আর্টস, স্মরণ

টুঙ্গিপাড়ার খোকা যেভাবে জাতির জনক

মুহাম্মদ শামসুল হক | 17 Mar , 2019  


বাংলার এক নিভৃত পল্লী, গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামের অভিজাত মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে শেখ মুজিব। পুরো নাম শেখ মুজিবুর রহমান। বাবা শেখ লুৎফর রহমান ও মা শেখ সায়েরা খাতুন ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্ম নেওয়া আদরের ছেলেটির ডাক নাম রাখেন খোকা। প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন ১৯২৭ সালে গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুল ও গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে পড়ালেখা করেন। ১৯২২ সালে এন্ট্রান্স (এসএসসি) পাস করার পর তিনি ভর্তি হন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে। সেখান থেকে ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএ পাস করেন এবং দেশ বিভাগের (ব্রিটিশের কাছ থেকে ভারত-পাকিস্তান আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে ভাগ হয়েছিল) পর ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। উল্লেখ্য, তৎকালীন পারিবারিক নিয়মে ছাত্রাবস্থায় মাত্র ১৪ বছর বয়সে শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুননেসা রেণুর বিয়ে সম্পন্ন হয়। তাঁদের প্রথম সন্তান শেখ হাসিনার জন্ম হয় ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর- যিনি আজকের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

ছোটবেলা থেকেই খোকা ছিলেন ক্রীড়ামোদী, সাহসী, বুদ্ধিমান, প্রতিবাদী, গরিব-অসহায় মানুষের প্রতি সংবেদনশীল এবং রাজনীতি সচেতন। ছাত্রাবস্থা থেকে সহপাঠী বন্ধুদের কাছে মুজিব ভাই এবং যৌবনের শুরুতে মুজিব ভাইয়ের পাশাপাশি পঞ্চাশের দশকে অনেকের কাছে পরিচিত ছিলেন মিয়া ভাই হিসেবে। বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রতিরক্ষাসহ সার্র্বিক ক্ষেত্রে যে শোষণ নির্যাতন ও বৈষম্য চলে আসছিল তা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে আন্দোলন করতে গিয়ে বারবার কারাবরণ করতে হয় তাঁকে। সরকারি নির্যাতন, জেল ইত্যাদি উপেক্ষা করে জনগণের পক্ষে বিভিন্ন সংগ্রামে নির্ভীক ও বলিষ্ঠ প্রতিবাদী ভূমিকা রাখার জন্য অনুসারীদের কাছে হয়ে ওঠেন বঙ্গশার্দুল।

শেখ মুজিবের রাজনৈতিক আন্দোলনমুখি চরিত্রের প্রত্যক্ষ প্রকাশ ঘটে ১৯৩৯ সালে। ওই সময় গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল পরিদর্শনে আসা তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং পল্লী উন্নয়ন ও বাণিজ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছে স্কুলের ছাদ মেরামতের দাবি তুলে ধরে নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। পরের বছর তিনি নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দিয়ে বেঙ্গল মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের কাউন্সিলর এবং গোপালগঞ্জ মুসলিম ডিফেন্স কমিটির সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র থাকাকালে ১৯৪২ সালে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন এবং ১৯৪৩ সালে নির্বাচিত হন তৎকালীন মুসলিম লীগের কাউন্সিলর। ১৯৪৬ সালে নির্বাচিত হন ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস (সাধারণ সম্পাদক)। দেশ বিভাগের প্রাক্কালে কলকাতায় সৃষ্ট দাঙ্গা প্রতিরোধে শেখ মুজিব অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
দেশ বিভাগের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট নতুন দেশ পাকিস্তানের একজন রাজনীতি-সচেতন নাগরিক হিসেবে তিনি দেখেন, দেশের পূর্বাঞ্চল তথা পূর্ব বাংলার জনগণের প্রতি কেন্দ্রিয় সরকারে ক্ষমতাসীন পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী সবক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। এ পর্যায়ে ১৯৪৮ সালের শুরুতে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসে করাচিতে অনুষ্ঠিত সংবিধান সভা ও গণপরিষদেও অধিবেশনে তারা বাঙালিদের মাতৃভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে