চলচ্চিত্র

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: কলকাতার সামগ্রিক মানুষ আজকাল একটা অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে

ইকবাল করিম হাসনু | 29 Apr , 2019  


[‘পথের পাঁচালী’-র মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রের প্রাপ্তবয়স্কতার ঠিকানা দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। আর দর্শককে উঁচুতারে বাঁধা অভিনয়ের মুখোমুখিও তিনিই করিয়ে দেন ট্রিলজির পরের পর্বগুলোতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে দিয়ে। নাট্যাভিনয়ের প্রতি সৌমিত্রর আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই। কলেজে পড়ার সময় সংস্পর্শ হয় নাট্যব্যক্তিত্ব শিশির কুমার ভাদুড়ীর সাথে। দক্ষ অভিনেতার ভিতটা তৈরি হতে থাকে সেই থেকে। অপুত্রয়ী চলচ্চিত্রের অপু চরিত্রে সত্যজিতের বাছাইতে মনোনীত হওয়ার পর থেকে দুই শিল্পীর মাঝে গড়ে ওঠে একটা বন্ধন। সেই সুবাদে সত্যজিতের চৌদ্দটা ছবিতে অভিনয় তথা মুখ্য চরিত্রে, বলতে গেলে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। মৃণাল সেন, তপন সিংহসহ নামী এবং অন্যান্য অনেক পরিচালকের প্রায় দেড়শ’র মতো চলচ্চিত্রে সৌমিত্র অভিনয় করেছেন এবং এখনও করে যাচ্ছেন।

মঞ্চে অভিনয় ও নাটক পরিচালনাতেও সৌমিত্রর সাফল্য রয়েছে। সুধীমহলে প্রশংসিত তাঁর নাট্যাভিনয়, পরিচালনা এবং রচনা। এবংবিধ পরিচয়ের বাইরে আরও একটা পরিচয় সৌমিত্র একজন কবি। নিরলস কাব্যচর্চার ফসল তাঁর পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ, সেইসাথে যুগ্ম সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন মানসম্পন্ন সাহিত্য পত্রিকা এক্ষণ-এর।

রবীন্দ্রভারতী ও বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি.লিট, দেশ বিদেশি অজস্র পুরস্কার ছাড়াও নাট্যশিল্পে বিশেষ অবদান রাখার জন্যে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সম্প্রতি ফরাসি সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক Commandeur des Arts et Lettres সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। সৌমিত্র গত বছর (২০০১ সাল) টরন্টোর একটি নাট্যোৎসবে বিচারকের দায়িত্ব পালনে এলে বাংলা জর্নাল-এর সম্পাদক ইকবাল করিম হাসনু সাক্ষাতকারটি নেন।]

ইকবাল : বাংলাদেশে আপনার পরিচয় আমরা পেয়েছি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। আমরা জানি আপনি একজন শক্তিমান অভিনেতা বিশেষ করে চলচ্চিত্রে এবং এও জানি আপনি মঞ্চে অভিনয় করছেন অনেকদিন থেকে। তো এই যোগাযোগটা অর্থাৎ ছবিতে আসার ব্যাপারটা যদি একটু বলেন।

সৌমিত্র : সত্যজিত রায় যখন ছবির দ্বিতীয় ভাগ অর্থাৎ ‘অপরাজিত’ করবেন বলে স্থির করলেন তখন উনি অপুর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য লোক খুঁজছিলেন। ওঁর ইউনিটের এবং অন্যান্য স্কাউটস্ যারা ছিলো, খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন এমন লোক যে এডোলেসেন্ট অপুর পার্টটা করতে পারবে। সেই সময় ওঁর এক এ্যাসিস্টেন্ট-নাম নিত্যানন্দ দত্ত, সে আমার এক বন্ধুর বন্ধু ছিল। তো সেই বন্ধুর সূত্রে সে আমার কাছে আসে, এসে আমাকে নিয়ে যায় সত্যজিৎ রায়ের কাছে। আমি তখন অবধি ছবিতো করিইনি, আর আমার ঝোঁকটাও ছিলো থিয়েটারের দিকে, থিয়েটারকে আমি ভালবাসতাম। বাংলা ছবি সম্পর্কে বরঞ্চ অযথা একটা অযৌক্তিক উন্নাসিক মনোভাব ছিলো.. যে ছবি আসলে কিছু হচ্ছে না। কিন্তু তার ঠিক আগে ‘পথের পাঁচালী’ দেখে সেই উন্নাসিক ভাবটা কেটে যায়। বুঝতে পারি যে ফিল্মও কতো উঁচু স্তরের হতে পারে। যাই হোক, ওঁর কাছে নিয়ে যওয়ার পর আমি সেই অভিনয়ের জন্য নির্বাচিত হইনি কারণ, যে বয়সের উনি চাইছিলেন তার থেকে আমি একটু বড়ো ছিলাম। তো, এর পরে যখন উনি তৃতীয় ভাগ করবেন বলে স্থির করেন, ঘোষণা করেন যে, অপু ট্রিলজির শেষ অংশ করবেন, তখন তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন। অনেক পরে জানতে পেরেছি, আমাকে দেখে উনি স্থির করেছিলেন যে, তাহলে তৃতীয় ভাগও করা যায়।

ইকবাল : এর আগে থেকে আপনি মঞ্চে অভিনয় করতেন। ঐ নিত্যানন্দ যাঁর কথা বললেন, উনি মঞ্চে আপনার অভিনয় দেখেছেন। সত্যজিৎ আপনার মঞ্চাভিনয় দেখেননি?

সৌমিত্র : না, ঐ যার কথা বলছি সেও আমার মঞ্চে অভিনয় দেখেনি। সে আমার বন্ধুর কাছে শুনেছিলো যে আমি অভিনয়ে ইন্টারেস্টেড, আমি থিয়েটারে অভিনয় করি।

ইকবাল : যখন ‘অপুর সংসার’ ছবির শুটিং শুরু হল তখন সত্যজিত অবশ্যই চলচ্চিত্রের জন্য আপনাকে নির্দেশ দিচ্ছিলেন। আপনি মঞ্চে অভিনয় ও চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্যে তফাৎ কতটুকু বুঝতে পেরেছিলেন? মানে, সেটা আপনি কী করে সামলালেন?

