প্রবন্ধ

মাটি ও মানুষের কবি আল মাহমুদ

পুলক হাসান | 9 Apr , 2019  


তাঁর কবিতা যেন জীবনেরই এক সহজপাঠ। নারীর নিঃশ্বাসের মতো নিগূঢ়, নম্র ও সহজিয়া এক কাব্যভাষা নিয়ে এলেন তিনি। নারীই যে সৃষ্টির চেতনা তা-ই হয়ে উঠল তাঁর কাব্যের মৌলিক এষণা। তার মধ্যেই খুঁজলেন তিনি জীবনের সুরবাহার ও চিরদ্যোতনা। চেনা পৃথিবীকে চেনালেন নতুনভাবে, চেনা ছবিকে আঁকলেন নতুন ও নিখুঁতভাবে। আমরা পেলাম কাব্যের নতুন এক স্বাদ, নতুন এক ব্যাখ্যা :
‘কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধ ভরা ঘাস/ ম্লানমুখ বউটির দড়িছেঁড়া হারানো বাছুর/ গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর/ কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।’
অতুলনীয় এই জাদুকরী কাব্যভাষার জন্যই তিনি হয়ে উঠলেন অদ্বিতীয়। তাঁর চেতনায় উদ্ভাসিত হলো ঘোরলাগা চির এই সত্য, এই উপলব্দি :
‘এই মৃত্তিকা প্রিয়তমা কিষাণী আমার/ বিলের জমির মতো জলসিক্ত সুখদ লজ্জায়/ যে নারী উদাম করে সর্ব উর্বর আধার।’
সৃষ্টির উর্বরতায় নারী ও মৃত্তিকা যে অভিন্ন সেই উপলব্দি গ্রামীণ লোক সমাজের ভাবব্যঞ্জনায় নতুন এক দ্যুতি পেল তাঁর কবিতায়। আর তিনি হয়ে উঠলেন প্রবাদপ্রতিম। কারণ, লোকনন্দিনী তাঁর কবিতায় আমরা শুনতে পেলাম উদার ও দিলখোলা দৃপ্ত এই ঘোষণা : আমি তোমাদেরই লোক। নগরের নকল পোষাক ছেড়ে এসেছি প্রাণের বিভূতি ছড়ানো চিরচেনা ধুলোকাদার প্রিয় গ্রামে, নদীর আর্তনাদ ভরা পরিচিত জনপদে। আমাকে চিনতেই হবে তোমাদের, তোমাদেরই অন্তরে আমার বাস। আমার স্বপ্ন জুড়ে তোমাদের এক টুকরো আকাশ। এ কথা শুধু আল মাহমুদই বলতে পারেন। কারণ, বাংলা কবিতার শেকড় যদি গ্রাম ও গ্রামীণ জীবনালেখ্য তবে তিনি তার অতি নিকটজন, আপন আলোক। সেই আলোকচ্ছটায় বাংলা কবিতায় উন্মোচিত হলো নতুন এক দিগন্ত, উন্মোচিত হলো গ্রামীণ লোকজীবনের আদি ও অকৃত্রিম রুপ। তিনি তার আধুনিক রূপকার :
‘কে যেনো ডাকলো তাকে, সস্নেহে বললো, বসে যাও,
লজ্জার কি আছে বাপু, তুমি তো গাঁয়েরই ছেলে বটে,
আমাদেরই লোক তুমি। তোমার বাপের
মারফতির টান শুনে বাতাস বেহুঁশ হয়ে যেতো।
পুরনো সে কথা উঠলে এখনও দহলিজে
সমস্ত গাঁয়ের লোক নরম নীরব হয়ে শোনে।’
খড়ের গম্বুজ, পৃষ্ঠা-২৯/সোনালি কাবিন ও নির্বাচিত ১০০ কবিতা

