চলচ্চিত্র

মুহম্মদ খসরু: নির্মল চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের পথিকৃৎ-পিতা

ফারুক আলমগীর | 7 Mar , 2019  


আলোকচিত্র: রাজু আলাউদ্দিন
[এক]
এক জীবনে শুধু একটি মাত্র বিষয়কে অবলম্বন করে হৃদয়ে ধারণ করে নিজেকে আত্মোৎসর্গ করতে পারে–নিষ্ঠায় ভালোবাসায়–মুহম্মদ খসরু বোধ করি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আমাদের অনেকের, যারা মেধা ও মননের গভীর অনুশীলনে ব্যাপৃত,কী সাহিত্য, কী চলচ্চিত্র ইত্যাদির মননমীল প্রসারে নিয়োজিত থাকা সত্ত্বেও একাধিক অঙ্গনে সুকৃতির ও স্বীকৃতির মোহবন্ধে নিবিষ্ট হয়, এমনকি পেশাগত বিষয়টি প্রধান হয়ে দাঁড়ায়, মুহম্মদ খসরুর ক্ষেত্রে তা হয়নি। মুহম্মদ খসরুর জন্মই হয়েছিলো যেন নির্মল চলচ্চিত্র আন্দোলনের পিতা রূপে। নির্মল চলচ্চিত্র আন্দোলনের সূচনা করে বহুমাত্রিক সৃজনশীল চলচ্চিত্র দর্শনের অপার আগ্রহ ও রুচিবোধ প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরে বিস্তৃত করে দিতে পারেন তিনিই হতে পারেন একজন পিতৃতূল্য পথিকৃৎ। মুহম্মদ খসরু সেই কারণে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের পথিকৃৎ-পিতা।

[দুই]

উপর্যুক্ত পংক্তিগুলো লোকান্তরিত মুহম্মদ খসরুর প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য নয় কিম্বা চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে তার স্থান নির্ধারণের প্রচেষ্টামূলক নয়, কেননা তার মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তার প্রতি উত্তর প্রজন্মের অসংখ্য অনুরাগীদের স্বতঃস্ফূর্ত শোক-সমাবেশ ও সেই সঙ্গে তার সমসাময়িক কিছু মানুষের কন্ঠে উচ্চারিত ভালোবাসায় তার স্থান পথিকৃৎরূপেই নির্ধারিত হয়ে গেছে।
[আমার এই লেখনীৃ প্রকৃত পক্ষে যেন একটি বাধ্যতামূলক লেখা, অনেকটা ইতিহাস প্রণেতাদের জন্য যাঁরা চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের প্রদোষকালের সঙ্গে নিজেদের সক্রিয়ভাবে যুক্ত করে দেখার সুযোগ পাননি। আমি সেই প্রদোষকালের কথা বলবো যার সঙ্গে আমার নবীন যৌবনের চারটি বছর কেটেছে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত। ১৯৬৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে টেলিভিশনে যোগ দিলেও চলচ্চিত্র সংসদের সঙ্গে আমার পরোক্ষ যোগাযোগ ছিলো।

প্রথমে রাওয়ালপিন্ডি ও পরে করাচিতে দীর্ঘ দু’বছর কাটিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আগে দেশে ফিরে কেন সংসদের সঙ্গে যুক্ত হলাম না, সে বিষয় এই লেখনীতে সঙ্গত কারণে পরে আসবো।

[তিন]

চলচ্চিত্র সংসদ গঠনের বিষয়ে প্রথম দিকের অনেক প্রচেষ্টার কথা শোনা যায় যার কোন প্রামাণিক দলিল নেই। যতটুকু জেনেছি এ-গুলো ফিল্ম ক্লাব ধরনের একটি সৌখিন সংগঠন যার মুখ্য উদ্দেশ্য কিছু ভালো ছবি দেখা। যথার্থ অর্থে সৃজনশীল চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও দর্শনের আন্দোলনভিত্তিক সংগঠন নয়। সংশ্লিষ্ট অধিকাংশই ছিলেন প্রযোজক, পরিবেশক/প্রদর্শক ও নিমার্তা। এই ধরনের একটা প্রচেষ্টার সন্ধ্যান পাওয়া যায় ১৯৬৩ সালের দিকে, সেই সময়কার জাঁদরেল Income tax Lawyer আশরাফ আলী চৌধুরীর (যিনি মধু মিয়া নামে বিখ্যাত এবং বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠদের অন্যতম ছিলেন) পুরানা পল্টনের বাড়িতে। এই বাড়িটি আমি চিনি কারণ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর এক বছর আগে থেকে এই বাড়ির কাছাকাছি পুরানা পল্টন লাইনের একটি বাসায় বিয়ের পরে প্রথম সংসার পাতি। এই বাড়ির কাছেই আমার স্কুল জীবনের শৈশবের বন্ধু গিয়াসউদ্দিন ইউসুফ (গিসু) থাকতো; যার ছোট ভাই এখনকার প্রখ্যাত নাট্যজন, চলচ্চিত্রকার ও মুক্তিযোদ্ধা নাসিরউদ্দিন ইউসুফ (বাচ্চু)। এই অনুজপ্রতিমের নতুন করে পরিচয় দান নিষ্প্রয়োজন। তবে আমাদের গর্বের কারণ এই জন্য যে শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে নয়, অনেক সামাজিক মহৎ কর্মেও তার অগ্রসর ভূমিকা লক্ষনীয়। এই যেমন, মুহম্মদ খসরুর মৃত্যুতে তাঁকে শোকে মূহ্যমান দেখেছি তেমনি, পুর্বসূরীর প্রতি যথাযথ সম্মানও প্রদর্শন করেছে।
মূল কথায় আসি। মধু মিয়ার বাড়ির বৈঠকের মুখ্য উদ্যোক্তা ছিলেন আনোয়ারুল হক খান; যিনি কলকাতা গিয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিলেন। তাঁর এবং বিখ্যাত আলোকচিত্র শিল্পী আমানুল হকের সৌজন্যে সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাৎ লাভও করেছিলেন। ধরে নেয়া যেতে পারে পেশাগত দিক থেকে আনোয়ারুল হক খান texation service-এর একজন পদস্থ কর্মকর্তা হওয়ায় মধু মিয়ার ঘটিষ্ঠ জন ছিলেন। পেশাগত কারণেই তাঁর বাড়িতে সভা ডেকে কিছু প্রগতিশীল বন্ধুদের মাধ্যমে চলচ্চিত্র সংসদ গঠন করতে উদ্যোগী হন। বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয়ার জন্য দেশের প্রথম চলচ্চিত্র “মুখ ও মুখোশের” পরিচালক আবদুল জব্বার খানকে আহবায়ক করা হয়। আমার জানামতে ঐ বৈঠকে রবীন্দ্র সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ বাম রাজনীতিক ওয়াহিদুল হক, চলচ্চিত্র পরিবেশক মোশাররফ হোসেন চৌধুরী, চিত্র পরিচালক সালাউদ্দিন, আনোয়ারুল হক খানের ব্যাচমেইট বাহাউদ্দিন আহমেদ, চলচ্চিত্রের একজন তরুণ শিল্পনির্দেশক এম, এ, সবুর, চিত্রশিল্পী ও ভাষা সংগ্রামী এমদাদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন। এই সভায় শ্রদ্ধেয় ওয়াহিদুল হক ও শ্রদ্ধেয় এমদাদ হোসেনের কল্যাণে একই এলাকা (রোহিতপুর) থেকে আসা ক্ষুদ্র শিল্প সংস্থায় সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত উদ্যমী কর্মীজন মুহম্মদ খসরু যোগদান করেন। যতদূর জেনেছি আশরাফ আলী চৌধুরী সভাপতিত্বে এই বৈঠকে জনাব ওয়াহিদুল হক সভাপতি ও জনাব আনোয়ারুল হক খানকে সাধারণ সম্পাদক করে একটি কমিটি গঠিত হয়। মুহম্মদ খসরুর তখন একজন সাধারণ সদস্য যার অত্যুৎসাহ পরবর্তীকালে একজন উদ্যোগী অসামান্য কর্মী নয়, একজন সৎ সনিষ্ঠ শিল্পশোভন চলচ্চিত্র সন্দর্শী বোদ্ধারূপে তার আত্মপ্রকাশ ঘটায়।

