বইয়ের আলোচনা

অধুনান্তিকতার অভেদ সন্ধানে কবি তুষার গায়েন

মারুফ বিল্লাহ তন্ময় | 3 May , 2019  


বাংলা কবিতায় বহুল-উচ্চারিত শব্দ ‘পোস্টমডার্ন’ ভাবধারার স্বরূপ ব্যবচ্ছেদ করেছেন তুষার গায়েন তার সাহিত্য সমালোচনামূলক প্রবন্ধ সংকলনের বই বাংলা কবিতা:অধুনান্তিকতার অভেদ সন্ধানে। মোট ছয়টি প্রবন্ধ এই বইটিতে ঠাঁই পেয়েছে, যার একটি নাসরিন জাহানের পরীক্ষামূলক উপন্যাস ‘চন্দ্রের প্রথম কলা’ নিয়ে। বাকিগুলোর মধ্যে রয়েছে কবিতা বিষয়ক ৪টি প্রবন্ধ এবং একটি সাক্ষাৎকার।
প্রথম প্রবন্ধ ‘বাংলা কবিতা: অধুনান্তিকতার অভেদ সন্ধান’। এখানে কবি, প্রাবন্ধিক ও লেখক তুষার গায়েন শুরু করেছেন সরাসরি পোস্টমডার্ন শব্দ যুগলের ব্যবচ্ছেদ দিয়ে। তিনি পোস্টমডার্নের বাংলায় বহুল প্রচলিত পরিভাষা উত্তরাধুনিক বা উত্তর আধুনিক বাদ দিয়ে বরং প্রবাল দাশগুপ্তের ব্যবহৃত পরিভাষা ‘অধুনান্তিকতা’ বেছে নিয়েছেন, এবং সেই বেছে নেওয়ার পেছনের কারণগুলো চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন।
এরপরপরই তুষার গায়েন আধুনিকতা ও অধুনান্তিকতার দর্শনগত জায়গাটি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তিনি খুবই সংক্ষেপে অথচ প্রাঞ্জল ভাষায় দেখিয়েছেন এই দুটো কীভাবে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা ভাবধারা। অর্থাৎ ‘আধুনিক’ মানে সমসাময়িক আর ‘অধুনান্তিক’ মানে আধুনিকের চেয়ে একটু এগিয়ে- এ ভাবনাটি যে ভুল তা তিনি তুলে ধরেছেন। আধুনিক ভাবধারা থেকে সৃষ্টি পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র থেকে কীভাবে বেরিয়ে এসে মানুষ অধুনান্তিক চিন্তার মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যন্ত এসেছে এবং দিনে দিনে আরও বিশ্বায়নের দিকে ঝুঁকছে সেই আলোচনা উঠে এসেছে।
নাম প্রবন্ধের তৃতীয়ভাগে এসেই লেখক আলোচনার সুবিধার্থে বাংলা কবিতাকে তিনযুগে ভাগ করে নিয়েছেন। প্রাগাধুনিক, আধুনিক ও অধুনান্তিক। ফলে লেখককে প্রবন্ধের মূল বিষয়ে ঢুকতে আসলে বিশ্লেষণ করতে হয়েছে প্রায় তেরশ’ বছরের কবিতা! তবে প্রবন্ধের আরেকটু ভেতরে ঢুকলেই দেখা যাবে মূলত চর্যাপদ থেকে শুরু করেছেন লেখক। একে একে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ছুঁয়েছেন প্রায় সব প্রধান কবিকে, এমনকি অপ্রধান কবিরাও বাদ যাননি। লেখকের চোখ সরে যায়নি, আধুনিক