গল্প

মাহবুবা হোসেইন-এর মাটি

মাহবুবা হোসেইন | 31 Mar , 2019  


ফয়জুদ্দিন ফকির রোজ খাঁ বাড়ির নামায় এসে দাঁড়ায়। দাঁড়ায় ঠিক সেই সময়ে, সূর্য যখন খাড়া মাথার উপর উঠে যায়। সেই সময় খাঁ বাড়ির নতুন বউও নিজের ঘর পার হয়ে টিনের ঘের দেয়া গোসল খানায় গোসল করতে যায়। ময়নার মা তার আগেই তেল, সাবান, গামছা, পানি গোসল খানায় গুছিয়ে দিয়ে এসে হাক দেয় ‘নতুন ভাবী সব দিছি।’
প্রথম দিন ময়নার মা ‘নুতন বউ’ ডাকতেই লতা মৃদু অথচ দৃঢ় স্বরে বলছিল ‘ময়নার মা আমাকে ‘নতুন ভাবী’ বলে ডাকবে। সহবত বড় বাড়ির পরিচয়। সে বউ-ই হোক আর ঝি।’
ময়নার মা প্রথম দিনই বুঝেছিল আর যেখানে যা হোক এই বউকে সমীহ করে চলতে হবে।

নতুন বউ তখন তখনই উঠে এলো না। সে জানে মানুষের সমীহ ধরে রাখা সহজ কাজ নয়, তাকে ধরে রাখতে হলে, গলার স্বর, দেহের ভঙ্গিমা, চালচলন, চোখের ভাষার মত সময়কেও কৌশলে ব্যবহার করতে হয়। বাড়ির মলিক হোক বা চাকর, তার ডাকে এমন ভাবে সাড়া দিতে হবে যেন সে খুব বেশী গুরুত্বপূর্ণ না হয়ে উঠে, আবার তাকে গুরুত্বহীন করাও চলবেনা। তার আহ্বানে সচেতন নির্লিপ্ততায় সাড়া দিতে হবে। এসব লতা শিখেছে তার দাদী পরিমন বিবির কাছে। দাদী তাকে হাতে ধরে শিখাননি। তাঁর হাবভাব, চালচলন, কথাবার্তা থেকে লতা আপনা আপনি শিখে নিয়েছে। সবাই শিখতে পারে না কিন্তু সে পেরেছে। কারন তার বুদ্ধির জোর অন্যান্যদের চেয়ে কিছু বেশী।
বিরাশি বৎসর বয়স পর্যন্ত তার দাদী প্রতাপের সাথে তার সংসারের হাল ধরে রেখেছিলেন। সাত ছেলে তিন মেয়ে তাদের মাকে দেবীর মত জ্ঞান করত এবং তারা তাদের মায়ের ব্যক্তিত্বের কাছে ছিল শিশু। সংসারে তাঁর কথাই ছিল আইন। তিনিও তা প্রজ্ঞা ও সু-বিবেচনার সাথে প্রয়োগ করতেন।

