শ্রদ্ধাঞ্জলি

কবি আল মাহমুদ , এক অসমন্বিত দ্বন্দ্ব এবং ধান ভানতে শিবের গীত

নূরিতা নূসরাত খন্দকার | 18 Feb , 2019  


কবিতার ছত্রে ‘মহাশ্মশান’ শব্দস্থলে ‘গোরস্থান’ লেপে দেওয়ার রাজনীতি সাহিত্য ময়দানে নতুন কিছু নয়। স্বদেশী দ্রোহের প্রকম্পন জাগানিয়া কবি কাজী নজরুলকেও এমনই এক ধাঁচের রাজনীতি একদা গালি দিয়েছিলো, ‘শালা হিন্দুর কবি’ -কীর্তন, শ্যামা গীত রচনার পুরস্কার হিসেবে। আবার, সময়ের আরেক ফোঁড়নের তেজে জ্বলে উঠে সেই রাজনীতিই নজরুলকে ‘জাতীয় কবি’ পদে ভূষিত করতে কুণ্ঠাও করেনি।

বিস্তারিত ও ব্যাপক অর্থে রাজনীতি নিয়ে রাষ্ট্রদর্শনের মহাসাগরে আর যে তিমিপণ্ডিত যাই ভাবুক, আপাতত গণ্ডুষ জলে সাঁতরানো আমার মতোন চুনোপুঁটির মতে, রাজনীতি’র মানে হলো টেকনিক বা কৌশল। যে টেকনিক বা কৌশল সূর্যকেও করতে হয় তার আকাশগঙ্গা নিয়ন্ত্রণে, বৃক্ষরাজীকেও শাখা প্রশাখা বিস্তার সমেত স্বীয় গোত্র বংশের মান ইজ্জত বাঁচাতেও করতে হয়। সবার মন রক্ষা করতে একজন নতুন বৌকেও বিভিন্ন কৌশল করে চলতে হয়। এমনকি যারা বর্তমান লেখাটি পড়ছেন, তাদেরও মগজ রাজনৈতিক কৌশল করেই পাঠ করছে। এরই মধ্যে হাজার পাঠকের হাজার মগজের কথা ভাবতে গিয়ে বর্তমান লেখককে আরও একটি রাজনৈতিক কৌশল ভাবতে হচ্ছে। তা হলো, চলমান লেখাটির বক্তব্য যেন কোনোভাবেই কারো বাপের বাড়ি, তো কারো শ্বশুরবাড়ির দলীয় রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষে গিয়ে তুলকালাম না ঘটায়। আর সেটা ভাবতে ভাবতেই বেশ দারুণ দারুণ সব কায়দা কানুন এঁটে, শব্দের মারপ্যাঁচ করতে হচ্ছে। কেননা, অদৃশ্য কি দৃশ্যমান কায়দায় হলেও কত শত রুই-কাতলা লেখক, প্রকাশক এই দলীয় রাজনৈতিক প্রতাপের ছায়ায় দাপটের সাথে চলেন। আবার এই রাজনৈতিক কায়দারই বুলেট, চাপাতির আঘাতে চটপট জীবনতরী ফেলে বিদায়ও নিয়ে থাকেন অনেকেই। তাই, দলবাজীর রাজনৈতিক তুলকালাম ব্যাপারসমূহ ভাবলেও ঘাম ঝরে যায় কখনো ভয়ে কখনওবা রাগের চোটে। তাই এই দলবাজ রাজনীতির সংস্কৃতিকে না ঘেঁটে এড়িয়ে চলাই চুনোপুঁটিদের রাজনীতি বা কৌশল।

তার উপর বাংলাদেশে দলীয় রাজনীতির সংস্কৃতি রাখোঢাকো বোরখা খুলে (বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে) নগ্নভাবে রাজার মতো নিজেকে বসিয়ে রেখেছে কি শাসন মসনদে, কি সাহিত্যশিল্প রাজ্যে। এখন তো ঠিকাদারের টেন্ডার থেকে শুরু করে মুচিকেও ফুটপাতে জুতো সেলাই করতে হলে এই দলীয় রাজনীতিকে সেলামী দিয়ে পেট চালাতে হয়। যদিও রাজনীতি সূর্যকেও করতে হয়। বনানীতে বৃক্ষরাজীকেও রাজনীতি করে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে। আর চুনোপুঁটিদের জন্য দলীয় রাজনীতির প্রকোপ থেকে নিজেকে বাঁচাতে নতুন বৌয়ের মতো সবার মন রক্ষার টেকনিকও বাজারে প্রচল আছে। কিন্তু যদি বৃহৎ স্বার্থে দেশের মাটিতে নাম কুড়োতে চান, ক্রিকেটার হন আর সংগীত শিল্পীই হন দলীয় রাজনীতির ভাগাড়ে নাম লিখতেই হবে।

