প্রবন্ধ

আমাদের মানভাষা নিয়ে বিতর্ক পাকিস্তান আমলের কথা মনে করিয়ে দেয়

জাকির তালুকদার | 7 Apr , 2019  


আমাদের বেতার-টেলিভিশনে, নাটকে-বিজ্ঞাপনে সম্প্রতি যে কিম্ভূত বাংলা ব্যবহার করা হচ্ছে, তার সপক্ষে কিছু অশিক্ষিত মিডিয়া-ব্যবসায়ী যখন কথা বলেন, সেই কথাকে বেশি গুরুত্ব না দিলেও চলে। কিন্তু এর সপক্ষে কিছু কিছু স্বঘোষিত ভাষাবিদ যখন ভাষার জাতীয়তাবাদের প্রসঙ্গটি টেনে আনেন, তখন তার মধ্যে রাজনীতির চোরাস্রোতের ভূমিকা লক্ষ্য না করে আর উপায় থাকে না। এই জাতীয়তাবাদ আবার বাঙালি বা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মতো সুস্পষ্ট নয়। বরং এটি হচ্ছে ভাগীরথী তীরের কলকাতার জাতীয়তাবাদ বনাম বুড়িগঙ্গার তীরের ঢাকার জাতীয়তাবাদের বিতর্ক। একটি মহল দাবি করতে চান যে প্রমিত বাংলাকে বিকৃত করার মাধ্যমে তারা নাকি আসলে কলকাতার অঘোষিত কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছেন। এবং এর মাধ্যমে পূর্ববাংলার সত্যিকারের স্বাধীকারের ঘোষণা দিচ্ছেন। সরাসরি এমন কথা না বললেও তারা তাদের বিকৃত কার্যকলাপের সমর্থনে যেসব যুক্তি-তর্ক উত্থাপন করে থাকেন, সেগুলির সারমর্ম আসলে এটাই।
আমাদের মানভাষা বা প্রমিত বাংলার বর্তমান পরিস্থিতি ও মানভাষার ইতিহাস-বিশ্লেষণ এই কারণে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাভাষার প্রথম ব্যাকরণগ্রন্থের প্রণেতা নাথানিয়াল ব্রাসি হ্যালহেড তাঁর গ্রন্থের ভূমিকায় এই বলে আশংকা প্রকাশ করেছিলেন যে, বাংলা গদ্য কোনোদিনই বিকশিত হতে পারবে না। তাঁর আশংকা যে সত্য হয়নি তার প্রমাণ তো আমাদের বাংলা গদ্যই। নিন্দুকরা একে অনেক অসম্পূর্ণতার দায়ে দায়ী করতে চান। তাঁরা সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন যে দিকটিতে, তা হচ্ছে বাংলা গদ্য ইংরেজদের পৃষ্ঠপোষকতায় ইংরেজি গদ্যের আদলে নির্মিত। এই সত্যটি মেনে নিতে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। কারণ ঊনবিংশ শতকে সৃষ্ট বাংলা গদ্যে ও গদ্যরীতিতে ইংরেজির প্রভাব সুস্পষ্ট। গদ্যের কমা, সেমিকোলন, বিস্ময়বোধক-চিহ্ন, উদ্ধৃতি-চিহ্ন এসেছে ইংরেজি থেকেই। বাক্যগঠনের বেশ কিছু বিধিও হুবহু ইংরেজিকে মেনে চলে। কিন্তু তবু তা ‘বাংলা গদ্যই’। ইংরেজরা প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যে বাংলা গদ্যের সূচনা ঘটিয়েছিল, তার পেছনে বাঙালির উন্নতি ঘটানোর ইচ্ছা কাজ করেছে মনে করা ভুল হবে। বাইবেলের সুসমাচার বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে এই দেশে খ্রিস্টানিকরণ ত্বরান্বিত করা, এবং অফিস-আদালতে দলিল-দস্তাবেজের পাশাপাশি ইংরেজ-রাজপুরুষদের সুবিধার্থে বাংলা শেখানোর উদ্দেশ্যেই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে শুরু হয়েছিল বাংলা গদ্যের প্রচার ও প্রসার।
