বইমেলা

দশম পর্ব : বইমেলায় প্রযুক্তির ব্যবহার, একুশে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

জালাল ফিরোজ | 11 Feb , 2019  

গ্রন্থমেলা ১৯৯৯ : তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার, সরাসরি সম্প্রচার, ধূমপানমুক্ত
১৯৯৯ সালের গ্রন্থমেলা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয় ৫ই ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায়। মেলা উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি কবি শামসুর রাহমান। বিশেষ অতিথির ভাষণ দেন ড. কবীর চৌধুরী এবং যুব, ক্রিড়া ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। বক্তব্য রাখেন বাপুপ্রবিস-র সহ-সভাপতি হামিদুল ইসলাম। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব আসাদ চৌধুরী। প্রধান অতিথির ভাষণে শেখ হাসিনা বলেন :

বইমেলা বাঙালি সংস্কৃতির একটি বড় অংশ। …বই জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বাহক। বইমেলা আমাদের জনগণের মেধা, প্রজ্ঞা ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করতে সহায়ক হবে। বইয়ের মতো আর কোনো ভাল বন্ধু বা সাথী হতে পারে না। আমাদের জনগণকে শিক্ষিত করে …তুলতে হবে যাতে তারা জাতিগঠনমূলক কর্মকাণ্ডে মূল্যবান অবদান রাখতে পারেন। আমাদের মনে রাখতে হবে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ দারিদ্র ও ক্ষুধায় জর্জরিত, তাই জ্ঞান ও প্রজ্ঞা আহরণসহ আমাদের সকল জাতিগঠন প্রচেষ্টার লক্ষ্য হবে জনগণের ক্ষুধা ও দারিদ্র বিমোচন। …মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ও আদর্শ অনুযায়ী দেশকে গড়ে তুলতে চাই। জাতীয় সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষ্যে নিজেদের মেধা ও প্রজ্ঞা কাজে লাগিয়ে সুযোগের সর্বোত্তম ব্যবহার করতে হবে। আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরোধিতাকারীরা দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। সাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনতা বিরোধী এই শক্তিকে নস্যাৎ করতে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। …শতাব্দীর সবচাইতে ভয়াবহ বন্যার দুর্যোগকাল কার্যকরভাবে শুধু মোকাবেলাই করা হয়নি, বরং ৪২ লক্ষ ভি. জি. এফ. কার্ড প্রদানের মাধ্যমে চার কোটিরও বেশি লোককে খাওয়ানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে। …দুই হাজার ছয় সাল কিংবা দুই হাজার পাঁচ সালের মধ্যে এদেশকে নিরক্ষরমুক্ত করা যাবে।

এবারই প্রথম গ্রন্থমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার সরাসরি সম্প্রচার করে। এর ফলে এই দেশের কোটি কোটিব মানুষ বাসায় বসে দেখতে পারেন।

এই বছর ২০৩টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নেয়। ৩১৩টি ইউনিট স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়। তিন ইউনিটের ১০টি, দুই ইউনিটের ৯০টি, এক ইউনিটের ১০৩টি স্টল ছিল। এবার ‘ বাংলা সাহিত্য : বিশ শতকের অর্জন’ এই বিষয়কে মূল থিম রেখে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা ও সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ২১শে ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টায় অমর একুশে বক্তৃতা প্রদান করেন অধ্যাপক মযহারুল ইসলাম।

এবারের মেলায় প্রথম বেশি পরিমাণে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার হয়। বাংলা একাডেমি মেলা নিয়ে একটি ওয়েবসাইট খোলে। মেলা সম্পর্কিত তথ্যের জন্য অনেকে এই ওয়েবসাইট ব্যবহার করেন। করোনা ইন্টারন্যশনাল টেকনলজি লি. নামে একটি প্রতিষ্ঠান এ-ক্ষেত্রে বিনা পয়সায় একাডেমিকে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করে। ২৭শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৫ হাজার লোক একাডেমির ওয়েবসাইট ব্রাউজ করেন। এতো সংখ্যক মানুষের ওয়েবসাইট ব্যবহার অনেককে আশাবাদী করে। বাংলা একাডেমি ও বইমেলার প্রতি মানুষের এই ব্যাপক আগ্রহকে অনলাইনে একাডেমির বই বিক্রি ও বিদেশ থেকে বইয়ের অর্ডার পাওয়ার সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

