প্রবন্ধ

কিংবদন্তীর মেলে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কারের গল্প

আনিসুর রহমান | 20 Apr , 2019  


শুরুতেই ২০১৩ সালে প্রকাশিত প্রতিশ্রতিশীল লেখক পলাশ দত্তের ‘গীতাঞ্জলি-চক্রে রবীন্দ্রনাথ’ বইটির কথা বলতে চাই। বইটি প্রকাশ করেছিল বাংলাদেশের প্রকাশনা সংস্থা ঐতিহ্য। নয়টি অধ্যায়ে শতাধিক পৃষ্টার বইটিতে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কারের আগের ও পরের নানা গল্প ও সত্য তুলে ধরা হয়েছে। নিজের কথা বলার আগে নয়টি অধ্যায়ের শিরোনামগুলো উল্লেখ করতে চাই। তাতে বইটির একটা চিত্র উঠে আসবে।
১।যাত্রা হলো শুরু ২। ইয়েটস জটিলতা ৩। উল্টোস্রোতের এজরা পাউন্ড ৪। অনুবাদ কেন ৫। নোবেল শুধু গীতাঞ্জলির জন্য? ৬। গীতাঞ্জলি বেরোল কবে ৭। জীবনীকারের রবীন্দ্রনাথ ৮। প্রথম আমেরিকা ৯। নিউ ইয়র্ক টাইমস: নোবেল থেকে মরণ।
বইটি সম্পর্কে বিশদ আলোচনায় যাব না। আমি নোবেল পুরস্কারের পেছনে খোদ বিলেত আর সুইডেনের যে সকল কিংবদন্তী লেখকদের ভূমিকা ছিল তাদের সম্পর্কে একটু আলোকপাত করব।
ইংরেজি নিয়ে রবীন্দ্রনাথের অস্বস্তি ছিল। তারপরও নিজের লেখা বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। আবার সরাসরি ইংরেজিতে লিখেছেন। ইংরেজিতে তার সাহিত্যকর্মও বিস্তর। কিন্তু ঘুরেফিরে জীবদ্দশায় যেমন ঠিক তেমনি মৃত্যুর শতবর্ষ পরেও গীতাঞ্জলি আলোচনায়।
ভারতে কর্মরত চিত্রকলা বিষয়ে ব্রিটিশ শিক্ষকের উদ্যোগে তাঁর প্রতিষ্ঠিত দি ইন্ডিয়া সোসাইটি থেকে গীতাঞ্জলি প্রথম প্রকাশিত হয়। চিত্রকলার এই শিক্ষকের নাম উইলিয়াম রোটেনস্টাইন। তিনি আর আইরিশ কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস ‘গীতাঞ্জলি’ পান্ডুলিপি ঘঁষামাজা করেন, সম্পাদনা করেন। রোটনস্টাইন ছিলেন একাধারে চিত্রশিল্পী, লেখক আর চিত্রকলার শিক্ষক। তিনি বয়সে বরীন্দ্রনাথের চেয়ে এগার বছরের ছোট ছিলেন। জন্মেছিলেন ১৯৭২ সালে। আর পরলোকে যান ১৯৪০ সালে। রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার জয়ী কাব্যগ্রন্থ রোটেনস্টাইনকে উৎসর্গ করেন। ২০১১ সালে বিবিসি এবং গণ ক্যাটালগ ফাউন্ডেশন রোটেনস্টাইনের যাবতীয় চিত্রকর্ম অনলাইনে অবমুক্ত করা শুরু করে।
আইরিশ কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসকে আমরা বাঙালি পাঠকরা অনেকটাই চিনি। রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির ভূমিকা লিখে গ্রন্থটিকে দুনিয়াজুড়ে পাদপ্রদীপে আনতে যার নাম অনস্বীকার্য। সেই তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন ১৯২৩ সালে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার লাভের দশ বছর পরে। লেখক হিসেবে তাঁরা দুজনে ছিলেন সমসাময়িক। ইয়েটসের জন্ম ১৯৬৫ সালে; আর মৃত্যু ১৯৩৯ সালে। পলাশ দত্তের গ্রন্থ থেকে আমরা জানি ‘গীতাঞ্জলি প্রকাশের পূর্বে ইয়েটস সারাক্ষণ পাণ্ডুলিপিটি সঙ্গে রাখতেন। তিনি সম্পাদনার পরে বেশকিছু ভাষাগত অসঙ্গতি থেকে যায়। পরে সেগুলো রোটেনস্টাইন ঠিক করেন। এই সংশোধনী দেখে ইয়েটস ইগোগত প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে স্বাচ্ছন্দ্য প্রকাশ করেছিলেন।
এরপরে যে নামটি উল্লেখ করব তিনি হলেন রাজকীয ব্রিটিশ সাহিত্য সমাজের সদস্য থমাস স্টার্জ মুর। তিনি রাজকীয় ব্রিটিশ সাহিত্য সমাজের সিদ্ধান্তের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে সুইডিশ একাডেমির নিকট পত্র লিখে নোবেল পুরস্কারের জন্যে রবীন্দ্রনাথের নাম প্রস্তাব করেন। স্টার্জ মুর একজন বড় মাপের কবি, নাট্যকার আর সাহিত্য সমালোচক। তিনি লেখক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক এবং বছর কয়েকের ছোট। তিনি জন্মেছিলেন ১৮৭০ সালে আর পরলোকে চলে যান ১৯৪৪ সালে।
নোবেল পুরস্কারের জন্যে রবীন্দ্রনাথের নাম সুইডিশ একাডেমিতে এলো। তিনি আলোচনায় থাকলেন। কিন্তু ঐ বছর নোবেল পুরস্কারের জন্যে বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন দ্বিতীয় পছন্দের। প্রথম পছন্দের ছিলেন ফরাসি লেখক এমিল ফগ। ঐ সময় সুইডিশ কবি হেইদেনস্টাম রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি গীতাঞ্জলি পড়ে একটা লেখা দাঁড় করান। লেখাটি সুইডিশ একাডেমিকে দেন। এরপর সুইডিশ একাডেমি তাদের সিদ্ধান্ত বদল করে। এখানে উল্লেখ্য যে হেইদেনস্টাম সুইডিশ একাডেমির সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯১৬ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
সুইডিশ একাডেমিতে ঐ সময়ে লুন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্য ভাষাবিদ্যা বিষয়ের পণ্ডিত তেগনের এসাইয়াস হেনরিক ভিলহেলম সুইডিশ একাডেমির সদস্য ছিলেন। আর যে কারণে সুইডিশ একাডেমি গীতাঞ্জলি ইংরেজি কাব্যের মূল বাংলা বইগুলো নৈবেদ্য, খেয়া আর গীতাঞ্জলি সংগ্রহ করে।
নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয় ১৯১৩ সালের নভেম্বর মাসে। বই তিনটি নোবেল লাইব্রেরিতে পৌঁছায় ১৯১৩ সালের জুলাই মাসে।
এখানে বলে নিই রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার গ্রহণের জন্যে ১৯১৩ সালে সুইডেনে যাননি। তার পক্ষে স্টকহোমে ব্রিটিশ দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত মিশন প্রধান চার্লস পুরস্কার গ্রহণ করেন। রবীন্দ্রনাথ প্রথম সুইডেন ভ্রমণ করেন ১৯২১ সালে। তাঁকে নিয়ে সুইডেনের মানুষের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ ছিল। একটি ঘটনা উল্লেখ করলেই তা অনুমেয় হবে তিনি কতটা আগ্রহের কেন্দ্র ছিলেন। তিনি উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেবার জন্যে আমন্ত্রিত ছিলেন। তাকে উপসালা রেলওয়ে স্টেশনে অভ্যর্থনা জানানোর জন্যে সাড়ে তিন হাজার লোক ভিড় করেছিল। উপসালার ইতিহাসে এরকম ঘটনা এখন পর্যন্ত আর ঘটেনি।
রবীন্দ্রনাথকে নোবেল পুরস্কার প্রদানের সময় সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সচিব ছিলেন এরিক আক্সেল কার্লফেল্ড্ট। জন্ম ১৮৬৪ সালে, মৃত্যু ১৯৩১ সালে।
একই বছর তিনি মরণোত্তর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। যদিও জনশ্রুতি আছে ১৯১৯ সালে তাঁকে নোবেল পুরস্কারের জন্যে বিবেচনা করা হয়েছিল। তিনি একই সময় সুইডিশ একাডেমির সদস্য এবং স্থায়ী সচিব। তিনি পুরস্কার গ্রহণে আগ্রহী হননি।
এ লেখা শেষ করার আগে দুইজন বিখ্যাত লেখক সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলতে চাই। একজন হলেন আমেরিকান কবি এজরা পাউন্ড। আরেকজন হলেন ফরাসি লেখক এমিল ফগ।