সৌমিত্র : ব্যাপার হচ্ছে, আমি যখন কলেজে পড়ি তখন থেকে মনস্থির করে নিয়েছিলাম যে আমি অভিনয় করব, আর কিছু করব না। কলকাতায় কলেজে পড়তে আসার পর থেকে থিয়েটার দেখতে আরম্ভ করি এবং শিশির কুমার ভাদুড়ীর থিয়েটার দেখি। তখন থেকেই আমি অভিনয় নিয়ে মোটামুটি সিরিয়াসলি পড়াশোনা করতাম বা চিন্তা-ভাবনা করতাম। তা থেকে এবং শিশিরকুমারের কাছ থেকেই মোটামুটি প্রাথমিকভাবে শুনেছিলাম, মঞ্চে অভিনয় এবং চিত্রাভিনয়ের তফাৎটা কি, যদিও শিশিরকুমার নিজে চিত্রাভিনয়ে আকৃষ্ট হননি। তাঁর ভাল লাগেনি, চলে এসেছিলেন। চিত্রাভিনয়ের খুঁটিনাটি নিয়েও তখন ভাবতে শুরু করেছিলাম। পরে যখন ‘পথের পাঁচালী’ এবং ‘অপরাজিত’ দেখলাম তখন সত্যজিৎ রায়ের অভিনয়ের ধারাটা কী রকম হয় সেটা বোঝার চেষ্টা করেছি। সেই জিনিসটাই মনে মনে, অর্থাৎ ‘অপুর সংসার’ করার আগে থেকেই সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে কী ধরনের অভিনয় করতে হতে পারে তার একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল। ‘অপুর সংসার’-এর শুটিং এর অনেক আগে থেকেই সত্যজিৎ রায় আমাকে নিয়ে যেতেন, নানারকম ছবি দেখাতেন। তখন তাঁর একটা চিত্রনাট্যের একটা খসড়াও আমাকে দিয়েছিলেন যাতে ক্যামেরার সামনে আমার কোনো আড়ষ্টতা না থাকে সেজন্যে। আমার কিছু ক্যামেরার টেস্ট নিয়েছিলেন এবং ক্যামেরা জিনিসটা কী চিনতে শিখিয়েছিলেন। আমার নিজের ভেতরে অভিনয়ের স্বাভাবিকতার একটা প্রবণতা ছিল। সেই সব মিলিয়ে আর কি, তবে, সমস্ত জিনিসটা মানে বলব, কোঅর্ডিনেট করা সবকিছু পরিচালকের ওপর ছিল। খুব দ্রুতই ওঁর সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। একটা বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে যেখানে একটা বোঝাপড়া তৈরি হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে আমি বুঝতে পারতাম উনি আমার কাছে কী চাইছেন এবং উনিও বুঝতেন আমার কাছে কী চাইতে হবে।

ইকবাল : আপনি ওঁর কতগুলো ছবিতে কাজ করেছেন?

সৌমিত্র : ১৪ টা ছবিতে কাজ করেছি।

ইকবাল : কখনো কি আপনার মনে হয়েছে, আপনি অপুর সঙ্গে নিজেকে আইডেন্টিফাই করেছেন বা ঐ চরিত্র কোনোভাবে আপনাকে প্রভাবিত করেছে? যেটা অনেকসময় অনেক অভিনেতার হয়ে থাকে।

সৌমিত্র : যখন করি তখনতো আইডেন্টিফাই করতেই হয় অভিনয় করার সময়, তবে সেটা শুধু অপু নয়। যখন যে চরিত্রে অভিনয় করি তার সঙ্গে আইডেন্টিফাই করাটা একটা প্রাথমিক কাজ মনে করি। তার সঙ্গে কোথাও একটা পয়েন্ট অব আইডেন্টিফিকেশান খুঁজে না পেলে তাহলে কিন্তু সেই চরিত্রে অভিনয় করাটা দুরূহ হয়। তার মানে এই নয় যে, সে সম্পূর্ণভাবে সেই চরিত্র হয়ে যাবে, তাহলে তো অভিনয় করা যাবে না। পাগলের ভূমিকা করতে গেলে কাউকে যদি পাগল হতে হয় তাহলে তো মুশকিল, খুনির চরিত্রে অভিনয় করতে গেলে কাউকে যদি খুন করতে হয়, তার তো কোনো মানে হয় না। অভিনয় অভিনয়ই। এটা একটা রিপ্রেজেন্টেশনাল এবং ইন্টারপ্রিটেশনাল আর্ট। কিন্তু চরিত্রটাকে বুঝতে গেলে তার সঙ্গে একটা সহমর্মিতা, তার সহানুভূতি বা তাকে বোধগম্যতার সীমানার মধ্যে আনার দরকার আছে।

ইকবাল : আপনি সত্যজিতের ১৪ টা ছবিতে অভিনয় করেছেন। আপনার নিজস্ব বিচারে, নিশ্চয় আপনার নিজস্ব একটা বিচার আছে, কোনটাতে নিজেকে সফল মনে হয়েছে।

সৌমিত্র
: সত্যজিৎ রায়ের ছবির ক্ষেত্রে আমার সে-রকম কোনো ইয়ে নেই। আমি যখন পেছনের দিকে তাকাই তখন আমার মনে হয় যে আমি একটা ছবিতেই কাজ করছি।

ইকবাল : তাই-ই? তাঁর কাছ থেকে কোনো ধরনের মন্তব্য বা বিচার শুনেছেন? আমি বিশেষ কোনো ছবির কথা বলছি।

সৌমিত্র : কোনো বিশেষ ছবি নিয়ে সেরকম বিশেষ কিছুু শুনিনি। আমি স্বল্প সময়ে প্রায় দু’শ ছবিতে অভিনয় করেছি। সত্যজিৎ রায় ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের অনেক বড়ো বড়ো পরিচালক – তপন সিংহ, অজয় কর, তরুণ মজুমদার সবার সঙ্গে কাজ করেছি। সেরকমভাবে ওই বাছবিচারটা আমি করতে পারিনি। এটা আমার কাজও নয়, আমি বাছবিচার করবই বা কেন? যাঁরা ছবি দেখবেন তাঁরা ভাববেন কোনটা ভাল কোনটা মন্দ।

ইকবাল : ছবিতে অভিনয় করতে করতে কখনো কি পরিচালনার দিকে আপনার ঝোঁক চাপেনি?

