অনুবাদ কবিতা

ইয়েভতুশেঙ্কোর কবিতা: জনপদের রূপরেখা

রেজওয়ান তানিম | 21 Mar , 2019  


গত শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ রুশ কবিদের একজন ইভগেনি ইয়েভতুশেঙ্কো। বিস্তর খ্যাতি ও জনপ্রিয়তার অধিকারী এই কবির পরিচয় বহুবিধ- একাধারে তিনি কবি, প্রবন্ধকার, নাট্যকার, চিত্রপরিচালক, ঔপন্যাসিক এমনকি অভিনেতাও। সাইবেরিয়ার ছোট্ট এক মফস্বল শহরে জন্ম তার ১৯৩৩ এ, ইভগেনি আলেক্সান্দ্রভিচ গাঙনুস তার পিতৃদত্ত নাম এবং মায়ের পারিবারিক নাম ইয়েভতুশেঙ্কো ব্যাবহার করেই তিনি লেখক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। দীর্ঘ ও পরিণত এক জীবন উপভোগ শেষে এই বছরেই গত এক এপ্রিল তিনি প্রয়াত হয়েছেন ওকলাহোমার টুলসা শহরে। জীবনের শেষ বছরগুলো পর্যন্ত তিনি সাহিত্য ও চলচ্চিত্র বিষয়ে পড়িয়েছেন।

ইয়েভতুশেঙ্কোর গুরুত্ব একজন লেখক বা কবি হিসেবে কেমন তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটা বিষয় পরিষ্কার আর তা হল তিনি সোভিয়েত জীবনের রূপকার। সোভিয়েত ইউনিয়নের শীর্ষ সময়ে তার উন্মেষ এবং সোভিয়েত জীবনের ইতিহাস তিনি লিখে গেছেন। অধিকাংশ সমালোচকের মতে তিনি বিংশ শতকের সোভিয়েত রাশিয়ার কণ্ঠস্বর। তার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে যেটি আলোচিত তা হল ১৯৬১ সালে লেখা কবিতা ‘বাবি ইয়ার’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউক্রেনের বাবি ইয়ারে ৩৪ হাজার ইহুদি জার্মান নাৎসিদের হাতে নিহত হন। এই ঘটনাকে সোভিয়েত সরকার গুরুত্ব না দিয়ে একে হলোকাস্ট সাইট ঘোষণা থেকে বিরত থাকে। তার কবিতা এই ঘটনার বিরুদ্ধে কাব্যিক প্রতিবাদ এবং এর ফলেই এ ঘটনা আবার সকলের চোখের সামনে চলে আসে। তার কবিতায় রাজনীতি ও সমাজের অসঙ্গতির চিত্র এসেছে ধারালো শাণিত রূপে, কোন প্রতীকের আড়ালে নয়। প্রতীকের আড়ালে প্রতিবাদকে সবসময় নেতিবাচক চোখে দেখে এসেছেন। একসময় স্তালিনের ভক্ত ও অনুগত এই কবি পরে হয়ে ওঠেন স্তালিনের কট্টর সমালোচক। Not by Bread Alone নামে Vladimir Dudintsev এর স্তালিন বিরোধী উপন্যাস এর পক্ষে বক্তৃতা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার হন।