কবিতা থেকে হঠাৎই ঐতিহ্যের ধারায় ফিরে যাওয়া কবিদের থেকে। সচেতনভাবেই বর্ণনা করেছেন, কীভাবে গোলাম মুস্তফা, ফররুখ আহমদরা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের পালাবদলে ছিটকে গেলেন সেই ইতিহাস। জীবাননন্দ দাশ, শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ কেন-কীভাবে ভিন্নধারার আধুনিক কবি হয়ে উঠলেন এবং তার সাথে সমাজ ও প্রতিবেশের সম্পর্ক কী ছিল- তাও খুব ছোট করে হলেও আলোচনায় এনেছেন তুষার।
কবিতার লাইন ধরে ধরে বিশ্লেষণ করেছেন, রবীন্দ্রনাথ থেকে নির্মলেন্দু গুণ–কে নেই নাম প্রবন্ধের প্রথমভাগের ৪২ পাতায়!
এখানে বাংলা কবিতায় অধুনান্তিক চিন্তাধারার বিস্তৃতিতে ভূমিকা রাখা বেশ কিছু লিটল ম্যাগাজিনের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রবন্ধের দ্বিতীয় ভাগটি শুরু হয়েছে অধুনান্তিকতা ভাবধারা বা দর্শনের ধারে কাছে না গিয়ে কেবল ভাষা বা শব্দে অধুনান্তিক কবি হওয়ার প্রচেষ্টার কথা দিয়ে। এই ভাগে আধুনিক কবিতার সাথে অধুনান্তিক কবিতার পার্থক্য এবং বাংলা কবিতায় ৫০ বা ৬০ এর দশকের অবক্ষয়ীদের সাথে ৭০ বা ৮০’র দশকের উত্তর আধুনিক কবিদের পার্থক্য ছকে উপস্থাপন করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ভাগের চতুর্থ পরিচ্ছেদটিতে ৬০ জন বাংলা অধুনান্তিক কবির কবিতা থেকে উদ্ধৃত লাইন দিয়ে উদাহরণ টেনেছেন তুষার গায়েন, যা কেবল পরিশ্রমলব্ধই নয়, এ বিষয়ে তার সুগভীর অনুসন্ধান ও পরিশ্রমকেও নির্দেশ করে।
বইয়ের দ্বিতীয় প্রবন্ধটির শিরোনাম ‘এই শক্তি, প্রোষিতভর্তৃকা জীবনানন্দের মানবসমাজ ও বিশ্বপ্রকৃতি পরিক্রমা’। প্রোষিতভর্তৃকা শব্দের আভিধানিক অর্থ- যে নারীর স্বামী বিদেশে থাকে। প্রবন্ধটি শুরু হয়েছে জীবানানন্দের কবিতা ‘শক্তি’ দিয়ে। এই কবিতায় প্রথম লাইনটি হচ্ছে- ‘শ্যামলী তোমার মুখ সেকালের শক্তির মত’; এ ‘শক্তি’ আসলে কী? এর সুলুক সন্ধান করতে গিয়ে তুষার গায়েন তার আলোচনায় এনেছেন পুঁজি মার্কসবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি। তিনি স্পষ্টভাবে এখানে উল্লেখ করেছেন জীবনানন্দ কোনও নির্দিষ্ট মতবাদে বিশ্বাস না করে বরং অনুসন্ধান করে গেছেন তার লেখায়। জীবানানন্দের ‘সেকালের শক্তি’ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেখক কবির প্রজ্ঞার পরিচয় সুষ্পষ্টভাবে প্রবন্ধে ফুটিয়ে তুলেছেন।