কিন্তু বাংলা গদ্য যে সেই জায়গাতেই থেমে নেই, তা তো ইতিহাসের বাস্তবতায় প্রমাণিত। রামমোহন রায় এই গদ্যের প্রায়োগিক শক্তি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তিনি যা করলেন, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়– ‘পূর্বে কেবল ভাবুকসভার জন্য পদ্য ছিল, এখন জনসভার জন্য গদ্য অবতীর্ণ হইল। রামমোহন রায় আসিয়া সেই আমদরবারের সিংহদ্বার স্বহস্তে উদ্ঘাটিত করিয়া দিলেন।’
ব্যক্তিপ্রতিভা বাংলা গদ্যকে যে কতবার কতভাবে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছে, তার দৃষ্টান্ত হিসাবে এক রবীন্দ্রনাথই যথেষ্ট। কিন্তু তাহলে তাঁর পূর্বসূরি ও উত্তরসূরিদের অস্বীকার করা হয়। বিশেষ করে অক্ষয়কুমার দত্ত এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উল্লেখ না করলে চরম অকৃতজ্ঞতা দেখানো হবে। বাংলা গদ্যে বিদ্যাসাগরের অবদান সম্পর্কে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের ভাষ্য মনে করা যেতে পারেÑ ‘বাংলা ভাষাকে পূর্ব-প্রচলিত অনাবশ্যক সমাসাড়ম্বর ভার হইতে মুক্ত করিয়া তাহার পদগুলির অংশযোজনার সুনিয়ম স্থাপন করিয়া বিদ্যাসাগর যে বাংলা গদ্যকে কেবলমাত্র সর্বপ্রকার ব্যবহারযোগ্য করিয়াই ক্ষান্ত ছিলেন তাহা নহে, তিনি তাহাকে শোভন করিবার জন্যও সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। গদ্যের পদগুলির মধ্যে একটি ধ্বনি সামঞ্জস্য স্থাপন করিয়া, সৌম্য এবং সরল শব্দগুলি নির্বাচন করিয়া, বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতা দান করিয়াছেন।’
অনেক বিবর্তন এবং ব্যক্তিপ্রতিভার সম্মিলিত অবদানে গড়ে উঠেছে বাংলা গদ্য। যে গদ্য তৈরি করা হয়েছিল কোম্পানির ইংরেজ কর্মচারিদের কাজের সুবিধার জন্য এবং বাঙালিদের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের গতিবেগ বৃদ্ধি করার অভিপ্রায় নিয়ে, সেই বাংলা গদ্যে গত দুই শতাধিক বছরে লিখিত হয়েছে অসংখ্য না হলেও অনেকগুলি কালজয়ী উপন্যাস, প্রচুর ছোটগল্প, নাটক। বিজ্ঞান শিক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলা গদ্য। ব্যবহৃত হচ্ছে ইতিহাস-বিন্যাসে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ও সকল শিক্ষায়তনে সকল উচ্চতর বিদ্যার চর্চায়, হাতিয়ার হিসাবে সেই বাংলা গদ্য ব্যবহৃত হচ্ছে গণশিল্পের জাগরণে। এই ভূখণ্ডের সকল সামাজিক-রাজনৈতিক বিপ্লবের ইশতেহার রচিত হচ্ছে এই বাংলা গদ্যেই। যুদ্ধে যাওয়ার সময় বিপ্লবী তার দয়িতার কাছে বিদায়ী-পত্র রচনা করছেন এই বাংলা গদ্যেই। আবার মৃত্যুশয্যায় পিতৃপুরুষ তাঁর উত্তরপুরুষদের জন্য অছিয়তনামা রচনা করে যাচ্ছেন এই বাংলা গদ্যেই। মানুষ চণ্ডতম ক্রোধ প্রকাশ করছে এই গদ্যেই। আবার সূক্ষ্মতম প্রেমানুভূতিও প্রকাশ করছে এই গদ্যেই।

