চলচ্চিত্র

আগামীর সিনেমা: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

ফৌজিয়া খান | 20 Apr , 2019  


এই একুশ শতকে জীবন বাস্তব আর ভার্চুয়ালিটির সীমা ভেঙে পরস্পরের মধ্যে দোল খাচ্ছে এবং অগমেন্টেড বাস্তবতায় ঢুকবো ঢুকবো করছে।

প্রযুক্তি প্রতিদিন পাল্টাচ্ছে। প্রযুক্তির সাথে পাল্টে যাচ্ছে আমাদের জীবন যাপনের উপায়। একই সাথে পাল্টাচ্ছে জীবনকে দেখার চোখও। এই পাল্টে যাওয়াটা এতই দ্রুত গতিতে ঘটছে যে আমেরিকার সিয়াটলে বসে কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা যা আবিষ্কার করছেন মুহূর্তে তার হাওয়া এসে লাগছে থই থই পানির সমুদ্রে ভাসা বাংলাদেশের নিঝুমদ্বীপে ঘরের চার দেয়ালে বন্দী ঘোমটাপরা নিরক্ষর গৃহবধূর জীবনেও।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সারা পৃথিবীকে নিয়ে এসেছে হাতের মুঠোয়। আমি, আপনি এইখানে বসেও মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যেতে পারি এই গ্রহের দূরতম প্রান্তে- এমনকি ভিন কোনো গ্রহেও। পয়সাও তেমন খরচ হবে না। এই রকম আশ্চর্য এক ভেলকিবাজির সময়ে বসে ভাবতে কি পারি, কেমন হবে আমাদের আগামির সিনেমা?

সে এক সময় ছিল- সিনেমা বানানো ছিলো দূর কোনো নক্ষত্রের কাছে পৌঁছুনোর মতোন। বলছি, প্রযুক্তি যখন ছিলো ফিল্ম ফরম্যাটে আবদ্ধ তখনকার কথা। ক্যামেরাগুলো ছিলো ভয়ানক ওজনদার, শুটিংয়ের সময় তোলা ছবি দেখার কোনো কায়দা ছিলো না। অনেকগুলো ধাপ পার হয়ে সিনেমা নিয়ে হলে পৌঁছুনো যেত- মিলত দর্শকের নাগাল। এই নাগাল পাওয়াটা ছিল অর্থ-নির্ভর। মোটা অংকের টাকা ছাড়া কিচ্ছু করা সম্ভব ছিলো না তখন। কিন্তু এখন? এতকিছু দরকার নেই। সেইসব ভারভারিক্কি যন্ত্রগুলো জাদুঘরে জায়গা করে নিচ্ছে, আর দর্শকের কাছে র্পৌঁছুনোর জন্য সিনেমার হলে যাওয়ার দরকার পড়ছে না। সব ওই প্রযুক্তির খেলা। সবকিছু এখন এসে পড়েছে হাতের মুঠোয়- মোবাইল ফোন কিংবা ট্যাবে। আমাদের আছে ইন্টারনেট। আজ নিঝুমদ্বীপে বসে একটা ছবি বানিয়ে আমি পৌঁছে দিতে পারব পৃথিবীর অন্য প্রান্তে- কারোর কোনো কিছুর দ্বারস্থ না হয়ে। এমন মুক্তি, এমন সম্ভাবনা আর কি কোনোকালে ছিলো সিনেমা-পাগল মানুষের হাতে? ছিল না।

এক সময় ভাবা হতো, কলমের মতোন ক্যামেরা যখন সহজলভ্য হবে- যথার্থ সিনেমা সেদিন নির্মিত হবে; সিনেমা তখন সকলের হয়ে উঠবে। এখন এই একুশ শতকে সত্যিই ক্যামেরা কলমের মতোই সহজলভ্য হয়ে গেছে। বহু মানুষের হাতের মুঠোয় থাকা একেকটি মোবাইল ফোনে এমন সব ক্যামেরা আছে যে ভাবতেও অবাক লাগে। মোবাইলগুলোতে আছে সম্পাদনার নানান অ্যাপ, শব্দের নানান অ্যাপও আছে নিশ্চয়, আছে ইন্টারনেট। আর ইন্টারনেট মানে ডিস্ট্রিবিউশনের সুযোগ। এর প্রায় সবকিছুই নামমাত্র টাকায় কিনে ফেলা সম্ভব। তার মানে ছবি বানাবার জন্য বিগ বাজেটের আশায় বসে থাকার কিচ্ছু নেই, বড় পুঁজির কাছে বন্দী হবারও আশঙ্কা নেই।