এই সভার সঙ্গে কিম্বা পূর্বে অথবা পরে বাহাউদ্দিন সাহেবের পাসপোর্ট অধিদপ্তরে একটি সভা আহবানের কথা শোনা যায়, যার কোন ভিত্তি নেই। কেননা পরবর্তীকালে বাহাউদ্দিন সাহেব, মোশাররফ হোসেন চৌধুরী সাহেব কিম্বা রূপবান খ্যাত সালাউদ্দিন সাহেব কাউকে চলচ্চিত্র সংসদ নিয়ে ভাবতে কিম্বা সংসদের কোন বিষয়ে দেখা যায়নি। চিত্রপরিচালক আবদুল জব্বার খান মধু মিয়ার অনুরোধক্রমে আহবায়ক হয়েছিলেন। তাঁর আগ্রহ পরবর্তীকালে দেখা যায়নি। মোশাররফ হোসেন চৌধুরীর পুস্তক মুদ্রণ প্রকাশনা ব্যবসা ছিলো। books & books নামে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে সম্ভবতঃ কবি শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা গ্রন্থ “প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে” বের হয়েছিলো। নতুন কবি ও লেখকদের প্রতি তাঁর আগ্রহ সহযোগিতা করার মানসিকতা ছিলো। আগেই বলেছি তিনি চলচ্চিত্র পরিবেশক ছিলেন। তাঁরই সহযোগিতায় আনোয়ারুল হক খান দু-একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে পেরেছিলেন। তাঁর কাজে রাত জেগে সাইকোলস্টাইল তৈরি করা ইত্যাদি কাজে একক সহযোগী ছিলো মুহম্মদ খসরু। পরিচিত বন্ধু বান্ধবের সাহায্য সহযোগিতা, লোকাভাব এবং সর্বোপরি চাকরি জীবনে নানা জটিলতা ও স্ত্রীর কঠিন অসুখের কারণে আনোয়ারুল হক খান চলচ্চিত্র সংসদ কর্মে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং মুহম্মদ খসরুকে তার চলচ্চিত্র সংক্রান্ত গ্রন্থ সমগ্র ও লাইব্রেরির দায়িত্ব নিতে বলেন। তিনি জনাব ওয়াহিদুল হকের কাছে সক্রিয় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চান। তখন থেকেই চলচ্চিত্র সংসদ -এর উষালগ্নের নতুন ইতিহাস শুরু।

[চার]

মুহম্মদ খসরুর এখান থেকেই তার মানসলোকের পথে যাত্রা শুরু যা যথার্থই নির্মল চলচ্চিত্র আন্দোলনের নামান্তর; শিল্পশোভন চলচ্চিত্র দর্শন ও প্রদর্শনের এক অনিন্দ্যলোক যার একটা সার্থক নাম দিয়েছেন আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের চলচ্চিত্র সংসদ কর্মী, লেখক গবেষক অনুজ-প্রতিম আলমগীর ফরিদুল হক “মুহম্মদ খসরু-একজন পরিব্রাজক: রুহিতপুর থেকে সেগুন বাগিচা।”
তবে এই পরিব্রাজন খুব সহজ ছিলো না মুহম্মদ খসরুর জন্য। একদিকে নির্বাচিত সুস্থ শৈল্পিক চলচ্চিত্র ও তখনকার দিনে ঢাকায় মুক্তিপ্রাপ্ত ক্লাসিক-মুভিগুলো নিয়মিত দেখাসহ চলচ্চিত্রের উপর পঠন-পাঠনে তাকে প্রচুর সময় দিতে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে উৎসাহী ও শিল্পশোভন চলচ্চিত্র নিয়ে চিন্তা করে এমন ধরনের তরুণদের খুঁজে বের করাও তার দায়িত্ব হয়ে পড়ে।

আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্সের ছাত্র। আমাদের অনেকে যারা পরবর্তীকালে কবি, লেখক, গল্পকাররূপে খ্যাতিমান হয়েছেন, তারা সকলেই অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের নেতৃত্বে নতুন রীতির সাহিত্য আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েছি। বিকেলে ক্লাস শেষে তখনকার পাবলিক লাইব্রেরি, এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক লাইব্রেরি তার পূর্ব-ফটকে নভেরা আহমেদ-এর কিছু ভাস্কর্যের পাশে সবুজ অঙ্গন এবং শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন আমাদের আড্ডায় গুলজার থাকতো। কী সাহিত্য, কী সঙ্গীত, কী চিত্রকলা, কী চলচ্চিত্র সব কিছুই ছিলো আড্ডার কথাকতা। সাহিত্য ও চলচ্চিত্রামোদী পুরোনো ঢাকার মাহবুব-উল-আলম জিনু নামে এক বন্ধু এই আড্ডায় প্রায়শঃ সামিল থাকতো। জিনু জগন্নাথ কলেজ থেকে ডিগ্রী পাশ করে কোন এক ব্যাংকে অফিসার। আমরা বেকার ছাত্র। সুতরাং শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে আমাদের চা আর মাখন টোস্টের দাম অধিকাংশ সময়ে জিনুই পরিশোধ করতো। এই জিনুর পরিচয়ের সূত্রে একদিন মুহম্মদ খসরু শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে উপস্থিত হয় আমার এবং এক সতীর্থ জামাল খানের সন্ধানে; যার একটু পটভূমি দেয়া প্রয়োজন বোধ করছি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তুখোড় ছাত্র, আমাদের সময়ে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় তৃতীয় স্থান অধিকারী জামাল খান আমার মতো চলচ্চিত্র বিষয়ে আশৈশব-উৎসাহী ছিলো। সেই সময় চিত্রালী পত্রিকা প্রকাশিত লেখার জন্য ভালো আনুতোষিক প্রদান করতো। ‘কালি ও কলম’ পত্রিকায় হক ভাই-এর (সৈয়দ শামসুল হক) উপর লিখিত আমার একটি স্মৃতি কথায় তার উল্লেখ রয়েছে। আমি মূলতঃ পকেট খরচ চালানোর জন্য সম্মানীর আশায় মারি সিটনের ঐ সময়ে বহুল পঠিত “কন্টেম্পোরারি সিনেমা” পুস্তকের সাহায্যে “যুদ্ধোত্তর চলচ্চিত্র” নামে দু’টি বড় লেখা তৈরি করে চিত্রালীতে পাঠাই এবং চিত্রালীর পর পর দু’টি সংখ্যায় তা প্রকাশিত হয়। অপর দিকে জামাল খানের “চলচ্চিত্র প্রসংগে” শিরোনামে একটি লেখা কবি সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত মাসিক সমকালে প্রকাশিত হয়। চলচ্চিত্র বিষয়ে লিখিত আমাদের প্রবন্ধগুলো মুহম্মদ খসরুর দৃষ্টিগোচর হয় এবং আমাদের সন্ধানে পত্রিকার দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে যে আমরা উভয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। পরবর্তীতে তার পূর্ব-পরিচিত জিনুর কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে কোন এক বিকেলে শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে আমাদের আবিস্কার করে। সময়টা উনিশো চৌষট্টির কোন একটি দিন যা আমার জীবনে স্মরণ্য মুহূর্ত হিসেবে সদা জাগরুক। খসরু নিজের পরিচয় দিয়ে আমাদের লেখা প্রবন্ধ পাঠের কথা ও চলচ্চিত্র সংসদে যোগ দেয়ার আহবান জানায়। এই প্রথম “ফিল্ম সোসাইটি’ বলে একটি সংগঠনের কথা শুনলাম এ-দেশে; যদিও শুনেছি কলকাতায় এ-ধরনের সংগঠন রয়েছে। কফি-হাউসে সাহিত্য আড্ডার মতো এদের আড্ডা বসে।

[পাঁচ]

