সিঙ্গাপুরের কবি সিরিল অঙ-এর সাথে একটি অসম্পূর্ণ আলাপ

সুমন রহমান | ১০ মার্চ ২০০৯ ৬:৩৫ অপরাহ্ন

cyrilwong_red.jpg
সিরিল অঙ (Cyril Wong), জন্ম ২৭/৬/১৯৭৭

সিরিল অঙ-এর কবিতা আমি প্রথম পড়ি সিঙ্গাপুরের তরুণ কবিদের একটা কবিতা সংকলনে। পড়ে বেশ ভালো লেগে যায়। তারপর নেটে ওর ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে গিয়ে দেখি বেশ বিখ্যাত কবি ইনি। জন্ম ১৯৭৭ সালে, এর মধ্যেই পাঁচটা কবিতার বই বেরিয়ে গেছে, গল্পও লিখেছেন বেশ কিছু।

সিরিল অঙ-এর লেখালেখি Atlanta Review, Santa Clara Review, Slope, Cider Press Review, Fulcrum 3, Di- Verse-City, Three Candles, Southern Ocean Review, Verse Libre Quarterly, Poetry Billboard প্রভৃতি কাগজে ছাপা হয়েছে। ২০০২ সালে One-Track Vision কবিতার জন্য থিয়েটার অ্যাওয়ার্ডসহ বেশি কিছু পুরষ্কার পান এই কবি। সিরিল বর্তমানে Quarterly Literary Review Singapore-এর সহকারী সম্পাদক।

এখানকার সবচেয়ে মূল্যবান সাহিত্য পুরষ্কার পেয়ে যাওয়ার সুবাদে বেশ সেলিব্রিটি গোছের একটা ভাবমূর্তি ওর। পত্রপত্রিকায় নিয়মিত ইন্টারভ্যূ হচ্ছে, ওর কবিতা নিয়ে গীতিনাট্য হয়েছে, ফিল্ম হয়েছে। ভাবলাম, ওর সাথে দেখা হয়ে গেলে তো বেশ হয়, এখানকার সাহিত্য নিয়ে জানা যাবে অনেক কিছু। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইংরেজি বিভাগের সমকালীন কবিতা কোর্সে ওর কবিতা পাঠ্য। আর মজার বিষয় হল, একই বিভাগে বর্তমানে স্নাতকোত্তর পড়াশুনা করছে এই কবি।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: সুমন রহমান

ইমেইল করাতে জবাব আসল তড়িৎ গতিতে। দেখা করার ব্যাপারে এই কবিরও যথেষ্ট আগ্রহ। ইমেইল থেকে ফোন, ফোনে দিনক্ষণ ঠিক করে (২০০৮-এর জানুয়ারির এক দিন) আমরা বসলাম একটা কফিশপে। সিরিল আমার জন্য ওর সদ্য প্রকাশিত দুটি কবিতার বই এনেছিল। তাতে মনে মনে ঠিক করলাম, কফিশপের দামি ক্যাপোচিনো কফির বিল এই গরিবের পকেট থেকেই পরিশোধ করতে হবে। কফি খেতে খেতে কথা হল অনেক।

● ● ●

আড্ডার শুরু

সুমন রহমান: খুব ভালো লাগল তুমি এসেছো। আশা করি মজার একটা আড্ডা দেবো আমরা।

সিরিল অঙ: সন্দেহ নেই। আর আমি আসলে খুব এক্সাইটেড।

সু.র.: কী বিষয়ে?

সি.অ.: প্রধানত তোমার সাথে দেখা হওয়া নিয়ে। এই প্রথম আমাদের নিজেদের ভাষাগুলোর বাইরে অন্য ভাষায় কবিতা লেখে এমন কারো সাথে কথা বলছি।

book_cw1.jpg……
সিরিল অঙ-এর বই Tilting Our Plates to Catch the Light
……..
সু.র.: দুটা ধান্দার কথা আগেভাগেই বলে রাখি, আশা করি তাতেও আমাদের দিলখোশ আড্ডার মজা নষ্ট হবে না। এক, তোমার কবিতাকে ঘিরে আমরা এখানকার শিল্পসাহিত্য নিয়ে আলাপ করবো, অর্থাৎ আমি শুনব তোমার কাছ থেকে। আর দুই, এইসব ইনফর্মাল কথাবার্তাকে একটা আলাপচারিতা হিসেবে আমি সাজাব, বাংলাভাষী পাঠকের জন্য।

সি.অ.: শুধু বাংলাভাষী পাঠকের জন্য?

