কবিতা

লিপি নাসরিন-এর প্রণয় বিহার ও অন্যান্য

লিপি নাসরিন | 27 Mar , 2019  


প্রণয় বিহার

নিশুতি রাতের পাঁজর ভেঙে
ট্রেনটি ছুটেছিল সেই জানা গন্তব্যের অচেনা শহরে।
হেমন্তের তখন বড্ড পৃষ্ঠটান,
হিমেল হাওয়া পাল তুলেছে উজান নায়ে গাঙ।
আমরা তখন চুপটি করে দু’জন,
ঢুকে গেছি কল্পগাথার মঞ্চে অনুক্ষণ ।
প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে থেকে শুরু,
আমার তখন বুকের বাতাস কাঁপছে দুরু দুরু ।
ভাবছি কী হতে কী হয় ,
তুমি তখন ট্রেনে ওঠার অধীর অপেক্ষায়।
ট্রেন এলো লোহার পাতে বজ্র আওয়াজ তুলে,
আমরা দু’জন এগিয়ে গেলাম ত্রস্ত পায়ে ভীড়ে।
তুমি উঠলে আগে
হাত বাড়িয়ে দিলে, আমায় তুলে নিতে।
উঠতে গিয়ে হঠাৎ তাড়াহুড়োয়,
পা দু’টো একটু উঠলো যেন দুলে।
তাল হারিয়ে তখন আমি বুঝি,
এলাম প্রথম তোমার কাছাকাছি।
চোখ যখন পড়লো গিয়ে চোখে,
দেখলাম সেথা ভরা নদী ছলছলিয়ে উঠে।
বললে তুমি- সাবধানে এস;এটি আমাদের বগি,
আমি তখন মায়ামৃগ আরণ্যকের বধি,
ট্রেনের তালে দুলছে কেবল অংশ নিরবধি।
কামরাটিতে ঠান্ডা হাওয়ার শিহর লাগে প্রাণে,
বদ্ধ কপাট মনের মাঝে লীলা খেলায় মজে।
তুমি তখন পা ছড়িয়ে ঘুমের ভানে শুয়ে,
আমি তখন চোরাচোখে দেখছি তোমায় চেয়ে।
হঠাৎ তুমি এক ঝটকায় উঠলে এসে কাছে,
বললে – দাঁড়িয়ে কেন বসো আমার পাশে।
আমার তখন কী যে দশা কেমন করে বলি,
তাড়া খাওয়া মায়ামৃগ সন্তর্পণে চলি।
বিষমাখা এক তীরের ফলার লক্ষ্যভেদী তাক,
আমায় তখন বিঁধছে যেন,দিচ্ছে কালের ডাক।
খোঁপা খুলে চুল এলিয়ে বসলাম সংকোচে ,
মাথার গোলাপ তখন গন্ধ ছেড়ে তোমার পায়ের কাছে ।
চকিত তাকে কুড়িয়ে নিয়ে ধরলে করতলে ,
হাঁটু মুড়ে বসলে এবার আমার শাড়ির ভাঁজে।
বললে- দেবী পূজা নাও ঝরা বাসি ফুলে।
আমি তখন শঙ্কা ভুলে খিলখিলিয়ে হেসে,
দু’হাত তোমার মুড়িয়ে দিয়ে বললাম চোখ তুলে,
জানালাটা খুলি?
হয়ত তখন ঢাকের আওয়াজ তোমার মনের মাঝে,
সরে গিয়ে উঠলে তুমি হতোদ্যমের সাজে।
এক মুহূর্ত পলক তোমার অন্য কোথাও ঘুরে,
স্মিতহাস্যে আমায় শুধায়-খুব কি কষ্ট পেলে?
বললাম দাও না খুলে জানালাটা
আকাশ দেখি, মুক্তি পাক প্রাণটা।
পাগল মেয়ে, জানালা খুললে বাইরের ধুলোবালি ,
ঢুকে যাবে শূন্য ঘরে ফেলে কানাগলি।
আমার তখন কী যে হলো,
মাথার ভিতর হয়ে গেল অনেক এলোমেলো ।
তখন দু’হাতে জড়িয়ে তোমার গলা
কণ্ঠে ঢেলে প্রাণ মদিরার জ্বালা-
বললাম- দাওনা খুলে ,ফাঁকা বিলে জ্যোৎস্না দেখি
আকাশ ভরা তারা গুণি,হাতের মাঝে জোনাক ধরি।
তুমি তখন বিশ্বজয়ী নর,
আঙুল ছোঁয়া বীণার তারে বাজলো আমার অধর।
অন্ধকারে ট্রেন চলেছে ঝমঝমা ঝম ঝম,
সময় তখন আলোর গতি যেন মোদের পর।
জানালা খুলে ঢুকে পড়ে হঠাৎ বাউরি বাতাস,
শাড়ির আঁচল খসে পড়ে, খসে পড়ে লাজ।
এক ঝটকায় সরে গিয়ে বললাম সিদ্ধি সুরে,
চোখের আকাশ, মাতাল বাতাস সবাই আমায় ডাকে
দাও না বাঁধন খুলে!
ভয়ঙ্কর এক খেলায় তুমি মত্ত তখন সাঁঝে
মনের মাঝে মন জ্বেলেছো আগুন ঘিরে নাচে।
চারদিকে সাজ রবে তাই অন্ধকারের দীপ,
মশাল জ্বেলে তাকিয়ে রয় আবীরে অধীর ।
আমি তখন ছুটে গিয়ে জানলা ছুঁয়ে হাতে,
আকাশ ভাঙা মেঘের রতি আমার কেশের মাঝে।
চুল ছুঁয়ে চিবুক ধরে বললে অভিমানে
দামাল প্রেমের মন্ত্র তুমি কেমনে জানো মেয়ে?
ঘুমের ঘ্রাণের মত আচ্ছন্ন পরিপাটি,
বিছিয়ে আমি তখন বিক্ষুব্ধ ল্যাম্পপোস্ট দেখি।
অন্ধকারে ছুঁয়ে দেখি তোমার তপ্ত শ্বাস,
দ্বৈত বাতাস ভারি হয়, সীমান্ত রেখায় বিশ্বাস ।
হয়ত তখন পৃথিবী সুলভ সোহাগ মেখে,
ঘুমিয়ে গেছে খোলা ছাদে নক্ষত্রের পাড়ে।
শুধু দু’টি আলগা প্রাণ রেলের ছাদের তলে,
বিশ্বাস মেখে নিশুতি রাতের প্রহর গুণে চলে।
ফিরতি ট্রেনে আমরা যখন মুখোমুখি বসে,
অনেক কথার জমা সিন্ধু বিন্দু-বিন্দু নাচে।
হাতটা আমার আদর করে বুকের মাঝে নিয়ে,
বললে- এ গল্পের সমাপ্তি কি এত সরল হবে?
আমায় তখন ঘর ডেকেছে
সময় যে আর নাই,
রক্তে তোমার বেনো জলের গন্ধ শুধু পাই।
কোষের মাঝে হঠাৎ পেলাম বসন্তের আভাস,
হিমের ঘরে ছড়িয়ে গেল পসারিনী বাতাস।
ট্রেন ছুটে যায় অচিন পুরের অচিন দেশের পানে
মোদের গল্প ফুরায় জীবন নামের ব্যস্ত খেয়ার পারে।