নুতন বউ মিনিট দশেক পরে আলতা দেয়া নুপুর পা ঘরের পৈঠার সিড়িতে রাখে। ঐ সময়ই ফৈজু ফকির ঐ খানটাতে এসে দাঁড়ায়। ঘটনাটা প্রথমে চোখে পরে আতর আলী খাঁর স্ত্রী ফাতেমার- নতুন বউ লতার শাশুড়ীর। রাতে শুতে গিয়ে সে স্বামীকে কথাটা জানায়। আতর আলীর মুখে চিন্তার ছাপ পড়ে। তখনই তার খেয়াল হয় কয়েকদিন থেকে ফৈজুকে সেও যেন ঐখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। অন্য কেউ হলে আতর আলীর চিন্তার কারণ ছিল না, সে হয়তো হেসেই উড়িয়ে দিত। বলত ‘হ তরে কইছে। ঐ বুইড়া এই কচি বউটার দিকে তাকাইয়া থাকব? মাইয়া গো যত কূট সন্দেহ। আর তুই তো আবার সন্দেহের রানী। হারা জীবন আমারে সন্দেহ কইরা কইরা আমার জীবনটা তিতা বানাইছস। কার সাথে না আমারে সন্দেহ করছস। মিয়া বাড়ীর মইরম, পূর্ব পাড়ার আনিসা, বিল্লাস পুরের তোর খালাত বোন বিধবা আকিরা। এমন কি আামার মেঝ চাচী-মেঝ চাচার দুই নাম্বার বউ মালেকারে লইয়াও। তোর তো ঐ খাসলত্। কেল সন্দেহ আর সন্দেহ। এলা এইসব বাদ দে।’ কিন্তু ফৈজুর ব্যাপারটা সে এত হালকা ভাবে নিতে পারল না। কারন গ্রামে ফৈজুর দুঃশ্চরিত্র বলে দুর্নাম আছে।
দুর্নামটা এমনি এমনি হয় নাই। তার আপন ছোট চাচীকে নিয়ে সে একবার কমলাকান্দি পালিয়ে গিয়েছিল। তার ঘরে তখন তার বউ হাসিনা। গ্রামের লোকজন সেখান থেকে তাদের ধরে এনে দুজনকে বেদম উত্তম মধ্যম দিয়ে, মুখে চুন কালি আর গলায় জুতার মালা পরিয়ে সারা গ্রাম ঘুরিয়ে এনেছিল। তখন থেকেই ফৈজুর প্রসঙ্গ এলেই সবাই ‘লুচ্চা ফৈজু’ বলে উল্লেখ করে যেন ‘লুচ্চা’ একটা পদবী। পরে ফৈজু বেশ কয়েকটা বিয়ে করে কিন্তু কোনটাই টেকেনি। সে অবশ্য ফৈজুর একার দোষ না। তার মা ছমিরন বিবি বউ কাঁটকি শাশুড়ী। বউদের সারাদিন কাজ করাতে, ক্যাটক্যাট করতে ওস্তাদ। খাওয়া দিতে গেলে হাতে উঠে কম। তাদের উপর পচা বাসির সদ্ব্যবহার তার নিত্যদিন। তারউপর বাপের বাড়ীর খোঁটা তো আছেই। এতে তিনি পরম তৃপ্তি পান। দু একজন গরীব ঘরের মেয়ে এতেও হয় তো মাটি কামড়ে পরে থাকত, ফৈজুকে যদি পাশে পেত কিন্তু ফৈজু মা অন্তপ্রান। মায়ের মুখ নিঃসৃত কথা তার কাছে বেদবাক্য। কাজ শেষে ফিরে এলে বউয়ের প্রতি মায়ের যত অভিযোগ অনুযোগে নির্বিচারে শাস্তিটা বউয়ের জন্য বরাদ্দ করতে সে কার্পন্য করে না। মা এমন ছেলে পেয়ে নিজের পেটে কিল দিয়ে দশজনকে দেখিয়ে বলে-সোনার গর্ভ, বুঝলি সোনার গর্ভ- তা নৈলে ফৈজুর মত ছেলে হয়? তার আসল উদ্দেশ্য চির শত্রু পাশের বাড়ীর বখে যাওয়া সোলায়মানের মাকে কথাটা শুনান। সব ঝগড়ায় সোলায়মানের মার গলা থাকে সবার উপরে কিন্তু এখানে সে হার মানে- কারন সোলায়মান গুণ্ডামি মাস্তানি করে ভাল কামাই করলেও মাকে দেখে না। তাই তাকে ভীষন অভাব অনটনের মধ্যে দিন যাপন করতে হয়। অথচ ফৈজু মা অন্তপ্রান। মাকে সে সত্যি ভালবাসে। তাকে ভাল রাখতে তার চেষ্টার ত্রুটি নেই।

তাই রাত যত বাড়তে লাগল আতর আলীর চিন্তাও তত বাড়তে লাগল। পার্শ্ববর্তী স্ত্রীর নাক ডাকায় সে যারপর নাই বিরক্ত। তাকে জোরে ঠেলা দিয়ে বিরক্ত গলায় বলে ‘ মাগি পাশ ফিরা শো। খালি খাওন আর ঘুমান আর কোন কাম নাই।’