আগামি দিনের সিনেমার রূপটা আমি এইখানে দেখি। যেখানে নির্মাতা সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিজের ইচ্ছায় ছবি বানিয়ে পৃথিবীময় দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে পারবেন। এটা ইউরোপ আমেরিকার একজন মানুষ যেমন পারবেন তেমনি পারবেন বাংলাদেশের প্রত্যন্ত কোনো গ্রামে থাকা মানুষও। এখন কথা হলো, হাতের তালুতে নিজের অধিকারে থাকা একটা মোবাইল থাকলেই কি যে কেউ চলচ্চিত্র বানিয়ে ফেলতে পারবেন? বানাতে চাইবেন? উত্তর এক কথায়, না। কিন্তু কেউ যদি চান, যদি নিজেকে প্রস্তুত করেন তবে তিনি চলচ্চিত্র বানাতে পারবেন। সবাই হয়তো ভাবছেন, সিনেমা বলতে আমি কোন সিনেমার কথা বলছি।

বহুবার বলা কথাটাই আবারও রিপিট করি এইখানে। মুভি ক্যামেরা আবিষ্কার হলো যখন তখন কিন্তু বাস্তব দৃশ্য ধারণ করেই সিনেমা নামের শিল্প মাধ্যমটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৮৯৬ সালে জীবনের অবিকল বাস্তবতা ধারণ ও তা প্রদর্শনের ভিতর দিয়ে সিনেমাশিল্প বাণিজ্য করতেও শুরু করেছিল। সোয়া শ বছরের যাত্রায় ক্রমে ‘কাহিনীচিত্র’ হয়ে উঠেছে সিনেমার অন্য নাম। পুঁজির দেন-দরবারও আবর্তিত হয়েছে কাহিনীচিত্রকে ঘিরেই। এটা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে যেমন বাংলাদেশেও তেমনই ঘটেছে। প্রযুক্তি যখন পুরোপুরি ফিল্ম ফরম্যাট-নির্ভর ছিল তখন সিনেমা বন্দী ছিলো ব্যবসায়ীদের হাতে। তবুও আশ্চর্য যে বিশ্ব চলচ্চিত্রে আমরা পেয়েছি তারকোভস্কি, বার্গম্যান, কুরোসাওয়া, বুনুয়েল, আন্তোনিওনি, গদার, ফেলিনি, ওজু, আগাসে ভার্দা, ঋত্ত্বিক ঘটক, সত্যজিত রায়ের মতোন চলচ্চিত্রকারদের। জানি, এমন আরো অনেক নাম বলা হলো না এখানে। কিন্তু বলবার কথা হলো এই যে, আর্ট ফর্ম হিসেবে সিনেমা জীবনকে কত গভীর অতলান্ত থেকে দেখতে ও অনুভব করতে পারে- এই সব মহান চলচ্চিত্রকার তাঁদের কাজের মাধ্যমে দেখিয়ে গেছেন আমাদের। জীবন ও জগতের গভীর, জটিল, বর্ণিল ভাঁজগুলো খুলে খুলে সিনেমার পর্দায় তুলে এনেছেন তাঁরা তখন- যখন প্রযুক্তি আজকের মতোন এমন সহজলভ্য হয়ে উঠেনি।


এখন সিনেমার প্রযুক্তি যখন প্রায় সকলের নাগালের মধ্যে এসেছে, ভেঙে দিয়েছে সিনেমা পুঁজির স্বৈরতান্ত্রিকতা তখন আজকের নবীন মানুষ মোড় ঘোরানো সিনেমার কথা ভাবতে পারেন, ভেঙে দিতে পারেন কাহিনীচিত্রের ডগমা এবং বানাতে পারেন এমন চলচ্চিত্র যা জীবনের বিভ্রম নয়- জীবনকে স্বরূপে দর্শকের দরবারে হাজির করবে। ভাবছেন হয়তো সকলে, কেবল প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের কথা বলছি। প্রামাণ্য চলচ্চিত্র তো বটেই, আমি আসলে নতুন সিনেমার কথা বলছি যার নমুনা একটু মিলবে ইরানের আব্বাস কিয়ারোস্তামীর ‘ফাইভ’ কিংবা কোলকাতার রঞ্জন পালিতের ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’ ছবিতে। আরও অনেক ছবি আমার অভিজ্ঞতার বাইরে রয়ে গেছে- অভিজ্ঞতায় আছে এমন অনেক ছবিতেও আমি যে নতুন সিনেমার কথা বলছি তার ইঙ্গিত আছে।