বিতর্ক উঠেছে প্রমিত বাংলা এবং আঞ্চলিক বাংলা নিয়ে।

শিল্পী-সাহিত্যিক-নাট্যকার তথা যে কোনো সৃজনশীল গদ্যশিল্পীর ক্ষেত্রে এই বিতর্ক অবান্তর। কারণ শক্তিমান শিল্পী কোনো ব্যাকরণ বা বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করেই সৃষ্টি করতে পারেন প্রতিভাদীপ্ত শিল্প। প্রমিত ভাষার সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষার সংশ্লেষণের মাধ্যমে, কিংবা পুরোপৃুরি কোনো আঞ্চলিক ভাষাতেই সৃষ্টিশীল লেখক রচনা করতে পারেন কবিতা, গান, নাটক, গল্প, উপন্যাসসহ লিখিত সাহিত্যের যে কোনো বর্গ। এখানে লেখক-শিল্পীর নিজের প্রতিভা এবং যোগ্যতা ছাড়া আর কিছুই বিবেচ্য নয়। প্যারীচাঁদ মিত্র, কালীপ্রসন্ন সিংহ, জসীম উদ্-দীন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী, সৈয়দ শামসুল হক, সেলিম আল দীন প্রমুখ শক্তিমান লেখকের ক্ষেত্রে তাঁদের আঞ্চলিক ভাষায় লেখা রচনা নিয়ে কোনো বিতর্ক ওঠেনি। বরং তাঁরা অভিনন্দিত হয়েছেন। আর যাঁরা অল্পশক্তির বা প্রতিভাহীনতার উদাহরণ, তাঁরা প্রমিত বাংলাতে যেমন, তেমনই আঞ্চলিক বাংলাতেও চিরকাল শিব গড়তে কিম্ভূত বানরই গড়েছেন। আর নিজেদের অক্ষমতার দায় চাপিয়েছেন ভাষার অপ্রতুলতার উপর। এবার আরেকদিকে তাকানো যাক। তাকানো যাক দক্ষিণারঞ্জন মিত্রের ‘ঠাকুমার ঝুলি’র দিকে। এই বই কি আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত? নিশ্চয়ই নয়। এমনকি এর ক্রিয়া ও সর্বনামপদের ক্ষেত্রেও তথাকথিত চলতি ভাষার পরিবর্তে সাধু ভাষার প্রয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলা ভাষায় আর কি একটিও গ্রন্থের নাম উচ্চারণ করা সম্ভব যেটি বাংলাভাষীর সর্বস্তরে এমন বোধ্য-সৃষ্টি হিসাবে মর্যাদা পেয়েছে? অতুলনীয় প্রতিভা ছাড়া কোনো লেখকের পক্ষে এই পর্যায়ে পৌঁছানো অসম্ভব। বাংলাভাষায় গদ্যে লেখা এমন অনেক উদাহরণ দেখানো সম্ভব যেখানে সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের বিশুদ্ধ সাধুরূপ সত্ত্বেও সেই ভাষা প্রকৃতপক্ষে কথ্যভাষা। ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ তার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ।
অর্থাৎ প্রকৃত শক্তিমান সৃজনশীল লেখকের ক্ষেত্রে প্রমিত ভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা কোনোটাই যে কোনো সমস্যা নয়, বরং সবগুলোই তার রচনাশৈলী প্রকাশের লাগসই হাতিয়ার হতে পারে, সে ব্যাপারে বিতর্ক তুলতে পারে শুধু কম শক্তিমান বা প্রতিভাহীন-উচ্চাকাঙ্ক্ষী লেখকরাই।
তবে প্রমিত বাংলা এবং আঞ্চলিক বাংলার জিগির তোলার পেছনে একটি অনুক্ত প্রশ্ন রয়ে গেছে। তা হচ্ছে প্রমিত বাংলার বিরোধিতার নাম করে কলকাতার ভাষার বিরোধিতা করা। ভাগীরথী তীরের ভাষাটির বিরোধিতা করার যৌক্তিকতা খুঁজতে যাওয়ার আগে আমরা একটু স্মরণ করতে পারি, কোন পরিস্থিতিতে ও কীভাবে এই ভাষা বাংলার মানভাষা হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করল।