কী চমৎকারভাবেই না তিনি আমাদের আত্মপরিচয় উন্মোচন করেন। আর এমন হৃদয় নিঙরানো এবং স্বতঃফূর্ত প্রকাশভঙ্গির জন্যই আল মাহমুদের কবিতা অনন্য। গ্রাম জনপদের মানুষের জীবনোপাদান, তাদের নিত্য আহার্য, ভাষা, শব্দ তাঁর কবিতায় জীবন্ত এবং হৃদয়স্পর্শী বলেই তিনি লোক ও কৌম সমাজের অনন্য প্রতিনিধি। এর উৎস চর্যাপদে। মধ্যযুগের কবিদের অবলম্বনও ছিল তা। কবি জসীমউদ্দীনের কবিতায় এসে তা হয়েছে আরও অপূর্ব, আরও মূর্ত। চর্যাপদের কাব্যবিশ্বাস যদি হয় তত্ত্ব ও সাধনা তবে কবি জসীমউদ্দীনের কাহিনী কাব্যে আছে এক নবযোজিত লোক জীবনের ধারা। আর সেটিকে আরও সুসংহত করেন কবি আল মাহমুদ তাঁর ‘সোনালী কাবিন’ দিয়ে। ‘সোনালী কাবিন’ বাংলা কবিতার এক অভাবিত সংযোজন। এক অনন্য উদ্ভাসন। আল মাহমুদ তাঁর এই কাব্যগ্রন্থে আমাদের পোড়া রূপসী বাংলাকেই বেঁধেছেন হৃদয়ের পুষ্পহারে। এ কাব্যগ্রন্থ তাঁকে শুধু খ্যাতি নয়, চিহ্নিত করে বাংলা কবিতায় তাঁর স্বতন্ত্র অবস্থানও। তিনি হয়ে ওঠেন ‘সোনালী কাবিন’ এর কবি। একটা বিশেষ ধারা লালনের জন্য তাঁর এই অনন্য স্বীকৃতি। তিনি তার মধ্যে তৈরি করেছেন তাঁর কাব্যকুটির। নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন লোক ঐতিহ্যের অঙ্গে অঙ্গে বাঁধ খুলে দিয়ে। আধুনিক বাংলা কবিতা কালে কালে কতকিছুই না গ্রহণ করেছে, এমনকি লোক ঐতিহ্যের অন্তর্গূঢ় ঠিকানায় ডুব দিয়ে সেখানেও আশ্রয় খুঁজেছে বারবার। আল মাহমুদ বাংলা কবিতার সেই চিরায়ত বন্ধন ‘সোনালী কাবিন’ দিয়ে উন্মোচন করেন। পঞ্চাশের দশকের মৌলিক এ কবির কবিতায় তাঁর অন্তরঙ্গ আলোর সন্ধান পাই আমরা। তাঁর কবিতা কতখানি সমৃদ্ধ সে সম্পর্কে আমাদের কারোই দ্বিমত নেই। তারপরও তিনি বিতর্কের মুখোমুখি। যেমনটি হয়েছিল কাজী নজরুল ইসলাম ও কবি ফররুখ আহমদের ক্ষেত্রে, এমনকি কবি রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও। জীবনবাদী রবীন্দ্রনাথকে তাঁর ভক্ত অনুরাগীরা এমনভাবে তাঁকে প্রাচ্যের ঋষির আসনে বসিয়ে দেয়, যেন তাঁর কাজ শুধু আধ্যাত্ম সাধনা। এই তকমার কারণে পশ্চিমা বিশ্ব তাঁকে বর্জন করেছিলো। কারণ, আধ্যাত্ম যে তাদের কাম্য নয়। এ জন্য রবীন্দ্রনাথকে অনেক ধকল পোহাতে হয়। শেষ পর্যন্ত অবশ্য পশ্চিমা বিশ্ব পরিস্কার হয় যে, তিনি আদপে ঐ ধাতুর লোক নন। সৃষ্টি চৈতন্যে তাঁর অবস্থান অন্য উচ্চতায়। আল মাহমুদ-কে নিয়েও রাজনৈতিক স্থূলতা তাঁর অসাধারণ কবিত্ব শক্তিকেই অসম্মান প্রদর্শনের চেষ্টা। তিনি একজন কবি, শুধুই কবি। তিরিশোত্তর বাংলা কবিতার ব্যতিক্রমী নিজস্ব কাব্য ভাষার অনন্য সাধারণ এক কবি। জন্মগত প্রতিভা ও জীবন সংগ্রামে তাঁর উত্থান কেবল কাজী নজরুলের সাথে তুলনীয়। ছিলেন রণাঙ্গনের একজন মুক্তিযোদ্ধা। তার সম্মান তো আমরা দিয়েছিই: সর্বজন শ্রদ্ধার জন্য তাঁর লাশ যায়নি শহীদ মিনারে, ঠাই হয়নি বুদ্ধিজীবী কবরে, ফিরে যেতে হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার নিজ গ্রামে, চিরশায়িত হয়েছেন বাবা-মা’র কবরের পাশে। এ প্রত্যাবর্তনে তাঁর কোনো লজ্জা নেই, লজ্জা আমাদের, লজ্জা জাতির। ফরাসি দেশে জনপ্রিয় কবি পল এলুয়ারের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছিল। সরকার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তাতে মানুষের হৃদয় থেকে তাঁকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হয়নি। তাঁর মূল চেতনা লোকধর্ম, মানবিক বিধান, মানবিক এক সমাজ দর্শন। তাঁর ‘লোক-লোকান্তর’, ‘কালের কলস’ ও ‘সোনালী কাবিন’ তিনটি কালজয়ী গ্রন্থই সেই চেতনা উৎসারিত।
‘আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন,
পরম স্বস্তির মন্ত্রে গেয়ে ওঠো শ্রেণির উচ্ছেদ,
এমন প্রেমের বাক্য সাহসিনী করো উচ্চারণ
যেন না ঢুকতে পারে লোকধর্মে আর ভেদাভেদ।’
সোনালী কাবিন, পৃষ্ঠা-৩৭/সোনালি কাবিন ও নির্বাচিত ১০০ কবিতা