শৃঙ্খলে তোমার মুক্তি

তুমি কি লুণ্ঠিত এক লণ্ঠন?
নিজে জ্বলেও জ্বালাতে পারো না
অনাদ্রিতার মেঘমন।
সে অঙ্গে ছড়িয়ে বৈরীবিতান
যেখানে তোমার প্রবেশ নিষিদ্ধ অনাদিকাল।
তবুও তুমি তারই আঁচলে মানচিত্র খোঁজ
নিখাদ প্রেমের গল্প আঁকো,
তোমার ইতিহাস ভুলপাঠে জর্জরিত
তোমার ভূখণ্ড চোরাকান্নায় হয় প্লাবিত
তুমি এক বৈবাহিক ক্রীতদাস,
নিত্য কাজের, নিত্য প্রাণের অবরুদ্ধ কুঠিরে
তোমার আজন্ম স্বর্গবাস।
তোমার জমিন দু’হাতের ব্যবধানে
তোমার তৃপ্তি ক’পয়সায় কেনা
যন্ত্রমানবীর আরক্তিম ঠোঁটে।
তোমার কাছে পুরুষতন্ত্র
চাবুকে চাবুকে নিষ্পেষিত,
সত্যি কি তাই?
নাকি এক দিঘির স্বচ্ছজলে সন্তর্পণে অবগাহিত।
সেটি তোমাকে বিভক্তি থেকে দেয় মুক্তি
তোমার দাসত্ব তোমাকে দিয়েছে
সীমানা ভাঙার অফুরান শক্তি।
তুমি তাই নিরস জমিনে খুঁজে পাও এক সুখকর পল্লব
বৃষ্টি নহরে জলমগ্ন হয়
তোমার শুষ্ক অর্ণব।
ক্রীতদাসত্বই তোমাকে দিয়েছে সীমাহীন জমিন
তুমি তাই বাঁধাহীন এক শৃঙ্খলিত বন্ধনে
রুদ্র সমাসীন।


