চলচ্চিত্র, সঙ্গীত, স্মৃতি

’পান্তাভাতে’ – গুলজারের স্মৃতিতে শিল্পীরা

লীনা দিলরুবা | 23 Apr , 2019  


“কবি ও লেখকদের বসবাসের জন্য স্মৃতিবেদনার মতো মনোরম জায়গা আর নেই।” বলেছেন, গুলজার, যার লেখার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় মস্তবড় এক দার্শনিককে। তাঁর অনেকগুলো পরিচয়। কবি, গীতিকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, সংলাপ রচয়িতা, চলচ্চিত্র প্রযোজক। গুলজারের মতো প্রতিভা সারা ভারতে আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। তিনি বিশবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছেন। সাতবার জাতীয় পুরস্কার। একবার সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। ভূষিত হয়েছেন পদ্মভূষণ পুরস্কারে। চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকেও হয়তো তাঁর জীবনের সেরা পুরস্কার নয়, এমনকি অস্কারও। তিনি পৃথিবীর বহু মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন। যা খুব কম লোকই পেয়েছে। অসামান্য এই প্রতিভাবান মানুষটির পুরো নাম সম্পূরণ সিং কালরা, যিনি গুলজার নামেই খ্যাত, কাজ করেছেন বহুবিখ্যাত শিল্পীর সঙ্গে। তাঁদের নিয়ে অভিজ্ঞতার কথা বলা আর স্মৃতির ভাণ্ড খালি করার উপলক্ষ্য তৈরি করা যে গ্রন্থটি নিয়ে লিখতে বসলাম, এর নাম ‘পান্তাভাতে’।
বইটি অনুলিখিত। গুলজারের বাংলা, হিন্দি, ইংরেজিতে মেশানো স্মৃতিচারণ শুনে বাংলায় বইটির পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছেন সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়। প্রকাশ করেছে দে’জ পাবলিশিং।

’আমি আসলে একজন বাঙালি যে কিনা বাই চান্স জন্মে গিয়েছি একটা পঞ্জাবি পরিবারে।’ পরিচালক বিমল রায়ের সঙ্গে কাজ করে সিনেমা জগতে আসা গুলজার বাংলার প্রতি এভাবেই তাঁর ভালোবাসার কথা জানিয়েছেন। বিমল রায়ের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের প্রক্রিয়া এমনই, পিতার মৃত্যুর পর শোক প্রকাশের যে মাত্রা ছিল বিমল রায়ের মৃত্যুর পর তা যেন আরও বেশি ছিল। তিনি যেন গুলজারের পিতার আসনেই বসেছিলেন। বিমল রায় সম্পর্কে গুলজারের মূল্যায়ন, ‘বিমলদা জীবনযাপন করতেন না, সিনেমাযাপন করতেন’।

সলিল চৌধুরী সেই বিখ্যাত ভারতীয় সঙ্গীত পরিচালক, গীতিকার, সুরকার , গল্পকার যিনি `গাঁয়ের বধু’র মত গান তৈরি করে বাংলা সঙ্গীতে একটি নতুন ধারা তৈরি করেছিলেন। ১৯৫৩ সালে বিমল রায় পরিচালিত ‘দো ভিঘা জামিন’ চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে সলিল চৌধুরীর হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। গুলজারের স্মৃতিচারণায় আমরা পাই এক মজার চরিত্রের সলিল চৌধুরীকে, যিনি স্টুডিয়োতে সারাক্ষণ ক্যারম খেলতেন। আর খেলতেন টেবিল টেনিস। একদিকে সঙ্গীত সাধনা চলছে অন্যদিকে ক্যারম খেলে সাধনার সময় নষ্ট করা, এটি দেখে গুলজার বলেন, ‘ইনি সলিল চৌধুরী। মানুষ আর সুর- দুটোই যেন অনেক উঁচু থেকে লাফিয়ে পড়া পাহাড়ি ঘরনা। যত সুন্দর, ততই ম্যাজেস্টিক, যত মনোহরণ, ততই আকর্ষক।’

‘সাদা ধুতি আর শার্ট পরা একটা ভীষণ লম্বা লোক মার্সিডিজ চালিয়ে বম্বে শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ষাটের দশকে এমন কলার-তোলা বাঙালি দেখা যেত না।’ গুলজার এখানে যার কথা বললেন তিনি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। গুলজারের স্মৃতিচারণায় আমরা দেখি, হেমন্ত সিগারেট খেতেন, নস্যি নিতেন। যা দেখে গুলজার অবাক মানতেন কারণ এতে গলা নষ্ট হবার কথা। গানের আগে সিগারেট কেন খান এ প্রশ্ন করলে হেমন্ত উত্তর দেন, ‘না হলে আমার গলার গ্রেনটা ভাল আসে না, গলাটা পরিষ্কার হয় না।’