যদিও প্রতিবাদী কবি হিসেবে তিনি সুনাম কুড়িয়েছেন এবং লোকপ্রিয় ছিলেন, তথাপি তাকে বিস্তর সমালোচনাও সহ্য করতে হয়েছিল সোভিয়েত শাসককুলের প্রশ্রয় পাবার ব্যাপারে। অনেক সমালোচক যুক্তি দেখিয়েছেন, তাঁর ভিন্নমত সোভিয়েত-ব্যবস্থার শর্ত মেনেই প্রকাশিত হয়েছিল কেননা তিনি সাখারভ বা সলঝেনিৎসিন নন। তার কট্টর সমালোচক স্বদেশী কবি জোসেফ ব্রডস্কি তাকে নিয়ে ঠাট্টা ছলে বলেছিলেন, ইয়েভতুশেঙ্কো পাথর ছুড়ে মারে ঠিকই, কিন্তু মারার আগে দেখে নেয় সরকারিভাবে সে পাথর ছোড়া অনুমোদিত কি না। একথা সত্য তিনি কখনোই কম্যুনিজমের বিরুদ্ধে ছিলেন না, বরং তিনি চেয়েছিলেন এর ভুল ত্রুটিগুলো শুধরে সাম্যের যে মহান বানী নিয়ে এটি শুরু হয়েছিল তার বাস্তবায়ন। আর তাই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তিনি জীবনের বেশিরভাগ সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টুলসা শহরে কাটান যদিও মাতৃভূমির টানে ফিরে গেছেন রাশিয়ায় বারবার। রাজনীতি ও সমাজ সচেতনতার কথা বারংবার কবিতায় লিখে যাওয়া এই কবি আসলে মানুষের ইচ্ছাশক্তির, প্রাণস্পন্দনের জয়গান গাইতে চেয়েছেন।

এবারে আসা যাক আজকের ভাষান্তরিত কবিতায়। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে কবিদের মধ্যে প্রধানত ছোট দৈর্ঘ্যের এবং খুব ছোটছোট দৃশ্যচিত্রের কবিতার যে ধারা চলছে, তার থেকে একেবারেই ব্যতিক্রম দুটি কবিতা আমি এখানে ভাষান্তরের চেষ্টা করেছি। ইয়েভতুশেঙ্কোর গুরুত্বপূর্ণ ও লোকপ্রিয় অনেক কবিতাই বেশ বড়সড় ও দীর্ঘ কলেবরের। সেরকমই একটি ব্যালাডধর্মী কবিতা Баллада о питьевой বা Ballad About Drinking যাতে বর্ণিত হয়েছে সাগরে নিরন্তর সংগ্রাম করে তিমিশিকারিদের জীবনের চালচিত্র। সংগ্রামী এই মানুষগুলোর জীবনের নানা রঙের ছবি এখানে আঁকা হয়েছে। Albert C. Todd এর অনুবাদে Ballad About Drinking থেকে বাংলা তর্জমা মদ্যপান বিষয়ক পাঁচালি করা হয়েছে। আর দ্বিতীয় কবিতাটি তার সবচাইতে বিখ্যাত কবিতাগুলোর একটি Babi Yar বা বাবি ইয়ার। কিয়েভের একটি ছোট্ট মফস্বল শহর এই বাবি ইয়ারে ২য় বিশ্বযুদ্ধের ইহুদী নিধন পর্বে এখানে যে গণহত্যা হয়েছিল তা নিয়ে কবির প্রতিবাদ ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে এতে। George Reavey এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে এই কবিতাটির বাংলা ভাষাবদল করা হয়েছে।

ভূমিকা ও ভাষান্তর: রেজওয়ান তানিম

মদ্যপান বিষয়ক পাঁচালি

আমরা করেছি সংহার শ্বেততিমি কত শত,
সভ্য দিনের কথা বিস্মৃত ছিল বেমালুম,
দা’য়ে কাঁটা তামাকের ধোঁয়া পুড়িয়ে দিচ্ছিল ফুসফুসগুলো,
কিন্তু যেই চোখে লেগেছিল কূলরেখা, অমনি পোয়াতি পিপার মতন
বুকের ছাতি ফুলিয়ে দিচ্ছিলাম শিস
আর শান্ত স্বরে আলাপ, চলছিল অভিবাদন পরস্পরের,
আর মদ্যপানের মহৎ উদ্দেশ্য সামনে রেখে
দু’মাস্তুলের ছোট্ট জাহাজ থেকে ডাঙায় নামি আমদেরমায়!

