা দিয়ে কি বোঝাতে চাইলেন?
টাকম্যান: আমি যেটা বলতে চাইছি তা হলো, এখন আমাদের চারপাশের অবস্থা অনেক অর্থেই বেশ ভয়াবহ, অসম্ভব চাপ এখন সবকিছুতেই যেগুলো সামাল দেয়া বেশ কঠিন। যেখানে হার্ডিং এবং কোলিজের সময় অনেক কিছুই কম জটিল ছিল।
মোয়ের্স: সেনাবাহিনী ছোট ছিল, বাজেট ছোট ছিল, অন্যের জীবনের উপর অধিকারও অনেক কম ছিল।
টাকম্যান: যেমন, এখন আমাদের গোয়েন্দা কর্মকান্ডের দিকে খেয়াল করুন। একুশ শতকের দিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হ্যানরি স্টিমসন ব্ল্যাক চেম্বারখ্যাত কোড রিডিং-এ আপত্তি করেছিলেন এই বলে যে , ভদ্রলোকেরা অন্যের ইমেইল পড়ে না। তাঁর নীতিজ্ঞান প্রবল ছিল যদিও তা কিছুটা বেখাপ্পা বা ভুল জায়গায় প্রয়োগ হয়েছিল। কিন্তু আমাদের এখনকার সরকার সব বিষয়ে অনেক বেশি সজাগ হয়ে প্রত্যেকটি খুঁটিনাটি বিষয়ে নজরে রাখে এবং প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশিই তারা জানেন। তাদের জ্ঞান নেই, তাদের যা আছে তা হলো এখানে কি হচ্ছে বা ওখানে হচ্ছে সেসব তথ্য।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় আমি রবার্ট ম্যাকনামারার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম, ” দেখুন, মোটের উপর ফরাসীরা অনেকদিন ধরেই ভিয়েতনামে ছিল এবং কালো পাজামা পড়ে এমন সব মানুষ তাদের হারিয়েছে যাদের কোন ক্ষমতা থাকারই কথা ছিল না।” তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ” কিন্তু সেটা তো আমরা জানতাম না।” এমনভাবে এই জানাটা হলো আমার। এটা এতই প্রকাশ্য ব্যাপার ছিল যে ঘটনা হলো ভিয়েতনামে কি হচ্ছে, ওখানকার লোকজন কেমন এসব জানা একেবারে সহজ ছিল আমাদের জন্য। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ছিলেন যারা সারাক্ষণ নানা ধরনের রিপোর্ট লিখে পাঠাতেন। তাছাড়া, বই ছিল, গবেষণা ছিল। ৫ মিনিটের মধ্যেই জাতীয়তা কি, ভিয়েতনামের লোকজন কেমন সেটা জানা যেতো।

মোয়ের্স: তাহলে সরকারগুলো নিজেদের এধরনের বোকামি চালিয়ে যাচ্ছে কেন?