এই দলীয় রাজনীতির বিচারশালায় কাজী নজরুল কিম্বা আল মাহমুদ যেন এক অসমন্বিত দ্বন্দ্বের ভিতর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকেন। জমিদার কূলে জন্মেও রবি ঠাকুরও কবি হিসেবে ছাড় পাননি। কারণ, এঁরা কবি হলেও দলীয় রাজনীতির মতাদর্শীরা তো মহাকবি! তারা কবির ছত্রে ‘মহাশ্মশান’ মুছে ‘গোরস্থান’ বসাতে ওস্তাদ। তাই নিপাট মনে কবি নজরুল শ্যামা, কীর্তন লিখলেও এদের কাছে সমস্যা, আল মাহমুদ কবিতার ছত্রে ‘জিহাদ’ লিখলে তো আরও বেশি সমস্যা। বর্তমান লেখকের মতে- এই জাতের দলীয় রাজনীতিই মানুষের একমাত্র আবিষ্কার, যেখানে ধর্ম কখন মিত্র আর কখন শত্রু হবে সেটাই অাজও অনাবিষ্কৃত।

এসব দলীয় রাজনীতির চোখে কবি থাকবেন দুধে ধোয়া তুলসিপাতা। কবিসাহিত্যিকরা হবেন একদম ‘ছোটে নাকো হাঁটে না’। দৈন্য দশায় ভরপুর ব্যক্তিজীবন এঁদের কেটেছেঁটে টুকরো টুকরো করে দিলেও ‘কাউকে যে কাটে না’ টাইপ হবেন সকল কথাসাহিত্যিক, শিল্পী, কুশলীরা। এঁরা চলবেন নিয়ম মতে, ‘দূরে তাকিয়ো নাকো ঘাড় বাঁকিয়ো নাকো’ গোছের হবে চলাফেরার ধরণ। খাঁচায় পোষা তোতার মতো মনিব বাক্য আওড়ালেই এঁরা হবেন ভালোবাসার পাত্র। নচেৎ, ‘তুই রাজাকার’, ‘শালা মুসলমানের কবি’, ‘চেতনাবাজ কবি’, ‘হিন্দুর কবি’ গালি অবধারিত পুরস্কার।

কবি আল মাহমুদ প্রয়াণ প্রসঙ্গে এসব কথা অনেকটা ধান ভানতে শিবের গীত মনে হলেও এই কবি প্রসঙ্গে যেসব বিদগ্ধকথা মুখস্থ হয়ে গেলো এক’দিনে তা হল: তিনি নিঃসন্দেহে বাংলাসাহিত্যের একজন প্রধানতম কবি; কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শও আমাদের বিবেচ্য, রাজাকারদের সাথে তাঁর ওঠাবসা মেনে নেওয়া যায় না কিছুতেই; তিনি বড় কবি হলেও চেতনায় বামন ছিলেন; তাঁর কবিতা মৃত্তিকা ঘ্রাণ বেষ্টিত হলেও একটি বিশেষ ধর্মের প্রতি তাঁর অনুরক্ত কবিতাগুলো অবশ্যই মানবতাবিরোধী; তিনি মোটেও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না ইত্যাদি।

এখন এই অসমন্বিত দ্বন্দ্বের ভিতর দিয়ে কি একজন কবিকে টেনে তোলা কারো দায়িত্ব? নিজের জীবন বাঁচিয়ে চলার টেকনিক যে সময়ের বুকে প্রচল, সে সময়ে কার সময় আছে বা দায় পড়েছে অন্যকে টেনে তুলে নিজের কাঁধে বোঝা টানার? এ দায় কেবল মনে হয় বাংসাহিত্যেরই আছে। সাহিত্য তার ইতিহাসে প্রকৃত সেবককে টিকিয়ে রাখতে চায়; নতুন বৌয়ের মতো সাহিত্য সমাজের সবার মন রক্ষার রাজনীতি করে না ঠিকই, অথবা দলীয় রাজনীতি করে না ঠিকই কিন্তু সূর্য, বৃক্ষের মতোই সাহিত্য আপন রাজনীতি করে চলে শুধুমাত্র নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। নজরুলকে সাময়িক দলকানারা গালি দিলেও সময় তাঁকে টিকিয়ে রেখেছে সময়ের প্রয়োজনে, সাহিত্য তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে সাহিত্যের অস্তিত্বের প্রয়োজনে। আর কেন সময় এবং সাহিত্য নজরুলকে আগলে রেখেছে? কারণ, নজরুল ছিলেন তাঁর সমকাল এবং স্বীয় ভাষাসাহিত্যের প্রকৃত সেবক। কোনো দলীয় রাজনীতির সেবক ছিলেন না তিনি। কোনো দলীয় রাজনীতি তাঁকে তৈরীও করেনি।