দিঘির কাছে ফেরা

খুব ছোটবেলায় আমার একটা ডোবা ছিল,
সেই ডোবার পানিতে লালপদ্ম লাগিয়ে
আমি সারাদিন পদ্ম ফোটার অপেক্ষায় থাকতাম।
মনে মনে ভাবতাম
আমি যখন বড় হবো
তখন আমার অনেক লম্বা চুল হবে
আমার খোঁপা ঘিরে থাকবে লাল পদ্ম।
প্রতিদিন আমি ডোবার ধারে বসে পদ্ম ফোটার গান গাইতাম
আর অপেক্ষায় থাকতাম কবে বড় হবো,
পদ্ম ফুটবে, আমার খোঁপা হবে লাল পদ্মে ঘেরা।
এমনি করে আমার শৈশব কৈশোর কাটলো,
কিন্তু লাল পদ্ম আর ফোটে না।
তারপর যৌবনে এসে দেখলাম-
ডোবাটা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে,
তখন মনে মনে আমার লাল পদ্ম খুঁজতাম।
ডোবার ধার ছিল আমার খুব প্রিয় জায়গা,
আমার যখন খুব মন খারাপ হতো-
আমি ডোবার ধারে ঘাসের উপর বসতাম।
ওর স্থির জলের বুকে নুড়ি ফেলে ঢেউ জাগাতাম,
নাম না জানা বুনো লতা আর পতিত মাছের খেলা দেখতাম।
আমি অবাক হয়ে দেখি-
আমার ডোবাটা না মস্ত দিঘি!
সে দিঘির বুকে আমার শৈশব নেই,
নেই কৈশোরের সে লাল পদ্মের স্বপ্ন।
যে ডোবাটা ছিল আমার একার,
সে আজ অন্য মানুষের জলের আধার।
আমার মন খারাপের নুড়ি তার বুকে আর ঢেউ তোলে না।
তার বুকে এখন রঙিন মাছের প্রদর্শনী মেলা, জলের ফোয়ারা, দু’পাশ পাকা শানে ঘেরা।
দিঘির কাছে গিয়ে বললাম-
তুমি আমার সেই ডোবাটা না?
যেখানে একটা লাল পদ্মের আশায় কত গান গেয়েছি,
যার শান্ত বুকে আমি কত ঢেউ তুলেছি।
দিঘি বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে রয়,
সে আমাকে চেনে না।
একদিন যে ডোবাটা আমার খুব প্রিয় ছিল-
আজ সে প্রিয়তর দিঘি।
কিন্তু আমি তাকে আর মন খারাপের গল্প শুনাতে পারিনা-
পদ্ম ফুল ফোটাবার গান গাইতে পারিনা-
তার জলের আয়নায় চোখ রেখে আকাশ দেখতে পারিনা
আমি আজ তার কাছে বহুদূরের এক অবাঞ্ছিত কন্যা।

