অনুবাদ গল্প

বেসি হেড-এর গল্প: লাইফ

তনিমা মাহমুদ অন্তরা | 28 Apr , 2019  

লেখক পরিচিতি: বেসি হেড ( ১৯৩৭-১৯৮৬) ১৯৩৭ সালে সাউথ আফ্রিকার পিটারমারিজবার্গ-এ জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন একজন কৃষ্ণবর্ণ আর মা ছিলেন শ্বেতাঙ্গ। বড় হয়েছিলেন পালক বাবা-মায়ের কাছে আর তের বছর বয়সে তাকে চলে যেতে হয় এতিম খানায়। ছোটবেলা থেকে একাকীত্বকে মাত দিতে বই ছিল তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। বই এর এই জগতকে সে বলত-“নিজের চিন্তার বাইরের এক জাদুর পৃথিবী”। তার লেখাগুলোতে খুবই সংবেদনশীল ধর্মীয় আর সামাজিক প্রথাগুলোর বিরুদ্ধে কথা উঠে এসেছে। হেড তার এই ছোট গল্পে রক্ষণশীল পুরুষশাসীত গ্রাম্য সমাজের চিত্র তুলে ধরতে চেয়েছেন। “লাইফ” গল্পটাতে সে তার পরিচিত এক গ্রামের পুরনো সামাজিক প্রথা আর নতুন সামাজিক আচার-আচরনের একটা লড়াই তুলে ধরেছেন।

“ মূল গল্প: বেসি হেড
ভাষান্তর: তনিমা মাহমুদ আন্তরা”


১৯৬৩ সাল, বোটসওয়ানার বংশোদ্ভূত নাগরিকদের বাড়ি ফেরার পালা। কারণ ওই বছর বোটসওয়ানা আর সাউথ আফ্রিকার মাঝে প্রথম সীমানা দেওয়া হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে পাওয়া বোটসওয়ানার স্বাধীনতা কিন্তু তখনও বাকি। ঔপনিবেশিক সময় থেকেই বিশৃঙ্খলা চলে আসছিল, আর এই দুই দেশের মাঝে মানুষের আবিচলিত আসা-যাওয়া চলে আসছিল বছরের পর বছর। বিশেষ করে যারা খনিতে অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে কাজ করত, তাদের খুব অল্প সময়ের জন্য থাকতে দেওয়া হত, কিন্তু অনেক মানুষ ছিল যারা চাকুরীর সুবাদে স্থায়ীভাবে থাকার সু্যোগ পেয়েছিল। এই স্থায়ী বাসিন্দাদেরকেই উৎখাত করা হয়েছিল আর মূলত ফেরত পাঠানো হয়েছিল গ্রামের জীবনে। ফেরত আসার সময়, তারা তাদের সাথে নিত্যদিনের সঙ্গী হিসেবে হালকা কিছু বিদেশী সংস্কৃতি আর শহুরে অভ্যেস নিয়ে এসেছিল। গ্রামের লোকেরা নিজেদের খামখেয়ালে প্রভাবিত হয়; তাদের পছন্দ, কোনটা তাদের জন্য লাভজনক, তাদের গভীর বিশ্বাস – যেমন, বিশ্বাসের- আরোগ্য লাভ হত যে গির্জাগুলোতে সেগুলো দ্রুত দাবানলের আগুনের মত ছড়িয়ে পড়ছিল, যা তাদের জন্য ছিল ক্ষতিকর, তা তারা বর্জন করেছিল। ঠিক তেমনি, লাইফের হত্যাটাও চাপা গলায় প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছিল।
লাইফ দশ বছর বয়সে বাবা মায়ের সাথে গ্রাম ছেড়ে জোহানসবার্গে পাড়ি জমিয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সতের বছর পর লাইফের বাবা -মা মারা যাওয়ায় তাকে গ্রামে ফেরত আসতে হয়েছিল এবং ফিরে এসে জানতে পেরেছিল যে, গ্রামের নিয়ম অনুযায়ী তার গ্রামের বাড়িটি এখনও তারই রয়েছে। লাইফ মোরাপেদি নামটি বলতেই, গ্রামের লোকজন তাকে বিনীতভঙ্গীতে গ্রামের ঠিক মাঝে অবস্থিত মোরাপদি বাড়ির উঠোনে নিয়ে গেল। বাড়ির উঠোনটা জনশূন্যতায় জরাগ্রস্থ হয়ে ছিল। এই জরাগ্রস্থতা ছাড়া উঠোনটি ঠিক তেমনই ছিল যেমনটি ওরা রেখে গিয়েছিল। মাটির ঘরের তালপাতার ছাউনির উপর মাটির ঢিবি করে বাসা বেধেছে পিপড়েরা; ছাদের সাথে যুক্ত কাঠের খুটিগুলো একদিকে হেলে গেছে, কারণ খুটির গোড়াগুলো পিপড়েরা খেয়ে নিয়েছে। রাবার গাছের বেড়াটা অসামঞ্জস্যহীনভাবে বেড়ে উঠেছিল যা কিনা উঠোনে সূর্যের আলো ঢুকতে দিচ্ছিল না, পুরো উঠোন গাছের ছায়ায় অন্ধকার হয়েছিল। বর্ষায় জন্মানো আগাছা আর ঘাসে একাকার হয়ে গিয়েছিল উঠোনটি।
লাইফের ভবিষ্যত প্রতিবেশীরা, একদল মহিলা, তার পাশে দাড়াল।
“ তোমার উঠোন মেরামতে আমরা সাহায্য করব”, তারা অমায়িক ভঙ্গীতে বলল, “ ভাবতেই ভাল লাগছে যে আমাদের গ্রামের মেয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে”।
