প্রবন্ধ

প্রমিত ভাষার প্রয়োজন ও আঞ্চলিক ভাষার ভূমিকা

রাজু আলাউদ্দিন | 6 Apr , 2019  


প্রমিত ভাষা হিসেবে একটি নির্দিষ্ট রূপ গ্রহণ করাকে কেউ কেউ ভাষার আধিপত্য বলে অভিহিত করছেন। তাদের দাবি আমাদের আঞ্চলিক ভাষাগুলোকে গ্রাহ্য করতে হবে। যেহেতু বেশিরভাগ মানুষ ‘প্রমিত’ ভাষায় নয়, আঞ্চলিক বুলিতে কথাবার্তা বলেন, অতএব প্রমিত সাধারণ মানুষের ভাষা নয়। ভাষা বিষয়ে তাদের এই গণমুখী চেতনাকে আমি শ্রদ্ধা জানাই। যে ভাষা মানুষ ব্যবহার করে না তা কখনোই টিকে থাকতে পারে না। পারেওনি। এই কারণে প্রমিতবিরোধীরা দাবি করছেন আঞ্চলিক বুলিকেই হয় প্রমিত রূপে গ্রহণ করতে হবে, নতুবা প্রমিত রূপের ধারণা থেকে সরে আসতে হবে যেহেতু এটি অন্যসব বুলির ওপর ছড়ি ঘুরাচ্ছে।
প্রশ্ন হল ভাষার যে প্রমিত রূপটি চালু আছে সেটাকে হটিয়ে তারা কোন অঞ্চলের বুলিটিকে প্রমিত রূপে দেখতে চান? ধরা যাক সিলেটের বুলিটিকেই কেউ একজন প্রস্তাব করলেন, তাহলে চট্টগ্রামের তারাও তো একই দাবি নিয়ে যৌক্তিক কারণেই হাজির হতে পারে। কিংবা কুমিল্লার, খুলনার, যশোরের, বরিশালের বুলি কী দোষ করেছে? তাদের দাবিরও তো ন্যায্যতা আছে। আঞ্চলিক বুলিবাদীরা এর সমাধান কীভাবে করবেন? নাকি এসব দাবি মেনে নিয়ে একটি মিশ্রভাষা তৈরি করবেন? মিশ্র ভাষার উদ্ভট ধারণাটি মনে হয় না তারা মেনে নেবেন। যদি মেনে নেন তাহলে এর সর্বজনমান্য রূপটি কিভাবে নির্ধারণ করবেন? তার ব্যাকরণই বা কী হবে? অর্থাৎ এই পথ আরও জটিল। এই দিকে বেশি দূর তারা যেতে পারবেন না। তাহলে অন্য যে বিকল্পটি থাকছে তাহলো কেউ কাউকে আধিপত্যের একত্ব না দিয়ে নিজেদের আঞ্চলিক বুলিতে বলবেন এবং লিখবেন। যদি এরকম ঘটে তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে এক অঞ্চলের মানুষ যখন অন্য অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইবেন তখন তারা কীভাবে সেটা করবেন? চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বুলির সঙ্গে বরিশালের অধিবাসীদের যোগাযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। অতএব এই পথে যোগাযোগের সম্ভাবনা কম। যদি যোগাযোগ করতে হয় তখন ইন্টারপ্রেটার ব্যবহার করা ছাড়া উপায় থাকবে না। সুতরাং এই চিন্তা করাটা একেবারেই অবাস্তব হবে। হবে টাওয়ার অব ব্যাবেলের মতোই বহু ভাষার এক কিচিরমিচির যা পরস্পরকে ভাষিক একাকিত্বের মধ্যে নিক্ষেপ করবে। অতএব প্রমিত একটি ভাষিক রূপের প্রয়োজন হয় আমাদের সবার স্বার্থেই।
কিন্তু আঞ্চলিকতাপন্থীরা বাস্তব এই সমস্যাটিকে উপেক্ষা করছেন অনেকটা গায়ের জোরে। গায়ের জোরে এই অর্থে যে, সব নাগরিকের যোগাযোগের জন্য নয়, কেবল ‘চুক্তি আইন ও বৈদেশিক যোগাযোগের জন্য’ (ব্রাত্য রাইসু) প্রমিত ভাষার প্রয়োজন মনে করেন। এর বাইরে মানুষের অন্য যেসব বৃত্তি আছে তার প্রকাশে নাকি প্রমিত ভাষা অক্ষম। রাইসুর ভাষ্যমতে :
“মানুষের সংবেদন, অনুভূতি, ইচ্ছা, প্রতিক্রিয়া, কল্পনা, আধাত্মিকতা ইত্যাদি বহু জিনিসের ইচ্ছানিরপেক্ষ সম্মিলন হচ্ছে জীবিত মানুষের ভাষা। প্রমিত তার ধারে কাছেও নাই। এইটা হইল মানুষের ব্যবহৃত ভাষার অনুবাদ ও সংকোচন। অর্থাৎ বিকৃতি।”
অর্থাৎ রাইসু-কথিত উপরোক্ত অনুভূতিগুলো প্রকাশের সক্ষমতা নাকি প্রমিত ভাষার নেই। সেই সক্ষমতা কার আছে? ওটা নাকি আছে আঞ্চলিক ভাষার। প্রমিত ভাষা, তার কাছে, ‘অনুবাদ ও সংকোচন’। এবং প্রমিত ভাষার বিরুদ্ধে তার চূড়ান্ত ফতোয়া হচ্ছে এই ভাষা এক ধরনের ‘বিকৃতি’।
অন্য এক লেখায় প্রমিত ভাষার বিরুদ্ধে প্রায় রাইসুর নৈকট্য লাভ করে সোহেল হাসান গালিবের এই পর্যবেক্ষণ যে ‘প্রমিত ভাষা বস্তুত ভাষার কংকাল।’ আরেকটু এগিয়ে গালিব প্রমিত ভাষার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আমাদেরকে অভিহিত করতে গিয়ে এও বলেন যে, ‘আমাদের প্রাত্যহিকতার যে ছন্দ-স্পন্দন, যেসব হেয়ালি ও হুল্লোড়, তর্ক ও তামাশা, আর যত আত্মময়তা, সব কনুই মেরে রাস্তায় ফেলে আসতে হয়। ফেলে আসার পর আমরা বুঝি আমার ‘আমি’টাকেই ছেড়ে এসেছি। তখন এ ভাষার মধ্যে যার কণ্ঠ শুনি সে তো আর আমি নই, অন্য কেউ।” গালিব প্রমিত ভাষায় নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে পাবেন না আশঙ্কা করে প্রশ্ন তুলেছেন: “কিন্তু যে মনের কথাটি মনের মতো করে বলতে চায়, এই ভাষা দিয়ে তার কী ফায়দা!”
সত্যিই তো যে ভাষায় আমি নিজেকে পরিপূর্ণরূপে প্রকাশ করতে পারব না, সে ভাষা দিয়ে আমি কী করব! মানুষ স্বভাবতই প্রকাশকামী এক সত্তা। সুতরাং ব্রাত্য রাইসু এবং সোহেল হাসান গালিবের উদ্বেগের সঙ্গে একাত্ম না হয়ে কোনো উপায় নেই।