আমদেরমায় চলেছি আমরা পশ্চাতে ঝুলিয়ে হাত
ঠিক দেবতার মত, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ভঙ্গীতে,
আর বন্দর ধরে আমাদের দাঁড়ি ও লম্বা জুলফি
চিহ্ন রেখে যেত শুঁড়িখানা জুড়ে,
আর চলার পথের রমণীরা কিংবা বৃদ্ধ কোন নাবিক
আমাদের সাহচর্য দিত পথচলায় তখন
যেমন সেখানকার পথের কুকুরগুলো।

কিন্তু অকস্মাৎ মেঘ নেমে আসে পুরো গ্রহজুড়ে
একটা নোটিশ ঝুলছে দোকানেঃ ‘সূরা নেই!’
ভোর হতেই খুঁজছিলাম এইটুকুন সফেন মদ
যেন ছিল আরাধ্য সে, পক্ব ফলের রস
আর প্রবল আকাঙ্ক্ষার পীড়ায় জর্জর হয়ে
উপলব্ধি করলাম- পণ্ডশ্রম সমস্তই!

এখন, কে শেষ করতে পারে আমাদের সূরা বা ভদকা?
যেভাবে লোকে পান করে সত্যি তা ভয়ের- নিতান্তই ধ্বংসাত্মক।
কিন্তু হাড্ডিসার কঙ্কালের মত আজিয়েছার পেটকা মার্কোভস্কি
যার বেলায় এমন হয় সবসময়,
সে হঠাৎ হারিয়ে গেল কোনো এক দিকে
গোপনীয় কিছু একটার ‘শ-শশ!’ ইঙ্গিত দিয়ে।

আর ক্ষণ পরে বেশ টুংটাং শব্দযোগে
ফিরে এলো বড়সড় একটা কার্ডবোর্ড বক্সসহ,
কিঞ্চিৎ আমোদিত সে, ইতোমধ্যে
আর সেই বক্সটা দিচ্ছিল মিষ্টি এক টুংটাং শব্দ
আমরা যেন জেগে উঠেছি এই সত্যে: ‘এই তো সে! সে’ই আপেল!
আর মার্কোভস্কি চোখ মেরে জানাল: সেই সত্য!

জলে ঢেউ তুলে আমরা হাত নাড়লাম সবার প্রতি-
উঠলাম হোটেলের এক বিলাসী শোভন কক্ষে
আর বসলাম যেন বিছানায় ঢলে পড়েছে দেহটা।
বক্স থেকে বেড়িয়ে এলো রজ্জুগুলো
এবং সেখানে বোতলের জ্বলজ্বলে কলামগুলো,
স্ফীত, অনম্র আর আরামদায়ক,
পরিপাটি একদম-
তিন চোলাইয়ের এউ ডি কোলোন দাঁড়ানো ছিল সেখানে!

আর মার্কোভস্কি উঠে দাঁড়ালো, ধরল গ্লাস তুলে
সিম্যান্স জ্যাকেটটা নামিয়ে
বলল: ‘আমার বলার আছে কিছু কথা…’
‘বলে ফেল না মশাই!’ সকলে দিল চিৎকার
তবু সব কিছুর আগেই ওরা
চাইছিল ভেজাতে গলাটা সুরার নেশায়।

মার্কোভস্কি বলল: ‘এস হে- একটু মাল টানা যাক!
আমাকে ডাক্তার বলেছেন, এউ ডি কোলোন হল
সেই জিনিস যা কিনা বলি রেখা দূর করে।
যা খুশী ভাবুক ওরা, ভাবতে দাও! –আমরা পরোয়া করি না!
আমরা অভ্যস্ত সব রকমের মদ খেতে
যখন ছিলাম আমরা জর্মন দেশে
মোসেল থেকে নেয়া আঙুর সুরা সহযোগে
আমরা ভরতাম টাংকির রেডিয়েটরগুলো।

আমাদের কোন নিয়মমাফিক খাদ্য দরকার নেই
আমাদের চাই মুক্ত বাতাস, অসীম আকাশ!
পুরনো বন্ধুরা, শোন ওই আমাদের
হৃদয়ের কথা, যেন বা সুরক্ষিত সিন্দুকের মতঃ
আমাদের আছে সমুদ্র, আমাদের মায়েরা আর ছোট ভাইয়েরা
আর বাকি সব… একদম ছাইপাঁশ!’