সত্যজিৎ রায়-এর সঙ্গে কেন যেন গুলজারের ব্যাটে-বলে মেলেনি। কোনো কাজ করা হয়নি। অথচ হবার উপলক্ষ্য তৈরি হয়েছিল। সত্যজিৎের প্রতি তাঁর মুগ্ধতার প্রকাশ এরকম-‘সত্যজিৎ রায়ের মধ্যে একটা অমোঘ আকর্ষণ ছিল। সেটা ওঁর সারা অস্তিত্বে ছড়ানো ছিল। সিনেমার অলৌকিক সেন্স, একজন কমপ্লিট ফিল্মমেকারের প্রতিভা, ব্যক্তিত্ব, খ্যাতি, বোধ, ছেলেমানুষি, মনোযোগ, সবটার একটা অপূর্ব মিশেল। যা সত্যিই সাধারণের কাছে অধরা। এ রকম একজন মানুষের সঙ্গে কাজ করতে না পারার আক্ষেপ কি একজীবনে যায়?’
’আমি সামনাসামনি এত হ্যান্ডসাম পুরুষ প্রায় দেখিইনি। উত্তমকুমারকে এত সুন্দর দেখাত, কোনও পুরুষও তাঁর সৌন্দর্যকে ইগনোর করে চলে যেতে পারতো না।’ উত্তমকুমারের সঙ্গে গুলজারের কাজের অভিজ্ঞতা ছিল চমৎকার। উত্তমকুমার ছিলেন ভদ্র এবং সামাজিক। খুবই নিয়ম মেনে চলতেন। গুলজার তাঁর ‘কিতাব’ সিনেমাটি করেছিলেন উত্তমকুমারকে নিয়ে। কাজের মধ্যেই, খ্যাতির মধ্যেই চলে যান উত্তমকুমার। গুলজার লেখেন, ‘এ কথা সত্যি, সব অর্থেই একটা দুর্দান্ত হেলদি কেরিয়ারের একেবারে তুঙ্গে থাকার সময় হুট করে চলে গেলেন। একদম মহানায়কের মতোই। কিন্তু, আর কয়েকটা সিন থাকলেও তো পারতেন, অত বড় একটা মানুষের কাছে আর কয়েক রিল দাবি কি আমাদের ছিল না?’
’ম্যাডলি জিনিয়াস। যে কোনও মানে করা যেতে পারে। একজন পাগল যে কিনা জিনিয়াস। কিংবা এত জিনিয়াস একজন পাগল ছাড়া কেউ হতে পারে না। আর এই ম্যাডলি জিনিয়াস-এর সমার্থক আমার কাছে একজনই-কিশোরকুমার।’
এই পাগল লোকটার ভক্ত আমরা কে নই? কিশোরকুমারের সঙ্গে গুলজারের স্মৃতিগুলো বড়োই মধুর। ‘আনন্দ’ সিনেমার কথা বলছিলেন গুলজার। যখন সেখানে কিশোর কুমারের নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করার কথা। কিশোরকুমার মাথা ন্যাড়া করে সেটে এলেন। কেন? কারণ এই সিনেমাটায় তাঁর একদমই অভিনয় করার ইচ্ছে ছিল না। পরে অল্পসময়ের মধ্যে রাজেশ খান্নাকে দিয়ে রোলটা করানো হয়। গুলজার বলেন, ‘তবে কিশোরদা বাস্তব বুঝতেন না, এ কথা বললে অন্যায় হবে। আসলে আমাদের বাস্তবটা ওঁর বাস্তব ছিল না। উনি এই বাস্তবকে প্রত্যাখ্যান করে ওঁর বাস্তবে বাঁচতে চেয়েছিলেন। যেটাকে আমরা হয়তো না-বুঝে বলব পাগলামি, সেয়ানগিরি। আর কিশোরদা তার উত্তরে গাইবেন, ‘জিন্দেগি এক সফর হ্যায় সুহানা।’
গুলজার লিখেছেন, ‘কিশোরদার ঘরে একটা বিরাট সাইজের সায়গল-এর ছবি ছিল। কিশোরদা সায়গল সাহেবের বিরাট ভক্ত ছিলেন এ কথা সবাই জানেন। কিন্তু কিশোরদা অমন মজাদার মানুষ হয়েও সায়গল সাহেবের গানের মধ্যে যন্ত্রণার অনুভূতি প্রকাশের খুব বেশি ভক্ত ছিলেন। সায়গলের গানের মধ্যে যে আশ্চর্য করুণ রস ছিল, সেটাকে কিশোরদা আত্মস্থ করে তাঁর গলায় সেই দ্যোতনাকে ম্যাজিক করে তুলেছিলেন। তেমন গান কিশোরদার গলায় শুনলে মন নিভে আসে, আর না শুনলে প্রাণ ছটফট করে। অথচ কিশোরদাকে সবাই শুধু কমেডির রাজা বলে জানল। কেবল শচীন দেববর্মন আর রাহুল ছাড়া এই বিষাদ প্রায় কেউই বোঝেনি। আর তাই রাহুল এমন সব গান গাইয়েছে কিশোরদাকে দিয়ে, সেগুলো যেন ব্যথার দাগ, যার ওপর হাত বোলোলে আরাাম লাগে ’।