প্রাচীন বাংলায় উচ্চারণের সমতা ছিল না। চর্যাপদে একই শব্দের ভিন্ন ভিন্ন বানান। মধ্যযুগের বাংলার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বড়– চন্ডীদাস, কবিকঙ্কণ চন্ডী, আলাওল ও ভারতচন্দ্রের রচনাবলী সেই সাক্ষ্যই প্রদান করে। দোভাষী পুঁথিলেখকদের মধ্যে শুধু ভাষার অসমতা নয়, শৈলীগত দূরত্বও ছিল অনেক বেশি। এর একটি প্রধান কারণ হচ্ছে সমগ্র বাংলাভাষী অঞ্চলের কোনো একক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল না। বিভিন্ন কেন্দ্র ছিল বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য। যেমন আরাকান রাজসভা, ত্রিপুরার মহারাজার দরবার, নদীয়ার রাজার রাজসভা। খুব নিকট অতীতেও বাংলার রাজধানী স্থানান্তরিত হয়েছে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গাতে। পুন্ড্রবর্ধন, নদীয়া, সোনারগাঁও, গৌড়, রাজমহল, মুর্শিদাবাদ, ঢাকা– এই সবগুলি নগর কোনো-না-কোনো সময় বাংলার রাজধানী তথা কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। ইংরেজ শাসনামলে ভারতবর্ষের ৬৬৭টি রাজ্য ও রাজ্যখণ্ডকে একত্রিত করে প্রথম একটি এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা স্থাপিত হয়। এবং কলকাতা হয় তার রাজধানী বা কেন্দ্র। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রত্যেক দেশেই অধিকাংশ ব্যক্তিকে একই ভাষার দুইটি রূপ ও রীতি শিখতে হয়। একটি তার নিজের আঞ্চলিক ভাষা। সেটিই তার যথার্থ মাতৃভাষা। আর একটি প্রমিত ভাষা বা মান ভাষা বা শিষ্ট ভাষা। প্রথমটি মানুষ ব্যবহার করে নিজের বাড়ির মধ্যে, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে, নিজের অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে। আঞ্চলিক ভাষার মধ্যেও আবার অসংখ্য ভাগ রয়েছে। এক পেশাজীবী গ্রুপের সঙ্গে একই অঞ্চলের আরেক পেশাজীবী গ্রুপের আঞ্চলিক ভাষাতেও অনেক প্রভেদ লক্ষ্য করা যায়। পিটার ট্রুডগিলের বরাতে জানা যাচ্ছে যে সপ্তদশ শতকে ইউরোপীয়রা যখন প্রথম ওয়েস্ট ইন্ডিজে পৌঁছে তখন তারা সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছিল সেখানে নারীদের ও পুরুষদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ভাষার ব্যবহার দেখে। প্রমিত ভাষার ব্যবহার হয় শিক্ষাক্ষেত্রে, প্রাতিষ্ঠানিক কাজে-কর্মে, জাতীয় গণমাধ্যমসমূহে, অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে। ‘এক অঞ্চলের গালি আরেক অঞ্চলের বুলি’। আঞ্চলিক ভাষার এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই প্রধানত প্রয়োজন পড়ে প্রমিত ভাষার। প্রমিত ভাষাটি হুবহু কোনো অঞ্চলের ভাষা নয়, বরং সকল আঞ্চলিক ভাষাভাষী যাতে রাষ্ট্রের সকল প্রয়োজনীয় তথ্য সঠিক অর্থে বুঝতে পারে, সেই কারণেই প্রয়োজন পড়ে প্রমিত ভাষার। প্রমিত ভাষার ‘বুলি’ সকল অঞ্চলেই ‘বুলি’, এবং প্রমিত ভাষার ‘গালি’ সকল অঞ্চলেই ‘গালি’। সেই কারণেই কৃত্রিম হলেও জাতির চিন্তা-চেতনার ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রমিত ভাষার ভূমিকা অপরিসীম। তবে প্রমিত ভাষাকে আঞ্চলিক ভাষার চাইতে উন্নত মনে করার কোনো কারণও নেই। ভাষাপণ্ডিতরা ‘উন্নত’ বা ‘অনুন্নত’ ভাষার ধারণাটিকে অস্বীকার করে থাকেন। কারণ প্রত্যেক ভাষাই– তা প্রমিত হোক আর আঞ্চলিক বা উপভাষা হোক, তার লিপি থাকুক বা না থাকুক– স্বয়ংসম্পূর্ণ। ভাগীরথী-তীরের মিশ্র ভাষাকে যে প্রথমে বাংলাভাষাভাষী অঞ্চলের সবাই শিষ্ট ভাষা বা মান ভাষা হিসাবে মেনে নিয়েছিলেন, তার পেছনে ছিল প্রয়োজন। ছিল ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কারণ।
