বইয়ের আলোচনা

আশরাফ জুয়েলের ‘জাড়’ এবং আমাদের ভোটাভুটি

মুহিম মনির | 3 Mar , 2019  


‘গত দশ বছরে এত শীত পড়ে নি। ভাদু মণ্ডলের এতদিনের অভিজ্ঞতা বলে, যেবার যত বেশি শীত পড়বে সেবার তত বেশি অঘটন ঘটবে।’ এবং জীবনের সাত দশক পেরুনো ভাদুর এই বাজে অভিজ্ঞতার সত্যতা আমরাও অবলোকন করতে থাকি ‘জাড়’ গল্পে। জাড়ে শরীর জুড়িয়ে এলেও মন জুড়ায় না। বরং একরকম অস্থিরতা পেয়ে বসে পাঠককে। কী হচ্ছে, কী হতে চলেছে এমন উদ্বিগ্নতায় উৎকণ্ঠিত থাকতে হয় শেষ পর্যন্ত। সবল-সাবলীল শব্দসুতোয় বেঁধে এভাবেই আমাদের নিয়ে নিজের গল্পের ভুবনে ঘুরে বেড়ান গল্পকার আশরাফ জুয়েল।
‘জাড়’ জুয়েলের ‘রাষ্ট্রধারণার বিরুদ্ধে মামলা ও বিবিধ গল্প’ গ্রন্থের দ্বিতীয় গল্প। গল্পটি নিয়ে কিছু বলার আগে আরেকটু পেছন থেকে ঘুরে আসা হয়তো অহেতুক হবে না। আশরাফের ‘একজন ভাত ব্যবসায়ীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া খণ্ডদৃশ্য’ পড়ে অভিভূত হয়েছিলাম বছর দেড়েক আগে। গল্পটির বয়ানবিন্যাসে বেশ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন তিনি। আর সে অভিনবত্বের চমক কাটার আগেই আমরা তাঁকে অভিনন্দিত করলাম তাঁর ‘জেমকন’প্রাপ্তিতে। উল্লেখিত গল্পগ্রন্থের পাণ্ডুলিপির জন্যেই তিনি গত বছর এই সম্মাননীয় পুরস্কারে সম্মানিত হন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁকে পড়ার আগ্রহটা আগের আরেটকু বেড়ে গেল। হাতে করলাম কাগজ প্রকাশনী থেকে একুশে বইমেলা-১৮’য় প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থটি। কিন্তু হলোটা কি, আমার দীন পাঠাভ্যাসের দরুন পড়তে গিয়ে প্রথম গল্পেই হোঁচট খেলাম। ‘গল্পটি অসমর্থিত’র মতো গল্প পাঠের অভিজ্ঞতা না-থাকায় এই থেমে যাওয়া। পুনঃপাঠে বুঝলাম কিছুটা। তারপর পরবর্তী গল্প ‘জাড়’-এ যাওয়ামাত্র উঠে বসতে হলো আমাকে। প্রথম গল্পে নিরীক্ষার দিকটি যেমন প্রকট দ্বিতীয় গল্পে তেমনটি নেই। ‘জাড়’ গল্পে জুয়েল দেখিয়েছেন তাঁর অন্য ও অনন্য মুন্সিয়ানা। সাবলীল গদ্যশৈলীতে যাপিত জীবনের জটিলতা জঙ্গতা কী এক অভূতপূর্ব দক্ষতায় সাহসীকতায় যে তিনি তুলে ধরেছেন তা যেকোনো গল্পপাঠককে বিস্মিত করার কথা।
গল্পটির মূল চরিত্র যদিও ভাদু মণ্ডল তবু গল্পটি তার একার নয়; সতীশ-মদুলের গল্পও এটি। আর অন্তর্গত অর্থে জুয়েলের ‘জাড়’ তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক অস্থিরতার এক অনন্য বয়ান। ভোটযুদ্ধ যে এদের কী করতে পারে, কোথায় নিয়ে গিয়ে নামাতে পারে, তার শিল্পিত প্রকাশ ঘটিয়েছেন গল্পকার।
একরাতে নামোবাগানের অন্ধকারে সতীশকে মেরে ফেলে দিনের ঈশ্বর আর রাতের শয়তানেরা। আর অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সে ঘটনার একমাত্র সাক্ষী হয়ে যায় মদুল দোকানদার। নিজেকে খুব করে লুকিয়ে রাখলেও তার ফেলে আসা মাফলার পরবর্তীতে কাল হয়ে দাঁড়ায় তার জন্য। সেও বলী হয় সাপলুডু খেলার। একটা প্রকাণ্ড আম গাছের নিচে বেঁধে হত্যা করা হয় তাকে। আর এ হত্যার দায় চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলে ভাদু মণ্ডলের বড়ো ছেলে সাব্জাদের ওপর। কেননা আসন্ন নির্বাচনে আনারস মার্কা নিয়ে বেলাল চেয়ারম্যানের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে সে। ছাতা মার্কার লোকদের মিথ্যা প্রচারণায় স্বাভাবিকভাবে ভোটব্যাংক কমে আসতে থাকে আনারসের। এর মধ্যেই আবার একদিন আনারস আর ছাতা মার্কার মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। তাতে আনারস পক্ষের সাতজন আর ছাতার চারজন লোক আহত হয়। যেহেতু জোর যার মুলুক তার, সেহেতু সাধারণ ভোটাররা ছাতার নিচে জায়গা খুঁজতে শুরু করে। ভারী হয়ে ওঠে বেলাল চেয়ারম্যানের পাল্লা। আর দিশেহারা হতে শুরু করে আনারস মার্কার লোকগুলো। চোখে সর্ষেফুল দেখে সাব্জাদ আর তার দুই ছোটোভাই–কিসলু ও বিরু। সাতান্ন লাখ টাকার পসার বসিয়েছিল তারা। সবই ভেস্তে যেতে শুরু করেছে। আর এর জন্য দায়ী যেন একমাত্র মদুল। সে-ই মরে গিয়ে জলাঞ্জলি দিতে চলেছে সাব্জাদের সব প্ল্যান। রাগের মাথায় সাব্জাদ বলেও, ‘শোরের বাচ্চা মোদল্যা, সব ভ্যাজালের শুরু ওই হারামি মইরা যাওয়ার পর থাইক্যাই।’ আর সেসময় ‘গরিব মৃত হোক আর জীবিত–সব দোষ তার ওপরেই’, গল্পকারের এমন অসহায়ত্ব পাঠককে সহানুভূতিশীল করে তোলে।
তাই বলে সাব্জাদদের ক্ষমতালোভ কমে আসেনা মোটেও। বরং তাদের মাথায় খেলতে থাকে কূটবুদ্ধি। শুক্রবার দিবাগত রাতে নিজের পিতাকে নামোবাগানে নিয়ে যায় তারা। সেই নিঃসন্তান আমগাছটার নিচে গিয়ে দাঁড়ায়, যার নিচে কুপিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল সতীশকে; শিরোচ্ছেদ করা হয়েছিল মদুলের। আর সেখানে আবারো অবাক করার মতো, মেনে না-নেয়ার মতো পরিস্থিতির অবতারণা করেন আশরাফ–
‘বাপু, তোমার তো ম্যালা বয়স হোয়্যা গেছে। তোমাকে এখ্যানে, এই আম গাছের গোড়ায় ব্যান্ধ্যা থুই, মোদল্যাকে যেভাবে ব্যাইন্ধ্যা থুয়্যাছিল, ওরকুমভাবে তোমাকেও কোপিয়্যা…। বাপু, তারপর ব্যাব্ল্যার উপর সব দোষ চাপিয়্যা দি। তখন দেখব্যা সবকিছুই হামারঘে পক্ষে চোল্যা আসবে। তোমার ব্যাটার চেয়ারম্যান হওয়া তখন ঠেকায় কে, বাপু! বাপুজি।’
ছানিপড়া কুয়াশাক্রান্ত দৃষ্টিতে ভাদু মণ্ডল লক্ষ করে কিসলু’র বাম হাতে জিহ্বা বের করে হাসছে একটা ছুরি। ট্রেনের পাত দিয়ে বানানো ছুরিটাকে বালি দিয়ে ধার দেয়ায় চকচক করছে। প্রথমে একে কুয়াশা-বিভ্রম বলেই ভেবেছিল ভাদু। কিন্তু না! কিসলু’র ইশারায় ছুরিটা মাঝেমাঝেই ঘন রাতের গুমোট পরিস্থিতিকে চোখ রাঙিয়ে যাচ্ছে। হরি কামারের দোকান থেকে ছুরিটা বানিয়ে এনেছিল ভাদু নিজেই।
‘ছুরি ধারাল্যা হ্যোইক কিমবা ভোঁথা–তাকে কিছুতেই বিশস্যাশ কোত্তে নাই।’ এমন একটা কথা ভাদুর দাদী প্রায়ই বলতেন। দাদীর চেহারা মনে করতে করতে জমাট অন্ধকারের আয়নায় নিজেকে পরখ করে নেন ভাদু, না হেরে যাবার কোনো লক্ষণ নিজের চেহারায় দেখতে পান না তিনি।
সহসা চোখ বন্ধ করে নামোবাগানের কুয়াশার ফাঁদে আটকে থাকা আকাশের দিকে মুখ তুলে বিড়বিড় করে বলতে থাকে, ‘চুতমারানি জাড়, চু-ত-মা-রা-নি…’