সৌমিত্র : ছবি পরিচালনার কথা মনে হয়েছে অনেক সময়। কিন্তু আমার পক্ষে পরিচালনা করাটা অনেক অসুবিধার ছিল। প্রাকটিক্যাল অসুবিধা। একদম বাস্তবিক অসুবিধা। ছবি পরিচালনা একটা ফুল টাইম জব। মানে তাতে ৬ থেকে ৮ মাস আর অন্য কাজ করা যায় না। সেই ৬ থেকে ৮ মাস আমি অন্য কী করতে পারি শুধু ছবি করা ছাড়া? আমি অভিনয় করে যে অর্থ উপার্জন করি এবং যে অর্থের প্রয়োজন আমার কাছে আছে সেটা তাহলে অনেক কমিয়ে ফেলতে হয়। ছবি পরিচালনা করায় পয়সা নেই অত। কিন্তু বাংলাদেশের মানে পশ্চিমবঙ্গের সব থেকে বড় চিত্রতারকা যে ছিল তার চেয়েও বেশি অর্থ উপার্জন আমি করেছি। সেই অর্থটা ত্যাগ করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না – প্রথম কথা। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, আমি যে ধরনের ছবি করতে চাই সে ধরনের ছবির ব্যাকারও আস্তে আস্তে প্রথমদিক থেকে কমতে শুরু করেছে। শেষদিকে সত্যজিৎ রায়কে পর্যন্ত বেশিরভাগ ছবি সরকারি ফিনান্সে করতে হয়েছিল। সরকারি ফিনান্স বলতে এনএফডিসি ইত্যাদি আছে, সেসব মাধ্যমে বিভিন্ন দিকে ছোটাছুটি করার মতো লোক আমার ছিল না। আমি একা মানুষ। সেদিক দিয়েও অসুবিধা ছিল। আমার নিজের মনের মতো ছবি করতে না পারলে, যেরকম সবাই করছে মানে প্রযোজকের নির্দেশে করতে হত তাহলে আমি করতে পারতাম না, আমার করার কোনো ইচ্ছেই ছিল না। এছাড়া আরেকটি কারণেও হয়তো আমার অত ঝোঁক আসেনি, সেটার কারণ একটা সম্পূর্ণ থিয়েটার তৈরি করা, অর্থাৎ ক্রিয়েটিভ স্যাটিসফেকশন সেটা আমার থিয়েটারে হয়ে যায় বলেই হয়তো আমি সিনোমতে অত ঝুঁকিনি।

ইকবাল : সেখানেও তো একটা সাংগঠনিক ব্যাপার আছে।

সৌমিত্র : সেটা আমার আয়ত্তের মধ্যেই। ফিল্মে ইনভেস্টমেন্টের নেচার এমন যে সেটা একটা বড়ো জিনিস হয়ে যায়। সিনেমায় যেখানে একটা প্রোডাকশনে ইনভেস্ট হচ্ছে ৩০/৪০ লাখ টাকা সেখানে একটা থিয়েটার প্রোডাকশন নামাতে হয়তো লাগছে মাত্র এক-দেড় লাখ টাকা।

ইকবাল
: যদি ছবি করতে আপনি চাইতেন যেরকম ভাবে ছবি করতে চান, সেরকম কোনো একটা প্লট বা কোনকিছু …।

সৌমিত্র
: অনেক সময় অনেক সাবজেক্ট মাথায় এসেছিল। নানা সময় নানা জিনিস মাথায় এসেছে। সে-তো আর একটা কোনো বিশেষ বিষয় নয় যে, এইটেই করতে চাইতাম, বহু সময় বহু জিনিস মাথায় এসেছিল।

ইকবাল : আপনি একাধারে চলচ্চিত্রে অভিনয় করে গেছেন। একই সময়ে মঞ্চে নাটক নির্দেশনাও করেছেন, অভিনয় করেছেন। অভিনয়ের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে তো আপনি পড়াশোনা করেছেন। আপনাদের সময়ের যে অভিনয়, বিশেষ করে সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে আপনি যেটা করেছেন আর এখন যারা অভিনয় করছে এর মধ্যে কোনো বিবর্তন বা তফাৎ লক্ষণীয় কি?

সৌমিত্র : না, কোনো ভালোদিকে যে আরো বিবর্তিত হয়েছে তা আমি বলতে পারছি নে। এটা বলতে দুঃখ পাচ্ছি, কিন্তু না সেরকম কিছু হয়নি।

ইকবাল : বলতে চাইছেন, সেটা ভালো দিকে যায়নি?

সৌমিত্র : ভালো দিকে মানে, কোনো বিবর্তনেরই কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি। বরং ডেকাডেন্স-এর চিহ্নই বেশি হয়ে গেছে কারণ খারাপ অভিনয় বেশি হয়ে গেছে এখন আগের তুলনায়।

ইকবাল : আপনার মতে কারণটা কী, বা আপনি কী মনে করেন, কেন এই দুর্বলতা?

সৌমিত্র
: এই দুর্বলতা, মানে, সামগ্রিকভাবে অভিনয়ের যে-সমস্ত বড়ো বড়ো আদর্শ সেগুলো এখন চোখের সামনে নেই বড়ো একটা। ছবির জগতে বিশেষ করে হিন্দি ছবির প্রভাব এত বেশি বেড়ে গেছে যেখানে অন্য অভিনয়ের দিকে এখনকার ছেলেমেয়েদের হয়তো অতটা ঝোঁক নেই। আমি জানিনা কী কারণ কিন্তু এমন কোনো অভিনয় দেখি না এখনকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে যাকে রিমার্কেবল অভিনয় বলা যায়। যেটা দেখে মনে হয় যে হ্যাঁ এখানে অভিনয়টা সার্থকতার স্তরে উঠেছে।

ইকবাল : আপনি যখন চলচ্চিত্রে অভিনয় করছেন, তখন আপনার সামনে কোনো আদর্শ ছিল?

সৌমিত্র : এক কথায় ছিল বলব না, মানে একজনের মধ্যে সে-রকমভাবে। কারণ ছোটোবেলা থেকে সিনেমা আমি খুব দেখতাম। সেটাই ছিল আমার স্বভাব। হলিউডের অনেক অভিনেতাই আমাকে খুব ছোটোবেলা থেকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু সে-প্রভাবটা আমার ভেতরে চলে গেছে, আলাদা করে। যেমন রোনাল্ড কোলম্যান আমার ভালো লাগত, তারপর গ্যারি কুপার – এদের অভিনয় আমার ছেলেবেলা থেকেই ভালো লাগত। তার পরবর্তী কালে অনেককেই।

ইকবাল : স্থানীয়ভাবে?