এখন কেউ কেউ চাইছেন, ভাগীরথী-তীরের ভাষার পরিবর্তে বুড়িগঙ্গা-তীরের ভাষাকে বাংলার মান ভাষা হিসাবে প্রচলন করতে। ১৯৪৭ সালের ভারতবিভক্তির পরে একবার পাকিস্তানি জোশ্ নিয়ে এই কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন আবুল মনসুর আহমদ, ফররুখ আহমদ, তালিম হোসেনরা। তাঁরা সেকাজে সফল হননি। সফল যে হননি, তার পেছনে কারণ হিসাবে শুধু যে তাঁদের প্রতিভার অভাবই দায়ী তা নয়, বরং বাস্তবতার সাথে সম্পর্করহিত একটি প্রকল্পের অনিবার্য নিয়তিই ছিল এই ব্যর্থতা। এখন আবার নতুন করে সেই প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। কেন এখনো পশ্চিমবঙ্গ, যা আসলে ভারতের একটি প্রদেশমাত্র, তার প্রমিত ভাষাকে স্বাধীন বাঙালির একমাত্র নিজস্ব রাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রমিত ভাষা হিসাবে মেনে চলা হবে? কেন ঢাকাসহ পাশ্ববর্তী এলাকার আঞ্চলিক ভাষাকে মান ভাষা হিসাবে বাংলাদেশে গ্রহণ করা হবে না?
যারা বুড়িগঙ্গার তীরের ভাষাকে বাংলাদেশের মান ভাষা হিসাবে প্রতিস্থাপিত করতে চান, তাদের উপরই এই দাবির যৌক্তিকতা প্রমাণের দায়িত্ব বর্তায় যে কেন ঢাকা-ময়মনসিংহের ভাষাকে মান ভাষা হিসাবে আমাদের মেনে নিতে হবে? কোন সে বিভায় এই আঞ্চলিক ভাষাটি বিভামণ্ডিত, যা কিনা যশোর-খুলনার ভাষাতে নেই, রাজশাহীর ভাষাতে নেই, পাবনা-বগুড়ার ভাষাতে নেই, সিলেট-চট্টগ্রাম-নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষাতে নেই? কোন সে ঐশ্বর্য যার কারণে ঢাকার আঞ্চলিক বাংলা বরিশাল-রংপুর-দিনাজপুরের আঞ্চলিক বাংলাকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের প্রমিত ভাষা হবে?
মনে রাখতে হবে যে, বর্তমানে প্রচলিত প্রমিত ভাষাকে প্রমিত ভাষা হিসাবে মেনে নিয়েছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষরা। ‘আলালের ঘরের দুলাল’কে যদি উপন্যাস তথা গদ্যের সবচেয়ে প্রসারিত ও পরিশীলিত রূপের সূত্রপাত হিসাবে ধরি, তাহলে বলতে হয় ঐ মান-বাংলাতেই আমাদের আধুনিক কথাসাহিত্যের সূচনা। দুই শতাধিক বছর ধরে এমনটি চলে আসছে। এখন যদি রাতারাতি ঘোষণা দিয়ে পরিবর্তনের কথা বলা হয় তাহলে শিক্ষা-প্রশাসন-জনজীবনসহ সর্বস্তরে যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে, তা এই পশ্চাদ্গামী জাতির পশ্চাদ্গমন-গতিকে আরো ত্বরান্বিতই করবে। যখন ভাগীরথী-তীরের ভাষাকে মান ভাষা হিসাবে নির্ধারণ করা হয়, তখন বাংলায় রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদের ধারণাটি একেবারেই ভ্রূণ পর্যায়ে ছিল। তাই সমস্ত বাংলার ওপর এটিকে চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু আজ পঙ্গু ও বিকলাঙ্গ হলেও একটি দেহ বা অবয়ব সে পেয়ে গেছে। এখন আর এই ধরনের হঠাৎ-পরিবর্তন সম্ভব নয়। সম্ভবত এই ধরনের সত্য উপলদ্ধি করতে পেরেই ইরানিরা তাদের ওপর আরবীয় ঔপনিবেশিকতার অবসান ঘটার পরেও নিজেদের ভাষায় লেখার সময়েও আরবী বর্ণমালার প্রচলন রেখে দিয়েছে।
তদুপরি যে ব্যাপারটি অনেকেই খেয়াল করেন না তা হচ্ছে, গত বাষট্টি বছরের বিবর্তন যথেষ্ট ছাপ ফেলেছে বাংলাদেশে ও পশ্চিমবঙ্গের প্রমিত ভাষাতে। এখন এই ভাষাকে দুইটি আলাদা আলাদা প্রমিত ভাষা বলাই সঙ্গত। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিক-ভাষা, সংবাদপত্রের ভাষা, রাজনৈতিক ভাষ্য, বেতার-টেলিভিশনের ভাষার মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট। উচ্চারণেই শুধু নয়, বাক্য গঠনের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। আর শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে পার্থক্য তো অনেক বেশি সুস্পষ্ট। এই পৃথকী-সংঘটন বিবর্তনের ধারায় অনিবার্য, ন্যায্য এবং আকাঙ্ক্ষিতও।

