বিচিত্র

মায়ান যোদ্ধা চিনুয়া

ফাতেমা খান | 18 May , 2019  


ছোট্ট খালটায় কোশা নৌকায় লগি ঠেলে যাচ্ছিল চিনুয়া। দুদিক থেকে ঝুকে আদর জানাচ্ছে জ্যাকারান্ডা গাছের ঝিরঝিরি পাতা। শরীরের সবল টানটান পেশিতে রোদ পড়ে চকচক করছিল, ঘাম ঝরে পড়ছে চিবুক বেয়ে। মাথা ভরা রোদে পোড়া তামাটে চুল আর ঘন ভুরুর নীচে একজোড়া অগভীর চোখ। লেকের পানিতে তিরতির করে কাঁপছে ওর ছায়া। পানিতে নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে নৌকা চালানো ওর পুরোনো অভ্যাস। নয় দশ বছর বয়সে ওর পালক পিতা ওকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে এসেছিল এই ছায়া ঘেরা গ্রামটাতে। ওদের টোহোনো গোষ্ঠির দরদী রাজা কিঞ্চ পাকাল যার নামের অর্থ সূর্যবর্ম। মহাবীর রাজা পাকাল প্রজাদের সব সুবিধার জন্য পাহাড় কেটে রাস্তা বানানো থেকে শুরু করে সুপেয় পানির ব্যাবস্থা করেছেন। তারই প্রস্তুতিতে টেনোচ, সবুজ টেনোচ, ভালবাসার টেনোচ এখন চকচকে শহর হতে চলছে। টেনোচ রাজ্যের লোকজন কর্মঠ, নিরহ, নিজের ভাগ্য নিজে নির্মান করে। কারোটা কেড়ে খেতে হয় না তাদের, তাই ঝগড়া-বিবাদও কম। তবে অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে ভুল হয় না। প্রকৃতিও ওদের প্রতি উদার সব সময়। প্রজাদরদী রাজা পাকাল যা বলবেন সকল প্রজা সে আদেশ মাথা পেতে নেয়। আর তাতে নিহিত রয়েছে সকল মঙ্গল। রাজপ্রাসাদ সংলগ্ন বাগানে কাজ করে চিনুয়া আর ওর গ্রামের লোকেরা। চিনুয়া তার অপ্রশ্বস্ত নৌকায় ঘড়া ভর্তি করে পানি নিয়ে যাচ্ছে বাগানের লোকদের খাওয়ানোর জন্য। এই সব ঘড়াগুলো এক এক করে কাঁধে নিয়ে পাহাড় বেয়ে উপড়ে উঠে যাবে সে। খাঁজকাটা পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে উঠতে উঠতে তার বুকে হাঁফ ধরে যাবে তবুও সে থামবে না। এক ঘড়া নিয়ে বিশাল বাগানের দরজা পাড় হবে যেখানে ওর গ্রামের প্রায় সব লোকজন প্রতিটা মুহূর্ত এক মহান কাজে ব্যয় করছে। পিঠের ঝুড়িতে বড় পাথড়ের খন্ড বহন করে চলছে কতকজন। বিশাল মোটা গাছের গুড়ি হেইয়ো হেইয়ো করে ঠেলে আনছে অনেকে মিলে। গাছের গুড়ি চেছে সমান টুকরো করে একটার ওপড় একটা রাখা হচ্ছে দালানের কাঠামো তৈরীর জন্য। চিনুয়া এদের পানি খাওয়ায় বেতনের বিনিময়ে। ওদের গ্রামের প্রায় সব পুরুষরা এখানে এসেছে কাজ করতে। তবে কেউ কেউ দুর-দুরান্ত গ্রাম থেকে, অন্য গোষ্ঠির। রাজা এতে কিছু মনে করেন না। ঘরের অনেক অভাবী মেয়েরাও আছে, আগাছা তুলে নিচ্ছে ঝুড়িতে। চিনুয়া ওদের অনেককে চেনে না, কথাও হয় না তেমন। কথা বলতে গেলে চাবুকের ঘায়ে পিঠ লাল হয়ে যায়; এব্যাপারে রাজা অত্যন্ত কঠোর। রাজার সর্দাররা অনেক নির্দয়। কেউ ফাঁকি দিতে পারেনা এক মিনিটও। নিঃশব্দে কাজ করে চলে সবাই, শুধু চিনুয়া মাঝেমাঝে ছাড়া পায় যখন পড়ন্ত বিকেলে সবার পানির তেষ্টা পর্যন্ত মরে যায়। সেই সময় চিনুয়া তার বাঁশিটি যত্নে বের করে আনে পিঠের ঝোলা থেকে। ও’র বাঁশির সুর পাহাড়ের এক কোণ থেকে আরেক কোণে বয়ে চলে। সর্দাররাও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যায়, পাইন পাতার ফিস্ ফিস কথা বলা থেমে যায়।

