ভ্রমণ-জার্নাল

ডার্লিংটনের কুসুম ও কণিফার

শামীম আজাদ | 29 Mar , 2019  


ডারহাম নামের কাউন্টিতে, সবুজ ছাতার মত ছোট্ট সুন্দর একটি শহরের নাম ডার্লিংটন। আহ…..আই লাইক দ্যা সাউন্ড অফ ইট। তারে দেখেছিলাম ট্রেনের জানালা থেকে। বছর কুড়ি আগে তো হবেই। আবাসিক লেখক হিসেবে আমার লেখার চাকুরীস্থল ছিলো সিটি লাইব্রেরী সান্ডারল্যান্ড আর্টস সেন্টারে। লন্ডন থেকে নির্ধারিত সময়ে নিউক্যাসেলের ট্রেনে উঠে, কোট খুলে, চা নিয়ে, টেবিলে কম্পূটার সাজিয়ে জানালা দিয়ে চোখ মেলে দিতাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখ ভরে যেতো সবুজ কাজলে। দেহ থেকে ক্রমশ বেরিয়ে যেতো গতবাঁধা কাজ ও ক্লান্তির নিকোটিন।
ইয়র্কের পর পড়তো ডিয়ার ডার্লিংটন। প্রাচীন ষ্টেশনটাতেই শ্যাওলা রঙা কি সুউচ্চ লোহার ছাদ, বিশাল বিশাল বীম! ছাদ থেকে ঝুলে পড়া ফুলের ঝাড়ে কান পাতলে বুঝি শোনা যাবে ঝুমুর কম্পন। দেখতাম, দামী লাগ্যেজ ক্যারিয়ারসহ উঠে আসছেন ধব্‌ধবে সাদা চুলের রিটায়ার্ড সম্ভ্রান্ত দম্পতি। ষ্টেশন ছেড়ে যাবার সময় ঘাড় বেঁকিয়ে দেখতাম ফেলে যাচ্ছি সবুজে সিঁড়ি ধরে কোমড় বাঁকিয়ে গুড বাই বলা টীজ নদী! এখানেই না স্টিভেনসনের লোকোমটিফ ট্রেন, ষ্টিম এঞ্জিন এর শুরু। কয়লা বহন করতে করতেই এর উন্নয়ন আর এক সময় বিস্ময়ের মত তা হয়ে ওঠে সব কিছুরই ব্যাপক বাহক ও ব্রিটিশের সকল সংযোগ। এখানেই না এ্যালিস ইন দা ওয়ান্ডারল্যান্ড-এর লেখক লুইস ক্যারলের জন্ম!
গত বছর গ্রীষ্মে, স্মৃতিগ্রন্থের পান্ডুলিপি নিয়ে লন্ডন থেকে পালাতে চাইছি এমন সময় ক্যানাডার বরফখন্ড উইনিপিগ থেকে শ্রাবনীর উষ্ণ স্বর: ডার্লিংটন চলে যা, দিদি-জামাই বাবুর কাছে। দ্বিজেন শর্মা দিক্ষিত বোটানিস্ট ধ্রুবা দি অবসর জীবনে হয়েছেন প্রকৃতি-প্রেমিকা। আর অর্থপেডিক সার্জন অজিত দা, ফুল টাইম শিল্প-চিন্তক। সত্যি চলে গেলাম।

সেই ট্রেনষ্টেশনে এবার সত্যি নেমে গেলাম। দেখি কচি কলাপাতা শার্ট, গ্রে ট্রাউজার্স, কোট ছাড়া বুট পরা সত্তরোর্ধ তরুনী দিদি দুহাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে। আইঞ্জা আইঞ্জির পর, লেখার লাগই কম্পূটার আনছোনিগো বইন? আমি হেসে পিঠের গোলাপী র‍্যাকস্যাক-এর দিকে ঈশারা করে কার পার্কে অপেক্ষারত সৌম্যদর্শন অজিতদা’র সঙ্গে হ্যান্ড শেইক করতেই তিনজন হৈ হৈ করে উঠলাম। আহ, দিদির হি হি একদম তার সহোদরা, আমার বন্ধুর মত। গাড়ি এগুতে থাকলে সবুজ থেকে সবুজান্তরের দরজা খুলে যেতে লাগলো। সবুজ রঙের এতো স্তর, এত পরম্পরা, এত বিস্তার লন্ডনে নেই। এরা সর্ষে সবুজ, ওয়াইন সবুজ, সূর্য সবুজ, কলাপাতা সবুজ, টিয়া সবুজ, ক্যামোমাইল সবুজ, বন্য সবুজ, হ্লুদ সবুজ, ব্যাথার মত সবুজ, প্রেমের মত সবুজ, গ্রীন চা’র মত সবুজ, মেহগনি রাত্রির মত সবুজ ।
দিদি শুরু করে দিল তার বৃক্ষ পুরাণ আর আমি বুঝলাম এ যাবত যাদের সকলকেই ‘গাছ’ নামে ডাকি আসলে এদের কারো কারো নাম কনিফার। কনিফারের ডাল থেকে সবুজ ঝাড়ুর শলাকার মত, বর্ষজীবী, ফল সুশক্ত পাথর বা ইটের ঢেলার মতো, অনেকটা ঝাউ মার্কা আরকি। ক্রিস্মাস ট্রি কনিফার আর অন্যসব পাতাওলা বৃক্ষ।