সৌমিত্র
: স্থানীয়ভাবে আমার অনেকের অভিনয়ই ভালো লাগত, যেমন মনীন্দ্র ভট্টাচার্য, যোগেশ চৌধুরী, ছোটোবেলায় যাঁদের দেখতাম। তুলসী চক্রবর্তী বিশেষ করে এবং তুলসী লাহিড়ী, তাঁদের অভিনয়ের খুবই ভক্ত ছিলাম বা এখনো আছি। কিন্তু যাঁর অভিনয় খানিকটা পরিমাণে বলা যায় যে, মোটামুটি একটা আদর্শের মতন ছিলো উনি হচ্ছেন বলরাজ সাহানি। আমার ধারণা তিনিই ভারতীয় সিনেমার সবচেয়ে ভালো অভিনেতা ছিলেন, এখন অব্দি যা চলছে। অভিনয় বলতে যা বুঝায় অর্থাৎ point of excellence.

ইকবাল : সত্তর দশকের শেষের দিকে ফরাসি নবধারার মতো হিন্দি ‘নিউ ওয়েভ’ শুরু হল। যেমন একদিকে একটা গ্রুপ national school of drama থেকে, অন্যদিকে পুনা থেকে আরেকটা গ্রুপ বেরিয়ে এল, বিশেষ করে হিন্দি ছবিতে কিছু কাজ-টাজ করলো, এই যেমন ‘আক্রোশ’, তারপর ‘চক্র’। সেখানে আমরা দেখি কয়েকজন শক্তিমান অভিনেতা অভিনেত্রী, যেমন নাসিরউদ্দিন শাহ্, ওমপুরী, স্মিতা পাতিল, শাবানা আজমী। পাশাপাশি বিচার করলে আমরা বাংলায় সেরকম কাউকে শনাক্ত করতে পারি না। আপনাদের জেনারেশানের পরে আরকি..।

সৌমিত্র : তো এই জেনারেশনের পরে আপনি হিন্দিতে পান কি? তাতো পান না। একেকটা সময়ে একেকটা গ্রুপ ওঠে। যখন শ্যাম বেনেগাল, সথ্যু এঁদের মতো ডিরেক্টররাও এসেছে, তার জন্যে নাসির, ওম, শাবানা আজমী, স্মিতা পাতিল, মোহন আগাসে, গিরিশ কারনাড, আরো অনেক ভালো ভালো অভিনেতাই এসেছে। একটা সময়ের ফসল ওরা, আমরাও। we are also product of time. সত্যজিৎ রায় ছবি না করলে কি আমাকে পেতেন? মানে আমার কাজটাকে পেতেন? আমি হয়তো অভিনয় জগতে আসতাম, অভিনয় করতাম। মোটামুটি খেটেখুটে যেমন কাজ করি সেরকম করলে হয়তো নামও হতো। কিন্তু আমি ঠিক যে ধরনের কাজটা করেছি, অভিনয়ের যে মানটা বা রূপটা তৈরি করেছি চল্লিশ বছর ধরে, সেটা নিশ্চয় সত্যজিৎ রায় না থাকলে হত না। এটা হয়তো উল্টোদিক থেকে সত্যজিৎ রায়ের বেলায়ও ঠিক। বহু সময়ের বহু চেহারার অ্যান্টিপ্রোট্যাগনিস্টকে এরকম করে ব্যক্ত করার মতন অভিনেতা তিনি যদি আমার মতন কাউকে না পেতেন তাঁর পক্ষেও হয়তো ঠিক এ জিনিসটা হত না। সেজন্য সময় একটা ভয়ংকর জিনিস। সত্যজিৎ রায় তাঁর শিল্পের ক্ষেত্রে He is the creator of time. উনি সময়কে তৈরি করেছেন তাঁর ছবিকে গ্রহণ করার জন্য। কিন্তু অন্যদিকে থেকে যে creation উনি করেছেন সেটার জন্য সময় ওঁকেও তৈরি করেছে। ওঁর পূর্বসূরি যদি রবীন্দ্রনাথ না হতেন, বাংলাদেশের মানে পুরো বাংলার কালচারাল হেরিটেজ যদি উনি আত্মস্থ করতে না পারতেন, তাহলে কি এই ছবি উনি করতে পারতেন?

ইকবাল : অনেকদিন থেকে আপনি মঞ্চে অভিনয় করছেন, পাশাপাশি আপনার আরো দুটি পরিচয় আছে। আপনি আবৃত্তিও করে যাচ্ছেন, এবং অনেকদিন থেকে আপনি সম্পাদনা করেছেন এক্ষণ পত্রিকা। আমরা যখন দেখি সত্যজিৎ রায় এবং আপনাদের মতো এরকম আরো অনেক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব যাঁরা নানা শাখায় কাজ করে যাচ্ছেন সফলভাবে। পরের জেনারেশনে দেখা যাচ্ছে সংখ্যাটা আরো কমে আসছে, এর কারণটা কী?