আমি ভালবাসি

আমি ভালবাসি তৃষিত দুপুরে
আকাশে নোঙর তোলা
উদ্ভ্রান্ত মেঘমালা,
আমি ভালবাসি জ্যোৎস্না প্লাবনে
আলোছায়া বীথির
ঘুমরাত নাগর দোলা।
আমি ভালবাসি খরস্রোতা ঝর্ণায়
নাম না জানা বনফুলের
নিঃশব্দে পাপড়ি ঝরা,
আমি ভালবাসি রঙধনুর
আকাশ জুড়ে জলকেলি খেলা।
আমি ভালবাসি বৃষ্টিচোখ
বুকভরা নীল আর জলের সঙ্গমে
বাতাসের কেশর দোলা,
আমি ভালবাসি মহুয়ার অপক্ক গর্ভদল
চৈত্রের নিরাভরণ মধ্যাহ্নে
শুষ্ক মাটির কায়া।
আমি ভালবাসি মৃত্যু, ধ্বংস
তা এক নব সৃষ্টির সহজাত নেশা,
আমি ভালবাসি পাতার পিঙ্গল
হরিদ্রাভ আর রক্তের অবিনাশী মায়া।
আমি ভালবাসি ফুল
ভাঁটফুল আর প্রজাপতির নিষিদ্ধ মিলনমেলা,
আমি ভালবাসি নক্ষত্র, কৃষ্ণগহ্বর
আর তানপুরার অবিরাম বেজে চলা।
আমি ভালবাসি নগ্নচোখ
ক্ষিপ্রতায় বীক্ষণে ভাজের পরতে
পুলক খুঁজে ফেরা,
আমি ভালবাসি অলস দুপুর
অন্ধকারের উদাসী রাত
আর স্মৃতির জানালায় উঁকি দেওয়া আবছা প্রভাত।

ফেরাবে কি আমায়

নিজেকে হারিয়ে ফেলছি বৃন্তচ্যুত একটি ফুলের গর্ভে,
চোরাবালিতে পায়ের ছাপে পা মিলিয়ে –
জলমেঘ ভাঙা এক দারুচিনি দ্বীপের দেশে।
সেই ভালো আমি হারিয়ে যাই,
বুক ভেঙে নেমে আসা কান্নার ঢলে-
মুক্তা ধরা ঝিনুক ফোটাই।
আজ নির্নিমেষ কাজল কালো পল্লবে
জন্মান্ধ সাদা মেঘের শৈশব, আরাধ্য জন্মান্তর খোঁজে।
মৃত্যু তার কল্পনাকুহক-
সে বার্তা ঐশ্বর্যের ঐশ্বরিক,
কখনো পাগলামি খেয়ালি গানে
জলসা বসায় কুসুমিত শাণিত কঠিন।
ভয় নেই প্রিয়তম,
আমার এ নিরুদ্দেশ যাত্রায় তোমার প্রেম রবে
এক অনুচ্চারিত সত্য।
যখন আকাশ নীল থেকে পিঙ্গল,
ধরিত্রীর বোঝা বাড়ায় কোন মহিমামন্থর তস্কর,
সেদিন বৃষ্টি হবো,
ছুঁয়ে যাবো তোমার অনার্দ্র চোখ।
শুষে নেবো নোনা জলের শিশিরসিক্ত কপোল,
অনুচ্চ উচ্চতায় অভুক্ত যে চিবুক,
সেখানে বন্য চুম্বনের মায়ামৃগ হবো।
ততদিনে প্রতীক্ষা হে নবজন্ম!


2 Responses

  1. Maruf Billah Chowdhury says:

    “প্রণয় বিহার”পড়লাম। খুব মনোযোগ দিয়ে আস্তে আস্তে পড়লাম। অসামান্য ভালো হয়েছে! অসম্ভব সুন্দর! আমি নিজেই রাতের ট্রেনে ভ্রমণে চলে গিয়েছিলাম,সাথে এক অনন্যা সুন্দরী, সে কে? সে কি তুমি কবি?
    মাঝখানে কয়েকটি লাইন এতো সুন্দর হয়েছে যে বলার মতো না। বাকী গুলো আস্তে আস্তে পড়বো সময় নিয়ে।
    অভিনন্দন তোমায় তোমার অনবদ্য লেখনির জন্য। সাথে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।

  2. Naim Mohammad SYeed says:

    শৃঙ্খলে তোমার মুক্তি is just amazing.
    And i love this lines (শুষে নেবো নোনা জলের শিশিরসিক্ত কপোল,
    অনুচ্চ উচ্চতায় অভুক্ত যে চিবুক,
    সেখানে বন্য চুম্বনের মায়ামৃগ হবো।) From ফেরাবে কি আমায়.
    Keep going dear :)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.