বিচিত্র

মনপাখি – একটি বয়ে চলা প্রেমের গল্প

তানবীরা তালুকদার | 28 Feb , 2019  


“উইড়া যায় রে পংখী-পইরা থাকে তার মায়া” – হুমায়ূন আহমেদ

না না, রোমিও জুলিয়েটের মত বিয়োগান্তক কোন প্রেমের উপাখ্যান নয়, ভিনদেশী ছাড়া, ক্রোয়েশিয়ানদের নিজস্ব বিয়োগান্তক উপাখ্যানও আছে। কিন্তু এখানে প্রতীক্ষার, পাশে থাকার আর একটি সম্পর্কে যে জিনিসটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ “দূরত্ব”, তাকে অতিক্রম করার গল্প এটি।

ছাব্বিশ বছর ধরে প্রেমিক সারসটি ক্রোয়েশিয়া’র সেই ছাদে উড়ে যায় যেখানে তার শারীরিক প্রতিবন্ধী কিন্তু তার প্রাণের সঙ্গী তার অপেক্ষায় আছে। পূর্ব ক্রোয়েশিয়ার স্লাভোনস্কি ব্রড (Slavonski Brod) গ্রামে প্রাণসখা ক্লেপটান প্রতি গরমে দক্ষিন আফ্রিকা থেকে তের হাজার কিলোমিটার উড়ে প্রিয় সখী মালেনা’র কাছে ফিরে আসে। একজন শিকারীর গুলির আঘাতে উনিশো তিরানব্বই সালে মালেনা’র ডানা ভেঙে যাওয়ার পর থেকে মালেনা আর উড়তে পারে না। শীতটা কাটিয়েই ফিরে আসে প্রিয়তমা’র কাছে আর প্রতি গরমে তাদের নতুন জন্ম নেয়া ছোট ছোট ছানাদের কলকাকলিতে চারদিক মুখরিত হয়ে ওঠে। স্টেপান ভকিক (Stjepan Vokic) গ্রামের স্কুলের একজন দপ্তরী মালেনাকে ডানা ভাঙা আহত অবস্থায় রাস্তার পাশে কুড়িয়ে পেয়ে নিজের বাড়ি নিয়ে এসে শুশ্রুষা করেন এবং তার নিজ বাড়ির ছাদে থাকার জায়গা করে দেন। স্টেপানের ভাষায়, মালেনা এখন তার পরিবারের সদস্য, শীতের সময় ওকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যান, উষ্ণতায় থাকে মালেনা, বসন্তের শুরুতে ছাদে নিয়ে আসেন, আনন্দে উচ্ছাসে মেলেনা তার প্রেমিকের প্রতীক্ষা করে।

পাখিরে তুই দূরে থাকলে
কিছুই আমার ভালো লাগে না!
পাখিরে তুই কাছে থাকলে
গানের সুরে পরাণ দোলে (সুবীর নন্দী)

ক্লেপটান আর মালেনা’র প্রেম কাহিনী ক্রোয়েশিয়ানদের মুখে মুখে ফেরে। গত বসন্তে ক্লেপটানের ফিরতে ছয় দিন দেরি হওয়াতে স্থানীয় মিডিয়া খুব ফলাও করে এ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে, গ্রামবাসী অনেকেই দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন, হয়ত এবার আর সে ফিরে আসতে পারলো না। কারণ ক্লেপটান খুব কঠোরভাবে তার ফিরে আসার দিনটি মেনে চলে। প্রতি বসন্তে স্থানীয় লোকজন তার ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকে, ছোটখাট স্বাগতম উৎসব হয় তার ফিরে আসাকে ঘিরে। জনপ্রিয়তার কারণে ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগরেবের প্রধান কেন্দ্রে ওদেরকে লাইভ টেলিকাস্ট করে দেখানো হয়। স্টেপান এক ঝুড়ি ভর্তি মাছ তৈরী করে রাখে ক্লেপটানকে স্বাগত জানাতে, যাতে এত লম্বা যাত্রার ধকল খানিকটা সে পুষিয়ে নিতে পারে। যদিও ডানা’র আঘাত সারেনি তবুও এই গরমে প্রেয়সী মালেনা বেশ খানিকটা উড়েছিল তার প্রিয়তম ক্লেপটানের সাথে। ছয় দিন দেরীতে ক্লেপটান ফিরে আসার পর কয়েক ঘন্টার জন্যে দু-দুজনকে সর্বাঙ্গে জড়িয়ে ছিলো।

একবার একটি প্রেমিক সারস মালেনার চারপাশে উড়ছিল, অনেকেই ভেবেছিলো হয়ত ক্লেপটান ফিরে এসেছে। কিন্তু রাধিকা মালেনা যেভাবে প্রতিবাদী হয়ে তার প্রেমের প্রত্যাশায় থাকা অন্য প্রেমিককে আক্রমন করে ঠুকরে সরিয়ে দিলো তাতে পরিস্কার সবাইকে বোঝানো হয়েছে, সে শুধুই তার প্রিয়তম কানাইয়া ক্লেপটানের প্রতীক্ষায় আছে। অন্য কাউকে সে তার পাশে ঘেষতে দেবে না। সেবার ক্লেপটান এক সপ্তাহ আগে ফিরে এলে, গ্রামের লোকেরা স্টেপানকে জিজ্ঞেস করলো, এটা কি সত্যিই ক্লেপটান নাকি অন্য কেউ? স্টেপান সবাইকে আশ্বস্ত করলো এই বলে, ক্লেপটান জানে কোথায় আমি ওর মাছের ঝুড়ি রাখি, ফিরে সে প্রথমে সেখানেই গেলো যদিও ঝুড়িটি খালি ছিলো। তারপর গেলো তার সঙ্গিনী মালেনার কাছে।

প্রতি বসন্তে ছোট গ্রাম স্লাভোনস্কি ব্রড আজকাল মিডিয়া কর্মীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে, ক্লেপটান আর মালেনা এখন জাতীয় নায়ক নায়িকার মর্যাদায়। পর্যটন বিভাগ ও এই হৃদয়কাড়া ভালবাসা ও নিবেদনের গল্প ফলাও করে তাদের পর্যটকদের কাছে প্রচার করে থাকে।

তথ্যসূত্রঃ অন্তর্জাল
২৬/০২/২০১৯
Flag Counter


2 Responses

  1. wasikur says:

    nice post really i like it

  2. Md Masud Hossain says:

    চমৎকার এই ঘটনাটা শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ !
    এদের কোনো ভিডিও ক্লিপের লিংক কি দিতে পারেন ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.