যেন ছোটগল্পের সেই ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ সূত্র মেনেই দুম করে গল্পটি শেষ হয়ে গেল এখানে। অতঃপর ভাদু মণ্ডলের ভাগ্যে কী ঘটল, তা পাঠকের ভাববার বিষয়। যে যাঁর মতো করে ব্যাখ্যা দাঁড় করাবেন, এ-ই তো একটি সার্থক সৃষ্টির সার্থকতা। গল্পটির কিছু কিছু জায়গায় মুদ্রণপ্রমাদ অথবা অনবধানতার ভ্রান্তি রয়ে গেছে। পরবর্তী সংস্করণে গল্পকার সেদিকে নজর দেবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। কেবল বিশ্বাসই নয়; এ আমাদের দাবিও। কেননা ‘জাড়’ এমন একটি গল্প যা তার বুকে ধারণ করে আছে সমসাময়িক স্বর, যে স্বর একদিন হয়ে উঠবে একটি নিপীড়িত নিগৃহীত আর একইসঙ্গে ক্ষমতালিপ্সু জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসের দলিল। আর এমন সব গল্পের সংকলন ‘রাষ্ট্রধারণার বিরুদ্ধে মামলা ও বিবিধ গল্প’ও হয়ে থাকবে সময়ের সেরা গল্পগ্রন্থগুলোর একটি।

Flag Counter


1 Response

  1. হাসান says:

    মুহিম মনির, তুমি ভালই লিখছ। চালিয়ে যাও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.