ছড়ানো দু’পায়ে দৈত্যের মত পৃথিবীটাকে দলে,
মার্কোভস্কি উঠে দাঁড়ালো একটা গ্লাস হাতে করে
যাতে ছিল ফেনিল সাগর।
কাপ্তান চেয়ে দেখল: ‘সব কিছুই জাহাজের মত লাগছে!’
আর একমাত্র সারেঙ শিশুর মত ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে
‘কিন্তু আমার মা আর নেই…’

আর সকলেই আমরা কান্নায় ভেঙে পড়ি,
খুব সহজে, খুব নির্লজ্জ ভাবে,
যেন প্রত্যেকেই নিজ পরিবারের পাশে আছি
নামল সকাল চোখের লবণজল মেখে
প্রথমত সারেঙের মায়ের স্মৃতির প্রতি,
আর তারপর স্রেফ নিজেদের কথা ভেবে।

ইতিমধ্যেই দুঃখপূর্ণ নোটিশ ঝুলে আছে ঔষধালয়ে-
‘তিন চোলাইয়ের এউ ডি কোলোন নেই’-
কিন্তু আমরা আটটি সমুদ্র নেকড়ে
ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছিলাম প্রায় সমস্ত রাশিয়া জুড়ে!
আর কান্নার সাথে আমরা ছড়িয়েছি গন্ধ
যেন আটটি নরসুন্দর খানা।

অশ্রুধারা, যেন ঝড় হয়ে,
উড়িয়ে নিলো লালিত একগাদা মিথ্যে বোধ,
গর্বে ফেঁপে ওঠা নামের অহং,
আর একান্তে হৃদয়ে জেগে থাকে
শুধু একাকী সমুদ্র, আমাদের মা আর ছোট ভাইগুলো-
এমনকি যে মা মরে গেছে সেও…

আমি কাঁদি যেন সদ্য আমাকে মুক্তি দেয়া হয়েছে,
চিৎকার দেই যেন এই কেবল জন্মেছি আমি,
সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানুষ যা ছিলাম আগে তার চেয়ে,
যেমন স্রস্টার সম্মুখে তেমনি নিজের সম্মুখে,
ওই মাতাল তিমিশিকারিদের চোখের জলের মত,
আমার আত্মা ছিল নিখাদ।

বাবি ইয়ার

স্মৃতিস্তম্ভ বিহীন নির্জন এ বাবি ইয়ার।
পড়ে আছে এখানে কেবল শতচ্ছিন্ন কিছু সমাধিফলক।
ভয় পাচ্ছি কেমন,
যেন আমি সময়ের মতন প্রাচীন
সেই সব ইহুদি মানুষদের মতন।
এখন আমাকে দেখে মনে হয়
একজন ইহুদি।
এখানেই আমি ধুঁকে ধুঁকে চলি প্রাচীন মিশরে
এখানে বিক্ষত আমার বিনাশ, ক্রুশকাঠে ঝুলে।
আর আজকের দিনেও চলেছি বয়ে ক্ষতভরা নখ
হয়ে আছি আমি যেন
দ্রেফুস
ফিলিস্তিনরা
যারা তথ্য পাচার ও বিচার উভয়ই করে।
গরাদের পিছনে রয়েছি আমি।
দশদিক থেকে অবরুদ্ধ।
যন্ত্রণায় দগ্ধ,
থুথু ফেলি,
কুৎসিত ঘৃণায়।
ব্রাসেলস লেসের পাড় লাগানো জামার শৌখিন রমণীরা,
ক্ষোভের প্রকাশ করে রোদছাতার শক্ত আঘাতে।
মনে হয় যেন হয়েছি তখন
বাইহিলস্টকের তরুণ বালক এক।
রক্ত নামে, ঝরে পড়ে মেঝের বুকে।
পানশালার উশৃঙ্খল লোকেরা
তুলে দিল হাতে পুঁতি গন্ধময় ভদকা ও পেয়াজ১০
ফেলে দিল বুটের কী নির্মম আঘাত। অসহায় আমি
সংগঠিত দাঙ্গাবাজদের থামতে বলেছি নিষ্ফল প্রার্থনায়।
আর ওরা বিদ্রূপ চিৎকারে বলে যাচ্ছিল
‘মার ইহুদীর পুত। রাশিয়া বাঁচা!’
কৃষিবাজারের লোকেরা হাত উঠালো মায়ের গায়ে।