সু.র.: আমার দৌড় আপাতত এ পর্যন্তই।

সি.অ: (হাসি) ঠিক আছে, দেখা যাক আমার দৌড় কতদূর?

সু.র.: তোমার কবিতা পড়ে আমি আনন্দ পেয়েছি। একটা মাদকী সারল্য আছে তোমার।

সি.অ: আমার কবিতা পড়েছ কোথায় তুমি?

সু.র.: এখানেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে।

সি.অ: আচ্ছা… জিজ্ঞেস করলাম এজন্য যে, আমার লেখা তোমাদের ডেইলি স্টার নামে একটা পত্রিকা আছে সেখানেও ছাপা হয়েছে।

সু.র.: তাই নাকি?

সি.অ.: হ্যাঁ। তবে সে বিষয়ে আমাকে কিছু জানানো হয় নি। আমি পরে গুগল সার্চ দিতে গিয়ে দেখেছি।

সু.র.: অদ্ভুত বিষয়!
—————————————————————–
এখানকার সাহিত্যের ইতিহাসে বিকল্প খুব বেশি নাই বেছে নেয়ার। খুব একরৈখিকভাবে বেড়ে ওঠেছে এটা। ১৯৬৫ থেকে যদি হিসাব কর, এডউইন থামবো হচ্ছে সিঙ্গাপুরিয়ান সাহিত্যের গডফাদার। কিন্তু তার সাহিত্য মূলত প্রশস্তিগাথা। সরকারী পদক্ষেপের সমর্থনে প্রশস্তিগাথা রচনা করেছেন তিনি সারাজীবন। আর এটা দিয়েই স্বাধীন সিঙ্গাপুরের সাহিত্য শুরু হয়েছে।
● ● ●
ভেতরে ভেতরে আমরা পরস্পরের ভাষা বিষয়ে দিনকে দিন উদাসীন হয়ে যাচ্ছি। তিরিশ বছর আগেও চীনাদের অনেকেই মালে বা তামিল ভাষা জানত। এখন তুমি একশ-তে একজনও খুঁজে পাবে না। চীনাদের দৃষ্টি এখন হয় পশ্চিমে, না হয় চীন মেইনল্যান্ডে। মালে-রা জীবনচর্চায় বড় বেশি মুসলমান হয়ে পড়েছে। সৌদি আরব তাদের তীর্থ এবং সেদিকেই তাদের কেবলা। তামিলদেরও একই হাল। ফলে আমাদের ডাইভারসিটি আছে সত্য, কিন্তু ইউনিটি নাই।

—————————————————————-
সি. অ.: যাক বাদ দাও। আমি অভিযোগ করছি না। তথ্য আকারে জানালাম মাত্র।

সু.র.: ঠিক আছে। বলছিলাম, তোমার লেখায় বেশ মাদকী সারল্য আছে। এ ধরনের লেখা আমার পছন্দ খুব। তোমাকে প্রথমে পড়লে মনে হয় তুমি যেন নিকোলাস গ্যিয়েন বা নিকানোর পাররা ঘরানার কবি।

সি.অ: আমার মনে হয় আমি অ্যান সেক্সটন দিয়ে বেশি প্রভাবিত। নিকোলাস গ্যিয়েন আর কী যেন নাম বললে?

সু.র.: নিকানোর পাররা।

সি. অ: পড়া হয় নাই।

সু.র.: হুম, অ্যান সেক্সটনও আমি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ি নি। তবে তুমি পাররা পড়ে নির্ঘাত মজা পাবে অনেক। নিকোলাস গ্যিয়েন-এর চিড়িয়াখানা নামে একখানি কবিতার বই আছে, চটি বই, অসাধারণ সরলতায় ভরা।

সি.অ: পাওয়া যায়?

সু.র.: লাইব্রেরিতেই আছে। আমি তো সেদিনও দেখলাম। কেউ ইস্যু না করলে তুমি আজই পেতে পারো।

সি.অ: দেখবো তাহলে।

সিঙ্গাপুরিয়ান সাহিত্য

সু.র.: সিঙ্গাপুরিয়ান সাহিত্য নিয়ে কিছু বল। পকেট ইতিহাসজাতীয়।

সি.অ: তুমি সবচে ভাল করবে যদি এ বিষয়ে দুয়েকটা লেখা পড়ে ফেল….