কোনোই সন্দেহ নেই যে, পৃথিবীর যে কোনো ভাষার প্রমিত রূপই সীমাবদ্ধ। এমনকি ভাষা নিজেই—তা প্রমিতই হোক আর অপ্রমিতই হোক– সীমাবদ্ধ। ভাষার এই সীমাবদ্ধতা নিয়ে দার্শনিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বিস্তৃত হয়ে আছে সক্রেটিস থেকে দেরিদা পর্যন্ত। কিন্তু আঞ্চলিকতাবাদীরা একথা বলেন না যে, আঞ্চলিক ভাষাটিও সীমাবদ্ধ। বরং উল্টো একথাই বলতে চাচ্ছেন যে, আঞ্চলিক ভাষাটিই বরং প্রমিত ভাষার তুলনায় অনেক বেশি প্রকাশক্ষম, ওই ভাষাতেই নাকি চিত্তের সামগ্রিক স্ফূর্তি লাভ করে। তাদের এই দাবিকে আমার কাছে অবাস্তব ও অযৌক্তিক মনে হয়। আঞ্চলিক ভাষা হচ্ছে মূলতঃ বনসাইয়ের মতো, তার বয়স বাড়ে বটে কিন্তু গড়নে সে বামনই থেকে যায়। যে ভাষায় যত বেশি শব্দ সেই ভাষা ততবেশি প্রকাশক্ষম। দেশি-বিদেশি এবং অঞ্চলিক শব্দরাশির সমন্বয়ে ভাষার প্রমিত রূপটি বাংলাদেশের যে কোনো অঞ্চলের বুলির চেয়ে বিস্তৃত। প্রমিত ভাষার আরও একটি বড় সুবিধা হল সমাস ও সন্ধির মাধ্যমে নিজের অনুভূতি ও অভিব্যক্তিকে সম্প্রসারিত করা যায়, যা আঞ্চলিক ভাষার ক্ষেত্রে আমরা ঘটতে দেখি না। বাংলা প্রমিত রূপটি আমাদের নানামুখী প্রয়োজন মেটাতে–আইন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিচর্চা থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক ও দার্শনিক চর্চার কারণে–বিকশিত হয়েছে। ভাষার আঞ্চলিক রূপটিকে এই সর্বব্যাপী প্রয়োজন মেটাতে হয় না বলে তার সেই বিকাশ ঘটে না। তাই সে বনসাই। কিন্তু আঞ্চলিক ভাষার সর্বব্যাপী বিকাশ না ঘটলেও তার একটি ‘আপাত’ স্বয়ংসম্পূর্ণ রূপ অবশ্যই আছে, আর আছে বলেই সেই ভাষার জনগোষ্ঠী ঠিকই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ব্যবহার করে দিব্যি জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে পরস্পরের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে। তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে, সাধারণত যে-ক্ষেত্রগুলো তার দৈনন্দিন প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেগুলোতে তার বিকাশ ও বিস্তারও আছে; কিন্তু তা একেবারেই অল্প কয়েকটি ক্ষেত্রে। প্রমিত ভাষা যেহেতু দেশের সব অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনগুলো লক্ষ্যে রেখে এগোতে থাকে, ফলে বহু শব্দ আত্তীকরণের মাধ্যমে সে বড় ও বিকশিত হয়। আঞ্চলিক ভাষাও যে গ্রহণ করে না– তা নয়, কিন্তু তার গ্রহণের পরিমাণ কম হয় যেহেতু তার প্রয়োজন অঞ্চলভিত্তিক এবং ক্ষুদ্র এক জনগোষ্ঠীভিত্তিক; প্রমিত ভাষার মতো তা গোটা দেশ ও জাতিভিত্তিক নয়। দর্শন, বিজ্ঞান, সমাবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বসহ জ্ঞানবিজ্ঞানের নানা বিষয় চর্চা করতে গিয়ে প্রমিত ভাষাকে সৃষ্টি করতে হয় নতুন নতুন পরিভাষা– এটিও তার প্রসারিত হওয়ার আরেকটি কারণ। সিলেটে বা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় Deconstruction-এর পরিভাষা কি তৈরি হয়ে আছে? নেই। কিন্তু প্রমিত ভাষায় ‘অবিনির্মাণ’ (ফরহাদ মজহার প্রস্তাবিত) কিংবা ‘বিনির্মাণ’ (মনে পড়ছে না কে প্রথম এই শব্দটি প্রস্তাব করেছিলেন)। বলে দুটি শব্দ রয়েছে। Art for art sake-এর পরিভাষা করা হয়েছে ‘কলাকৈবল্যবাদ’। কিংবা ধরুন ভাষাতত্ত্বের ক্ষেত্রে একটা শব্দ আছে, যেটি সোহেল হাসান গালিবই তার লেখায় ব্যবহার করেছেন, ‘বাগার্থবিধি’ কিংবা ‘আসঞ্জনবিদ্যা’– এই শব্দ দুটো প্রমিতপন্থীরা যতটা বুঝবেন বাংলার আঞ্চলিক ভাষীরা কি বুঝবেন? বুঝবেন না, কারণ তার অভিধানে এই শব্দগুলো নেই। তবে তার অভিধানস্থ প্রায় সমর্থক, কিংবা সমার্থক না হলেও অন্য বহু শব্দের সমন্বয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে শব্দ দুটোর অর্থ বোঝার চেষ্টা করবেন তারা। বোঝার এই প্রক্রিয়াটা হচ্ছে এক ধরনের অনুবাদ। রাইসু যে বলেছেন, প্রমিত ভাষা হচ্ছে ‘মানুষের ব্যবহৃত ভাষার অনুবাদ’ তা এক অর্থে সত্য; কিন্তু এই সত্যটি, কি প্রমিত কি আঞ্চলিক উভয় ভাষার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আঞ্চলিক কিংবা প্রমিত যে কোনো ভাষার ব্যবহার হচ্ছে এক ধরনের অনুবাদ-ক্রিয়া। কথাটাকে আরেকটু ব্যাখ্যা করার সুবিধার্থে ভাষা সম্পর্কিত অক্তাবিত্ত পাসের একটি মন্তব্যকে তলব করা যেতে পারে এখানে:
“Language itself is a translation : each word and each phrase explains (translates) what other words and phrases mean. Speech is Continual translation within the same language.” (Seven Voices, Rita Guibert, New York, 1973, P 235)
সুতরাং রাইসু মানুষের ব্যবহৃত ভাষাকে অর্থাৎ প্রমিত ভাষাকে ‘অনুবাদ’ বলে সীমাবদ্ধ যে ভাবছেন, সেই সীমাবদ্ধতা সব ভাষারই আছে, আঞ্চলিক ভাষায় সেটা আরও বেশি মাত্রায় আছে, যেহেতু তার শব্দভাণ্ডার কম। শব্দ ভাণ্ডার কম বলেই তাকে বাচালের মতো বেশি কথা বলে উদ্বিষ্ট অর্থে পৌঁছাতে হয়।

অতএব প্রমিত ভাষা, যে ভাষায় ইতিমধ্যে আমাদের সম্মিলিত (নানান আঞ্চলিক বুলি থেকেও যা সঞ্চিত হয়েছে) জ্ঞানভাণ্ডার তৈরি হয়ে আছে এবং যা আঞ্চলিক জবানের জ্ঞানভাণ্ডার থেকে সহস্রগুণে বেশি তা কোন যুক্তিতে বর্জন করতে হবে? তাছাড়া, ইতিমধ্যে পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার যেসব জ্ঞানভাণ্ডার ও সাহিত্য প্রমিত ভাষায় অনূদিত হয়ে আমাদের অভিব্যক্তি এবং মন ও মননকে সমৃদ্ধ করেছে সেগুলো বর্জন করে আমরা কি তা আঞ্চলিক ভাষায় অনুবাদ করা শুরু করব? সেটা করতে গেলে আমাদেরকে শূন্য এক বিন্দুতে ফিরে যেতে হবে, যা হবে কয়েকশ বছরের পশ্চাদ্ধাবন। আঞ্চলিকতাবাদীরা এ ব্যাপারে আমাদের জন্য কী সূরা নাজেল করবেন?