ওদের বাড়ির সামনেই মংক ট্যারেসে গাছের আড়ালে লুইস ক্যারলের জন্ম বাড়ি। পিতা চার্লস ডডস্যান যে চার্চের দেখভাল করতেন পরদিন সেখানে প্রবেশ করে দেখি লতাগোলাপ ছাওয়া সামনের ঊনবিংশ শতকের নাম না জানা মসে-শ্যাওলায় জাড়িয়ে ধরেছে কবরের সব এপিটাফ। আহা এখানেই লুইস তার গোড়া খৃষ্টান বাবার সঙ্গে হাতে ধরে বাতি জ্বালিয়েছেন, প্রার্থনার পথ পরিষ্কার করেছেন। ভেতরের অসাধারণ স্থাপত্য দেখতে দেখতে আমার একটা সন্দেহ হল, লুইস কি নিজেই শিশুকালে এই চার্চের কারো দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন? বলা যায় না। ধর্মের নামেইতো চলে ধর্মের ধর্ষণ।

আমার কানে বাজতে লাগলো ক’বছর আগে ব্রিটিশ মিউজয়ামে ওঁর উপরই কাজ করার কালে সারাক্ষণই শিশুদের সমবেত “টুইংকল টুইংকল লিটল ষ্টার/ হাউ আই ওয়ান্ডার হোয়াট ইউ আর” এর ধ্বনি। সে গল্প থেকে আজব দেশের এ্যলিসের আলোচনা জমে উঠলো ক্যারলের গোপন জীবন নিয়ে। যে এ্যালিসকে নিয়ে লেখা তার বিশ্ববিখ্যাত শিশিতোষ গ্রন্থ, যে কিশোরীর পরিবারের সঙ্গে তার ছিলো মিষ্টি একটা সম্পর্ক হঠাৎ করেই একদিন দুম করে তারা তাকে আর কিশোরী এ্যলিসের সঙ্গে দেখাশোনা বন্ধ করে দিয়েছিলো। ক্যারল নিত্য ডায়েরী লিখতেন, তাতে ছবিও আঁকতেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর সে ডায়েরীর মাঝের ক’পাতা গায়েবসহ পাওয়া যায়। কিন্তু তার তোলা যে কিছু ছবি পাওয়া গেছিল তার সবই উদোম গায়ে ছোট ছেলেমেয়েদের। ভাবা যায়!
পরদিনই শুরু হল আসল উদ্ভিদ্বিদ্যাসংক্রান্ত ইন্টেন্সিভ কোর্স। হাউ গুড ইট ক্যান বি! পার্কে, নদীর পাড়ে, ব্রীজের নিচে, কফিশপে ও দিদির বানানো হানি কেক খেতে খেতে।

পাশেই টিন এজার টীজ নদী। যেন এক টিন এজার। জলের রঙ মেটে সবুজ। পাড়ে পাড়ে ছাতার মাপে কচু পাতার মত বিশাল বিশাল বাটারবার পাতা। প্রাচীন কালে নাকি ঘরে মাখন তুলে নেবার পর কো্নো ঠান্ডা বা ভেজা জায়গায় সেই মাখন্টুকু জমিয়ে বার বানিয়ে এই পাতা মুড়ে রাখা হত। তাই এর নাম বাটারবার। নদীর পাড়ে সুন্দর সুন্দর শ্যাওলা ও হ’থর্ণ, ঝুঁকে আছে সাদা সাদা নাকফুলের মত এল্ডার ফ্লাওয়ার। একদিকে চুল সবুজ এলিয়ে উইলো আর অন্যদিকে গহীন গহন প্রাচীন গন্ধ মাখা ঢাল। নাকে সে লাগলো তীব্র সে ঘ্রাণ। বোটানিস্ট দিদি একটানে একটি পাতা হাতে দিয়ে বললেন ডলে দেখো। ডলতেও হলো না; ছেঁড়া পাতা থেকে ভুর ভুর করে বেরুতে লাগলো এল্ডার ফ্লাওয়ার ড্রিংকের সুগন্ধ।