ঠিক তেমনি অসমন্বিত দ্বন্দ্বের ভিতর দিয়ে ব্যক্তি আল মাহমুদ চলাফেরা করলেও, সমকাল তাঁকে একজন প্রধান কবি, কথাসাহিত্যিক বললেও, তিনি যোগ্য কি অযোগ্য তার সমাধান একমাত্র বাংলাসাহিত্যই দিতে পারে। কারণ, তিনি দৈহিকভাবে লোকান্তরিত হলেও রেখে গেছেন তাঁর রচনাসমগ্র।

আল মাহমুদকে নিয়ে অতিকথনের সুযোগ নেই কোথাও। তবুও কিছু ভাবনা এসে ধাক্কা দেয় সময়ের ঘায়ে। যেমন: মানবজীবন এমনই এক রহস্যময় বিষয় যার তলানি পাওয়া মুশকিল। আর বিশ্বাস অবিশ্বাস ভরপুর এই জীবনে চলতে চলতে একজন ঈশ্বর-অবিশ্বাসীও হয়ে ওঠে বিশ্বাসী কিম্বা বিশ্বাসীও হয়ে ওঠে অবিশ্বাসী। কারও ব্যক্তিগত ধর্ম বা রাজনীতি চর্চা নিয়ে বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী কিম্বা এ দল সে গোত্র– কারোরই গোত্রবাজী করার অধিকার থাকা যেমন জরুরী নয়, তেমনি একজন কথাশিল্পীর ব্যক্তিজীবনের যাপন নিয়ে সাহিত্যবাজারে তুলকালাম করারও অবকাশ নেই। লেখনীশক্তি বিশ্লেষণই একমাত্র কর্তব্য।

অসংখ্য হামদ নাত লিখে নজরুল কেবল মুসলমানের কবি যেমন হননি, শ্যামা-কীর্তনে অজস্র কথা সুর সম্ভার দিয়ে গিয়েও তিনি হিন্দুর কবি নন। বামপন্থী চেতনায় উদ্দীপনা পেয়ে বাংলাগানের ধারায় গণসংগীতের স্রষ্টা হলেও এই কবি কমিউনিস্ট পার্টির দীক্ষানুযায়ী কমরেড হননি৷ কিন্তু তিনি স্বীয়কালের গণমানুষের গণআন্দোলনের লড়াকু সৈনিক। আবার গণমানুষের সুখদুখের চির সাথীকেই তো কমরেড বলা হয়। তেমনি, ব্যক্তিগতভাবে মুক্তিযোদ্ধা কি মুক্তিযোদ্ধা নন- এমন দ্বন্দ্বের মুখে থেকেও আল মাহমুদের কবিতায় বাংলার মেটেল জীবনের চেতনা বিরাজিত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাঁর উপন্যাসে, কবিতায় বিস্তৃত। ধর্মীয় যে চেতনাই তাঁকে আচ্ছন্ন করুক তাঁর রচনায় বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটই মুখ্য।