শহুরে মেয়ের চটপটে স্বভাবে সবাই প্রভাবিত হয়েছিল। গ্রামের লোকেরা স্বভাবতই পুরনো কাপড় পরে, আর সবচেয়ে সুন্দর পোশাকটি তুলে রাখে কোন বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্যে, যেমন- বিয়ে; এমনকি এই তুলে রাখা সুন্দর পোশাকটিও দেখা যায় শুধুমাত্র ছাপ দেওয়া সুতির কাপড় হয়ে থাকে। কিন্তু এই মেয়েটি একধরনের নরম দামি লিনেন কাপড়ের জামা পরত, আর জামাগুলো তার শরীরের গঠন অনু্যায়ী সুন্দর মানানসইভাবে বানাত। মেয়েটি সুন্দর, প্রাণবন্ত, বন্ধুসুলভ স্বভাবের ছিল এবং সে অবাধে জোরে শব্দ করে হাসত। সে উন্মত্তের মত দ্রুতগতিতে কথা বলত যা কিনা তার পুরো ব্যাক্তিত্বকেই ফুটিয়ে তুলত।
“ও আমাদেরকে কিছু আশার আলো দেখাচ্ছে,” কাজের সরঞ্জাম গোছাতে গোছাতে মহিলাটি বলে উঠল। তারা সবসময় এই আলো খুঁজত যা দিয়ে তারা নতুন ধারার চিন্তা করতে পারে আর তাদের সাধারণ আর একঘেয়ে জীবনকে সতেজ করে তুলতে পারে।
প্রতিবেশী এক মহিলা লাইফের বাড়ি ঠিক হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে নিজের বাড়িতে জায়গা দেওয়ার প্রস্তাব দিল। সে লাইফের চকচকে নতুন সুটকেসগুলো হাতে তুলে লাইফকে নিয়ে চলল তার নিজের বাড়িতে। সেখানে অবিলম্বে লাইফকে ঘিরে শুরু হল প্রীতিকর এক নজরদারি- ঘেরাও করে নিচু পায়খানা বানানো হল তার জন্য; হাত ধোয়ার জন্য গামলা ভর্তি পানি নিয়ে একটি ছোট্ট মেয়ে চুপচাপ এগিয়ে আসল; এর পরেই এত বড় সফরের পর তার ক্ষুধা মেটাবার জন্য এলো থালা ভর্তি খিচুড়ি আর মাংস। আরেকজন মহিলা নিড়ানি নিয়ে তড়িঘড়ি করে চলে গেল উঠোনের আগাছা আর ঘাস পরিষ্কার করতে, মাটির ঝুড়ি আর পানির বালতি নিয়ে শুরু হল দেওয়াল লেপা-লেপি, এবং তারা দুইজন কাজহীন লোক খুঁজে বের করল যারা মাটির ঘরের বিপজ্জনক কাঠের খুটিগুলো মেরামত করতে পারে। এগুলো হল এখানকার লোকদের দেখানো কিছু সাধারণ আন্তরিকতা, কিন্তু তারা খুবই খুশি হয় যখন তারা বুঝতে পারে যে নবাগত ব্যাক্তির অফুরন্ত টাকা-পয়সা আছে যা কিনা সে খুবই উদারতার সাথে উড়িয়ে দিতে পারে। উঠোন মেরামতের উৎসবে যা লাগবে তা হল- বড় লোহার হাড়িতে ধীর গতিতে খুব অল্প আঁচে রান্না করা ছাগলের মাংস; গ্রামের লোকদের মতে এই খাবার কাজ দ্রুতগতিতে শেষ হতে সাহায্য করবে। লাইফ ততক্ষনাৎ ছাগল, চা, দুধ,চিনি, যবের কৌটা ইত্যাদি, এমনকি উঠোন মেরামতের শ্রমিকরা যা যা চাইল লাইফ তার সব কিছুর জন্য টাকা বের করে দিল। উঠোন মেরামতের দুই সপ্তাহ বিয়েবাড়ির খানাপিনা চলল, কারণ গ্রামের লোকেরা কেবলমাত্র বিয়েতেই এত বেশি খেয়ে থাকে।
“তোমার এত টাকা হল কিভাবে, মা?” অবশেষে এক মহিলা জিজ্ঞেস করেই বসল।
“জোহানসবার্গে টাকা পানির মত বয়, শুধু টাকা আয় করার রাস্তাটা জানতে হয়।” প্রফুল্লতা আর অট্টহাসির সাথে লাইফ উত্তরটা দিল।
লাইফের এই উত্তরে মহিলাটির কেমন খটকা লাগল। সবাই বলাবলি করতে লাগল যে তাদের নিজেদের বাচ্চারা কিন্তু জোহান্সবার্গে তেমন কোন ভাল জীবন-যাপন করছে না। গ্রাম্যসমাজের মূল ভিত্তি হল- মিতব্যায়িতা আর সততা; এবং সবাই এটা ভাল করে জানে যে কেউ একই সঙ্গে সৎ ও বড়লোক হতে পারে না। তারা প্রত্যেকটা টাকা গুনে রাখে এবং জানে কতটা পরিশ্রমের পর এই টাকাগুলো আসে। টাকার কোনো অফুরন্ত তলাবিহীন কূপের কথা তারা কল্পনাও করতে পারে না। টাকা অবশ্যই শেষ হবে এবং এই আধো-মরুভূমি এলাকায় আবার টাকা কামানোও হবে ঘোর কষ্টের। তারা ধরে রেখেছিল যে লাইফের খুব দ্রুত চাকরি হয়ে যাবে, গ্রামের পোষ্ট অফিসে বুদ্ধিমতী মেয়েদের চাকরি খুব দ্রুতই হয়ে যায়।
জোহানসবার্গ শহরে কালো মহিলাদের জন্য যতরকম কাজের সুযোগ ছিল, লাইফের সে সব ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা ছিল। সে ছিল একাধারে–কন্ঠশিল্পী, সুন্দরের রানী, বিজ্ঞাপনের মডেল আর পতিতা। এই কাজগুলোর একটাও গ্রামে পাওয়া যায় না। গ্রামের অশিক্ষিত মহিলারা সারাদিন খামার আর ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকে, আর শিক্ষিতরা শিক্ষকতা, পরিষেবাকারী এবং দপ্তরির কাজ করে থাকে। প্রথমদিকে লাইফের কৃষিকাজ করা মহিলা আর গৃহবধূদের সাথে ভাব হয়ে ওঠে। প্রচন্ড রক্ষণশীল আর কঠিন গ্রাম্য সমাজের কেন্দ্রবিন্দু তারা। কিন্তু অতি সত্তর তারা লাইফ এর থেকে দূরে থাকতে শুরু করে, কারণ গ্রামের পুরুষেরা লাইফকে তখন নতুনভাবে আবিস্কার করেছিল। এই আশ্চর্য আলোড়নের কারণ হল, লাইফ গ্রামে প্রথম আর একমাত্র মহিলা যে