সৌমিত্র : দেখুন একটা জিনিস আপনারা বাংলাদেশের লোকেরা ঝট করে বুঝতে পারবেন না, কিন্তু খোলা চোখে তাকালে বুঝতে পারবেন যে, পশ্চিমবঙ্গে একটা সংস্কৃতির সংকট আছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বলুন, বাংলাদেশের নতুন আমিত্বই তৈরি হয়েছে ভাষা এবং ভাষার মাধ্যমে সংস্কৃতিকে ভালবেসে। তার ভিত্তিতে ঐ দেশটা তৈরি হয়েছে। সেখানে সবটাই গ্রোথের প্রশ্ন। আর পশ্চিমবঙ্গ তার দীর্ঘদিনে বাংলার যাবতীয় ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও তার যে আর্থিক সংকট, সামাজিক সংকট সেটা তার কালাচারাল সংকটের মধ্যে গিয়েও পৌছেছে, অবক্ষয়ের মধ্যে গিয়ে পড়েছে। শুধু অভিনয় বা এই ধরনের জিনিস নয়, পশ্চিম বাংলার কোন জায়গাটায় নতুন একটা স্ফূরণ, নতুন একটা চেহারা কোথায় হচ্ছে? কোথাও হয়েছে? সেই ঊনবিংশ শতাব্দীর কলকাতা কি আর আপনি পান? ঊনবিংশ শতাব্দীতে হয়ে গেছে বলে বিংশ শতাব্দী অবধি কলকাতার একটা বিরাট ঐতিহ্য উনিশ শ’ সাতচল্লিশ সাল অবধি তার বহু স্বাধীনতা আন্দোলনের লড়াই, বহু বামপন্থী আন্দোলনের লড়াই, এসব করে টরে একটা পলি পড়ে রয়েছে, তার একটা রেসিডিউ আছে। সেজন্য আপনি কলকাতার মানুষকে এটা তার ধর্তব্য নয় বলতে পারেন না, কারণ তার পেছনে একটা ঐতিহ্য আছে। কিন্তু কলকাতার সামগ্রিক মানুষ আজকাল একটা অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটা অস্বীকার করার কোনো রাস্তা কারো নেই।

ইকবাল : সেটা কি সবদিক থেকে আপনি মনে করেন?

সৌমিত্র : না সবদিক থেকে না হলেও এটার ব্যাপক চেহারা আছে। সামজিক অবক্ষয় এবং অর্থনৈতিক অবক্ষয় সবকিছুর সঙ্গে একটা জুড়ি আছে। ধরুন ষোড়শ শতাব্দী। ষোড়শ শতাব্দীতে চৈতন্যর যে ভক্তিপদ সে পদটা শুধুই কি রিলিজিয়াস ছিল? তাহলে নিশ্চয় এতবড়ো সাহিত্যভিত্তি তার সাথে জড়িত থাকত না। সে-রকম ধর্মগুরু তো অনেকেই অনেক সময় এসেছিলো। কিন্তু চৈতন্য যখন এলেন তখন তার সঙ্গে একটা কালচারাল রেনেসাঁস ছিল, তখন তাঁর প্রেরণায় কবিরা কবিতা লিখতে লাগল। চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি, জ্ঞানদাস তাঁর জন্য কবিতা লিখতে লাগল। যার জন্য উজ্জ্বল নির্মলিন লেখা হল। তাঁর জন্য কীর্তন নামক বাংলার এতবড়ো সাংস্কৃতিক সম্পদ, সেটা তৈরি হল অর্থাৎ গড়ে উঠল। এমন কি নাট্যকলা চর্চায়, তখনকার যে নাটক তাতে তিনি অংশগ্রহণ করতেন, ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, সব মিলিয়েই একটা কালচারাল রেনেসাঁস। সেই সময়টা এগিয়ে যাওয়ার সময়। মানে সেটা খুব নাতিক্ষুদ্র অবস্থায় হলেও, আপনারা বাংলাদেশে তার একটা স্বাদ পাচ্ছেন। অন্তত তিরিশ বছর পেয়েছেন। এখন হয়তো সেখানেও একটা ডেকাডেন্স-এর ছোঁয়া লাগছে।

ইকবাল : হ্যাঁ, ডেকাডেন্সতো আছেই।

সৌমিত্র : আছেই, কেননা এই সাব-কন্টিনেন্টই থেকে সেটা যেতে পারে না। সেটা দু’শ বছর ধরে মানে গোলামির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু তবুও বাংলাদেশের যে এসপিরিশন, বাংলাদেশের যে নতুন কিছু হওয়ার ইচ্ছে, বাংলাদেশে বাংলা একাডেমি থেকে নতুন যে বই বেরুচ্ছে, তার পেছনে যে উৎসাহ, যে আগ্রহ, সেটা কিন্তু সেই জাতির নবজন্মের জন্য হচ্ছে।

ইকবাল : সেটা আমরা একমাত্র একটা শাখায় দেখতে পারি – নাটক, গ্রুপ থিয়েটারের যে ধারণা সেই ধারণাটা একাত্তরের পরে কলকাতার অনুপ্রেরণায় ….

সৌমিত্র : কলকাতার অনুপ্রেরণায় বটেই, সেটা হতে পেরেছে… পশ্চিমবঙ্গ আপনাদের প্রোভাইড করতে পেরেছে, আপনাদের বা সব বাঙালিকে। তার কারণ কলকাতার থিয়েটারের দেড়শ বছরের ঐতিহ্য। সেখানে গিরিশ ঘোষ থিয়েটার তৈরি করেছেন, তারপরে শিশির ভাদুড়ী এসে নবরূপ দিয়েছেন। তারও পরে শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্তরা সেখানে কাজ করেছেন। সেজন্য এখন শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্তরা না থাকলেও তার মানে রাজার ধন তো বসে খেলেও শেষ হতে সময় লাগে, সেইটেই হচ্ছে আসল কথা।

ইকবাল
: আপনার কবি পরিচয়ও বাংলাদেশে অজানা নয়, এতসবের মাঝে আপনি কোনটাকে খুব নিবিড়ভাবে মনে করেন, যেখানে আপনি নিজেকে খুব বেশি প্রকাশ করেন?