বৃষ্টি নেই এমন দিনে লেখা শেষ করে গেলাম বেশ দূরে টীজ ডেলে নদীর লো ফোর্স দেখতে। জলস্রোতে দিনের কিরণ ফুটে আছে। ত্রুন ত্রুনীরা লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে সব তোলপাড় করছে। দিদি গম্ভীর। মাটিতে মাড়িয়ে যাওয়া কুচো চিংড়ির মত ফুল্গুলো দলে গেছে। হাত দিয়ে দেখালেন কি ভাবে ওরা গাছের ডাল ভেঙে গেছে। এরা প্রকৃতিকে মায়া করে ব্যবহার না করে নির্যাতন করছে। তাই তাদের আন্দোলন। প্রকৃতি যে তোমাকে বুকটা খুলে দিচ্ছে তা তুমি তাঁকে বাঁচিয়ে রেখে পান কর। যাতে সে বেঁচে তোমাদেরও বাঁচাতে পারে। আমার তখন বন্ধু আনু মুহাম্মদের কথা মনে হল। আমার সুন্দর বনের কথা মনে হল আর ভুমির নিচে পাথরে ছল্‌কে পড়া জলের মত বুক থেকে ক্রন্দন উঠে এলো।
আমরা দড়ির সেতু পেরিয়ে ওপারে গিয়ে দেখি মাইলকে মাইল হলদে বাটার কাপ ভুবনে চাল নামিয়ে এনেছে। বড় বড় পিলারের মত পাথর, যাকে বলা হয় বাসল্ট তার গায়ে মস হয়ে আছে। মস্‌ গজিয়েছে গাছের গায়ে, গিটে, ইটে, মাটিতে, পাথরের ফাঁকে ফাঁকে। দেখলাম হর্ন বীন গাছের দেশপাতাটার পেছনে কি আশ্চর্য প্যারালাল এন্ড প্রমিনেন্ট ভেইনগুলো। আহা পাতার রগ। ফুলগুলি নরম সিকামোরের মত। আশ্চর্য্য, ডগস্‌ মার্কারি গাছের নাকি পুরুষ নারী ভেদ রয়েছে। এদের একজনের আছে সবুজ অন্ডকোশ ফল! কি দারুন বৃক্ষ-বৈচিত্র্য!
কনিফারের মধ্যে সবচেয়ে মনোহর ওয়ালিংটনিয়া। কিন্তু একদম তা ওয়ালিংটন বুটের মত না। বরং উল্টে রাখা মেটো মেডুসার মাথা যেনো। আসলে তারই মাল্টি স্টেম সাপের মত গুচ্ছাকারে উঠে আসে মাটির উপর। এদের জন্মস্থান ক্যালিফোর্ণিয়ায়। বিলেতে ১৮৫৩ তে এর বীজ আসে কিউ গার্ডেন ও ডার্লিংটনে।

হাজার বছর বয়সী জামার লেইসের মত দেখতে, কুইন এ্যান্স লেইস থেকে ফুল ফোটে মে জুনে। এ্যাস্পেন ট্রির পাতা নড়লে নুপুরের মত শব্দ হয়। ক্যানাডায় এর বিস্তির্ণ ফরেস্ট আছে। এর গোড়ায়- ঠিক শিকড়ের উপর একই গাছের ঝোপের মত ঝাঁপি। শপিং লিস্টের দু’জাতের বার্চের মধ্যে ডাউনি বার্চ-এর গায়ের নরম লোম নতমুখি হয়ে থাকে। সিলভার বার্চ রূপালী। তারই খালাতো ভাইর ধবধবে সাদা বাকল উঠে আসে অনেকটা প্যাপিরাসের মত। তাকে বলে পেপার সিলভার বার্চ। ওকের কথা কি বলবো? সাধে কি আর একে ব্রিটিশ রাজকীয় বৃক্ষ বলে! একটি ইংলিশ ওক বড় হয় ১০০ বছরে, বেঁচে থাকে ১০০ বছর, টিম্বার বাঁচে আরো ১০০ বছর। আগে সব রকমের সেতুই হতো ওক দিয়ে। দেখলাম বীচ উড, হ্যাজল নাট, চেস্টনাট আর একটু তেলতেলে দেখতে লাইম ট্রি। হর্স চেস্টনাট কংকার। দেখতে একদম মুরগীর গিলার মতো।
সবই দিদির চোখ দিয়ে দেখে দেখে কুড়িয়ে এনেছি কনিফার, শুকনো কুসুম ও পাথর। ওরা এখন আমার সঙ্গে বাড়ি বদলে বো’তে চলে এসেছে। আমরা থাকি ট্ম থ্যাম্বস্‌ আর্চের কাছে। সত্যি এ খিলান টমের বুড়ো আঙুলের মতই টনটনে, গুটানো।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.