১৯৯৯ সালের বইমেলা প্রথমদিকে বিপুল সাড়া জাগায়। ২১শে ফেব্রুয়ারি লাখ লাখ মানুষ বইমেলায় আসেন। এটিকে ‘তিল ঠাঁই নাহিরে’ অবস্থা বলে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু শেষের দিকে রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি, ঘন ঘন হরতাল বইমেলাকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। প্রকাশকদের পক্ষ থেকে মেলার সময় বাড়ানোর দাবি ওঠে। এ-বছর আবার ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় বাণিজ্য মেলা আয়োজিত হয়। প্রকাশকরা মেলাকে ‘মন্দের ভালো’, ‘উৎরে যাওয়ার মতো’, ‘ভালোই হয়েছে’ বললেও এবার ৪ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়। ১ হাজার নতুন বই প্রকাশিত হয়। মানসম্মত বই ছিলো ২০০ থেকে ২৫০টি। হরতাল ও বাণিজ্য মেলার কারণে বইমেলার ক্ষতি হয়েছে, এই দাবির কারণে বইমেলা ১০ই মার্চ পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। সময় বাড়লেও ‘বইমেলা শেষদিকে এসে প্রায় দর্শকশূন্য হয়ে পড়ে। শেষদিকে এসে বই বিক্রিও কমে যায়।’ ১০ই মার্চ বইমেলার সমাপনী অনুষ্ঠান হয়।

গ্রন্থমেলা ২০০০ : একুশে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক স্বীকৃত, বিশ শতকের বাংলাদেশ
২০০০ সালের বইমেলা একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কো অমর একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। একুশে ফেব্রুয়ারির এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেশের মানুষ এবং বাংলা ভাষাভাষী সকলকে আনন্দিত ও গর্বিত করে। এই স্বীকৃতি পাওয়ার পর প্রথম অনুষ্ঠিত বইমেলায় মানুষের উদ্বেলিত অনুভূতির প্রকাশ ঘটে। একই সঙ্গে এই বছর নতুন একটি শতকের প্রথম বছর। এই বছরে একুশে উদযাপন করতে গিয়ে গত এক শতকে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষ কী কী অর্জন করেছে, কোথায় তাদের ব্যর্থতা ও কোথায় সফলতা এসব বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া হয়। এজন্য একুশে গ্রন্থমেলার আলোচনা অনুষ্ঠানে ‘বিশ শতকের বাংলাদেশ’-কে মূল থিম হিসেবে গণ্য করে নানা ক্ষেত্রের ওপর প্রবন্ধ পাঠ ও আলোচনার ব্যবস্থা করা হয়।

২০০০ সালের গ্রন্থমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয় ৬ই ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টায়। মেলা উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। বিশেষ অতিথির ভাষণ দেন যুব, ক্রিড়া ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। বক্তব্য রাখেন বাপুপ্রবিস-র অতিরিক্ত মহাসচিব নাসিম আলী চৌধুরী। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব আনিসুর রহমান। প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলে :

বায়ান্নর মহান ভাষা-আন্দোলনের স্মৃতিবাহী ফেব্রুয়ারি মাস বার বার ফিরে আসে আমাদের মাঝে। এ বছর ফিরে এসেছে অন্য রকম তাৎপর্য বহন করে, নতুন মর্যাদায় আসীন হয়ে। আজ অত্যন্ত আনন্দ এবং গৌরবের সঙ্গে বলতে চাই যে আমরা ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি। …শুধু বাংলা ভাষা নয়, বিশ্বের সকল মাতৃভাষার প্রতি সম্মান দেখিয়ে আমরা ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ করতে পেরেছি। পৃথিবীর যেখানে, যে অঞ্চলে যত ছোট ভাষাভাষী থাকুক না কেন তারা মাতৃভাষা নিয়ে আজ সগৌরবে বিশ্বের দিকে তাকাতে পারবে। …পৃথিবীতে প্রায় চার হাজার স্বীকৃত ভাষা আছে। উপভাষা অজস্র। কালের বিবর্তনে অনেক ভাষা হারিয়ে গেছে কিংবা লুপ্ত হয়েছে। আর কোনো ভাষারই যেন এই পরিণতি না হয়, তার জন্য আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রয়োজনীয়তা ছিল অত্যন্ত জরুরি। একুশে ফেব্রুয়ারির এই প্রতিকী অবস্থান প্রতিটি ভাষাকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করায় সহযোগিতা করবে।…আমরা চাই আমাদের বাংলা ভাষাসহ সারা বিশ্বের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর আপন-আপন অসংখ্য মাতৃভাষা স্বমহিমায় বিকশিত হোক। আমরাই তো রক্ত দিয়ে শিখিয়েছি মাতৃভাষাকে কিভাবে ভালবাসতে হয়।

