বিশ্বসাহিত্য

দ্য মেটামরফোসিস: রূপান্তরের জীবন

লীনা দিলরুবা | 29 Apr , 2019  


কোনো আখ্যানের প্রথম লাইনটি কী খুবই গুরুত্বপূর্ণ? ওটির মধ্যে যথেষ্ট চৌম্বকত্ব থাকলেই কেবল পাঠক বিহ্বল হয়ে অগ্রসর হন আখ্যানের গভীরে এবং হয়ে পড়েন দ্বিধাগ্রস্ত? আসলে তো তাই, গল্প বা উপন্যাস যা-ই বলি, তার অরণ্যে যদি মনের আনন্দে হারিয়ে যেতেই হয়, তবে প্রথম লাইনটা হওয়া উচিত আনন্দময় ভ্রমণের আবাহনে পূর্ণ। এই জরুরী বিষয়টির কথা মার্কেজও বলেছেন। এ-কারণে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিকগুলোর প্রত্যেকটির প্রথম লাইনই তাৎপর্যপূর্ণ, আকর্ষক এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দারুণ ইঙ্গিতবাহী। মবি ডিক-এর সেই আপাততুচ্ছ প্রথম লাইন- “কল মি ইশমায়েল, কিংবা ডিকেন্সের আ টেল অব টু সিটিজ-এর সেই অসাধারণ কবিত্বপূর্ণ প্রথম লাইন- “ইট ওয়াজ দ্য বেস্ট অব টাইমস, ইট ওয়াজ দ্য ওয়র্স্ট অব টাইমস … এগুলো সবগুলোই কোটি কোটি পাঠকের মনে এখনও জেগে আছে অনশ্বর আলোকবর্তিকার মতো।

দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী
-তে, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে প্রথম লাইনটি লেখেন- “বুড়ো মানুষটা ডিঙিনৌকায় করে খাঁড়ির কাছে নদীতে একা একা মাছ ধরতো, ৮৪ দিন কেটে গেছে, একটা মাছও ধরতে পারেনি সে।”

প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস-এ, জেন অস্টেন, “এ সত্যটা মোটামুটি সবাই মানে যে, সম্পদশালী একাকী একটা পুরুষ মানুষের অবশ্যই একটা স্ত্রী দরকার।”

আনা কারেনিনা
, লিও তলস্তয়, “সব সুখী পরিবারই একই রকমের; সব দুঃখী পরিবার তাদের নিজের নিজের মত করে দুঃখী।”

দ্য গ্রেট গ্যাট্সবি, এফ স্কট ফিটজেরাল্ড, “অল্প বয়সে, যখন মোটামুটি অসহায় ছিলাম, তখন এমন কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন বাবা, যেগুলো সে থেকেই মাথার মধ্যে নাড়াচাড়া করছ।”

ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিচুড, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, “ বহু বছর পর, ফায়ারিং স্কোয়াডের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার বহুদিন আগের সেই বিকেলটার কথা মনে পড়ে গেলো, যেদিন তার বাবা তাকে বরফ দেখাবার জন্য নিয়ে গিয়েছিলো।”

সুভা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “মেয়েটির নাম যখন সুভাষিণী রাখা হইয়াছিল তখন কে জানিত সে বোবা হইবে।”

তবে, আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের সবচাইতে চমক-জাগানো লাইন বলে স্বীকৃতি আদায় করেছে ফ্রানৎস কাফকার দ্য মেটামরফোসিস নভেলা’র প্রথম লাইনটি, “নানা আজেবাজে স্বপ্ন দেখার পর একদিন সকালে ঘুম ভেঙে জেগে উঠে গ্রেগর সামসা দেখল, সে এক বিশাল পতঙ্গে রূপান্তরিত হয়ে তার বিছানায় শুয়ে আছে।”