হে আমার রাশান বন্ধুরা
আমি জানি
তোমরা
আজ হৃদয় ধারণ করতে চাইছ বিশ্বজনীনতা।
কিন্তু যাদের হাত ছেয়ে আছে অশুচিতে
প্রায়শ উপহাসের সুর বাঁধে তোমাদের শুদ্ধতম নামে।
আমার জনপদের বকধার্মিকতা আমি জানি
কি উৎকট এসব ইহুদীবিদ্বেষীরা—
কোনরকম দুঃখবোধ ছাড়াই আজকে
তারা সাড়ম্বরে বলে যায়
আমরা রাশিয়ান ইউনিয়নের জনগণ!
বোধ জাগে আজকাল আমি যেন
এ্যান ফ্রাংক
নির্মলা
যেন এপ্রিলের এক বৃক্ষশাখা।
এবং আমি ভালবাসি।
দরকার নেই কোন আখ্যানের।
আমার চাওয়া
যেন পরস্পর তাকাই একদৃষ্টিতে।
কত সামান্য আমরা দেখতে পাই
কিংবা সুগন্ধ নিতে!
আমরা দেখিনি পাতার খেলা,
আমরা দেখিনি মুক্ত আকাশ।
তবুও কত কি করতে পারি আমরা—
মায়াভরা চোখে
আলিঙ্গন করতে পারি একে অপরে অন্ধ প্রকোষ্ঠে।
ওরা কি আসছে?
ভয় পেয়ো না, ওগুলো আড়মোড়া ভাঙা
বসন্তের শব্দ :
বসন্ত কাছেই, সমাগত প্রায়।
আমার কাছে এসো।
আর দেরি নয়, ওষ্ঠসুধায় ভরে তোলো।
ওরা কি দরজায় করছে বুটের আঘাত?
উঁহু, ওটা বরফ ভাঙার শব্দ…
বুনো ঘাসের মর্মরধ্বনি বাজছে বাবি ইয়ারে।
গাছগুলো যেন এক একটা শঙ্কার চিহ্ন,
বৃদ্ধ বিচারক।
এখানে সকল যেন করে শব্দহীন চিৎকার,
আর নগ্ন আমার মাথায়,
ধীরে ধীরে জাগে অনুভূতি
হয়ে যাচ্ছি কেমন ধূসর।
আর আমি যে নিজেই
প্রবল একটা শব্দহীন আর্তনাদ
হাজার হাজার লাশের স্তূপের উপরে দাড়িয়ে।
আমি যেন
প্রতিজন বৃদ্ধ লোক
যারা মরে গেল গুলির আঘাতে।
আমি যেন
প্রতিটি নিষ্পাপ শিশু
যারা ঝরে গেল গুলির আঘাতে।
কোনদিন ভুলবেনা
একথা আমার চিত্ত!
ওহে ‘দ্যা ইন্টারন্যাশিওনালে ১১,’ তোমাদের
চেতনা জাগুক বজ্রবেগে
যখন বিশ্বের শেষ ইহুদীবিদ্বেষী লোকটিও
সমাহিত হবে চিরতরে।
দেহে নেই আমার, কোন ইহুদি রক্ত।
সকল ইহুদীবিদ্বেষীরা, তোমাদের সবটুকু উন্মত্ততায়
অবশ্যই ঘৃণা করা উচিত আমাকে ইহুদী হিসেবে।
এর কারণ শুধু এটাই
যে আমিই প্রকৃত রাশান!