বইয়ের পরের দুইটি প্রবন্ধ আশির দশকের চার কবি নিয়ে লিখেছেন প্রবন্ধকার। খোন্দকার আশরাফ হোসেনকে নিয়ে একটি পুরো প্রবন্ধ আছে ‘স্বদেশের মর্ম থেকে উঠে আসা কবি’ শিরোনামে। আশির দশকের এ কবির চারটি কাব্যগ্রন্থ- তিন রমণীর ক্বাসিদা, পার্থ তোমার তীব্র তীর, জীবনের সমান চুমুক এবং সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর। এখানে তুষার গায়েন দেখানোর চেষ্টা করেছেন কীভাবে আশির দশকের কবিদের প্রধান দুই প্রবণতা পোস্টমর্ডানিজম ও ঐতিহ্যমুখীনতাকে পাশ কাটিয়ে দুই ধারার মোহনায় কবিতা লিখে গেছেন খোন্দকার আশরাফ। ঐতিহ্যান্বেষণ, রূপক নির্মাণ, মিথ ব্যবহার ও সর্বোপরি কাব্যভাষা নির্মাণের প্রশ্নে খোন্দকার আশরাফে আল মাহমুদ ও আবুল হাসানের প্রভাব থাকলেও কীভাবে উত্তরোত্তর তিনি তা পাশ কাটাতে পেরেছেন সেই আলোচনাও রয়েছে এই প্রবন্ধে।
চতুর্থ প্রবন্ধটি শিরোনাম- আশির দশকের তিনজন কবি: তিন কাব্যের পাঠ। শুরু হয়েছে কবি কামরুল হাসানের ষষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ ‘বৃক্ষদের শোভা দেখে যাব’ দিয়ে। এই কবির রুমা সিরিজ কবিতাগুলোর ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে আলোচক তুষার গায়েন দেখিয়েছেন- কীভাবে কামরুল শব্দের জাদুতে নারী ও প্রকৃতিকে একাত্ম করে ফেলেছেন।
একই প্রবন্ধের দ্বিতীয় কবি- সৈয়দ তারিক। তার কবিতা নিয়ে তুষার গায়েনের মন্তব্য- ‘এত তীব্র ও এত পরিমিত শুধু নয় কবিতার আয়তন ও পংক্তির নির্মাণে, উপরন্তু কাব্যগ্রন্থের কবিতা নির্বাচনে- মাত্র তেরোটি, যা এঁটে যায় এক ফর্মার কলেবরে।’
‘শুদ্ধি ও সিদ্ধির একান্ত বিশ্বাস’ থেকে আশির দশকে সৈয়দ তারিকের লেখা ছুরি হাতে অশ্ব ছুটে যায় কবিতাগ্রন্থটিতে প্রেম ও সৌন্দর্যের অনুরণন খুঁজে পান আলোচক তুষার। চতুর্থ প্রবন্ধের আলোচনায় তৃতীয় কবি বিষ্ণু বিশ্বাস এবং কবিতাগ্রন্থের নাম ভোরের মন্দির। সাত অংশে বিন্যস্ত এই কবিতার লাইনগুলোয় কীভাবে ‘নৈরাজ্যময় ভারসাম্য’ আছে, তা উদাহরণ দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন তুষার গায়েন।
বইয়ের পঞ্চম সংযোজনটি আসলে কবি জয় গোস্বামীর সাক্ষাৎকার। এখানে এসে আটকে থাকতে হয় এ কারণে যে একজন কবি কীভাবে লিখেন, লেখার সময় কী ভাবেন, প্রতিদিন লেখেন না হঠাৎ, এসব খুঁটিনাটি নিয়ে কিছু আগ্রহোদ্দীপক আলোচনা রয়েছে। সাক্ষাৎকারটি গভীর এবং এটি পড়ার পর কবি জয় গোস্বামীর ভক্তদের মনে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠবে সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত।
বইয়ের শেষ প্রবন্ধটি আশির দশকের অন্যতম কথাশিল্পী নাসরিন জাহানের নিরীক্ষাধর্মী উপন্যাস চন্দ্রের প্রথম কলা নিয়ে। উপন্যাসটি নিয়ে প্রবন্ধকারের উপলব্ধি- “পুনর্জন্মবাদের রহস্যময় আঙ্গিকে সেমেটিক ও ভারতীয় পুরাণকথা এক আত্মায় বাঁধা পড়ে, যা পক্ষান্তরে বহুকাল ধরেই আমাদের এই উপমহাদেশীয় মনোজাগতিক বাস্তবতা।”
প্রবন্ধের এক পর্যায়ে তুষার গায়েন এই উপন্যাসে মিথ ব্যবহারে নাসরীন জাহানকে বুদ্ধদেব বসুর নিকটবর্তী বলে মন্তব্য করেছেন। তবে বুদ্ধদেব বসুকে কোন কোন জায়গায় অতিক্রম করতে গিয়েই যে বির্তকের সৃষ্টি করেছেন সেটিও উল্লেখ করেছেন তুষার। গল্পের ভেতর গল্প, মিথের ভেতর মিথ কীভাবে এই উপন্যাসকে ব্যতিক্রম করে তুলেছে- তা উপন্যাসের বিভিন্ন অংশ উদ্ধৃত করে দেখিয়েছেন তুষার।
বইটি প্রকাশিত হয়েছে এবারের একুশে বইমেলায়। ‘বেহুলাবাংলা’ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এ বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন তুষার গায়েন নিজেই। ১৮২ পৃষ্ঠার বইটির গায়ের দাম ৩৫০ টাকা। বইটির প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে ছাপা, বাঁধাই সবকিছুইতে যত্নের ছাপ স্পষ্ট। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এই বইয়ের বিষয়বস্তুই পাঠককে মোহাবিষ্ট করার জন্য যথেষ্ট সে ব্যাপারে অন্তত নিশ্চিত থাকা যায়। এছাড়া লেখকের গদ্যভাষা ও বিশ্লেষণীশক্তি পাঠককে মুগ্ধ করার জন্য যথেষ্ট। কবিতার পাশাপাশি তিনি আরও প্রবন্ধগ্রন্থ আমাদেরকে উপহার দেবেন–এই প্রত্যাশা জানিয়ে রাখছি।
Flag Counter


1 Response

  1. ML Gani says:

    খুব ভালো লেগেছে। সুযোগ পেলে বইটি পড়বো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.