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বা একাডেমি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভাগীরথী-তীরের ভাষাকে অনেকটাই সুসমঞ্জস করা হয়েছিল। সেই ইতিহাস বোধহয় অনেকেরই অজানা। এবিষয়ে প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেছিলেন একজন ইংরেজ আমলা জন বীম্স। জন বীম্স মনে করতেন, বাংলা ভাষার উন্নয়নের জন্য শব্দ ব্যবহারের ঐক্যসাধন প্রয়োজন। তিনি সেই সময় খেয়াল করেছিলেন– ‘এক্ষণে বাঙ্গালায় দুই দল দেখা যায়। একদল পাণ্ডিত্যাভিমানে অপর্যাপ্ত সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করিতে প্রযত্নশীল। সাধারণ সমাজে তাঁহাদের ব্যবহৃত কঠিন শব্দ সকলে বুঝে কিনা, তৎপ্রতি দৃষ্টিপাত না করিয়া, বাঙ্গালাকে তাহারে সংস্কৃত করিতে চাহেন। অপরদল ইতর ও স্থানীয় ভাষা ব্যবহার করত সুশিক্ষিত সংস্কারের প্রতিযোগী হইয়া উঠিতেছেন।’ তিনি একাডেমি স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন এই কারণে যে– ‘বাঙ্গালায় এমত কোন সর্ব্বজন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি নাই যে তাহার প্রচলিত নিয়ম দেশীয় সকল লোকের নিকট মান্য হইবেক, এবং পাঠ্য পুস্তকেরও এমত আধিক্য ও উত্তমতা হয় নাই যে তাহা হইতে জনমনসদৃশ কোন ব্যক্তি সংকলন পূর্ব্বক সাধুভাষা অবধারিত করিতে সক্ষম হইতে পারেন।… অতএব বাঙ্গালা সাহিত্যের ভাষার স্থিরতা বিধান জন্য সকল বাঙ্গালী মিলিত হইয়া সভা করত তদ্বারা ভাষার উন্নতিসাধন আবশ্যক। যদি এমত সভা স্থাপিত হয়, তাহা হইলে বঙ্গদেশের পরোমপকার হইবেক সন্দেহ নাই। আর সভা স্থাপিত হইলে যে একই কার্য্য সমাধা হওয়া সম্ভব, তাহাও সহজে অনুমান হয়। সভার ব্যাকরণ প্রকাশিত হইলে তাহাতে যে যে শব্দের স্থান নাই কোন লেখক তাহা ব্যবহার করিতে সক্ষম হইবে না এবং উহাতেই ভাষা প্রণালীবদ্ধ হইবেক।’
জন বীম্স ইউরোপীয় ভাষাগুলির উদাহরণ টেনে বলেন– ‘ইউরোপীয় ভাষার মধ্যে সংস্কার বিশিষ্ট পাঁচটি প্রধান: ইংরাজী, ফ্রেঞ্চ, জরমান, ইটালীয় এবং স্পেনীয়। তত্তদেশীয় সুশিক্ষিত সম্প্রদায়ের পাঠযোগ্য পুস্তকাদির জন্য এক একটি পৃথক ও সুনির্ণীত ভাষা অবধারিত আছে। সুশিক্ষিত ইংরেজরা ইংলন্ডের যে প্রদেশ বা বিভাগ হইতেই লিখুন, এক ভাষাতেই লিখিবেন। বালটিক হইতে আল্পস পর্যন্ত সকল জরমান জাতি, সাবস হইতে পালার্মো পর্যন্ত সমস্ত ইটালীয়রা, সিসে হইতে মারসেল পর্যন্ত সকল ফরাসিসেরা, এবং ক্যাটালান গালিসিয়ান আন্ডালুসিয়ান কাষ্টিলিয়ান প্রভৃতি সমস্ত স্পেনীয়রা, এক সুনির্ণীত সাধুভাষা ব্যবহার করিয়া থাকেন।’
জন বীম্স-এর প্রস্তাব অনুযায়ী গঠিত হয়েছিল ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ’।
তবে সৃজনশীল লেখকদের মধ্য থেকে যথার্থ প্রতিবাদ এসেছিল। সেই প্রতিবাদের ভার নিয়েছিলেন রাজনারায়ণ বসু। তিনি জন বীম্স-এর প্রস্তাবের তিনটি প্রধান দিক সম্পর্কে ভিন্নমত প্রকাশ করেছিলেন। তিনি লিখলেন– ‘যখন রাজবিধির দ্বারা সে-সভার একাধিপত্য বিধিবদ্ধ হবার নয়’ তখন লেখক ও বক্তাগণ তার প্রভুত্ব ও ক্ষমতাকে মেনে নিবে কিনা সন্দেহ। দেশের প্রধান প্রধান বিদ্বানদের নিয়ে সভা প্রতিষ্ঠিত হলেও অনেক স্বাধীন ও তেজস্বী লেখক কারো বিচার সাপেক্ষ হয়ে লেখনী ধারণ করতে অনিচ্ছুক হতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, গ্রন্থ বিষয়ে সভা যে মীমাংসা করবে তাই যে অভ্রান্ত হবে তারই বা স্থিরতা কী? কবি মিলটনের রচনার মতো উৎকৃষ্ট রচনাও বহুদিন অনাদৃত হয়ে পড়ে ছিল। অনেক সময় উত্তম গ্রন্থও বাজে সমালোচনার ফলে অনাদৃত হয়ে থাকতে পারে। এককালে এক বিষয়ে যে সংস্কার, তা পরবর্তীকালে রূপান্তর প্রাপ্ত হয়ে থাকে। ‘অতএব মত, ভাষা, ভাব ইত্যাদি কোন এক ব্যক্তি বা কোন মণ্ডলীর মীমাংসাধীন করিয়া রাখাতে অনিষ্ট বই ইষ্টলাভের সম্ভাবনা নাই।’
তৃতীয়ত, ‘ইংরাজীতে যাহাকে জিনিয়াস কহে, সেই প্রতিভাবিশিষ্ট লেখকের রচনার নিকট শত শত মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিতের পাণ্ডিত্য, ব্যবস্থা ও উপদেশ কোন কার্যের নহে। এই শেষোক্ত মহাশয়েরা লিখনের প্রণালী ও ভাষা যেরূপ নিরুপিত করিয়া দিবেন, প্রথমোক্ত প্রকারের লেখকের লেখনীর এক খোঁচায় সেই নিয়মাদি কোথাও উড়িয়া যায়। বরং সেই লেখকের এই প্রণালী কালক্রমে লোকের আদর্শ হইয়া উঠে। অতএব এ বিষয়ের শক্তাশক্তি ও নিয়ম আঁটাআঁটি সকল সময় অধিক কার্য্যকরী হয় না।’
এই দিব্যদর্শনের পরে আর বাগ্বিস্তার অনাবশ্যক।
Flag Counter


