বইমেলা

পর্ব ১৫ : তত্ত্বাবধায়ক আমলে বইমেলা

জালাল ফিরোজ | 19 Feb , 2019  

গ্রন্থমেলা ২০০৭ : তত্ত্বাবধায়ক আমলে বইমেলা
২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় প্রথম অমর একুশে বইমেলা অনুষ্ঠিত এই বছরে। এর আগে কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে কোনো বইমেলা হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ফখরুদ্দীন আহমদ ১লা ফেব্রুয়ারি বইমেলা উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা আইয়ুব কাদরী। স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মঈনুল হাসান। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব এ বি এম আবদুল হক চৌধুরী এবং বাপুপ্রবিস-র সভাপতি মো. আবু তাহের। প্রধান উপদেষ্টা ফখুরুদ্দীন আহমেদ বলেন, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, কালো টাকার মালিক আর সুবিধাবাদী ক্ষমতালোভীদের নয়— জ্ঞানী-গুণী, ত্যাগী নিবেদিত আর সৎ ও যোগ্য মানুষের নেতৃত্বে একটি ন্যায়বিচার ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বায়ান্ন আর একাত্তরের মতো ইস্পাত কঠিন ঐক্য গড়ে তোলার মাধ্যমে একযোগে কাজ করতে হবে। অমর একুশ দেশপ্রেম ও জাতীয় ঐক্যের মূর্ত প্রতীক। একুশ আমাদের অন্যায় আর অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে শেখায়। দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ, সংস্কৃতির ভিন্নতাকে সংরক্ষণ করা, বাংলা ভাষার উন্নয়ন ও প্রসার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকলকে ব্রতী হতে হবে।

পূর্বের বছরগুলোর তুলনায় ২০০৭ সালে স্টলের সংখ্যা কমে যায়। স্থান সংকুলানের সমস্যা এবং স্টল বরাদ্দে কড়াকড়ি আরোপের ফলে কমসংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। আগের বছরের ৩১৭টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের জায়গায় এই বছর ২৬৭টি প্রতিষ্ঠানকে স্টল দেওয়া হয়। এগুলোর মধ্যে ১৩৯টি প্রতিষ্ঠান ১ ইউনিটের, ১০৮টি প্রতিষ্ঠান ২ ইউনিটের এবং ২০টি প্রতিষ্ঠান ৩ ইউনিটের স্টল পায়। এই বছরের মেলা একাডেমি প্রাঙ্গণে নতুন বিন্যাস পায়। গ্রামীণকোন মেলা স্পন্সর করে। মেলা আয়োজনে একাডেমির বাজেট বৃদ্ধি পায়। আগের বছরের ২৬.৫০ লাখের স্থলে এই বছর মেলার বাজেট ২৮.৬৩ লাখে উন্নীত হয়।

বইমেলা উদ্বোধনের পর প্রধান উপদেষ্টা ১লা ফেব্রুয়ারি একাডেমি প্রাঙ্গণে ৫ জন ভাষাশহিদের ওপর নির্মিত ‘মফিদুল আলম খানের ভাস্কর্য’ ‘মোদের গরব’ উদ্বোধন করেন। একাডেমি প্রাঙ্গণে এই ভাস্কর্য স্থাপিত হওয়ায় অনেকে খুশি হন। কেউ কেউ এই ভাস্কর্য বইমেলায় নতুনত্ব দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন। কিন্তু পরে ‘মোদের গরব’ ভাস্কর্যের প্রকৃত শিল্পী কে তা নিয়ে প্রচণ্ড বিতর্ক হয়। মফিদুল আলম খান নয়, অখিল পাল মূল শিল্পী বলে প্রমাণিত হয়। সেই সময় অনেকে শিল্পী হিসেবে মফিদুলের নাম যুক্ত হওয়ায় প্রতিবাদ করেন। প্রখ্যাত কবি সৈয়দ শামসুল হক বলেন, ‘আমি ক্ষুব্ধ এজন্য যে ভাস্কর্য করেছে অখিল পাল। কিন্তু এখন দেখছি শিল্প দখল করা হয়। যে ক্যাডার এটা করেছে তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া দরকার।’ এ-রকম দাবি উঠার পর মফিদুলের বিরুদ্ধে একাডেমি ব্যবস্থা নেয় এবং একাডেমি থেকে তার চাকরিচ্যুতি ঘটে।

২০০৭ সালের বইমেলা শুরুর পর প্রকাশকদের অনেকের পক্ষ থেকে এ-রকম আশাবাদ ব্যক্ত করা হয় যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের বইমেলা রাজনৈতিক সংঘাতমুক্ত পরিবেশে সবচেয়ে সফল হবে। শুরু থেকে বইমেলা সম্পর্কে পত্রিকাগুলোতে ইতিবাচক শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ‘প্রথমদিনেই জমে উঠেছে’, ‘ছুটির দিনে উপচেপড়া ভিড়’, ‘কেটে গেলো জমজমাট প্রথম সপ্তাহ’, ‘উপচেপড়া ভিড়ে উৎসবমুখর’, ‘ছুটিরদিনে বিশিষ্টজনদের ভিড়’, ‘ভিড় বাড়ছেই, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিক্রি’, ‘ক্ষুদে পাঠকদের মিলনমেলা’ ইত্যাদি শিরোনামে মেলা নিয়ে ইতিবাচক প্রতিবেদন ছাপা হয়। আবার কিছু সংবাদে বইমেলার দুর্বল দিকও উঠে আসে। ‘বইয়ের দাম বাড়ায় ক্ষোভ’, ‘বই প্রকাশনা দিন দিন কমছে’, ‘মুক্তিযুদ্ধের বই আসছে কম’, ‘শিশু কর্নার নিয়ে যত অভিযোগ, শিশুদের চেয়ে বড়দের বইই বেশি’ ইত্যাদি হেডিং-এর সংবাদও প্রকাশিত হয়। এই বছরের মেলায় গত কয়েক বছরের তুলনায় মানুষ চলাফেরায় স্বস্তি ফিরে পান। প্রবেশ পথে দীর্ঘ লাইন হলেও নিরাপত্তার স্বার্থে তা নিয়ে তেমন বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়নি।