চিনুয়ার আয়-রোজগার কম তবুও সে বাগানে গাছের গুড়ি পোতার কাজ করে না। অনেকে তাকে পাহাড় থেকে পাথর তুলে আনার কাজে লাগতে বলেছিল, ও যায়নি। ঘরে ও’র এক অন্ধ বুড়ো বাপ আর ও। কার জন্য এত খাটা-খাটনি করবে? এরচেয়ে কাজের শেষে বনে-জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে পাখিদের সাথে কথা বলা ও’র কাছে অনেক আনন্দের। সেদিনও বিকেলে কাজ শেষ করে বসেছিল ও। কাজ করা দেখতে ভালোই লাগে ওর। এক সময় ঝাকে ঝাকে কোয়েল নীল আকাশে চক্কর খেতে থাকে। সুর্যের কমলা রঙ বেগুনী হতে হতে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। মজুররা প্রার্থনালয়ের ঘন্টা বাজার সাথে সাথে সবাই একসঙ্গে কাজ বন্ধ করে যার যার ঝুড়ি পিঠে ঝুলিয়ে গ্রামের পথে হাটা পথ ধরে হাটা শুরু করল। চিনুয়াও দলে ভিড়ে গেল। বিশাল দলটি এরপর ছোট ভাগে বিভক্ত হয়ে চলে যাবে গ্রামের হাটের দিকে। সন্ধ্যা নামতে নামতে বাজারে ভূট্টা পোড়া কিনে খেতে খেতে বাজারের কাজটা সেরে নিয়ে বাড়ি ফিরবে ওরা। যদিও ওদের অনেক বাড়িতেই আছে আলু আর স্কোয়াশের ক্ষেত, আছে এয়াভোকাডো। অবস্থাপন্নদের বাড়ীতে কোকো’র চাষ হয়। মাঝ বয়সীরা ভূট্টা যাতায় ভেঙ্গে রুটি তৈরী করে। আর সাথে গরম গরম আলু পোড়া; বেশ সুস্বাদু। তার সাথে যদি হয় কাঠের মগে করে ঘন দুধে কোকো’র মত পানীয়, তবে তো সোনায়-সোহাগা। আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বুড়ো-বুড়ি আর জোয়ান-ছোকড়া গোল হয়ে বসে গল্প করতে করতে অর্ধেক রাত পার করে তারপর এক ঘুমে রাত পাড়। চিনুয়ার জীবনটা এতটা গতবাঁধা নয়। ও বাসায় অন্ধ বাপটিকে খাইয়ে বেড়িয়ে পড়ে। হেটে চলছে ও’র গুরুর বাড়ির দিকে। ও’র গুরু রাজার প্রধান সহচরী জেনারেল মকটিজুমা একদিকে যেমন বিশাল পন্ডিত অপরদিকে যুদ্ধেও পারদর্শী। মকটিজুমার মত দক্ষ ছোরা পরিচালনাকারী পাশের রাজ্য আজটেকদের গোত্রেও নেই। জেনারেলের বাড়িটি সম্বন্ধে অনেক রকম গুজব শোনা যায়। রাত নিঝুম হলে জেনারেলের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে নানান আধি-ভৌতিক আওয়াজ। গ্রামের লোকজন ভয়ে এ বাড়ির আশেপাশে আসে না রাতের বেলা। আর দিনে কৌতুহলী হয়ে উঠলেও কৌতুহল দমন করে চলে যেতে হয় বাড়ির মূল ফটকে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরের বর্শাধারী বিশালদেহী দুই পাহাড়াদারকে দেখে। তবে চিনুয়ার জন্য এ প্রাসাদের সিংহদ্বার সব সময়ের জন্য খোলা। এর কারণ একটাই ও’র বাবা ছিল জেনারেলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ও’র বাবা যে যুদ্ধে মারা যান সে যুদ্ধে জেনারেলও ছিলেন। চিনুয়ার বাবা বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই এরকমই বড় কিছু হতে পারত। চিনুয়া সিংহদ্বারের প্রবেশ মুখ থেকে বড় এক মশাল জ্বালিয়ে হাতে নিল। প্রাসাদের একপাশে ছোট চিড়িয়াখানা। ধাপে ধাপে নীচে নেমে গেছে দীর্ঘ সিড়ি একেবারে প্রাসাদের তলদেশ পর্যন্ত জেনারেলের প্রধান কর্মস্থল যেখানে। আবার একই সিড়ি চলে গেছে একেবারে ছাদ পর্যন্ত। ও নেমে যাচ্ছে মশাল হাতে অন্ধকার কূপের ভেতর দিয়ে। এক সময় তলদেশে এসে মশালটা নিভিয়ে গুরুর পাশে বসে পড়ল চিনুয়া। এটা ওদের ধ্যানের সময়। ধ্যান শেষে গুরু বললেন, “আজ এত দেরী করলে কেনো? ভেবেছিলাম আজ আর আসবে না। যাক চল কাজে নেমে পড়ি।” প্রাসাদের বিশাল তলদেশ এটা, দেয়ালে হাজারো দেবতার মূর্তি নানান ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছে। এরমধ্যে ও’র বাবার মূর্তি রয়েছে। যুদ্ধ অনেকবারই হয়েছে যদিও ওরা শান্তির পক্ষেই ছিল সব সময়। চিনুয়ার বাবা যে যুদ্ধে মারা গেছে সেটার চিত্র আছে এখানে। জেনারেল মকটিজুমা যাকে সবাই জেনারেল ম্যাক নামে ডাকে তাকে আর ও’র বাবাকেও পাথর খোদাই করে রাখা হয়েছে যুদ্ধাস্ত্র হাতে। মাঝে মাঝে ও এই ছবির সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাবাকে দেখে আর ভাবে ও ও’র বাবার মত বিশালদেহী না হয়ে ভালই হয়েছে। হয়তো মনে মনে ও মানুষের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা ঘৃনা করে।
গুরুর সাথে কাজে লেগে গেল। নিঃশব্দে কাজ চলল কতক্ষণ। প্রবেশ গুহামুখে ঠান্ডা ভেজা বাতাস শো-শো করে ধাক্কা খেয়ে একেবারে নীচে পড়তে লাগল। আবার তলদেশ ছুয়ে উপড়ে মিনার দিয়ে নীল আসমানে ছড়িয়ে গেল। কুলুঙ্গিতে বাতির ছায়া লম্বা হতে হতে স্থির হয়ে যাচ্ছে বিশাল দেয়ালে। মূর্তিগুলি জীবন্ত হয়ে উঠল রাত বাড়ার সাথে সাথে। চিনুয়া ফিসফিসিয়ে কথা বলছে ওদের সাথে। গুরুর হাত আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে পড়তে লাগল এক সময়। এক সমান্তরাল রেখায় থেমে আবার খুটখুট শব্দে চলতে লাগল। বুড়ো ঝিমিয়ে পড়া গলায় বলতে লাগল, “ যুদ্ধ হবে, আবার যুদ্ধ হবে – পানির জন্য হাহাকার করছে আজটেকরা। রক্তে ভাসবে আবার পালাঙ্কের মাটি। আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।” চিনুয়া বিষন্ন বদনে উঠে পড়ল কাজ থেকে। অনেক রাত হয়েছে। এবার ডেরায় ফিরতে হবে।