4 Responses

  1. Shamsul Alam says:

    উত্তম আলচনার জন্য ধন্যবাদ। আমি জনাব রাজনারায়ন বসুর সাথে একমত। প্রমিত বাংলা নিয়ে বাগারম্বর না করে, গ্রহণযোগ্য শক্তিশালী বাংলা রচনা করে দেখান। আমরা আম জনতার বিচারে তা বিবেচনা করে ভবিষ্যৎ নির্বাচন করবো। আপনি ব্রাত্য রাইসুই হন আর চান্দু মিয়াই হন, তাতে কিছু আসে যায়না।

  2. ইকবাল করিম হাসনু says:

    ”যারা বুড়িগঙ্গার তীরের ভাষাকে বাংলাদেশের মান ভাষা হিসাবে প্রতিস্থাপিত করতে চান, তাদের উপরই এই দাবির যৌক্তিকতা প্রমাণের দায়িত্ব বর্তায় যে কেন ঢাকা-ময়মনসিংহের ভাষাকে মান ভাষা হিসাবে আমাদের মেনে নিতে হবে? কোন সে বিভায় এই আঞ্চলিক ভাষাটি বিভামণ্ডিত, যা কিনা যশোর-খুলনার ভাষাতে নেই, রাজশাহীর ভাষাতে নেই, পাবনা-বগুড়ার ভাষাতে নেই, সিলেট-চট্টগ্রাম-নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষাতে নেই? কোন সে ঐশ্বর্য যার কারণে ঢাকার আঞ্চলিক বাংলা বরিশাল-রংপুর-দিনাজপুরের আঞ্চলিক বাংলাকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের প্রমিত ভাষা হবে?”