কিনা নিজেকে বিক্রির ব্যবসা খুলেছিল। পুরুষেরা লাইফের কাজের উপর ভিত্তি করে তাকে পারিশ্রমিক দিত। যৌনতা বিষয়ে মানুষের মনোভাব ছিল অবাধ ও উদার- এটাকে মানব জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা হত, চাহিবা মাত্র যেমন খাদ্য আর পানি উপস্থিত থাকে তেমনই এটিও থাকতে হবে, অন্যথায় কারো জীবন প্রদীপ নিভে যেতে পারে কিংবা হতে পারে ভয়ংকর কোন অসুখ। এসব মহাদুর্ঘটনা এড়াতে, পুরুষ ও মহিলারা অনেক অভিগমন করে থাকত কিন্তু তা অবশ্যই সম্মানজনক ও মানবিক পর্যায়ের, তারপর তার সাথে থাকত টাকা-পয়সা খরচের চিন্তা। যখন লাইফের এই ব্যাবসার কথা ছড়িয়ে পড়ল, তখন সে দ্বিতীয় শ্রেণির নারীদের সাথে চলা শুরু করল, যারা গ্রামে মদ তৈরী করত।
মদ্যব্যবসায়ী মহিলারা আমুদে আর প্রীতিকর স্বভাবের, যারা আসলে নিজেদেরকে কিছুদিন আগে সমাজের সকল শাসন হতে মুক্ত করেছে। তারা প্রতিদিন মদ্য পান করত, এবং গ্রামের ভেতর টলটলায়মান অবস্থায় ঘুরে বেড়াত, দেখতে খুবই সহজ-সরল ধরনের মনে হত আর তাদের কোমরের কাছাকাছি থাকত অজন্মা বাচ্চা-কাচ্চা। তারা একজন আর একজনের পিঠে চাপড় মেরে উচ্চস্বরে কথা বলত আর হাসত। তারা নিজেদের মত করে ভাষাও গড়ে নিয়েছিল।
“ ছেলে বন্ধু, ঠিক আছে। স্বামী, ছ্যাঃ ছ্যাঃ, না। এটা কর! ওটা কর! আমরা নিজের মত করে বাঁচতে চাই”।
তারাও কিন্ত গ্রামের সভ্য সমাজেরই অংশ ছিল। অনেক পুরুষলোক তাদের জীবনে এসেছ। তরপরও তারা একমাত্র ছেলে বন্ধুতে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিল। সাধারণ নিয়মটা হল:
“বাবা, তুমি আমাকে সাহায্য কর, আমিও তোমাকে সাহায্য করি”।
এটা শুধুই ধোকা ছিল। পুরুষেরা থাকত, মহিলাদের জিনিসপত্রের উপর নির্ভর করে বাঁচত, এবং এই পুরো সময়টাতে তারা তাদের পকেট থেকে বড়জোর দুই টাকা খরচ করত। তিন মাস পর আসল হিসাব-নিকাসটা করা হত:
“শোন বন্ধু,” মহিলাটি বলে উঠত, “ ভালবাসা ভালবাসার জায়গায় আর টাকা টাকার জায়গায়। আমি তোমার কাছে টাকা পাব”। তারপর সেই প্রেমিককে আর খুঁজে পাওয়া যেত না, কিন্তু তার জায়গায় আসত অন্য এক বজ্জাত। এবং এভাবে চলতেই থাকত। এই মহিলারা লাইফকে নিজেদের রানী হিসেবে পেল, এবং রানীর বিশ্বস্ত অনুসারীর মত তারা তাদের রানীর কাজে কখনোই হস্তক্ষেপ করত না। তারা কখনোই সাহস করে পুরুষদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে পারত না, মূলকথা হল ওরা জানতই না যে কিভাবে টাকা আদায় করতে হয়। সর্বোপরি, তারা লাইফের আঙ্গিনায় সাচ্ছন্দ্য বোধ করত। খুব শীঘ্রই গ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে জোহানসবার্গ শহরের মত একটা হৈচৈ আর হট্টোগোল শোনা যেতে লাগল, যদিও তুলনামূলক ছোট আকারের। একটা ট্রান্সিস্টর রেডিও সারাদিন উচ্চস্বরে বাজত। পুরুষ-মহিলারা চরকির মত এর চারপাশে ঘুরত আর মদ্যপান করত, হাসাহাসিতে ব্যাস্ত থাকত। খাবার ও পানীয়, দুধ আর মধুর মত বইতে লাগল। পাশের গ্রামের লোকেরা এগুলো দেখতে লাগল আর বাঁকা ঠোটে কটুক্তি করতে লাগল:
“ সোদম আর গোমরার মত ওরাও একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে”।
মদ্য প্রস্তুতকারী মহিলাদের মত লাইফেরও নিজস্ব ধাঁচের ভাষা ছিল। যখন লাইফের বন্ধুরা তার আঙ্গিনায় খেতে পাওয়া বিপুল পরিমাণ মাংস, ডিম, কলিজা, বৃক্ক, এবং ভাত দেখে বিস্ময় প্রকাশ করত,- যে খাবারগুলো তারাও যে কোন সময় কিনতে পারত কিন্তু স্বপ্নেও কেনার কথা চিন্তা করত না-, লাইফ তখন হালকাভাবে উত্তর দিতঃ “আমি সবসময় মোটা অংকের টাকা ঘাঁটাঘাঁটি করে অভ্যস্ত”। এ কথা বিশ্বাস করত না কেউ। এমন সৌভাগ্যে তারা কখনোই আস্থা স্থাপন করত না যার ভিত্তি নড়বড়ে। যদিও আসন্ন দুর্ভাগ্য থেকে বাঁচার ক্ষতিপূরণ হিসেবে তারা তাদের খাবারের উচ্ছিষ্টগুলো একসাথে করে রাখত, প্রত্যেক বেলার খাবারের সময় এভাবেই গ্রামের মুরগিরা তাদের উঠোনে লালিত-পালিত হত। গ্রামের লোকেরা লাইফের জীবনদর্শনের যে ব্যাপারটা মনে করে এখনও অস্থির হয়ে ওঠে তা হল-“ আমার আদর্শ হল: প্রাণ খুলে বাঁচো, তরুণ থাকতেই মরো, এবং একটি সুন্দর মরদেহ পাও”। এই কথাগুলো বলা হয়েছিল একজন সাহসী আর স্বাধীন মহিলা হিসেবে যে কিনা সকল সামাজিক বাধা অতিক্রম করেছিল। তার এই মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া চিন্তাকে গ্রামের মানুষেরা কোনদিনও অনুসরণ করে নি।
