১৯৫২

ঢাকায় শৈশবের একুশ: প্রথম প্রভাত ফেরি

ফারুক আলমগীর | 21 Feb , 2019  



ভারত বিভাগের পরে কলকাতা থেকে ঢাকা এলে বাবা আমাদের বসত গড়েন গোপীবাগ এলাকায়। আমরা দু’ভাই তখন খুবই ছোট, স্কুলে যাবার বযস হয়নি। কিন্তু ৫০ সালে পিতামহের লোকান্তর গমনে শোকাহত পিতা ঢাকার নিবাস উঠিয়ে আমাদের চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত গ্রামে পাঠিয়ে দেন। বাহান্নতে ঢাকায় আবারো ফিরে আসি। মা এবং আমার তখন অনেকটা ভগ্ন-হৃদয় কেননা সেবার দেশে মহামারী আকারে বসন্ত রোগ দেখা দিলে বড় ভাই গুটি বসন্তে আমাদের ছেড়ে চলে যায়। গ্রামে সুচিকিৎসা না হওয়ায় আত্মজের এই মৃত্যু বাবাকে সংগত কারণে অপরাধ বোধে আক্রান্ত করলে মা ও আমাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ঢাকায় এবার আমাদের নতুন করে বসত শুরু হয় পলাশী-আজিমপুর এলাকায়। আমার মধ্য-আশিতে লেখা “মা ও শিশুর গল্প” শীর্ষক দীর্ঘ কবিতায়, যা ইত্তেফাকের বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে আমি ঐ সময়ের কথা বলতে চেয়েছি।


বাহান্নতে দ্বিতীয় শ্রেণীতে আমাকে ভর্তি করা হয়, পলাশী প্রাইমারি স্কুলে। দেশের গ্রামের বাড়িতে আমাদের দূর-সম্পর্কের মাস্টার দাদার পাঠশালায় বাংলা, ইংরেজি আর ধারাপাতের নামতা মুখস্থ করতে করতে ঢাকায় একেবারে ক্লাস-টুতে বিদ্যালয় জীবন শুরু করতেই ঘটলো বিপত্তি। মনে পড়ে ২০ ফেব্রুয়ারি সকাল দশটায় আমরা কিছু বোঝার আগেই সলিমুল্লাহ মুসলিম হল থেকে একদল ছাত্র এসে আমাদের বললো, “স্কুলে আজ কোন ক্লাস হবে না, তোমরা বাড়ি চলে যাও।” তারা আরো বললো, “দ্যাখ আমরা কোন ক্লাস করছি না, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোথাও কোন ক্লাস হচ্ছে না, ক্লাস করার চাইতে আগে আমাদের মুখের ভাষার অধিকার চাই।” সেই সঙ্গে তাদের একজন সজোরে চিৎকার করে উঠলো, “রাষ্ট্রভাষা” অন্যরা আরো জোরে চিৎকার করে জবাব দিলো, “বাংলা চাই।” সেই দিন থেকে জানলাম, এটাকে বলে শ্লোগান। আমরা ছোটরা সেই শ্লোগান শিখে হৈ হৈ করে বাড়ি ফিরলাম। বাড়ি ফিরে মায়ের সামনেই সজোরে শ্লোগান দিলাম, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। মা এই শ্লোগানের বিষয়, এর তাৎপর্য আগে থেকেই জানতেন কারণ তার কলেজ-পড়ুযা সেজ ভাই বছর চারেক আগে এরকম শ্লোগান দিতে দিতে চট্টগ্রাম-নাজিরহাট রেল-লাইনে শুয়ে পড়েছিলো। সরকারের পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে কোর্টে চালান দিয়েছিলো, আমার উকিল নানা অনেক কষ্টে তাকে জামিনে ছাড়িয়ে এনেছিলেন। মা-র সন্দিগ্ধ বুক কেঁপে উঠলো। সেই আটচল্লিশের ভাষা-আন্দোলন আবার বুঝি ফিরে এলো।


পরদিন একুশে ফেব্রুয়ারি। ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। আমাদের প্রাইমারি স্কুলটি সরকারি বলে স্যাররা চুপি চুপি আমাদের জানিয়ে দিলেন, তারা ক্লাস নেবেন না, তবে স্কুল ছেড়েও যাবেন না। আমরা যেন স্কুলের মাঠে খেলতে থাকি। দপ্তরি তার নিয়ম অনুযায়ী স্কুলের ঘন্টা বাজাবে। কিন্তু আমরা ক্লাসে যাবো না। মাঠে খেলতেই থাকবো।