রাহুল দেববর্মন-এর সঙ্গে গুলজারের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতন। রাহুলের কাজ সম্পর্কে তিনি যা বলেন, রাহুলের কোনও ট্রেডমার্ক সুর ছিল না। যা কিছু অন্যরকম, তা-ই রাহুলকে টানতো। রাহুলের ঘরাণাকে তিনি এক্সপেরিমেন্টাল ঘরাণা বলেছেন। রাহুলের সঙ্গে বহুকাজ করেছেন গুলজার। একদিন রাত বারোটায় গুলজারের বাড়ির নিচে এসে গাড়ির হর্ণ বাজাচ্ছেন রাহুল। জিজ্ঞেস করলে রাহুল বললেন, গুলজারকে নেমে আসতে। গাড়িতে উঠার পর ক্যাসেট প্লেয়ারে দুইলাইন সুর শুনিয়ে রাহুল গুলজারকে বললেন, ‘এই সুরটায় কথা বসিয়ে দে, না হলে হারিয়ে যাবে ’। হ্যাঁ, সে অবস্থাতেই সুর। গান। মিউজিক ডিরেক্টর রাহুল দেববর্মনের সঙ্গে চিত্রপরিচালক গুলজারের প্রথম সিনেমা ‘পরিচয়’-এর সেই গানটি ‘মুসাফির হুঁ ইয়ারোঁ’। গুলজার বলেন, ‘আমি ছিলাম পঞ্চমের সুরের ডাস্টবিন’। পঞ্চম রাহুল দেববর্মনের ডাকনাম। আরো একবার একটা সুর তৈরি করে রাহুল গুলজারের কাছে নিয়ে এলেন। বললেন, ‘প্লিজ একটা লাইন বল, না হলে সুরটা হারিয়ে যাবে।’ গান তৈরির পর এবার রাহুলের আবদার, এই গানটা গুলজারের সিনেমায় জুড়ে দিতে হবে। গুলজারের আপত্তি। জায়গাতো নেই, কই জুড়াবেন? রাহুল গুলজারকে ডাকেন গুল্লু। রাহুল বললেন, ‘গুল্লু, তুই এই সুরটা না নিলে কেউ নেবে না, কেউ বুঝবে না রে! এই গানটায় অনেক রকম বাজনার এক্সপেরিমেন্ট আছে। দ্যাখ না।’ গুলজার লিখলেন, ‘আমি পঞ্চমের করুণ মুখ কিছুতেই সহ্য করতে পারি না। অগত্যা সিনেমার টাইটল কার্ডে গান রাখা হল। সেই প্রথম টাইটল কার্ডের সঙ্গে গান রাখার রেওয়াজ চালু হল। গানটা ছিল, ‘ছোটিসি কহানি সি, বারিষোঁ কে পানি সি। ইজাজত সিনেমার।’ এই ইজাজত সিনেমার বিখ্যাত গান, ‘মেরা কুছ সামান’ গানটা যখন গুজরাল লিখে আনলেন তখন রেগে গিয়ে রাহুল দেববর্মন বলেন, গুলজার কি খবরের কাগজের হেডলাইনকে গান বলে চালিয়ে দিতে চাচ্ছেন কি না! গুলজার নির্বিকার। রাগ করলে কি হবে, রাহুল গানটায় ঠিকই সুর বসিয়েছেন। আর জগত পেল একটি বিখ্যাত গান।
নায়ক সঞ্জীব কুমারও ছিল গুলজারের আপন লোকের মতন। সঞ্জীব কুমার এর ডাক নাম ছিল হরি। তাঁর অভিনয় নিয়ে গুলজার ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। একবারের স্মৃতিচারণ করলেন, যখন ‘পরিচয়’ সিনেমায় সঞ্জীব কুমার নায়িকা জয়ার বাবার ভূমিকায় অভিনয় করেন। এর পরের সপ্তাহেই সঞ্জীব কুমার এর ‘কোশিশ’ মুক্তি পাবে। সেখানে তিনি অভিনয় করছেন জয়ার স্বামীর ভূমিকায়। সঞ্জীব কুমার চিন্তিত ছিলেন, দর্শক কীভাবে নেয় বিষয়টি। অথচ গুলজার জানান, ‘কোশিশ’ এ অভিনয়ের জন্য সঞ্জীব কুমার ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেলেন। তাঁর অভিনয় নিয়ে গুলজার আরও বলেন, ‘ওর অভিনয় দেখে মনে হয়, ও যেন অভিনয় করছে না। বরং অভিনয় এসে ওর পায়ে পড়েছে : আমায় একটু আপনার আত্মায় স্থান দেবেন স্যার? আমি তা হলে ধন্য হই।’ সঞ্জীব কুমার-এর একটিই বদভ্যাসের কথা এখানে গুলজার বলেন, তিনি সেটে আসতে বড্ড দেরী করতেন।