লাইফের গ্রামে আসার কিছুদিনের ভেতর গ্রামে প্রথম হোটেল আর সেই সাথে মদের দোকান খোলা হল। মহিলারা সাথে সাথেই তা পরিহার করল, এমনকি মদ বিক্রি করা মহিলারাও চিন্তা করল যে তারা এখনও এতটা নিচে নামে নি – কারণ সেই হোটেলে যে কেউ নিজেকে বিক্রি করতে পারত। লাইফের জন্য এটা হয়ে উঠল এক পছন্দের ব্যাবসার জায়গা। ব্যাবসার জন্যে আগামী দিনের সাক্ষাতের সময় নির্ধারণের ব্যাপারটা অনেক সহজ হয়ে উঠল। কোন পুরুষলোকই নিজের আচরণের কথা চিন্তা করছিল না, কিংবা এই হোটেলের কারণে যে অসামাজিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছিল তার কথাও চিন্তা করছিল না তারা। কারণ তারা তাদের সব ধরনের শারীরিক চাহিদা গ্রামের ভেতর বিনা খরচে পূরণ করতে পারত, তবুও তাদের হোটেলের প্রতি আগ্রহের একটা বিশেষ কারণ হল এই কাজের জন্য জীবনে প্রথম তাদের টাকা খরচ করতে হচ্ছিল। তারা সহজেই মঞ্চে উঠে খুব অল্প কথায় লাইফের সাথে ভাবের আদান-প্রদান করতে পারছিল:
“কখন?” লাইফ উত্তর দিত: “দশটায়”। “কখন?” “দুইটায়”। “কখন?” “চারটায়”, এবং এভাবে চলতে থাকত।
এবং সেখানে বাজে কথার রোল আর বাজে অঙ্গভঙ্গি চলতে থাকত। এগুলো ছিল লাইফের উত্তেজনাপূর্ণ জীবনের এক অপরিহার্য অংশ। চকচকে আর উজ্জল কালো চোখগুলো হোটেলের পুরো জায়গাজুড়ে ঘুরে বেড়াত, সবকিছুই খুঁজত আবার কিছুই খুঁজত না।
এক বিকেলে হোটেলে মৃদু পায়ে মরণ হেঁটে এলো। সে ছিল, লেসেগো, একজন খামার মালিক, তিনমাস হল পাশেই অবস্থিত নিজস্ব খামারে কাজ করছে। গ্রামের ভেতর পুরুষেরা তাদের একটা নিজস্ব ও আলাদা পরিচয় গড়ে তোলে, আর লেসেগো ছিল অন্যতম একজন সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিত লোক। লোকে বলাবলি করত- “যখন লেসেগোর কাছে টাকা থাকে আর তোমারও টাকার প্রয়োজন তখন সে তোমাকে তার সবটুকু দিয়ে দিবে এবং সেই টাকা ফেরতের জন্য কখনই সে ঝামেলা করবে না…”। সে আরো কিছু কারণে সম্মানিত ছিল- দানশীলতা আর ভিন্ন ধারার চিন্তার জন্য। কোন একটা ঝামেলার মীমাংসা বা সত্যতা বিচার করতে স্বভাবতই সবাই হিমসিম খেয়ে যেত। সে মাথা ঠান্ডা রাখার উপায় জানত এবং পুরো কথা শুনে সে চূড়ান্ত বিচার করত: “ আচ্ছা, এই বিষয়ের সত্যতা হল…” সে অন্যতম সফল খামার মালিক যার ব্যাংকে সাত হাজার টাকা ছিল। সে গ্রামে আসার পর থেকেই অযথা ঘুরে বেড়াত আর গল্পগুজব করত কিংবা গ্রাম্য সালিশি দরবারের কর্মসূচিতে যোগ দিত, যাতে লোকে বলতে পারে: “ হুম, আমাকে নিজস্ব একটা ব্যাবসা খুলতে হবে। লেসেগোর মত আমার যে ব্যাংকে অত টাকা নেই”।
বরাবরের মতই, উজ্জল তীক্ষ্ণ চোখগলো হোটেলের চারকোনা চষে বেড়াচ্ছিল। বিকেলবেলা দ্বিতীয়বারের মত আবারো যখন চোখগুলো এমন ঘুরছিল, প্রত্যেকবারই একই জায়গায় এসে থেমে যাচ্ছিল। সেটা ছিল কৃশ, কালো আর আবেগে ভরা লেসেগোর মুখখানা। হোটেলে আর কোন পুরুষের মুখাবয়ব এমন ছিল না, অন্যসবার চেহারা ছিল লাজুক আর অন্তঃসারশূন্য ধরনের। জোহান্সবার্গের যে সন্ত্রাসীদের সাথে লাইফ যুক্ত ছিল, অনেকদিন পর, কিছুটা হলেও তাদের মত কাউকে খুঁজে পেল সে, ঠিক যেন একইরকম হীন, যার মধ্যে ছিল লাভজনক ইঙ্গিত, আর সেই একই ক্ষমতা আর প্রতিপত্তি। তার কাছাকাছি সব পুরুষলোক চুপচাপ বসেছিল এবং খুব আন্তরিক ভাষায় নীচু গলায় কথা বলছিল। তারা সারাদিনের ঘটে যাওয়া খবরগুলো নিয়ে আলোচনা করছিল যেগুলো দূরের খামারগুলোতে পৌঁছায় না। যখন বাকি সব লোকেরা তার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, এবং তৃতীয়বারের মত তার উজ্জল তীক্ষ্ণ চোখগুলো চারিদিকে তাকাতেই লেসেগো উঠে দাড়াল, হালকাভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে মাথা ঝাকিয়ে নীরব হুকুম দিল:
“ এদিকে আস”।
লাইফ তৎক্ষণাৎ হোটেলের আর এক প্রান্তে তার কাছে ছুটে গেল।