কয়েকদিন যেতে না যেতেই খাঁ বাড়ীর অনেকেই দৃশ্যটা দেখল। মাথার উপর সূর্যটা উঠলেই ফৈজু নামায় এসে কেমন এক চোখে বাড়ীটার কোনার দিকে তাকিয়ে থাকে। আতর আলীরা পাঁচ ভাই তিন বোন সকলেই এই বাড়ীতে থাকে। তার বাবা জায়গা জমি দিয়ে মেয়েদেরও এ বাড়ীতে রেখে দিয়েছে। তাদের ছেলে মেয়েরা ঐ দিনও ছোট ছিল কিন্তু দেখতে দেখতে ইদানিং যুবক হয়ে উঠছে।

আজ একটা ঝকঝকে দিন। সূর্যটা যেন চোখ বড় বড় করে মাথার উপর এসে থামল। ফৈজুও খাওয়া শেষ করে খাঁ বাড়ীর নামায় এসে দাঁড়াল। তার মুখটা কিছু বিষণ্ন। মা-টা তার মাস খানেক হল মারা গেছে। শেষ পর্যন্ত মা আর ছেলেই ছিল। মা মারা যাওয়ায় ফৈজু একেবারে একা হয়ে গেছে। খাঁ বাড়ীর নামায় পূর্ব দিকে মাকে কবর দেয়া হয়েছে। মৃত্যুর আগে ফৈজু মায়ের অনেক সেবা যত্ন করেছে। গ্রামের লোকে বলে ‘ফৈজু তো কামাই করে নিল, তার গুনাগাতি এইবার যদি কিছু কমে। মায়ের পায়ের নীচেই যে বেহেস্ত-ফৈজু সেই বেহেস্তই কিনে নিল কিনা কে জানে।’

আতর আলী পশ্চিমের বেড়াটা মেরামতের কাজে ব্যস্ত। বেড়ার ফাঁক দিয়ে গরু ছাগল তো আসেই তার উপর এই বেড়াটা উঁচু করে দিলে ফৈজুর চোখ থেকে এই বাড়ীর মেয়ে-বউরাও বাঁচে। সে কিছু চিন্তিত মুখে একটা বড় কঞ্চি চাঁচছিল। রাতে ভাল ঘুম হয়নি। চিন্তাটা তাই গেড়ে বসার সুযোগ পাচ্ছে। বুকের ভিতর কেমন এক অস্বস্তি। কায়িক পরিশ্রম করলে গ্যাসের প্রকোপটা কিছু কমবে তাই মনোযোগ দিয়ে জোরে জোরে কঞ্চিটা সে চেঁছে চলেছে। এমন সময় অদূরের পাকঘর থেকে ফাতেমা হাতের ইশারায় তাকে কিছু একটা বলল। প্রথমে সে কিছুই বুঝতে পারল না কিন্তু ফাতেমার নির্দেশিত হাতের দিকে লক্ষ্য করে দেখে ফৈজু সীমানা পিলারটায় হেলান দিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।

বড় ছেলের ঘরের নাতি বেলাল এতক্ষন দাদার কাছে বসে কঞ্চি চাঁছা দেখছিল। আতর আলী বলল, ‘বেলাল বাইর বাড়ীতে তর চাচারা ক্রিকেট খেলতেছে যা তো তাদের খবর দে ফৈজু আইজ আবার আসছে।’ এই কয়দিন খাঁ বাড়ীতে ছোট বড় সবার মধ্যে ঘটনাটা নিয়ে আলোড়ন চলছে। যুবকরা এখনই একটা হেস্তনেস্ত করতে চায় কিন্তু আতর আলীর বড় ভাই ফজর আলী বিচক্ষণ মানুষ। সে ব্যাপারটা আরো খতিয়ে দেখতে বাঁধা দিয়ে রেখেছে। আতর আলীর নির্দেশে বেলাল একছুটে বার বাড়ীতে গিয়ে বলল, ‘চাচ্চু, লুচ্চা ফৈজু আবার আইছে।’ যাওয়ার পথে সে যে তার প্রিয় গুলতিটা উঠানে ফেলে গেছে সেই খেয়ালও তার নেই। উৎসাহ তার এমনই।