এদেশে ধর্মপ্রাণ মানুষের অভাব নেই। ধর্ম প্রতিষ্ঠার নামে জিহাদে যাওয়ার মানুষেরও অভাব নেই। এ সমস্ত কিছুই তাঁর কাছে উপাত্ত হয়ে উঠে এসেছে। যেহেতু একদল বিশ্লেষক কবি আল মাহমুদকে রাজনৈতিক কাতারে ফেলে দিয়ে তাঁর সাহিত্যমান বিশ্লেষণে নেমেই পড়েছেন এবং যেহেতু এদেশে দলীয় রাজনীতির নগ্ন শাসনই মুখ্য; সেহেতু যারা বলছেন বিশেষ একপ্রকার ধর্মের প্রতি আল মাহমুদের অনুরক্ততা মানবতা-বিরোধী কার্য ; তবে তো তাদের কাছেও প্রশ্ন থেকে যায়। বাংলাদেশ সংবিধানে কেন গোড়াতেই সেই বিশেষ ধর্মের খুঁটি শ্লোক প্রচলিত? কেন বাংলাদেশকে সেই বিশেষ ধর্মপ্রধান দেশের কাতারে ফেলে দেওয়া হয়েছে? কেন সারা দেশ জুড়ে সেই বিশেষ ধর্ম প্রচারের আখড়া বাড়ানোর প্রকল্প বাংলাদেশ সরকার বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেন? তাহলে বাংলাদেশ সরকারও কি মানবতা বিরোধী কাজ করছে? কেন জাতীয় নির্বাচনে ভোটভিক্ষা সমাবেশে সেই বিশেষ ধর্মের লেবাসে ভোটভিক্ষুকেরা নিজেকে প্রদর্শিত করে গণমানুষের কাছে ভোট চায়? তাদের উদ্দেশ্যে বলতেই হচ্ছে, সর্ষের ভিতর ভূত পুষে এসব পণ্ড পাণ্ডিত্য বৈ আর কি!

প্রিয় পাঠক, সমাজটাই তো গড়ে উঠেছে নানান মুনীর নানান মতে। ধান ভানতে শিবের গীত গাইতে গাইতে এবার সদ্যপ্রয়াত আল মাহমুদ প্রসঙ্গে তাঁরই কিছু কথা মেলে ধরার প্রয়োজন হচ্ছে বটে। এই কবির ৮১ বছর পদার্পণ কালে একটি অনলাইন বেজ পত্রিকায় (প্রিয়.কম) সাক্ষাতকার দিয়েছিলেন কবি। সেখানে তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয় জামাত শিবিরের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা বিষয়ে। তাঁর উত্তর ছিলো, “দেখেন, আমি কোনো দিন এবং অতীতেও জামায়াতপন্হি ছিলাম না। এরাই আমাকে জামায়াত বানিয়েছে। এবং যারা বানিয়েছে, তারা তো দৈত্য বানিয়েছে। এখন দৈত্য তারা সামাল দিতে পারে না। জামাতি কাউকে আমি চিনতামই না। কিন্তু আমার যারা ক্ষতি করতে চেয়েছিল, তারা এটা করেছিল। আর আপনাকে আমার বলতে কোনো দ্বিধা নাই, তারা কিন্তু নাই। আমি কিন্তু আছি। কারণ আমি তো সাহিত্য করি। আমি কবিতা লিখি, গল্প উপন্যাস লিখি, আমাকে তো গুলি করে মারা যায় না। গুলি করে মারলেও আমি সাহিত্যে থাকব। না মারলেও থাকব”।

অাল মাহমুদ প্রসঙ্গে তাঁর রচনা বিশ্লেষণকে এড়িয়ে যাওয়াও সমুচিত নয়। কিন্তু একজন কবির রচনাকে পাঠক নিজেই নিজের বোধ দিয়ে পাঠ করবে সেটাই প্রকৃত কাজ। তিনি এমনই জাতিসত্তায় বেড়ে ওঠা নাগরিক যার পৃথিবী যাপন ছিল ত্রিখণ্ডিত জাতীয়তায়। ব্রিটিশ-ভারতীয় (১৯৩৬-১৯৪৭), পাকিস্তানী (১৯৪৭-১৯৭১), তারপর বাংলাদেশী (১৯৭১-আমৃত্যু)। তাঁর রাজনৈতিক চেতনার চড়াই উতরাইকে এমন ত্রিখণ্ডিত জাতীয়তার নাগরিক সত্তাও প্রভাবিত করতে পারে। মোটেই অমূলক নয় বিষয়টি।