এককভাবে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার অভিপ্রায় ঘোষণা করে। বাংলার ছাত্রসমাজসহ সচেতন শিক্ষিত জনগোষ্ঠী এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও তমুদ্দিন মজলিশের উদ্যোগে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা হয়। ঘোষণা করা হয় ‘বাংলা ভাষা দাবী’ দিবস। শেখ মুজিব তখন মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা। দিবসটিকে সফল করার জন্য দলবল নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন জেলায় জেলায়। ফরিদপুর, যশোর, দৌলতপুর, খুলনা ও বরিশালে ছাত্রসভা করে ৮ মার্চ ঢাকায় ফিরেন তিনি। ভাষার দাবিতে ১১ মার্চ ঢাকায় প্রথম প্রতিবাদ-বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে অন্যদের সাথে গ্রেপ্তার ও শারীরিকভাবে লাঞ্চিত হন শেখ মুজিব। ১৯৪৯ সালের ১২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনের পক্ষে মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন তিনি। এরপর গ্রেপ্তার হন ১৯৫০ সালে দুর্ভিক্ষের সময় মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শামসুল হকসহ প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলীকে ঘেরাও করার মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার ঘটনায়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন তীব্র হওয়ার সময় তিনি ছিলেন জেলে। আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি এবং মহিউদ্দিন আহমদ জেলে থেকে ১৬-২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনশন ধর্মঘট পালন করেন। এরপর ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনসহ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইউব খানের সামরিক শাসনবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনের কারণে একাধিকবার কারাবরণ করেন তিনি। এ পর্যায়ে শেখ মুজিব তরুণদের কাছে মুজিব ভাই ছাড়াও অনেকের কাছে পরিচিতি হয়ে ওঠেন মিয়াভাই হিসেবে।

যতই দিন যায় শেখ মুজিব বুঝতে পারেন পাকিস্তানিদের শোষণ-বৈষম্যের হাত থেকে বাঙালিদের বাঁচাতে হলে পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের মাধ্যমে বাঙালিদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ লক্ষ্যে ছাত্র-জনতাকে সংগঠিত করার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি শেখ মুজিব ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। পাকিস্তানের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এমনকি নিজ দলের অনেকের বিরোধিতা সত্ত্বেও শেখ মুজিব তাঁর বিশ্বস্ত সহকর্মী-অনুসারীদের নিয়ে বাংলা জুড়ে ছয় দফার পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক শাসক আইউব খানসহ তাঁর দোসররা ছয় দফাকে পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দিয়ে শেখ মুজিবকে বন্দী করে এবং ছয় দফার আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতন শুরু করে। এর মধ্যে সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার উৎখাত এবং বাংলাদেশকে স্বাধীন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবকে প্রধান আসামি ও সামরিক-বেসামরিক অন্য ৩৪ জনকে আসামি করে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা (রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য) করে আইউব সরকার। সরকার ভেবেছিল এই মামলার মাধ্যমে জনগণকে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলে শেষ পর্যন্ত তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলাবে। কিন্তু জনগণ এই মামলাকে বাঙালিদের স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলন দমানোর জন্য শেখ মুজিব ও অন্যদের ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে সরকারি ষড়যন্ত্র বলে মনে করে। ফলে ছয় দফার পক্ষে এবং শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন চাঙা হয়ে ওঠে। কারাগার থেকে শেখ মুজিবের অনুরোধে তৎকালীন ন্যাপ নেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর অংশগ্রহণ আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। ভাসানীসহ প্রগতিশীল ছাত্র-জনতা শেখ মুজিবসহ রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে রাজপথে নেমে আসেন। ৬৮ সালের ৭ ডিসেম্বর বিরোধী দলগুলোর ঢাকায় আহুত হরতালের সময় পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন নিহত ও আহত হয়। ৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি তৎকালীন ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমদের নেতৃত্বে বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ছয় দফার পাশাপাশি সম্পূরক হিসেবে ১১ দফা প্রস্তাব তুলে ধরে এবং ছয় ও ১১ দফার ভিত্তিতে দেশব্যাপী ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে। এতে যুক্ত হয় শেখ মুজিবসহ রাজবন্দিদের মুক্তি ও আগরতলা মামলা প্রত্যাহারের দাবি। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০ জানুয়ারি ছাত্রদের প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান আসাদ। আসাদের রক্তমাখা শার্ট নিয়ে বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেওয়া হাজারো ছাত্র-জনতার সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মুখোমুখি সংঘর্ষে অনেকে আহত হয়। ২৪ জানুয়ারি ছিল প্রতিবাদ দিবস। ওইদিন সচিবালয়ের এক নম্বর গেটে ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে শেখ রুস্তম আলী, মকবুল ও মতিউর রহমান নিহত হন। এ ছাড়া, আরও কয়েক জায়গায় তিনজন নিহত ও বহু হতাহতের ঘটনা ঘটলে আন্দোলন বিস্ফোরণোম্মুখ হয়ে ওঠে। এদিন ছাত্র-জনতা বেশ কয়েকটি সরকারি অফিস, আন্দোলনবিরোধী ভূমিকা রাখা দৈনিক পাকিস্তান ও মর্নিং নিউজ পত্রিকা অফিস, আগরতলা মামলার প্রধান বিচারক এস রহমানের বাসা ইত্যাদিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এভাবে দিনটি গণ-অভ্যুত্থান দিবসে পরিণত হয়। গণ-আন্দোলনের দিনগুলোতে স্লোগান উচ্চারিত হয় ‘তোমার আমার ঠিকানা-পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘তোমার নেতা আমার নেতা-শেখ মুজিব শেখ মুজিব’, জেলের তালা ভাঙব-শেখ মুজিবকে আনব’, ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা-মানি না মানব না’, ‘তোমার দেশ আমার দেশ-বাংলাদেশ বাংলাদেশ’, ইত্যাদি। ১৫ ফেব্রুয়ারি কারাগারে বন্দী অবস্থায় আগরতলা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হককে গুলি করে হত্যা এবং সার্জেন্ট ফজলুল হককে আহত করা হলে ছাত্র-জনতা আরও ফুঁসে ওঠে। পরদিন সামরিক বাহিনীর টহল ও জরুরি অবস্থা উপেক্ষা করে কড়া হরতাল পালন করা হয়। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহাকে হত্যার পর আন্দোলন এমন চরমে পৌঁছে যে, সরকার জনতার এ আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকারে বাধ্য হয় এবং ২২ ফেব্রুয়ারি ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবসহ অন্যদের মুক্তি দেয়। মুক্তি লাভের পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানের বিশাল সমাবেশে শেখ মুজিবুর রহমানকে এদেশের ছাত্র-জনতার পক্ষে তোফায়েল আহমদ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। সেই থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের অপর নাম হয় ‘বঙ্গবন্ধু’।
এরপর থেকে আন্দোলনে ভিন্নমাত্রা যোগ হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে তখন ৬ দফা ও ১১ দফার আন্দোলন স্বাধিকার আন্দোলনে রূপ নিতে শুরু করে। ছাত্র-জনতাসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। তবে কেউ পূর্ব বাংলার নাম হিসেবে ‘বাংলাদেশ’ কথাটি উচ্চারণ করতে পারছিলেন না। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু ছিলেন অনেক এগিয়ে। তার প্রমাণ মেলে ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বরÑবঙ্গবন্ধু কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের নাম ‘বাংলাদেশ’ ঘোষণার মধ্য দিয়ে। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু দিবসের এক আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু বলেন, “এক সময় এদেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে ‘বাংলা’ কথাটির শেষ চিহ্নটুকুও মুছিয়া ফেলার চেষ্টা হইয়াছে, একমাত্র ‘বঙ্গোপসাগর’ ছাড়া আর কোন কিছুর নামের সঙ্গে ‘বাংলা’ কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। আমি ঘোষণা করিতেছি আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম হইবে পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’।” এর আগে ১৯৪৮ থেকে শেখ মুজিব (তখন তিনি বঙ্গবন্ধু উপাধি পাননি) বেশ কয়েক জায়গায় বক্তৃতায় পূর্ব পাকিস্তান না বলে ‘বাংলাদেশ’ কথাটা উচ্চারণ করেছেন যার বহু প্রমাণ পাওয়া যায়।
