আর্টস

পর্ব ১৭ : ভালো শুরু, শেষে ছন্দপতন

জালাল ফিরোজ | 24 Feb , 2019  


গ্রন্থমেলা ২০০৯ : শুরু ভালো কিন্তু বিডিআর-এর ঘটনায় ছন্দপতন
২০০৮ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৯ই জানুয়ারি ২০০৯ তাঁর দ্বিতীয় সরকার গঠন করেন। এই সরকার গঠনের মাত্র কয়েকদিন পর অমর একুশে বইমেলা শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে ১লা ফেব্রুয়ারি মেলা উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ ও জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে মঞ্চে আসন গ্রহণ এবং বক্তব্য রাখেন পশ্চিমবঙ্গের লেখক মহাশ্বেতা দেবী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ। স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ। বাপুপ্রবিস-র পক্ষে বক্তব্য রাখেন মহিউদ্দিন আহমেদ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি মাতৃভাষা বাংলাকে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষার স্তর পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে না পারলে আমরা যেমন বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধন করতে পারব না, তেমনি শিক্ষার ইপ্সিত মানোন্নয়ন হবে না। সেজন্য সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ব্যবহারে যত বাধা আছে তা দূর করার জন্য বাংলা একাডেমীকে পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি উন্নতি করতে পারে না। তাই আমরা ডিগ্রি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে চাই। ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফসল বাংলা একাডেমী। বিশ্ববাসী যাতে ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পটভূমি, ইতিহাস ও তাৎপর্য জানতে পারে সেজন্য প্রচারমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।

২০০৯ সালে স্টলের সংখ্যা পূর্বের বছরের তুলনায় বেশ বৃদ্ধি পায়। ২০০৮ সালের ২৪২টি স্টলের জায়গায় এই বছর ৩২৫টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ৪৬২ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। এগুলোর মধ্যে ২১১টি প্রতিষ্ঠান ১ ইউনিটের, ৯১টি প্রতিষ্ঠান ২ ইউনিটের এবং ২৩টি ৩ ইউনিটের স্টল পায়। একাডেমির ভেতরে বাংলা একাডেমির জন্য নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ায় স্থান কমে যায়। ফলে কিছু প্রতিষ্ঠান একাডেমি প্রাঙ্গণের বাইরে রাস্তায় ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্টল পায়। পুরো মেলা প্রাঙ্গণকে ৫ জন ভাষাশহিদের নামে উৎসর্গ করা হয়। এই বছর বইমেলা স্পন্সর করে ব্রাক ব্যাংক। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি স্টেপ মিডিয়া সার্বিক সহযোগিতা করে। এই বছর প্রথম গ্রন্থমেলার সদস্য-সচিবের দায়িত্ব পালন করেন বাংলা একাডেমির পরিচালক শাহিদা খাতুন।