এই বছরের বইমেলায় ২১৫টি প্রতিষ্ঠানকে ৩১৯টি ইউনিট স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। ১ ইউনিটের ১২২টি, ২ ইউনিটের ৭৯টি এবং ৩ ইউনিটের ১৩টি স্টল ছিলো। বাংলা একাডেমি স্টলগুলো থেকে ১০ লক্ষ ৫৯ হাজার ৫ শত টাকা ভাড়া গ্রহণ করে। এই বছর বাংলা একাডেমির বইমেলার বাজেট ছিলো ১৮ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ২০শে ফেব্রুয়ারি বিকেলে একাডেমিতে একটি বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান হয়। এতে প্রথমে বাংলা একাডেমির পরিচালক সেলিনা হোসেন ‘ভাষা আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন। পরে চীন, জাপান, ইরান, ফ্রান্স, জার্মানি ও রাশিয়ার প্রতিনিধিরা নিজ নিজ ভাষা সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন। প্রত্যেকে বাংলা ভাষায় তাঁর বক্তব্য রাখেন। বিদেশিদের মুখে বাংলা ভাষায় বক্তব্য শুনে দর্শক-শ্রোতারা অভিভূত হন। অনুষ্ঠানে বাংলা সাহিত্য পুরস্কার ১৯৯৯ প্রাপ্ত লেখকের নাম ঘোষণা করা হয়। পুরস্কার পান নাসরীন জাহান। ২১শে ফেব্রুয়ারি সকালে একাডেমির মূল মঞ্চে ১৩৩ জন কবি স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন। অনুষ্ঠানে কলকাতা থেকে আগত কয়েকজন কবিও অংশ নেন। সকাল ৮টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত এই অনুষ্ঠান চলে।

প্রতি বছরই বইমেলার বিভিন্ন স্টলে শিশুদের জন্য বিক্রির ব্যবস্থা রাখা হয়। কিন্তু ২০০০ সালে বইমেলা প্রাঙ্গণে শিশুদের জন্য আলাদা একটি প্রাঙ্গণ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই প্রাঙ্গণে শিশুদের বই প্রকাশ করে এমন সব প্রতিষ্ঠানকে স্টল দেওয়া হয়। শিশুদের জন্য নির্ধারিত এই প্রাঙ্গণের নাম দেওয়া হয় ‘শিশু মেলা’। শিশু মেলা বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। শিশুদের ও তাদের অভিভাবকদের পক্ষে এখান থেকে স্বাছ্যন্দে তাদের পছন্দের বই দেখা ও কেনা সহজ হয়। এই ‘শিশু মেলা’ পরে ‘শিশু চত্বর’ নামে একুশে গ্রন্থমেলার স্থায়ী ও প্রিয় অংশ হিসেবে সমাদৃত হয়। ২০০০ সালে বইমেলা ধূমপান ও পলিথিন মুক্ত ছিলো।

বইমেলা শেষ হয় ২৯শে ফেব্রুয়ারি। এদিন সমাপনী অনুষ্ঠানের সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘বইমেলায়…প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা বেড়েছে, বই পড়ার দিকে পাঠপকের আগ্রহ বেড়েছে,…বইয়ের সংখ্যা বেড়েছে এটা আনন্দের কথা। মেলায় আগে আগে বই বের করতে গিয়ে প্রকাশকেরা হয়তো নির্ভুল বই বের করতে পারেননি। বইমেলায় তবে লেখকেরা সারা বছরে রচিত শ্রেষ্ঠ ফসলটি উপহার দেন। এবার বইমেলায় অনেক মহিলা তাদের শিশু সন্তানদের সঙ্গে করে এনেছেন, এর প্রভাব শিশু মনে সারাজীবন থাকবে।’

গ্রন্থমেলা ২০০১ : একুশ শতকে বইমেলা
২০০১ সালের গ্রন্থমেলা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয় ২রা ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩-১৫টায়। মেলা উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। বিশেষ অতিথির ভাষণ দেন যুব, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও প্রবীণ সাংবাদিক ওবায়েদ-উল হক। স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি মফিদুল হক ও বাপুপ্রবিস-র মহাসচিব মো. আব্দুর রাজ্জাক। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব আনিসুর রহমান। প্রধান অতিথির ভাষণে শেখ হাসিনা বলেন,