সু.র.: আমি পড়েছি কিছু কিছু। তাই তোমার কাছ থেকে জানতে চাইছি, আর তুমি যখন একটা লম্বা জিনিসকে সংক্ষেপে বলতে চাইবে তখন এই বলার মধ্যে তোমার নিজের পছন্দ বা নির্বাচন ফুটে ওঠবে। সেটাই আমার ধান্দা।

cyril-wong.jpgসি.অ: (হাসি) এখানকার সাহিত্যের ইতিহাসে বিকল্প খুব বেশি নাই বেছে নেয়ার। খুব একরৈখিকভাবে বেড়ে ওঠেছে এটা। ১৯৬৫ থেকে যদি হিসাব কর, এডউইন থামবো হচ্ছে সিঙ্গাপুরিয়ান সাহিত্যের গডফাদার। কিন্তু তার সাহিত্য মূলত প্রশস্তিগাথা। সরকারী পদক্ষেপের সমর্থনে প্রশস্তিগাথা রচনা করেছেন তিনি সারাজীবন। আর এটা দিয়েই স্বাধীন সিঙ্গাপুরের সাহিত্য শুরু হয়েছে।

সু.র.: দুর্ভাগ্যজনক।

সি.অ.: বটেই। কিন্তু এটাই বাস্তবতা। একে ভুলে যাওয়া বা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় তো নেই।

সু.র.: কিন্তু আমি জানি ক্যাথরিন লিম তো বেশ সাহসী। তার সাহিত্য পড়েছি কিছু কিছু। বেশ ভাল লেগেছে। আর শুনেছি তিনি তাঁর সাহিত্যে সরকারের সমালোচনা করে বেশ বিপাকে পড়েছিলেন।

catherine-lim.jpg……
ক্যাথরিন লিম, জন্ম ১৯৪২
…….
সি.অ: সেটা সাহিত্যে নয়। তিনি স্ট্রেইট টাইমস-এ চিঠি লিখতেন সরকারের কার্যক্রমের সমালোচনা করে। একটা চিঠির পর স্বয়ং প্রাইম মিনিস্টার বিবৃতি দেন যে, ক্যাথরিন লিম-এর এখতিয়ার হচ্ছে সাহিত্য। এর বাইরে তাঁর কথা বলবার দরকার নাই, বিশেষত যা তিনি পরিষ্কার জানেন না। এই বিবৃতির পর ক্যাথরিন লিম আর কোনোদিন মুখ খুলেছেন বলে মনে তো পড়ে না। তবে পুরনোদের মধ্যে ক্যাথরিন লিম আসলেই ভাল। তিনিই আসলে আমাদের একমাত্র লেখক। তুমি তাঁর শক্তি টের পেতে চাইলে শুধু প্রথম দুইটা বই পড়।

সু.র.: পরেরগুলোতে কী সমস্যা?

সি.অ.: ওখানে তিনি অনেক বেশি কৌশলী হয়ে উঠেছেন। ইংরেজিভাষীদের কাছে চাইনিজ ঐতিহ্য বিক্রি করার একটা রোখ দেখি সেসব লেখায়। সারগর্ভ জিনিস কিছু খুঁজে পাই নি। তুমি অবশ্য খুঁজে দেখতে পারো।

সু.র.: কিরপাল সিং কেমন লাগে?

সি.অ: কিরপাল আমায় টানে না। একাডেমিক লাগে। পড়েছ তুমি?

সু.র.: নাহ। নাম শুনেছি।

সি.অ.: তাহলে পড়ে খুব একটা কাজ নেই। কিরপাল না পড়েও সিঙ্গাপুরের সাহিত্য বোঝা যাবে।

সু.র.: কিন্তু ইংরেজির বাইরে যারা চাইনিজ, মালে বা তামিল ভাষায় সাহিত্য করছে তাদের বাদ দিয়ে কি সিঙ্গাপুরের সাহিত্য বোঝা সম্ভব?