এই বছর প্রথমদিন থেকেই বইমেলা জমে ওঠে। সংবাদপত্রে বইমেলার নানাদিক নিয়ে ইতিবাচক সংবাদ/প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। শুরু থেকে মেলা নিয়ে ‘মেলায় প্রথমদিনেই বই প্রেমীদের উপচেপড়া ভিড়’, ‘নতুন বইয়ে আগ্রহ বেশি’, ‘উপন্যাসের দিকেই ঝোঁক বেশি পাঠকদের’, ‘পাঠকেরা তালিকা হাতে নিয়ে খুঁজছেন নতুন বই’, ‘শিশুপ্রহর আজ : মেলা মুখরিত হবে ক্ষুদে পাঠকদের পদচারণায়’, ‘শিশুদের পছন্দের শীর্ষে সায়েন্স ফিকশন কার্টুন ও ভূতের গল্প’, ‘পাঠক আসছে বেশি, বিক্রিও সন্তোষজনক’, ‘দিন যাচ্ছে, বাড়ছে পাঠক দর্শনার্থীদের ভিড়’, ‘বিক্রি বাড়ায় খুশি স্টল মালিকেরা’, ‘মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইয়ে আগ্রহী নয়া প্রজন্ম’, ‘কবিতায় আগ্রহী তরুণেরা’, ‘বইমেলায়ও লেগেছে বসন্ত আর ভালবাসা দিবসের ছোঁয়া’, ‘ভালবাসা দিবসে চাহিদার শীর্ষে রোমান্টিক উপন্যাস, কবিতার বই’, ‘বাড়ছে নবীন লেখকদের বইয়ের কাটতি’, ‘একুশের আগের দিনে বইমেলায় মানুষের ঢল’, ‘প্রভাতফেরির জনস্রোত মিশল একুশের বইমেলায়’, ‘পাঠক সমাগমে বইমেলা ছিল প্রাণবন্ত’, ‘সময় ফুরিয়ে এলেও জলুশ কমেনি বইমেলার’, ‘বইমেলায় বিদায়ের সুর : বেড়েছে বিক্রিও’ এসব ইতিবাচক ও উৎসাহব্যঞ্জক প্রতিবেদন সংবাদপত্রে ছাপা হয়। তবে মেলা নিয়ে কিছু নেতিবাচক সংবাদও প্রকাশিত হয়। যেমন, ‘বিজ্ঞান বিষয়ক বইয়ের চাহিদা বাড়লেও প্রকাশ সন্তোষজনক নয়’, ‘লিটল ম্যাগাজিন আসছে কম : বিক্রিও হতাশাব্যঞ্জক’, ‘চাকচিক্যের অভাবে বাইরের স্টল থেকে বই কেনেন না ক্রেতারা’, ‘বাংলা একাডেমীর বই বিক্রি কমেছে’, ‘ভাষা আন্দোলনের বই না পেয়ে হতাশ পাঠক’, ‘বিডিআর বিদ্রোহের আতংক ছিল বইমেলায়ও’, ‘নিস্প্রাণ বইমেলা : সময় বাড়ানোর দাবি’ ইত্যাদি সংবাদে সেই বছরের মেলার কিছু দুর্বল দিক এবং বিডিআর হত্যাকাণ্ডজনিত পরিস্থিতি বইমেলাকে কীভাবে প্রভাবিত করে তা স্পষ্ট হয়।

২৫শে ফেব্রুয়ারি বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর বইমেলায় এর নেতিবাচক প্রভাব করে। অনেকে আতংক ও ভয়ে এই এলাকায় প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকেন। ২৭শে ফেব্রুয়ারি পরিস্থিতির উন্নতি হলেও অন্যান্য বার শেষ সপ্তাহে যে বিক্রি হয়, তা ২০০৯ সালে হয়নি। এজন্য প্রকাশকেরা হতাশ হন। তাদের পক্ষ থেকে বইমেলা অন্তত ৭ই মার্চ পর্যন্ত বাড়ানোর দাবি ওঠে। কিন্তু একাডেমি রাজি না-হওয়ায় মেলা নির্ধারিত দিন ২৮শে ফেব্রুয়ারি শেষ হয়। ‘শেষে ছন্দপতন হলেও সব মিলিয়ে সফল’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয় :

ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে অনুষ্ঠিত অমর একুশে বইমেলার শুরুতে সফলতা দেখা গেলেও শেষলগ্নে ছন্দপতন ঘটে। বিডিআর সদস্যদের বিদ্রোহের প্রভাব পড়ে বইমেলায়ও। সাধারণত বইমেলার শেষের দিকে পাঠক বাছাই করে পছন্দের বই কিনে থাকেন। কিন্তু গত বুধবার বিডিআর বিদ্রোহের কারণে রাজধানীতে আতংক ছড়িয়ে পড়লে বইমেলার শেষ চারদিন পাঠক সমাগম ও বিক্রি কমে যায়। বাংলা একাডেমীর নতুন ভবন নির্মাণের কারণে এবারের মেলায় একাডেমীর বাইরেও স্টল করতে হয়েছে। এবার অন্যান্য বারের চেয়ে লোক সমাগম বেশি হয়েছে। শেষ ৪ দিন ছাড়া পুরো মেলায় পাঠক সমাগম ও বিক্রি ছিল দারুণ।

২০০৯ সালে ২৭৪১টি নতুন বই বের হয়। এই বছর বাংলা একাডেমি ৫৮ লাখ ১৬ হাজার ৭২ টাকার বই বিক্রি করে। মেলা শুরুর আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে ৩০ কোটি টাকার বই বিক্রি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৮ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়। এই বছর কিছু স্টল মালিকের বিরুদ্ধে স্টলকর্মীরা উপযুক্ত পারিশ্রমিক না-দেওয়ার অভিযোগ উত্থাপন করেন।

(পর্ব ১৮ : পরিসর ও স্থান নিয়ে বিতর্ক)

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.