বইমেলা

দ্বাদশ পর্ব : হুমায়ুন আজাদ আক্রান্ত

জালাল ফিরোজ | 14 Feb , 2019  


গ্রন্থমেলা ২০০৪ : মৌলবাদীদের হামলা
২০০৪ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি ঈদুল আজহা থাকায় বইমেলা ১লা ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে ৭ই ফেব্রুয়ারি শুরু হয়। ঈদের আনন্দ ও ঈদের ছুটির পর যে বইমেলার শুরু হয়েছিলো তা ক্ষোভ-প্রতিবাদ-বিষাদের মধ্যে শেষ হয় হয়। ২৭শে ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে ফেরার পথে প্রগতিশীল লেখক হুমায়ুন আজাদ সন্ত্রাসীদের দ্বারা আক্রান্ত হন। সন্ত্রাসীদের ধারালো অস্ত্রের এলোপাথারি কোপে তিনি গুরুতর আহত হন। অমর একুশে বইমেলার ইতিহাসে এর আগে এ-রকম কোনো জঘন্য ঘটনা ঘটেনি। এই ঘটনায় সারাদেশের মুক্তমনা মানুষ স্তম্ভিত হন। বইয়ের পাঠক-লেখক-প্রকাশক তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। এই ক্ষোভ-প্রতিবাদ কেবল ২০০৪ সালের বইমেলা নয়, পরবর্তী বইমেলাগুলোতেও অব্যাহত থাকে। বইমেলায় প্রতি বছর ২৭শে ফেব্রুয়ারি মৌলবাদ-সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালিত হয়।

৭ই ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩-টায় বইমেলা উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী সেলিমা রহমান। স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মনসুর মুসা। বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোদাব্বির হোসেন চৌধুরী ও বাপুপ্রবিস-এর সভাপতি আবু তাহের।

প্রধান অতিথির ভাষণে খালেদা জিয়া বলেন :

আমরা শিক্ষার উপর খুব বেশি বেশি জোর দিচ্ছি। কেননা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে উপলব্ধি করেছি যে, জাতীয় অগ্রগতি ও উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত হচ্ছে ‘শিক্ষা’। আর প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা অপ্রাতিষ্ঠানিক সব ধরনের শিক্ষার প্রধান উপকরণ হচ্ছে বই। সেজন্যই বই লেখা, বই প্রকাশ, বই পড়াকে আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। গুরুত্ব দিচ্ছি পাঠাগার গড়ে তোলার উপর। শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার পথকে রুদ্ধ করার জন্য অতীতে এদেশে অপতৎপরতা কম হয়নি। আমরা সে পর্যায়কে অতিক্রম করে এসেছি।…চলতি বছরকে আমি ‘শিশুসাহিত্য বর্ষ’ হিসাবে গ্রহণ করেছি।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া তাঁর বক্তৃতার মাধ্যমে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মনসুর মুসা প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আর কোনো সরকারপ্রধান এতো অধিকবার একাডেমীর গ্রন্থমেলা উদ্বোধন করার সুযোগ পাননি। আপনার শুভ-আগমন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।’ যাহোক, এবার ৩১২টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ৪৫৭ ইউনিটের স্টল দেওয়া হয়। ১৭৯টি প্রতিষ্ঠান ১ ইউনিটের, ১১৮টি প্রতিষ্ঠানকে ২ ইউনিটের এবং ১৪টি-কে ৩ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ করা হয়।

২০০৪ সালে অমর একুশে গ্রন্থমেলার আলোচনা অনুষ্ঠানের মূল বিষয় ছিলো ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’। বিভিন্ন দিনের আলোচনায় চর্যাপদের পাঠান্তর, মধ্যযুগের যুদ্ধকাব্য, শিশুসাহিত্য, তথ্য-প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা, প্রবন্ধে মুক্তিচিন্তা, ভাষা-আন্দোলনের নানা মাত্রা, প্রমিত বানান, গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিকদের জীবন ইত্যাদি বিষয়ে প্রবন্ধ পঠিত হয়। এই বছরকে সরকারের পক্ষ থেকে ‘শিশুসাহিত্যবর্ষ’ ঘোষণা করা হয়। বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে গ্রন্থমেলায় শিশুসাহিত্য প্রকাশের ঊপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলা একাডেমি অর্ধ-শতাধিক শিশুবিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশ করে।

ঈদের ছুটির পর শুরু হলে মেলার ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু অভিযোগ ওঠে। ‘দম আটকানো ধূলায় অতিষ্ঠ’ হন বইপ্রেমিকেরা। নিরাপত্তার নামে পুলিশি হয়রানির শিকার হন অনেকে। মাঝে কয়েকদিন খারাপ গেলেও ২১শে ফেব্রুয়ারিতে মেলায় প্রচুর লোকের সমাগম ঘটে। তবে এইদিন মানুষ বিড়ম্বনায়ও পড়েন। প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে পুলিশের নিস্ক্রিয়তা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেন। একটি প্রতিবেদনে বলা হয় :