আমার বাড়ি স্কুলের খুবই কাছে। বাবা নিয়মানুবর্তী মানুষ। সকালেই হাইকোর্টে গেছেন। মা সদ্যজাত আমার ছোট বোনটিকে নিয়ে বাসায় একাকী।

স্কুলের মাঠে ছেলেরা গোল্লা ছুট, দাড়িয়া বান্ধা নানা খেলায মত্ত থাকলেও আমার কেন জানি দীর্ঘক্ষণ খেলতে ভালো লাগছিলো না। তাই এক ফাঁকে খেলা ছেড়ে শ্রেণী কক্ষে বসে কলকাতার দেব সাহিত্য কুটিরের “ছোটদের গল্প কথা” বইটি পড়ছিলাম। হঠাৎ শুনি পলাশী রেল গেইট–এখন যা চৌরাস্তার মোড়–থেকে শোরগোল ভেসে আসছে। আমরা কযেকজন সেদিকে দৌড়ে গেলাম, যদিও শিক্ষকরা আমাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে নিষেধ করছিলেন এবং কযেকজন শিক্ষকও দৌড়ে এলেন আমাদের সঙ্গে।

আমরা দেখলাম বকশি বাজার আর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের (এখনকার বুয়েট) দিক থেকে অনেক ছাত্র রেল-লাইন ধরে এস.এম.হল ও পলাশীর দিকে ছুটে আসছে। তাদের চোখে রুমাল। চোখ দিযে অবিরত পানি পড়ছে। পলাশীর দোকানিরা বালতি ভরা পানি এগিযে দিয়ে তাদের রুমাল ভেজাতে সাহায্য করছে। শুনলাম এরই নাম কাঁদানে গ্যাস। চোখের অসহ্য যন্ত্রণা লাঘবের জন্য ছাত্ররা দোকানের পানির কলে হুমড়ি খেয়ে চোখে-মুখে পানি দিচ্ছে। দোকানিরাও সাহায্য করছে বালতি ভড়া পানি যোগান দিয়ে।

এই প্রথম শুনলাম, শুধু কাঁদানে গ্যাস নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উপর, ছাত্রদের মিছিলে, মেডিক্যাল হোস্টেলে পুলিশ গুলি চালিয়েছে। অনেক ছাত্র নিহত হয়েছে। মারা গেছে সাধারণ মানুষ, রিক্সাওয়ালা, পথচারী। মেক্যিাল হোস্টেলের দিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কাঁদানে-গ্যাস থেকে, গুলি থেকে বাঁচতে ছুট্তে ছুটতে এস.এম.হল ও পলাশীর অনেকটা ঘেরাও করে তাঁরা আমাদের পলাশীও আজিমপুর কলোনির দিকে নিয়ে এসে যার যার বাসায় পৌঁছে দেয়ার চেষ্টায় ব্রতী হলেন।

পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি। পূর্ণ ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। আমরা কেউ স্কুলে গেলাম না। শহরে ১৪৪ ধারা জারি রয়েছে। বাবা যথারীতি হাইকোর্টে চলে গেলেন। মা-কে বলে গেলেন, আমি যেন বাড়ির চৌকাঠ না মাড়াই। এরপর ছোট হিসেবে আমার আর কিছুই মনে পড়ে না। তবে বাড়ি ফিরে বাবাকে বলতে শুনেছি এ-দিনও গুলি ছুঁড়েছে পুলিশ এবং হাইকোর্টের একজন সাইকেলে যাচ্ছিলেন ও অতর্কিত গুলিতে মারা গেছেন। শুনে মা শিহরিত হলেন কেননা বাবাও বাইরে গেছেন ও তাঁরও এমনি দুর্ভাগ্য হতে পারতো। আমিও ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম। অস্পষ্ট স্মৃতি হয়ে শুধু কাঁদানে গ্যাস ও অবিরল অশ্রুধারা নিযে দৌড়ানো সেই তরুণ সাহসী মুখগুলো মনের মুকুরে ভেসে রইলো।

আরো অনেক পরে একদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল গানের সুরে। সময ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৪ সাল। উষালগ্নে আমাদের বাসার কাছ দিয়ে সড়ক পথে গান গাইতে গাইতে একদল তরুণ ছাত্র যাচ্ছে আজিমপুর কবরস্থানের দিকে। আমিও দৌড়ে গিয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দিলাম ও গানটি ধরার চেষ্টা করলাম। সেদিনই জানালাম, এটা হচ্ছে একুশের দিনে শহীদ আত্মাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নগ্নপদ শোক মিছিল যার নাম ‘প্রভাত ফেরি’। যে গানটি গাইছিলো তরুণেরা তার প্রথম দুই ছত্র ছিলো, “ভুলবো না ভুলবো না ভুলবো না সেই একুশে ফেব্রুয়ারি/ভুলবো না….”। মার্চ-পাস্টের সুরের মতোন সেই সুর মূর্চ্ছনায় এগিযে যাচ্ছি আমি, এগিয়ে যাচ্ছে তরুণ ছাত্ররা। তাদের সেই শোকার্ত-মিছিলে পথে পথে যোগ দিচ্ছে নারী-পুরুষ উৎসুক মানুষেরা, আমার মতো ছোটরাও যারা সেই গানের সুরে ঘুম ভেঙে বেরিয়ে এসেছে।