বীজের দিকে ফেরা
আঞ্চলিক জবানের পক্ষে আজকে যে দাবিগুলো তৈরি হচ্ছে পাকিস্তান আমলেও পূর্ব বাংলার ভাষার স্বাতন্ত্র্যের প্রশ্নে সেই দাবি উঠেছিল এবং উঠেছিল মূলত সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ঘূর্ণি থেকে। সেটা যদিও প্রথমে আঞ্চলিক বুলি প্রতিষ্ঠার কথা বলেনি, বলেছিল মুসলমানি বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার কথা, যাতে করে পশ্চিমবঙ্গের ‘হিন্দুদের’ ব্যবহৃত ভাষা থেকে আলাদা হতে পারে। স্বাতন্ত্র্যবাদীদের এই দাবির পাঁয়তারা লক্ষ করা গিয়েছিল অবশ্য আরও আগেই। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠারও বছর পাঁচেক আগে। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু লেখকদের থেকে আলাদা হওয়ার জন্য ১৯৪২ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’। তাদের মূল আয়াত ছিল “পরাণুকরণমুক্ত সুস্থ-সাহিত্য-সংস্কৃতি সাধনার”। (ভাষা-আন্দোলন: সাহিত্যিক পটভূমি, হুমায়ুন আজাদ, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা, ২০০০,পৃ ১) ‘পরাণুকরণমুক্ত’ বলতে তারা যে হিন্দুদের প্রভাবমুক্ত সংস্কৃতি বোঝাচ্ছিল তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল কয়েক বছর পর আবুল মনসুর আহমদের বক্তব্যে। পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্য বিষয়বস্তুতেই কেবল স্বতন্ত্র হবে না, “‘সে সাহিত্যের ভাষাও হবে মুসলমানের মুখের ভাষা,’ অর্থাৎ তিনি আরবি-ফার্সি-উর্দু মিশ্রিম বাঙলা ভাষায় মুসলমানি বাঙলা সাহিত্য সৃষ্ট হবে বলে মনে করেন। সে-ভাষা ‘সংস্কৃত বা তথাকথিত বাংলা ব্যাকরণের কোনো তোয়াক্কা রাখবে না।’ ”(ভাষা-আন্দোলন: সাহিত্যিক পটভূমি, হুমায়ুন আজাদ, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা, ২০০০, পৃ ৫) অর্থাৎ কেবল বিষয়বস্তুতেই নয়, ভাষার জায়গাতেও তাদের মধ্যে স্বতন্ত্র হওয়ার তাগিদ তৈরি হয়েছিল এবং তাদের মতে আজকের দাবির মতোই ভাষাটি হবে ‘মুখের ভাষা’।

আজকে ৭০-৭৫ বছর পর আবারও যে সেই একই দাবি খানিকটা ভিন্ন সূত্রে ও ভিন্ন মুখোশে হাজির হয়েছে, তার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কিংবা প্রক্রিয়াশীলতার রক্তের বন্ধন আদৌ সক্রিয় কিনা তা হয়তো নিশ্চিত করে বল যাবে না। তবে এর বীজ যে সেই অতীতেই উপ্ত হয়েছিল তা নিশ্চিত করেই বলা সম্ভব।
ভাষিক স্বাতন্ত্র্যের দাবি ইতিহাসে নতুন কোনো ঘটনা নয়। ইংরেজি ভাষায় কথা বলেন এমন দেশ ও জাতিগোষ্ঠী সারা পৃথিবীতে একাধিক। আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও আমেরিকাসহ আরও বহু দেশ আছে যারা ইংরেজি ভাষাতেই কথা বলেন; কিন্তু তা এক রকম নয়, এক রকম হওয়া সম্ভবও নয়; ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ভূখণ্ড হওয়ার কারণেই তা নানান রকম হয়ে গেছে। স্প্যানিশের ক্ষেত্রেও তাই। স্পেনের স্প্যানিশ এবং লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশের স্প্যানিশ ভাষা উৎস ভূমির মতো থাকেনি, থাকা সম্ভবও নয়। সম্ভব যে নয় তার এক উদাহরণ দেয়া যেতে পারে কুবার বিশ্বখ্যাত লেখক আলেহো কার্পেন্তিয়েরের অভিন্ন ভাষার স্বাতন্ত্র্যলিপ্সু প্রবণতা সম্পর্কে একটি মন্তব্যকে তলব করে :
“আমাদের এই আমেরিকা মহাদেশের স্প্যানিশ ভাষায় কিছু ঘোরালো মারপ্যাঁচ আছে, কিছু অভিব্যক্তি আছে, শব্দের কিছু গঠন আছে, যেগুলো মিলে মিশে তৈরী হয় – নতুন একটি ভাষা ঠিক বলবো না, বরং বলবো তৈরী করে বিবিধ আমেরিকান ভাষা। আর এই বিভিন্ন ভাষাগুলোর নিয়তিই হচ্ছে একত্রিত হয়ে যাওয়া, একে অপরের মাঝে দ্রবীভূত হয়ে কালক্রমে একটি মহাদেশীয় বুলির জন্ম দেয়া। মেক্সিকান বোল ইতিমধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে, যেমন রয়েছে স্বতন্ত্র কিউবান এবং ভেনেজুয়েলান উপভাষা। তবু এরা যেন ভাই ভাই, দৃশ্যতই বিনিময় করছে নানারকম প্রকাশভঙ্গি আর বাগবৈশিষ্ট্য। ভেনেজুয়েলার যে কোন নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যে কিউবান ভাষার স্বকীয় প্রকাশগুলো বুঝে ফেলবেন, ঠিক যেমন একজন কিউবান মানুষ বুঝতে পারবেন ভেনেজুয়েলার আপন অভিব্যক্তি।”–(যুবায়ের মাহবুবকৃত বাংলা তর্জমা।)
(Disponemos nosotros, en nuestro espanol de America, de unos giros elipticos, de expresiones, de structuras verbales que estan creando, no dire un idioma, si no varios idiomas Americanos destinados a fusionarse, a integrarse en un habla continental a medida que pasen los años. Hay ya un idioma mexicano, un idioma cubano, un idioma venezolano—hermanos—que visiblemente estan intercambiando giros y locuciones. Cualquier venzolano de hoy comprende los cubanismos, como cualquier cubano entiende los venezolanismos.– La Novela Latinoamericana en visperas de un Nuevo siglo y otros ensayos, Alejo Carpentier, Siglo veintiuno editors, España, 1981, P 141-142)
একটা গোটা মহাদেশ একই ভাষায় কথা বললেও তাদের স্বাতন্ত্র্য যেমন বজায় থাকছে, তেমনি যোগাযোগেও তা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না।
কার্পেন্তিয়ের-এর এই উদ্ধৃতিটা হাজির করার একটা উদ্দেশ্য হল এই যে, ভাষার লক্ষ্য যদি হয়ে থাকে যোগাযোগ তাহলে আমরা যোগাযোগের স্বার্থে আবার যেন স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে না ফেলি। আরেকটি ব্যাপার হলো এই যে, কথাটা কার্পেন্তিয়ের বলেছেন বলেই যে শিরোধার্য– তাও নয়, বরং বাস্তবতার নির্ভুল এক বয়ানের জন্য তা আমাদের কাছে মান্য হয়ে ওঠে। ভাষার প্রমিত রূপ যে স্বাতন্ত্র্য-বিনাশী নয়, এমনকি বিনাশের ইচ্ছা থাকলেও যে তা সম্ভব নয় কার্পেন্তিয়ের তা খুবই স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন এই বক্তব্যে। স্প্যানিশ ভাষার একটি প্রমিত রূপ যদি না থাকত তাহলে লাতিন আমেরিকার প্রতিটি দেশে হয়তো ভাষিক স্বাতন্ত্র্য তৈরি হতো ঠিকই, কিন্তু যোগাযোগ? ভাষার যে মুখ্য উদ্দেশ্য যোগাযোগ– সেটা কীভাবে সাধিত হতো তিহুয়ানা থেকে তিয়েররা দেল ফুয়েগো পর্যন্ত এক বিশাল মহাদেশে?