“হাউ!” আশ্চর্যজনক এক স্নেহপূর্ণ কন্ঠে সে বলে উঠল এবং এক ঝলক মৃদু হাসি ফুটে উঠল তার গম্ভীর কালো চেহারায়। এটা হল লেসেগোর পুরো চরিত্র, সে একজন দয়ালু আর আবেগপ্রবন মানুষ, সে মহিলাদের সঙ্গ ভালবাসে আর তার কর্মক্ষেত্রে বিশাল সফলতার জন্য সে তার কর্তৃত্ব আর সাফল্যকে সবচেয়ে বড় করে দেখে। তারা দুজন কিন্তু দুজনকে নিজের দুনিয়া থেকে দেখছিল আর এক সর্বনাশা পরিণতিতে পৌঁছাচ্ছিল- লাইফ তার ভেতর গুণ্ডাদের মত ক্ষমতা আর পুরুষত্ব দেখল; আর লেসেগো পুরো নতুন ধরনের এক সজীবতা আর কৌতূহল খুঁজে পেল লাইফের মধ্যে। একসময় সে তার পুরনো সম্পর্কের সব মহিলাদের ছেড়ে দিল কারণ ওদেরকে একঘেয়ে লাগছিল, এবং এই একঘেয়ে জীবন-যাপন করা আর সবার মত লেসেগোও লাইফের খিচুনী তোলা হাসির দিওয়ানা হয়ে গেল।
তারা উঠে দাড়াল আর তড়িঘড়ি করে চলে গেল। হঠাৎ এক নীরবতায় ছেয়ে গেল হোটেলটি। লোকেরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল, এবং এই নীরবতা বলে দিচ্ছিল যে তারা বুঝে গেছে লাইফের অন্যসব সাক্ষাৎ আজ বন্ধ। কারণ আজ লেসেগো আছে তার সাথে। সবার মনের অবস্থা দেখে লেসেগোর এক বন্ধু, সিয়ানা বলে উঠল:
“ আমাদের মত লেসেগোও এই নতুনত্বের স্বাদ নিতে চায়। যখন সে বুঝবে এর গোড়াতেই গলদ তখন সে আর বেশিক্ষণ থাকবে না”।
কিন্তু সিয়ানা পরবর্তীতে বুঝতে পেরেছিল যে সে আসলে তার বন্ধুকে পুরোপুরি চিনতেই পারেনি। এক সপ্তাহ যাবত লেসেগোকে তার আড্ডায় পাওয়া যাচ্ছিল না এবং যখন সে আবার উদয় হল তখন সাথে নিয়ে এলো তার বিয়ের খবর। নীরব শত্রুতার সাথে খবরটা গ্রহণ করা হল। কেউ কিছুই বলছিল না, কারণ অসম্ভব কিছু হওয়ার মত যেন সবার চোখের সামনে পাপ হচ্ছিল। সিয়ানা বরাবরের মতই নিজেকে লেসেগোর মুখপাত্র হিসেবে তুলে ধরল। লেসেগোর বাড়ি গোটিয়া গ্রামে, সেই গ্রামে যাবার পথে সে ওত পেতে থাকল:
“ তোমার ব্যাপারে গজব শুনে আমি খুবই অবাক হয়েছি, লেসেগো”, সে স্পষ্টভাবে বলল। “ তুমি ওই মেয়েকে বিয়ে করতে পার না। ও একটা ভয়ঙ্কর খারাপ মেয়ে”।
লেসেগো একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর শান্ত আর উদাসীনভাবে বলল, “ এখানে কে আছে যে খারাপ নয়?”
সিয়ানা তার কাঁধ ধরে ঝাঁকি দিল। ঘটনা অনেক দূর এগিয়ে গেছে, কিন্তু যেটা চলছিল দুজনের মাঝে তা মোটেও টাকার লেনদেন নয়, ওটা মানবিক ব্যাপার ছিল; কিন্তু এভাবে কি কোন ভাল কিছু হতে যাচ্ছিল? লেসেগো সাবলীলভাবে যুক্তিতর্কের সাহায্যে সব বুঝিয়ে বলছিল। যখন তারা দুজন হাঁটছিল সিয়ানা অনেকবার তার মাথা নেড়ে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে যাচ্ছিল যেগুলো লেসেগোর থেকে লুকোনো হয়েছিল। কিন্তু সবশেষে লেসেগো হাসিমুখে বলে দিয়েছিল, “ ও আমাকে ওর সব বাজে কাজের কথা বলেছে। ও এখন আর ওগুলো করে না”।
সিয়ানা কোনমতে ঠোঁট চেপে নিজেকে চুপ রেখেছিল।
লাইফও বিয়ের পর তার সকল মদ্য ব্যবসায়ী বন্ধুবান্ধবদের বলে দিয়েছিল, “আমার আগের সব কাজ বন্ধ। কারণ এখন আমি একজন নারী”।
তাকে তখনও হাসি-খুশী আর হো হো করে হাসতে দেখা যেত। সবকিছুই তার কাছে খুব সহজেই চলে আসত- পুরুষলোক, টাকা, আর সবশেষে বিয়ে। মদ্য ব্যবসায়ীরা খুব তাড়াতাড়িই বিস্মিত হল ঠিক যেমনটা তারা তার উঠোনে খাওয়া ডিম আর মাংস দেখে হয়েছিল। কত মহিলা যে আছে গ্রামে যারা লেসেগোর জন্যে কেঁদে ভাসিয়েছে! লাইফ সত্যই মিষ্টি কথায় মানুষ ভোলাতে পারত।
তাদের জীবনযাপন, বিশেষ করে বিয়ের পর লেসাগোর জীবনে তেমন কোন পরিবর্তনই দেখা যাচ্ছিল না। সে তখনও গ্রামের ভেতর আড্ডা মেরে বেড়াত। তার উপর বর্ষাকাল খামার মালিকদের জীবনে স্বস্তি বয়ে আনল কারণ এই সময় গৃহপালিত পশুদের জন্যে পর্যাপ্ত পানি আর খাবার পাওয়া যায়। লেসেগো অতটা দয়ালু ব্যক্তি ছিল না যে বাড়ির কাজে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বে এবং এই সময়টাতে সে বাড়ীর ব্যপারে শুধুমাত্র তিনটা নিয়ম ঘোষণা করল- সে সব টাকা পয়সার ভার গ্রহণ করবে, লাইফের কোন টাকার দরকার হলে সে তার কাছে চাইবে এবং এই টাকা কেন দরকার তা বর্ণনা করে বুঝিয়ে বলতে হবে। সবশেষে সারাদিন ধরে ট্রাঞ্জিস্টর রেডিও জুড়ে দিয়ে গান বাজানো তার অপছন্দ।
