বিচিত্র

মনুষ্যত্বের শিকড়

আনন্দময়ী মজুমদার | 3 Apr , 2019  


কৃতজ্ঞতা আর শুভাকাঙ্ক্ষা – আজকের দিনের অব্যর্থ ওষুধ। আমার বাবা কারো সঙ্গে সংঘাত হলে, কেউ রেগে উঠলে, কেউ মাথা খারাপ করে দুটো অনিষ্টকারী কাজ করলে তার প্রতি মনে মনে দরদ ও শুভ কামনা অভ্যেস করেন।
অর্থাৎ, সঙ্গে সঙ্গে ক্ষেপে উঠে প্রতিক্রিয়া করে নিজের শক্তিকে নেতিবাচক ভাবে রেগেমেগে খরচ করে, চারদিকে নেগেটিভিটি ছড়িয়ে দেওয়া থেকে নিজেকে বাঁচান।
এই জন্য এই মানুষটাকে দেখে মনে হয়, তাঁর চারদিকে একটা আলো জ্বলছে।
পাগলা হাতি এসে তাঁর কাছে নতজানু হয়ে যাবে, যেন এমন।
আমি কোনো এক সময় আমার নরম মনের কারণে এবং বিশ্বাসী সংবেদনের কারণে কিছু মানুষের পাল্লায় পড়ি যারা নিজেদের গন্ডীটুকু ছাড়া আর কিছুই বুঝতে পারতেন না। নিজেদের বিচারবিবেচনাকে শেষ কথা বলে ভাবতে ভাবতে তার বাইরে যারা, তাদের বেকায়দা, বেচাল মনে করতেন। তাই ‘অন্য রকম’ লোকদের তারা নিরস বিচারবুদ্ধি দিয়ে বিচার করতেন। যারা এর মধ্যে একটু বুদ্ধিমান তারা সরাসরি কিছু না বল্লেও কাজেকর্মে এই অসংযোগ প্রখরভাবে তুলে ধরতেন।
দুনিয়ায় সেরকম লোকজন সব সময় আছে। সমাজ ও পরিবেশ এরকম একপেশে মানসিকতা অহরহ তৈরি করছে যারা নিজেদের দৃষ্টিকোণকে বরাবর শেষ কথা বলে ভাবেন।
নিজেদের মাপের বাইরে আর কারোকে আমলে নেন না।
একেই বুঝি সামাজিক বৈষম্য বলে!
ভিন্নজনের পায়ের জুতো পরার স্বভাবটা আমা্দের ছোটো থেকে কিছুটা ছিল বলে আমি কল্পনা করে নিতাম অন্যদের দুঃখ-দুর্দশা, আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন-সুখ, বিস্ময়-আন্তরিকতা, খুশি ও কৌতূহল।
এই বিষয়টাকে আজকের বিজ্ঞান খুব জরুরি মনে করছে।
অন্যদের পায়ের জুতো পরে নেওয়াকে বিজ্ঞান বলে এম্প্যাথি। এই এম্প্যাথি হল অংক বিজ্ঞান ভাষা শেখার চেয়ে জরুরি শিক্ষা, আজকের আধুনিক শিক্ষার দিগগজরা তেমন বাতলেছেন।
এম্প্যাথিকে আসলে মনুষ্যত্বের সঙ্গে এক করে দেখা যায়। যার এম্প্যাথি বা সহমর্মিতা নেই, তার আর থাকল কি? সে নিজের চাকায় ঘুরে ঘুরে নেহাত একটা সরু জীবনের এক ডাইমেনশনের মধ্যে থাকতে বাধ্য। বাইরে যত চাকচিক্য থাক, আসলে তার কলুর বলদের মত অবস্থা।
যার বেশি এম্প্যাথি আছে, সে বলা চলে সব প্রাণের সঙ্গে সহজ একাত্মতা অনুভব করতে পারে। একটা হাঁস, একটা পেঁচা, একটা তিমি মাছ, একটা হাতি, একটা গাছ, একটা শিশু, একটা বুড়ো মানুষ, একটা পোয়াতি মহিলা, একটা মা, একটা বাবা, একটা নেতা, একটা রিক্সাওয়ালা, একটা গৃহকর্মীর মাথা ও হৃদয়ের মধ্যে আসন গ্রহণ করতে পারে।
‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা, মনে মনে’।
এই গভীর কল্পনার জন্যই আজ যে ছেলেটা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেল তাঁকে আমাদের ঘরের ছেলের মত আপন মনে হচ্ছে। আমাদের কান্না পাচ্ছে। রাগ হচ্ছে। কষ্ট হচ্ছে ভীষণ যা বলে বোঝাতে পারছি না আমরা।
যা হোক সমবেদনা আর সহমর্মিতা মানুষের প্রধান গুণ, সেটাই তার মনুষ্যত্বের শিকড়। যার সহমর্মিতা নেই, তার গোড়া নেই বললে চলে।
কিন্তু কিছু কিছু ম্যাল-প্র্যাক্টিস অর্থাৎ আনমনা অদক্ষ স্বভাব, এই দরদকে বুকের ভিতরে জল না ঢেলে ঢেলে শুকিয়ে ফেলতে পারে।
বাগানের গোলাপ ঝাড়টা যেদিন শুকিয়ে যায় সেদিন বুকের মধ্যে কেমন খাঁ খাঁ করে।
অনেক দিনের বটবৃক্ষ যেদিন কেটে ফেলা হয় মনে হয় আমরা তার সঙ্গে মরে গেলাম।
কিন্তু বুকের শিকড়ে জল ঢেলে নিজেদের এম্প্যাথি অর্থাৎ মনুষ্যত্ব বাঁচিয়ে রাখার জন্য বাইরের কাউকে লাগে না, নিজেকেই লাগে।
আমরা আমাদের মালি।
এই এম্প্যাথির একটা বড়ো শত্রু হল ভয়। নিঃসঙ্গতা। বিচ্ছিন্নতা।
যারা ভয়কে জীবনের অবিচ্ছেদ্য পার্টনার করে তুলেছেন, একে ড্রাইভার সিট দিয়ে রেখেছেন, ভয় তাদের নানা অবাস্তব জগতে নানা হয়ে-না-ওঠা ভুতুড়ে জগতে নিয়ে যায়। সেই অবাস্তব আমাদের খুশি করে না, সেই ভুতুড়ে জগত আমাদের আরো ভয় দেখায়। একেই বুঝি বলে ক্রনিক ডিপ্রেশন।
সুকুমার রায় বেশ একটা লেখা লিখেছেন বাচ্চাদের নিয়ে এটার ওপর। যারা ভয়কে প্রশ্রয় দেয়, তাদের চোখেমুখে ভয়ের উল্কি লেখা থাকে।
তারা বড়ো বেশি গম্ভীর। বড়ো বেশি স্পর্শকাতর। বড়ো বেশি অভিযোগপরায়ন। বড়ো বেশি অকৃতজ্ঞ। তারা ভিকটিম মেন্টালিটির। তারা হিংসাপরায়ন। তারা অস্থির। তারা বেসামাল চিন্তা করেন। তারা দুর্বল।
এম্প্যাথির শিকড় শুকিয়ে না ফেলার জন্য একটা পথ আছে। ভয়ের কণ্ঠস্বরকে লক্ষ্য করা। আর ভয় যেই মাথা উঁচু করছে তখন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে এই মুহূর্তে কী কী ভালো ঘটছে, কী কী বিস্ময়কর ঘটছে, কী কী টেকেন ফর গ্র্যান্টেড নিয়েছি, যা কিনা না-ও ঘটতে পারত, তা মনে রাখা, বারবার।
তা অক্সিজেন নেওয়ার মত, বেঁচে থাকার মত মৌলিক সরল ব্যাপারও হতে পারে। আজকে আমি বেঁচে আছি। দুই চোখ ভরে দেখছি। আমার কলিজা ধুকপুক করছে। একটা গাছে বাতাসের শব্দ আমাকে শুশ্রূষা দিচ্ছে। একটা কোকিল ডাকছে। মরুভূমি থেকে আসা মানুষের মত সবুজকে দেখি। কত সবুজ! কত স্বচ্ছতা! কত প্রাণ!