‘মীরা’ – গুলজারের এ ছবিটি মুক্তির সাল ১৯৭৯। ছবিটি হিন্দু সন্ত-কবি মীরার জীবন নিয়ে তৈরি – যিনি ভগবান কৃষ্ণের প্রেমে জীবনের সকল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য পরিত্যাগ করেছিলেন। উপকথা নয়, বরং ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে মীরার জীবন ও সময়কে তুলে ধরেছে সিনেমাটি। যে সমাজে নারীদের কেবল গৃহস্থালি কাজের উপযুক্ত বলে মনে করা হয়ে সে সমাজে স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা আর আধ্যাত্মিক সন্তুষ্টির জন্য নারীদের বিরামহীন সংগ্রামকে গুলজার তুলে ধরেছেন মীরার জীবনালেখ্যের মাধ্যমে। পণ্ডিত রবিশংকরের মহাকাব্যিক সুরকে মিষ্টিমধুর কণ্ঠে ধারণ করেছেন পুরস্কারজয়ী গায়িকা বাণী জয়রাম। চলচ্চিত্র-সঙ্গীতের এই সমীহজাগানো জুটিকে শ্রদ্ধা করে এমন যে কারো মনেই গানগুলোর সুর ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে। রবিশংকরকে নিয়ে যে লেখাটি, এর শিরোনাম গুলজার রাখেন, ‘ঈশ্বর এ রকমই দেখতে।’ গুলজারের সিনেমা ‘মীরা’র কাজটি করার সময় পণ্ডিত রবিশংকরকে গুলজার আবিষ্কার করেন অন্যভাবে, যিনি রেওয়াজ আর সুরের প্রতি নিমগ্ন একজন শিল্পী। রবিশংকরের সঙ্গে একটি অস্বস্তিকর স্মৃতিও তাঁর রয়েছে। রবিশংকরের স্ত্রী সুকন্যা এক অনুষ্ঠানে গুলজারকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আমায় অনেকটা রাখীজির মতো দেখতে না?’ গুলজার বিব্রত হন অনেকটা। আমতা আমতা করে বলেন, ‘আপনাদের দু’জনের সৌন্দর্য তো এক্কেবারে আলাদা। আমার পক্ষে এর বিচার করা খুবই দুষ্কর।’ এ কথা যখন গুলজার রবিশংকরের স্ত্রীকে বলছিলেন, তিনি লক্ষ্য করেন রবিশংকরের ঠোঁটের কোণে তখন দুষ্টু হাসি। প্রসঙ্গত, চিত্রনায়িকা রাখী ছিলেন গুলজারের স্ত্রী। রাখীর সঙ্গে গুলজারের সম্পর্ক শেষে উষ্ণ থাকেনি।

বাঙালি লেখকদের সঙ্গে গুলজারের ছিল ঘনিষ্ট সম্পর্ক। এদের মধ্যে একজন ছিলেন কথাসাহিত্যিক সমরেশ বসু। সররেশ বসুর ‘অকাল বসন্ত’ নিয়ে গুলজার তৈরি করেন তাঁর বিখ্যাত সিনেমা ‘নমকিন।’

