শ্রদ্ধাঞ্জলি

কবি আল মাহমুদ, শিবনারায়ন রায়ের মূল্যায়ন ও কয়েকটি স্মৃতি

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী | 17 Feb , 2019  


লোক থেকে লোকান্তরে আমি যেন স্তব্ধ হয়ে শুনি
আহত কবির গান। কবিতার আসন্ন বিজয়।

এক বর্ষাঘন অপরাহ্নে মতিঝিলের অবজার্ভার ভবনের দোতলায় দৈনিক পূর্বদেশ অফিসে চাঁদের হাট-এর পরিচালক রফিকুল হক দাদু ভাই আবৃত্তি করলেন: ‘‘ট্রাক ! ট্রাক ! ট্রাক !/ শুয়োরমুখো ট্রাক আসবে / দুয়োর বেঁধে রাখ।/ কেন বাঁধবো দোর জানালা / তুলবো কেন খিল ? / আসাদ গেছে মিছিল নিয়ে / ফিরবে সে মিছিল। / ট্রাক ! ট্রাক ! ট্রাক ! / ট্রাকের মুখে আগুন দিতে / মতিয়ুরকে ডাক। / কোথায় পাবো মতিয়ুরকে / ঘুমিয়ে আছে সে ! / তোরাই তবে সোনামানিক / আগুন জ্বেলে দে।’’ — আর এর মধ্য দিয়ে আল মাহমুদের রচনার জগতে আমার অভিষেক হলো। — জানা ছিল না কবি তখন কারাগারে, বই পড়ে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ জানে না কুরআন পাঠে তাঁর মনোজগত নবচেতনার প্লাবন শুরু হয়েছে।
১৯৬৮ তে আল মাহমুদ মাত্র বত্রিশ বৎসর বয়সে বাঙলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৬৩তে প্রথম কাব্যগ্রন্থ লোকলোকান্তর প্রকাশের পর ১৯৬৬তে কালের কলস প্রকাশিত হয়েছে। তবে সোনালী কাবিন প্রকাশের পর তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। তাঁর কবিতার ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি হলো। মুখে মুখে আবৃত্তি হতে লাগলো।
১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশ ছেড়ে কবি আগরতলা হয়ে কলকাতায় গিয়েছিলেন। বিজয়ের পর দেশে ফিরে ১৯৭২ এ দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসাবে কাজ শুরু করেন। ক্রমান্বয়ী সরকারবিরোধী প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে ১৭ই মার্চ ১৯৭৪ দিনগত রাতে তাঁকে বাসা গ্রেপ্তার করা হয়। সরকারী আদেশে ১৮ এপ্রিল ১৯৭৪ তারিখে গণকণ্ঠের প্রকাশনা চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রায় এক বৎসর কারাবাসের পর তাঁকে মুক্তি দেয়া হয় ১৯৭৫-এর ১০ মার্চ। মায়াবী পর্দা দুলে ওঠে প্রকাশিত হয় ১৯৭৬-এ।
অর্থনীতি বিভাগের সহপাঠী ফারুক মঈনুদ্দীন কবি। তিনি সোনালী কাবিন-র ভক্ত। চা দোকানের আড্ডায় তিনি সোনালী কাবিন থেকে আবৃত্তি করেন। সেটা ১৯৮১। তাঁর আবৃত্তি শুনে শুনে কিছু অংশ আমাদেরও মুখস্থ হয়ে যায়।
সোনার দিনার নেই, দিনমোহর চেয়ো না হরিনী
যদি নাও, দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দু’টি,
আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনোকালে সঞ্চয় করিনি
আহত বিক্ষত করে চারদিকে চতুর ভ্রুকুটি;
ভালোবাসা দাও যদি আমি দেব আমার চুম্বন,
ছলনা জানি না বলে আর কোনো ব্যবসা শিখিনি;
দেহ দিলে দেহ পাবে, দেহের অধিক মূলধন
আমার তো নেই সখী, যেই পণ্যে অলংকার কিনি।
বিবসন হও যদি দেখতে পাবে আমাকে সরল
পৌরুষ আবৃত করে জলপাইয়ের পাতাও থাকবে না;
তুমি যদি খাও তবে আমাকেও দিয়ো সেই ফল
জ্ঞানে ও অজ্ঞানে দোঁহে পরস্পর হব চিরচেনা
পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয় না কবিরা;
দারুণ আহত বটে আর্ত আজ শিরা-উপশিরা।

