স্মৃতি

মুহম্মদ খসরু সম্পর্কিত স্বল্পদৈর্ঘ্য

ইকবাল করিম হাসনু | 1 Apr , 2019  


১.সূচনাদৃশ্যের আখ্যান

“দেশে আইবা কখন? দেখা হবে না?”
বললাম: ডিসেম্বরের দিকে সম্ভাবনা আছে।
“ধুর মিয়া, অদ্দিন কি বাঁচমু নাকি?”
বললাম: বাঁচবেন না কেন? কেন কী হয়েছে?
“কী একটা রোগ আছে না? ট্রিটমেন্ট নাই। তোমাগো ওইহানেও। অ্যালঝাইমার.. অ্যালঝাইমার..”
কথা আরও হয়েছিল দূরালাপনে। জানুয়ারির ২০ তারিখ, রোববার। অনেক মাস পর কথা হচ্ছিল। তাঁকে উৎসর্গ করা চলচ্চিত্র সংক্রান্ত আমার প্রথম বই নিবন্ধ চলচ্চিত্র -এর কপি অবশেষে তিনি গ্রহণ করেছেন এবং পেয়েছেন জানালে আমার ঘাড় থেকে অসোয়াস্তির বেড়ালটা নেমে পড়লো। বুঝলাম তাঁর সংগত অভিমানের রেশটুক আর তিনি ধরে রাখতে চাইছেন না। বরং অতীতের মতোই আমার বোধের অতীত কী এক স্নোহাধিক্যের পরশে আলাপ জুড়ে দিলেন। গদারের সর্বশেষ চলচ্চিত্র ইমেজ বুক নিয়ে আমার উচ্ছ্বাস, তা দেখবার জন্য তাঁর তীব্র আকাঙক্ষা এবং স্বপ্নের নির্মীয়মান চলচ্চিত্র কেন্দ্রের জন্যে ছবি জোগাড় করার ফরমাশ নিয়ে কত কথা!
পরদিনই তো তিনি বুকের ব্যথা নিয়ে ঢাকার ইব্রাহিম হৃদরোগ চিকিৎসাকেন্দ্রের নিবিড় পরিচর্যা বিভাগে শয্যা নিলেন। সেই যে শয্যা নিলেন আর সপ্রাণে ফিরতে পারলেন না তাঁর রোহিতপুরে। গেলেন শেষযাত্রার লাশ হয়ে অভাগা জাতির প্রথম ও শেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য আদায় করে। এক স্বশিক্ষিত, আজীবন নির্লোভ, বিত্ত-ক্ষমতা-প্রতিপত্তি এবং কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার বা সম্মামনা কিংবা প্রচারলাভে অনীহ মুহম্মদ খসরুর মরদেহ বিদায়কালে যেন অপরাজেয় বাংলা-র পাদদেশে লজ্জায় অবনত করলো দেশের সেরা বিদ্যাপীঠ এবং দেশের সাংষ্কৃতিক অঙ্গনের বিদ্বৎজনদের।

২.বিষয়: মুহম্মদ খসরু
[এই অংশটি পূরণ করতে পারেন যে কেউই। আমাদের মতো পোড়া দেশে যাঁরা কখনো কৃতীব্যক্তিকে তাঁর জীবদ্দশায় যথাযথ স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ হন তাঁরাই হয়তো ঝাঁপিয়ে পড়বেন পূরণ করতে। অন্যদিকে সেই কৃতী ব্যক্তির আলোকচ্ছটায় তরুণ প্রজন্মের কেউ যদি এগিয়ে আসে তো তাহলে আক্ষেপের তালিকা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এই অংশের বিস্তৃতি যেহেতু পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনি চলচ্চিত্রের মতো নয় তাই ব্যক্তিগত পরিচয়ের আখ্যানটুকু নিষ্প্রয়োজন। ]