সি.অ.: হুম, তাদের তো পড়া দরকার। তবে এরা অনেক বেশি ক্লোজড সার্কেল। নিজেদের বাইরে খুব মেশে টেশে না। আমি কিছু চাইনিজ কবিকে চিনি, দারুণ লেখে। কিন্তু থাকে নিজেদের মধ্যেই।

সু.র.: তাদের লেখা কোথায় ছাপা হয়?

সি.অ: তারা কিছু কিছু লিটল ম্যাগাজিন বার করে। সেখানে ছাপা হয়। তবে তাদের সবচেয়ে বড় যে পেট্রন, (নাম মনে করতে পারে নি) সে খুবই অসুস্থ। মৃত্যুশয্যাশায়ী। পেনিনসুলা প্লাজার উল্টোদিকে ওর একটা বইয়ের দোকান আছে। সেখানে চাইনিজ কবিদের আড্ডাও হত নিয়মিত। সে মরে গেলে এই দোকান বন্ধ হয়ে যাবে। আড্ডাও। হয়ত লিটল ম্যাগাজিনটাও।

সু.র.: মালে বা তামিল ভাষাভাষী যারা?

সি.অ: দুঃখিত। আমার তেমন ধারণা নেই তাদের সম্পর্কে।

সু.র.: ঠিক আছে। বরং তোমার কবিতায় ফিরে আসি। তোমার দুটো কবিতা আছে, একটা স্কন্দপুরাণের বিষয় নিয়ে অন্যটি নুসরাত ফতেহ আলী খান নিয়ে।

সি.অ.: স্কন্দপুরাণ দারুণ এক জিনিস। আমার পার্টনার এক ইন্ডিয়ান, ওর কাছেই আমি স্কন্দপুরাণ সম্পর্কে জেনেছিলাম।

সু.র.: আর নুসরাত? তাঁর গান শুনেছ কোথায়? সিঙ্গাপুরে এসেছিলেন নাকি?

সি.অ.: মনে হয় না। আমি তাঁকে সামনাসামনি দেখি নি। গান শুনেছি। তাঁকে গান করতেও দেখেছি ছবিতে। দারুণ ধ্যানী মানুষ।

সু.র.: আসলে আমি যেটা জানতে চাইছি, সেটা হল, ধর তুমি এই যে এসব বিষয় নিজের কবিতায় নিয়ে আসছ, একজন সিঙ্গাপুরিয়ান হিসেবে এদের সাথে কী রকম আত্মীয়তা বোধ কর? তুমি কি বিশ্ব নাগরিক?

সি.অ.: (হাসি) যা বলেছ! নাহ, আমি বিশ্ব নাগরিক হতে চাইনি। যেসব বিষয় ভাল লেগেছে সেসব নিয়ে কবিতা লিখেছি। তারা কোন ঐতিহ্যের অংশ সেটা ভেবে দেখিনি।

সু.র.: বিপরীতক্রমে, তোমার কবিতায় কিন্তু যাকে বলে “জাতীয়” সংস্কৃতি, তার তেমন আনাগোনা দেখি না।

সি.অ.: বলা মুশকিল। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে জাতীয় সংস্কৃতি নির্মাণের দায়িত্ব আমি নিচ্ছি না। আর সিঙ্গাপুরের জাতীয় সংস্কৃতি, বা যাকে সরকারিভাবে “এশিয়ান ভ্যালুজ” বলা হয় তা নিয়ে আমার কোনো ফ্যাসিনেশন নেই।

সু.র.: আচ্ছা ধরো, তোমার একটা কবিতা আছে, ঐ যে নববিবাহিত দম্পতি বরের পিত্রালয়ে গিয়ে উঠল। সেখানে শিক্ষিত কনেটির নানারকম আচরণ দেখে দেখে বরের পিতামাতার ভুরু কুঁচকে যেতে থাকল।

সি.অ.: হুম। এটা বাস্তবতা। এটা এশিয়ান ভ্যালুজ কি না সেটা আমার আগ্রহের বিষয় নয়।

সু.র.: আরেকটা বলি। ঐ যে, স্ত্রী তাকে ছেড়ে গেছে, কিন্তু স্বামীটি তখনো স্ত্রী-র ইন্টেরিয়র ডিজাইন করা শোবার ঘরেই বসবাস করছে। স্বামীর এক বন্ধু এসে বলল সে তার প্রাক্তন স্ত্রীকে দেখেছে, সম্ভবত বার্লিনে, কোনো শাদা চামড়ার সাথে (শাদা চামড়া শব্দটা আমার অনুমান)। তখন স্বামীটি জিজ্ঞেস করল, তার স্ত্রী কি খুব মাতাল ছিল কি না সেসময়ে।