“ যেসব মহিলারা সারাদিন এসব জিনিস জুড়ে রাখে তাদের মাথায় বুদ্ধি বলতে কিছুই নেই”, সে বলল।
এরপর বিশাল উৎকর্ষের সাথে সে লাইফের দিকে তাকাল এবং অবশেষে বলল, “ তুমি যদি আবার ওইসব লোকের কাছে যাও তাহলে আমি তোমাকে খুন করে ফেলব”।
কথাগুলো এতটাই উদাস আর শান্তভাবে বলা হচ্ছিল যাতে করে বুঝা যাচ্ছিল লেসেগো কখনোই নিজের কর্তৃত্ব আর প্রাধান্যকে কোন বাধার সম্মুখীন হতে দিতে পছন্দ করে না।
লাইফের পর্যাপ্ত মানসিক ক্ষমতা ছিল না যে সে কোন ব্যপারটায় আঘাত পেয়েছে সেটা বুঝে ওঠে, কিন্তু কিছু একটা মনে হয় তার মাথার পেছনে ভয়ানক এক আঘাত দিয়েছে। সে সাথে সাথে ব্যথার কাছে নতি স্বীকার করে বেশ খানিকটা দূরে সরে গেল। অপরদিকে, প্রতিদিনের গ্রাম্য জীবন চলছিল একদমই চরম পর্যায়ের নিষ্প্রাণভাবে। একটানা একঘেয়েমি; আর খুব সহজ-সাধারণভাবে এক দিন গিয়ে আর এক দিন চলে আসে। পানি আনা, গম ভাঙ্গা, খাবার রান্না করা – কিন্তু এসবের মাঝেও এদের জীবনে আছে বিশাল টানা-পোড়েন। অন্যদিকে সামাজিক রীতিনীতির দাবি সবাই সবাইকে গুরুত্ব দেবে। সারাদিনমান মানুষের জীবনে মানুষের আসা যাওয়ার যানজট লেগেই থাকে। কাউকে সমাধিস্থ করা হবে, এজন্য সহানুভূতি আর সাহায্য দরকার- আরো আছে টাকা ধার, নবজাতক শিশু, দুঃখ, কষ্ট, দান-খয়রাত ইত্যাদি। লেসেগো অনেকদিন ধরেই এই ভুবনের রাজা হিসেবে আছে, প্রতিদিন এখানে অনেক লোক সমাগম হয়, কেউ লেসেগোর কাছে কিছু চাইতে আসে আবার কেউ পূর্ব সাহায্যের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ কিছু দিতে আসে। এটা হল গ্রামের জীবন-শক্তির বুনিয়াদ। এর মাধ্যমে কিছু লোকের সৃষ্টি হয় যাদের সহানুভূতি আর আবেগ পুরোপুরি জাগ্রত, এবং এর মাধ্যমে তাদের শূন্যতায় জায়গা করে নেয় এক বড় রকমের একঘেয়েমি। যখন অট্টহাসি আর সস্তা গুন্ডামি কেড়ে নেওয়া হল, লাইফ এই একঘেয়েমিতে পড়ে গেল; অবশেষে লাইফ বুঝতে পারল যে এই জীবনে খাপ খাওয়ানোর মত কোন গুণই ছিল না তার। মদ্য ব্যবসায়ী মহিলারা এখনো সেখানে আছে; তারা এখনও লাইফের উঠোন পছন্দ করে কারণ লেসেগো ছিল অগোছালো আর আয়েসী স্বভাবের এবং সবকিছুই এই জায়গায় একযোগে চলছিল যেমন- এক বয়স্ক লোক উপহার সামগ্রী নিয়ে উঠোনের এক কোনে উবু হয়ে বসে রয়েছে: “ লেসেগো, আমার শিকারের ভাগ্য আজ খুব ভাল ছিল। দুটো খরগোশ ধরেছি আজ, তার একটা আমি তোমাকে দিতে চাই…”- এটা ছিল সোয়ানাদের মত জীবনযাপন। মদ্য ব্যবসায়ী মহিলারা তাদের রানীর নতুন সামাজিক মর্যাদা দেখে তারা বলল:
“ আমরা নারী এবং আমাদেরও কিছু করা উচিৎ”।
তারা মাটি আর গোবর খুটে এনে লাইফের উঠোন লেপা আর সাজানো শুরু করল। তারা লাইফের জন্য পানি বয়ে আনত, তার গম ভাঙত, এবং বাহ্যিকভাবে সবকিছুই খুব সাধারণ মনে হচ্ছিল কারণ লেসেগোরও এক বোতল মদ হলে বেশ ভালই লাগত। কিন্তু কেউই লাইফের চেহারায় ধীরে ধীরে ফুটে ওঠা বিরক্তিটা লক্ষ্য করছিল না। প্রতিদিনের একঘেয়েমিতে সে দম বন্ধ হয়ে মারা যাচ্ছিল এবং মদ্য ব্যবসায়ী বন্ধু-বান্ধব থেকে শুরু করে তার স্বামী পর্যন্ত যেদিকেই সে তাকাতো, এমন কেউ ছিল না যার সাথে মন খুলে দুটো কথা বলা যাবে; আর এটা তার জন্য হয়ে উঠল এক বিরাট শারীরিক কষ্ট। এর এক মাস পর, সে অবসন্নতার শেষ পর্যায়ে চলে গেল। এক সকালে সে তার নিদারুন যন্ত্রনার কথা মদ্যব্যবসায়ী বন্ধুদেরকে বলেছিল: “আমার মনে হয় আমি ভুল করেছি। বিবাহিত জীবন আমার জন্যে নয়”।
এবং তারা সমবেদনার সাথে বলেছিল: “ তুমি ঠিকই মানিয়ে নেবে এর সাথে। যতই হোক, জোহানসবার্গ এর জীবন এর থেকে অনেক আলাদা”।
প্রতিবেশীরা বেশি বেশি কানাঘুষা করতে লাগল। তারা সে সব বিবাহ দেখে খুব পুলকিত হয় যেগুলো অসফল হবে বলে তাদের মনে হয়। তারা বলাবলি শুরু করল- যে মানুষটা একই সাথে ভাল ও খারাপ তাকে নিয়ে কখনও বিচার-বিবেচনা করা উচিৎ না, এবং লেসেগো একটা বাজে মেয়েলোককে ভাল জীবন দিয়েছে যেটা এর আগে তারা কখনও দেখে নি। তারা যখন এগুলো বলছিল আর নিজেদের কথায় নিজেরাই সম্মতিসূচক মাথা নাড়ছিল, তখন মনে হচ্ছিল সোডম আর গোমরার গল্প আবার উন্মোচন করা হচ্ছিল। বিকেলে লেসেগো খবর পেল যে তার খামারের নতুন জন্মানো বাছুরগুলো মারা যাচ্ছে, এবং পরদিন সকালেই সে তার ট্রাকে করে চলে গেল।
