অনুবাদ, বিশ্বসাহিত্য

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস: কীভাবে আমি লেখা শুরু করি

সেজান মাহমুদ | 9 Mar , 2019  

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ ভেনেজুয়েলার এথেনিয়াম অফ ক্যারাকাসে ১৯৭০ সালের মে ৩ তারিখে এই বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন। স্প্যানিশ থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন এডিথ গ্রোসম্যান। সাক্ষাতকারটি প্যারিস রিভিউয়ে মার্চ ৬, ২০১৯ সালে প্রকাশিত। লেখাটি ইংরেজি থেকে বাংলা তর্জমা করেছেন কথাসাহিত্যিক সেজান মাহমুদ।

ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ: সেজান মাহমুদ

প্রথমত আপনাদের সামনে বসে-থেকে বক্তৃতা দেয়ার জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী; কিন্তু বাস্তবতা হলো আমি দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিয়ে গেলে ভয়ে পড়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা। প্রকৃতপক্ষে আমি ভাবতাম আমার কপালে আছে বিমানের ভেতরে তিরিশ চল্লিশজন লোকের সামনে জীবনের দূর্বিসহ পাঁচ মিনিট কাটাবো কিন্তু ভাবিনি এভাবে শ’দুয়েক বন্ধুর সামনে তা কাটাতে হবে। সৌভাগ্যবশত এখন আমার ভেতরে যা ঘটছে তা আমাকে সাহিত্য নিয়ে কথা বলতে প্ররোচিত করবে; কারণ, আমি যেভাবে এই উঁচু মঞ্চে উঠে এসেছি ঠিক সেভাবেই লেখক হবার প্রচেষ্টা শুরু করেছিলাম। আমার ওপরে কিছুটা জুলুম করা হয়েছে বলতে পারি। আমি স্বীকার করি এই সমাবেশে না আসার সব রকমের চেষ্টা চালিয়েছিলাম; অসুস্থ হবার চেষ্টা করেছি, নিউমোনিয়া বাঁধানোর চেষ্টা করেছি, এমনকি নাপিতের কাছে গিয়েছিলাম যদি আমার গলাটা কেটে ফেলে, এবং সর্বশেষ চেষ্টা হিসাবে একটা জ্যাকেট ছাড়া, টাই ছাড়া চলে এলাম যাতে এমন গাম্ভির্যময় অনুষ্ঠানে আমাকে ঢুকতে না দেয়। কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছিলাম এটা ভেনেজুয়েলা, এখানে শার্ট-হাতা ছাড়াও যে কোন জায়গায় চলে যাওয়া যায়। ফলাফল হলো আমি এখানে উপস্থিত কিন্তু জানি না কোথায় শুরু করবো। কিন্তু আমি উদাহরণ হিসাবে বলতে পারি, কীভাবে লেখা শুরু করেছিলাম।

আমার কখনোই মনে হয়নি যে আমি লেখক হতে পারবো। কিন্তু আমার ছাত্রাবস্থায় বোগোতা থেকে প্রকাশিত ‘এল এস্পেক্টাদোর’ নামের সাহিত্য সাময়িকীর সম্পাদক এদুয়ার্দো হালামেরা বোরদা একটি সম্পাদকীয় লিখলেন। যাতে তিনি বললেন, নতুন প্রজন্মের লেখকদের আর কিছু দেবার নেই; একজন নতুন গল্পকার বা ঔপন্যাসিক আর দেখা যাবে না। তিনি এটাও বললেন, কেউ কেউ অভিযোগ করেন আমরা শুধু প্রতিষ্ঠিত পুরনো লেখকদের লেখা ছাপি, নতুনদের নয়; কিন্তু সত্য হলো নতুন কেউ আসলে লিখছেনই না।

