আর্টস

ভাল বই একটি নাগরিক সমাজ গঠনে সাহায্য করে

বিপাশা চক্রবর্তী | 22 Feb , 2019  


১৭৮০ সালে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস’এর একজন–যিনি তার দেশপ্রেমের জন্য ছিলেন পরিচিত–জন অ্যাডামস তার স্ত্রী আব্যাগেইলকে লিখেছিলেন, আমেরিকান সংস্কৃতির বিকাশ / বিবর্তন কিভাবে হতে পারে সে সম্পর্কে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির কথা। তিনি বলেন, “আমার রাজনীতি এবং যুদ্ধ নিয়ে পড়া উচিত,” তিনি ভবিষ্যতের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, “ যাতে করে আমাদের সন্তানেরা গণিত ও দর্শনে অধ্যয়ন করার স্বাধীনতা পেতে পারে”। তারা তাদের পড়াশোনায় অন্তর্ভুক্ত করবে ভূগোল, নেভিগেশান, বাণিজ্য, এবং কৃষি, । তিনি আরোও বলেছিলেন, যাতে তাদের সন্তানরা ‘চিত্রকলা, কবিতা, সঙ্গীত, অধ্যয়ন করার অধিকার উপভোগ করতে পারে”।

অ্যাডামের সাহসী ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, আমেরিকা সাহিত্য, শিল্প, সঙ্গীত, নাচ, মঞ্চ এবং চলচিত্রে আন্তর্জাতিকভাবে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল।
কিন্তু বিগত সিকি শতক থেকে শিল্পজগতে এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। যখন মানুষের আয় একটি অপ্রত্যাশিত মাত্রায় গিয়ে ঠেকে, তখন কলেজের উপস্থিতির হার বেড়ে যায়। সেই সাথে তথ্য পাওয়ার অধিকারও অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পায়। ফলে আমেরিকার যুব সমাজ যাদের একসময় শিল্প-সাহিত্যে আগ্রহ ছিল তাদের সেই আগ্রহে ভাটা পড়ে।
শিল্পসাহিত্যে জনগণের অংশগ্রহণ সম্পর্কে ২০০২ সালে এক জড়িপে দেখা গেছে, শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ নয়টি ক্ষেত্রের মধ্যে আটটির প্রতি আমেরিকানদের আগ্রহ হ্রাস পেয়েছে। শুধুমাত্র ব্যতিক্রম ‘জ্যাজ সঙ্গীত’। এখানে সাম্যান্য কিছুটা বেড়েছে। জড়িপে দেখা যায়, ১৮-২৪ বছর বয়সী তরুণদের শিল্প সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ সবচেয়ে বেশি কমেছে। ২০০২ সালে আমেরিকার পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত এই জড়িপে আরোও দেখা যায়, তাহলো মার্কিন তরুণ সমাজের মধ্যে সাহিত্য পাঠের হার উদ্বেগজনক হারে হ্রাস পেয়েছে।