ডব্লিও এইচ অডেন বলেছিলেন, ‘ফ্রানৎস কাফকা আমাদের সকলের কাছেই ততটা গুরুত্বপূর্ণ যতটা গুরুত্বপূর্ণ আমাদের কাছে আমাদের এই বেঁচে থাকা।” এমন আলোকসঞ্চারী বাক্য অডেন-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কবি যখন উচ্চারণ করেন, এর তাৎপর্য তখন সুদূরে বিস্তৃত হয়, কারণ কাফকা এক অলীক দুনিয়া থেকে মানুষকে নিরেট বাস্তবে নামিয়ে এনেছিল। তাইতো কাফকাকে বলা হয় লেখকদের লেখক। তাঁর মাতৃভাষা ছিল চেক, তিনি জার্মান ভাষায় লেখালেখি করতেন। ১৮৮৩ সালে প্রাগে এক সচ্ছল ইহুদি পরিবারে ফ্রানৎস কাফকা জন্মগ্রহণ করেন। প্রাগের জার্মান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের পাঠ সমাপ্ত করে একটি বীমা কোম্পানিতে চাকরি নেন। কাফকার লেখা ততখানি দুর্বোধ্য কিন্তু মননশীল যতখানি দুর্বোধ্য করলে ইটের তৈরি খরখরে শয্যাকে ভারী, ইষৎ অসম্ভব কিন্তু সহনীয়ও মনে হয়, হয়তো ঘুমের আবেদন সে স্থানটি সৃষ্টি করতে পারে বলেই। কাফকা আপাত জটিল বিষয়গুলোর সঙ্গে বোঝাপড়া করতে চেয়েছেন। পাঠক সেই বোঝাপড়ার সঙ্গে লড়াই করে করে এগোতে চায়, এদের কেউ কেউ জয়ী হয়, তখন সেই বিজয়ী পাঠকের জীবনে থান-ইটের শয্যায় ঘুমানোর মানসিক প্রশান্তি নেমে আসে। আর এইসব বোঝপড়ার কারণে কাফকা পাঠকের হৃদয়ের মূলে পৌঁছে যেতে পেরেছেন, এমন উচ্চতায় হয়তো পৃথিবীতে আর কোনো লেখক পৌঁছুতে পারেন নি। আর হয়তো এজন্যই তাঁকে লেখকদের লেখক বলে ডাকা হয়। কাফকা সমস্যা চিহ্নিত করেন এবং সেই সমস্যার পথে এগিয়ে চলাও শেখান। কিন্তু চূড়ান্ত পথের বিষয় হয়তো এররকম ভ্রান্ত ধারণা, সে পথের খোঁজ কাফকাও পান নি। তিনি বলেছিলেন, “লেখার সময় লেখকের হাত চতুর মিথ্যার আশ্রয় হয়ে ওঠে।” আবার তিনিই তৎপর ছিলেন যাতে ‘মিথ্যার হাত’ তার লেখার হাতকে আশ্রয় না করে। তার লেখা কখনো কপটতাকে প্রশ্রয় দেয় নি। যা বলতে চেয়েছেন নির্মেদ ভাষায়, স্পষ্ট করেই সব বলেছেন। মানুষকে তার অন্তিম গন্তব্যে পৌছুবার রাস্তার সন্ধান দিতে কাফকাও পারেন নি হয়তো কিন্তু তিনি যেটুকু পেরেছেন অনেকেই তা পারে নি। কাফকার লেখায় অস্তিত্ববাদী দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায়, ইংরেজিতে ‌’কাফকায়েস্ক’ বা বাংলায় ‘কাফকায়িক’ বলে একটি বিশেষণযুক্ত শব্দ রয়েছে কাফকার নামে; দুশ্চিন্তা, ভয়, দুঃস্বপ্নতাড়িত লেখার অর্থবোধকরূপে। তাঁর দুঃস্বপ্নতাড়িত লেখার সবচেয়ে বড় উদাহরণ দ্য মেটামরফোসিস বা রূপান্তর।