‘দেহ দিলে দেহ পাবে’ আল মাহমুদের এই সরল প্রতিশ্রুতি আমাদের মুগ্ধ করে। ‘বিবসন হও যদি দেখতে পাবে আমাকে সরল’ এই আহবান আমাদের রোমাঞ্চিত করতে থাকে। সোনালী কাবিনর অনপনেয় মুর্ছনা সারা দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
আগের বছর নীলখেত থেকে দুই টাকা দিয়ে কিনেছিলাম কবীর চৌধুরীর অনুবাদগ্রন্থ Selected Poems of Al Mahmud । অনুবাদক ভূমিকায় লিখেছিলেন, “I think most people would agree with me when I say that Al Mahmud is one of the most important living poets of Bangladesh and that his poetry is unique in many ways। অনুবাদক আরো লিখেছিলেন, ‘His images are carefully wrought, and though mostly culled from the familiar rural world of Bangladesh, the reader finds them at once striking and graceful because of the way he manipulates his words and rhythm and the keen, sensuous, delicate sensibility he brings to bear on them। কবীর চৌধুরীর অভিমত সকল কাব্যরসিকের উপলব্ধির প্রতিধ্বনি ছিল।

এ সূত্রে স্মরণ হয় লোক-লোকান্তর প্রকাশের পর এক গ্রন্থালোচনায় আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখেছিলেন, ‘প্রচলিত কাব্যছাঁচের ভিতরে আল মাহমুদের কবিত্বশক্তি স্বপ্রকাশ। . . . লোক-লোকান্তর কবিতাটিতে যে তীব্র কবিচৈতন্যের আর্তি একটি বিহঙ্গের মুখোশে উড্ডীন তা ব্যক্তি-সভ্যতার অবলুপ্ত দায়ভাগ থেকে উত্থিত একজন যথার্থ কবির‘।

১৯৮৭ এ পশ্চিমবঙ্গের কবি শক্তি চট্টেপাধ্যায় খুলনায় এসেছিলেন। বন্দর কর্তৃপক্ষের অতিথিশালার বৈঠকখানায় কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘এখানকার লেখার মধ্যে আমি নানা কারণে আল মাহমুদের সোনালী কাবিনটা খুব বিশিষ্ট বই বলে মনে করি। বাংলাদেশে এরকম সনেট আর লেখা হয় নি। পশ্চিমবঙ্গে হয়েছে।’ — এটি কোনো কাজের কথা মনে হয় নি সেদিন। ‘সোনালী কাবিন’ কেবলই সনেটগুচ্ছ এরকম কখনই মনে হয় নি আমাদের। হতে পারে শক্তি চট্টেপাধ্যায় সেদিন হয়তো তাঁর ভাবনা পরিষ্কার করে বলতে পারেন নি। স্মর্তব্য তিনি কলকাতা থেকে আল মাহমুদের একটি কাব্যসংকলন প্রকাশের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, প্রচ্ছদনাম ছিল ‘আল মাহমুদের কবিতা’।
১৯৭৬ এ প্রকাশিত হয় মায়াবি পর্দা দুলে ওঠো। এতেই প্রথম ইসলামী চেতনায় আত্মসমর্পণের চিহ্নাবলী ফুটে ওঠে। সোনালী কাবিন-এ এরকম কয়েকটি পঙক্তি ছিল:
কিছুই থাকে না কেন? করোগেট ছন কিংবা মাটির দেয়াল
গাঁয়ের অক্ষয় বট উপড়ে যায় চাটগাঁর দারুণ তুফানে
চিড় খায় পলেস্তরা, বিশ্বাসের মতন বিশাল
হুড়মুড় শব্দে অবশেষে
ধসে পড়ে আমাদের পাড়ার মসজিদ।

অন্যদিকে মায়াবী পর্দা দুলে ওঠোতে আল মাহমুদ লিখলেন,
তবু আমার মনে হলো ধ্বংসস্তুপের মধ্যে কাত হয়ে পড়া
গম্বুজটিই বুঝিবা খানিকটা উঁচু হয়ে আছে।