তারা সাহিত্যরসের আনন্দ এবং চ্যালেঞ্জগুলি উপেক্ষা করে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক ও আবেগীয় বিকাশের পথকে বাধাগ্রস্ত করছে। এটা যদি সত্য হয় যে তারা সাহিত্যের বিকল্প হিসেবে ইতিহাস,জীবনী বা রাজনৈতিক কর্মকান্ডকে প্রতিস্থাপিত করেছে তাহলে চিন্তার বিষয় ছিলো না। কিন্তু তারা তো কোন ধরণের বই-ই পড়ছে না।
আমেরিকার দীর্ঘস্থায়ী এবং মৌলিক সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকলাপের দ্রুতই পতন হবে বিশেষ করে যুব সমাজের মধ্যে। তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সমসাময়িক জীবনযাপনই মূখ্য। ‘ট্রেন্ড’ এর প্রতি তাদের মনোযোগ। আর্টস এন্ডোভমেন্ট’এর জরিপে পাঠাভ্যাসের উপর আলাদা একটি প্রতিবেদনে যুব সমাজের এই প্রবণতার প্রতি আকর্ষণের কথা বলা হয়। সেই পৃথক রিপোর্টির শিরোনাম ছিল, ”Reading at Risk: A Survey of Literary Reading in America.”
কম পাঠাভ্যাসের প্রভাব সাহিত্য ছাড়িয়ে অন্য জায়গায়ও পরেছে । ব্যবসায়িক দুনিয়ায় বেশি পাঠাভ্যাসের ভিন্ন এক তাৎপর্য রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, আমেরিকার Wired magazine একটি সংখ্যায় একুশ শতকে মানুষের সঠিক মানসিক দক্ষতা ও অভ্যাসের একটি রূপরেখা দাড় করিয়েছিল। সেখানে দেখানো হয়েছিল সাহিত্যে বর্ণিত চরিত্রগুলো স্বাভাবিকভাবে সহজ সরল হয়, তারা যৌক্তিক হয় না, অগোছালো হয়। সেখানে লেখক ড্যানিয়েল পিঙ্ক-এর একটি বক্তব্য ছিলো, তাঁর মতে, “বরং একটি পাঠকপ্রিয় সন্তোষজনক গল্পের উৎকৃষ্ট বর্ণনা সৃষ্টির জন্য তার গঠনের ধারা বা দরকারি ছাঁচ ও এর সুবিধাগুলো খুঁজে বের করতে হয়, এর জন্য একজনের শৈল্পিক ও আবেগীয় সৌন্দর্য তৈরির ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। ব্যবসায়িক নেতাদের যখন জিজ্ঞাসা করা হয়, তারা কোন ধরণের প্রতিভাসম্পন্ন মানুষকে ব্যবস্থাপনা পজিশনে দেখতে চান, তখন তারা সর্বাগ্রে সৃজনশীল, উচ্চমার্গের চিন্তা করতে পারেন এমন কাউকেই তারা পছন্দ করেন।

দুর্ভাগ্যজনক, সাহিত্যপাঠ চর্চার অভাবে পড়াশোনার মূল্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মদক্ষতা হ্রাস পাচ্ছে। এখন কর্মস্থলে পাঠাভ্যাস না থাকার প্রভাব ব্যাপকভাবে উপলব্ধি হচ্ছে। ২০০১ সালে আমেরিকার ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ম্যানুফ্যাকচারার্স কর্মীদের দক্ষতার ত্রুটি সম্পর্কে জানার জন্য একটি জরিপের ব্যবস্থা করেছিল। তাতে দেখা যায় যারা ঘন্টা হিসেবে কাজ করছে তাদের পড়ার দক্ষতা দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। তাদের মধ্য ৩৮ শতাংশ কর্মী বলেছে, স্থানীয় স্কুলগুলি পড়া বোঝা পাঠ উপলব্ধি বিষয়ে অপর্যাপ্ত শিক্ষা দিয়েছে।
কর্পোরেট আমেরিকাও লেখা এবং পড়ার ক্ষেত্রে প্রায় একই ধরণের অভিযোগ করেছে। কলেজ বোর্ড জানিয়েছে যে, কর্পোরেশনগুলি কর্মচারীদের লেখার দুর্বলতা দূর করার জন্য প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ করে। তারা আরো জানান, সাম্প্রতিক কালে কলেজ গ্র্যাজুয়েটদের লেখার মান খুবই অসন্তোজনক। যদি একুশ শতকের আমেরিকার অর্থনীতির উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার প্রয়োজন পড়ে, তাহলে অবশ্যই দৃঢ় পাঠ দক্ষতা ও কল্পনাশক্তি বৃদ্ধির প্রকল্প প্রণয়ন করতে হবে। অবশ্যই তার কেন্দ্রীয় উপদান হবে সাহিত্য পাঠ।