সকাল থেকেই…জনতার ঢল নামে বাংলা একাডেমী চত্বরের একুশের বইমেলায়। দুপুরের পর উপচেপড়া ভিড়ে মেলা প্রাঙ্গণে মানবজটের সৃষ্টি হয়। প্রতিটি স্টলের সামনেই বইপ্রেমীদের ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ করা যায়।

মেলার সামনের রাস্তা অসংখ্য দোকানপাটসহ হকারদের দখলে চলে যাওয়ায় মানবজট আরও বেড়ে যায়। ফলে আগতদের মেলায় প্রবেশে প্রচণ্ড কষ্ট স্বীকার করতে হয়। এছাড়া মেলার গেটে শৃংখলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশকেও নিস্ক্রিয় হয়ে পড়তে দেখা যায় তখন। যার ফলে গেটে সৃষ্টি হয় এক অব্যবস্থাপনার।…আগতদের প্রতি একশ্রেণীর মানুষের অশালীন ব্যবহার, মেলার মধ্যে অনেক ভ্রাম্যমান দোকান, টয়লেট ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত এবং সম্পূর্ণ নোংরা, পানি ছিটানোর কারণে কিছু কিছু স্থানে কাদা হয়ে যাওয়া, অনেক বাচ্চা হারিয়ে যাওয়াসহ নানা অভিযোগ। মেলা প্রাঙ্গণের সর্বত্রই ধাক্কাধাক্কি, ঠেলাঠেলাইর ঘটনা চোখে পড়েছে। এসব অব্যবস্থাপনা নিয়ে মেলা আয়োজক কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাকে জানানো হলে তিনি বিষয়টিকে সাধারণভাবে নেন। ‘একুশের দিনে এমনই হয়’ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

২১শে ফেব্রুয়ারি প্রচণ্ড ভিড়ের দিনের মেলা সম্পর্কে এসব অভিযোগ সত্ত্বেও পরের দিনগুলোতে মেলা জমে ওঠে। সংবাদপত্রসমূহে বইমেলা নিয়ে নানা ইতিবাচক মন্তব্য ও প্রতিবেদন ছাপা হতে থাকে। ‘শিশু কর্নারে ছিল বেজায় ভিড়’, ‘বিচিত্র বিষয়ের নতুন বই, উপন্যাসই শীর্ষে’, ‘নতুন বই, মোড়ক উন্মোচন, হাতে হাতে বইয়ের প্যাকেট’, ‘পরিপাটি পরিবেশে বিক্রিও ভালো’ ইত্যাদি শিরোনামে বিভিন্ন দিনের মেলা নিয়ে সংবাদপত্রে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এভাবে বইমেলা যখন সমাপনীর দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো তখন ২৭শে ফেব্রুয়ারি রাতে প্রগতিবাদী লেখক হুমায়ুন আজাদ মৌলবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত হন। ২৮শে ফেব্রুয়ারির পত্রিকায় এই ঘটনার খবর প্রকাশের পর সারাদেশে বিশেষ করে বাংলা একাডেমির সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, প্রকাশক-লেখক-পাঠকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। ২৮শে ফেব্রুয়ারি গ্রন্থমেলায় বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। কাপুরুষোচিত এই হামলায় সমগ্র জাতি স্তম্ভিত হয়। ২৯শে ফেব্রুয়ারি বইমেলার সমাপনী অনুষ্ঠান ও অঙ্গসজ্জার জন্য পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান স্থগিত রেখে বইমেলা শেষ হয়। হুমায়ুন আজাদের ওপর এই হামলা কেবল তাঁর ওপর হামলা নয়, এটি অমর একুশে বইমেলা, মুক্তবুদ্ধি চর্চা এবং বাংলাদেশের সৃষ্টিশীলতার ওপর হামলা বলে গণ্য হয়। এজন্য বাংলা একাডেমির বইমেলা প্রতিবছর ২৭শে ফেব্রুয়ারিকে মুক্তচিন্তার বিরোধিতাকারী মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দিন হিসেবে স্মরণ করে।

যাহোক, ২৯শে ফেব্রুয়ারি ২০০৪ সালের বইমেলা শেষ হয়। এই বছর ১৫ শ’ নতুন বই প্রকাশিত হয়। সমগ্র মেলায় ২০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়।

(পর্ব ১৩ : বাংলা একাডেমির পঞ্চাশ বছর)

টীকা:
১. আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ (সম্পাদিত), একুশের প্রবন্ধ ২০০৪ ও আলোচনা, বাংলা একাডেমী, ২০০৫, পৃ. ১৭
২. দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০০২, পৃ. ১২

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.