গ্রেগর সামসা পুরো সংসারের দায়িত্ব যার কাঁধে, সে কাজ করে একজন ভ্রাম্যমান সেলসম্যানের, বহুবছর কাজ করে ছুটি কাটায় না, যথাসময়ে নিয়ম মেনে অফিসে যায় এবং খাটুনি খেটে চলে। বাড়িতে তার ছোটবোন গ্রেটা, মা আর বাবা রয়েছে। গ্রেটাকে সামসা খুবই স্নেহ করে। বাবার সঙ্গে সম্ভ্রমপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে। মা একটু নাজুক। আলাভোলা। কিন্তু ছেলের জন্য মায়ের স্নেহের জায়গা চিরায়ত। একদিন সকালে গ্রেগর সামসা ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করে, সে একটি পোকায় রূপান্তরিত হয়েছে। আরশোলায়। সে যেদিন আরশোলায় পরিণত হয় সেদিন স্বাভাবিকভাবেই যথাসময়ে অফিসে যেতে পারে নি, অফিসের কেরানী গ্রেগরের খোঁজ নিতে বাড়িতে চলে আসে, যেন কাফকা বোঝাতে চাইলেন, নিয়মের ঘেরাটোপে আবদ্ধ এই জীবন তোমাকে নিস্তার দেবে না, তোমাকে তাড়া করবে, এবং নিশ্চিত হতে চাইবে, তুমি যদি এই সিস্টেমের মধ্যে অবস্থান করো তবে তোমাকে কাজে যেতে হবেই। পোকায় রূপান্তরিত হয়ে গ্রেগর কী সিস্টেমের মধ্যেই অবস্থান করছিল তখন, না কি সে ছিটকে পড়েছিল যাবতীয় সিস্টেম থেকে? কিন্তু কাফকা গ্রেগরকে পোকায় রূপান্তরিত করলেন কেন? এরকম নিশ্চয়ই ঘটতে পারে না। মানুষ অন্য কোনো প্রাণীতে রূপান্তরিত হতে পারে না। কাফকা, গ্রেগর সামসাকে মানুষ থেকে আরশোলায় পরিণত করলেন কেন এই অহেতুক প্রশ্নের যদিও কোনো মানে নেই, তবুও, পাঠকের অনুসন্ধিৎসু মনের কাছে এই প্রশ্নটি ধাক্কা দেবেই। দেখা যায়, আরশোলার জীবন পেয়ে শরীরে-শরীরে গ্রেগর সামসা পোকায় রূপান্তরিত হয় কিন্তু মনে সে মানুষই রয়ে যায়। মানুষের মত দুঃখ, কষ্ট, বেদনা অনুভব করে। গ্রেগর সামসার চারপাশের মানুষরা যদিও টের পাচ্ছিল না সে কী অনুভব করছে। তাদের কাছে পরিবারের এই সদস্যটি আগে ছিল রোজগেরে, সোনার ডিম পাড়া হাঁসের মতো, এখন যখন এই সদস্যটি পোকায় পরিণত হলো তখন তাদের যেন স্বর্গচ্যুতি ঘটলো। তারা কোনোভাবেই এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি মানতে পারছিল না। সামসার পোকায় পরিণত হবার পর প্রথম দিকে ছোটবোন গ্রেটা তাও কিছুটা সমবেদনাপ্রসূত ইচ্ছে নিয়ে ভাইকে সাহায্য করছিল কিন্তু সামসার বাবা একদম নয়। যদিও গ্রেটা পরে মনে প্রাণে চাইছিল সামসা যেন মারা যায়। কাফকা সামসাকে পোকায় রূপান্তরের মাধ্যমে বিচিত্র সব পরিস্থিতি হাজির করতে চাইলেন। পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য যখন অগুরুত্বপূর্ণ সদস্যে পরিণত হয় তখন সৃষ্টির কোথায় যেন কোনো সৌন্দর্য্ ম্লান হতে দেখা যায়। পোকায় পরিণত হবার আগে সামসার যে জীবন ছিল সেটি দীর্ঘ, ক্লান্তিকর এক জীবন। সেখানে প্রতিমুহূর্তের চাপ, কোম্পানীর লাভ-লস, বহুকিছু। এমন জীবন পৃথিবীর বহু মানুষ কাটাচ্ছে, কাটাতে হয়। এই ক্লান্তিই কী মানুষকে প্ররোচিত করে দুঃস্বপ্নের জীবন বেছে নিতে? এ্ জীবন নয়, আরেকটু স্বস্তিকর জীবন? কিন্তু যখন স্বস্তি মেলে না, তখন যেন-তেন? যে