আমেরিকার ‘পোয়েট্রি’ সাময়িকীতে এজরা পাউন্ড অপ্রকাশিত গীতাঞ্জলির পাণ্ডুলিপি থেকে ছয়টি কবিতা পাঠিয়েছিলেন পত্রিকাটির সম্পাদক হ্যারিয়েট মনরোকে। কবিতাগুলো ছাপাও হয়। এখানে এজরা পাউন্ড প্রসঙ্গে অন্য একটি গল্প বলব। এজরা পাউন্ডকে কেন্দ্রে রেখে আমরা তিন কিংবদন্তী কবির কথা উল্লেখ করতে পারি- এরা হলেন – উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস, থমাস স্টার্ন এলিয়াট বা টিএস এলিয়ট এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এরা তিনজনই নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।
কিন্তু এজরা পাউন্ড নয়। এজরা পাউন্ড ইতালির একনায়ক মুসোলিনীর বন্ধু ছিলেন এবং তাঁর রাজনীতিরও সমর্থক। যে কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মার্কিন কর্তৃপক্ষ তাকে কারাগারে ভরে। পরে তৎকালীন জাতিসংঘের মহাসচিব সুইডিশ নাগরিক দগ হ্যামারশল্ড গোপন কূটনীতি চালিয়ে এজরা পাউন্ডকে মুক্ত করেন। দগ হামারশল্ড বিমান দুর্ঘটনায় কঙ্গোতে মৃত্যুবরণ করেন ১৯৬১ সালে। তিনি একই বছর শান্তিতে মরণোত্তর নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
দগ হামারশবোল্ড মা আগনেসের আতিথেয়তায় রবীন্দ্রনাথ মধ্যাহ্নভোজ করেছিলেন। আগনেস রবীন্দ্রনাথের একজন অনুরাগী পাঠক ও ভক্ত ছিলেন।
এবার এমিল ফগ প্রসঙ্গে আসি। ফরাসি লেখক এমিল ফগ ১৯১৩ সালে নোবেল পুস্কারের জন্যে প্রথম পছন্দের ছিলেন। তার জন্ম ১৮৪৭ সালে। মৃত্যু ১৯১৬ সালে। তিনি রবীন্দ্রনাথের চেয়ে প্রায় দেড় দশকের বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন।
তিনি সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরাসি কবিতার অধ্যাপক। ১৯০০ সালে ফরাসি একাডেমির সদস্য হয়েছিলেন। তার ভাগ্যে নোবেল না জোটার কারণে নোবেলের ইতিহাসে প্রথমবারের মত ইউরোপ মহাদেশের গণ্ডি ডিঙালো ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথকে পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.