এই অভ্যেস একটা কাচের বয়ামে লাল নীল সোনালি মার্বেল ভরে রাখার মত। সেগুলোর দিকে ঘুরে ফিরে তাকালেই আমাদের মনে আনন্দ খুশি আর কৃতজ্ঞতা তৈরি হয়।
বুঝতে পারি, কারো, কিছু্‌র, সাধ্য নেই আমার এই খুশি এই শান্তি এই কৃতজ্ঞতা কেড়ে নেয়।
জীবনের আশা অপার। আনন্দ অপার। আমাদের স্বরূপ আনন্দময়। শান্তিময়। শক্তিময়।
এমনকি এক পর্যায়ে দুশমনকে আর দুশমনের মত লাগে না। মানুষ বলে মনে হয়। ভাঙা টুটাফ্টা কষ্ট পাওয়া অদক্ষ মানুষ। ভঙ্গুর মানুষ। তাকেও জড়িয়ে ধরে একটা হাগ দেওয়া যায় (অবশ্যই তার আগে ভালো মত সীমানা দিয়ে পাঁচিল দিয়ে শান্তিকে রক্ষা করে তবেই)।
ক্ষমা মানে পুরনো ভুল আবার করা নয়। ক্ষমা মানে নিজেদের মনের ভিক্টিম মেণ্টালিটি থেকে নিজেকে রেহাই দেওয়া। মুক্ত স্বাধীন হওয়া।
লজ্জা ঘৃণা ভয় এগুলো শরীরের জন্য ক্যান্সার স্বরূপ। দেখবেন বেশি নেগেটিভ মেন্টালিটির মানুষের মধ্যে রাগ/ভয় জমা হতে হতে অসুখ তৈরি করছে।
রাগ ক্ষোভ ভয় থেকে দূরে থাকুন। এসব রিসাইকেল করে সমঝোতা আর ভালোবাসা আর ক্ষমা তৈরি করে নিন।
আপনার ভালো থাকার মহৌষধ আপনার কাছে। আর কারো কাছে নেই।
আপনার খারাপ থাকার জন্য আপনি অন্যদের দায়ী করলে সমাধান আসবে না। আরো সংকট তৈরি হবে। কারণ আপনার অন্তরাত্মাকে প্রশ্ন করে দেখতে পারেন কোনো এক সুক্ষ্ম সুস্থ মুহূর্তে, আপনি অন্যকে দায়ী করে কি সুখে আছেন? সে জবাব দেবে, না।
আপনার নেগেটিভিটির দায় আপনাকে নিতেই হবে।
নাহলে তা আপনার সন্তানের ওপরও তা বর্তাবে।
আসুন, পরচর্চা আর পরনিন্দা থেকে নিজেদের বাঁচাই। অন্যদের বাঁচাই।
নিজে সৎ আন্তরিক আর নিজের কাছে স্বচ্ছ থেকে কৃতজ্ঞতা অভ্যেস করে, ভালোবেসে নিজেকে সুস্থ রাখতে চেষ্টা করছেন কিনা, সেটাই দেখুন।
অভিযোগ আর নেগেটিভিটি দুর্বল অদক্ষ পলায়নবাদীদের রাস্তা। আপনি তো মানুষ। মানুষের মত ঝকঝকে হৃদয়বান ক্ষমাশীল শান্তির নীড় হন।
আমাদের দুনিয়ার জন্য শান্তি খুব দরকার।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.