বইমেলা

পর্ব ১৬ : বৈষম্যের শিকার কিছু স্টল

জালাল ফিরোজ | 22 Feb , 2019  

গ্রন্থমেলা ২০০৮ : বৈষম্যের শিকার কিছু স্টল
অমর একুশে বইমেলায় ২০০৮ সালে প্রথম কিছু স্টল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্থান পায়। কিন্তু মেলা শুরু হওয়ার পর এসব স্টল বৈষম্যের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ করে। এই বছর মেলার স্থান সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে নিনুক্ত হওয়ার পর অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদের আমলে এটি ছিলো প্রথম বইমেলা। এই বছরের মেলা সফল হয়। তবে কিছু বিষয় নিয়ে সমালোচনাও হয়।

১লা ফেব্রুয়ারি বিকেলে বইমেলা উদ্বোধন করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ। স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ। বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব শরফুল আলম এবং বাপুপ্রবিস-র সভাপতি মো. আবু তাহের।

২০০৮ সালে স্টলের সংখ্যা পূর্বের বছরের তুলনায় কমে যায়। এই বছর ২৪২টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ৩৭১ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। এগুলোর মধ্যে ১৩৯টি প্রতিষ্ঠান ১ ইউনিটের, ৮০টি প্রতিষ্ঠান ২ ইউনিটের এবং ২৪টি ৩ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ পায়। পুরো মেলা প্রাঙ্গণকে ৫ জন ভাষাশহিদের নামে উৎসর্গ করা হয়। এই বছর বইমেলা স্পন্সর করে ব্রাক ব্যাংক। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি স্টেপ মিডিয়া সার্বিক সহযোগিতা করে।

প্রথম দিন থেকে বইমেলা জমে উঠে। সংবাদপত্রে বইমেলার প্রশংসা করে প্রতিবেদন ছাপা হয়। ‘বইমেলায় প্রথম দিনেই উপচেপড়া ভিড়’, ‘পাঠকেরা খুঁজছেন নতুন বই’, ‘নতুন বইয়ের ভিড়ে এগিয়ে উপন্যাস’, ‘লিটলম্যাগ কর্নারে পাঠকদের ভিড়’, বইপ্রেমীদের পদচারণায় প্রাণবন্ত মেলা’, ‘জমে উঠেছে বেচাকেনা’, ‘ছুটির দিনে উপচেপড়া ভিড়’, বৃষ্টি-শীত দমাতে পারেনি পাঠকদের’, ‘প্রিয় লোকদের ঘিরে বইপ্রেমীদের উচ্ছাস’, ‘বাসন্তী সাজে বর্ণিল মেলা প্রাঙ্গণ’, ‘মেলার প্রথম প্রহর আজ শিশুদের’, ‘শিশুদের কোলাহলে মুখরিত মেলা’, ‘বিক্রি নিয়ে খুশি প্রকাশকেরা’, ‘শিশুদের বইয়ের কাটতি বেশি’, ‘বরণ্যজনদের মিলন মেলা’, বইমেলায় একুশের আমেজ’, ‘প্রভাতফেরির জনস্রোত মিশেছে মেলায়’, ‘তালিকা হাতে বই খুঁজছেন পাঠক’, ‘সমাদৃত নারীদের লেখা বই’, ‘শেষ বেলায় জমে উঠেছে বেচাকেনা’, ‘ভাঙল মিলন মেলা : আড়াই হাজার নতুন বই, বিক্রি বেড়েছে দ্বিগুণ’ ইত্যাদি শিরোনামে বইমেলা সম্পর্কে ইতবাচক সংবাদ প্রকাশিত হয়। বইমেলা নিয়ে কিছু সমালোচনাও হয়। একটি স্টলে যুদ্ধাপরাধীদের ওপর লিখিত বই বিক্রি হয়। এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। অনেকে বইমেলায় কীভাবে যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে বই প্রকাশিত তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। কেবল অমর একুশে বইমেলা নয়, সারা দেশ থেকে এই বই সরিয়ে ফেলার দাবি ওঠে। নবীন লেখকদের সমস্যা, দুঃখ-কষ্ট নিয়ে এইবার অনেক কথা হয়। তুরুণ লেখকেরা তাদের পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকদের কাছে গেলে প্রকাশকদের সহযোগিতা পাননি।