একথায় আমার প্রজন্মের নতুন লেখকদের প্রতি একধরনের একাত্মতাবোধ করি এবং সেই বোধ থেকেই এদুয়ার্দো হালামেরা বোরদা, যিনি আমার তুমুল বন্ধু ছিলেন, কিম্বা পরবর্তীতে ভাল বন্ধু হয়েছিলেন, তাঁর মুখ বন্ধ করতে একটা গল্প লিখে ফেলি এবং ‘এল এস্পেক্টাদোর’ সাময়িকীতে পাঠালাম। পরের রোববার আমি দ্বিতীয় দফায় বিস্মিত হলাম যখন কাগজ খুলে দেখলাম আমার পূর্ণ-পাতার গল্প শুধু ছাপাই হয়নি, তাতে সম্পাদক এদুয়ার্দো হালামেরা বোরদা একটি নোট লিখেছেন এই বলে যে নতুন প্রজন্মের লেখকদের নিয়ে তিনি শুধু ভুলই নন, কলম্বিয়ার সাহিত্যে একজন নতুন প্রতিভার আবির্ভাব ঘটেছে, বা এজাতীয় কিছু।

এইবার আমি সত্যিই অসুস্থ হয়ে পড়ি, এবং মনে মনে ভাবি একি মহা জগাখিচুড়ির মধ্যে নিজেকে জড়ালাম? আমি এখন কী করি যাতে এদুয়ার্দো হালামেরা বোরদার মুখরক্ষা হয়? উত্তর একটাই- লেখা চালিয়ে যাওয়া। কী বিষয়বস্তু নিয়ে লিখবো তা ছিল আমার জন্যে চ্যালেঞ্জ। আমি সবসময় কোন কিছু লেখার আগে বিষয়বস্তু বা গল্পটি খুঁজে পাওয়ার জন্যে বাধ্যবাধকতা বোধ করতাম।
আর পাঁচ পাঁচটি বই লিখে প্রকাশ করার পর এই বাধ্যবাধকতা আমাকে এখন একটি বিষয়ে কথা বলতে অনুমতি দিচ্ছে, যা এখন যাচাই করে নিশ্চিত বলতে পারি, তা হলো একজন লেখকের কাজ কঠিন থেকে কঠিনতর হতে থাকে যখন সে আরো বেশি লিখতে থাকে। এক সময় আমি একটি বিকেল বেলা এক বসাতেই যে গল্পটি লিখে শেষ করতে পারতাম, সেই শ্রম ও সাধ্য চলে যায় এখন একটি মাত্র পাতা লিখতে। আমার লেখার পদ্ধতি সব সময় একই রকম- শুরুতে বলতে পারবো না কতক্ষণ আমি লিখবো, এবং কী নিয়ে আমি লিখবো। আমি যখন লেখার কথা ভাবি, কোন একটি বিষয় পেয়ে যাই তখন তা মাথার মধ্যে লালন করতে থাকি যতক্ষণ না তা পরিপক্ব হয়। যখন তা পরিপক্বতা পায় (কখনো কখনো তা বছরের পর বছর, যেমন ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচ্যুউড’র বেলায় তা ছিল দীর্ঘ উনিশ বছর), আমি আবারো বলি যখন তা মাথার ভেতরে পরিপক্বতা পায়, তখন লিখতে বসি। ঠিক তখনই সবচেয়ে কঠিন অংশটা শুরু হয়- লিখে শেষ করা, যা অত্যন্ত বিরক্তিকর; কারণ, সবচেয়ে সুখকর কাজটা হলো গল্পটাকে মাথায় নিয়ে উল্টে পালটে দেখা, বার বার ভাবা, নানান দিক থেকে চিন্তা করা। তাই সব শেষে তা লিখতে গেলে পুরনো লাগে, অন্তত আমার কাছে বিরক্তিকর লাগে।

আমি এখন একটা গল্পের উদাহরণ দেবো যা আমি মাথার মধ্যে বছরের পর বছর উল্টে পালটে দেখছি। আমার ধারণা গল্পটা ইতোমধ্যে বেশ পরিপক্ব হয়ে আছে। আমি গল্পটা বলে দেবো, কারণ, আমি মোটামুটি নিশ্চিত এটা যখন লিখবো, যদিও জানি না কখন, তখন গল্পটা আমূল পালটে যাবে এবং আপনারা বুঝতে পারবেন কীভাবে এটার বিবর্তন হয়েছে।

মনে করুন একটি খুব ছোট্ট গ্রামে একজন বয়স্ক মহিলা ছিলেন যার দুই সন্তান; একটি সতের বছরের ছেলে আর একটি চৌদ্দ ছুঁইছুঁই মেয়ে। বয়স্ক মহিলা মুখায়বে ভয়ানক দুশ্চিন্তার ছাপ নিয়ে ছেলেমেয়ে দুটো কে প্রাতরাশ দিচ্ছিলেন। ছেলেমেয়ে জিগ্যেস করে কী নিয়ে দুশ্চিন্তা। মহিলা উত্তর দেন, ‘আমি জানি না বাছা, কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হয়েছে এই গ্রামে ভয়ানক কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।‘