এরই দিন কয়েক পরে মুহম্মদ খসরু আমাদের নিয়ে যায় রবীন্দ্র-সঙ্গীত গুরু ওয়াহিদুল হকের আবাসন অধ্যাপিকা সানজীদা খাতুনের আজিমপুর কলোনির বাসায়। সনজীদা আপা তখন ইডেন গার্লস কলেজে অধ্যাপনা করতেন বিধায় আজিমপুরের সরকারি আবাসনটি তাঁর নামেই বরাদ্দ ছিলো। ওয়াহিদ ভাই প্রথম পরিচয় পর্বের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আপন করে নিলেন, বিশেষ করে যখন জানতে পারলেন, আমরা ছাত্র ইউনিয়নের একনিষ্ঠ কর্মী তখন আমাদের প্রতি তাঁর স্নেহ ও সানজিদা আপার আদর-আপ্যায়ন বেড়ে গেল। মনে পড়ে অপলাকে এই বাসায় আমি ৪/৫ বছরের শিশুরূপে দেখেছি। আমি এই এলাকায় তাঁর কাছাকাছি থাকি শুনে তিনি আজিমপুর, পলাশী, ঢাকেশ্বরী, শেখ সাহেব বাজার ইত্যাদি এলাকার সমমনা তরুণদের একত্র করার পরামর্শ দিলেন। মুহম্মদ খসরু আগেই এ-সম্পর্কে আভাস দিয়েছিলো। আজিমপুরের ইয়াসিন আমিন ও মিনহাজ উদ্দিন মিনু রহমত, তোফাজ্জল ও মিরুসহ অনেকে তাৎক্ষনিক সাড়া দিয়েছিলো। জনাব আনোয়ারুল হক খানের নিষ্ক্রিয়তার কারণে ওয়াহিদ ভাই চলচ্চিত্র সংসদকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করেন। এই পর্যায়ে খসরুর উদ্যোগে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় যেখানে আমি ইয়াসিন আমিন ও জামাল খান ছাড়াও বিসিকের নকশা কেন্দ্রের (তখন EPSIC) শিল্পী গোলাম সারোয়ার, ঢাকা যাদুঘরের কিপার শিল্পী আনোয়ারুল হক (পিয়ারু), স্থির চিত্রগ্রাহক গোলাম মোস্তফা (পরবর্তীতে বিটিভির পরিচালক, ফটোগ্রাফি), বিজন সরকারসহ অনেকে। এই বৈঠকে প্রথম তদানীন্তন পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটির একটি কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয় যেখানে তেষট্টিতে মধু চৌধুরীর বাড়িতে গঠিত কমিটিই বিদ্যমান থাকে। শুধুমাত্র ফিল্ম সোসাইটিকে গতিশীল করার জন্য মুহম্মদ খসরুকে দপ্তর সম্পাদক ও জামাল খান, ইয়াসিন আমিন, গোলাম মোস্তফা ও বিজন সরকার ও আমাকে নির্বাহী সদস্য করা হয়। পটুয়া কামরুল হাসানকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট করা হয়। অত্যুৎসাহী অন্য একজন সিনিয়র ব্যক্তিত্ব শিল্পী এমদাদ হোসেন টেলিভিশনে প্রধান শিল্প নির্দেশক রূপে যোগ দেয়ায় ফিল্ম সোসাইটির কোন পদে যাতে তাকে না রাখা হয় তা আগেই অবহিত করেছিলেন। ওয়াহিদ ভাই এই মর্মে মত প্রকাশ করেন যে, যেহেতু জনাব আনোয়ারুল হক খানই ফিল্ম সোসাইটি গড়ার স্বপ্নদ্রষ্টা, সেহেতু তিনি নিজে থেকে পদত্যাগ না করলে তাকেই সাধারণ সম্পাদকরূপে রাখতে হবে।
শেষ পর্যন্ত তাই ছিলেন জনাব আনোয়ারুল হক খান। পয়ষট্টির প্রারম্ভকালেই তাঁর স্ত্রী-বিয়োগ ঘটে। তিনি নিজেও খুব ভেঙ্গে পড়েন। তবে সেই সময়ে সুপিরিয়র সার্ভিসের সদষ্যরূপে প্রেসিডেন্টের অর্থনৈতিক কমিশনে তাঁর পদোন্নতি ঘটলে তিনি তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তান চলে যান। চলচ্চিত্র সংসদের সঙ্গে তিনি আর যোগাযোগ রাখেননি। তবে চলচ্চিত্র সংক্রান্ত তাঁর সমস্ত সংগ্রহ ও লাইব্রেরি তিনি সংসদকে দিয়ে যান যা মুহম্মদ খসরু গ্রহণ করে মগবাজারের একটি বাসায় রাখার বন্দোবস্ত করে।
জনাব বাহাউদ্দিন জনাব মোশাররফ হোসেন চৌধুরীসহ একাধিক ব্যক্তি যাদের নাম আমরা মধু চৌধুরীর বাড়িতে অনুষ্ঠিত প্রথম বৈঠকে পাই তাঁদের এই দীর্ঘ সময়ে আমি কিম্বা আমার চলচ্চিত্র সংসদ কর্মীরা কোনদিন দেখিনি। তাঁরা স্ব-স্ব কর্মক্ষেত্রে পরিপূর্ণ নীত হয়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন।
তবে জনাব আনোয়ারুল হক খানের সন্ধান আমরা অন্যত্র পাই। বাংলাদেশের বীরোচিত মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁকে মুজিবনগরের অস্থায়ী বিল্পবী সরকারের তথ্যসচিব করা হয়। এক জীবনে ছাত্র ইউনিয়ন ও বাম রাজনীতির পোষক ছিলেন বলে তিনি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের নজর কেড়েছিলেন তার নির্লোভ সনিষ্ঠ দেশপ্রেমের কারণে। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তথ্যসচিব হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হন তারই বন্ধু বহুল আলোচিত বাহাউদ্দিন সাহেব। আনোয়ারুল হক খানের আনুষ্ঠানিকভাবে চলচ্চিত্র সংসদ ত্যাগের পর আমাদের দায়িত্ব হলো একজন যোগ্য সাধারণ সম্পাদক সন্ধান করা। যোগ্য ব্যক্তি খোঁজার কাজে আমাদের বেশী বেগ পেতে হলো না। কারণ আমরা সকলেই লক্ষ্য করলাম আলমগীর কবির নামে একজন নিয়মিত ইংরেজিতে চলচ্চিত্র সংক্রান্ত সৃজনশীল লেখা লিখছেন আবার ঢাকার কিছু ছবির চিত্র-বীক্ষণও লিখছেন পত্র-পত্রিকার জন্য। খবর নিয়ে জানলাম তিনি সাপ্তাহিক হলিডে পত্রিকায় চাকুরি করছেন। এই ব্যক্তি বৃটিশ ফিল্ম ইন্সটিট্যুটের একজন স্নাতক। বামপন্থী চিন্তাধারার লোক। সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন। মনে মনে আমরা তাঁকে চলচ্চিত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করে ওয়াহিদ ভাইকে জানাতেই তিনি সম্মতি দিলেন।
এক সন্ধ্যায় মুহম্মদ খসরু, ইয়াসিন আমিন, জামাল খান ও আমি হলি-ডে’র অফিস নয়া পল্টনে ‘সচিত্র সন্ধানী’খ্যাত গাজী শাহাবুদ্দীন ভাই-এর বাড়ির অঙ্গনে পৌঁছালাম। এখন যে বিশাল গাজী ভবন সেখানে গাজী ভাই-এর ছোট্ট দ্বিতল বাড়ির সামনের প্রশস্ত অঙ্গনে ছিলো হলি-ডে’র দপ্তর। এক কোনে ছোট্ট একটা ঘর ছিলো সন্ধানীর যা এক সময় কবি, লেখক, সাহিত্য-প্রেমী ও বিনোদন-প্রিয় মানুষের প্রিয় পত্রিকা ছিলো।
যাক আমরা কোন রকম বার্তা না দিয়ে জনাব আলমগীর কবিরের কক্ষে ঢুকে পড়লাম। আমাদের পরিচয় দিতে তিনি যেন অপেক্ষমান মানুষের মত আমাদের স্বাগত জানিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করলেন। কারণ তাঁর ধারণার অতীত ছিলো ঢাকার মতো একটা মফঃস্বল শহরে ফিল্ম সোসাইটি আছে, কিছু সচেতন তরুণ আছে যারা চলচ্চিত্র, বিশেষ করে শিল্পশোভন চলচ্চিত্র নিয়ে ভাবে এবং বহু কষ্টে ভালো ছবি সংগ্রহ করে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে। আমাদের সাধারণ সম্পাদকের শূন্য পদে আমরা তাঁর নাম প্রস্তাব করলে জনাব আলমগীর কবির কোন দ্বিধা না করে সানন্দে গ্রহণ করেন।
শুরু হয় আমাদের চলচ্চিত্র সংসদের নতুন করে স্বপ্ন যাত্রা। পয়ষট্টির কার্যনির্বাহী কমিটিতে সাধারণ সম্পাদকরূপে যোগ হয় জনাব আলমগীর কবিরের নাম, একজন চলচ্চিত্র শিক্ষক-প্রশিক্ষক ও সমালোচকরূপেই তখন তাঁর পরিচিতি ছিলো, ছিল চলচ্চিত্র বিষয়ে তাঁর পদ্ধতিগত শিক্ষা। এই কমিটিতে আগের মতোই যথারীতি জনাব ওয়াহিদুল হক সভাপতি, পটুয়া কামরুল হাসান সহ-সভাপতি, দপ্তর সম্পাদক মুহম্মদ খসরু, অনুষ্ঠান সম্পাদক ফারুক আলমগীর এবং ইয়াসিন আমিন, জামাল খান, বিজন সরকার ও গোলাম মোস্তফা নির্বাহী সদস্য ছিলেন।
জনাব ওয়াহিদুল হক এসময়ে তাঁর ছায়ানট ছাড়া ভিন্নতর একটি বিষয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ছায়ানটের অনুষ্ঠানগুলো তখন ঘরোয়াভাবে গৃহ-অভ্যন্তরে হতো। কিন্তু পার্টির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওয়াহিদ ভাই আমাদের এলাকা আজিমপুর পলাশী ইত্যাদি জনপদ থেকে মৌলিক গণতন্ত্রীর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। আমাদের জন্য তা বিস্ময়কর হলেও তিনি আমাদের পার্টির সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে নির্বাচনে তাঁর প্রচারণার জন্য অনুরোধ করেন। আমাদের মধ্যে ইয়াসিন আমিন এই দায়িত্ব গ্রহণ ও ভোটের আগে প্রচারণায় নানাভাবে সহযোগিতা করে। সেই সময় কম্যুনিষ্ট পার্টি কেন এই সিদ্ধান্ত নিয়োছিলো তা আমাদের বোধগম্য নয়। এখনো নয়।