খেলার উত্তেজনায় ফৈজুর নামটা যুবকদের কানে চাউর হয়ে গেল। তাদের রক্ত আরো গরম হয়ে উঠল। তারা ক্রিকেট ব্যাট ও স্টেম্পগুলো উঠিয়ে নিয়ে হৈহৈ করে নামায় নেমে গেল। ফৈজু কিছু বুঝে উঠার আগেই তার উপর ব্যাট বলের খেলা শুরু হয়ে গেল। ফৈজু যত বলে শুনেন শুনেন ততই বারির পরিমান ও ওজন বাড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফৈজু নেতিয়ে যায়। ততক্ষণে চারদিকে অনেক ভিড় জমে গেছে।
এমন সময় গয়নাগাটি সমেত নুতন বউ সবার মাঝে এসে ফৈজুকে আঁড়াল করে দাঁড়াল।
এলো পাথারি কয়েকটা বারি নতুন বউয়ের উপরও এসে পরে। সে সবার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে, ‘থামেন থামেন কেন তারে মারতেছেন?’
উত্তেজিত হয়ে একজন বলে,
– কত্ত বড় সাহস। সে তোমার দিকে চোখ দেয়। তোমারে দেখার জইন্যে রোজ এইখানে আইস্সা দাঁড়ায়ে থাকে। হেংলার মত তোমার দিকে তাকায়া থাকে।
লতা আশ্চর্য হয়ে বলে,
– উনি আমার দিকে তাকায়া থাকেন? না, তাতো আমার মনে হয় না?
– কেমনে বুঝলা তুমি?
সে মাথার ঘোমটা একটু খাটো করে সোজা প্রশ্নকর্তার দিকে তাকিয়। বলে,
– আমি সোন্দর কিনা কন?’
তার মুখ উত্তেজনায় লাল। তাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।
সমস্বরে বেশ কয়জন বলে -‘হ সোন্দর।’
একজন টিপ্পনি কাটে,’ সোন্দর না হইলে কি খাঁ বাড়ীত আইছ?’
অন্যান্যরা ঘের দিয়ে মজা দেখতে থাকে।
– আমি সোন্দর এক মাইয়া হইয়া পুরুষের দৃষ্টি বুঝুম না তা কেমনে হয়? আমি এত বোকা নাকি?
কথা সত্য। অনেকেই মাথা নাড়ে।
ফৈজু তখন আধ মরা। তাকে জিজ্ঞেস করা হল কেন সে রোজ এখানে এসে দাঁড়িয়ে থাকে? তার কথা বলার অবস্থা নয়। তবু সে আস্তে আস্তে ভেঙে ভেঙে বলে,
ফৈজুর বাবার শশুর মানে ফৈজুর নানা বাদলা বৈষ্ণব তার নয় বৎসরের সুন্দরী কইন্যা জয়নবকে নিজের পিড় বৈরাম ফকিরের নির্দেশে পিড় বাবার ছোট ছেলে মানিক ফকিরের কাছে বিয়ে দিলে বিয়েটা যে ওঁচা হয়ে গেছে বুঝতে পারেন কারণ বৈরাম ফকিরের কেবল পিড়ালিই সম্বল জমিজমা কিছু নাই। সেই ঘাটতি পূরণের জন্য বাদলা বৈষ্ণব খাঁ বাড়ীর নামায় মেয়ের নামে পাঁচ কুনি জমি কিনে দেন। জমিটা খুব ভাল- তিন ফসলি। দীর্ঘ দিন জমিটার দিকে খাঁয়েদের নজর। আতর আলীর পিতা সুন্দর আলী অনেকবার বৈরাম ফকিরকে অনুরোধ করেছে জমিটা তার কাছে বেচে দিতে। বৈরাম ফকির বার মাসের মধ্যে দশ মাস গান বাজনা, পিড় ফকিরালি, তাবিজ তুমা নিয়ে মাজারে মাজারে ঘুরে বেড়ালেও স্ত্রীকে খুব ভালবাসতেন। জয়নবের বিয়েটা যে তার যোগ্যতানুযায়ী হয়নি তা তিনি মানতেন। তাই তাঁর অনেক অভাব অনটনের মধ্যেও জয়নবের একমাত্র ভরসার স্থল শশুরের দেয়া জমিটা তিনি বেচতে চাননি। তিনি খাঁয়ের মুখের উপর বলে দিলেন, ‘ কি কন খাঁ সাহেব এইটা জয়নবের হক। আমি বেচি কেমনে? আমার যা ছিল সব ত আপনেরেই দিছি।’ খাঁ সাহেব নাখোশ হন কিন্তু নিরাশ হন না, অপেক্ষা করতে থাকেন। জানেন একদিন না একদিন বিক্রি হবেই।
ফকির সাহেব কোন দিন জমিটার দিকে চোখ তুলেও তাকাননি। এই রকম হার হা-ভাতে পরিবারে বিয়ে দেয়ায় জয়নব পিতার সাথে পারতপক্ষে কথা না বললেও পিতৃস্মৃতি হিসাবে জমিটা তার জানের টুকরা ছিল। এটা বেচার কথা উঠলেই তিনি ক্রেতার চৌদ্দ গেষ্ঠি উদ্ধার করে ছাড়তেন। তারপরও বৈরাম যদি জমিটা বেচতে চাইতেন তিনি নির্দ্বিধায় দিয়ে দিতেন। বলতেন ‘তোমার জমি তুমি বেচপা আমি কওয়নের কে?’ বিয়ের জন্য বাপের উপর রাগ থাকলেও স্বামীর উপর তার কোন রাগ ছিল না। তাকে সে প্রান দিয়ে ভালবাসত। কিন্তু বৈরামই ঐ জমির উপর হাত দেয়ার কথা চিন্তাই করতে পারত না।