রাজা পাকালের একমাত্র আদরের মেয়ে ইটসেল। যেদিন ইটসেল বয়স পনরোতে পা দিল সেদিন রাজপ্রাসাদে সারারাত আলোর ফোয়ারা বয়ে গিয়েছিল। রাজার বাগানে সারারাত উৎসব হয়েছিল। কাঠের ঝুড়ি ভর্তি খাবার আর পানীয় নিয়ে আসছিল রাজার লোক। বাগান ঘিরে শত শত মশালের আলোয় রাজপ্রাসাদ শত বর্ণে বর্ণিল হয়ে উঠেছিল। রাতের নক্ষত্রের মত জ্বলছিল মেয়েদের সবুজ গয়না আর মাথার রঙিন স্কার্ফ। ড্রামের ধুমধুম তালে মেয়েদের হাসি আর নাচের তালও বেড়ে চলল। বুড়োবুড়ি অনেক বাচ্চাও এসেছে আজকের উৎসবে। রাজা আজ দিল-দরিয়া। সবাইকে সমান আপ্যায়ন করছেন আজ। সবার মধ্যমণি চিনুয়া পায়ে তাল ঠুকে নেচে চলছে। রাজকন্যাকে প্রথমবার দেখার আনন্দ ওকে মাতাল করে রেখেছে। ধনীরা পড়ে এসেছে পশু চামড়ার কোট। যুবকরা ভালুকের মূখোশে মুখ ঢেকে সারসের পালক মাথায় গুজে সবল হাতে মারিম্বা বাজিয়ে চলছে। চিনুয়া নিজে বানানো ঈগলের মুখোশ পড়েছে। ঈগল ওদের জাতীয় প্রতীক, সাহসের প্রতীক।
কাঠের ছোট ছোট বাটিতে তীব্র ঝাজালো পানীয় আসছে। নাহুলা’র নেশায় ওদের চোখ লাল। দুলছে ছেলেদের মাথার পালকের পাগড়ী গর্বের সাক্ষী হয়ে। রাজকন্যা বসে আছে অদূরে সখী পরিবেষ্টিত হয়ে। সফেদ গাউনে তাকে অপ্সরীর মত লাগছে। আলো ঠিকরে পড়ছে তার সবুজ পান্নার মুকুট থেকে।
আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে এল ফিয়েস্তা। বুড়োবুড়ি বাড়ি ফিরতে শুরু করল তবে তার আগে রাজাকে দীর্ঘ প্রণামের পালা। রাজা পাকালের সামনে বসে মাথা ঝুকে প্রণাম জানিয়ে বিদায় নিচ্ছে প্রজাগণ। রাজাই তাদের পালনকর্তা। যার যত চাওয়া-পাওয়া আজ এই মহান রাতে পূরণ হবে। কাল রাজার বাগানে কাজের ছুটি। অনেকে ঘুমিয়ে পড়ল বাগানের মাঝখানে।