২০০৭ সালে একাডেমি প্রাঙ্গণে আগ্রহী দর্শক-ক্রেতার অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে বইমেলাকে একাডেমির বাইরে নেওয়া যায় কিনা তা নিয়ে আলোচনা হয়। দেশের প্রখ্যাত লেখক-সাহিত্যিক-পণ্ডিতজনেরা এ-বিষয়ে তাঁদের মতামত প্রকাশ করেন। কবি সৈয়দ শামসুল হক বলেন, ‘রাস্তা-সহ অন্য পাশে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও এর বিস্তৃতি করা যেতে পারে।’ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘এলাকাটা আরও বিস্তৃত করা দরকার। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত করা যায় কি না তা ভেবে দেখা দরকার। তবে তা বাংলা একাডেমিকে কেন্দ্র করেই হতে হবে।’ ২০০৭ সালে কবি সৈয়দ শামসুল হক ও অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বইমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারণের যে ইঙ্গিত দেন তা-ই ২০১৪ সালে বাস্তব রূপ নেয়। বইমেলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান উভয় স্থানে অনুষ্ঠিত হতে থাকে। এই বছর বইমেলার গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়েও কথা হয়। প্রখ্যাত লেখক আবুল আহসান চৌধুরী মন্তব্য করেন, ‘বইমেলাই পারে বর্তমান ও উত্তর প্রজন্মকে আকাশ সংস্কৃতি থেকে রক্ষা করতে।’ কবি রবিউল হুসাইন বলেন, ‘যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন বইমেলা থাকবে।’

২০০৭ সালের বইমেলায় প্রথম ‘শিশুপ্রহর’ যুক্ত হয়। কেবল যুক্ত হয়নি, পরবর্তী বছরগুলোতে শিশুপ্রহরের এই ধারণা ব্যাপক জনপ্রিয়তাও পায়। তারপর থেকে প্রতি বছর শিশুপ্রহর ঘোষিত ও পালিত হচ্ছে। প্রথম বছর শিশুপ্রহর পালিত হয় সকাল ৯টা থেকে। প্রথম শিশুপ্রহর সম্পর্কে সংবাদপত্রে প্রকাশিত ‘আজ মেলার সকাল শুধুই শিশুদের’ শীর্ষক প্রতিবেদনের অংশবিশেষ এখানে উদ্বৃত করা যেতে পারে :
‘ছোট বন্ধুরা, তোমাদের জন্য একটি আনন্দের খবর আছে। আর তা হলো, এতদিন তোমরা যারা বড়দের ভিড়ে অমর একুশে বইমেলায় ইচ্ছেমাফিক ঘুরেফিরে পছন্দের বই কিনতে পারোনি, তাদের কথা চিন্তা করে বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ পুরো একবেলার বইমেলা শুধু তোমাদের জন্য বরাদ্দ করে দিয়েছে। এর নাম দেয়া হয়েছে ‘শিশুপ্রহর’। আজ শনিবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত অমর একুশে বইমেলা পুরোটাই থাকবে তোমাদের দখলে। তোমরা মেলায় স্বচ্ছন্দে ঘুরেফিরে বই কিনবে, বড়দের মতো আড্ডা দেবে, এমনকি পছন্দের লেখকের কাছ থেকে অটোগ্রাফ নিতে পারবে। এছাড়াও তোমাদের বিনোদনের জন্য বিজয়ীদের জন্য পুরস্কার তো থাকবেই। সুতরাং আর দেরী নয়, তোমরা অভিভাকদের সঙ্গে নিয়ে চলে আসো অমর একুশে বইমেলায়।’

একাডেমির পক্ষ থেকে ২০০৭ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি শুক্রবার এই ঘোষণা প্রচারিত হয়। অর্থ্যাৎ এইদিন থেকে বইমেলায় শিশুপ্রহর যুক্ত হয়। সেই দিন শিশুপ্রহর ছিলো সকাল ৯টা থেকে ২টা পর্যন্ত। এখন বইমেলায় শিশুপ্রহর হয় সকাল ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত। প্রতি শুক্র ও শনিবার শিশুপ্রহর থাকে।

যাহোক, ২০০৭ সালের বইমেলায় প্রথম ১৭ দিনে ১২১৯টি নতুন বই বের হয়। এসব বইয়ের মধ্যে শীর্ষে ছিলো কবিতার বই, ২৮৫টি। শেষ পর্যন্ত ২৮ দিনে ২৪০২টি নতুন বই বের হয়। সবমিলেও কবিতার বই ছিলো শীর্ষে, ৪৩৫টি। বাংলা একাডেমি ৪৩ লাখ ৪৪ হাজার ৩৮৮ টাকার বই বিক্রি করে। সমগ্র মেলায় ১০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়।
(পর্ব ১৬ : বৈষম্যের শিকার কিছু স্টল)

টীকা:
১.দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০০৭, পৃ. ১৩
২.দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০০৭, পৃ. ১৩
৩.দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০০৭, পৃ. ১
৪.দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, ১৬ই ফেব্রুয়ারি ২০০৭, পৃ. ১৩
৫.দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, ২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০০৭, পৃ. ১৩
৬.দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, ২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০০৭, পৃ. ১৩
৭.দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, ২৪শে ফেব্রুয়ারি ২০০৭, পৃ. ১১

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.