বইমেলা

পর্ব ১৩ : বাংলা একাডেমির পঞ্চাশ বছর

জালাল ফিরোজ | 15 Feb , 2019  


গ্রন্থমেলা ২০০৫ : বাংলা একাডেমির পঞ্চাশ বছর
২০০৫ সালের বইমেলা বাংলা একাডেমির পঞ্চাশ বছরপূর্তি উপলক্ষে একাডেমির জন্য বিশেষভাবে সুন্দর ও স্মরণীয় হতে পারতো। কিন্তু বিভিন্ন কারণে একাডেমির জন্য এই বছরের বইমেলা খুব আনন্দদায়ক হয়নি। প্রধানমন্ত্রী মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে একাডেমিকে তাদের ‘প্রকাশিত বইয়ে ভুল তথ্য সংশোধন’ করার পরামর্শ দেন। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত বোমা হামলার পর বইমেলায় বোমা-আতংক দেখা দেয়। মেলায় নিরাপত্তা বিধানের নামে পুলিশের বাড়াবাড়ি নিয়ে সমালোচনা হয়। নীতিমালা লঙ্ঘনকারী স্টল চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ না-করায় নিন্দা হয়। একাডেমির সাহিত্য পুরস্কার দলীয়করণ নিয়ে কবি-সাহিত্যিক-লেখকেরা বিবৃতি প্রদান করেন। মেলায় বই চুরি ও জালনোটের ছড়াছড়ি নিয়ে তীর্যক কথা হয়। হুমায়ুন আজাদের ওপর পরিচালিত হামলার বর্ষপূর্তিতে একাডেমির পক্ষ থেকে কোনো কর্মসূচি না-নেওয়ায় ২০০৫ সালে একাডেমি সমালোচিত হয়।

১লা ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টায় বইমেলা উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক ওয়াকিল আহমদ। বিশেষ অতিথির ভাষণ দেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী সেলিমা রহমান। স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মনসুর মুসা। বক্তব্য রাখেন বাপুপ্রবিস-র সভাপতি মো. আবু তাহের। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেন, ‘বাংলা একাডেমী প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্যপুস্তক-সহ কিছু বইতে তথ্য বিভ্রাট এবং ভূল বিশ্লেষণের অভিযোগ রয়েছে, যা একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। আশা করি কর্তৃপক্ষ এসব ভূল দ্রুত শুধরে নেবে।’

২০০৫ সালে ৩১৮টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ৪৬৪ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। এগুলোর মধ্যে ১৮৯টি প্রতিষ্ঠান ১ ইউনিটের, ১১২টি প্রতিষ্ঠানকে ২ ইউনিটের এবং ১৭টি ৩ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ পায়।

পঞ্চাশ বছরপূর্তি উপলক্ষে একাডেমি ২০০৫ সালে ৫৪টি নতুন বই প্রকাশ করে। সেমিনারের বিষয়ে পঞ্চাশ বছরপূর্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। আলোচনা অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাডেমি পঞ্চাশ বছরে কী কী সাফল্য অর্জন করেছে এবং একাডেমির ব্যর্থতা কোথায় তা মূল্যায়নের চেষ্টা করা হয়। একুশের আলোচনায় একাডেমির ওপর কয়েকটি প্রবন্ধ পঠিত হয়। এগুলো হলো : ‘বাংলা একাডেমির পঞ্চাশ বছর : পরিভাষা, কোষগ্রন্থ ও রচনাবলি প্রণয়নে বাংলা একাডেমির ভূমিকা’ (স্বরোচিষ সরকার), ‘বাংলা একাডেমির পঞ্চাশ বছর : অভিধান প্রণয়নে বাংলা একাডেমির ভূমিকা’ (আহমদ কবির), ‘বাংলা একাডেমির পঞ্চাশ বছর : উচ্চ শিক্ষা বিস্তারে বাংলায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন’ (সুব্রত বড়ুয়া), ‘বাংলা একাডেমির পঞ্চাশ বছর : ফোকলোর চর্চায় বাংলা একাডেমির ভূমিকা’ (সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ), ‘বাংলা একাডেমির পঞ্চাশ বছর : বাংলা একাডেমি গ্রন্থাগারের ভূমিকা’ (শাহিদা খাতুন) এবং ‘বাংলা একাডেমির পঞ্চাশ বছর : বাংলা ভাষা-সাহিত্য গবেষণায় বাংলা একাডেমির ভূমিকা’ (আবুল আহসান চৌধুরী)।