টেনোচ এক এক ঋতুতে এক এক রূপ ধারণ করে। জুল ঋতুতে ওদের ভাড়ার পরিপূর্ণ হয় ভুট্টায়। ওদের বসন্তের নাম সায়াব। সে সময় সবুজে -হলুদে রঙিন উপত্যকা প্রজাপতির সাথে ভেসে বেড়ায়। বড় বড় গাছের তলায় ভোরের নরম আলোয় জেগে ওঠে বেগুনী প্যাসন ফুল। কায়টের ঝাক নামে পাহাড় থেকে। চিনুয়া’র বাঁশির সুর তখন এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে নীচে নাযাস নদীতে মিশে যায়। নদীর পাড় ধরে যে রাস্তা চলে গেছে চিনুয়ার বাঁশি সেই রাস্তার শেষ মাথায় রাজপ্রাসাদে গিয়ে আছড়ে পড়ে। কিন্তু সে সুর কাউকে স্পর্শ করার আগেই নিভে যায়। চিনুয়ার কেন জানি আজ মন উতলা। ও’র মনে পড়ে যাচ্ছে রাজকন্যার হাসির রোল, তার অবাক চাউনি, নদীর স্ফটিক জলে কার ছায়া, সব ঘিরে আছে এক অজানা বেদনায়। ও জানে ইটসেলের বিয়ে হবে পাশের রাজ্যের আজটেক রাজকুমার জুলিয়ানের সাথে। সে তার যোগ্য নয় তবুও মন আকুল হয় কারো জন্য।