২০০৮ সালে বইমেলার স্থান সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে মেলার স্থান সংকুলান হচ্ছে না, সুতরাং মেলাকে অন্যত্র ছড়িয়ে দিতে হবে। এ-বিষয়ে নতুন নতুন ধারণা ও প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। মেলার পরিসর একাডেমি থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারণের কথা অনেকে বললেও এইবার বইমেলাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি নীলক্ষেতেও ছড়িয়ে দেওয়ার ধারণা ব্যক্ত হয়। সাংবাদিক মুহম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আগামীতে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে বইমেলার স্থান আর কুলাবে না। ফলে মেলার স্থান আরও বাড়াতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শিশু একাডেমী, পাবলিক লাইব্রেরী পর্যন্ত এর স্থান বাড়ানোর প্রয়োজন পড়বে। আমাদের মেধা, মনন ও সৃজনশীলতা বিকাশে একুশে বইমেলাকে আন্তর্জাতিক বইমেলা করার বিষয়টিও ভাবার সময় এসেছে। ’ ২০০৮ সালে দু’দিন শিশুপ্রহর ছিলো। এই দু’দিন অনেক শিশু-কিশোর বইমেলায় অংশ নেয়। সংবাদপত্রে শিশুদের নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বইমেলা ‘ক্ষুদে পড়ুয়াদের অভয়ারণ্য’ শীর্ষক সংবাদে বইমেলায় তাদের অংশগ্রহণ, মেলা থেকে তাদের বই কেনা এবং মেলায় কীভাবে তারা আনন্দ-উল্লাশ করেছে তা তুলে ধরা হয়। শিশুপ্রহর থাকলেও এই বছর বইমেলায় ‘শিশু চত্বর’ ছিলো না। ২০০০ সাল থেকে বইমেলায় শিশুদের জন্য আলাদা চত্বর সাজানোর রেওয়াজ থাকলেও এই বছর তা বাদ দেওয়া হয়। একাডেমির এই সিদ্ধান্ত সমালোচিত হয়। অনেকে এজন্য দুঃখ ও কষ্ট পান। প্রখ্যাত শিশু-সাহিত্যিক লুৎফুর রহমান রিটন বলেন, ‘খারাপ লাগছে যে এবারের বইমেলায় শিশুদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেই। আগে শিশুদের জন্য শিশু কর্নার ছিল।’ এই বছর গ্রন্থমেলায় এক প্রকাশনীর বই অন্য প্রকাশনীর স্টলে পাওয়া যাবে কি না তা নিয়েও কথা হয়। কেউ কেউ একই স্টলে অনেক প্রকাশনীর স্টল পাওয়া গেলে পাঠকের বই খুঁজতে সুবিধা হয় বলে মত দেন। প্রখ্যাত লেখক সেলিনা হোসেন বলেন, ‘বইমেলায় এসে ভাল লাগছে। তবে এক প্রকাশনীর বই অন্য প্রকাশনীর স্টলে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পাঠকের পছন্দের বই পেতে অসুবিধা হচ্ছে। এক প্রকাশণীর বই অন্য প্রকাশনীর স্টলে রাখার নিয়ম করা দরকার। তাহলে পাঠকের পছন্দের বই খুঁজে পেতে সহজ হয়।’ যেহেতু অমর একুশে বইমেলা প্রকাশকদের মেলা, সেহেতু প্রত্যেক প্রকাশক কেবল নিজের বই বিক্রি করবেন এটাই স্বাভাবিক। ২০০৮ সালের ৮ ও ৯ই ফেব্রুয়ারি ঝড় ও বৃষ্টি হয়। সে সময় মাঘ মাসের কনকনে শীতও ছিলো। বৃষ্টি ও শীত উপেক্ষা করে বিপুলসংখ্যক মানুষ বইমেলায় অংশ নেন। এই বছরের বইমেলায় জনপ্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদের ভক্তরা এক অদ্ভুত কাণ্ড করেন। সেই বছর হুমায়ুন আহমেদের হিমু রিমান্ডে বইটি আলোচনার কেন্দ্রে ছিলো। হুমায়ুন আহমেদের তরুণ ভক্তরা হলুদ পাঞ্জাবি পরে মিছিল করে হিমুকে রিমান্ডে পাঠানোর প্রতিবাদ করেন। তাদের যুক্তি ছিলো, হিমু অপরাধী নয়, হিমু সাধারণ জীবনযাপন করে, তাকে রিমান্ডে পাঠানোর কোনো যুক্তি ও কারণ নেই। হিমুকে হিমুর মতো থাকতে দেওয়া হোক।