মেলার শুরুতে অগোছালো পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা হয়। পানি না-ছিটানোতে ধূলার উপদ্রব নিয়ে পাঠক-প্রকাশকেরা বিরক্তি প্রকাশ করেন। ২০০৫ সালের বইমেলার সময় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত ছিলো। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া ২৭শে জানুয়ারি আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারান। বিরোধী দলের ডাকে ঢাকায় ও সারাদেশে হরতাল, বিক্ষোভ-সহ আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়। এ-অবস্থায় বইমেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়। সরকার বইমেলার প্রবেশ পথে পুলিশের সঙ্গে র‍্যাবও মোতায়েন করে। পুলিশের তল্লাশির মুখে মেলায় প্রবেশ করতে দর্শক-ক্রেতাদের বিলম্ব হয়। এসব নিয়ে সংবাদপত্রে বিরূপ প্রতিবেদন ছাপা হয়। ‘মেলার নিরাপত্তায় র‍্যাব মোতায়েন’, ‘কঠোর নিরাপত্তা : লাইনে দাঁড়িয়ে মেলায় প্রবেশ’, ‘বিক্রি বেড়েছে : নিরাপত্তায় কড়াকড়িতে লেখক প্রকাশকদের ক্ষোভ’ ইত্যাদি শিরোনামের সংবাদে বইমেলায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যেয়ে পাঠক-প্রকাশকেরা কিভাবে বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হন তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। ‘অতিরঞ্জিত নিরাপত্তা ও নিরাপত্তার নামে পুলিশি হয়রানির’ বিরোধিতা করেন প্রকাশকেরা। ১৪ই ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ডিবেটিং সোসাইটির এক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বোমা বিস্ফোরিত হয়। এতে ১২ জন আহত হন। এ-ঘটনার বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় বইমেলায়। পরদিন পত্রিকায় ‘মেলার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে টিএসসির বোমা হামলা’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশিত হয়। নিরাপত্তা দিতে পুলিশের বাড়াবাড়ি রকমের পদক্ষেপ বইমেলার সামগ্রিক পরিবেশে ও দর্শনার্থীদের মনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। মেলায় প্রবেশের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে একজন দর্শক বলেন, ‘পৃথিবীর অনেক মেলায় আমি গিয়েছি, কিন্তু কোন দেশে নিরাপত্তার নামে…অস্ত্র উচিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য দেখিনি। এসব কারণে এবারের মেলায় আমার মনে হয় প্রাণের উচ্ছাস কম।’

২০০৫ সালের বইমেলায় নীতিমালা ভঙ্গের বিষয় নানাভাবে আলোচিত হয়। এই বছর অনেক প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নীতিমালা লঙ্ঘন করে বই বিক্রির অভিযোগ ওঠে। একাডেমি এই বিষয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে। এই টাস্কফোর্স কয়েকদিন মেলা পরিদর্শন করে প্রথমে ২০টি ও পরে ৪০টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এগুলোকে তালিকাবদ্ধ করে। স্বাভাবিকভাবেই এই দাবি উঠেছিলো যে, যেসব প্রতিষ্ঠান নীতিমালা ভঙ্গ করেছে সেগুলোর বিরুদ্ধে একাডেমি কঠোর ব্যবস্থা নিবে। একাডেমির পক্ষ থেকে একাধিকবার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হলেও কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বইমেলার সদস্য সচিব মেলার শেষ দিন কেবল এই আশ্বাস দেন যে, ‘আগামীতে এসব প্রতিষ্ঠান যাতে কোন অবস্থাতেই মেলায় অংশগ্রহণ করতে না পারে সে ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ প্রকাশকদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সরকারের সমর্থনধন্য সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর প্রভাবে বাংলা একাডেমি নীতিমালা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে দ্বিধান্বিত অবস্থান নেয়। একাডেমির এই দ্বিধাগ্রস্থ অবস্থান সমালোচিত হয়। এসব কারণে ‘একুশের গৌরবময় ঐতিহ্যমাখা বইমেলা পাচ্ছে রাজনৈতিক চরিত্র’ বলে নিন্দাবাক্য উচ্চারিত হয়। এই বছরের বইমেলায় প্রকাশকদের পক্ষ থেকে ‘বই চুরি ও জাল টাকার ছড়াছড়ি’-র অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ‘চুরি নিত্যনৈমিত্যিক বিষয়’ এবং ‘একটি সংঘবদ্ধ দল মেলার বিভিন্ন স্টলে জাল টাকার বই কিনে সরে পড়ে’ বলেও মন্তব্য করা হয়।