টীকাঃ

১) দু মাস্তুলের ছোট্ট জাহাজের আলাদা করে একটি নাম আছে ইংরেজিতে, যাকে বলা হয় Schooner, রুশ ভাষায় যা Шхуна বা Shkhuna। এই জাতীয় ছোট জাহাজের প্রধান মাস্তুলটির তুলনায় সামনেরটি বেশ ছোট হয়ে থাকে। তবে মাস্তুল সংখ্যা দুইয়ের বেশিও হতে পারে।
২) Amderma (আমদেরমা) বা রুশ ভাষায় Амдерма রাশিয়ার স্বায়ত্তশাসিত অক্রুগ এলাকার একটি ছোট শহর যা কারা সমুদ্রের তীরে অবস্থিত। ১৯৯০ সালে এখানকার খনিজ সম্পদ উত্তোলন বন্ধের পর এখানে বসবাস করা লোকেদের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। এখানে লোকেদের প্রধান পেশা মাছ ধরা।
৩) আজিয়েছা হচ্ছে ইউক্রেন এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর ও শহর। ইংরেজি ভাষায় একে Odessa বলা হলেও রুশ উচ্চারণে একে শোনায় আজিয়েছা’র মত (রুশ: Одесса) এই শহরটি কৃষ্ণসাগরের উত্তর পশ্চিম দিকে অবস্থিত। একে অনেক সময় কৃষ্ণসাগরের মুক্তা বলা হয়। সোভিয়েত আমলে একে বলা হত দক্ষিণের রাজধানী।
৪) Triple-distilled eau de cologne বা ত্রি-পাতিত এউ ডি কোলোন সুপ্রসিদ্ধ সুগন্ধি যা জার্মানির কোলোন (Kölnisch Wasser ) শহরের নামে এবং এখান থেকেই তৈরি হয়েছে। এই সুগন্ধি বিভিন্ন নামে এবং বিভিন্ন ব্রান্ডের পাওয়া যায়। এটি পানীয় মদ থেকে সস্তা হওয়ায় অনেক সময় দরিদ্র লোকেরা একে পান করতেন সেই কথাই এখানে বলা হয়েছে।
৫) Mosel বা মোসেল একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় পাহাড়ি নদী যা ফ্রান্স, লুক্সেমবুর্গ এবং জার্মানির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। এই নদীর প্রবাহের পাহাড়ি অংশে আঙুরের চাষ করা হয় যা দিয়ে তৈরি হয় রেড ওয়াইন বা এই জাতীয় দ্রাক্ষারসের মদ।
৬) প্রাচীন ইহুদী রীতি অনুযায়ী নখ কাটার একটি বিশেষ নিয়ম রয়েছে যা সকলের অনুসরণ করা কর্তব্য। যারা এটা ভাল করে অনুসরণ করে না তারা দুষ্ট লোক- এরকম ধারণা রয়েছে। নখ কাটার নানান নিয়ম রয়েছে যা বিভিন্ন গোত্র ও র‍্যাবাইয়ের অনুসারীরা মেনে আসছে। এমনকি হাতের ও পায়ের নখ একসাথে কাটা উচিত নয় বলে তারা মনে করে। এলাইজা ডে ভিদাস এবং আইজ্যাক আরামা’র মতে নখ কাটা বাম হাত দিয়ে শুরু করা উচিত এবং আঙ্গুলের ক্রম হবে ২, ৪, ১, ৩, ৫ (বৃদ্ধাঙ্গুলি এক ধরে)। আবার আবুধারহাম এর মতে এটা হবে ১, ৩, ৫, ২, ৪। যা হোক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিংবা তার আগেও ইহুদীদের হাতের নখ বিক্ষত করে অত্যাচার করা হয়েছে, যা এখনো অনেক দেশেই নির্যাতনের উপায় হিসেবে স্বীকৃত।