নাগরিক পরিমন্ডলেও পাঠভ্যাসের অবনতি দেখা যায়। ২০০০ সালে আমেরিকার শীর্ষ ৫৫টি কলেজের সিনিয়র শিক্ষার্থীদের উপর ‘রপার অর্গানাইজেশন’ একটি জরিপ চালায়, সেখানে দেখা যায় যে, ৮১ ভাগ শিক্ষার্থী হাইস্কুল লেভেলের ইতিহাস পরীক্ষায় সি গ্রেডও পায়নি। ২০০৩ সালে ন্যাশনাল কনফারেন্স অব স্টেট লেজিসলেচারস ১৫ থেকে ২৬ বছর বয়সীদের উপর একটি গবেষণা পরিচালনা করে, তারা সেখানে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, তরুণরা নাগরিকত্বের আদর্শগুলিই বুঝতে পারে না। আর গণতন্ত্রের প্রতি তাদের উপলব্ধি ও সমর্থন সীমিত।


যুবসমাজের সাহিত্য পাঠের হার হ্রাসের সাথে সাথে তাদের মধ্যে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক সচেতনতার আবনতির মাত্রাও যে এক হবে এতে সম্ভবত অবাক হবার কিছু নেই। Reading at Risk সেই জরিপের আরেকটি আবিষ্কার ছিল বিস্ময়কর। তাহলো, সাহিত্য পাঠকরা অন্যদের তুলনায় সামাজিক কর্মকাণ্ডে বেশি জড়িত থাকে। যারা একেবারেই কিছু পড়ে না তাদের তুলনায় এই পড়ুয়ারা ২ থেকে ৪ গুন বেশি দাতব্য কাজ, যাদুঘর পরিদর্শন অথবা খেলাধুলার মতো ইভেন্টে অংশ নেয়।
টেলিভিশন, ভিডিও দেখা বা ওয়েবসাইট ঘাটার মতো নিষ্ক্রিয় কাজের চেয়ে পাঠ অভ্যাস একটি নিখাদ সক্রিয় কর্মকাণ্ড। পড়াশোনার জন্য প্রয়োজন অব্যাহত নিবিষ্ট মনোযোগ আর স্মৃতি ও কল্পনা শক্তির সক্রিয় ব্যবহার। সাহিত্য পাঠ আমাদের বিনয়কে সম্প্রসারিত করে যা জীবনকে ভিন্নভাবে বুঝতে সহয়তা করে।

প্রকৃতপক্ষে , কখনও কখনও আমরা আমাদের জাতীয় পরিচয়ের বিবর্তনে সাহিত্য কত বড় ভূমিকা পালন করেছে তা অবমূল্যায়ন করি। বিশেষকরে, ঐ সমস্ত সাহিত্য যা প্রায়ই তরুণদের কাছে সুশীল সমাজ ও শাসনব্যবস্থার অতীত ঘটনাবলীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। যেমনটি প্রাচীন গ্রীকরা প্লেটোর সংলাপের চেয়ে হোমারের মহাকাব্য থেকে বেশি পরিমাণ নৈতিকতা ও রাজনৈতিক আচরণ শিখেছিল। তাইতো মৃত্যুদণ্ড বিরোধী আন্দোলনের উৎসাহ ছিল আংকেল টম’স কেবিন উপন্যাসটি। একইভাবে, আমেরিকার ‘পপুলিজম’ বা লোকরঞ্জনবাদ ধারণাটি এসেছে কোন রাজনৈতিক দলিল থেকে নয় বরং হুইটম্যানের কাব্যিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। আজও আমেরিকার মানুষ যখন ত্রিশের দশকের অর্থনৈতিক মন্দার কথা স্বরণ করে তাদের মনে যে ছবিগুলো ভেসে ওঠে তাহলো জন স্টাইনবেক-এর The Grapes of Wrath এর জোড পরিবারের কাহিনী। সাহিত্যিক উত্তরাধিকার ছাড়া অতীত ইতিহাস নিঃস্ব।