ফেব্রুয়ারি মাসে একাডেমি যে সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণা করে তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। দেশের ৩২ জন প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিক-লেখক এক বিবৃতিতে একাডেমির সাহিত্য পুরস্কার দলীয়করণের প্রতিবাদ করেন। প্রতিবাদকারীদের মধ্যে ছিলেন হাবীবুল্লাহ সিরাজী, নাসরীন জাহান, মুহাম্মদ সামাদ, আসলাম সানী প্রমুখ। বাংলা একাডেমির ‘স্বেচ্ছাচারিতার’ প্রতিবাদ করেন কবি শামসুর রাহমান। তিনি একাডেমিতে নিরাপত্তার নামে পুলিশের বাড়াবাড়ির প্রতিবাদে একাডেমিতে না-যেয়ে নিজ বাসায় ৫টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন।

প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার বছরপূর্তিতে একাডেমি কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করেনি। যদিও মেলায় প্রতিবাদী লেখক-প্রকাশক-পাঠকদের পক্ষ থেকে বইমেলা প্রাঙ্গণে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। একাডেমির তথ্যকেন্দ্রের সামনে সমাবেশ ও মানববন্ধন হয়। এখান থেকে হুমায়ুন আজাদ হত্যা প্রচেষ্টার নিন্দা জানানো হয়। একাডেমি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে কঠোর সমালোচনার সম্মুখীন হয়। ‘হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলার বার্ষিকীতে বাংলা একাডেমীর কর্মসূচি নেই’ শিরোনামে সংবাদপত্রে রিপোর্ট ছাপা হয়।

‘বই বিক্রি না হওয়ায় প্রকাশকেরা বিপাকে’ পড়লেও ২০০৫ সালে বিক্রির শীর্ষে ছিলো হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস লীলাবতী। সমগ্র মেলায় বাংলা একাডেমি-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ১৩০০টি নতুন বই বের হয়। বাংলা একাডেমি ৩২, ৩১ ৬৮৮.০০ টাকার বই বিক্রি করে। আগের বছর একাডেমি ৪০ লক্ষ টাকার বই বিক্রি করেছিলো।

টীকা:
১.দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, ১৬ই ফেব্রুয়ারি ২০০৫, পৃ. ১২
২. দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, ১০ই ফেব্রুয়ারি ২০০৫, পৃ. ১১
৩.দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, ১লা মার্চ ২০০৫, পৃ. ২
৪.প্রিয়ঙ্কর সেন, ‘বাংলা একাডেমী ও একুশের বইমেলা : ঐতিহ্য ও বেদনা’, একুশে সংখ্যা, দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, ২১শে ফেব্রুয়ারি ২০০৫, পৃ. ৬
৫. দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, ২০ই ফেব্রুয়ারি ২০০৫, পৃ. ১২
৬.দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, ২৫শে ফেব্রুয়ারি ২০০৫, পৃ. ১১
৭.দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, ২৬শে ফেব্রুয়ারি ২০০৫, পৃ. ১১
৮.দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, ২৩শে ফেব্রুয়ারি ২০০৫, পৃ. ১২
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.