৩.সমাপনীদৃশ্যের আখ্যান
টরেন্টো ফিল্ম ফোরামের উদ্যোগে ১লা মার্চ আয়োজিত পূর্বনির্ধারিত মৃণাল সেন (চলচ্চিত্রকর মৃণাল সেন প্রয়াত হলেন ২০১৮ সালের শেষ দিনে) স্মরণানুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হল খসরু ভাই স্মরণেও আলোচনা। মৃণালের মৃত্যুর পর একমাস ধরে ইউটিউব ও নানা দৃকমাধ্যমে তাঁর সম্পর্কে নানাজনের আলোচনা, মূল্যায়ন, বিভিন্নজনকে দেওয়া মৃণালের একাধিক সাক্ষাৎকার দেখতে দেখতে ভাবছিলাম খসরু ভাই সম্পাদিত ধ্রুপদী-র ৫ম সংকলনে প্রকাশিত মাহবুব আলমের নেওয়া মৃণালের দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটির কথা। মৃণালের চলচ্চিত্র ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশ থেকে এরকম বিস্তৃত আলোচনা সম্ভবত এই প্রথম। ফোরামের মনিস রফিকের অনুরোধে স্মরণানুষ্ঠানে খসরু ভাই সম্পার্কে আমাকে কিছু বলতে হবে। কিছু বলার জন্যে থরোল্ড থেকে ২০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে আসবেন খসরু ভাইয়ের দীর্ঘদিনের সহচর দিনু বিল্লাহও। সেই ১৯৭৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত খসরু ভাইয়ের সান্নিধ্যে আমি নানাভাবে আলোকিত হয়েছি। অন্যদিকে যে দুটি বাংলা চলচ্চিত্র দেখার মাধ্যমে কলকাতার প্রথম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রোৎসবে দর্শক হিসেবে আমার অভিষেক হয় তার একটি মৃণালের চালচিত্র, অন্যটি অপর্ণা সেন-এর থার্টিসিক্স চৌরঙ্গি লেইন। স্মরণানুষ্ঠানে বলার জন্যে কত কথাইতো মাথায় ভিড় জমায় কিন্তু অল্প কথায় কী করে এই দুই ব্যক্তির সমাপতন ঘটাই? এরকম ভাবনাচিন্তার জটাজাল থেকে রেহাই পেতে খসরু ভাইয়ের বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন বইটি হাতে নিয়ে দেখি চোখের সামনেই জ্বলজ্বল করছে অভাবনীয় এক উৎস!
স্মরণানুষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত আলেচানায় যা বলেছিলাম তারই পুনরাবৃত্তি করে বলছি: বাংলাদেশের মতো সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন যে দু’জন স্বশিক্ষিত ব্যক্তি জনগণের সাংস্কৃতিক চেতনাকে আলোকিত করে গেছেন তাঁদের একজন আরজ আলী মাতুব্বর, অন্যজন মুহম্মদ খসরু। আরজ আলী দিয়ে গেছেন যুক্তির আলোয় প্রথাগত শাস্ত্রকে প্রশ্ন করার শিক্ষা আর মুহম্মদ খসরু চেষ্টা করে গেছেন সর্বকনিষ্ঠ শিল্পমাধ্যম চলচ্চিত্র নিয়ে চর্চা, অধ্যয়ন ও দীক্ষার ব্যাপারে সমাজের সর্বস্তরে, বিশেষ করে বিদ্যায়তনিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের বিদ্বৎজনদের মধ্যে সচেতনতা জাগাতে। বাম প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতি মুহম্মদ খসরু বা মৃণাল সেন-এর আনুগত্যের কথা ছেড়ে দিলেও আরও একটি ব্যাপারে আশচর্য এক সমাপতন আমার নজরে পড়ে। ক’জন চলচ্চিত্রকারের সাক্ষাৎকার ছাড়া খসরু ভাইয়ের বেশিরভাগ লেখাজোখার অংশ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দেলনকে ঘিরে। চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা নিয়ে তাঁর গভীর বোধের লিপিভাষ্য যে ছবিটি নিয়ে মৃণাল সেনও এক সাক্ষাৎকারে প্রশ্নকর্তার উত্তরে বেছে নিয়েছিলেন সেই একই ছবিটিকে। মৃণালের মতে তাঁর জন্যে এটি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র যা তিনি বারবার দেখতে চাইবেন। ছবিটি হচ্ছে দিনেমার চলচ্চিত্রকার কার্ল ড্রায়ারের নির্বাকযুগের দ্য প্যাশন অব জোন অব আর্ক । আমি দেখাতে চাই খসরু ভাইয়ের চলচ্চিত্রবোধের ঠিকানা। তাই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন-এ মুদ্রিত দ্য প্যাশন অব জোন অব আর্ক সম্পর্কে তাঁর লেখা থেকে পড়তে গিয়ে বললাম, ১৯৭৫ সালে ধ্রুপদি এই চলচ্চিত্র দেখার ২৮ বছর পর খসরু ভাই লিখতে গিয়ে বলছেন : “২৮ বছর অতিবাহিত হতে চলেছে এই ছবির স্মৃতি হৃদয়ে এখনো অম্লান। …একটি দৃশ্যে, যা আমার আমৃত্যু হৃদয়ে গেঁথে থাকবে, তা হল জোয়ানকে যখন পুড়িয়ে মারার আদেশ দেয়া হল, তাঁর হাত-পা বাঁধা, অসহায়, মুমূর্ষু জোয়ানকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বধ্যভূমিতে, তাঁর ঘর্মাক্ত ছোট কেশরাশিকে খুর দিয়ে মুড়িয়ে দেয়া হল আমাদের সম্মুখে, তাঁর কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুধারা, ঠোঁট কাঁপছে তাঁর থরথর করে। এই অন্যায় অপবাদ এবং অবিচারের বিরুদ্ধে তিনি কঠিন প্রতিবাদ রেখে যান চোখে দু’ফোটা অশ্রুবিন্দু দিয়ে। দুঃখ-বিষাদে ভারাক্রান্ত মুখমণ্ডল আর অশ্রুসিক্ত চোখের বিশাল ক্লোজ-আপের মাধ্যমে ড্রায়ার এখানে এক অসাধারণ মন্তাজ সৃষ্টি করেন, নৈঃশব্দ্য হয়ে ওঠে শব্দময় দ্যোতনা, আমাদের হৃদপিণ্ডের স্পন্দনে এবং ধমনীর রক্তে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আইজেনস্টাইনের ওডেসা সিঁড়ির দৃশ্যমালার পর এ ধরনের শিল্পগুণে তাৎপর্যমণ্ডিত দৃশ্য রচনা আর হয়েছে বলে আমার জানা নেই।”
উদ্ধৃতাংশটি পড়ার পর বললাম: মুহম্মদ খসরুকে বুঝতে হলে এই চলচ্চিত্রবোধের খোঁজ নেওয়া ও চর্চাই হবে আমাদের পাথেয়।
Flag Counter


2 Responses

  1. আবেদীন কাদের says:

    Hasnu: You have written really an excellent piece on Khashru Bhai. Thanks.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.