সেই হারিয়ে যাওয়া বেপরোয়া আর উন্মত্ত মেয়েটি যেন মৃত্যুর মুখ থেকে আবার জেগে উঠল, সাথে পেল বিশাল এক মুক্তির আনন্দ। ট্রানজিস্টরটা বাজল, আবারো বয়ে গেল খাবারের বন্যা, পুরুষ-মহিলারা মাতাল হয়ে ঘুরে ঘুরে নাচা শুরু করল। তাদের এই হৈ-হুল্লোড়ের শব্দে আরো কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত লোকও চলে আসল আর সীমাহীন লজ্জায় তাদের মাথা নত হয়ে গেল। তারা প্রস্তুত হয়ে থাকল লেসেগো ফেরত আসামাত্রই সবকিছু বলার জন্য, বলবে এই মহিলা কখনোই তার বউ হওয়ার যোগ্য নয়।
তিনদিন পর লেসেগো অপ্রত্যাশিতভাবে হঠাৎ গ্রামে ফেরত এলো। বাছুরগুলোর রক্তশূন্যতা হয়েছে এবং ওদেরকে এক পশু চিকিৎসকের কাছে ইনজেকশন দিতে নিয়ে আসা হয়েছিল। সে তারা ট্রাকটা সরাসরি চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে দাড় করিয়েছিল। এক মদ্যব্যবসায়ী দেখেছিল তাকে আর সবাইকে তাড়াতাড়ি বলতে চলে এসেছিল।
“ তোমার স্বামী চলে এসেছে”, লাইফকে হাত ধরে কোনায় টেনে নিয়ে সে ভয়ে ভয়ে ফিসফিসিয়ে বলল।
“ উফফ”, বিরক্তির সাথে বলল লাইফ।
মুহূর্তের ভেতর সব হৈচৈ, পুরুষলোক আর মদ সে অদৃশ্য করে দিল, কিন্তু যেকোনভাবেই হোক না কেন এই নির্জীব জীবন থেকে বের হওয়ার জন্যে এক উন্মাদনা কাজ করছিল তার ভেতর। এক লোককে সে ছয়টার সময় দেখা করার কথা দিল। প্রায় পাঁচটার সময় লেসেগো ট্রাকভর্তি বাছুর নিয়ে বাড়ি পৌঁছল। তাকে সম্ভাষণ জানানোর মত কেউই ছিল না বাড়িতে। সে ট্রাক থেকে লাফিয়ে নামল এবং একটা ঘরের দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলল। লাইফ খাটের উপর বসে ছিল। তাকে শান্ত আর নির্জীব দেখাচ্ছিল। সে খুব অবাক হয়েছিল কিন্তু তার মন তখনও বাছুরগুলোর চিন্তায় মগ্ন। বাছুরগুলোকে আজ রাতের জন্য উঠোনে রাখতে হবে।
“একটু চা বানাতে পারবে?”, সে বলল, “ খুব পিপাসা পেয়েছে আমার”।
“ঘরে কোন চিনি নেই”, লাইফ বলল। “ আমাকে কিনে আনতে হবে”।
কিছু একটা খটকা লাগছিল লেসেগোর কিন্তু সে আবার বাছুরগুলো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল আর ওদিকে তার স্ত্রী বাড়ির বাইরে চলে গেল। লেসেগো বাছুরগুলোকে গুছিয়ে নিতেই একজন প্রতিবেশী এসে হাজির হয়েছিল আর তাকে খুবই রাগান্বিত দেখাচ্ছিল।
“ লেসেগো”, সে স্পষ্টভাবে বলল, “ তোমাকে বলেছিলাম ওই মেয়েকে বিয়ে না করতে। তুমি রাদিথোবোলোর বাড়ি গেলেই ওদেরকে একসাথে বিছানায় পাবে। ওই মেয়েকে যে তোমার তালাক দেওয়া উচিৎ সেটা গিয়ে নিজের চোখে দেখে নাও”।
লেসেগো কিছু সময়ের জন্যে তার দিকে একচোখে চেয়ে থাকল, যেহেতু তার জীবনে কোন তাড়া নেই সেহেতু সে তার নিজের গতিতেই খুব আস্তে আস্তে রান্নাঘরে গেল। এক কৌটাভর্তি চিনি রয়েছে সেখানে। সে ঘুরে দাড়াল এবং এক কোনায় একটা ছুরি দেখল আর সেটাকে নিজের জামার ভেতর ঢুকিয়ে নিল। ছুরিটা অনেক বড় এবং ওটা সে পশু জবাইয়ে ব্যবহার করত। অতপর সে নিজের গতিতে চলে গেল রাদিথোবোলোর বাড়িতে। বাড়িটা জনশূন্য দেখাচ্ছিল, শুধুমাত্র একটা ঘরের দরজার একভাগ খোলা আর একভাগ হালকা চাপানো। সে লাথি দিয়ে সেই ঘরের দরজা খুলে ফেলল এবং ভেতরের ভদ্রলোক বিপদের আভাসে চিৎকার করে উঠল। লেসেগোকে দেখে সে ভয়ে জড়সড় হয়ে এক কোনায় গিয়ে লুকালো। লেসেগো মাথা নাড়িয়ে ওই লোককে ইশারা করে ঘরের বাইরে যেতে বলল। কিন্তু রাদিথোবোলো বেশি দূরে গেল না। সে এই ঘটনা উপভোগ করতে চাইছিল, তাই সে লুকিয়ে পড়ল এক রাবারের ঝোপের পেছনে। সে সাধারণ স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া আসা করেছিল, – যেমন রাগান্বিত স্বামী চেঁচিয়ে স্ত্রীকে অভিশাপ দেবে আর স্ত্রী মনভুলানো হাসি হাসবে সেই সাথে থাকবে অনেক মিথ্যা কথা আর নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা। শুধু লেসেগো বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলো, এবং তার হাতে ছিল সেই বিশাল আকারের রক্তমাখা ছুরি। এই দৃশ্য দেখেই রাদিথোবোলো মরার মত বেহুশ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। সামনের পায়ে চলা পথে কিছু লোক হেঁটে যাচ্ছিল, সেই ছুরি দেখে সবাই রাবার গাছের বেড়ার ভেতর জড় হল।