পিতার মৃত্যুর পর ফয়জুদ্দিন পরে গেল মহা বিপদে। এতদিন সে ফিটফাট হয়ে ঘুরে ফিরে বেড়াত। তার চেহারাটাও ছিল মাশাল্লাহ্। তাছাড়া হাসি ঠাট্টা মশকারায় সে ছিল ওস্তাদ। কোন মেয়েকে কি প্রসংশা করলে খুশি হয় তা তার জানা। মাঝি বাড়ীর মাইঝা ভাবী বাপের বাড়ীর প্রসংশা করলে খুশি হয় সে জানে। তাই তাকে দেখলেই সে আবদার করে, ‘ও মাইঝা ভাবী আপনার হাতের এক খিলি পান খাওয়ানদি। সবাই কি আর পান বানাইতে পারে? পান বানাইতে জাত লাগে। উঁচু জাত। ফইন্নি কেমনে পান বানাইব, হেই বিলাসিতা হেগের কই?’ ব্যাস মাইঝা ভাবী খুশিতে ডগমগ। মজাদার এক খিলি পান এনে ফৈজুর হাতে দেয়।
জুলেখার হাসিটা বড় চমৎকার। তারে দেখলে ফৈজু বলে, ‘ ঐ জুলেখা তর হাসিটা কোন থন আনছস রে হাসলে যেন জোছনা ভাইঙা পরে।’ জুলেখা লজ্জা পায়। বলে, ‘যান আপনে যেন কি কন? হিহি।’ জুলেখা যারপর নাই খুশি।
ফৈজুর আছে মেয়ে পটানোর একটা সহজাত প্রতিভা যার জন্য সে যেমন জনপ্রিয়, তেমনি আবার নিন্দার ভাগিদার। তার বিভিন্ন দুর্নাম সত্ত্বেও নারীরা তাকে কেন যেন পছন্দই করে কিন্তু পুরুষদের কাছে সে দুই চক্ষের বিষ। কিন্তু এই গুন দিয়ে তো আর পেট ভরে না। তাই বাবা মারা গেলে চক্ষে মুক্ষে অন্ধকার দেখে ফৈজু। তারপরও দিন মজুরী করে কোন মতে মা-ব্যাটার সংসার চলছিল। কিন্তু মা অসুখে পরলে আর পারে না ফৈজু। খাঁ বাড়ীর জমিটার দিকে হাত দিতে হয়। আতর আলির বড় ভাই জমিটার পিছে লেগেই ছিল। এইবার ফৈজুকে বড় টোপ দেয়, অনেক টাকার টোপ। ফৈজু মাকে গিয়ে কথাটা পাড়ে। মা এক কথায় নাকচ করে দেয়, বলে ‘এইটা তর বাপের জমি, তারে যৌতুক দিছিল আমার বাপে। আমার হক কি? আমি কেমনে বেচি।’ সেই সময় জমিজমার উপর নারীদের অধিকারের কথা চিন্তাই করতেই পারত না কেউ। নারীরা তো নয়ই। গোটা পৃথিবীটার মত সমস্ত জমিজমায় এক মাত্র অধিকার পুরুষের। ফৈজু যখন চাপাচাপি করতে লাগল তখন মা বললেন, ‘ঐ জমিতে একখান কবরের জায়গা অন্তত রাহিস।’ এই শর্তেই জমিটা বিক্রি হয় এবং ঐ জমিরই এক কোনায় মায়ের কবর হয়।
জমি বিক্রি করেছে ঠিক কিন্তু ফৈজুর মনে শান্তি নাই। অনুসূচনা কমে না। দাদায় বিক্রি করে নাই, বাবায় বিক্রি করে নাই তার হাতে হইল সর্বনাশ? অভাব কার না ছিল। বাবার ছিল, তার বাবার ছিল, তার বাবার ছিল। মায়ের এত সখের জমি? এই চিন্তায় সে কোন ভাবেই শান্তি পায় না। রাতে ঘুমাতে পারে না। মানুষ যেমন ক্ষতটাতে বারবার হাত বুলিয়ে আরাম পায় ফৈজুও সকালের কামলা শেষে দুপুরের ভাত খেয়ে আবার জমিতে যাওয়ার পূর্বে একবার অন্তত জমিটার কোনায় এসে দাঁড়ায়। তখন কবরটা সূর্যের আলোয় ঝকমক করে। তার মনে হয় অন্য সময় মা ঘুমিয়ে থাকলেও এই সময় জেগে থাকে। সে ঐ দিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে মায়ের কাছে ক্ষমা চায়।