এদেশে অসংখ্য বামপন্থী চেতনার মানুষ আছেন যারা অবশেষে এলাকার মন্দির-মসজিদ কমিটির সভাপতিও হয়ে গেছেন। যাদের ঘরে হিজাবী সংস্কৃতি প্রবেশ করেছে। আল মাহমুদের কাব্যে কমিউনিজমের গন্ধ উন্মাদ করে দিয়ে অবশেষে ঈশ্বরীয় সৌরভ মিশে গেছে এদেশের বাতাস এবং ত্রিমাত্রিক জাতিসত্তার প্রভাবে। আল মাহমুদকে শেষ জীবন কাটাতে হয়েছে স্ত্রী বিয়োগের বেদনা নিয়ে। একাকীত্ব তাঁকে অসহায়ত্ব এনে দিয়েছিলো যাপনের দিনলিপিতে। যে দেশে অধিকাংশ মানুষ বৃদ্ধ বয়সে পদার্পণ কালে পরপারের চিন্তায় মগ্ন থাকে, ধর্মীয় ভাবধারায় নিমজ্জিত হতে থাকে। জীবনের চাওয়াপাওয়ার হিসেব ভুলে কেবল মৃত্যুমুখী দিন যাপন চলে আসে তাদের ক্ষেত্রে ঈশ্বর এক বড় আশ্রয় হয়ে ওঠে। বর্তমান লেখকের বিশ্লেষণে, আল মাহমুদ সে আশ্রয়ের বাইরে বসত করতেন না। এই ভাবধারার আঁচ যদি তাঁর কাব্যের গায়ে না লাগে তবে তো তাঁকে মিথ্যে রচনার কৌশল করতে হতো। জীবনের যে স্তরে তিনি যা ভাবনায় পুষেছেন তাই তো লিখেছেন। সেটাই তাঁর লেখকসত্তা। উল্লেখিত সাক্ষাতকার থেকেই আলোচ্য বিশ্লেষণটি মেলে ধরা হয়েছে। তিনি সহজ সরল যাপনের একজন নাগরিক ছিলেন। তাঁর নিজ ভাষায় প্রকাশ পায়, “আমি কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে ধর্মে বিশ্বাস করি। যদিও আমি আনুষ্ঠানিকভাবে সেটা করি না। আমি কিছু চাইলেই আল্লাহর কাছে চাই। লোকে বলে আল্লাহকে ডাকলে আল্লাহ কি শুনতে পায়? কিন্তু আমার কেন যেন মনে হয় তিনি কথা বলেন।
….আমি একজন কবি, আমি রাজনৈতিক নেতা নই। আমি সোজা-সরল মানুষ। আপনি যদি আমাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসেন, আমিও আপনাকে হৃদয় দিয়েই ভালোবাসব। আপনার সঙ্গে আমার বিনিময় হবে।”

এখানে শেষ উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার এবং কবি এজরা পাউন্ডও কিন্তু নাৎসিবাদ সমর্থন হেতু। নেরুদা’র মতো রাজনৈতিক সমর্থন হেতু ইতিহাসে আরও অনেকে বিতর্কিত ছিলেন। কিন্তু তাঁদের মহান কীর্তি সমূহকে অস্বীকার করতে পারেনি তাঁদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। যদি আল মাহমুদ সত্যিকারের সাহিত্য সেবক হয়ে থাকেন তো কারো মতামত বা মতানৈক্যের তোয়াক্কা না করে তিনি হয়ে উঠবেন বাংলা কথাসাহিত্যের আপন রাজপুত্র, সাহিত্যের বরে। এরজন্য কোনো দলীয় রাজনীতির আশীর্বাদে শাপমোচনের প্রয়োজন পড়বে না। এমনকি আল মাহমুদ রচনাবলী নিয়ে নিন্দার ঝড় তুলতে তাঁর লেখনী এড়িয়ে ধান ভানতে শিবের গীতও গাওয়ার প্রয়োজন হবে না। আর সেদিনই ত্রিখণ্ডিত জাতিসত্তা বহনকারী এই কবির হৃদয় নিংড়ে জাগ্রত দেশমাতৃছায়াতলের বিষাদিত সুরের স্বরলিপি-কঙ্কালটি প্রকৃত রূপলাবণ্য নিয়ে ফুটে উঠবে বাঙালি পাঠের উঠোনে-

…বাইরে দারুন ঝড়ে নুরে পড়ে আনাজের ডাল,
তস্করের হাত থেকে জেয়র কি পাওয়া যায় ত্বরা –

পোকায় ধরেছে আজ এ দেশের ললিত বিবেকে
মগজ বিকিয়ে দিয়ে পরিতৃপ্ত পণ্ডিত সমাজ…।
[মাতৃছায়া]
Flag Counter