সৌমিত্র : আমি ঠিক বলতে পারি না, সত্যিই বলতে পারি না মানে, একটা মানুষ, নানা রকম ইচ্ছে, আকাক্সক্ষা, বাসনা এসব তো থাকবে। আমার ভেতরে কবিতা লেখার তাগাদা মোটামুটি ছেলাবেলা থেকে ছিল। হয়তো অভিনয়টা আরও ছোটোবেলা থেকে ছিল। হয়তো আমার জ্ঞানোদয়ের সময় থেকেই আমি অভিনয় করছি। আবৃত্তি করছি, আমাদের বাড়িতে থিয়েটার-চর্চা ছিল, কবিতা লেখাটা একটু পরে এসেছে। ষোল বছর বয়স থেকে কবিতা লেখা আরম্ভ করেছি, আমার কোনো বিশেষত্ব ছিল না, বেশিরভাগ বাঙালির ছেলে যেমন – হাত থাকলেই কবিতা লেখে, প্রেমে পড়লে কবিতা লেখে, আমিও তেমন। সেভাবেই কবিতা লেখা শুরু হয়েছিল। কিন্তু তবে জিনিসটা আমি খুবই ভালোবাসতাম। আমাদের বাড়িতে সাহিত্যের ভীষণ প্রীতি ছিল। আমার দাদু লিখতেন, আমার বাবা-মা সাহিত্য খুব ভালোবাসতেন। ছোটোবেলা থেকে আমাদের বইটই পড়ার প্রশ্রয় ছিল, বহু বাঙালির বাড়িতে যে-রকম থাকে না। এই লেখাপড়া কর, এখন কী জন্য গল্পের বই পড়ছ – এই বলেই থামিয়ে দেয়া হয়, তা ছিল না। বেশ প্রশ্রয় দেয়া হত বই পড়তে এবং আমি বইয়ের পোকা ছিলাম। কৈশোরে একটা সংকট মানুষের থাকে, ঐ যে আত্মপরিচয়ের সংকট, আত্ম-আবিষ্কারের সংকট। তখন সব সময় মনে হয়, আমার হাতটা মনে হয় একটু বেশি রোগা, আমার গলাটা বোধ হয় বেশি ঢ্যাঙ্গা, আমায় কি জানি লোকে কী চোখে দেখছে। সেখানে হঠাৎ কবিতা লিখতে শুরু করলে ঐ সংকটের অনেকটা কেটে যায়। মানে পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পায়, মনে হয় এই তো আমি এইটা পারি, তাহলে আমি একটা কেউ, আই এ্যাম সামওয়ান ওয়ার্থ টু বি রিকগনাইজড। সে-রকম একটা ভাবনার মধ্য থেকে কবিতাটাকে বেশি আঁকড়ে ধরেছিলাম, এবং আজও কবিতা লিখি। সাহিত্য আমার কাছে ততখানিই প্রিয় এবং আমার মনে হয় আমার অভিনয়ের থেকেও বেশি। এটা আমার ধারণা দু’ একজন বলেছেনও, আমার সমসাময়িকদের থেকে আমার যদি কোথাও কোনো উৎকৃষ্টতর ভূমিকা অভিনয়ে থেকে থাকে সেটা আমার কাজের মধ্য দিয়ে ভাষার প্রতি এবং সাহিত্যের প্রতি ভালবাসার কারণে। আমি আমার ভাষাটা বলতে ভালবাসি, সেজন্য আমার সংলাপ বলতে এত ভালো লাগে। আমি যখন একটা বাংলা শব্দ উচ্চারণ করি, সেটা আমার কাছে তৃপ্তিকর মনে হয়। সেটা আমার কাছে কেবল কোনো কথা নয়। ওটা আমার কাছে গায়ে দেওয়ার জামা নয়। ওটা আমার শরীর।

ইকবাল
: আপনি প্রায় দু’শর মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন। কোনো একটা ছবিতে, কোনো কারণে কোনো সংলাপ বা ডায়লেক্ট কি আপনার জন্য কোনো চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছে? এরকম কিছু মনে পড়ছে?

সৌমিত্র : দুম করে বললে হঠাৎ মনে পড়ে না। মুশকিল হচ্ছে আমি যেসব পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছি, যাঁরা উৎকৃষ্টতর চিত্রনির্মাতা বলে পরিচিত, যেমন সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, এঁদের ছবিতে সংলাপ এত স্বভাবসিদ্ধ এবং স্বাভাবিক যে সেখানে খুব সহজেই এই সংলাপের মধ্যে যাওয়া যায়। বরঞ্চ অসুবিধা হয় যারা দোজ হু আর লেসার ইন ট্যালেন্টস্, তাদের ছবিতে সংলাপ অনেকসময় খটমট থাকে। তবে তপন সিংহের একটা ছবির কথা হঠাৎ মনে পড়ছে। ‘হুইল চেয়ার’ বলে একটা ছবি করেছিলেন। খুবই ভালো ছবি, খুবই মানবিক আবেদন। তাতে আমি হুইল চেয়ার বেইজড এক ডাক্তারের ভূমিকায় অভিনয় করেছি। তাতে মনোজও ছিলো। তপন সিংহের সেই ছবিটার মাঝে মাঝে কিছু সংলাপ। বিশেষ করে মনোজের সাথে সিনগুলোতে কিছু সংলাপ তথাকথিত বাস্তব সংলাপ ছিল না। অনেক সময় একজন ডাক্তার বা একজন সাইক্রিয়াটিস্ট যখন কাউন্সেলিং করেন, তাঁকে অনেকরকম প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রোগীকে আশ্বস্ত করতে হয়, আশ্রয় দিতে হয়, অনেকসময় সংলাপগুলো বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে কাব্যের মধ্যে চলে গিয়েছিল। সেই সংলাপগুলো বলা চ্যালেঞ্জ ছিল। সেগুলোকে কানে শুনলে তবে মনে হবে না যে, আমি কবিতা করে করে বলছি, কাব্যি করে বলছি। কাব্যের নির্যাস সেই সংলাপগুলোর মধ্যে যেন অক্ষুণ্ণ থাকে সেটা খেয়াল রাখতে হয়েছে। সেখানেও আমার ঐ লেখার অভ্যাস, আমার আবৃত্তি করার অভ্যাস আমাকে সাহায্য করেছিল।

ইকবাল : কখনো কখনো কোনো বিশেষ অঞ্চলের সংলাপ আপনাকে বলতে হয়েছে। তাতে কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়নি?

সৌমিত্র : একটু হয় বেশি হয় না। কারণ মোটামুটি ভাষার প্রতি আগ্রহের জন্য যখন যেখানে যাই, সেখানে কান পেতে থাকি, কে কীরকম কথা বলছে, শুনি। ধরুন ‘অশনি সংকেত’-এর চরিত্রে। সেখানে বিভূতিভূষণ লিখেছেনই নদীয়া জেলার ব্যাকগ্রাউন্ডে এবং আমার বাড়ি নদীয়া জেলায়। আমি আশৈশব ঐ সংলাপ শুনে আসছি। আমি নিজেও বলতে পারি। ওটা আমার পারারই কথা। ধরুন, কেউ যদি বলে, আপনি কী সুন্দর বাংলা বলেন! ওটা তো আমার কৃতিত্ব নয়, ওটাতো হওয়ারই কথা। নদীয়ার সেই ডায়ালগ তো আমি জানিই। তবে যখন বীরভূমের কথা বলতে হয়েছে, কি বাঁকুড়ার কথা, কি পুরুলিয়ার কথা বলতে হয়েছে, তখন নিশ্চয় একটু খেয়াল করে, অভ্যেস করে বলতে হয়েছে।

ইকবাল : এবার একটু অন্য প্রসঙ্গ – শিল্প সংস্কৃতির সাথে রাজনীতির সম্পর্কটা আপনি কীভাবে দেখেন? আপনার দৃষ্টিভঙ্গিটা কীরকম?