জনতা হতবিহ্বল। অনেকের চোখই মাটির দিকে।

কথা শেষ হলে নতুন বউ দৃঢ় গলায় বলে, ‘ এরে আমাগের বৈঠক খানায় নিয়া যাও। শুশ্রুষা করন লাগব।’ আশ্চর্য কেউ তার কথার প্রতিবাদ করে না। তার কথার দৃঢ়তায়, না নিজ নিজ কর্মের অনুশোচনায় কে জানে। তাকে পাঁজাকোলা করে খাঁ বাড়ীর বৈঠকখানায় নেয়া হয়। নতুন বউ কোন রকম সংকোচ না করে তাদের পিছন পিছন সোজা বৈঠকখানা ঘরে গিয়ে ঢোকে। তার শাশুড়ী একবার বলতে চেষ্টা করে ‘ বউ তুমি কই যাও?’ লতা কেবল মাত্র পিছন ফিরে তাকায়, সেই দৃষ্টিতে কি ছিল কে জানে, কেঁচোর মুখে লবন পড়ার মত শাশুড়ী মাতা চুপসে যায়। কিছু বলার আর সাহস পায় না। লতাও তাকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বৈঠকখানা ঘরে গিয়ে ঢুকে। ঢুকেই ময়নার মাকে আদেশ দেয় এক ডেকচি গরম পানি করে আনতে। ময়নার মা সেই আদেশ পালন করতে রান্না ঘরের দিকে দৌড়ায়। অন্যান্যরা নতুন বউকে জায়গা করে দিতে সরে দাঁড়ায়। লতা যখন কপালে হাত দিয়ে ফৈজুর মুখের উপড় ঝুকে পড়ে, তখন ফৈজু কোন এক অবচেতন থেকে বিড়বিড় করে বলছে মা, মাগো।
ফৈজুর কপালে রাখা লতার স্নেহময় হাতটা পরিণত হয় আশ্বাসের হাতে যাকে সে সামান্য চেপে ধরে চুলের দিকে টেনে নিয়ে যায়। মুখে তখন তার গভীর আপত্যস্নেহ।
এই মাত্র সবর- শীতল গাঁয়ে আরেকজন পরীমন বিবির জন্ম হল যে পরবর্তীতে খাঁ বাড়ীতে নিজস্ব প্রতাপ নিয়ে বিরাজ করবে।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.