৭০ সালের নির্বাচনকে ঘিরে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ বাংলার একক রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হতে দেখে পূর্ব বাংলার অন্যান্য রাজনৈতিক দল, উপদল ও গ্রুপগুলো স্বাধীনতার দাবি তুলতে থাকে ক্ষীণস্বরে। তবে প্রচারপত্রের মাধ্যমে তাদের কারও স্লোগান ছিল ‘পূর্ব বাংলা স্বাধীন কর’, ‘পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন কর’, আবার কারও স্লোগান ছিল ‘স্বাধীন সার্বভৌম গণবাংলা কায়েম কর’ ইত্যাদি। আশ্চর্যের হলেও সত্য যে ওইসব রাজনৈতিক সংগঠনের কোনো কোনোটি রাজনৈতিকভাবে স্বাধিকার আন্দোলনের কথা বললেও ছয় দফার প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণের কারণে এবং সত্তরের নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকায় রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ে। জনগণের সমকালীন দাবি-দাওয়ার প্রতি খেয়াল না করে কেউ কেউ শ্রেণি সংগ্রামের রাজনীতি অব্যাহত রাখেন। ফলে রাজনেতিকভাবে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক হিসেবে এগিয়ে যায় আওয়ামী লীগ। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে দলটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এতে সারা দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় বঙ্গবন্ধু ও তাঁর দলের একক নেতৃত্ব। এরপর নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানিদের অনীহা ও চক্রান্ত শুরু হলে একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। তিনি পাকিস্তানি শত্রু বাহিনীর মোকাবেলায় যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বানে ২৫ মার্চ পর্যন্ত চলে অসহযোগ আন্দোলন। সমগ্র প্রশাসন পরিচালিত হয় তাঁর নির্দেশে।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দও আস্থাশীল হয়ে ওঠে বিকল্প নেতৃত্বের ব্যাপারে কোনো ভরসা না পেয়ে। ৯ মার্চ পল্টনের জনসভায় জাতীয় লীগ প্রধান (যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে মুখ্যমন্ত্রী ১৯৫৬-৫৮ এবং এরশাদ সরকারের প্রধানমন্ত্রী, ১৯৮৫-৮৬) আতাউর রহমান খান কালবিলম্ব না করে বাংলার জাতীয় সরকার গঠনের জন্য আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি আহ্বান জানান।
১১ মার্চ সিএসপি ও ইপিসিএস সমিতির পদস্থ বাঙালি সরকারি কর্মচারীরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান এবং আওয়ামী লীগের তহবিলে একদিনের বেতন দান করেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশে বঙ্গবন্ধুর একচ্ছত্র আধিপত্য কোন পর্যায়ে পৌঁছে তার স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের বক্তব্যে। ১৫ মার্চ বায়তুল মোকাররমে পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত জনসভায় ঘোষণা করা হয়, ‘বাংলাদেশ আজ স্বাধীন, আমাদের ওপর সামরিক বিধি জারী করার ক্ষমতা কারো নেই। বাংলাদেশের জনগণ একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশই মেনে চলবে।’ ‘বাংলাদেশে যদি কোন আইন জারী করতে হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই তা করবেন।’ ৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এক প্রতিবাদ সভায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা জানিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে জনতার সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করা হয়।