কোনো একটা পরিবর্তন? তাই নিজেকে বদলে ফেলা, নিজের অস্তিত্বকে অন্য কোনো অস্তিত্বে পরিবর্তন। তার বিবর্তন, অন্য কোনো সত্ত্বায়। সে কারণে গ্রেগর সামসা পোকায় রূপান্তরিত হলো! ব্যক্তির দুরূহ ক্লান্তির পরিণামে কাফকা সচরাচর বা বৃত্তবন্দি ভাবনার বিপরীতে ভয়াবহ কিছুই পাঠককে উপহার দিতে চাইলেন, তাহলে যদি পরিত্রাণ ঘটে পাঠকেরও ক্লান্তির! মানুষ থাকার সময় গ্রেগর যে খাবারগুলো পছন্দ করে খেত না, পোকায় পরিণত হবার পর সে সেসব খাবার খাচ্ছে এবং আকর্ষণ পাচ্ছে, অন্যদিকে মানুষ থাকাকালীন সে যে সমস্ত খাবার পছন্দ করতো, পোকায় পরিণত হবার পর সে সেসব খাবার গ্রহণ করতে আগ্রহ পাচ্ছে না–নভেলায় এরকম একটি পরিস্থিতি কাফকা দেখান, ধারণা করতে ইচ্ছে করে, গ্রেগর সামসা পোকায় রূপান্তরিত হবার পর তার আসলে এক ধরনের পরিবর্তন হয়েছেই, এই পরিবর্তন হয়তো পোকায় পরিণত হবার দুঃসহ ঘটনার একটি হলেও ইতিবাচক দিক! এ প্রসঙ্গে তখন মনে পড়ে যাবে কাফকার জীবনকে পর্যবেক্ষণের এবং মনোবিশ্লেষণের ঐশ্বরিক প্রতিভার কথা। কাফকাই যেন পারেন বাস্তব থেকে বাস্তবকে বের করে নিয়ে আসতে। বাস্তবের ছাঁকনি দিয়ে বাস্তবকে দেখতে। কিংবা সেই ছাঁকনি থেকে ছাই ফেলে মুক্তো তুলে আনতে। নভেলাতে কাফকা দেখান পোকায় পরিণত হবার পর গ্রেগর যেন একটি ইতিবাচকতা আসলেই চাইছিল। সে আস্তে আস্তে পোকার জীবনের সঙ্গে অভ্যস্ত হতে চাইছিল। কাফকা যেন দেখাতে চাইলেন, হ্যাঁ, গ্রেগর পোকা হয়েছে, সে এবার পোকার মতোই বাঁচবে। সে যখন মানুষ ছিল তাকে মানুষের জীবন কাটাতেই হয়েছে, যে যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাবে তাকে সেই পরিস্থিতি বিবেচনা করেই চলতে হবে। এই আপাতবাধ্য কাজটি কী আমরা সারাজীবনভর করে যাচ্ছি না! এই অভ্যস্ত হবার পরিকল্পনায় গ্রেগর বসার ঘরে উন্মুক্ত জায়গায় সবার সঙ্গে দেখা হলে পরিবারের সদস্যরা ভীত হবে ভেবে সোফার নীচে একট চাদর দিয়ে নিজেকে ঢেকে ফেলার জন্য জায়গা প্রস্তুত করে, সে পরিবারের সদস্য, সুতরাং অন্ধকার কক্ষে লুকিয়ে না থেকে সে উন্মুক্ত জায়গায় থাকতেই পারে, কিন্তু কাউকে নিশ্চয়ই অসহায়তা উপহার দিয়ে নয়, তাই চাদর বয়ে নিয়ে এসে সে থিতু হতে চায়, একটা সামাজিক জীবন যেন স্বপ্ন দেখে। এই কাজটি করতে তার বহু সময় লাগে। কিন্তু সে এসব করছিল জীবনকে সহনীয় করে নেবার জন্য। মানব জীবনের দিকে ইঙ্গিত করে কাফকা গ্রেগরকে পোকা বানিয়ে তোলেন, পোকার শরীর দিয়ে মানুষের মনের গভীরে ঢুকে পোকা আর মানুষ এই দুই ভিন্ন প্রাণীর জীবনযাপনকে পর্যবেক্ষণ করে যেন বোঝাতে চাইলেন, আসলে কোনো কিছু সত্যিকার অর্থে পরম নয়। জগতে যা কিছু ঘটছে সবই আপেক্ষিক, আপেক্ষিকভাবেই আমরা ভাল-মন্দ থাকি। আপেক্ষিকভাবে সুখ-দুঃখ অনুভব করি। গ্রেগর যখন দেখছিল ছোটবোন গ্রেটা ভাইয়ের এই পরিবর্তিত জীবনের দরকারী অনুষঙ্গগুলো নিয়ে সচেতন তখন গ্রেগর কৃতজ্ঞ হচ্ছিল মনে মনে, যেন একটু সহনীয় হয়ে যাচ্ছিল গ্রেগরের পোকা জীবন। এই সূক্ষ্ম বিষয়গুলো নভেলাতে