সৌমিত্র : যেমন? যদি স্পষ্ট করে বলেন তা’হলে বুঝতে সুবিধা হয়।

ইকবাল
: যেমন, মৃণাল সেন। উনি রাজনীতির কথা স্পষ্টভাবেই বলেন। তাঁর আদর্শের কথা বলেন সেভাবেই।

সৌমিত্র : সবসময় কি তাঁর সেই রাজনীতিটা সম্পর্কে তিনি নিজেই কি পরিষ্কার? এখানে আমার একটা প্রশ্ন আছে। যেমন উৎপল দত্ত। অন্তত তিনি তাঁর রাজনীতিটাকে পরিষ্কারভাবে করতেন। কতটা বিশ্বাস করে করতেন তা জানি না কিন্তু করতেন। মৃণালদা কিন্তু নিজেই নিজের রাজনীতিটাই, তারমধ্যে যে একটা clarity of conviction আছে, এটা আমার নিজের মনে হয় না কিন্তু সবসময়। মৃণালদা একজন পথ খোঁজা মানুষ, অনেকটা। নিশ্চয় মৃণালদা’র মধ্যে একটা বামপন্থা আছে। সেটা ঐ সময়কার সব মানুষের মধ্যে রয়েছে। এমনকি খুব তলায় তলায় সত্যজিৎ রায়েরও ছিল। সেটা যদি শিবির ভাগ করেন, সেখানে আমিও বামপন্থী, নিশ্চয়ই। আমি ঐ কনফরমিস্ট, রাইটিস্ট, দক্ষিণপন্থী হতে পারব না। আমার সব নেচারের মধ্যেই একটা বিদ্রোহ রয়ে গেছে। সমাজ, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি এসবের দিক থেকে নিশ্চয়ই আমাদের কিছু ধ্যানধারণা ছোটোবেলা থেকে ছিল, এরমধ্যে তারও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সেখানে যেসব জিনিস ধ্রুব বলে ভাবতাম, এখন অত ধ্রুব বলে ভাবি না। তবে সাধারণভাবে ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করার দিক থেকে আমার ভেতরে একটা মার্কসবাদী চিন্তা এখনো রয়ে গেছে। কিন্তু তার প্রয়োগের ক্ষেত্রে, এই সমাজ পাল্টে এভাবে ওভাবে.. সেটা কোন পথে হবে ইত্যাদি বিষয়ে আমি আর এখন অত নিশ্চিত নই। নানা পথে সেসব পরিবর্তন হতে পারে। ধরুন কামাল আতাতুর্কের হাতে তুরস্ক একরকমভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল। আবার বাংলাদেশ আরেকরকমভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং পরিবর্তন মানেই একটা অক্ষয় মডেল আছে – সে-রকমভাবে হবে, এটা আর বিশ্বাস করি না। কিন্তু কমিউনিস্ট মেনিফেষ্টোর প্রথম লাইন – যেখানে বলা আছে All hitherto existing society is the history of class struggle– এটা আমি এখনো সত্য বলে মনে করি। ক্লাস স্ট্রাগল সমস্ত সমাজের মধ্যেই আছে। সেটা কখনো ডরমেন্ট থাকে, কখনো ভায়োলেন্ট হয়ে ওঠে। এভাবেই বলছি, সেদিক থেকে আমি এখনো ওইটুকুন অর্থে এখনও মার্কসবাদী। কিন্তু আমি কোনোদিনই কম্যুনিস্ট পার্টির মেম্বার তো হইনি, সচেতনভাবেও হইনি। কারণ আমি জানতাম ওটা আমার কাজ নয়। আই এ্যাম নট এ পলিটিক্যাল একটিভিস্ট। আমি জানতাম যে আমার যা কিছু জীবন সম্পর্কে ধ্যানধারণা সেটা আমার কাজের মধ্যে দিয়ে বলতে হবে। যদি কোনো এমন ইস্যু আসে যেটা সামগ্রিকভাবে ইউনিভার্সেল, ধরুন যদি হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা হয়, তখন আমি নিশ্চয়ই রাস্তায় দাঁড়িয়ে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করব, কারণ সেটা ইউনিভার্সেল একটা দুঃখের ঘটনা একটা জাতির জীবনে। সেখানে আমি নিশ্চয়ই ওটা রাজনীতির ঘটনা বলে আমি যাব না – এমন নয়, আমি দূরে থাকব না। ফান্ডামেন্টাল হিউম্যান ইস্যুতে আমি নিশ্চয় পথে দাঁড়াতে রাজি আছি। কিন্তু বাকি সব জায়গায় আমার যেটুকু কাজ আমি সেটুকু করতে চাই এবং তার মধ্যে দিয়ে আমার জীবন-ভাবনা, আমার সমাজ-ভাবনা, সেটাকে প্রকাশ করতে চাই।

ইকবাল : থিয়েটারে কি আপনার এই চিন্তাভাবনার কিছু প্রতিফলন ঘটাতে পারেন?