ঋত্বিক ঘটককে গুলজার নাম দিয়েছেন, গ্রিক মাস্টার। ঋত্বিক ঘটক-এর সঙ্গে তাঁর পরিচয় বিমল রায়ের মাধ্যমে। তাঁর বড়দাদা ছিলেন বিমল রায়ের প্রোডাকশন হেড। তিনি ছিলেন অনেকটা নিয়ম ছাড়া। এ প্রসঙ্গে গুলজার বলেন, ‘শিল্পের মানচিত্র তো হরেক রকম প্রতিভা দিয়ে তৈরি। কিছু মানুষ থাকবেনই যাঁরা ছন্নছাড়া, উদ্দাম প্রতিভাধর, উল্কার মতো-স্বল্পকালীন। সেই সব মানুষকে তাঁদের মতো করেই গ্রহণ করতে শিখতে হবে।’

সুচিত্রা সেনের সঙ্গে গুলজারের স্মৃতি যেন অম্লমধুর। তিক্ত ঘটনাটা গুলজারের ভাষ্যে এরকম- ‘একবার প্রযোজক সোহনলাল ঠিক করলেন, সুচিত্রা সেনকে নিয়ে একটা সিনেমা করবেন। সেই তো আমি স্ক্রিপ্টও তৈরি করলাম। বেশ সময় নিয়েই করলাম। যতই হোক, সুচিত্রা সেন করবেন সিনেমাটা। তারপর এলাম কলকাতা, বালিগঞ্জ প্লেস, মিসেস সেনের বাড়ি। স্ক্রিপ্ট পড়ে শোনালাম। শোনার পরই উনি বলতে লাগলেন, স্ত্রিপ্টের এখানটা বদলান, ওখানটা বদলান, এই চরিত্রকে দিয়ে এই জিনিসটা করান। শুনে তো আমার মেজাজ গেল গরম হয়ে। আমি অনেক খেটে, অনেক ভাবনাচিন্তা করে স্ত্রিপ্টটা লিখেছি। আমি বদলাব না। আর আমার মনে হয় না আপনি বিরাট একজন লেখক, যিনি কিছুক্ষণ স্ক্রিপ্ট শুনেই বুঝে যাবেন, কোথায় কোথায় কী বদল দরকার, কোন চরিত্রের ঠিক কী করা উচিত। সোহনলাল কুমারজি’কে বললাম, আপনি অন্য কাউকে দিয়ে লেখান, আমি লিখব না। অথবা মিসেস সেনকেই বলুন লিখতে। বলে বেরিয়ে এলাম।’ পরে অবশ্য তাঁদের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে যায়। গুলজারের ‘আঁধি’ সিনেমাটা করেন সুচিত্রা সেন।

শর্মিলা ঠাকুর সম্পর্কে গুলজার লেখেন, ‘আমায় রাখীজি বলেছিলেন, কারও দু’গালে এক সঙ্গে টোল পড়তে পারে না, একবার এক দিকে পড়ে তো অন্যবার অন্য দিকে পড়ে। আমি মেনেই নিয়েছিলাম। কিন্তু কিছু দিন আগে একটা লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড নিচ্ছিল রিংকু, মানে শর্মিলা ঠাকুর। দেখি, একসঙ্গে দুগালেই টোল পড়ছে ওর!’ গুলজারের সিনেমা ‘খুশবু’তে গেস্ট চরিত্র এবং ‘মৌসম’-এ অভিনয় করেন শর্মিলা। তাঁর সম্পর্কে গুলজার বলেন, ‘ রিংকু সেই বিরল প্রজাতির মানুষ যারা ‘ডিগনিটি’ শব্দটার মানে ঠিকঠাক বুঝতে পেরেছে।’

স্মৃতির রহস্য বোঝা ভার। সে বড়োই পলাতকা। কখন কি রাখে, কখন কি ফেলে, বলা মুশকিল! গুলজারের স্মৃতিতে আমরা যেসব বিখ্যাত শিল্পীকে পেলাম সে কি রেখেছে, কি ফেলেছে জানি না, কিন্তু এসব স্মৃতিচারণ যে অনেক মধুর লেগেছে, বলাই বাহুল্য। গুলজারের স্মৃতিতে সেলুলয়েডের শিল্পীরা যেমন, দূরের হয়েও কাছের, বইটি লেখার গুণে বা স্মৃতিচারণার মোহনীয়তায় পাঠকের কাছেও যেন তাঁরা তেমন হয়ে উঠলেন, চেনা আর কাছের মানুষ। বইটি পড়ার এটিই অনেক বড় প্রাপ্তি।


1 Response

  1. Sadi Alam says:

    অনেক দিন পর একটি সুখপাঠ্য সমালোচনা পড়লাম। মনে হয় বইটি আর পড়া লাগবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.