তাঁর এই কবিতার চরণে আমরা শুনতে পাই ভেদাভেদমুক্ত এক সুষম সমাজ আকাঙ্ক্ষারই অনুরণন। শ্রেণি ও বিদ্বেষমুক্ত সমাজ দ্রষ্টা যে কবি তাঁর কোনো মৃত্যু নেই। যখন মানুষ তাঁকে হৃদয়ে দিয়েছে বর, মৃত্যু সেখানে নিতান্তই লোকান্তর। কবিতা প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় নয়, প্রকৃতিই তার পাঠশালা। আল মাহমুদ সেই পাঠশালা থেকেই পেয়েছেন কবিতার মণিরত্ন, যা দিয়ে কাব্যহিংসার সঙ্গে জয় করেছেন নিজের দারিদ্র্য, জয় করেছেন অগণিত মানুষের হৃদয়ও। তাঁর সবকিছুই জীবন থেকে নেয়া। দেশের মাটি ও মানুষের জীবন চেতনা থেকে তাঁর ভাবের উন্মিলন। মাটি ও মানুষের কবি তিনি। বাংলা কবিতা যদি বিশ্ব-দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার ঘোষণা দেয় তবে তিনি থাকবেন সর্বাগ্রে। সেখানে তাঁর কবিতা হয়ে উঠবে এক টুকরো বাংলাদেশ। বাংলা কবিতার বিশ্বজনীন স্বীকৃতির জন্য অনুবাদ এখন খুবই জরুরি। তা না হলে আল মাহমুদের মতো বিশ্বমানের কবি থেকে যাবেন অনাবিষ্কৃত। জাতীয় প্রয়োজনেই এই উদ্যোগ আজ সময়ের দাবি। আল মাহমুদ সত্যিকার অর্থেই বাংলা কবিতায় আমাদের প্রতিনিধি। অগ্রজ কবির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে তাই বলতে চাই : কবিতার জন্যই আল মাহমুদ বেঁচে থাকবেন, তাঁর কবিতা আমাদের পড়তেই হবে। তাঁর কবিতা পড়তেই হবে কবিদের। কারণ, তিনি কবিদের কবি।


2 Responses

  1. Ahsan Ibn Mazhar says:

    পুলক হাসান,
    অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।
    অসম্ভব কঠিন অথচ সত্য বিষয়টি তুলে ধরবার জন্য। এখন শুধু অনুধাবন আর বাস্তবায়ন এর প্রয়োজন।

  2. Sam Alam says:

    অনুবাদের আকালের জন্যই আমাদের অনেক কবিই বিশ্বের আঙ্গিনায় অপরিচিত থেকে গেছেন। জানিনা এ আকাল কবে মিটবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.