কেন এই বিরোধিতা?
প্রমিত ভাষার বিরুদ্ধে আঞ্চলিকতাপন্থীদের একটা বড় অভিযোগ এই যে, এটি বেনিয়া সাহেব-মিশনারি ও সংস্কৃতি পণ্ডিতদের তৈরি একটি কৃত্রিম ভাষা। কথাটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য হলেও, তা সত্যের এক উপরি-আদল। নিহিত সত্যের দিকে তারা তাকাননি কিংবা সে ব্যাপারে তারা উৎসাহী নন বলেই এর নিহিত বার্তাটি আড়ালে থেকে যায়। কে না জানেন যে পৃথিবীর কোনো ভাষাই কেবলমাত্র কয়েকজন পণ্ডিতের বা কোনো একটি ক্ষুদ্র শ্রেণীর দ্বারা তৈরি হয়নি। প্রমিত বাংলার বীজকে কলকাতার বাবুদের কিংবা সংস্কৃত পণ্ডিতদের তৈরি বলে যে-প্রচার তৈরি হয়ে আছে, ভাষা সৃষ্টির বিবর্তন ও ইতিহাসের সঙ্গে তা পুরোপুরি অসঙ্গতিপূর্ণ। ভাষা একটি জনগোষ্ঠীর দ্বারা তৈরি হওয়ার বিষয়। বাংলা গদ্য নিয়ে বিদেশি ও সংস্কৃত পণ্ডিতরা উনিশ শতকে নাড়াচাড়া করেছেন বটে, কিন্তু বাংলা গদ্যের অস্তিত্ব তারও কয়েকশ বছর আগে থেকেই ছিল। লিখিত রূপেই আমরা দেখতে পাচ্ছি বাংলা গদ্যের নমুনা ১৫৫৫ সাল থেকেই বিদ্যমান ছিল। লেখার রেওয়াজ নিশ্চয়ই আরও আগে থেকেই ছিল। অহোমরাজকে লেখা কোচবিহারের রাজা ১৫৫৫ সালে যে-চিঠি লেখেন সেই চিঠির ভাষা ইংরেজ ও সংস্কৃত পণ্ডিতদের কৃত্রিম মিশ্রভাষা নয়, তা লৌকিক বুলির বেশ খানিকটা নিকটবর্তী। কিন্তু ইংরেজরা বাংলা ভাষা ভালো মতো জানতেন না বলে ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে গিয়ে তখনকার হিন্দু পণ্ডিতদের সহায়তা নিয়েছিলেন। ওইসব পণ্ডিতদের ধারণা ছিল বাংলা সংস্কৃত-জাত এক ভাষা, ফলে তারা ইংরেজদের সঙ্গে বাংলা গদ্যকে সংস্কৃতায়নের মাধ্যমে কৃত্রিম করে তুলেছিলেন। প্রমিত ভাষার বিরোধিতার পেছনে আঞ্চলিকতাবাদীদের এটাও একটা কারণ। তারা মনে করেন, যে-কৃত্রিম গদ্যের ওপর ভিত্তি করে বাংলার প্রমিত রূপ দাঁড়িয়ে আছে তা কেন আমাদের গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু আঞ্চলিকতাবাদীরা যেটা লক্ষ্য করেন না তাহলো বাংলা গদ্যের লেখ্য-রূপ গঠনে ইংরেজ ও সংস্কৃতজ্ঞ হিন্দু পণ্ডিতরা খুবই সীমিত পরিসরে অল্পকালের জন্য আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন, তাও একটি বিশেষ শ্রেণির মধ্যে যে-শ্রেণির সাথে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর যোগাযোগ তেমন ছিল না ছিল না তাদের ভাষার প্রতি পক্ষপাতও। বাংলা গদ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ, যাকে লৌকিক রূপ বলা যায়, তা কিন্তু ওই ইংরেজ পণ্ডিতদের গদ্য নয়। খোদ কলকাতাতেই তার অনুসরণ বেশি ঘটেনি, ঘটা সম্ভবও ছিল না। মানুষের বাচনিক স্বাভাবিক স্ফূর্তি ও গতির সঙ্গে ওই কৃত্রিম ও খুড়িয়ে-চলা গদ্য তাল সামলাতে পারেনি বেশি দিন। ভাষা একটি জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত সৃষ্টি, তারাই ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখে দৈনন্দিন ব্যবহারের মাধ্যমে। তাদের ব্যবহৃত ভাষাই যে আধিপত্য করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এবং ঘটনাক্রমে, অনেকটা ঐতিহাসিক কারণেও বাংলা গদ্যের প্রমিত যে-রূপটি দাঁড়িয়ে গেছে তা মূলত পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ এক অঞ্চলের ভিত্তিতে, আমরা যাকে নদীয়া অঞ্চল বলে চিনি। প্রশ্ন হল কেন সিলেটি, চাটগাইয়া বা নোয়াখালীর আঞ্চলিক রূপটি বাংলা গদ্যের প্রমিত রূপ পেল না? আমার পাল্টা প্রশ্ন হচ্ছে সেটা পাওয়া কি সম্ভব ছিল? বাংলা গদ্যের যেসব নমুনা পাওয়া যাচ্ছিল তার সঙ্গে অনেক বেশি মিল ছিল পশ্চিমবঙ্গসহ পূর্ববঙ্গের সেই অঞ্চলগুলো যা পশ্চিমবঙ্গের নিকটবর্তী। তাছাড়া সর্বাঞ্চলিক জবানের প্রাধান্য দিয়ে কখনও একটি ভাষার প্রমিত রূপ গড়ে তোলা সম্ভবও নয়। হয় সেটা হয়ে উঠবে এক মিশ্রভাষা-রূপ, নয়তো কেবলই একটি মাত্র অঞ্চলের ভিত্তিতে। যদি একটি মাত্র অঞ্চল হতে হয় সেটা কোন অঞ্চল হবে– সেটা কি আমরা নির্ধারণ করতে পারব সর্বসম্মতিক্রমে? আঞ্চলিকতাবাদীরা হয়তো বলবেন, প্রমিত রূপের ধারণাতেই আমরা বিশ্বাস করি না, সবাই যার যার আঞ্চলিক ভাষায় লিখবো। আপনি আঞ্চলিক ভাষায় লিখলে প্রমিত তাতে কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করবে না অবশ্যই। প্রমিতের লক্ষ্য একটাই: একই ভাষার অন্তর্গত সর্বাঞ্চলিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগ।
আঞ্চলিকতাবাদীরা বলেন, প্রমিত রূপটি কৃত্রিম, নিষ্প্রাণ এবং সর্বোপরি তা আঞ্চলিক ভাষার ওপর ছড়ি ঘোরাতে চায়। সত্য বটে, মুখের ভাষার মিষ্টতা ও প্রাণবন্ততা এতে কম, ক্ষেত্র বিশেষে কৃত্রিমও বটে। কিন্তু এটাও তো সত্য এই কৃত্রিম ও নিষ্প্রাণ প্রমিত ভাষাকেই সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো লেখকরা বিদেশি ও আঞ্চলিক ভাষার ফোড়ন দিয়ে প্রাণচঞ্চল করে তুলতে পারেন। শুধু প্রমিত কেন, অপ্রমিত ভাষাও মৃত এবং এর শব্দসমূহও অর্থহীন যতক্ষণ না তাতে আমরা প্রাণসঞ্চার করি এবং অর্থারোপ করি। শব্দগুলো অর্থের বন্ধন ছেড়ে ঘুমিয়ে থাকে, আমরা আমাদের প্রয়োজনে তাদেরকে জাগিয়ে তুলি, আমরা তাদেরকে পুরনো অর্থে, কখনও বা প্রয়োজনে অর্থান্তর ঘটিয়ে থাকি ব্যবহারের মাধ্যমে। অতএব প্রমিত কৃত্রিম কি নিষ্প্রাণ সেটা মূল বিষয় নয়। মুখ্য বিষয় আমরা তাকে কৃত্রিমতা থেকে কতটা মুক্ত করে প্রাণসঞ্চার করতে পারছি। আল মাহমুদ বা জীবনানন্দ দাশের কবিতার মধ্যেই আমরা সেই উদাহরণ দেখতে পাব কীভাবে তারা আঞ্চলিক শব্দ ও আঞ্চলিক আবহ সঞ্চার করে ভাষাকে স্পন্দিত করে তুলেছেন। কিন্তু তারা যদি সেটা না করে পুরোপুরি আঞ্চলিক ভাষায় লিখতেন তাহলে সর্বাঞ্চলের পাঠগ্রাহ্যতা পেতেন না, পাওয়া সম্ভবও ছিল না। জীবনানন্দ দাশ কিংবা নজরুল ইসলাম যে অঞ্চল-নিরপেক্ষ পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছেন তার মূলভিত্তি প্রমিত রূপই, আঞ্চলিকতা নয়। কোনো বিশেষ অঞ্চলের ভাষায় লিখলে ওটা সম্ভবই হতো না।
প্রমিত ভাষার বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ হচ্ছে এটি ঔপনিবেশিক বাংলা এবং এটি সংস্কৃত পণ্ডিতদের মুসাবিদা করা ভাষা। কিন্তু বাংলা গদ্যের যে নিদর্শন পাওয়া গেছে তা তো উপনিবেশ গড়ারও অনেক আগের এবং তা সংস্কৃত পণ্ডিতদের দ্বারা বিকৃত হওয়ারও আগের রূপ। সত্য বটে, এই ভাষা নিয়ে পণ্ডিতরা ও বিদেশিরা অনেক কাটাছেঁড়া করেছেন; কিন্তু বাংলা প্রমিত গদ্যের যে মূলকাঠামো সেটা ইংরেজ ও সংস্কৃত পণ্ডিতদের তৈরি নয়। তারা ওতে কিছু রং চড়াবার চেষ্টা করেছেন বটে। তারা ওটাকে গড়ে তুলবার নামে বহু ছেলেমানুষী করেছেন বাংলা গদ্যের লিখিত রূপ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না থাকার কারণে। তারপরও তারা যে-গদ্য রূপটি দাড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন সেটা আশেপাশের বুলিকে পুঁজি করেই। বিভিন্ন এলাকার আঞ্চলিক বুলির প্রভাব তাদের রচিত গদ্যের মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে। তবু যদি ধরেও নেই যে, ঔপনিবেশিক খোঁয়াড়ি থেকে বের হওয়ার জন্য আমরা ভাষার বি-উপনিবেশিকরণ করব। কিন্তু প্রশ্ন হল সেটা কীভাবে করব? প্রমিত বাংলার পরিবর্তে আমাদের কোনো একটি আঞ্চলিক ভাষাকে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে? সেটি কোন অঞ্চলের ভাষা হবে? নাকি অন্য উপায়ে এই বি-উপনিবেশিকরণের কথা ভাবছেন তারা?