এই সময় থেকে সানজীদা আপার আজিমপুর কলোনির আবাসন থেকে আমাদের ফিল্ম সোসাইটির নিয়মিত বৈঠক আলমগীর কবিরের বোনের বাসগৃহ হাতিরপুল তথা এলিফ্যান্ট রোডে স্থানান্তরিত হয়। ওয়াহিদ ভাই আমাদের বৈঠকে উপস্থিত থাকতে না পারলেও আমাদের নানা পরামর্শ দিয়ে এবং অনেক সময় একক প্রচেষ্টায় প্রদর্শণের জন্য ছবিও সংগ্রহ করে দিতেন। যেমন প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন, পূর্ব য়ূরোপের দেশগুলোর ছবি তারই প্রচেষ্টা ও সৌজন্যে পেতাম। এমনকি ১৯৬৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত পোল্যান্ডের আন্দ্রে ভাইদার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ক্যানাল সংসদের সদস্যদের প্রদর্শনের জন্য আমরা একদিনের জন্য আনতে পেরেছিলাম ওয়াহিদ ভাইয়ের প্রচেষ্টায়। আলমগীর কবির বৃটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে এবং মুহম্মদ খসরুসহ আমরা গ্যাটে ইনস্টিট্যুট-এর সৌজন্যে জার্মান চলচ্চিত্র ও আলিয়স ফ্রঁসের মাধ্যমে ফরাসি চলচ্চিত্র সংগ্রহ করতাম। এ ছাড়া ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশন ও সংস্কৃতি কেন্দ্রের সৌজন্যে পথের পাঁচালী, অযান্ত্রিক, সুবর্ণরেখা দেখানোর সৌভাগ্য আমাদের হয়েছিলো। এ কথা যথার্থ সত্য যে ঢাকায় কোন বৈদেশিক দূতাবাস না থাকাতে ঐ সময়ে শিল্পশোভন চলচ্চিত্র সংগ্রহ যথেষ্ট দুঃষ্কর ছিলো। এই সব ছবি দেখানোর আগে সাইক্লোস্টাইল মেশিনে আমরা ছবি সম্পর্কে ছোট আলোচনার মাধ্যমে দর্শকদের ধারণা দিতাম। ছবির অধিকাংশ সারসংক্ষেপ মুহম্মদ খসরু, আলমগীর কবির ও আমি রচনা করতাম।
আমাদের সকলের মিলিত প্রচেষ্টায় ১৯৬৫ থেকে চলচ্চিত্র সংসদের কাজে গতি সঞ্চারিত হয়। এ-সময় ধ্রুপদী ও চলচ্চিত্র পত্রসহ অনন্য সাধারণ প্রকাশনা চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর সঙ্গে সঙ্গে সংসদ আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। সবগুলো কাজই হয়েছে মুহম্মদ খসরুর অমানুষিক শ্রম ও প্রচেষ্টায়। আলমগীর কবির পত্রিকার দাপ্তরিক কাজে বেশী ব্যস্ত থাকতেন। জামাল খান ও আমার অনার্স পরীক্ষা সন্নিকটবর্তী। ইয়াসিন আমিন সদ্য জে এল মারিসন নামে একটি বহুজাতিক ঔষধ কোম্পানিতে যোগ দিয়েছে। সুতরাং আমাদের কারোর অতিরিক্ত সময় দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। আমার অবাক লাগে মুহম্মদ খসরু কোন যাদুবলে এমন সুদৃশ্য প্রকাশনা কীভাবে করতো। হয়তো এই সময়ে সে বুঝে গিয়েছিলো এ সব তরুণরা একে একে এক সময়ে হারিয়ে যাবে। কিন্তু মুহম্মদ খসরু তো একা থাকার নয়। তার আরো তরুণতম উৎসাহী মানুষ চাই। সেটা সত্যি হয়েছিলো পরবর্তীতে। এক এক সময় এক এক দল তরুণ মুখ যুক্ত হয়েছে ফিল্ম সোসাইটিতে। খসরু কোনদিন একা থাকেনি। প্রজন্ম, প্রজন্মন্তরে তার বিস্তার ঘটেছে।