5 Responses

  1. অনেকদিন পর যেন মনে হয় একটা বিশুদ্ধ মানবকন্ঠ শুনতে পেলাম৷ মূল কথাটাই হল এই যে যার সাহিত্যে কোনও মেধাভিত্তিক বা হৃদয়কেন্দ্রিক অনুপ্রবেশ নেই সে যদি কাব্যসাহিত্যের এলাকায় ঢুকে পড়ে তাহলে যা হয় বা হতে পারে, তারই অন্তর্ভেদী দিকনিরূপণের মাধ্যমে লেখিকা কতকগুলি গুণ্ডাকে প্রহার করেছেন৷ খুব যুগোপযোগী ও সময়েচিত প্রতিবেদন৷ সেই সঙ্গে মানবমনের রহস্যও যে কি অবিসংবাদিতভাবে দুর্মর, তারও একটা আভাস ফুটে উঠেছে তাঁর তুলির দুয়েকটি আঁচড়ে৷ হাইডেগার মনে প্রাণে নাৎসী হওয়া সত্ত্বেও হানা আরেন্ট কিভাবে তাঁর প্রেমিকা হতে পারলেন, লেখিকার হাইডেগার-এর উল্লেখে আমার সেকথাও মনে পড়ল৷বহুকাল পর এমন সরল সত্যকথন প্রাণে বল ফিরিয়ে দিয়েছে৷ রোদ পড়ে আসছে, এই সময়টা যদি এমন দুচারটা কথা কানে শুনতে পাই, তাহলে মরেও সুখ৷

  2. হৃদয়ে বাংলাদেশ says:

    কবি আল মাহমুদ রাজাকারদের সাথে উঠাবসা করেছেন, স্বৈরাচারের কাছ থেকে বখসিস নিয়েছেন, ধর্মাশ্রয়ী বক্তব্য রেখেছেন – এগুলো ঐতিহাসিক সত্য। অতএব কবি আল মাহমুদের কাব্যশক্তির সাথে তাঁর রাজনৈতিক আচরনকেও যোগ করে তাঁকে বিচার করতে হবে। চাইকি তার মরণোত্তর বিচারও হতে পারে। তাঁকে দেয়া রাষ্ট্রীয় সন্মানও কেড়ে নেয়া হতে পারে। ব্যক্তি আল মাহমুদ অপসৃত হয়ে থাকবে শুধু তাঁর কবিতা। ঠিক আছে।
    এদেশে মুক্তিযুদ্ধের ধারক-বাহক আওয়ামী লীগ ১৯৯৫ সালে জামাতি রাজাকারদের সাথে সনশ্লিষ্ট হয়েছে। একত্রে বসে বিএনপি বিরোধী আন্দোলনের ছক কেটেছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী বিচারপতিকে স্বাধীনতা বিরোধী ও বাঙালি হত্যার প্রধান দানব গো আযমের কাছে ফোন করে এ্যাপয়ন্টমেন্ট নিয়ে দোয়া আনতে পাঠানো হয়েছে। এখনো জামাতিদের একাত্তরের সহযোগী সংগঠন মুজাহিদ বাহিনীর প্রধানকে জাতীয় পর্যায়ে সন্মানজনক পদে বরন করা হয়েছে। জামাতিদের সাথে ঘনিষ্ট ও দলভুক্তদের আওয়ামী লীগের এমপি নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। পারিবারিক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেত্রী সাজেদা চৌধীর অভিযোগমত একাত্তরে পাকি বাহিনীর সহযোগীকে আত্মীয় ও মন্ত্রী করার কথা নাইই বললাম।
    পক্ষান্তরে, যে স্বৈরাচারের বখসিস নেয়ায় আল মাহমুদকে নিন্দিত হতে হচ্ছে, সেই খোদ স্বৈরাচারকেই রাষ্ট্রীয় পদ দিয়ে তার শাসনামলে আওয়ামী লীগের ত্যাগী কর্মী হত্যা ভুলে যাওয়া হয়েছে।
    আমার দাবী, রাজনৈতিকভাবে জামাতিদের সাথে যারা রাজনৈতিক শয্যায় গিয়েছে, স্বৈরাচারকে যারা প্রতিষ্ঠা করেছে, আল মাহমুদের সাথে তাদের সকলের বিচার করতে হবে।
    এক যাত্রায় পৃথক ফল কেন হবে? তা’ আমরা মানবো না।

  3. Mirza Kibria says:

    A rotten & nasty thoughts for a rotten rajakar, traitor & lair.

  4. Golam Mostofa says:

    Iniye Biniye this writer is supporting the Fake Freedom Fighter who lived on the incentives from Jamat-Shibir. I think the writer did not read the interview taken by Raju Alauddin. He is not a poet…a poet has a different definition than the writer trying to depict here.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.