ভীষণ ভাবে চোখে পড়ে। বাবা-মা-বোন-ভাড়াটিয়া-পরিচারিকা এই চরিত্রগুলোর সঙ্গে গ্রেগর নানা-বিষয়ের প্রেক্ষিতে যেসব ভাবনার মধ্য দিয়ে যায় কাফকার পর্যবেক্ষণে সেই অংশগুলো অত্যন্ত গভীর এবং শৈল্পিকভাবে উঠে এসেছে। গ্রেগরকে তার পরিবারের সদস্যরা একরকম কক্ষবন্দি করে রাখে। সে কোনোরকমে নিঃসাড় হয়ে পড়ে থাকে তার অন্ধকার ঘরে। পাশে একটা হাসপাতাল। সে দেখে আগে যখন সে মানুষ ছিল তখন কি ওভাবে দেখতো? যখন মানুষ ছিল সে ভাবতো তার বোনকে বেহালা শেখানোর স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবে, কারণ এতে তার খুব আগ্রহ ছিল। গ্রেগরের মানবিক ইচ্ছেগুলো পোকা হওয়ার রূপান্তরিত জীবনের প্রবাহমানতার সঙ্গে স্থানান্তরিত হয়, তার মগজে, হয়তো এর থেকে পরিত্রাণ চায়নি বলেই, সে মনে ও মননে, অনুভূতিতে মানুষই থেকেছে, কিন্তু পরিবারের সদস্যরা সেটি একদম অনুভব করে নি। তাকে তার পরিবারের সদস্যদের প্রচণ্ড বোঝা বলে মনে হয়, তারা তার মৃত্যু কামনা করে। তার বাবা তাকে আপেল ছুঁড়ে মেরে ফেলতে উদ্যোগ নেয়। আপেলের আঘাতে গ্রেগর আহত হয়। গ্রেগরের আয় বন্ধ হয়ে যাবার পর তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা নাজুক হয়ে গিয়েছিল, তারা এবার সবাই মিলে বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে থাকে, এর মধ্যে একটি উদ্যোগ হলো বাড়ির বাড়তি কক্ষ ভাড়া দেবার বিষয়। গ্রেগরের কক্ষ থেকে আসবাব সরে যেতে থাকে, স্থান হয় ময়লার ঝুঁড়ির মতো জিনিস, তার কক্ষে ধুলো জমে, তার শরীরেও জমে ধুলোর আস্তরণ। গ্রেগর মনে মনে এবং শরীরেও এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। এই দুঃস্বপ্ন প্রলম্বিত হতে থাকে। গ্রেগর চেষ্টা করেছিল তার রূপান্তরিত অবস্থার সঙ্গে আত্মস্ত হতে, তার সঙ্গী কেউ হয়নি, কেউ এগিয়ে আসে নি, বরং সবাই একে একে দূরে সরে গিয়ে তাকে নিষ্ঠুর এক বাস্তবতা উপহার দেয়। পরিবারের সদস্যরা যেহেতু তার মৃত্যু চায়, প্রকৃতিও সেই ইচ্ছের অনুগামী হয়, গ্রেগর সামসা মৃত্যুবরণ করে। তার মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যরা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। তার বোন উৎফুল্ল হয় সবচেয়ে বেশি। এই বোনটিই, যার সঙ্গে ভাইয়ের ছিল হার্দিক সম্পর্ক। হয়তো মেয়েটির কোনো অপরাধ নেই, কারণ গ্রেগরের রূপান্তরিত সত্ত্বার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে ব্যর্থতা তো তার নয়। এর ভার কেবলই গ্রেগরের, সে কেন পোকা হতে গেল! অথবা গ্রেগর একটি প্রতীক, একধরনের রূপক, জীবনের ক্লান্তির অবসানের চূড়ান্ত রূপ। অসহনীয় জীবনের কাছে আমরা সবাই তো এক অর্থে বন্দি। সে অর্থে আমরা সবাই আসলে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায়ই আছি, রূপান্তরের অনেকটাই কাছাকাছি। যে জীবনকে আমরা জয়শ্রী জীবন বলে জানি সে জীবন হয়তো কেবল মানুষের জীবন থেকে পোকা বা পোকার মতো হয়ে উঠবার রূপান্তরেরই নাম!
Flag Counter