সি.অ.: হ্যাঁ। এটাও অন্যদের অভিজ্ঞতা থেকে জানা।

সু.র.: তোমার কবিতার যে সারল্য, তার সহগামী আরেকটা জিনিস আছে যা সত্যি অমূল্য। সেটা হল পরিমিতিবোধ। অসামান্য পরিমিতিবোধ আছে তোমার। তুমি জানো একটা গল্পের কোন টুকরাটা দিয়ে তুমি কবিতা বানাবে, কবিতায় কতটুকু বলবে, আর কতটুকু র্দীর্ঘশ্বাসের মত কবিতার অঙ্গে ছড়িয়ে থাকবে। ব্যক্ত না হয়ে।

সি.অ.: এটা আসলে আমাদের দেশের প্রগলভ সাহিত্যগুলো দেখে ক্ষেপে যাওয়ার ফলশ্রুতি। বা বলতে পারো আমাদের পূর্বসূরী দেশপ্রেমিক সাহিত্যিকদের নন্দনতত্ত্বের বিরুদ্ধে একটা প্রতিরোধ।

সু.র.: জটিল একটা পরিস্থিতি। আমাদের সাহিত্যের কথা বলি একটু। বাংলা কবিতা ঐতিহাসিকভাবেই একটু প্রগলভ। ব্যতিক্রম যুগে যুগে অনেকেই ছিলেন, কিন্তু ঐ প্রগলভ ধারাটিই মূলধারা হয়ে থেকে গেছে। কিন্তু ঐ প্রগলভতা সরকারি ভাষ্যের মত ফালতু কিছু নয়। এটা আমাদের প্রকৃতিগত। আমরা ইংরেজি সাহিত্যের পরিমিতি অনেক পড়েছি, ফরাসী কবিতার ঘন জমাট-বাঁধা চেহারার সাথেও বহুদিন পরিচিত। কিন্তু নিজেদের সাহিত্যের জন্য ঐ প্রগলভতার স্বরটিকে খুব ছেড়ে এসেছি এমন মনে হয় না।

সি.অ.: কিন্তু সিঙ্গাপুরের সাহিত্যের ইতিহাস অর্ধশতাব্দীও পেরোয় নি। ফলে হাজার বছরের সাহিত্যের ইতিহাস দিয়ে একে মাপা যাবে না। আমাদের সাহিত্য তৈরি হয়েছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়।

সু.র.: আমাদের সাহিত্যও তাই।

সি.অ.: কিন্তু তোমাদের সেটা হয়েছে বহুবছর আগে। আর আমাদের সাহিত্যের প্রথম প্রজন্মের লেখকরা এখনো জীবিত আছেন এবং লিখে যাচ্ছেন। তারা এখনো যথেষ্ট প্রভাব রাখেন।

সু.র.: কিন্তু তোমরা কেন ১৯৬৫ সাল থেকেই সাহিত্যের ইতিহাস শুরু হতে দিচ্ছ? এর আগে সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার অংশ ছিল, কাজেই মালয়েশিয়ার সাহিত্যিক ঐতিহ্য তো এক অর্থে তোমাদেরও ঐতিহ্য।

সি.অ.: কিন্তু সেটা তো মালে ভাষার সাহিত্য। আর তুমি এখানে যে নানান ভাষার মিলনক্ষেত্র দেখছো এটা মূলত আইওয়াশ। ভেতরে ভেতরে আমরা পরস্পরের ভাষা বিষয়ে দিনকে দিন উদাসীন হয়ে যাচ্ছি। তিরিশ বছর আগেও চীনাদের অনেকেই মালে বা তামিল ভাষা জানত। এখন তুমি একশ-তে একজনও খুঁজে পাবে না। চীনাদের দৃষ্টি এখন হয় পশ্চিমে, না হয় চীন মেইনল্যান্ডে। মালে-রা জীবনচর্চায় বড় বেশি মুসলমান হয়ে পড়েছে। সৌদি আরব তাদের তীর্থ এবং সেদিকেই তাদের কেবলা। তামিলদেরও একই হাল। ফলে আমাদের ডাইভারসিটি আছে সত্য, কিন্তু ইউনিটি নাই। একটা শক্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে ঠেলেঠুলে থাকা হয় মাত্র। কিন্তু আমরা আসলেই পরস্পর থেকে বহু দূরে অবস্থান করি। পরস্পরের বিষয়ে আমাদের কোনোই আগ্রহ নেই।