যাক, যে সময়ের কথা বলছিলাম ১৯৬৫ ও পরবর্তী বছরগুলো ফিল্মি সোসাইটির জন্য রমরমা দিন ছিলো। ষাট দশকের আমাদের সাহিত্য আন্দোলনের তরুণতম কবি লেখক সাহিত্যব্রতী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ছাত্র শিক্ষক ফিল্ম সোসাইটির সদস্য হলেন। প্রথম দিকে খ্যাতিমান যারা সদস্য হয়েছিলেন তাদের অনেকের কথা মনে পড়ে, যেমন অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, কবি শামসুর রহমান, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানসহ পঞ্চাশের অনেক কবি লেখক শিক্ষাব্রতী ও সাংবাদিক ছিলেন এই দলে। ১৯৬৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে টেলিভিশনে যোগ দেয়ার সুবাদে আমাকে প্রথমে প্রশিক্ষণের জন্য রাওয়ালপিন্ডির সেন্ট্রাল টেলিভিশন ইন্সটিট্যুট ও পরে করাচি স্টেশনে যোগ দিতে হয় যদিও আমি ঢাকা স্টেশনের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলাম। হতাশাগ্রস্থ আমি ঐ সময়ে একটি সিনে সাপ্তাহিকে যোগ দেয়ার উদ্যোগ নিতেই ঢাকার বন্ধুরা আমাকে নিরস্ত করলো এই বলে যে, সিনে সাপ্তাহিকটা বন্ধ হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে তারা আরও একটি দুঃসংবাদ দিলো যে আলমগীর কবির সাহেব আমাদের চলচ্চিত্র সংসদ ত্যাগ করে Cinearts নামে অন্য একটি চলচ্চিত্র সংসদ গঠন করেছেন। জনাব আলমগীর কবিরের এই আচরণ আমাকে আহত করলো কেননা আলমগীর কবিরকে আমরা তদানীন্তন পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ তথা আমাদের ও বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক করে জনসমক্ষে পরিচিতি তথা lime lights-এ এনেছিলাম যদিও চলচ্চিত্র শিল্পে তাঁর পদ্ধতিগত শিক্ষা তাঁকে অচিরেই কোন না কোনভাবে সমাসীন করতো একদিন উচ্চালোকে। কিন্তু আমাদের প্রতি তাঁর অকৃতজ্ঞ-চিত্ততা সঙ্গত কারণে আমাকে আহত করে। মুহম্মদ খসরুসহ বন্ধুরা নতুন একজন সাধারণ সম্পাদক খোঁজাখুজি করে আমাদের চলচ্চিত্র সংসদের একজন পুরোনো সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমর এক বছরের সিনিয়র মাহবুব জামিলের নাম প্রস্তাব করলো। প্রস্তাবক ছিলো জামাল খান, সদ্য পড়াশুনো শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকরূপে যোগ দান করেছে। আমি চিন্তা করলাম জামিল ভাই সম্প্রতি বহুজাতিক কোম্পানি সিঙ্গার-এ যোগ দিয়েছেন ভালো বেতনে। তাঁর গাড়িও আছে। তাঁর সাহায্য ও প্রতিপত্তি বিচ্ছেদের ভারে আহত সকল সাথীদের ক্ষত মুছিয়ে চলচ্চিত্র সংসদকে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। আমি ইতিবাচক সায় দিলাম। মাহবুব জামিল হলেন চলচ্চিত্র সংসদের নতুন সাধারণ সম্পাদক।