7 Responses

  1. লীনা দিলরুবা, কাফকা৷
    বৈদগ্ধ্যকে সুন্দর ক’রে ঢেকে নিজের বক্তব্যকে কিভাবে সাধারণ পাঠকের মননের সমতালে পরিবেশন করা যায়, এই রচনাটি তার আশ্চর্য উদাহরণ৷ আপাত কঠিন একটি বিষয়কে এত সহজ ক’রে পেশ করতে পারেন তিনিই যিনি বিষয়টি ভাল বোঝেন এবং বিষয়টির সঙ্গে পাঠকের সাহিত্যিক পরিবেশ থেকে দৃষ্টান্ত তুলে এনে তুলনা দিতে পারেন৷ সাধুবাদ জানাই৷
    কাফকার মাতৃভাষা চেক নয়৷ তার কারণ তিনি ইহুদী৷ বৃহৎ অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যে (এই রাজ্যের রাষ্ট্রভাষা / জাতীয় ভাষা ছিল জার্মান) চেক স্লাভ জার্মান হাঙ্গেরীয়ান প্রভৃতির মধ্যে ভাষা নিয়ে যে হানাহানি হচ্ছিল, তার মধ্যে একটা সময় খুব সম্ভবত ১৮৬৭ সালে ইহুদীদের কাছ থেকে মতামত চাওয়া চাওয়া হয়, তারা কোন ভাষাকে নিজের মাতৃভাষা হিসাবে ব্যবহার করবে৷ এই সময় বেশীর ভাগ ইহুদীই জার্মান ভাষাকে লিখিতভাবে মাতৃভাষা হিসাবে স্বীকার ক’রে নেয়৷ এর কারণও ছিল, কারণ এই ভাষা ছিল রাজভাষা এবং এটি ছিল উন্নতির সোপানদ্বার৷ আর একটি কারণ, সেটা হল জার্মান ভাষা ছিল অত্যন্ত উন্নত ভাষা এবং কবি, সাহিত্যিক দার্শনিকদের বহুল চর্চায় সমৃদ্ধ৷
    কাফকা জন্মেছেন চেক দেশে৷ তবে ১৮৮৭-তে তাঁর জন্মের সময় দেশটি বৃহৎ অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যেরই অঙ্গীভূত ছিল, এবং তাঁর পরিবার ওই ১৮৬৭-তে জার্মান ভাষাকে অঙ্গীকার ক’রে নেবার ফলে তিনি স্বাভাবিকভাবে জার্মান ভাষার চর্চাই করেছিলেন৷ তবে চেক তিনি জানতেনই৷

    • লীনা দিলরুবা says:

      Debabrata Chakrabarti, আপনাকে ধন্যবাদ, লেখাটা এত যত্ন করে পড়লেন বলে।

      কাফকার মা জার্মান ভাষাভাষী ছিলেন, বাবার ভাষার অনুরাগ ছিল চেকের প্রতি। কাফকা দুই ভাষায়ই কথা বলতে পারতেন। আক্ষরিক অর্থে ধরলে তাঁর মাতৃভাষা ভাষা জার্মানই।
      আপনাকে এই মনোযোগী পাঠের জন্য আবারও ধন্যবাদ।