এই প্রতীকি পার্থক্য চোখ এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয় আদৌ। তবে সেক্যুলার সাহিত্যবোদ্ধারা তখনই আল মাহমুদের সমালোচনা করার সাহস সংগ্রহ করে উঠতে পারেন নি। আশির দশকের শেষভাগে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় আল মাহমুদ সমালোচনার মুখে পড়েন। যত দূর মনে পড়ে, সাহিত্যের রাজনীতিকরণ শুরু হয়েছে নব্বুয়ের মধ্যভাগে–সাহিত্য ব্যবসায় শুরু হয় নি তখনও, সাহিত্য ব্যবসায়ের পুঁজি জমে উঠতে শুরু করেছে কেবল।

আশির দশকের শুরুতে “জিজ্ঞাসা“ পত্রিকায় আল মাহমুদের কবিতা প্রকাশ করতে গিয়ে বিরোধিতার মুখে পড়েছিলেন শিবনারায়ণ রায়। ২০০৬ তাঁর কলকাতার বাসভবনে কথাপ্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করেছিলাম: জিজ্ঞাসা’র বিভিন্ন সংখ্যায় কবি আল মাহমুদের অনেক কবিতা আপনি প্রকাশ করেছেন। সন্দেহ নেই আল মাহমুদের কবিতা আপনার পছন্দের। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী এ ব্যাপারে আপনাকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে করেন। ধরুন, কবি শামসুর রাহমানের কথা। তাঁর সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী শুনতে চাই।
উত্তরে শিবনারায়ণ রায় বলেছিলেন, ‘ ‘জিজ্ঞাসা’র পাতায় বাংলাদেশের তরুণ-প্রবীণ অনেক কবিরই কবিতা সাদরে মুদ্রিত হয়েছে। শামসুর রাহমানেরও। বাংলাদেশের কবি ও সাহিত্যিকদের লেখার সঙ্গে আমার সম্যক পরিচয় বহু আগে থেকেই। পূর্ববঙ্গের কবিদের কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা পূর্বাপর প্রত্যক্ষ করেছি। এটি ঠিক, আল মাহমুদের কবিতা আমাকে বেশ মুগ্ধ করে। যেমন এ বাংলার শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা। কিন্তু শামসুর রাহমানকেও আমি সমকালীন বাঙালি কবিদের মধ্যে অন্যতম বলে বিবেচনা করি। তিনি যে বাংলাদেশে প্রবলভাবে জনপ্রিয়, তা-ও আমার অজানা নয়। তার অনেক বই আমার সংগ্রহে আছে।