অতিসত্বর হাউমাউ কান্নাকাটির রোল পড়ে গেল। সবাই কষ্টে মাথা চাপড়াচ্ছিল আর এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করে হাউ-মাউ করে কাঁদছিল। কিছুক্ষণ পর সবার পুলিশকে ডাকার কথা মনে পড়ল। সবাই অস্থির হয়ে পড়েছিল কারণ খুন, স্পষ্টবাদিতা আর হিংস্রতা- এগুলো গ্রাম্য জীবনে খুবই অস্বাভাবিক আর বিরল ব্যাপার। মনে হচ্ছিল একমাত্র লেসেগোই স্বাভাবিক আচরণ করছিল ওই বিকেলে। যখন পুরো পুলিশ বাহিনী তাকে ধরতে এসেছিল তখন সে তার বাড়ির উঠোনে চুপচাপ বসে ছিল। তারা লেসেগোর দিকে ভয়ে ভয়ে তাকচ্ছিল আর তার এই শান্ত চেহারা দেখে প্রচণ্ড বকাঝকা করছিল।
“ একজন মানুষের জীবন নেওয়ার পরও তোমার এত শান্ত আচরণ!” তারা রাগের সাতে বলল। “ এই দুষ্কর্মের জন্যে এখন তোমার ফাঁসি হবে। মানুষ খুন খুবই মারাত্নক অপরাধ”।
তার ফাঁসি হয় নি। আদালতের শুনানি শুরুর দিন থেকেই সে তেমনই ঠান্ডা আর নির্বিকার ছিল যেন তার মাথা তখনও পানির উপরেই আছে। তারপর সে জজ সাহেবের দিকে তাকিয়ে শান্তভাবে বলেছিল, “ আচ্ছা, এই বিষয়ের সত্যতা হল, আমি তখনই খামার থেকে ফিরেছিলাম। আমার ওইদিন বাছুরগুলোকে নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়েছিল। আমি দেরি করে বাড়ি ফিরেছিলাম আর পিপাসাও পেয়েছিল খুব, বউকে বলেছিলাম চা বানাতে। সে বলেছিল বাড়িতে কোন চিনি নেই আর চিনি কিনতে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিল। প্রতিবেশী, মাথাতা, তার পরপরই এলো এবং বলল আমার বউ দোকানে নয় বরং রাদিথোবোলোর বাড়িতে গেছে। আমার উচিৎ কাজ ছিল সেখানে গিয়ে দেখা যে ও রাদিথোবোলোর বাড়িতে কী করছে। তারপর ভাবলাম আমার আগে দেখা উচিৎ আসলেই রান্নাঘরে চিনি আছে কি না এবং সেখানে গিয়ে এক কৌটো ভর্তি চিনি পেয়েছিলাম। তা দেখে আমি একই সাথে আশ্চর্য হয়েছিলাম আর কষ্টও পেয়েছিলাম। আমার মনে যেন আগুন জ্বলে উঠেছিল। আমি ঠিক করেছিলাম ও যদি সত্যই রাদিথোবোলোর সাথে খারাপ কিছু করে যেটা মাথাতা আমাকে বলেছিল, তাহলে আমি ওকে খুন করে ফেলব কারণ আমি কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না যে একজন স্ত্রী কিভাবে এতটা নীচে নামতে পারে…”
লেসেগো অনেক বছর ধরেই স্পষ্টভাবে আর নির্ঝঞ্ঝাট তরিকায় জীবনের সকল ক্ষেত্রে নিজের মত করে ফয়সালা করে আসছিল। জজ সাহেব ছিলেন একজন সাদা চামড়ার লোক, তার উপর সে সাউয়ানা গোত্রের রীতি আর তর্কে কোনভাবেই অন্তর্ভুক্ত ছিল না, তবুও সে অন্যান্য গ্রামবাসীদের মত লেসেগোর আচরণে মুগ্ধ হয়ে গেল।
“ এটা আবেগের বশে করে ফেলা অপরাধ”, সে সমবেদনার সাথে বলেছিল, “ তাই এখানে তেমন গুরুতর কিছু হয় নি। তবুও মানুষ খুন খুব মারাত্নক অপরাধ, তাই আমি তোমাকে পাঁচ বছরের কারাবাসের আদেশ দিলাম…”
লেসেগোর বন্ধু সিয়ানার উপর লেসেগোর কারাবাসের সময় তার ব্যবসার সব কিছু দেখাশোনা করার দায়িত্ব পড়ল। সে লেসেগোর সাথে দেখা করে হাত পর্যন্ত মেলালো। সবকিছু দেখে তার কাছে কিছু একটা খটকা লাগছিল, মনে হচ্ছিল এটা শুরু থেকেই পরিকল্পনা করা ছিল।
“ লেসেগো,” সে প্রচণ্ড কষ্টের সাথে বলেছিল, “ কেন তুমি ওই নোংরা মেয়েটাকে খুন করলে? তোমার কাছে সরে আসার সুযোগ ছিল। তুমি তো সরে আসতে পারতে। তুমি কি আমাদের দেখাতে চাচ্ছো যে এখানে দুই নদী কখনও পরস্পর মিলে যেতে পারে না? একজন ভাল মহিলা আর একজন ভাল পুরুষলোকের কপালে কখনোই একসাথে জীবন যুদ্ধে যোগ দেওয়ার সুযোগ হয় না। জীবন সবসময়ই এমন বোকামিতে ভরপুর আর তালগোল পাকানো…”
জিম রিভস-এর একটা গান তখন খুব জনপ্রিয় হয়েছিল: “ এমনই হয় যখন দুই পৃথিবীর টক্কর লাগে”। এরপর থেকে মদ্যব্যবসায়ী মহিলারা মাতাল হয়ে এই গান গাইত আর কান্নাকাটি শুরু করত। মনে হত একমাত্র তাদেরই এই পুরো ব্যপারে কিছু বলার ছিল।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.