লেখার শুরু থেকেই বলছি প্রযুক্তির কথা, বলছি পুঁজির কথা। সিনেমা প্রযুক্তি-নির্ভর মাধ্যম। এটা খুব পুরোনো কথা। সিনেমাকে প্রকাশের মাধ্যম করতে চাইলে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, প্রযুক্তি বুঝতেও হবে। তো এই একুশ শতকে প্রযুক্তি যখন প্রায় সকলের নাগালের মধ্যে এসে গেছে বলছি, তখন আমাদের সিনেমায়- সিনেমার পর্দায় আগামি দিনগুলোতে প্রযুক্তি কি অনেক বেশি ভর করবে? যেমনটা দেখি হলিউড ঘরানার ছবিগুলোতে? হয়তো করবে। তবে মানুষের জীবনে মানুষের বিকল্প নেই কিছু। তাই আগামির চলচ্চিত্রে ‘মানুষের গল্প বলাতেই’ আমাদের সিনেমার সম্ভাবনা দেখি। স্বপ্ন দেখি সেই সিনেমার যা একুশ শতকে বিশ্বকে হাতের মুঠোয় নিয়ে চলা আশ্চর্য স্বাধীন উল্লম্বু ত্রিশঙ্কু অবস্থায় ঢুকে পড়া জীবনে প্রকৃতি সমাজ দেশ ও বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এক মানুষের সাথে অন্য মানুষের সম্পর্ককেই আরও বেশি গভীর লগ্ন হয়ে ভালোবাসতে শেখাবে আমাদের।

ভাবছেন হয়তো, এত ভালোবাসার কথা বলছি কেন। কেন ভালোবাসাকেই আমাদের আগামি দিনের চলচ্চিত্রের মোক্ষ করে তুলতে চাইছি।

দেখুন, মাত্র কিছুদিন আগে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইসচার্চে এক বন্দুকধারীর গুলিতে জুম্মার নামাজ পড়তে গিয়ে মারা গেছেন ৫০ জন মানুষ। হত্যাকারী ফেসবুক লাইভে দিয়ে আক্রমণ শুরু করেছেন এবং তার গুলি করার কায়দাটা ছিলো ভিডিও গেমের মতোন। বিবিসি নিউজের এক রেডিও প্রতিবেদনে শুনেছি, সতেরো মিনিট ধরে তার আক্রমণের দৃশ্য ফেসবুকে লাইভ প্রচার হয়েছে। আক্রমণের দৃশ্যটি প্রায় দুইশ মানুষ সরাসরি দেখেছেন। আক্রমণের দৃশ্য লাইভ দেখার বারো মিনিট পর একজন ভিডিওটি সম্পর্কে ফেসবুককে রিপোর্ট করেছেন। ততক্ষণে ৫০ জন নির্দোষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

ফেসবুক ভিডিওটি ব্লক করার আগে চার হাজারবার দেখা হয়ে গেছে। মোট কত মানুষ ওটা দেখেছেন সেটা আমরা জানি না। একসঙ্গে কয়েকজনও তো দেখা সম্ভব! তো ফেসবুক আক্রমণের ভিডিওটি নেট থেকে সরিয়ে নেওয়ার আগেই ওটার একটা কপি alt-right file-sharing site 8chan নামের একটা সাইটে আপলোড করা হয়ে গেছে। ভিডিওটি সম্পর্কে সতর্কবার্তা পাওয়ার সাথে সাথে ফেসবুক মূল ভিডিওটা সরিয়ে ফেলেছে এবং এর মতোন দেখতে অন্য সব ভিডিও অটোম্যাটিকেলি ব্লক করার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু করলে কি হবে, ততক্ষণে মানুষ মারার সেই লাইভ ভিডিওর কপি পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। ফেসবুক বলছে, কপি করা ভিডিওটি একটু আগে যে সাইটটির নাম বললাম সেখানে আপলোড হওয়ার আগে ২৪ ঘণ্টায় এক লাখ বিশ হাজার কপি তারা আটকে দিতে পেরেছে। আর আপলোড হয়ে যাওয়া তিন লাখ কপি ডিলিট করেছে। কিন্তু কপি করা ওই লাইভ ভিডিওটি সামান্য এডিট করে কিংবা পর্দায় চালিয়ে সেখান থেকে রেকর্ড করে আবার শেয়ার করলে সেটা ঠেকানো ফেসবুকের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