পালাঙ্কের সবচেয়ে নিকটবর্তী রাজ্য টেনোচের অধিবাসী বীর যোদ্ধা আজটেকরা ছোড়া চালোনায় পালাঙ্কদের চেয়ে একধাপ এগিয়ে। দৌর্দন্ড প্রতাপশালী রাজা মকটিজুমার সুরম্য প্রাসাদের আলো চারিদিক বিচ্ছুরিত হতে থাকে। চাষাবাদে, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, আজটেকরা সব সময়ই এগিয়ে। রাজা মকটিজুমার একমাত্র ছেলে হুলিয়ানের সাথে পালাঙ্কের রাজার একমাত্র কন্যার মেয়ের বিয়ে। সেখানে চিনুয়া এক সামান্য সৈন্যের ছেলে।

আজটেক রাজ্য পালাঙ্কের মতন সুজলা-সুফলা নয়। সেখানকার মানুষদের অনেক কষ্ট করে ফসল ফলাতে হয়। ও’রা বলে শস্য দেবতার তুষ্টি ঘরে আনে ফসল অতি মিষ্টি, দেবতার অসন্তষ্টি সকল অনাসৃষ্টি। তাই দেবতার তুষ্টিতে ওদের প্রাণ উৎসর্গ করা। ওদের পুর্বপুরুষরা যুগ যুগ ধরে এ প্রথার মধ্য দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে অস্তিত্ব।