সাহিত্য শিক্ষার সামাজিক সুবিধার উপর মনোনিবেশ করার ক্ষেত্রে আমাদের ব্যক্তিগত প্রভাবকে উপেক্ষা করা উচিত না। প্রতিদিন লেখকরা অসংখ্য চিঠি পান, তারা বলেন, ‘আপনার বইটি আমার জীবনকে বদলে দিয়েছে’। ইতিহাস একের পর এক বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনকে উদঘাটন করে সাহিত্য আকারে পরিবেশন করে। ভিক্টোরিয়ান যুগের বিখ্যাত ব্রিটিশ চিন্তাবিদ জন স্টুয়ার্ট মিল যখন বয়োসন্ধি শেষে বিষণ্ণতায় ভুগছিলেন তখন ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতা তাকে আশা জুগিয়েছিল, তার আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার করেছিল, একে তিনি –“আমার মনের ঔষধ” বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। কয়েক দশক পরে আমেরিকার সমাজবিজ্ঞানী, মানবাধিকার উইলিয়াম বাগার্ত ডু বয়েস সাহিত্যে ভিন্নরকম শক্তিদায়ক এক টনিকের খোঁজ পান। সে সময় মার্কিন মুল্লুকে “জিম ক্রো’র মত বর্ণবাদী আইন বহাল ছিল। সে আইনে শুধু শরীরের ত্বকের রঙয়ের ওপর ভিত্তি করে সাদা ও কালোদের জন্য আলাদা জীবন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল। ফলে কৃষ্ণাঙ্গরা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। ডুবয়েস জিম ক্রো থেকে মুক্ত হয়ে সাম্যের পৃথিবী গড়ার টনিক সাহিত্যে খুঁজে পেয়েছিলেন। ডুবয়েস আমাদের বলেন “ আমি যখন শেক্সপিয়রের সাথে বসে থাকি, তিনি আমার কাছ থেকে সরে যান না। আমি বালজাক আর দ্যুমা’র সাথে বাহুতে বাহু মিলিয়ে চলি, যেখানে হাসিখুশী পুরুষ,অভ্যর্থনা জানানো রমণীগণ সোনার আবরণে ঢাকা হল রুমে ধীরে ধীরে ভেসে চলে”। সাহিত্য হলো শিক্ষা ও সংস্কৃতির অনুঘটক।

ব্যক্তি, সমাজ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাহিত্যের গুরত্ব এতই শক্তিশালী যে তাকে কোনভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। সাহিত্যচর্চার অবনতি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি করে। তাই সরকারী নীতিমালা প্রণয়নে শিল্প-সাহিত্যকে বিবেচনা করার সময় এসেছে। লাইব্রেরী, স্কুল ও সরকারী সংস্থাগুলি মহৎ কাজ করে সত্য। কিন্তু পাঠাঅভ্যাস বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রয়োজন, পাশাপাশি ব্যবসায়ী মহলেরও অবদান রাখতে হবে।
বর্তমানে সাহিত্যকে ইলেকট্রনিক মাধ্যমের সাথে সাঙ্ঘাতিক প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। পাঠচর্চা কমে যাওয়ার জন্য কোন একক ক্রিয়া দায়ী নয়, ক্রমবর্ধমান ও সহজলভ্য ডিজিটাল বিকল্পগুলির উপস্থিতি বেশিরভাগ মানুষকে পাঠ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে। অধ্যয়ন কোন নিরবধি, সার্বজনীন ক্ষমতা নয়। উচ্চতর অধ্যয়ন একটি নির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা ও সামাজিক অভ্যাস যা বহুলাংশে শিক্ষাগত, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উপাদানের উপর নির্ভর করে। বর্তমানে জনগণের বিরাট অংশ এই দক্ষতা হারিয়ে ফেলছে, ফলে তারা কম সচেতন, কম সক্রিয় আর পরিকল্পনাবিহীন জাতি হিসেবে পরিণত হচ্ছে। আর এসব গুন হারিয়ে একটি মুক্ত, উদ্ভাবনী আর উৎপাদনশীল সমাজ গঠন হতে পারে না।
( Boston.com news-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধ অবলম্বনে)

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.