  2. একটা জিনিস লক্ষ করেছেন? Die Verwandlung বইটা বেরিয়েছিল Kurt Wolff Verlag থেকে৷ ১৯১৬ তে এই প্রকাশন সংস্থার বই বেরোত লাইপৎসিগ থেকে৷ এইখান থেকে জার্মান সাহিত্যের বহু বড় রথী মহারথীদের বই বেরিয়েছিল৷ রবীন্দ্রনাথের অনেকগুলি বইয়ের অনুবাদ তো বেরিয়েছিলই, তাঁর গ্রন্থাবলীও বেরিয়েছিল আট খণ্ডে৷ এই প্রকাশন সংস্থা আসলে কুর্ট ভোলফ-এর নামাঙ্কিত ফেয়ারলাগ বা প্রকাশন৷ “জার্মানির প্রাজ্ঞতীর্থে রবীন্দ্রনাথ” বইটিতে “কুর্ট ভোলফ ও রবীন্দ্রনাথ” নামে একটি প্রবন্ধ আছে৷ তাতে কিছু তথ্য পাওয়া যাবে৷ আর একটি সংযোজন, গ্যুন্টার গ্রাস-এর “টিন ড্রাম” কিন্তু ১৯৫৯-এ এই প্রকাশন সংস্থা থেকেই প্রকাশিত হয়েছিল৷

  3. Md.Mahfuzur Rahman says:

    আমি একটা জিনিস বুঝলাম না। কাফকা যদি কঠিন হয়, যদি দুর্বোধ্য হয় তবে তা আমার পাঠ করার দরকার কি? মানুষ তো সাহিত্য পড়ে আনন্দ পাওয়ার জন্য। নিজের জীবনকে উপলব্ধি করার জন্য। তা সেই উপলব্ধি যদি এতটাই কঠিন হয় তবে তা নিয়ে এত গুনগান করার প্রয়োজন কি?
    এর থেকে আমার হুমায়ূন আহমেদ ভাল।

    • লীনা দিলরুবা says:

      আপনার হুমায়ূন পাঠ আনন্দময় হোক। তবুও আশা করবো, আপনি পাশাপাশি পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক কাফকাকেও বালিশের পাশে রাখবেন। যদি কোনো উজ্জ্বল মুহূর্তে হাতে টেনে নিতে ইচ্ছে করে কাফকাকে, সেটি হবে একটি বিশেষ ঘটনা।

  4. Aurko F Ahmad says:

    সাবলীল ও সহজপাঠে কাফকা, এবং তাঁর ‘রূপান্তর’ রচনার পরিচয় ক’রে দেবার জন্য ধন্যবাদ।

    দু-দু’বার ‘লেখকদের লেখক’ বিশেষায়ণ পূর্ণতা পাওয়ায় যে তথ্যটির অনুপস্থিতি আমার গলায় সাফোকেটেড হয়ে ঠেকেছে – ক্ষণজন্মা এ-মহৎ লেখকের আয়ু ছিল মাত্র ৪০ বছর; তথ্যটির উল্লেখ ব্যতিরেকে যেকোন ‘কাফকায়িক’ রচনা অপূর্ণ।

    • লীনা দিলরুবা says:

      আপনার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। কাফকা অত্যন্ত জটিল বলেই হয়ত অবচেতনে চেষ্টা ছিল, তাঁকে আবিষ্কারের ফ্রেমটি যেন সহজ হয়।

      আর যা বললেন, এমন অনেক কথাই বলার ছিল যা লেখায় নেই। কাফকা সংক্রান্ত এরকম অনেক তথ্য উল্লেখ করা যাবে, যা এই লেখায় নেই বলে অন্যদের সাফোকেটেড লাগবে। আপনি তো বললেন, তাঁর আয়ুর কথা। আমার হয়ত মনেই হয়নি এ-কথা টেনে আনার, কাফকার মৃত্যু নিয়ে বলার চাইতে তিনি যে লেখকদের লেখক ছিলেন এটিই বেশি বেশি বলতে ইচ্ছে করেছে হয়ত। মেটামরফোসিস- এর গভীরে পৌঁছুবার চেষ্টা কাফকার আয়ু বিষয়ক আলোচনার চাইতে অধিক প্রাসঙ্গিক ছিল, এটিও ভেবে নিতে পারেন! তবুও, আপনার মনে হওয়াকে কোনোভাবে আঘাত করতে চাই না। আমার এ সমস্ত অক্ষমতাকে মার্জনা করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.