কুকুল কান বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করার জন্য সভাসদদের আর পন্ডিতদের ডেকে পাঠিয়েছে। জেনারেল এসেছেন ক্যালেন্ডার সঙ্গে করে। যদিও রাজ দরবারে বিশাল গোলাকৃতি ক্যালেন্ডার সকলকে দিন রাত্রির কথা, কৃষি-মৌসূমের হিসাব করিয়ে দেবার জন্য। এ ক্যালেন্ডার ছাড়া জেনারেল এরকম একটি বিশেষ দিন ধার্য করার কথা ভাবতে পারেন না। এ ক্যালেন্ডারেরও একটা ইতিহাস আছে।
তখন জেনারেল ম্যাক যুবক ছিলেন, আর রাজা কুকুল কান নিজেও দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। রাজা সিংহাসনের ঠিক পেছনের বানানো চৌকোণাকৃতি সাইরাস দেবের আকৃতি দুহাত মেলে দাঁড়িয়ে আছে। সেদিন রাজা রাজ্যসভার শুরুতে ভিনাস দেবের পূজায় বসেছেন। সকলে গোল হয়ে বসে আছে আগুনের চারপাশ ঘিরে, অপেক্ষা করছে কখন ভিনাস দেব দেখা দেবেন। কিন্তু অপেক্ষা করতে করতে মধ্যরাত্রি হয়ে গেল তবুও ভিনাস দেবের দেখা মিলল না। পরেরদিন আবার সবাই সম্মিলিত হল, পূজা-পাটের আয়োজন হল। কিন্তু সেই একই সমস্যা। ভিনাস দেব আকাশে নেই। এমন করে সাতদিন পার হয়ে গেল তবুও তার দেখা মিলল না। রাজা শঙ্কিত হলেন। সেইসাথে রাজ্যের সবার বুক ভয়ে দুরুদুরু করতে লাগল, এবার নিশ্চয়ই কোন অঘটন হবে। তখন ইউকাতান সবেমাত্র দখল করা হয়েছে। রাজার বীরত্বের গাঁথা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। রাজার শলা-পরামর্শকারীরা একত্রে জড়ো হয়ে বসে আছে বিরস বদনে। ভাবতে ভাবতে আকূল হল সকলে কিন্তু কেউ কোন কূল কিনারা করতে পারল না। সেই সময় জেনারেল ককটিজুমা, বীর ম্যাক এগিয়ে এসে রাজাকে বললেন বিশাল উঁচু, পাহাড়ের চেয়েও উঁচু এক স্তম্ভ বানানো হবে, যার তিনশত ছত্রিশটা সিঁড়ি হবে। তার ওপরে বসানো হবে কারাকোল ডোম। আর ডোমের মুখটি ছড়িয়ে যাবে সীমাহীন অন্ধকার নীল আকাশের নিলীমায়। রাজা এককথায় রাজী হয়ে গেলেন। রাজার নির্দেশে কারাকল টেম্পল নির্মাণের দক্ষ-যজ্ঞ শুরু হল। ইউকাতান একেবারে সমতল টেবিলের মত ছড়ানো। সেই সমতল টেবিলে পোতা হল গাছের গুড়ি চৌকোণাকৃতি করে। নদীর পাড় থেকে পাথর আনা হল মনুষ্য বাহনে করে বছরের পর বছর ধরে । তার চারপাশে গোল করে বৃত্ত আঁকা হল, তার ওপর বসানো হল বিশাল শামুকের আকৃতির ডোম। নাম দেয়া হল কারাকোল, যার মানে হল শামূক। এই কারাকোল টেমপল এখানকার ইতিহাস হয়ে আছে অনেক সময়ের সাক্ষী হয়ে। সে বৃত্তান্ত সম্পর্কে আমরা সময়ে জ্ঞাত হব।

রাজা ভিনাসের দেখা পেলেন কারাকোলের মিনারে উঠে হা-করা দৈত্যাকৃতি শামূকের লেজে চোখ রেখে। তখন রাজা রাতভর জেগে জেগে তারাভরা আকাশের ঝিকিমিকি খেলা দেখেন। আর সাথে থাকে তার ঘনিষ্ঠ সহচর জেনারেল আর সান্ত্রী-সেপাই। প্রতিদিনের ভিনাস পর্যবেক্ষনে ওরা জেনে গেল ভিনাস দেবের দেখা মেলে শীতের সন্ধ্যায়, সকালে চলে যায় দুরের কোন দেশে আবার বসন্তের সকালে তার আশীর্বাদ পাওয়া যায়। তাছাড়া চন্দ্রদেবের দ্যুতি পনের দিন থেকে কৃদেবের আগমণ ঘটে। তবে সূর্য দেবরাজের পূজা যে কোন দিন করা সম্ভব। ভিনাসও কি তবে সূর্যদেবের স্পর্শ পেতে চলে যান দূরে কোথাও? এ প্রশ্নের কূলকিনারা করতে পারেন না তারা। তবে এটা তাদের জানা হয়ে যায় যে দিন ছোট হয়ে আসে শীতকালে। আবার দিনগুলি আস্তে আস্তে বড় হতে হতে এক সময় গ্রীষ্মকালে শেষ হয়। দিন, মাস, বছর একটি ক্যালেন্ডারে আবদ্ধ করে ফেললেন রাজার পন্ডিতগণ। এক বছরে থাকবে চার ঋতু তিন’শ ষাট দিন, আঠারো মাস। এটাই ছিল ওদের গোলাকৃতি ক্যালেন্ডার সৃষ্টির পুরনো কথা।