শিবনারায়ণ রায় আরো বলেছিলেন, “আল মাহমুদের কবিতা নিয়ে ‘জিজ্ঞাসা’র বিরুদ্ধে অনেকের অসন্তুষ্টি বা অভিযোগের কথাও আমার অজানা নয়। ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘জিজ্ঞাসা’ প্রকাশের কথা ভেবেছিলাম মেলবোর্নে থাকতেই। প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮১-তে। কিন্তু অচিরেই বুঝতে পেরেছিলাম, বাংলায় ভালো লেখার অভাব রয়েছে। যা হোক, ‘জিজ্ঞাসা’র তৃতীয় সংখ্যায় আল মাহমুদের একগুচ্ছ কবিতা মুদ্রিত হয়। সেটা ১৯৮২-এর কথা। আমি চিঠি লিখে আগ্রহ ভরে কবিতাগুলো চেয়ে নিয়েছিলাম। শুরু থেকেই বাংলাদেশে ‘জিজ্ঞাসা’ যেত। কয়েকজন আজীবন সদস্য ছিলেন। হাসান আজিজুল হক ও আরও কারও কারও বদান্যতায় প্রায় একশ’ কপি ‘জিজ্ঞাসা’ বাংলাদেশে যেত। আল মাহমুদের কবিতাগুলো দেখে অনেকেই চিঠি লিখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন যে, আল মাহমুদের পৃষ্ঠপোষকতা সমীচীন হয়নি। কারণ সম্প্রতি তিনি একদিকে ইসলামী ভাবধারায় দীক্ষা নিয়েছেন, অন্যদিকে সামরিক শাসকগোষ্ঠীর সমর্থক হয়ে উঠেছেন। কিন্তু কবির কার্যকলাপ দিয়ে কবিতার মূল্যায়ন মেনে নিতে পারিনি আমি। তাই কয়েক সংখ্যা পর আল মাহমুদের আরও একগুচ্ছ কবিতা প্রকাশ করি। আর সম্পাদকীয় মন্তব্যে এ কথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিই— আল মাহমুদের কবিতা উপভোগ এবং তাঁর বিশ্বাস বা কার্যকলাপকে সমর্থন করা সমার্থক নয়। এ কথা সত্য যে, আশির দশকের শুরু থেকে আল মাহমুদের মনোজগতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল। তবে কবিতায় তাঁর কল্পনার উদ্ভাস, মননশীল গভীরতা, উপমা-বাকপ্রতিমার মৌলিকত্ব অটুট থেকেছিল। আমার প্রতীতি ছিল যে, ধর্মবিশ্বাস বা রাজনৈতিক দিকদর্শন তার কবিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে সক্ষম হবে না। কারণ তিনি অস্থিমজ্জায় কবি, বিশুদ্ধ একজন কবি। তাঁর কাব্যপ্রতিভা মৌলিকত্বে উজ্জ্বল। রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কাউকে অবদমনের দাবি বা প্রচেষ্টা আমার পক্ষে সমর্থন করা সম্ভব নয়। মানুষের মুক্তি ও গণতন্ত্র— এ দুই অভীষ্ট থেকে আমি সজ্ঞানে কক্ষচ্যুত হইনি কখনও। আল মাহমুদের সাম্প্রতিক কবিতাও আমাকে মুগ্ধ করে, স্পর্শ করে; মনের গভীরে আলো জ্বেলে দেয়, যার কোনো ব্যাখ্যা নেই“।

১৯৮৬ এ আমি বেনাপোলে চাকুরি করি; সে সময় কলকাতায় সাহিত্য মেলা শেষ করে ফিরছিলেন আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান আরো অনেকে। পত্রিকায় পড়া ‘ভাসানীর টুপি’ কবিতাটি অনুবাদ করছিলাম কিছু দিন আগে। সেটি দেখালে আল মাহমুদ খুব সন্তুষ্ট হয়ে বলেছিলেন তাঁর কবিতার অনেক অনুবাদ হলেও তিনি এতো মনোগ্রাহী অনুবাদ আর দেখেন নি। ‘আপনি আরো অনুবাদ করুন না’, বলেছিলেন তিনি। — তাঁর কথা রেখেছিলাম। আরো কয়েকটি কবিতার অনুবাদ করেছিলাম। ‘ভাসানীর টুপি’ কবিতাটির অনুবাদ এরকম ছিল:

BHASANI: REMINISCENCE OF A MISSING MOUNTAIN
Al Mahmud
Maulana’s capped head, held high, was
As it were—the reminiscence of a missing mountain.
Now and then I went beside this mountain—
Serene, as if a blow of wind lost within self
”What’s the use of poetry”, asked he, ”Freedom first,
Then, bread and butter”.
”And then?” I would ask, ”What else Maulana?
after your rice and robe?”
Silent—he turned on his plate
the bowl of lobster curry
that my sister gave for him
And ate, silently, like an aged python.
The dinner over, he picked the teeth,
combed the beard
And you know, nothing he would require anymore.
—”Well, you can tell me anything now
Even any nonsense verse from your notebook”.
But before I could open the book, he fell fast asleep
And a mysterious sound of a distant wrecking,
as if, overflowed his nostrils
And beside a napping mountain
All the words of my script hovered around
like a fluttering hopper.