    – সুহৃদ জাকিরের এই প্রশ্নের উত্তর কি তাঁদের কাছে আছে?

  3. মুহিম মনির says:

    ‘এক অঞ্চলের গালি আরেক অঞ্চলের বুলি’। আঞ্চলিক ভাষার এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই প্রধানত প্রয়োজন পড়ে প্রমিত ভাষার।’ তাঁর এ কথার সঙ্গে সঙ্গত কারণেই একমত। বেশ ভালো লাগল তাঁর এই যৌক্তিক কথাগুলো–‘যারা বুড়িগঙ্গার তীরের ভাষাকে বাংলাদেশের মান ভাষা হিসাবে প্রতিস্থাপিত করতে চান, তাদের উপরই এই দাবির যৌক্তিকতা প্রমাণের দায়িত্ব বর্তায় যে কেন ঢাকা-ময়মনসিংহের ভাষাকে মান ভাষা হিসাবে আমাদের মেনে নিতে হবে? কোন সে বিভায় এই আঞ্চলিক ভাষাটি বিভামণ্ডিত, যা কিনা যশোর-খুলনার ভাষাতে নেই, রাজশাহীর ভাষাতে নেই, পাবনা-বগুড়ার ভাষাতে নেই, সিলেট-চট্টগ্রাম-নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষাতে নেই? কোন সে ঐশ্বর্য যার কারণে ঢাকার আঞ্চলিক বাংলা বরিশাল-রংপুর-দিনাজপুরের আঞ্চলিক বাংলাকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের প্রমিত ভাষা হবে?’

    প্রিয় কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদারের এই অনবদ্য লেখাটি পড়ে অনেককিছু জানতে পারলাম। লেখকের উদ্দেশে অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞতা।

  4. Quader Mahmud says:

    জাকির তালুকদারের এ নিবন্ধটি সুচিন্তিত, সুগঠিত ও সুলিখিত। বক্তব্য স্পষ্ট ও সরল। যুক্তি অকাট্য। সাধু কি চলতি -সব ভাষারই নিয়ম আছে। সবে তা মানে। আর তাই ভাষার একটা ধারা বা প্রবহ থাকে। ভাষা নদীর মতো। আর নদী যেমন বহু, ভাষাও তেমন অনেক। একই মাটির সব নদী যেমন এক নয়, তার ভাষাগুলো এক নয়। বাংলা হলেও, বাহের দেশের ভাষা আর কুট্টি ভাষা এক নয়। তবে এই যে সব আঞ্চলিক ভাষা, এরাই হচ্ছে মূল ভাষার প্রাণ। কোনো মূল বা মান বা প্রমিত ভাষা কারো আঞ্চলিক ভাষা নয় বটে এটাই সকলের সার্বজনীন। নিজ নিজ আঞ্চলিক ভাষা বজায় রেখে, ধরুন, একজন সিলোডীর সাথে একজন চাঁটগাইয়া কী করে কথা বলবেন? না পারলে হবে বিচ্ছিন্নতা। বরং তখন কথা বলতে হলে লাগবে মান বা প্রমিত ভাষা। যা সবাই বুঝতে পারবে। যাঁরা ভাবেন বাংলাদেশে আইন করে স্বতন্ত্র প্রমিত ভাষা চাপাতে হবে, তাঁরা ক‘দিন পশ্চিমবঙ্গ থেকে ঘুরে এলেই টের পাবেন ওখানকার ভাষা-নদী কত ভিন্ন্ হয়ে উঠেছে। বৃটিশ ইংরেজি, আমেরিকান ইংরেজি– অস্ট্রেলীয়, কানাডীয়, ভারতীয়– ইংরেজি কি এক? কোন্ আইনে এরা ভিন্ন হলো? ভাষার নিজস্ব প্রবহমানতায়। সেটা অপ্রতিরোধ্য।
    কাদের মাহমুদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.