আঞ্চলিকতাবাদীরা, আরও একটা অনুযোগ তুলে প্রমিত ভাষাকে বর্জন করতে চান। অনুযোগটা হলো এটি পশ্চিমবঙ্গের ভাষা, এতে আমাদের অঞ্চলের ভাষার অংশগ্রহণ নেই– কথাটা আংশিক সত্য। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে লাগোয়া যশোহর খুলনা অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার নৈকট্য তাতে বেশ খানিকটা আছে। আজ ভাষার বিবর্তনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে, বহু রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্থানপতনের মধ্যদিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার ৪০ বছর পর, আমরা বাংলাদেশের মানুষ যে-বাংলায় লিখছি তা কি ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা থেকে মেজাজে-মর্জিতে আলাদা হয়ে যায়নি স্বাধীন ভূখন্ড ও স্বতন্ত্র্য সাংস্কৃতিক আবহের কারণে? পশ্চিমবঙ্গের বাংলা থেকে পুরোপুরি স্বতন্ত্র্য হতে চাওয়ার মধ্যেও একটা গোড়ামি ও বিদ্বেষ আছে যা ভাষার সম্পর্কে অবাস্তব ও অনৈতিহাসিক জ্ঞানেরই প্রকাশ। স্পেনের স্প্যানিশ থেকে লাতিন আমেরিকার স্প্যানিশের পার্থক্য থেকেই আমরা তা ইতিমধ্যে লক্ষ করেছি। অতিমাত্রায় স্বাতন্ত্র্যের ধারণাটি আমাদেরকে শেষ পর্যন্ত বিশুদ্ধতার সেই ধারণার কাছে নিয়ে যায় যেখানে অপরের কিছুই থাকবে না। বিশুদ্ধতার এই ধারণাটি পুরোপুরি ভাষাবিরোধী, প্রচ্ছন্ন জাতি-বিদ্বেষীও এবং সর্বোপরি তা ভাষার স্বাভাবিক প্রবাহেরও বিরোধী। ভাষা বড় হয় এবং অর্থের ও অভিব্যক্তির বহু ব্যঞ্জনায় রঞ্জিত হয় বহু উপাদানের স্পর্শে। অতি স্বাতন্ত্র্যবোধ হচ্ছে রুদ্ধ মনের সীমিত রূপ। এই বোধ যোগাযোগে বিমুখই শুধু নয়, স্বাতন্ত্র্যবোধের অহং-এ ভোগা এক ব্যাধি। সারাৎসারের স্বাতন্ত্র্যের তুলনায় বহিরাঙ্গিক স্বাতন্ত্র্যকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে তারা গৌণ বিষয়কে মনোযোগের কেন্দ্রীভূত করেন কেবল।

এটা খুবই কৌতূহলোদ্দীপক যে পশ্চিমবঙ্গীয় বাংলার বিপরীতে মুসলমানি মুখের ভাষার দাবিটি তৈরি হয়েছিল পূর্ববঙ্গে এমন এক সময়ে যখন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এক দল বুদ্ধিজীবী ভাষাকে লন্ডভন্ড করার জন্য নানান ধরনের জিকির তুলেছিল। এবং তাদের এই জিকিরের পেছনে ছিল মূলত সাম্প্রদায়িকতাবোধ। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা এই সাম্প্রদায়িক বুদ্ধিজীবীদেরকে তাদের ওই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ব্যবহার করেছিলেন। শাসকদের ইচ্ছানুযায়ী ওই সব বুদ্ধিজীবীরা আমাদের অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিকে সাম্প্রদায়িকতায় রূপান্তরিত করতে চেয়েছিলেন। আজ ৭০-৭৫ বছর পর প্রায় একই দাবি নিয়ে হাজির হচ্ছেন এমন এক সময়ে যখন আমাদের রাজনীতি ও সংস্কৃতির সাম্প্রদায়িকীকরণ ঘটেছে ব্যাপকভাবে। এই দাবির পেছনে সেই একই মনস্তত্ত্ব ক্রিয়াশীল। এই মনস্তত্ত্বের মূলে রয়েছে ভারতবিরোধিতাবোধ এবং সজ্ঞানে যদি সাম্প্রদায়িকতাবোধ নাও থাকে, তারপরও এর একটি সাম্প্রদায়িক অর্থ তৈরি হয়ে যায়। এটা ঠিক যে বাংলাদেশে এখন ভারতের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিপুল। ফলে এই আধিপত্যের বিরোধিতা খুবই ন্যায়সঙ্গত। এই বিরোধিতার সূত্রেই ভাষিক স্বাতন্ত্র্যের দাবিটিকেও এক ধরনের বৈধতা দেয়া হয়। তাছাড়া, বিভাগপূর্ব এবং উত্তরকালেও হিন্দু লেখক-বুদ্ধিজীবী ও অভিজাত শ্রেণীর মুসলমানবিরোধিতা ও ইসলামবিদ্বেষের কারণেও পশ্চিমবঙ্গীয় বাংলাকে বর্জনের একটা মনস্তাত্ত্বিক ভিত তৈরি হয়ে আছে আমাদের মধ্যে। এটা তো ঐতিহাসিকভাবেই খুব সত্য যে, হিন্দু সম্প্রদায়ের লেখক-বুদ্ধিজীবীরা ইংরেজ ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে বিশ শতক পর্যন্ত বাংলা ভাষা থেকে আরবি-ফারসি শব্দ ঝেটিয়ে বিদায় করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন স্রেফ মুসলিমবিদ্বেষ থেকে এবং আরবি-ফার্সি শুধু বর্জনই করলেন না, বোঝার আঁটির মতো সংস্কৃতের প্রয়াত বুড়োকেও বাংলার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেন তারা।
আঞ্চলিকতাবাদীদের বিরোধিতার আরও একটি মনস্তাত্ত্বিক কারণ হচ্ছে এই যে বাংলা গদ্যরূপ নির্ধারণের পেছনে মুসলমানদের অংশগ্রহণহীনতা। যেহেতু মুসলমানদের আংশগ্রহণ ছিল না তাই এই ভাষিক রূপটি গ্রহণে তাদের অনীহা প্রবল। আজকে তারা ভাষার স্বাতন্ত্র্যের প্রতি দরদী হলেও এক সময় এই মুসলমান অভিজাত শ্রেণি ভাষার স্বাতন্ত্র্য দূরের কথা, গোটা বাংলা ভাষার প্রতিই ছিল অনীহ। তারা নিজেদের আত্মপরিচয় ও আভিজাত্য খুঁজে পেতেন উর্দু, আরবি আর ফার্সিতে। কিন্তু নানা কারণে তাদের পেয়ারের উর্দু, আরবি ও ফার্সি জবানের পরিবর্তে যখন ঔপনিবেশিক শক্তির মদদে ইংরেজি ও বাংলাভাষা সমাজে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করলো তখন মুসলমান সম্প্রদায় ধীরে ধীরে বাংলার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। কিন্তু আগ্রহী হয়ে উঠলেও হিন্দু পণ্ডিতদের সংস্কৃতায়িত বাংলা রূপের তারা বিরোধিতা করলেন একই রকম সাম্প্রদায়িকবোধ থেকে– বিভাগোত্তর কাল থেকে গোটা পাকিস্তান আমল পর্যন্ত। তারই সর্বসাম্প্রতিক চেহারা হচ্ছে প্রমিত ভাষার বিরোধিতা।