টাকম‌্যান: তারা এসব বোকামি করে যাচ্ছে কারণ তারা তাদের অবস্থান বা ক্ষমতা হারাতে চায় না। তাদের ভয়, যদি তারা এসব ছেড়ে দেয় বা জানিয়ে দেয় যে তারা ভুল করছে, তবে তারা পরিত্যক্ত হবেন বা অবস্থান হারাবেন। অনাকাঙ্খিত তথ্য দিয়ে তারা হোয়াইট হাউজের পরবর্তী মধ্যাহ্নভোজন থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে চায় না বা নির্বাসিত হতে চায় না।
মোয়ের্স: সাম্প্রতিক সময়ে সায়রাস ভ্যানস-ই একমাত্র উদাহরণ যিনি রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে পদত্যাগ করেছেন। যদিও দুই মন্ত্রী সুলজ এবং ওয়েনবার্গার বলেছিলেন যে তাঁরা ইরানে অস্ত্র বিক্রির বিপক্ষে।
টাকম্যান: কিন্তু তাঁরা এর বিপক্ষে দাঁড়াননি।
মোয়ের্স: আপনি বলছিলেন, জনগনের কাছে এসব জালিয়াতের গ্রহণযোগ্যতা একসময় সমাজের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।
টাকম্যান: কেবল সান্তা ক্লজের উপর ভরসা করে বসে থেকে আপনি তো কোন কিছুর ভালো ফল পেতে পারেন না। যেমন কেবল ধারের টাকায় জীবন টেনে নিয়ে যাওয়া যায় না। আপাতদৃষ্টিতে যদিও মনে হয় যে আমরা তা পারি কারণ আমরা বিজ্ঞাপনী মোহে এমনই আচ্ছন্ন যেখানে আমাদের বিশ্বাস করানো হয় ঠিকঠাক টুথপেষ্ট বা শ্যাম্পু ব্যবহার করলেই আমাদের জীবনের সবকিছু ঠিকঠাকই চলবে। এগুলো তো আসলে সত্যের কাছাকাছি কিছু না।
মোয়ের্স: ইতিহাস থেকে একের পর এক এসব চরিত্রদের মুখোমুখি হয়ে আদৌ কি কোন লাভ আছে? অনেকে বলতে পারেন, অতীত তো অতীতই, মৃতদের দায়িত্বেই থাকুক মৃতরা, ইতিহাস হলো পেছনে ফেলে আসা সত্য। ইতিহাস পড়ে আদৌ কি কোন লাভ আছে?
টাকম্যান: নিশ্চয়ই আছে। একে তো ইতিহাস পড়া ভয়ানক আকর্ষণীয়। মানুষজন বলে, ইতিহাস পড়ে কি লাভ? আমি বলি, যদি তাই হয়, তাহলে বেথোফেনের সোনাটা শুনে কি লাভ? সবকিছুর লাভ ধরাছোঁয়া যায় না। অনেক কিছুই থাকবে যা আপনাকে আনন্দ দেবে, আপনাকে ভাবাবে, আপনার জীবনকে আরো দামি করে তুলবে। ইতিহাসও তাই, যদিও এখান থেকে কেবল অতীতই জানতে পারবেন আপনি। সম্ভবত কোলরিজ বলেছিলেন, ” ইতিহাস হলো নৌকার গলুইয়ে থাকা আলো।” এটা আপনাকে জানিয়ে দেবে আপনি কোথায় ছিলেন। তো, এই জানাটা তো দরকার।
মোয়ের্স: এ নিয়ে বিতর্ক অনেক পুরোনো যে ইতিহাস হয়তো আমাদের ভবিষ্যতের পথে চালিত হবার ক্ষেত্রে একধরনের দিকনির্দেশনা বা এর ফলে আমরা অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের ভুল এড়িয়ে যেতে পারি। আমার মতে ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা থেকে মার্কিন নাগরিকরা যৌথ জ্ঞানে এটা শিখেছে যে জাতীয় নিরাপত্তা স্পষ্ট হুমকির মুখে পড়ার পর্যাপ্ত প্রমাণ না দেখানো পর্যন্ত কোন রাষ্ট্রপতি যেন আমাদেরকে যুদ্ধের মুখে ঠেলে না দেয়। আপনি এ নিয়ে কতটা আশান্বিত?