কিছু প্রতিষ্ঠান বৈষম্যের শিকার বলে বাংলা একাডেমির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে। বইমেলা রাস্তা থেকে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ফিরে আসার পর ২০০৯ সালে আবার কিছু প্রতিষ্ঠানকে একাডেমির বাইরে স্টল দেওয়া হয়। একাডেমির উল্টোদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসব প্রতিষ্ঠান স্টল নির্মাণ করে। নিয়ম অনুযায়ী একাডেমিকে স্টল ভাড়া পরিশোধ করে প্রতিষ্ঠানগুলো স্টল বানানোর সুযোগ পায়। নির্মিত স্টলগুলোর অধিকাংশ খাবারের হলেও কিছু বইয়ের প্রতিষ্ঠানও ছিলো। উদ্যানে স্টল থাকলেও এসব স্টলে দর্শক-ক্রেতার খুব একটা উপস্থিতি ছিলো না। ফলে মেলা শুরুর কিছু দিন পর এসব প্রতিষ্ঠান বৈষম্যের শিকার বলে অভিযোগ উত্থাপন করে। ‘বৈষম্যের শিকার যে সব স্টল’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদনে বলা হয় :

এবারের বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রয়েছে অনেকগুলো বইয়ের স্টল। এই স্টলগুলো সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত এবং কর্তৃপক্ষের বৈষম্যের শিকার। পাঠকরা অনেকেই জানেন না যে সেখানেও বইয়ের স্টল আছে। সেখানে খাবার খেতে গেলে চোখে পড়ে বইয়ের দোকান। কিন্তু মূল প্রাঙ্গণ থেকে বই কিনে ততক্ষণে পাঠকদের টাকা শেষ হয়ে যায়। ফলে পছন্দের বই চোখে পড়লেও তারা কিনতে পারেন না। …সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে জানা যায়, সেখানে বই বিক্রি না হওয়ায় বইয়ের স্টলকে অনেকে খাবারের স্টলে পরিণত করেছে। স্টলপ্রাপ্তরা জানান, তাদের প্রতি মেলা কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কথা। বাংলাদেশ কালচারাল ফোরামের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে বইয়ের স্টল আছে মেলা কর্তৃপক্ষ তার প্রচার করে না। এখানে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেনি। রাতে নিরাপত্তা কর্মী না থাকায় বই চুরির ঘটনা ঘটে। …বাংলাদেশ আওয়ামী সাংস্কৃতিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আরজু খান বলেন, বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে স্টলপ্রাপ্তরা যে টাকা দিয়েছে আমরাও সে পরিমাণ টাকা দিয়েছি। কিন্তু মেলা কর্তৃপক্ষ মূল প্রাঙ্গণে স্টলপ্রাপ্তদের যে সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে তাদের সে সুযোগ-সুবিধা দেয়নি। ফলে সেখানে ২০ ভাগের এক ভাগও বই বিক্রি হয় না। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে টয়লেটের ব্যবস্থা না থাকায় অসুবিধায় পড়তে হয়।

২০০৮ সালের বইমেলায় চ্যানেল আই প্রথম ‘বইমেলা প্রতিদিন’ নামে মেলা প্রাঙ্গণ থেকে সরাসরি অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। বাংলাভিশনও এই বছর ‘প্রতিদিনের বইমেলা’ নামে একটি অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার শুরু করে। এই বছর আনন্দ আলো বইমেলা প্রতিদিন নামে বইমেলায় ৪ পাতার ৪ রঙা একটি বুলেটিনের প্রকাশনা শুরু হয়।

২০০৮ সালে ২৫৭৮টি নতুন বই বের হয়। কবিতা ও উপন্যাস সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি, যথাক্রমে ৫৮৬ ও ৪৮৯টি। এই বছর বাংলা একাডেমি ৬৫ লাখ ৪২ হাজার ৫৮২ টাকার বই বিক্রি করে। পুরো মেলায় পূর্বের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ অর্থাৎ ২০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়।
(পর্ব ১৭ : ভালো শুরু, শেষে ছন্দপতন)
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.