কিন্তু আমরা এখন যে বাংলায় লিখি তা পশ্চিমবঙ্গের বাংলা থেকে অনেকটাই আলাদা হয়ে গেছে–এটা তারা বুঝতে চান না। যে আরবি-ফার্সির বিরোধিতা এক সময় পশ্চিমবঙ্গের লেখক-বুদ্ধিজীবীরা করেছিলেন তার উপস্থিতি এখন তাদের ভাষায় প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। অর্থাৎ বিরোধিতা করলেই বর্জন করা যায় না। বর্জন যে করা যায়নি তার কারণ পশ্চিমবঙ্গের জনগোষ্ঠীর ওপর আরবি-ফার্সি ভাষার কয়েকশ বছরের আধিপত্য। বাংলা ভাষার রক্তের সঙ্গে আরবি-ফার্সি শব্দগুলো মিশে আছে। পণ্ডিতদের চোখ রাঙানি দিয়ে তাদেরকে হটানোর উপায় নেই। সেগুলো এখন আমাদের আত্মপ্রকাশের উপায় হয়ে উঠেছে। ঠিক একইভাবে প্রমিত ভাষার রূপটির উদ্ভবের পেছনে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু সম্প্রদায়ের ভূমিকা রয়েছে বলে তাকে বর্জন করার দাবিটাও অর্থহীন; কারণ এর মধ্য দিয়ে শতশত বছরব্যাপী আমাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড জড়িয়ে আছে। এটি এখন আমাদেরও আত্মপ্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। অস্বীকার করছি না যে, এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার উপায় আমাদের আঞ্চলি ভাষা থেকে শব্দ আহরণ করে প্রমিত ভাষায় অন্তর্ভুক্ত করা। কিন্তু সেই অন্তর্ভুক্তি ঘটবে সাহিত্যে তার প্রয়োগের মাধ্যমে। সেটা করতে পারলেই আমাদের প্রমিত ভাষা কেবল তার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রমই করবে না, একইসঙ্গে তা পশ্চিমবঙ্গীয় ভাষা থেকেও আরও বেশি স্বতন্ত্র হয়ে উঠবে।

বাংলা গদ্যের প্রমিত রূপ ও আঞ্চলিক ভাষার প্রশ্নটি নিয়ে যেসব তর্কবিতর্ক তৈরি হয়ে আছে তার একটি জবাব ভাষাতাত্ত্বিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সেই ১৯৫৩ সালের ১০ অক্টোবরেই দিয়েছিলেন। আমি মনে করি, আমাদের বিভ্রান্তি মোচনের জন্য শহীদুল্লাহর ওই জবাবটি স্মরণ করা খুবই জরুরী। তিনি বলেছিলেন–
“কতকগুলি অ-সাহিত্যিক গোঁড়া রাজনীতিক বাংলা অক্ষর এবং ভাষাকে গায়ের জোরে বা আইনের জোরে রাতারাতি বদলাইতে চাহিলেও বাংলা ভাষা প্রবল নদীপ্রবাহের মতো নিজের মরজিমত আপনার গতিপথ বাছিয়া লইবে। বাহিরের কোনো শক্তিই তাহাকে বাধা দিতে পারিবে না। ভাষা পরিবর্তনশীল সুতরাং পরিবর্তন আসিবেই। কিন্তু তাহা ভাষাতত্ত্বের নিয়ম অনুসারে, কাহারো হুকুম বা ইচ্ছানুসারে নহে। … কোনও কোনও রাজনীতিক বলিতেছেন পূর্ব-পাকিস্তানের বাংলা পূর্ববঙ্গের চলিত ভাষার উপর স্থাপিত হইবে। এই মতবাদের কারণ কী, আমি বুঝিতে পারি না। পশ্চিমবঙ্গের সহিত আমাদের রাজনীতিগত পার্থক্য আছে; কিন্তু ভাষাগত তো শত্রুতা নেই। যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পাইয়াছি, তাহা কাহারও কথায় আমরা ত্যাগ করিতে পারি না। ভারতের অন্তর্গত দিল্লী ও লক্ষ্মৌ অঞ্চলের উর্দু ভাষা হতে পাকিস্তানের উর্দুকে পৃথক করিতে হইবে, এমন কথা তো কাহাকেও বলিতে শুনি না। আমেরিকা, ইংল্যান্ডের সহিত স্বাধীনতা লাভের জন্য যুদ্ধ করিয়াছিল কিন্তু তাহারা ইংরেজি ভাষা তো ছাড়ে নাই। অস্ট্রো-হাঙ্গারী ও জার্মান দুটি পৃথক রাষ্ট্র ছিল কিন্তু তাহাদের তো একই জার্মান ভাষা ছিল। …কিন্তু পূর্ববঙ্গে বহু উপভাষা আছে, তাহার কোনটি গ্রহণ করা হইবে? …তাহার পর জিজ্ঞাসা যে, ব্যাকরণও কি পূর্ববঙ্গের হইবে? এখন কেহ বলিতে পারেন, আমি ঢাকা জেলার লোক, কেন অন্য জেলার ভাষা বলিব বা লিখিব? এই রূপে প্রত্যেকে যদি সাহিত্যে নিজ নিজ স্থানীয় ভাষা ব্যবহার করিতে থাকেন, তবে সে কি একটি Tower of Babel সৃষ্টির মতো হয় না?” ( দীপ্ত আলোর বন্যা, আজহারউদ্দীন খান, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৯৯,পৃ. ১৯৫)
শহীদুল্লাহর এই বক্তব্যের পাশাপাশি আমাদের এটাও স্মরণ করা উচিত যে, প্রমিত ভাষায় লেখা সত্ত্বেও তারই উদ্যোগে সংকলিত ও প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা ভাষায় প্রথম আঞ্চলিক ভাষার অভিধান। অর্থাৎ তিনি প্রমিত ভাষায় লিখলেও আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োজন ও গুরুত্বকে মোটেই খাটো করে দেখেননি।
প্রমিত ভাষা নিয়ে প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র যতই খবরদারি করুক না কেন, তাদের এটা জানা উচিত যে, প্রমিত নিজে কখনো এই দাবি করে না যে, সে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাকে প্রতিনিয়ত আঞ্চলিক ও বিদেশি ভাষার অভিব্যক্তি আত্তীকৃত করে এগিয়ে যেতে হয় বা নিজের বেঁচে থাকার পুষ্টি জোগাতে হয়। প্রমিত বলতে যেমন এটা বোঝায় না যে, আঞ্চলিক ভাষা উচ্ছেদ করতে হবে, তেমনি আঞ্চলিক ভাষা প্রবহমান থাকলে প্রমিত কিছু থাকা যাবে না– এটাও এক বিপজ্জনক প্রত্যয়। আমরা ধরেই নিয়েছি যে, পরস্পর পরস্পরের বিরোধী। বরং উল্টো: এরা স্বামী-স্ত্রীর মতো ভিন্ন লিঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও একই সংসারে যাপন করে, তারা পরস্পরকে সঙ্গমের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করে। প্রমিত থাকতেই হবে, সেটা শাসনের উদ্দেশ্যে নয়; পরস্পরের প্রতি লেনদেনের একটি উন্মোচন হিসেবে। আঞ্চলিক ভাষাকে উপেক্ষা করে প্রমিত কখনোই বড় হতে পারবে না, তা সে চায়ও না; কিন্তু সব আঞ্চলিক ভাষারই প্রয়োজন হয় একটি প্রমিত ভাষার যার মাধ্যমে সে নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে।
Flag Counter