অন্যদিকে থেমে থাকেনি পশ্চিমাদের পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর গোপন ষড়যন্ত্র। পশ্চিম পাকিস্তানের অধিকাংশ দল ও নেতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে পাকিস্তানের অখ-তা রক্ষার আশু পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহ্বান জানান। কিন্তু ইয়াহিয়া জুলফিকার আলী ভুট্টোর ফাঁদে পা দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা চালাতে থাকেন। পাশাপাশি চলে প্রতিবাদী ছাত্র-জনতার ওপর কথায় কথায় গুলি, হত্যা, গ্রেপ্তার নির্যাতন। ক্ষমতা হন্তান্তরের ব্যাপারে পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করলেও ইয়াহিয়া তা শোনেননি।
পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা এয়ার ভাইস মার্শাল আসগর খান বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এ মুহূর্তে সংখ্যাগুরু দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেশের সংহতি রক্ষা করা অপরিহার্য।’
ন্যাশনাল আওয়ামী (ওয়ালি, বেলুচিস্তান)পার্টি অভিমত দেয়; ‘জাতীয় সংসদের প্রস্তাবিত অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিতের ঘোষণা অবাঞ্ছিত ও অগণতান্ত্রিক।’ পাকিস্তানি নেতা মালিক গোলাম জিলানি বলেন, ‘এখন আমরা এমন একটা অবস্থার সম্মুখীন হয়েছি যখন পাকিস্তানকে রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে সংখ্যাগুরু দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ছাড়া কোন পথ নেই।’ ন্যাপ প্রধান খান আবদুল ওয়ালি খান বলেন, ‘নির্বাচিত পার্লামেন্টের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক। বাস্তব ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের আর অস্তিত্ব নেই। ১ জুলাই থেকে এখানে ৪টি পৃথক প্রদেশ হয়েছে।’
ক্ষমতা হস্তান্তর করার ব্যাপারে এরকম যখন ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নেতাদের অভিমত, তখন পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক, একগুঁয়েমিপূর্ণ। করাচিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে ভুট্টো (১ মার্চ) বলেন, ‘শুধুমাত্র সংখ্যাধিক্যের জন্য পাকিস্তানে শাসন পরিচালনা করা যাবে না। পিপলস পার্টিকে বাদ দিয়ে কোন সরকার গঠন সম্ভব নয়। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দুটি পার্টির কাছে, পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতা পিপলস পার্টির কাছে এবং পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষমতা আওয়ামী লীগের কাছে হস্তান্তর করা সমীচীন হবে।’
এদিকে সারা দেশের (বাংলাদেশ) প্রশাসন, ব্যাংক, বীমা, ডাক ও তার বিভাগ, আদালত, বেতার-টেলিভিশন সবকিছুই কেবল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এবং তাঁর অগ্রগামী সংগঠন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় চলতে থাকে। এতে ভুট্টো-ইয়াহিয়া-সামরিক চক্রের মাথা ঘুরে যায়। দেশব্যাপী স্বাধীন বাংলা ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদের প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কৌশলে যুদ্ধ প্রস্তুতির কথাও তাঁদের জানতে বাকি রইল না। এ অবস্থায় বাঙালিদের প্রতিরোধ প্রস্তুতি ও স্বাধীনতার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করা যাবে না- বুঝতে পেরে তাঁদের চিরতরে খতম করে দেওয়ার কুমতলব নিয়ে অগ্রসর হতে থাকে ইয়াহিয়া-ভুট্টো চক্র।
১৫ মার্চ আলোচনার মাধ্যমে দাবিমালার ফয়সালা করার নামে ইয়াহিয়া এলেন ঢাকায়। ১৬ থেকে ২৪ মার্চ নয় দিনব্যাপী আলোচনা চললো দুপক্ষের মধ্যে। এর মধ্যে ২১ মার্চ এলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। দফায় দফায় বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঘনিষ্ট হয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে সহায়তা করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এইএইচএম কামরুজ্জামান, ড. কামাল হোসেন প্রমুখ। অপরদিকে ইয়াহিয়ার লেলিয়ে দেওয়া সামরিক পাষ- জেনারেল টিক্কা খান, জেনারেল মিঠা খান, জেনারেল ওমর প্রমুখ ঢাকায় সেনানিবাসে বসে সামরিক অভিযানের নীল নকশা প্রণয়ন করতে থাকেন।