আল মাহমুদ বাংলাভাষার অন্যতম প্রধান একজন কবি। তিনি যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছেন কিন্তু তাঁকে নিয়ে সামগ্রিক মূল্যায়ন চোখে পড়ে নি। যারা বলেন জীবনানন্দ-পরবর্তী কালের তিনি প্রধান কবি তারা অতিরঞ্জন করুন বা না করুন এই দাবীটি ব্যাখ্যা করে বলবার দরকার রয়েছে।
প্রায় দুই দশক মৃত্যু অবধি তাকে এক ঘরে করে রাখা হয়েছে। কিন্তু কেউ আল মাহমুদকে বাতিল করে দেয় নি। এমনকী তাঁর ঘোর শত্রুরাও না। ব্যক্তি আল মাহমুদকে আক্রমণ করা সহজ, কিন্তু তাঁর কবিতা অনাক্রম্য থেকে যায়। স্বীকার করা সমীচীন হবে যে, তাঁর কবিতায় যে ইসলামী অনুষঙ্গ সত্তুর দশকের শেষভাগ থেকে স্থান লাভ করেছে তা ক্রমবিস্তার লাভ করে নি। প্রেম, সৌন্দর্য, দেশের জন্য আর্তনাদ তার কবিতায় প্রথম থেকেই ছিল; শেষ পর্যন্তও ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অদৃষ্টবাদিতা, যোগ হয়েছে অস্তিত্ব ও মৃত্যু চিন্তা। আত্মজৈবিনকতা গাঢ়তর হয়েছে। তিনি লিখেছেন: ’আমি জনপদে থাকতে চেয়েছি, কিন্তু কারা আমাকে এই অজ্ঞাত বাসে / অরণ্যে বৃক্ষের সহোদরে ঠেলে দিয়েছে?’ লিখেছেন, ‘ঋতুর অতীত আমি। কে জিজ্ঞাসে এটা কোন মাস / বাতাসে গড়িয়ে পড়ে বিদায়ের বিষণ্ন নির্যাস।’ লিখেছেন,
ফেরদৌসীর কবরের কাছে একদল প্রেমিক জমা হলে তাদের মুখ দেখে
আমি হতবাক হলাম। কবি শব্দটির অর্থই হল মানুষের কবন্ধে শেয়ালের মুণ্ডু বসানো
আমার কবন্ধেরও ওপর কি আছে দেখার জন্য এক ঝরণার কাছে দৌড়ে গিয়ে দেখি
হায় আল্লাহ, এ যে অতিকায় এক ঈগলের মাথা।

ইসলামী অনুষঙ্গ যাদের গাত্রদাহের কারণ তারা ঐ রকম কয়েকটি কবিতা বাদ দিয়ে আল মাহমুদের সংকলন করে নিতে পারেন। কিন্তু এ কথাও বিবেচনায় নেয়া দরকার ইসলামি অনুষঙ্গ আর ইসলামি ভাবধারা সমার্থক নয়। ২০০৭ এর ৭ ফেব্রুয়ারি লেখা ‘পুনরুত্থানের ফুৎকার’ পূর্ণাংশেই ইসলামি অনুষঙ্গের কবিতা, আটাত্তুর পঙক্তির দীর্ঘ কবিতা। কিন্তু এটাকে কোনোভাবেই ইসলামী ভাবধারার কবিতা বলা যেতে পারে না। চট্জলদি কয়েকটি পঙক্তি উদ্ধারণ করা যেতে পারে:
“ইসরাফিলের চোখ দুটি ঈষৎ রক্তবর্ণ ধারণ করলেও অনন্তকালের মধ্যে তিনি সজাগ / শৃঙ্গধারী এক ফেরেস্তা। তবুও তার চোখের কোল বেয়ে কিসের দুটি দাগ? তিনি কি / তার প্রথম ফুৎকারের পরিণাম দর্শনে মুহূর্তের জন্যও কেঁদে ফেলেছিলেন? তার / বৈদুর্যমণির মত চোখ দুটি থেকে কি ঠিকরে গড়িয়ে পড়েছিল বৃষ্টি? . . . ”
আল মাহমুদের কাছে বাংলা কবিতা ঋণী, ঋণী পূর্ববঙ্গের কবিতা; ঋণী বাংলা ভাষা। কবি আল মাহমুদ প্রসঙ্গে এটিই শেষ কথা।
Flag Counter