5 Responses

  1. আঞ্চলিক ভাষা বইলা কিছু হয় না। অনেক জায়গায় তা আমি বলছি। কাজেই আমারে আঞ্চলিক ভাষার লগে এক কইরা দেখাইয়েন না।

  2. Mukul Mia Talukder says:

    একটি সুন্দর মননশীল রচনার জন্য ধন্যবাদ। প্রখাত ভাষাবিদ ডঃ শহিদুল্লার মতামত মেনে চলার মধ্যেই, প্রমিত ভাষার যথাযথতা সম্পরকে কোন প্রশ্ন তোলা যুক্তিযুক্ত নয়। আমরা যারা বাংলাদেশে বাংলায় লেখার চেষ্টা করি, তাদের দায়িত্ব হবে, জোরালো প্রমিত বাংলার প্রচুর চর্চা করে এর গতি এবং প্রকৃত রুপ দেয়া। একমাত্র এভাবেই আমরা প্রমিত বাংলার সেবার মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে পরিপুষ্ট করতে পারি এবং নিজেদের শব্দের যথাযথ ব্যাবহারে তার গতিময়তা বাড়াতে পারি। সেটাই হবে বাংলাদেশের বাংলা। যেমন করেছেন মুজতবা আলী, নজরুল ইসলাম, আল মাহমুদ এবং শামসুল হক। ভাষা বহমান নদীর মত। এর চলমান স্রোতের তোরে সকল আবর্জনা ভেসে যাবে। শুধু রয়ে যাবে সেই সকল শব্দ যা পরিস্কার বালির মত স্পষ্ট। বাংলার জনগনই তা যথাসময়ে নির্ধারণ করবে।

  3. ইকবাল করিম হাসনু says:

    “আজ ৭০-৭৫ বছর পর প্রায় একই দাবি নিয়ে হাজির হচ্ছেন এমন এক সময়ে যখন আমাদের রাজনীতি ও সংস্কৃতির সাম্প্রদায়িকীকরণ ঘটেছে ব্যাপকভাবে। এই দাবির পেছনে সেই একই মনস্তত্ত্ব ক্রিয়াশীল। এই মনস্তত্ত্বের মূলে রয়েছে ভারতবিরোধিতাবোধ এবং সজ্ঞানে যদি সাম্প্রদায়িকতাবোধ নাও থাকে, তারপরও এর একটি সাম্প্রদায়িক অর্থ তৈরি হয়ে যায়। ”

    – যথার্থ বলেছেন রাজু

  4. গুরুচণ্ডালী বইলা কিছু নাই, আছে বাংলা ভাষা ‍//

    প্রমিত বাংলা বাংলার একটা শক্তিশালী আধিপত্যবাদী উপভাষা।

    ভাষা থুইয়া উপভাষা শিখাইতে তৎপর ভালোত্বের ধ্বজাধারী প্রথম আলো ও আমাদের পয়সা খাওয়া আকামা প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি।

    প্রমিত ভাষার মধ্য দিয়া ব্রিটিশ ইংরাজির সমান্তরাল একটা নকল বাংলা বাংলাদেশ ও মেইনলি ইন্ডিয়ার পশ্চিমবাংলায় প্রচলিত আছেন। এই প্রমিত সাহেবের আসল কাম বাংলায় ইংরাজি বলা। ব্রিটিশ গোলামির ভাবধারা ও নাইসনেস শিখানো।

    বাংলা ভাষারে এর ভাব-চক্করসহ ফিরা পাইতে হইলে প্রমিতের গুষ্টি কিলাইতে হবে। প্রমিতের আগের বাংলার লগে যোগ লাগাইতে হবে আমাদের। কবিতা ও কাহিনী দুই প্রকারেই তা দরকার। এই কাজ করতে গিয়া প্রমিতের কুঅভ্যাসের ভিতর দিয়াই যাইতে হবে। প্রমিতরে ব্যবহার কইরা আমরা শক্তিনাশ করব প্রমিতের। তবে সাবধান, প্রমিত ভাষা সাহেব আপনার মাথায় হাত বুলাইয়া ভাষার আঞ্চলিকতারে মাইনা নেওয়ার উদারতা দেখাইবেন আপনারে।

    এমনকি আঞ্চলিক ভাষার অভিধানও বানাইছেন প্রমিত পণ্ডিতরা। কিন্তু জানবেন, আঞ্চলিক বইলা কোনো ভাষা হয় না। ভাষার উপত্ব অঞ্চল ভেদে হয় না। বরং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততার বাইরে আরোপিত ভাষাগুলিই উপভাষা।

    প্রমিত বাংলা উপভাষার মূল শক্তি ব্রিটিশ ইংরাজির প্রাতিষ্ঠানিকতা বা গাম্ভীর্য। এই গাম্ভীর্যকে উল্টাইয়া দেওয়াটাই হইতেছে আসল কাম। প্রমিত খেদানোর একটা সহজ উপায় প্রমিত ভাষার মধ্যে ইতরামি বা লঘুতার সঞ্চার। তা দিয়া আস্তে আস্তে আপনি এই ভাষারে চুটকির বা ব্যঙ্গের বা গালাগালির বিকল্পে পরিণত করতে পারবেন। আপনার বাংলা ভাষা তো বাংলাই আছে। দরকার বিদেশী ভাষার তথা প্রমিতের মাতব্বরি নিকাশ করা।

    এই ব্যাপারে আমাদের অগ্রগতি অসামান্য। প্রমিত বেচারা বেচইন হইয়া উঠছেন। বাংলা একাডেমি দুর্গের বাইরে প্রমিতের অবস্থা বড় সঙ্গীন।

    যারা বলেন ‘প্রমিতও আছে বাংলাও (বাংলারে তারা বলেন গুরুচণ্ডালী!) আছে অসুবিধা কী’ তারা আসলে দুই নাম্বারি করেন। তারা বাংলার উপরে প্রমিতের মাতব্বরির ওকালতি করেন।

    কিছু আছেন সাধু বাংলা উপভাষার ব্যায়াম করেন। এনারাও ইংরাজির গোলাম। এদের ব্যাপারে ফাইট দেওয়ার প্রস্তুতি নেন ইয়াং সমাজ। এই দেশের প্রায় সব লেখক, কবি ও বুদ্ধিজীবী ‘কলকাতা’ খাইয়া ভদ্রলোক সাজছেন, আপনাদের কইলকেতার দরকার নাই। আছে কি?