১৮ মার্চের দিকে ইয়াহিয়া খান তাঁর হাতে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা রেখে দুটি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগ ও পিপলস পার্টির কাছে আঞ্চলিক সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়ে ছয় দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের ব্যাপারে রাজি হলেও ভূট্টোর নেতিবাচক মনোভাবের কারণে তা সম্ভব হয়নি। আলোচনায় কোনো সুস্পষ্ট ইতিবাচক ফলাফল না দেখে দেশের ছাত্র নেতৃবৃন্দ ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতারা হতাশা ব্যক্ত করে বঙ্গবন্ধুর প্রতি আহ্বান জানাতে থাকেন স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য। ২১ মার্চ চট্টগ্রামে এক জনসভায় ন্যাপ প্রধান মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতি আহ্বান জানান শেখ মুজিবের নেতত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের জন্যে। মাওলানা ভাসানী বলেন, ‘মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলে বিশ্বের স্বাধীনতাপ্রিয় জাতি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে।’
লক্ষণীয় মাওলানা ভাসানী এই প্রথম ‘বাংলাদেশের’ স্বাধীনতার কথা বললেন।
দেখতে দেখতে এসে গেলো সেই ২৫ মার্চ কালো রাত। আশা ছিল ওইদিন মুজিব-ইয়াহিয়া প্রস্তাবিত বৈঠকে চূড়ান্ত ফয়সালা হয়ত হয়ে যাবে। কিন্তু সেই কুখ্যাত কুচক্রী কায়েমী স্বার্থের রক্ষক ইয়াহিয়া খান তাঁর বর্বর বাহিনীকে বাঙালিদের ওপর সামরিক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়ে গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। পরে ভুট্টোও হন একই পথের পথিক।
কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন যে, ’৭১-এর ২৩, ২৪ মার্চ তারিখে ছাত্রজনতার দাবি সত্ত্বেও সে সময় বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা কেন দিলেন না? কেন তিনি পাকিস্তানি বাহিনীকে আক্রমণের সুযোগ দিয়ে ‘আত্মসমর্পণ’ করলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর অতি সহজ। প্রকৃতপক্ষে একটা রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে ছিল তখন বাঙালিরা। ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর আওতায় এবং আওয়ামী লীগের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল, যদি ভালোয় ভালোয় নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয় তাহলে স্বায়ত্বশাসনের ভিত্তিতে ছয় দফার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে এবং এতে স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সোপানও রচিত হবে।
বস্তুত একটা রাষ্ট্রকাঠামোর আওতায় থেকে সেই রাষ্ট্রের আইননানুগ কোনো অংশের নেতা দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলে তা বে-আইনি ও রাষ্ট্রদ্রোহীতামূলক কাজ হিসেবে গণ্য হতো। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও তা সমর্থনযোগ্য হতো না। সেই সময় ইয়াহিয়া খান আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় এমনকি পরোক্ষভাবে বাঙালির আশা-আকাক্সক্ষা পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যেহেতু ঢাকা এসেছেন, আলোচনায় নিয়োজিত রয়েছেন-এ অবস্থায় সামগ্রিকভাবে একটা ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া সত্ত্বেও অপেক্ষা করার প্রয়োজন ছিল। কারণ, পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়োজিত পাকিস্তানি বাহিনীর মোকাবিলায় জনগণের পরিকল্পিত ও সংগঠিত শক্তি সম্পর্কে বিবেচনা করতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে। প্রায় প্রত্যেক দেশেই কিছু সংখ্যক ঘরের শত্রু ‘বিভীষণ’ থাকেÑযাঁরা নিজেদের ভেতরে থেকে শত্রু পক্ষের সঙ্গে যোগযোগ রেখে আত্মঘাতী ধ্বংসাত্মক কাজকর্ম চালায়। ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার’ উদ্ভব হয়েছিল ওই বিভীষণ বিশ্বাসঘাতকদের কারণেই।