টাকম্যান: হ্যাঁ, আমরা এ শিক্ষা নিতে পারি। এছাড়া, আমার মনে হয় আমরা এটাও পরিষ্কারভাবে বুঝেছি যে জনগনের সহযোগিতা ছাড়া কোন দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ জেতা সম্ভব না। আপনি হেরে যাবেন কারণ জনগন এর পক্ষে থাকবে না। যদিও ভিয়েতনামে যুদ্ধের ক্ষেত্রে এর প্রতিবাদ শুরুতে অনেক সময়ক্ষেপণ হয়েছে, কিন্তু তারপরেও প্রতিবাদ হয়েছে। এখন তো আমরা প্রায়ই শুনি,” আমরা দ্বিতীয় কোন ভিয়েতনাম চাই না।”
মোয়ের্স: অনেকে অবশ্য ভাবেন যে ভিয়েতনাম থেকে শিক্ষা নেয়াটা ভুল।
টাকম্যান: সামরিক ভাবনায় আমরা আসলে পরিস্থিতির শিকার হয়েছি বা এরকম কিছু, কারণ ভিয়েতনামবাসীদের শেষ করতে তারা শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট সহযোগিতা পায়নি। আমার তো মনে হয় না ফরাসীরা যেভাবে তাদের নির্মুল করতে চেয়েছে, মার্কিনীরা সেভাবে চেয়েছে। আমার মনে হয় , যতই বোমা ফেলুক, শেষ পর্যন্ত ভিয়েতনামবাসীদের নির্মুল করা তাদের পক্ষে সম্ভব হতো না। সেখানে কেবল ভারী বোমা বর্ষণ করলেই বিরোধীপক্ষের শক্তি ক্ষয় করা সম্ভব হতো না। এটা ঠিক যে শেষ পর্যন্ত অর্থ বরাদ্দের বিষয়ে বাধা এসেছিল কিন্তু কেবল এজন্য যে এ যুদ্ধে আমাদের হার হয়েছে তা নয়। ঘটনা হলো এ ক্ষেত্রে আমাদের চেয়ে ভিয়েতনামবাসীর মনোবল অনেক বেশি ছিল।
মোয়ের্স: আপনি নিজেকে একজন গল্পকথক বলেন, সত্যি ঘটনার বর্ণনাকারী। আপনি যদি এখনকার আমেরিকা নিয়ে লেখেন, তাহলে আপনার লেখার মূল বক্তব্য কি থাকবে?
টাকম্যান: আমার মনে হয় আমেরিকার শুরুর দিককার ভাবনা-ই আমি আবার অনুভব করতে চাইবো। যেমন, কেন ফ্রান্সের অভিজাত সম্প্রদায় এদেশে যুদ্ধ বাধাতে এতো আগ্রহী ছিলেন? কারণ মোটের উপর তাঁদের আভিজাত্যের বোধ যে ধারণার উপর গড়ে উঠেছে তা থেকে তো এই ভাবনা সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁরা আসলে কি বিশ্বাস করতো? এটা আমার কাছে একটা ধাঁধার মতো। মার্কিনীদের স্বাধীনতা যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল তা অসাধারণ যদিও তা ছিল ওইসব মানুষদের বিশ্বাসের বিপরীত। আমেরিকার এই ভাবনা নিয়ে এখানকার বা ইউরোপের অনেক দেশের যে বিশ্বাস তা সত্যিই অনন্যসাধারণ। আপনি কি জানেন যে লাফায়েত ফ্রান্সে ফেরত যাওয়ার সময় আমেরিকা থেকে এক কন্টেইনার মাটি নিয়ে গিয়েছিলেন যাতে তাঁর সমাধিতে তা দেয়া যায়। এটা শুনলেই অসাধারণ একটা ছবি ভেসে ওঠে না চোখের সামনে?
মোয়ের্স: আপনি আপনার বই শেষ করেছেন আরেক ফরাসী ক্রেভকারের উদ্ধৃতি দিয়ে। এখন তিনি যদি আবারও তাঁর সেই বিখ্যাত প্রশ্ন নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় ” আমেরিকান এই মানুষের মধ্যে নতুনত্ব কি?”, তিনি এখন কি পাবেন? আপনার উত্তর কি হবে?