6 Responses

  1. abir says:

    great article, onek kichu jante parlam

  2. Ajitkumer Roy says:

    দেখা যাচ্ছে কবি আল মাহমুদের এমন অনেক কবিতা রয়েছে যেগুলো পড়া হয় নি। আল মাহমুদকে সামগ্রিকভাবে বোঝার জন্য এগুলো পড়া দরকার। লেখক যে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টটি বলেছেন তা হল ইসলামি ভাবধারার কবিতা ও ইসলামি অনুষঙ্গময় কবিতা এক নয়। ঘটনাক্রমে ‘পুনরুত্থানের ফুৎকার’ পড়েছি। পৃথিবী ধ্বংসের উদ্দেশ্যে ইসরাফিল শিঙ্গায় ফুঁ দিয়েছেন এবং এর পরিণাম দেখে অশ্রুপাত করেছেন —এ তো মোটেও ইসলামি ভাবাদর্শের কবিতা নয়; বরং একজন সৌন্দর্য-পূজারী আধুনিক মানুষের প্রতীকি প্রতিবাদ। আল মাহমুদের উদ্দেশ্যে প্রণতি। – অজিতকুমার রায়, ঢাকা।

  3. Erick says:

    কবি আল মাহমুদ যে বাংলা ভাষার আধুনিক কবিদের পুরোধা তা প্রমাণ করার জন্য শিবনারায়ণ রায়ের সার্টিফিকেট লাগবে কেন? গত কয়েক দিন ফেসবুকে তো কেবল আল মাহমুদ তর্পণ। আর কোন প্রমাণ কি লাগে? আবদুল মান্নান সৈয়দের রেফারেন্স দিসেন। তিনি তো বুঝতেই পারেন নাই কাকে নিয়া লিখতাছেন। বরং কবির চৌধুরী ভাল লিখসেন। যাই হোক ইসরাফিলের শিঙ্গা নিয়া কবিতাটা পড়তে হবে। মনে হয় এনজয় করার মতো কবিতা। লেখকরে ধন্যবাদ।

  4. Nahid says:

    লেখাটি পড়ে উপকৃত হলাম । আসলে আল মাহমুদের শেষের কবিতাগুলো কেউ পড়েছে মনে হয় না । সবাই না পড়েই সমালোচনা করে বলে হচ্ছে । দেশের মানুষ আল মাহমুদের কবিতার ভক্ত কিন্তূ সরকার তাকে অবহেলা করলো এটা মেনে নেয়া যায় না । আমরা আল মাহমুদের কাছে ছোট হয়ে গেলাম ।

  5. Farida Majid says:

    কোন গভীর ধর্মবোধ থেকে লেখকদের কেউ জামাতের সাথে হাত মেলায় না । সুদূর কলকাতা বসে শিবনারায়ণ রায় কি করে তা আঁচ করবেন ? শহুরে শিক্ষিত আঁতেলরা সর্বদা অশিক্ষিতদের দোষারোপ করে, তাচ্ছিল্য করে ‘ধর্মান্ধ’ বলে । অথচ জামাতের ব্যাপারে গ্রামের মুসলমান যতটা বোঝে শহুরে আঁতেলরা বোঝে না । এতোকাল ধরে বাংলার গ্রামের মুসলমানেরাই জামাতের সুদূর প্রসার ঠেকিয়ে রেখেছিলো । কৌশলী, বিত্তশালী জামাত কখনও ৫-৬% এর বেশী ভোট পায়নি সাধারণ নির্বাচনে । জামাত ঠেকিয়ে রাখার দেয়ালগুলো ধীরে ধীরে, সুপরিকল্পিতভাবে ভাঙ্গা হয়েছে । মীর কাশেম আলীর বেতনভুক্ত কবি আল মাহমুদের প্রধান দায়িত্ব ছিল ঐটা — শিক্ষিত শহুরে বাঙালি মুসলমান তরুণদের মধ্যে জামাত ঠেকানোর প্রতিরক্ষার দেয়ালগুলো ভাঙ্গার । সফলও হয়েছিলেন । বাঁশের কেল্লার লাখ লাখ মেম্বার ও ব্লগার খুনীরা কবি আল মাহমুদের কর্ষিত জমির ফসল ।

    • ফরিদ আহমেদ খান says:

      দিদি খুব যাহোক এক হাত নিয়ে নিলেন। আল মাহমুদ কবি; তাকে কবি হিসেবেই দেখুন না? শিবনারায়ণ বাবুকেই বা ছোট করতে চাচ্ছেন কে বলুন তো?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.