আমার মনে হয় এটাই একুশের প্রথম প্রভাত ফেরি। সেই যে গানের সুরে বেরিয়ে পড়ে শোকার্ত-মিছিলে একাত্ম হলাম, আর ঘরে না ফিরে প্রভাত ফেরির সঙ্গে আজিমপুর কবরস্থান গেলাম এবং সেখান থেকে শহীদ মিনারে। তখন চতুর্থ শ্রেণীতে উঠেছি সেই পলাশী প্রাইমারিতে, আগের চাইতে বড়ো হয়েছি, একা একা ধারে-কাছে অনেক জায়গায় যেতে পারি।

আমাদের ছোট বেলার এই ‘ভুলব না’ গানটির রচয়িতা হলেন ভাষা-সংগ্রামী এডভোকেট গাজীউল হক, সুরও তাঁর দেয়া যা অনেক পরে জেনেছি। তবে এটাই আমাদের প্রথম একুশের সঙ্গীত। উধালগ্নে প্রভাত ফেরিতে শহীদ স্মৃতি তর্পণের প্রথম গান, যে গান আমাদের শৈশবকে উদ্দীপ্ত করেছে বহুদিন। পলাশী, আজিমপুর, ঢাকেশ্বরী, লালবাগ, শেখ সাহেব বাজার এলাকার হাজারো বালক-বালিকাদের অংশগ্রহণে মুখর হযে উঠত। দল বেঁধে খালি পায়ে শোকার্ত মিছিলে শামিল আমরা শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ঘরে ফিরতাম।


পরে অবশ্য প্রখ্যাত সাংবাদিক গল্পকার কবি আবুদল গাফফার চৌধুরীর লেখা একুশের অমর সঙ্গীতের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে। “আমার ভায়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি”। এই কবিতাটিতে প্রথম সুরারোপ করেন আবদুল লতিফ। কিন্তু তাঁর সুরারোপিত গানটি তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি যদিও তিনি তাঁর লেখা ও সুরে গাওয়া “রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলিরে বাঙ্গালী। ঢাকার শহর রক্তে রাঙ্গাইলি” গানটির জন্য বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন যা জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছিলো তখন। দ্বিতীয়বার সম্ভবত: ১৯৫৭ /১৯৫৮ সালের দিকে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম আবারো তাঁকে আবদুল গাফফার চৌধুরী কবিতাটি নতুন করে সুরদানের অনুরোধ করেন। সেই সময আইয়ুব খানের মার্শাল-ল’-এর কারণে দেশ থরথর কাঁপছে।

কাঁপছে দেশের মানুষ। সরকারি চাকুরির কারণে সুরকার আবদুল লতিফ তখন অপারগতা প্রকাশ করলে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম গণ সঙ্গীতের অন্যতম বলিষ্ঠ কন্ঠ ও সুরকার আলতাফ মাহমুদের শরণাপন্ন হন। বলা বাহুল্য শহীদ আলতাফ মাহমুদের অনন্য সুরারোপে গানটি অমরতা লাভ করে। ষাট দশকে একুশের উষালগ্নে প্রভাত ফেরিতে এই গান সকলের মুখে মুখে ফিরেছে যা এখন কোন ভাষাভিত্তিক অনুষ্ঠানে, বাংলা একাডেমির মাস-ব্যাপী অনুষ্ঠানে সূচনা সঙ্গীত হিসেবে গীত হয়।

তবে এ কথাও অনম্বীকার্য, আমার সমান-বয়সী মানুষের কাছে আমাদের ছোট বেলায় দেখা ১৯৫৪ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রভাত ফেরিতে শ্রুত প্রথম গানের কলি অদ্যপি চির জাগুরুক অনেকের স্মৃতির মনি-কোঠায়।
Flag Counter


1 Response

  1. তাপস মজুমদার says:

    অনবদ্য। এক নিঃশ্বাসে পড়ে গেলাম। ইতিহাস এমনই টানে মানুষকে; লেখার গুণে তা ততোধিক আকর্ষণীয় হয়ে উঠে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.