টাকম্যান: এখন আর তিনি তাঁর প্রত্যাশানুযায়ী মুক্ত আর স্বাধীন মানুষ খুঁজে পেতেন না, যদিও এখনো কোন কোন জায়গায় তেমন মানুষের অস্ত্বিত্ব আছে। অনেক ফরাসীর মতোই তিনি ভেবেছিলেন, মার্কিন বিপ্লব এমন এক অসাধারণ ব্যাপার যা একেবারে নতুন ধরনের মানুষ তৈরি করবে। কিন্তু আদতে তা ঘটে নি। ফরাসীরা বিশ্বাস করতেন যে স্বাধীনতা, সাম্য ও ভাতৃত্ববোধের অনন্য শিক্ষা নিয়ে এক নতুন ধরনের মানুষের জন্ম হবে। তেমনটা হয়নি। চাইনিজরাও ভাবতেন যে তাঁদের সাম্যবাদের ধারণা এমন নতুন মানুষের জন্ম দেবে যারা নিজের চেয়ে অন্যকে বেশি গুরুত্ব দেবে।

মোয়ের্স: কিন্তু এই বিপ্লবের ফলে নতুন এক দেশের জন্ম হয়েছে।
টাকম্যান: তা হয়েছে। এবং এমন এক নতুন সিস্টেমের জন্মও হয়েছে যেখান থেকে হয়তো নতুন ধরনের মানুষের জন্ম হতে পারতো যদি মনুষ্য প্রকৃতি আরো বেশি রকমের নমনীয় হতো। কিন্তু মানুষ আসলে অপরিবর্তনশীল। তারা বদলায় না।
মোয়ের্স: আপনি লিখেছিলেন, ” বিপ্লব অন্য মানুষ তৈরি করে, নতুন মানুষ নয়। সত‌্য ও অগণিত ভুলের মাঝামাঝি থাকা এ প্রজাতির ছাঁচ আদতে অপরিরর্তনশীল। পৃথিবীর পক্ষে এ একধরনের বোঝা।” আমরা এমন এক দেশে বাস করি যা এখনো হয়ে উঠছে, এখনো যা হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াধীন, যে দেশ এখনো নিজেকে নিয়ে নিঃসংশয় নয়- অনেকটা বড়সড় এক কিশোরের মতো।
টাকম্যান: আমি ঠিক জানি না যে আমরা এখনো হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াধীন কিনা। আমি ঠিক জানি না যে আরো ভালো মানুষ বা আরো ভালো সমাজের প্রত্যাশা না রেখে আমরা আদতে কোন কিছু যা ঠিক সেভাবেই গ্রহণ করতে শিখেছি কিনা। আমার মনে হয় না আমরা এমন কোন সমাজ বিনির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছি যা ক্রেভিয়ার বা অন্য বিদেশী যারা আমাদের হয়ে লড়েছেন তাঁদের স্বপ্নকে ছুঁতে পারে। কিংবা আমাদের নিজেদের মানুষ যারা দেশকে ভালোবেসেছেন, আমাদের যোদ্ধারা বা সেইসব মানুষরা যারা তাঁদের ঘর, চারণভূমি, তাঁদের খামার সব ছেড়ে কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেদের সঁপে দিয়েছেন, স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন।
মোয়ের্স: কিন্তু আমরা অনেক ক্ষেত্রে অনেক এগিয়েছি। আমরা তো এখনো সেই দুশো বছর আগের পরিস্থিতিতে নেই, যখন কালোরা এদেশে দাস ছিলো। হয়তো সমাজের এই অগ্রগতিই হলো সেই বিষয় আপনি যাকে বলেন আধুনিক যুগের অসামঞ্জস্যতা। আরও বেশি স্বাধীনতা আছে এখন।
টাকম্যান: এটা ঠিক যে আমরা সামাজিক মুক্তি, ব্যক্তি অধিকার এসবের ক্ষেত্রে অনেককিছু অর্জন করেছি। আমি নিজে এসবে অন্য অনেক কিছুর চাইতে অনেক তীব্রভাবে বিশ্বাস করি- মানুষের নিজের জীবন চালানোর অধিকার, নিজের জন্য ভাববার অধিকার, যেখানে খুশি সেখানে বেঁচে থাকার অধিকার। আমরা এমন সমাজ বিনির্মাণে সক্ষম হয়েছি যেখানে ব্যক্তি নিজের জীবন নিজেই পরিচালনা করতে, নিজের ভাগ্য নিজেই নির্ধারণ করতে সক্ষম যদি তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকে।
মোয়ের্স: এটাই একধরনের প্রতিবন্ধকতা কারণ রাজনৈতিক মুক্তি সবসময় অর্থনৈতিক মুক্তি আনে না।
টাকম্যান: তা আনে না এবং বেশিরভাগ জনগনের অর্থনৈতিক মুক্তির পথকে অবজ্ঞা করে আমরা সেই স্বাধীনতাকেই অবহেলায় ঠেলে দিচ্ছি।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.