আলোচনা শেষ না হওয়া এবং ইয়াহিয়ার ঢাকা ত্যাগ করার আগে, শত্রুপক্ষ থেকে আঘাত আসার জন্য অপেক্ষা না করে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করা হলে বিশ্বাসঘাতকদের ইঙ্গিতে বঙ্গবন্ধুসহ মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় সক্ষম ও নির্বাচিত প্রায় সব নেতাকেই পাকিস্তানি বাহিনী গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতে পারতো এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মতো পুনরায় আরেকটি রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলায় জড়িয়ে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করতে পারতো। সাধারণ গণহত্যাও বেড়ে যেতো বহুগুণ। ঘটনা সে রকম হলে সাধারণ নেতাকর্মী সমর্থকরা দিক নির্দেশনাহীন হয়ে পড়তো, সংগ্রামী স্পৃহা অনেকটা তিথিয়ে পড়তো এবং জনগণের মধ্যে ভীতি ও হতাশার জš§ নিতো। কাজেই সরাসরি আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা বা যুদ্ধ শুরুর নির্দেশ জারির জন্য উপলক্ষ হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষ থেকে বাঙালিদের ওপর প্রথম আঘাত আসার জন্য অপেক্ষা করাই ছিল সবচাইতে যুক্তিযুক্ত। হাজার চাপ থাকলেও একজন রাষ্ট্রনায়কোচিত জননেতা বুঝে শুনে একটা ঘোষণা হুজুগের বশে দিতে পারেন নাÑযা তাঁর জাতির মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে।
২৪ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আগত স্বাধীনতাকামী ছাত্রজনতার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু দীপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘আমার মাথা কেনার শক্তি কারো নেই। বাংলার মানুষের সাথে, শহীদদের রক্তের সাথে আমি বেঈমানী করতে পারব না। আমি কঠোরতর সংগ্রামের নির্দেশ দেবার জন্য বেঁচে থাকবো কিনা জানি না, দাবি আদায়ের জন্য আপনারা সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন।’
কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক ‘পূর্ব পাকিস্তানের’ স্বাধীনতা ঘোষণার ব্যাপারে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু তাঁদের বলেছিলেন, ‘তোমরা তো বেশ অভিজ্ঞ, অনেক কিছুই বোঝ, এই রকম পরিস্থিতিতে তোমরাই বুঝে নাও কি হতে পারে পরবর্তীতে।’
২৪ মার্চ সকাল থেকেই বঙ্গবন্ধুকে খুবই অস্থির দেখাচ্ছিল, তিনি সামরিক বেসামরিক পর্যায়ে দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হচ্ছিলেন এবং যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকার নেতাদের নির্দেশ দিচ্ছিলেন। তাঁর কাছে খবর আসতে থাকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর, সৈয়দপুরসহ বিভিন্নস্থানে পাকিস্তানি সেনারা বাঙালিদের ওপর আক্রমণ শুরু করেছে। ইয়াহিয়া খান প্রথমে ভেবেছিল, বাঙালিদের প্রস্তুতির পর্যায়ে তাঁরাও প্রস্তুতি নিয়ে রাখবেন এবং শেখ মুজিব স্বাধীনতার সরাসরি ডাক দেওয়া মাত্র শুরু হবে হত্যাযজ্ঞ। কিন্তু বঙ্গবন্ধু চাইলেন পাকিস্তানি বাহিনী আগে আক্রমণ শুরু করুক। এরই মধ্যে তিনি তৈরি করে রাখেন যুদ্ধের চূড়ান্ত ঘোষণা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইপিআর ক্যাম্প, পুলিশ ক্যাম্পসহ বিভিন্ন স্থানে হত্যার সংবাদ পেয়েই তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের গোপন স্থানে চলে যাবার নির্দেশ দেন এবং বিশেষ ব্যবস্থায় টেলিফোন ও একান্ত বিশ্বস্ত লোকের মাধ্যমে অয়ারলেস স্টেশনে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন স্বাধীনতার সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা-যা রাতের মধ্যেই পৌঁছে যায় চট্টগ্রামে। পরদিন ২৬ মার্চের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশের আনাচে কানাচেসহ বহির্বিশ্বে। স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠাবার ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণ। রাত প্রায় ১টা ২০ মিনিটে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী স্বাধীনতার মহান ঘোষক ও স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সেই থেকে দীর্ঘ প্রায় নয় মাস অর্থাৎ ’৭১-এর ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রায় ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হানির বিনিময়ে বাঙালিরা অর্জন করে চূড়ান্ত বিজয়। অবশেষে বিশ্বজনমতের চাপে পাকিস্তানি কারাগারের বন্দিদশা থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন পাকিস্তানি সামরিক জান্তার পরবর্তী শিখন্ডি জুলফিকার আলী ভুট্টো। ১০ জানুয়ারি স্বাধীন জাতির জনক হয়ে স্বদেশের মাটিতে জনতার মাঝে ফিরে আসেন সেই স্বপ্নপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.