সৌমিত্র : চেষ্টা করেছি। আমাদের পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কী বলবো, বিস্মরণশীল। মানে, আজকের কথা কালকেই ভুলে যায়। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের সবথেকে মুশকিল হয়েছে যেটা বাংলাদেশের মানুষের এখনো সেই সংকটটা আসেনি। Take pride in oneself, আমি যে বাঙালি এর জন্য আমার একটা গৌরববোধ থাকবে তো। তার জন্য অন্য লোককে ছোটো ভাবতে হবে না। বিহারি খারাপ কি, পাকিস্তানী খারাপ কি, থাইল্যান্ডের লোক খারাপ, আমার তা ভাবতে হবে না। কিন্তু আমি বাঙালি তাঁর জন্য আমি গর্বিত। এই ভাবনা তো তার থাকবে। সেই গর্বটর্ব সব হতগর্ব হয়ে বসে রয়েছে পশ্চিমবাংলার মানুষ। আমি বাঙালি বলেই তো আমি ইউনিভার্সেল ম্যান হতে পারি If I’m a true Bengali। আমি আবহমানকালের বাঙালি। যে বাঙালি চাঁদ সওদাগরের মতন নৌকা যাত্রা করতো।

ইকবাল : এক্ষণ পত্রিকা সম্পর্কে একটু বলুন।

সৌমিত্র : আমাদের একটা বন্ধুগোষ্ঠী ছিল। মানে কুড়ি পঁচিশজন আমরা একসঙ্গে আড্ডা মারতাম, গল্প করতাম, থিয়েটার দেখতাম, সিনেমা দেখতাম, সাহিত্যচর্চা করতাম। তার মধ্যে অনেকে লিখতও বটে, নির্মাল্য খুব বেশি একটা কিছু লিখত না। অনেক সময় আমাদের মনে হত বড়ো বড়ো কাগজগুলোতে সে-রকমভাবে নতুন লেখকদের প্রবেশাধিকার চট করে জন্মায়না, সেজন্য কলকাতায় যেটা, সেটা মনে হয় ঢাকাতেও আছে, ছোটো ছোটো কাগজ মানে লিটল ম্যাগাজিন বার করা, তাতে সবাই লিখবে। উভয় বাংলার বাঙালির মধ্যে এটা আছে। আমরা অনেকবার ভেবেছি। ১৯৬০ সালের পর নির্মাল্য আমার কাছে একদিন এসে বলল যে, একটা কাগজ বের করার কথা কংক্রিট টার্মসে ভাবছি, যে কাগজটা বলা যায় পরিচয়, চতুরঙ্গ যে-ধরনের কাগজ, সেই ধরনের সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা হবে এবং আমাকে ওর সঙ্গে যুগ্ম সম্পাদনা করতে হবে। আমি ওকে শর্ত দিই যে, আমি সবরকমের সাহায্য করতে রাজি, কিন্তু সম্পাদনার পুরো দায়িত্ব তোমায় নিতে হবে। ও আবার বলল, তাহলে আমি কাগজ বের করব না তুই যদি না থাকিস। তারপরে আমরা দুজন রাজি হয়ে এক্ষণ বার করি। এক্ষণ পত্রিকার নামকরণ করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। নামকরণের জন্য আমি ওঁকে অনুরোধ করেছিলাম। উনি পাঁচ-ছ’টা নাম দেন, তারমধ্যে ওঁর প্রেফারেন্স ছিলো এক্ষণ। আমাদেরও এক্ষণ নামটা পছন্দ হয়। প্রচ্ছদও উনি আমৃত্যু এঁকে দিয়েছিলেন। তখন উনি নির্মাল্যকে ভালো করে চিনতেন না। এইভাবে চলতে চলতে দুই দশকের উপর একসঙ্গে সম্পাদনা করি। আমাদের কতগুলি এরিয়া ভাগ করা ছিল। কাগজের কোন দিকটা কে কী দেখবে। কাগজের প্রোডাকশান অর্থাৎ তার প্রুফ দেখা, তার ছাপা কীরকম হবে, কী টাইপ হবে না হবে, এটা খুব সুন্দরভাবেই করত নির্মাল্য এবং এন্টায়ার কৃতিত্বটাই ছিল নির্মাল্যের। সিঙ্গেলহ্যান্ডেডলি ও জিনিসটা করত। আর কী লেখা যাবে না যাবে সেটা আমরা দুজন মিলে স্থির করতাম, তার মধ্যেও কিছু কিছু জিনিস, যেমন- কবিতা কী ছাপা হবে না হবে এটাতে নির্মাল্য একদম চোখই দিত না, বলত- এটা তোর পুরো দায়িত্ব, তুই যা বাছবি, যে কবিতা বাছবি তাই ছাপা হবে, সেভাবেই চলত। অন্যান্য লেখার ক্ষেত্রেও দু’জনে মিলে ঠিক করতাম কোন সংখ্যা কীরকম হবে, এইভাবে চলত। প্রথম যখন সত্যজিৎ রায়ের কাছে আমরা কাগজটার কথা বলি, যে আমরা এরকম কাগজ বের করতে চলেছি আপনি নাম দেবেন। তো উনি লেখকগোষ্ঠীর কথা জিজ্ঞেস করলেন, কারা লিখবে, না লিখবে। সেখানে ওঁর বহু সাজেশান ছিল। যেমন চঞ্চল কুমার চট্টোপাধ্যায়, কমলকুমার মজুমদার প্রমুখের কথা উনিই প্রথম আমাদের বলেছিলেন। এঁদের আমরা দূর থেকে জানতাম, খুব ভালো করে এঁদের লেখার সঙ্গে ইনফ্যাক্ট আমার পরিচয় ছিল না। ওঁর বলার পর আমি সে পরিচয়টা করতে আরম্ভ করি। কমলকুমার মজুমদার সম্পর্কে উনি বলেছিলেন যে He knows all the arts. সেই তখন কমলকুমার মজুমদারের কাছে আমরা যাই এবং প্রথম সংখ্যাতেই গোলাপ সুন্দরী ছাপা হয়েছিল।

ইকবাল : পত্রিকা তো বন্ধ হয়ে গেছে।

সৌমিত্র : নির্মাল্যের মৃত্যুর পর বন্ধ হয়ে গেছে। নির্মাল্যের মৃত্যুর বেশ কিছুদিন আগে থেকেই আমি সম্পাদনার দায়িত্ব থেকে সরে আসি। সেটার কারণ আর কিছু নয়, খুব সোজা কথায় বললে যতখানি understanding থাকলে যুগ্মভাবে একটা কাগজ সম্পাদনা করা যায়, সেই understanding টা আমাদের কাজের ক্ষেত্রে আর থাকছিল না।

(বি:দ্র: এই আলাপচারিতা হয়েছিল ২০০১ সালের গ্রীষ্মে কানাডার টরন্টোতে। পরের বছর অর্থাৎ ২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলা জর্নাল ৪র্থ বর্ষ ৩য় সংখ্যায় এই আলাপচারিতা প্রথম প্রকাশিত হয়। বর্তমান সংস্করণে শিরোনামে সৌমিত্রের পুরো নাম ব্যবহার এবং কিছু বানান সংশোধন ছাড়া আর কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।)
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.