প্রতি বছরের মতো বাংলা একাডেমী এবারও ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০০১’-এর আয়োজন করেছে। বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার এই ঐতিহ্যবাহী মিলনমেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তাই প্রাণের টানে উপস্থিত হয়েছি। অমর একুশের গ্রন্থমেলার উদ্বোধন করার সুযোগ পাওয়া আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের বিষয়। …আমাকে যখন ভাষণ দেবার জন্য আহ্বান জানানো হলো এবং পরিচয় করে দেওয়া হলো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তখন মনে হয় সরকার-প্রধান বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যেন একটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়। কিন্তু আমি তো এই জায়গারই অত্যন্ত আপনজন, অত্যন্ত কাছের। যদিও এটা ঠিক যে প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই হয়তো এই উদ্বোধন করার সুযোগ আমি পাচ্ছি। জনগণের ভোটে আমি নির্বাচিত। তারপরেও পরিচয়ের দিক থেকে এই বাংলা একাডেমীর আমিও একজন। …আপনারা জানেন গত বছরে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমি ঘোষণা করেছিলাম বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশসহ বিশ্বের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষাগুলির চর্চা ও গবেষণার জন্য বাংলাদেশে একটি মাতৃভাষা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। ইনশাল্লাহ আমরা এই গবেষণা কেন্দ্র অচিরেই বাস্তবায়ন করবো। বাস্তবায়িতব্য এই গবেষণা কেন্দ্রে বিশ্বের সকল মাতৃভাষার নমুনা আমরা সংগ্রহ করবো। …বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিধন্য বাংলা একাডেমী আমাদের প্রাণপ্রিয় জাতীয় প্রতিষ্ঠান। বিগত পঁচিশ বছর ধরে বাংলা একাডেমী অমর একুশে গ্রন্থমেলার আয়োজন করে আসছে। এই বইমেলা এখন আমাদের সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের এক অপরিহার্য অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। একুশে বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত হচ্ছে নতুন নতুন বই। লেখক, পাঠক, বিক্রেতা ও দর্শকের সম্মিলিত প্রয়াসে বইমেলা আমাদের আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

২০০১ সালে ২৩৭টি প্রতিষ্ঠানকে ৩৩৭টি ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। একাডেমিতে লিটলম্যাগ প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্টল দেওয়া হয়। এবার মেলায় লেখককুঞ্জ ছিলো। বইমেলা সম্পর্কে একাডেমির নিজস্ব ওয়েবসাইট ছিলো। মাসব্যাপি অনুষ্টিত আলোচনা সভার মূল থিম ছিল ‘একুশ শতকের দাবি ও সম্ভাবনা’। এই মূল থিম রেখে ‘বাংলা ভাষার ব্যবহার’, ‘বিশ্বায়নের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সমাজ’, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সংকট’, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ’, ‘বাংলাদেশের কবিতার রূপ ও রূপান্তর’, ‘বাংলাদেশের উপন্যাস ও বিশ্বসাহিত্যের আন্তঃক্রিয়া’, ‘বাংলাদেশের ছোটগল্প ও বিশ্বসাহিত্যের আন্তঃক্রিয়া’, ‘বাংলাদেশের নাটক সংকট ও উত্তরণ’, ‘বাংলাদেশের অনুবাদ সাহিত্য : সমস্যা ও উত্তরণ’, ‘বাংলাদেশের লোক সাহিত্য’, ‘তথ্য প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’, ‘বাংলাদেশের গবেষণা সাহিত্য’, ‘সাহিত্যতত্ত্ব ও বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিত’ ইত্যাদি বিষয়ে প্রবন্ধপাঠ ও আলোচনা হয়।

২০০১ সালে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত ছিলো। ফেব্রুয়ারি মাসের ২৮ দিনের মধ্যে ৮ দিন বিরোধী দল হরতালের ডাক দেয়। মেলার প্রধান সমস্যা ছিলো ধুলো। ধুলোর কারণে পাঠক-ক্রেতাদের দুর্ভোগ সইতে হয়। তবু মেলায় প্রচুর মানুষ আসেন, অসংখ্য বই বিক্রি হয়। সংবাদপত্রে ‘বইমেলা এখন জমজমাট’, ‘বইমেলায় প্রতিদিনই জমজমাট ভিড়’ ইত্যাদি শিরোনামে সংবাদ পরিবেশিত হয়।
(একাদশ পর্বে দেখুন: বিতর্ক-প্রতিবাদ, অনুজ্জ্বল বইমেলা)

টীকা:
১.দেখুন, দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, ২৮শে ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯, পৃ. ৮
২.দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, ২৩শে ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯, পৃ. ১২
৩.দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, ১১ই মার্চ ১৯৯৯, পৃ. ৮
৪.একুশের স্মারকগ্রন্থ ২০০০, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ২০০০, পৃ. ২১১
৫.পূর্বোক্ত
৬.কাজী আদর, ‘শেখালে না সখী মোরে ভালোবাসা কি‘, দৈনিক মানবজমিন, ২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০০১, পৃ. ৮
৭.দেখুন, দৈনিক মানবজমিন, ৫ ও ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০০১

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.