  5. আসহাবুর রহমান, ঢাকা says:

    রাজু আলাউদ্দিনকে ধন্যবাদ চমৎকার বিশ্লেষণমূলক দীর্ঘ লেখাটির জন্য ৷ এর প্রতিক্রিয়ায় কিছু যোগ করার নেই ৷ আমি শুধু বিষয়টি একটু ভিন্নভাবে বলতে চাই ৷ বাঙলার শুধু পূর্বাঞ্চল কেটে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে ১৯৪৭-উত্তর প্রাক্তন পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম জাতিয়তাবাদী লেখক-সাহিত্যিকরা নয়া জবান সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন ৷ আবুল মনসুর আহমদ এ উদ্যোগের স্রষ্টা ৷ পাক-বাংলার জবান তাঁরই পরিকল্পনা ছিল ৷ এখন সেই উদ্যোগ প্রমিত খেদানোর মাধ্যমে নতুন করে শুরু হয়েছে ৷এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে আরেক অধ্যাস ৷ তা হলো পূর্ববঙ্গকে প্রাক-১৯৪৭ কালেও মুসলিম এবং পশ্চিমবাংলাকে শুধু হিন্দু রাষ্ট্ররূপে গণ্য করা ৷ প্রাক-১৯৪৭ বাঙলা একটি অভিন্ন দেশ ছিল যেখানে বর্ধমানের কাজী নজরুল ইসলাম, আবুল হাশিম, বীরভূমের ড. মুহম্মদ কুদরৎ-ই-খুদা, চব্বিশ পরগণার মওলানা আকরম খাঁ ও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দেশের রাজধানী কোলকাতাকেই তাঁদের কর্মক্ষেত্র হিশেবে বেছে নিয়েছিলেন ৷ একই কারণে কুমিল্লার নাসিরউদ্দিন, যশোরের গোলাম মোস্তফা, ময়নসিংহের আবুল মনসুর আহমদ, ফরিদপুরের হূমায়ুন কবির, জসীমউদ্দীন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ঢাকার বদলে কোলকাতাকে বেছে নিয়েছিলেন ৷ নিজেকে প্রকাশের আকাঙ্ক্ষায় সব উচ্চাভিলাষীরাই রাজধানীতে আসেন ৷ সেটাই স্বাভাবিক ৷ এখন যেমন ব্রাত্য রাইসু ও সোহেল হাসান গালিব রাজধানী ঢাকায় থাকেন ৷ তাই কোলকাতায় জন্ম নেয়া প্রমিত ভাষা উৎখাতের দাবিটি তাঁদের ইতিহাস-অজ্ঞতাপ্রসূত ৷ এঁদের প্রমিত বাংলা বর্জনের দাবিটি ১৯৬৭-এর জুন মাসে ‘তামুদ্দনিক স্বাতন্ত্রবাদী’ বুদ্ধিজীবীদের রবীন্দ্রনাথ বর্জনের বিবৃতির সঙ্গে তুলনীয় ৷ এঁদের মান্ডুক্যবাদী চিন্তায় বাংলাভাষার হিন্দু-বৌদ্ধ-এনিমিস্ট উৎস, ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার একইসাথে কোলকাতার ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতভাষাদোষে নাপাক অতএব তা বর্জনীয় ৷ এঁদের পূর্ববঙ্গকে শুধু মুসলমানের দেশ ও তার সমস্ত জেলা-উপজেলা-ইউনিয়নের কথ্যভাষাকে মুসলমানের ভাষা হিশেবে গণ্য করায় মারাত্মক বিভ্রান্তি রয়েছে ৷ এ কথাটি এজন্য বলছি যে কোলকাতার ভাষা হিন্দুস্পৃশ্য ও প্রমিত বাংলা সংস্কৃতশব্দবহুল বলেই তা বোধহয় তাঁদের কাছে বর্জনীয় ৷ এছাড়া পূর্ব বাংলার কোনো উপজেলার গ্রাম্যবুলিকে প্রমিত বাংলার স্থলাভিষিক্ত করার কোনো যুক্তি নেই ৷
    আধুনিক বাংলা গদ্য মৃত্যুন্জয় বিদ্যালঙ্কার,ভবানীচরণ, রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্রের মতো সংস্কৃতভাষার পন্ডিতদের হাতে জন্ম নিয়েছিল ৷ তা ছিল বাঙলার ইতিহাসের অনিবার্য ঘটনা ৷ এর অন্যথা হওয়া সম্ভব ছিল না ৷কারণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাঙলার সুবাদার আজিমউশ্বান কোলকাতাকে ১৬৯৬ সালে দান করেছিলেন ৷ পলাশির বিজয়ের পরে তাই কোলকাতা বাংলার রাজধানীতে রূপান্তরিত হয়েছিল ৷ সেসময় ইংরেজ শাসকদের ঘনিষ্ঠ আরবি ও ফার্সি জানা অনেক আলিম ছিলেন কিন্তু তাঁরা কেউ বাঙালি ছিলেন না ৷ ইংরেজ শাসকের অভিপ্রায়ে তাঁরা ফার্সিতে বাঙলার ইতিহাস লিখেছেন যেমন সৈয়দ গোলাম হোসেন খান তবাতবায়ী লিখেছিলেন ‘সিয়ার-ই-মুতাখ্খরীন’ এবং গোলাম হোসেন সলিম লিখেছিলেন ‘রিয়াজ উস সালাতিন’ ৷ তাই বাংলা বই ও ব্যাকরণ লেখানোর জন্য ইংরেজদের বাঙালি হিন্দু পন্ডিতদের উপরই নির্ভর করতে হয়েছিল ৷
    কিন্তু ইতিহাসের এই ঘটনা-পরম্পরা বাংলাভাষার মহা উপকার করেছিল ৷সংস্কূত ভাষা সম্ভবত পৃথিবীর শুদ্ধতম ও সমৃদ্ধতম ভাষা ৷ এসিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রথম ইংরেজ ভারতবিদ্যাবিদ উইলিয়াম জোন্সের ভাষায়, “The Sanscrit language, whatever its antiquity, is of wonderful structure; more perfect than the Greek, more copious than the Latin, and more exquisitely refined than either…”৷ বলা নিষ্প্রয়োজন যে এর ফল হিশেবে আমরা পেয়েছি দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে উন্নত, সমৃদ্ধ শব্দসম্ভারযুক্ত, জটিলতম উচ্চচিন্তা প্রকাশক্ষম আধুনিক বাংলা ভাষা যাকে মন্ডুকীয় মূঢ়বুদ্ধিতে বর্জনপূর্বক নয়া জবান চালুর জন্য তাঁরা আস্ফালন করছেন ৷ তবে ‘তামুদ্দনিক স্বাতন্ত্রবাদীরা’ যেমন ‘পাক-বাংলার জবান’ সৃষ্টির চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন, এঁরাও একই কারণে অসফল হবেন ৷ আধুনিক বাংলা ভাষা যে কাঠামোয় স্থিত তা কখনই সঙ্কীর্ণ, স্থূল, অমার্জিত গ্রাম্যতার স্তরে নামবে না ৷ তা নিজের গ্রামের বুলি নিয়ে মন্ডুকেরা যতই গর্বিত ও তৃপ্ত হোক না কেন ৷ মানুষ জীবের পক্ষে যেমন শিম্পান্জিতে জৈবিক অধোগমন সম্ভব নয় তেমনি প্রমিত বাংলা পূর্ববঙ্গের কোনো উপভাষা দিয়ে নির্মান সম্ভব নয় ৷ প্রমিত বাংলা বিশ্বের ২৮ কোটি বাঙালির কথা বলার, লেখার, ভাব প্রকাশের ও যোগাগোগের ভাষারূপে স্থিতি লাভ করেছে ৷ এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা, কোনো উপভাষা নয় ৷এটি বাংলাদেশ,পশ্চিম বাংলা, ত্রিপুরা ও আসামের তিনটি জেলায় বসবাসকরী অভিন্ন নৃগোষ্ঠীর (ethnic group) সর্বজনীন ভাষা ৷ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এর পরিবর্তন হতে থাকবে, নতুন শব্দ, বাক্যরীতি গ্রহণ করবে,সমাজ ও সংস্কৃতি যত এগুতে থাকবে ৷
    আরেকটা কথা, ইংরেজি প্রভাবিত প্রমিতের আধিপত্যে ব্রাত্য রাইসু ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর চুটকি ভাষার ইতরামি চালাতে পারেন ৷ কিন্তু তা হবে হিন্দি প্রবচনের, “হাতি চলে বাজার, কুত্তা ভুকে হাজার”এর মতো ৷ বাংলায় এর আগেও কালাপাহাড়ের আবির্ভাব হয়েছে ৷ তবে তাতে বাঙলার মূর্তিশিল্প ও স্থাপত্যকলার বিকাশ রুদ্ধ হয়নি ৷ বাঙলার শিল্পকলার রসস্বাদনেও কোনো বিঘ্ন ঘটেনি ৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.