৭) আলফ্রেড দ্রেফুস (৯ অক্টোবর ১৮৫৯ – ১২ জুলাই ১৯৩৫) ছিলেন একজন ফ্রেঞ্চ ইহুদী আর্টিলারি অফিসার যাকে ১৮৯৪ সালে জার্মানিতে অস্ত্র ও গোলাবারুদের নকশা পাচারের দায়ে অভিযুক্ত করা হয় কোন প্রমাণ ছাড়াই। শেষ পর্যন্ত ফরাসি সরকার তার ভুল বুঝতে পেরে দীর্ঘ কারাবাস শেষ তাকে মুক্তি দেয় এবং তাদের সর্বোচ্চ সম্মান লিজিয়ন অফ অনার প্রদান করে। আধুনিক ইউরোপের ইহুদি বিদ্বেষের প্রতীক হিসেবে দেখা হয় এই ঘটনাকে এবং একে Dreyfus affair বলে অভিহিত করা হয়।
৮) The Philistine: গাজা, আশদোদ, আশকেলন, একরন এবং গাথ এই পাঁচটি শহরের অধিবাসীদের বনী ইসরাইলিরা বা ইহুদীরা ফিলিস্তিনি বলে থাকে এবং এদের সাথে ঐতিহাসিকভাবেই এদের শত্রুতা। গোলিয়াথ নামের যে দৈত্য বধের কথা শোনা যায় ডেভিড এর হাতে সেও এই অংশ থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়। ইহুদীদের ঐতিহাসিক শত্রু বলে বিবেচিত ফিলিস্তিনিদের সাথে আজও চলছে জাতিগত দ্বন্দ্ব।
৯) Byelostok বা বাইহিলস্টক হল রাশিয়ার গ্রদনো অঞ্চলের খুব ছোট্ট একটি ইহুদী অধ্যুষিত অঞ্চল যা বহু পুরনো হলেও আজকের দিনে বিস্মৃতপ্রায়। জায়গাটি রাশিয়ান ফেডারেশনের সাথে যুক্ত হবার পূর্বেও ইহুদীপ্রধান ছিল।
১০) Vodka and onion: রাশিয়ার জীবনাচরণের সাথে ভদকা যেমন জড়িত তেমনি একইসাথে পেয়াজও তাই (বেগুনি রঙের)। ভদকা ও কাঁচা পেঁয়াজের শট এই জনপদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য সেটাই উল্লেখ হয়েছে এখানে।
১১) The Internationale: ফরাসি ভাষায় উজিন পোত্তি রচিত বিখ্যাত সঙ্গীত L’Internationale বাম বা মার্ক্সবাদী রাজনীতির মুখ্য সঙ্গীত হিসেবে গীত হয়ে আসছে দীর্ঘকালব্যাপী। ১৮৬৪ সালে রচিত এ গানকে বাম ঘরানার পরিচিতি সঙ্গীত হিসেবেও বলা যেতে পারে। সোভিয়েত রাশিয়ার জাতীয় সঙ্গীত হিসেবেও এটি গৃহীত হয়েছিল। এটি বিশ্বের প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ ভাষাতেই অনূদিত হয়েছে। বাংলাভাষাতে কাজী নজরুল ইসলাম একে অনুবাদ করেছেন এবং বিখ্যাত গন সঙ্গীতশিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস গানটি গেয়েছেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.