সাত
জনাব আলমগীর কবিরের একদেশদর্শিতায় প্রথম চলচ্চিত্র সংসদ ভাঙ্গনের কবলে পড়লেও চলচ্চিত্র সংসদের প্রাণ-পুরুষ হিসেবে কিন্তু রয়ে গেলেন মুহম্মদ খসরু। দেশে সত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে আমি করাচি থেকে ফিরে এলেও চলচ্চিত্র সংসদে যোগ দেইনি। আমার চাকুরি ও সংসার দুটোই বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। খসরুও আমাকে জোড়াজুড়ি করেনি। শুধু বলেছিলো ধ্রপদী ও চলচ্চিত্র পত্রের জন্য নিয়মিত লেখা দিতে। আমি সেই কথা রেখেছিলাম। আমাকে বিষয়বস্তু বলে দিতে আর লেখা জমা দেয়ার তাগাদা দিতো আমার স্ত্রীর কাছে। বার বার টেলিফোন করে আমাকে না পেয়ে তার স্বভাবসুলভ অকথ্য ভাষায় “কুকুর ছানা” গোছের গালাাগলি করলেও আমার স্ত্রী পিনকি কিছুই মনে করতো না। কারণ সে নিজেও ছাত্র ইউনিয়ন করা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তান্ডব এন. এস. এফ নামীয় মোনেম খানী ক্যাডারদের হুমকির মধ্যেও ১৯৬৫ -৬৬ শিক্ষাবর্ষে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি সপ্তাহ সাহসের সঙ্গে সুষ্ঠভাবে সম্পাদন করেছিলো। খসরুর অকথ্য ভাষার গলাবাজির মধ্যে সে হেসে ইতিবাচক জবাব দিয়ে বলতো, আমি তাগাদা দিচ্ছি আপনার বন্ধুকে, দায়িত্ব নিচ্ছি অচিরেই লেখা পাবেন। আমি তার তাগাদার ব্যাপারে জানতাম, কারণ আমি বেশ সময় নিয়ে লেখা দিলেও ‘ধ্রুপদী’ বের হতো আরো দীর্ঘ সময় নিয়ে, কখনো কখনো বছর পেরিয়ে যেত। কিন্তু যখন বের হত ধ্রুপদী হাতে নিয়ে আমরা বিস্মিত, হতবাক হতাম। আজকের মতো পরিপাটি শোভন দ্রুত মুদ্রণ প্রযুক্তি না থাকা সত্ত্বেও ধ্রুপদীর প্রথম দিকের কিম্বা চলচ্চিত্র পত্রের প্রথম দিকের মুদ্রণ, গ্রন্থের প্রচ্ছদ থেকে সকল সৌকর্য আমাদের মুগ্ধ করতো।
আশির দশকের চলচ্চিত্র সদস্য ও খসরুর সাথী আলমগীর ফরিদুল হক তার রোহিতপুরের এই পরিব্রাজক সম্পর্কে অত্যুক্তি করেননি, যখন তিনি বলেন, “তাঁর স্বশিক্ষিত হাতে সৃষ্টি হয় নির্মল চলচ্চিত্র আন্দোলনের অনুপম প্রকাশনাগুলো ‘ধ্রুপদী’, চলচ্চিত্র পত্র’, ‘ক্যামেরা যখন রাইফেল’ এবং অসংখ্য অনিন্দ সুন্দর সেই সকল প্রদর্শনীর সংকলন আজো আমাদের মনোজগতে চির হরিৎ উদ্ভাসন জাগিয়ে রাখে।”

আট
স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন বহুধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। একাধিক ফিল্ম সোসাইটির জন্ম হয়েছে। চলচ্চিত্র সংসদগুলোর মধ্যে বহু বাকবিতন্ডার মধ্যে চলচ্চিত্র ফেডারেশনের জন্ম হয়ে অনেক অহেতুক রেষারেষি শুরু হয়। দুঃখের বিষয় এই রেষারেষির লক্ষ্যবস্তু হয়েছে ফিল্ম সোসাইটির প্রকৃত জন্মদাতা মুহম্মদ খসরু। তার পদ্ধতিগত তাত্ত্বিক কোন শিক্ষা না থাকলেও সে ছিলো পরিপূর্ণ জ্ঞানধারী একজন স্বশিক্ষিত মনে প্রাণে প্রজ্বলিত প্রগতিশীল পুরুষ। চলচ্চিত্রের কঠিন কঠিন বিষয়ে তার অধ্যয়ন ও বিশেষ করে নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে তার জ্ঞান আমাকে মুগ্ধ করতো। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে আমার ওয়ারির বাসায় প্রতি রোববার ছুটির দিনে সারাদিন কাটতো মুক্তিযুদ্ধের উপর একটি চিত্রনাট্য রচনার তৈরির কাজে। আমরা দুই সু্হ্দ চিত্রনাট্য নিয়ে বসতাম আর আইজেনস্তানীয় ‘ফিল্ম সেন্স’ নিয়ে বিস্তর আলোচনা থেকে বচসা পর্যন্ত গড়াতো। আমার স্ত্রী তার নীরব সাক্ষী হয়ে থাকতো এবং তাঁর জ্ঞান গরিমার পরিধি পর্যবেক্ষণ করে অবাক হতো। তার অপার বিস্ময় খসরু এতো জানে!
আসলে কারণে অকারণে অশ্রাব্য শব্দ উচ্চারণের এই মানুষটি ছিলো নিভৃতে একজন জ্ঞান বটবৃক্ষ। শুধু চলচ্চিত্র নয়, সাহিত্য, চিত্রকলা ও সঙ্গীত নিয়ে আলোচনায় আমরা অনেকে তার সমকক্ষ হতে পারিনি। এটাই মুহম্মদ খসরুর অপরাধ। তার সমকক্ষ হতে পারেনি বলেই তার বিরুদ্ধাচারীরা ঈর্ষাকাতর হয়ে তাকে অশিক্ষিত বলে নিজেরা আনন্দ পেত। এই সব তথাকথিত ডিগ্রীধারীরাই ছিলো প্রকৃত পক্ষে মুর্খ ও চলচ্চিত্র-শিল্পজ্ঞানরহিত মানুষ যারা মুহম্মদ খসরুর সঙ্গে শুধু দ্বিমত পোষন করেনি বরং তার সার্বক্ষণিক বিরুদ্ধাচারণ করে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকে পঙ্কিল করেছে।
নির্মল চলচ্চিত্র আন্দোলনে আত্মোৎসর্গিত এই মানুষটির প্রচেষ্টা ও আন্দোলনে মূলতঃ প্রতিষ্ঠা পায় বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ। খসরুর চলচ্চিত্র সংসদের প্রাক্তন সদস্য কিশোরগঞ্জের আবদুল আহাদ মানিকগঞ্জের হীরালাল সেনের ছবি উদ্ধার করেন। বয়সে ওয়াহিদ ভাইদের সমতূল্য আমাদের অনেক সিনিয়র আবদুল আহাদ আমাদের সঙ্গে সানজীদা আপার আজিমপুর কলোনীর প্রথম দিকের সভায় উপস্থিত থাকতেন ও পরে কোন কারণে হারিয়ে যান। মুহম্মদ খসরু তাঁকে আর্কাইভের প্রথম পরিচালক চিত্রশিল্পী আবদুর রউফের কাছে নিয়ে যান ও হীরালাল সেনের সংগৃহীত ছবিটি জমা দেন। পরে খসরুর উদ্যোগে শিল্পী আবদুর রউফ (বাংলাদেশের বাহাত্তরের সংবিধানের অক্ষরলিপি কারক ও বঙ্গবন্ধুর স্নেহভাজন) আহাদ সাহেবকে সংগ্রাহকের কাজে নিয়োজিত করেন। সম্প্রতি প্রায় ৯০ বছর বয়সে তিনি লোকান্তরিত হন।
বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের উষালগ্নে সঠিক কাহিনী তুলে ধরাই ছিলো আমার এই লেখনীর মূল উদ্দেশ্য কারণ মুহম্মদ খসরুর জীবিতকালে যেমন তা নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত করা হয়েছিলো এখনো তা পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমি ইতিহাসবেত্তা নই ইতিহাসও লিখতে বসিনি। তবে পরবর্তী প্রজন্মের তরুণ তরুণীরা যাতে সঠিক তথ্যের সন্ধান পায়, গবেষকরা যাতে উপকৃত হয়, সেই কারণেই আমার দীর্ঘ এই অবতারণা অনুসরণ করে তারা সংসদ আন্দোলনের প্রকৃত পথিকৃৎ-পিতাকে নির্ণয় করবেন বলে আমার বিশ্বাস।

বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার যোজন দূরে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে বসে তাঁর মরণোত্তর শ্রদ্ধাঞ্জলি ও শোক সমাবেশ দেখে আমার অশ্রুসিক্ত হৃদয়ে এই বিশ্বাস আরও সুদৃঢ় হয়েছে। সবচেয়ে ভালো লেগেছে বিশ্ববিদ্যালয়-স্বীকৃত-শিক্ষা, কিম্বা তথাকথিত শিক্ষার গণ্ডির বাইরে থাকা স্বশিক্ষিত মানুষটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনেই শায়িত হয়ে সংগ্রহ করলো উত্তর প্রজন্মসহ অসংখ্য বিজ্ঞ, জ্ঞানবান সুশীল সমাজের মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও দুই উপ-আচার্য থেকে শুরু করে একজন প্রাক্তন মন্ত্রীও সামিল ছিলেন। তাদের সবাইকে একজন প্রাক্তন চলচ্চিত্র সংসদকর্মী হিসেবে অভিবাদন জানাই কেন না আপনারা একজন যোগ্য ব্যক্তিকে তাঁর প্রাপ্য যোগ্য সম্মান দিলেন।
জয়তু মুহম্মদ খসরু।
জয়তু চলচ্চিত্র সংসদের পথিকৃত-পিতা।
Flag Counter


4 Responses

  1. ইকবাল করিম হাসনু says:

    ফারুক আলমগীরকে অশেষ ধন্যবাদ খসরু ভাই এবং চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সূচনাপর্বের ইতিহাসটুকু জানানোর জন্য। ১৯৭৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত খসরু ভাইয়ের সান্নিধ্যে থেকে নানাভাবে আলোকিত হয়েছি। তাই আপনারই কথার প্রতিধ্বনি করে বলতে চাই, খসরু ভাই ছিলেন “নিভৃতে একজন জ্ঞান বটবৃক্ষ” ।

  2. আলমগীর ফরিদুল হক says:

    আমাদের খসরু ভাই ছিলেন স্বশিক্ষিত, প্রাগ্রসর শিল্পানুরাগী ! তাঁর লালনীয় আদর্শিক পথ ছিল সর্বাঙ্গে , পুঁজিবাদী শিক্ষার কি অর্থলীপ্সা, কি উচ্চাকাঙ্ক্ষা , কি কপটতা এমন কি সে শিক্ষার পাপ ছিল না ! কিন্তু ছিল এক চিরহরিৎ অমল বিশ্বাস, একাগ্রতা, সংসদ’কে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন যখন এঁকে এঁকে সবাই জীবন যুদ্ধে জড়িয়ে চলে যান । ফারুক ভাই’কে আন্তরিক শুভেচ্ছা আমাদের’কে সেই যুগের প্রারম্বিক সূচনাকাল থেকে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন ইতিহাসের সাথে যুক্ত করার জন্যে

  3. সুমন রহমান says:

    ফারুক আলমগীর ভাইকে ধন্যবাদ অসাধারণ এই লেখাটির জন্য। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন ও তাতে মুহম্মদ খসরুর ভূমিকা চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন ফারুক ভাই – যা উভয়কে নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহলের ছড়ানো বিভ্রান্তি মোচনে সহায়ক হবে।
    মুহম্মদ খসরুর মত স্বশিক্ষিত নির্লোভ মহীরুহের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পেয়েছিলাম – এটি আমার জীবনে অন্যতম আলোকিত অভিজ্ঞতা। মুহম্মদ খসরুর স্মৃতি অমর হোক।

  4. ` says:

    দিনু বিল্লাহ
    জনাব ফারুক আলমগীরকে ধন্যবাদ জানাতে হয় এমন একটি লিখা আমাদের সামনে তুলে ধরার জন্য । আমিও তাঁকে ৭৩/৭৪ সাল থেকে চিনতাম এবং জানতাম । আপনার লিখায় যে সব নাম এসেছে তাদের অনেকের সাথে পরিচয় ছিল তাছাড়া খসরু ভাইয়ের মুখেও নানা গল্প শুনতাম তবে আপনি জন্মলগ্নের যে চিত্র তুলে ধরেছেন তা এক কথায় অনবদ্য , আমাদের নুতন প্রজন্মের এ ইতিহাস জানা প্রয়োজন বিশেষ করে যারা চলচিত্র নিয়ে ভাবেন । খসরু ভাইকে নিয়ে আমারও অনেক স্মৃতি অনেক রসালো গল্প আছে । শুধু এটুকুই বলবো তাঁর আর্থিক কষ্ট আর অবহেলার সময় থাকতে পেরেছিলাম । কিছুদিনের জন্য আমার চিলে কোঠায় সংসদের লাইব্রেরী ঠাঁই নিয়েছিল, যাক সে সব কথা । খসরু ভাইকে আমাদের অভাগা জাতি যেভাবে অবহেলা করেছে তা মেনে নেয়া কঠিন । খসরু ভাই বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্মে তাঁর নিষ্ঠায় আপনাকে আবারও ধন্যবাদ – ভাল থাকুন এ কামনা করছি ……।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.