কি ভয়ঙ্কর! কল্পনা করা যায়? প্রযুক্তি- এই আমাদের হাতের মুঠোয় থাকা ছোট্ট একটা ফোনের আউটরিচ? এটা ভয়াবহ, এটা আত্মঘাতী।

এই প্রযুক্তি কিন্তু আমার আপনার- আমাদের সবার হাতে হাতে। কিন্তু কল্পনা করুন, আপনি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা। কারোর কোনো কিছুর দ্বারস্থ না হয়ে মুহূর্তে আপনি পৃথিবীময় ছড়িয়ে দিতে পারছেন আপনার বানানো চলচ্চিত্র এবং সেই চলচ্চিত্রে আপনি যদি সব রকম ঘৃণার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, আপনি যদি পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলেন, আপনি যদি সাম্য ও সুশাসনের কথা বলেন, আপনি যদি পরিবেশের বিপর্যয় নিয়ে কথা বলেন, আপনি যদি শিল্পের কথা বলেন, আপনি যদি সুরের কথা বলেন, যদি আপনি সুন্দরের কথা বলেন- তবে কত সহজে তা আপনি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারবেন!

সকলে ভাবছেন, এইসব বিষয় নিয়ে হচ্ছে তো কথা। সংবাদ মাধ্যমগুলো করছে সেসব কাজ। ঠিক, সংবাদ মাধ্যমেরা করছে তাদের কাজ। আমি বলছি, চলচ্চিত্রের কথা। শিল্পের কথা। যেমনটা ফরাসি চলচ্চিত্র নির্মাতা জঁ লুক গদার (Jean-Luc Godard) বলেছেন, “The cinema is not an art which films life: the cinema is something between art and life. Unlike painting and literature, the cinema both gives to life and takes from it, and I try to render this concept in my films”।

শুরু থেকে যেমন মোবাইল মোবাইল করছি, আপনারা আবার ভেবে বসবেন না যেন যে মোবাইলে ধারণ করা দৃশ্য লাইভ করে দেওয়াকে আমি আগামির সিনেমা ভাবতে চাইছি। না, তা আমি চাইছি না মোটেই। আমি বরং চাই তারকোভস্কি, বার্গম্যান, কুরোসাওয়া, বুনুয়েল, আন্তোনিওনি, গদার, ফেলিনি, ওজু, আগাসে ভার্দা, ঋত্ত্বিক ঘটক, সত্যজিত রায়রা যেমন জীবন ও জগতের গভীর তলদেশকে জানা বোঝা ও অনুভব করার মতোন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন তেমন হবে আমাদের চলচ্চিত্র। তবে সব চলচ্চিত্র তো ওইরকম গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন হবে না। মনে পড়ছে ক্যাথেরিন ডানোউভের (Catherine Deneuve) একটি কথা। ফ্রান্সের এই নারী মূলত অভিনয় করেন, মাঝে মধ্যে গান করেন, করেন মডেলিংও। তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনাও করেছেন। গুগুলে সিনেমা বিষয়ক কোটেশন সার্চ দিয়ে পাওয়া তার এই কথাটি এখানে প্রাসঙ্গিক, That’s what I like about film-it can be bizarre, classic, normal, romantic. Cinema is to me the most versatile thing। ক্যাথেরিনের সাথে স্বর মিলিয়ে বলি, সমাজে নানা রকমের সিনেমাই থাকবে। আর সব কালের মতোন আগামিতেও গভীরের সঙ্গে পলকা ছবিও থাকবে। ওরাই হয়তো বেশি থাকবে। থাকুক তারা। আমি ভাবছি অন্য সিনেমার কথা। এই লেখা লিখতে বসে মেক্সিকোর অভিনেতা নির্মাতা Diego Luna-এর একটি কথা খুব মনে পড়ছে। তাঁর থেকে ধার করে বলি, Cinema is a mirror that can change the world। আমিও চাই আগামি দিনের সিনেমাকে হতে হবে এই বর্তমানের আয়না যা স্বপ্ন দেখাবে সুন্দর এক আগামির এবং এখনকার এই পাংশুটে-হিংসুটে পৃথিবীটাকে পাল্টে দিবে।