ছেলেমেয়ে দুটো ব্যঙ্গের হাসি হাসে আর বলে, ওগুলো বুড়ি মানুষের সন্দেহ যা উপেক্ষা করা যেতে পারে। ছেলেটি বাইরে বিলিয়ার্ড খেলতে বের হয়। যখন সে একটি খুব সাধারণ ক্যানন-শট মারার জন্যে উদ্যত তখন তাঁর প্রতিপক্ষ বলে, ‘আমি এক পেসো বাজী ধরছি, তুমি এই শটটি মারতে পারবে না।‘ সবাই হাসে, ছেলেটিও হাসে কিন্তু সে সত্যিই ক্যানন-শটি মারতে ব্যর্থ হয়। ছেলেটি প্রতিপক্ষকে এক পেসো দিয়ে দেয়। প্রতিপক্ষ তা নিতে নিতে বলে, ‘কিন্তু কী হয়েছিল, ওটা তো সত্যি একটা সহজ শট ছিল? পারলে না কেন?’ তখন ছেলেটি উত্তরে বলে, ‘ওটা সহজ শট ছিল বটে। কিন্তু সকালে আমার মা বলেছিলেন যে গ্রামে কিছু একটা ভয়ানক ঘটবে সেই কথা নিয়ে আমি চিন্তিত ছিলাম।‘
সবাই ছেলেটির কথায় হাসে। প্রতিপক্ষ ছেলেটি এক পেসো জিতে নিয়ে বাড়ি চলে যায়। সেখানে ছিল তার মা, চাচাতো ভাই, কিম্বা ভাগিনী আর কিছু আত্নিয়া। এক পেসো পেয়ে ছেলেটি খুশি আর বলে, ‘ ডামাসোর কাছে থেকে পেসো টা সহজে জিতে নিয়েছি কারণ, ও একটা গাধা। ‘কেন, গাধা কেন? উত্তরে বলে, ‘ হায় হায়, একটা সহজ ক্যানন-শট ও মারতে পারে নাই। কারণ, সকালে ওর মা নাকি ঘুম থেকে উঠেছে এই ভাবনা নিয়ে যে গ্রামে ভয়ানক কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। তা-ই ভেবে ও নাকি খুব চিন্তিত ছিল।‘