● ● ●
[এই পর্যায়ে সিরিল-এর একটা জরুরি ফোনকল আসে এবং আমরা ঠিক করি পরবর্তীতে আবার বসে এই আলাপ শেষ করবো। কিন্তু সাক্ষাৎকারদাতা ও গ্রহীতা উভয়েরই সময়ের হিসাব না মেলায় এই আলাপ অসম্পূর্ণ হয়েই থাকে। সিঙ্গাপুর থেকে চলে আসার প্রাক্কালে সিরিল-এর সাথে শেষ মোলাকাত। তখন আমার বাঁধাছাদা নিয়ে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা! আবার ঠিক করলাম ইমেইল-এ এই আলাপ শেষ করবো। কিন্তু বাংলাদেশে আসার পর ইমেইলে বাঁধাধরা প্রশ্ন করতে আর জবাব পেতে ইচ্ছে করল না। ভাবলাম আগামী বছর আবার না হয় নতুন করে আলাপটা করা যাবে। এর মধ্যে ডেইলি স্টার-এ আমার “নয়টা পঞ্চাশ” গল্পের অনুবাদ ছাপা হল এ বছরের গোড়াতে। সিরিলকে সেটা পড়তে দিয়েছিলাম, তার উচ্ছ্বাস দেখে ভাল লেগেছিল। আমরা ঠিক করেছিলাম দুজন মিলে ক্যাথরিন লিমকে ইন্টারভ্যু করবো। আর সাউথ এশিয়া এবং সাউথইস্ট এশিয়ার কবিতা নিয়ে একটা সংকলন বের করবো ইংরেজি ভাষায়।

এই আলাপটা প্রকাশ পাবার কথা ছিল অংকুর সাহা সম্পাদিত একটি পত্রিকার সাউথইস্ট এশিয়া ইস্যুতে। শেষ না হওয়ায় সেখানেও পাঠানো গেল না। আর্টস-এ এর প্রকাশ উপলক্ষ্যে অংকুর সাহার কাছে আন্তরিক ক্ষমাপ্রার্থনা করি।]

cyrilwong.jpg
সিরিল অঙ; ছবি: সিরিল অঙ

লিংক:
সিরিল অঙ-এর কবিতা: The Other Voices International Project; The Drunken Boat.

sumanrahman@hotmail.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফাহমিদুল হক — মার্চ ১১, ২০০৯ @ ১:২৮ অপরাহ্ন

      সত্যিই অসম্পূর্ণ। জমতে না জমতেই ছেদ পড়লো। তবে সিঙ্গাপুরের সাহিত্য সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া গেল।

      – ফাহমিদুল হক

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কাজী দিলরুবা আক্তার লীনা — মার্চ ১২, ২০০৯ @ ৭:৩০ অপরাহ্ন

      অনেক ভাল লাগল। ধন্যবাদ।

      – কাজী দিলরুবা আক্তার লীনা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন sayeed jubary — মার্চ ১৩, ২০০৯ @ ৩:৫১ অপরাহ্ন

      মজা পেলাম, আগ্রহ তৈরি হবার সাথে সাথে শেষ হাওয়ায় আফসোস!

      – sayeed jubary

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সৈকত আরেফিন — আগস্ট ২২, ২০১০ @ ৩:০২ অপরাহ্ন

      সাক্ষাৎকারটা পড়ে অনেক শেখা হলো; আপনাদের দুজনকেই ধন্যবাদ।
      আর সুমন রহমানের কাছে অনুরোধ করছি সিরিল অঙের কবিতার কিছু অনুবাদ আমাদের পড়ান।

      – সৈকত আরেফিন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন jewel mostafiz — december ১৯, ২০১০ @ ৬:০৩ অপরাহ্ন

      ভাল লাগলো এই কবি সম্পর্কে জেনে…সুমন রহমানকে বিশেষ ধন্যবাদ…

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com