এই একুশ শতকে আমাদের সামনে কোনো আদর্শ নেই। ভার্চুয়ালিটি ঢুকে পড়েছে আমাদের বাস্তবে। বাস্তব জীবনের নানা ফাঁকফোকর আমরা পূরণ করছি ভার্চুয়াল বাড়ির দরজা-জানলা খুলে ঢুকতে দেওয়া কিছু ভার্চুয়াল সঙ্গ যাপনের মধ্যদিয়ে। এ বড় আজব সময়। এই সময়ে বাস্তব পৃথিবীর বাস্তব মানুষ নিজের শোবার ঘরে বসে বিনা পাসপোর্ট-ভিসায় প্রায় বিনা খরচে পৃথিবীর যেকোনো দেশের নাম না জানা ভিনভাষী যে কোনো মানুষের সাথে নিজের সুবিধামতোন সময়ে মনের কথা উজাড় করে বলে ফেলতে পারছেন! অথচ এই মানুষ হয়তো বাস্তবে তার পাশের ঘরে থাকা মানুষটির সাথে দুঃখ তো দূরের কথা সুখের কথা- এমনকি সৌজন্য সম্ভাষণও করেননি বহুদিন। ভার্চুয়ালিটির আপাত আড়ালের ভেতর দিয়ে দূর প্রান্তে অচেনা, অদেখা বন্ধুর কাছে অবলীলায় এখন মানুষ নিজেকে উন্মোচন করে চলেছে। এ আসলে অপরকে নয়- নিজের কাছে নিজের উন্মোচন। আবার যেহেতু ওপাশ থেকে অন্য একজন তাতক্ষণিক উত্তর দেয় ফলে কথার ডালপালা ছড়ায়। এক মানুষ যুক্ত হচ্ছে অন্য মানুষের সাথে। কিন্তু নিজের নির্বাচিত কমফোর্ট জোনের অংশটুকুই কেবল পড়তে বা জানতে দিচ্ছে অন্যকে। একই সঙ্গে খোলা এবং আড়ালের জীবন। এই জীবন দিন শেষে প্রাপ্তি নয়- আরও কিছু শূন্যতা যোগ করে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ক্ষণে ক্ষণে নানা মানুষের নানান খবর ভেসে আসে, টুকরো ওই খবর পড়ার পরপরই আবার অন্য খবরে অন্য মানুষের সাথে দেখা হয়ে যায়- কোথাও স্থিতি নেই। আকস্মিক নতুন কিন্তু তীব্র সব গল্প আর ঘটনার সঙ্গে আমরা ভেসে ভেসে চলি। বিশ্বাস করে গভীরে যাওয়ার ফুরসত না মিললেও আমরা তাদের পুরোপুরি অবিশ্বাসও করি না। কিছুটা চেনা, বাকিটা অচেনা- চেনা চেনা অজানা জগত আমাদের ‘বর্তমান রিয়েলিটি’। এই রিয়েলিটি আমাদের চেতনায় ঢোকে, কিন্তু মননে গভীর কোনো রেখাপাত করে না। কিন্তু শিল্পীর প্রয়োজন গভীর থেকে গভীরে অবগাহন। শিল্প করবেন যিনি তিনি এই উপর-ভাসা বর্তমান রিয়েলিটির ফাঁদে ডুবে যাবেন না।


প্রযুক্তি অনেক দরজা খুলে দিয়েছে, স্বাধীন করেছে আমাদের। জীবনের নানা রঙ রূপ রসের নির্যাস সহজে এখন সিনেমার পর্দায় তুলে আনা এবং বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়া আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সহজ। বিশ্বময় মানুষের সাথে মানুষের আবেগ অনুভূতি আর চিন্তার আদান-প্রদান সহজে করা সম্ভব। ভার্চুয়াল রিয়ালিটির এই যুগে নিজেদের কমফোর্ট জোনে আবদ্ধ হওয়া এই সময়ে মানুষের সাথে মানুষের গভীর থেকে গভীরতর সংযোগ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। দৃশ্য এবং শব্দ- এই দুই পাঁয়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকা সিনেমাই মনে হয় জরুরি কাজটি সবচে ভালোভাবে করতে পারে। মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে আর্ট ফর্ম হিসেবে চলচ্চিত্র তাই এখন আরোও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। এইখানে স্মরণ করি রুশ চলচ্চিত্রকার আন্দ্রেই তারকোভস্কিকে। তিনি বলেছিলেন, ব্যক্তি মানুষকে সমগ্র বিশ্বের সাথে যুক্ত করা সিনেমার কাজ; আর এই সংযোগ হলেই তবে সিনেমার অর্থ কিছু দাঁড়ায়। প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতার যুগে সিনেমার বিষয় নির্বাচন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সতর্কতা দাবি করে।

আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে পৌঁছে গেছি, বিজ্ঞান এখন নারী-পুরুষের চেনা সম্পর্কের বাইরে গিয়ে মানুষের জন্ম আবিষ্কার করে ফেলেছে। পারিবারিক কিংবা আবেগগতভাবে সম্পর্কিত নয়- পৃথিবীর তিন প্রান্তে তিনজন মানুষ নতুন এক মানুষকে পৃথিবীতে আনতে পারছেন। সারোগেসি হচ্ছে অহরহ। তার মানে, মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অনেককিছুই খুব বেশিদিন আর আমাদের চেনা জায়গায় থাকবে না।

এরই মধ্যে আদর্শ আর স্বপ্নহীন হয়ে গেছে পৃথিবী, ধর্ম ধর্মের জায়গায় নেই, পরিবার নেই পরিবারের প্রয়োজনীয় ভূমিকায়, সম্পর্কগুলো নেই সম্পর্কের মধ্যে, কমিটমেন্ট নেই- আবার পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়াও নেই- এই রকম সময়ে যাপন করা জীবনকে এই বাংলাদেশে বসে নতুন এক জীবনের স্বপ্ন দেখানোর স্বপ্ন আমি দেখি আমাদের আগামি দিনের চলচ্চিত্রে। কেন চাই সেটা খুব সুন্দর করে বলেছেন মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা মার্টিন স্করসিস। তাঁর কথাটাই উদ্ধৃত করি আপনাদের জন্য: Now more than ever we need to talk to each other, to listen to each other and understand how we see the world, and cinema is the best medium for doing this.

কিন্তু আমরা মানে বাংলাদেশের সমাজ কি সেই চলচ্চিত্র নির্মাণের পথে আছে? নেই কিন্তু। এইখানে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে চলচ্চিত্র নিয়ে যাকিছু হচ্ছে তা টুকরো টুকরো, বিচ্ছিন্ন, তাতক্ষণিক সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত সুবিধা প্রাপ্তির আশায় হচ্ছে। কোনোকিছুর ধারাবাহিকতা থাকছে না, সমন্বিতভাবে হচ্ছে না। সরকারি-বেসরকারি সব উদ্যোগে চলচ্চিত্রের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গিয়ে ঠেকেছে ইলেকট্রনিক জার্নালিজম আর কর্পোরেট অডিও-ভিজু্য়াল উপকরণ নির্মাণের দক্ষতা তৈরিতে। নির্মাণ ও প্রদর্শনীতে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা বন্দী আছে চলচ্চিত্রে অনভিজ্ঞ-অনাগ্রহী আমলাতন্ত্র ও কিছু সুশীলের কলমের নিবে। এমন একটা সমাজ আমরা তৈরি করেছি যেখানে রগরগে বাণিজ্যিক ধারার কাহিনীচিত্রকেই কেবল ‘চলচ্চিত্র’ মনে করা হয়। স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শনীর বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক অনুদান ও উতসব-নির্ভর, গোষ্ঠিকেন্দ্রিক। তবে শঙ্কার কথা হলো, আমাদের সার্বিক শিক্ষা-ব্যবস্থা চটপটে কর্পোরেট ব্যবস্থাপক তৈরি করাকেই মুখ্য করে তুলেছে। সংবেদনশীল অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন স্বাপ্নিক শিল্পী মানুষ তৈরি না হলে এবং রাষ্ট্র তাদের লালন না করলে- সেই চলচ্চিত্র কে তৈরি করবে বলুন যার স্বপ্ন আমরা দেখছি?

এইরকম একটা বর্তমানে দাঁড়িয়ে গোষ্ঠিতন্ত্রের বাইরে থাকা বাংলাদেশে স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতার রোল মডেল হতে পারেন সদ্য প্রয়াত দুজন চলচ্চিত্র নির্মাতা- তাঁদের একজন ফ্রান্সের আগাসে ভার্দা (Agnes Varda) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনাস মেকাস (Jonas Mekas)। এই দুই নির্মাতাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এই লেখা শেষ করা যায়।

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.