পূর্নিমার রাত, টেনোচ বনভূমি কেঁদে উঠছে চিনুয়ার বাঁশির করুন সুরে। মায়া পাহাড়ের চাতালে বসে আছে সে। মাঝে মাঝে সে তার নেশাগ্রস্থ রাত পাড় করে এখানেই। অদূরে তারাভরা রাতের মত জ্বলজ্বল করছে চকমকি পাথরের রাজপ্রাসাদ। সেদিকে তাকিয়ে ও’র আত্মায় চেপে থাকা দুঃখগুলি গলে গলে বেরিয়ে যেতে থাকল বাঁশিতে। খুব মনে পড়তে লাগল সেদিনের ভোজের কথা যেদিন প্রথম সে রাজকন্যাকে দেখেছিল। চিনুয়া জানে ও’কে কেউ মনে করছে না। ও’র জন্য কেউ অপেক্ষায় নেই। হঠাত খেয়াল করল একটু দূরে কারাকোল মন্দিরে আলো জ্বলছে। ও একটু উৎসুক হয়ে উঠল। আবার মূহুর্তেই তার উৎসাহ নিভে গেল। যা হবার হোক এখন তাকে আর তার বাঁশি ছাড়া আর কিছুই টানবে না। নীল তারারা তার কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলতে লাগল
“এই পূর্নিমার রাতে বেচে থাকতে দে আমায় ভেসে যেতে দে আমায় ভেসে যেতে দে—–”
হঠাত মেঘের গর্জনে চিনুয়া’র ঘুম ভেঙ্গে গেল। রাতের ঝকঝকে আকাশ কৃষ্ণ মেঘে ছেয়ে গেছে। রাত আর নেই। ভোর হয়ে গেছে। দ্রুত পায়ে নেমে আসতে থাকল। গত রাতের সব কথা মনে পড়ে যেতে থাকল। পাহাড়ী পথের দু’পাশে সাদা জেসমিন ফুটে আছে। কতগুলি জেসমিন তুলে নিয়ে গন্ধ শুকতে শুকতে মনে হল ‘মন্দিরে যাই, আজ দেবী মায়ের পায়ে নিজেকে সপে দিয়ে কিছু চাইব, দেখি উনি কি বর দেন।’ গতকাল রাতে মন্দিরে অনেক মানুষ দেখেছে সে। হয়ত পুরোহিতরা এসে এফ্রোদিতির পূজো-অর্চনা করেছে। আবছা অন্ধকারে বেশ ভুতুরে লাগছে মন্দিরের আশেপাসে। আর ভেতরে আরো আঁধার জমাট বেঁধে আছে। একটু ভয় ভয় লাগছে ও’র আরাধ্য দেবী’র কুঠুরীতে ঢুকতে। তবুও সাহসে ভর করে পা চালাল। কিন্তু মন্দির প্রকোষ্ঠের স্লেট পাথরের বারান্দায় তার পা মনে হল আটকে গেল কিছুতে, ছিটকে সে পড়ে গেল পাথরের দরজার সামনে। আর মন্দিরের দেয়ালে মশালের আলোয় সব পরিষ্কার হয়ে গেল। জিবাল্বা দেবীর জিভ গড়িয়ে রক্ত পড়ছে তখনো। হাতের ধারালো খরগ তখনো রক্তে ভেসে যাচ্ছে। সামনে পড়ে আছে তাদের গ্রামের পনর বছরের কুমারী মেয়ে রূদালী।
(চলবে)
সহায়ক গ্রন্থ:
Mesoamerican Mythology: A Guide to the Gods, Heroes, Rituals, and Beliefs of Mexico and Central America by Kay Almere Read, Jason J. Gonzalez

Handbook of Mesoamerican Mythology (World Mythology) Annotated edition Edition
by Kay Almere Read, Jason J. Gonzalez


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.