কবিতা

অনিন্দ্য জসীম-এর কবিতা

অনিন্দ্য জসীম | 7 May , 2019  


চিঠি তুমি কার কাছে যাবে

প্রাপকের ঠিকানা জানি না
তবু চিঠি লেখি, পুরনো অভ্যাস।

বসন্ত এলেই চিঠি লেখতে ইচ্ছা হয় খুব
আর চিঠি লেখতে লেখতে বসন্ত চলে যায়
চিঠি লেখতে লেখতে অন্ধ বেহেলার
ছিঁড়ে যায় সুরের মুর্ছনা
ঝরে যায় শিমুলের লাল সুগন্ধি যৌবন
চিঠি, তুমি কার কাছে যাবে !

বিস্ময়ে শরীর বেয়ে নেমে আসে কুয়াশার ঘ্রাণ
জোসনায় ভিজে যায় জানালার গ্রিল।
তবু লেখি- ভালো আছি বন্ধু, খুব ভালো
যেমন ভালো থাকে মধ্যবিত্ত গ্রামীন জীবন
কৃষকের দু’ফসলী সুখ!
চিঠি, তুমি কার কাছে যাবে!

আমার না পাঠানো অনেক চিঠি
শিমুলের শুকনো পাপড়ি
হলুদ খামের ভেতর
গন্ধহীন শুয়ে আছে বহুকাল
প্রেমের ফসিল হয়ে বিবর্ণ সুন্দর

বসন্ত এলেই চিঠি লেখতে ইচ্ছা হয় খুব
আর চিঠি লেখতে লেখতে বসন্ত চলে যায়।

দুপুর ও ছায়ার জ্যামিতি

আমাকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না
আজ আমার যেখানে থাকার সম্ভবনা ছিলো
সব খানে খুঁজলাম, কোথাও পাচ্ছি না!
তাহলে কী আজ কোথাও ছিলাম না আমি!
না কী দিকহীন গোলাকার রহস্যে, নৈসর্গিক চেতনায়
শূন্যতার পাল উড়িয়ে উড়ে যাচ্ছি
যেখানে আমার সময়ের কোন দিন রাত্রি নেই,
জগৎ সংসার নেই, নেই প্রেম, মায়ার বন্ধন!

ও জারুল বৃক্ষ, ভাটিয়ালি নদী
আমি হরিয়ে গিয়েছি
ও গারো পাহাড়, লাল মাফলার পরা
হেমন্তের শীতোষ্ণ হাওয়া
আমি হরিয়ে গিয়েছি,
ও শিমুল যৌবনের মৌলিক ভুলের মাশুল
আমাকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছিনা।

এমন ভাবতে গিয়ে কখোন যে একটা মনভাঙা দুপুর
নির্জন ভ্রমণে বিকেল হয়ে গেলো
কাশবনে ঘন হয়ে আসা নিঃসঙ্গ সন্ধ্যায়,
সোমেশ্বরী দ্বীপচর জানলো না কিছুই,
পুচ্ছ নাড়িয়ে উড়ে যায় দোয়েলের শিষ।
একটা কবিতাও হলো না লেখা।
কতো দিন পড়া হয় না চিঠির খসড়া
কুয়াশায় ঢেকে গেছে প্রেমিকার নাম!
শুধু একা একা নিরামিষ ভোজী আমার ভাবনাগুলো
পুরনো চিঠির মতোই স্মৃতির জাবর কাটে
বর্ষায় কুঁড়েঘরের চালে গজানো ঘাসের মতোই
বেড়ে ওঠার আগেই অনাদরে মরে যায়।

মাঝেমধ্যে এমনই হারিয়ে যাই আমি
হারালেই খুঁজার তৃষ্ণা বাড়ে!
সে কী প্রাঞ্জল তৃষ্ণা! যে হারায় সেই খোঁজে-
যে হারায় নি কখনো সে কি বুঝে
খুঁজার তৃষ্ণা কতো মধুমাখা!
খুঁজে খুঁজে কতো নদী হয়ে গেছে পথ,
কতো পথ আজ নদী,
কেন আলোমুখী আত্মাহুতিদেয় সবুজ পতঙ্গ!
কতো অভিমান প্রিয় এই মনভাঙা দুপুর!

বনসাই

দক্ষিণের আঙিনার টবে
বনসাই চাষ করি
প্রতিদিন জলসেচ দেই
ধূলোবালি মুছে দেই
চিরহরিৎ বনসাই বৃক্ষে
গজালে নতুন পাতা
যতœ করে ছেঁটে দেই
বাড়তে দেই না
ফুল ফুটতে দেই না
শাখা প্রশাখার বিস্তার হতে দেই না
মাঝে মধ্যে দু’একটা পাতা ঝরে গেলে
হলুদ প্রেমপত্রের ভাঁজে স্বযতেœ লুকিয়ে রাখি
কোনো ভালোবাসা ভুলতে দেই না আমি
বনসাই করে রেখে দেই

ভালোবাসা এক চিরহরিৎ বনসাই

অসুখ

আমার অসুখ হলে মনে মনে
সুখ সুখ লাগে- কারো শুশ্রূষার প্রত্যাশায়।
আমার ইচ্ছেগুলো
শিয়রে অপেক্ষমান বিমূর্ত আপেল।

সকালে না হোক দুপুরে সে আসবে
প্রকাশ্যে না হোক গোপনে সে আসবে
ব্যথায় অস্থির অঘুমের রাতে
তন্দ্রার ভেতর সে আসবে..!
কমলা লেবুর খোসা
খুলে খুলে সে আসবে

তবুও অসুখ বাড়ে, আমার প্রত্যাশা
আরও অধিক বেড়ে যায়, শূন্যতায় উড়ে
অজস্র বর্ণিল প্রজাপতি,
সাদা সাদা লাল কবুতর।

কাঁঠালচাঁপার গন্ধ

বউ আমার কবিতা পড়ে না
কবিতায় না কি কাঁঠালচাঁপার গন্ধ থাকে
যার তীব্র মাদকতা
মাথা ঝিম ধরে যায়
অজস্র শর্ষে ফুলের হলুদ
ঝিলমিল করে চোখের শিশিরে
কী যেনো কেমন হয়ে যায়
সময়ের গতিপ্রকৃতি

কবিতার খাতা ছিঁড়ে
উনুনে আগুন ধরাতে গিয়ে
হঠাৎ একটা কবিতার পংতি
চোখে পড়ে তার, আর এমনি
কাঁঠালচাঁপার গন্ধে আলোকিত হয়ে উঠে
শূন্যতার ভিতর বাহির
দাউ দাউ জ্বলে উঠে চারপাশ
কবিতার এ জাজ্বল্য ক্ষমতা তাকে বিমোহিত করে
তাকে স্মৃতিময় করে
অনার্স ক্লাশের প্রথম প্রেম পত্রের মতো
আহা, কাঁঠালচাঁপা!


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.