একথায় ছেলেটির মা বলে, বুড়ি মানুষের সন্দেহ নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করবি না, কারণ অনেক সময় তা সত্যি হয়।‘ সেই আত্নিয়া একথা শুনে বাজারে মাংশ কিনতে গিয়ে কসাই কে বলেন, ‘এক পাউন্ড মাংশ দিন তো।‘ তারপর কসাই মাংশ কাটা শুরু করতে না করতেই যোগ করেন, ‘ভাই আরেক পাউন্ড বেশি দিন, লোকজন বলছে গ্রামে নাকি ভয়ানক কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, প্রস্তুত থাকা ভাল।‘ কসাই ভদ্রলোক ভদ্রমহিলাকে মাংশ এগিয়ে দেন। যখন আরেকজন ভদ্রমহিলা এক পাউন্ড মাংশ কিনতে আসেন তখন তাঁকে বলেন, ‘দুই পাউন্ড নিন। লোকজন বলাবলি করছে গ্রামে নাকি ভয়ানক কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, প্রস্তুত থাকা ভাল, জিনিসপত্র কিনছে তারা।‘
তখন সেই বয়স্ক ভদ্রমহিলা বলেন, ‘আমার অনেকগুলো ছেলেপুলে, দেখুন আমাকে বরং চার পাউন্ডই দিন।‘ সেই মহিলা চার পাউন্ড নিয়ে চলে গেলেন। আর লম্বা গল্প সংক্ষেপে বলি, ঘন্টা খানেকের মধ্যেই কসাইয়ের সব মাংশ বিক্রি হয়ে গেল। আরেকটা গরু জবাই হলে সেটাও বিক্রি হয়ে গেল এবং গুজব ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো যখন গ্রামের সবাই ভাবছে কখন সেই ভয়ানক ব্যাপারটি ঘটবে! সকল কাজকর্ম স্থগিত হয়ে রইলো আর ঠিক দুপুর দু’টোয় প্রচণ্ড গরমে, যা সব সময় পড়ে, সহসাই একজন বলে ওঠে, ‘দেখছো কী ভয়াবহ গরম পড়েছে?’ কেউ একজন বলেন, ‘কিন্তু এই গ্রামে তো এমন গরম সবসময় পড়ে।‘ আসলে এতো গরম পড়ে যে গ্রামের সব যন্ত্রবাদকেরা তাঁদের বাদ্যযন্ত্র আলকাতরা দিয়ে সারান এবং ছায়ায় বসে বাজান। তা না হ’লে গরমে আলকাতরা গ’লে যন্ত্রগুলো ভেঙ্গে পড়বে। সেই একজন বলেন, “তা ঠিক, তবু বছরের ঠিক এই সময়ে এমন গরম কখনো পড়তে দেখিনি।‘ সেইসময়, বিনা নোটিশে একটি ছোট্ট পাখি সেই নির্জন গ্রামের নির্জন চত্বরে উড়ে এসে আছড়ে পড়ে। খবর ছড়িয়ে পড়লো- ‘একটি ছোট্ট পাখি গ্রামের চত্বরে উড়ে এসে আছড়ে পড়েছে।‘ সবাই সেই চত্বরে ছুটে যায় আর সেই ছোট্ট পাখি দেখে ভীত হয়ে ওঠে।
সন্দেহবাদী কেউ বলে, ‘কিন্তু এর আগেও তো এমন ছোট্ট পাখি উড়ে এসে পড়েছে!’ উত্তর আসে,
‘কিন্তু কখনো দিনের এরকম ভর-দুপুর সময়ে না! ‘

এটা এমন একটি উত্তেজনাকর, মরিয়া সময়ে উপনীত হয় যখন গ্রামবাসী সবাই ভাবে গ্রাম ছেড়ে পালাতে হবে কিন্তু কেউ সাহস করে বলতে পারে না। এঁদের মধ্যে একজন চিৎকার করে বলেন, ‘আমি সত্যিকারের মরদ। আমি যাচ্ছি গ্রাম ছেড়ে।‘ তিনি তাঁর আসবাবপত্র, বাচ্চাকাচ্চা, পশুপাল গুছিয়ে ঠেলাগাড়িতে তোলেন, তারপর প্রধান রাস্তা পার হয়ে এগিয়ে যান যেখানে অন্যান্য সব দরিদ্র গ্রামবাসীরা তাঁর চলে-যাওয়া দেখতে থাকে। তারপর সেই সময় আসে যখন সবাই একযোগে বলে, ‘ওর যদি সাহস থাকে গ্রাম ছাড়ার, আমরা কেন পারবো না?’ এভাবেই সবাই চলে যেতে থাকে পুরো গ্রামকে ছিন্নভিন্ন ক’রে। গ্রামবাসী তাদের বস্তুসামগ্রী, পশুপাখি সবকিছু সঙ্গে নিলেন। গ্রামের সর্বশেষ লোকটি গ্রাম ছাড়ার আগে বলেন, ‘আমার বাড়ির ওপরে কোন দৈবদুর্বিপাক বা খারাপ কিছুর আছর লাগতে দিবো না।‘ বলেই নিজের ভাঙ্গা ঘরে আগুণ লাগিয়ে দেন। অন্যান্যরাও তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেন। গ্রামবাসী এবার সত্যিকারের ভয়াবহ আতঙ্ক নিয়ে গ্রামছাড়তে থাকে; অনেকটা যুদ্ধের সময়ের চিরপ্রস্থানের মতো এবং সেই বুড়ি মহিলা যিনি প্রথম সন্দেহ নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠেছিলেন, তিনি চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘বলেছিলাম না ভয়ানক কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, আর তোমার ভেবেছিলে আমিই পাগল?”

পুনশ্চঃ গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ এখানে বর্ণিত গল্পটি কোনদিন লিখেছিলেন কীনা তা জানা যায়নি -সেজান মাহমুদ

Flag Counter


1 Response

  1. Juwel Rana says:

    স্যার, অসাধারণ অনুবাদ আর লিখার জন্য অনুপ্রেরণাদায়ী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.