বইমেলা

অষ্টম পর্ব : অভাবনীয় বিস্তৃতি, বারোয়ারি মেলা

জালাল ফিরোজ | 8 Feb , 2019  


গ্রন্থমেলা ১৯৯৩ : আরও বিস্তৃত, টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর
মহাপরিচালক মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদের চিন্তা এবং পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিবের যুক্তিজালের ফল হিসেবে বইমেলা ১৯৯৩ সালে একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে রাস্তায় বিস্তৃত হয়। এই বছর গ্রন্থমেলা উদ্বোধন হয় ১লা ফেব্রুয়ারি। আগের বছর সরকারের প্রধানমন্ত্রী মেলা উদ্বোধন করলেও এবার মেলা উদ্বোধন করেন বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ। অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সদস্য-সচিব মুহম্মদ নুরুল হুদা। প্রধান অতিথির ভাষণে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন,

আমরা যখন কোন সমস্যার সম্মুখীন হই তখনই আমরা একুশের শহীদ মিনারের কাছে যাই। বাহান্নর ২১শে ফেব্রুয়ারিতে যে বিরাট আন্দোলন শুরু হয়েছিল সে আন্দোলনের ক্রমবিকাশের ফলস্বরূপ একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। এখন আমাদের দেশে ভাষা সম্পর্কে তেমন কোন সমস্যা নেই। এমন এক সময় ছিল যখন এ নিয়ে মানুষকে নানাভাবে দুঃখ-যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। জাতীয় জীবনে বা জাতীয় শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলা ভাষা কি স্থান অধিকার করবে সে সম্পর্কে অবশ্য এখনো আলোচনা চলছে। উচ্চ শিক্ষার মাধ্যম কি হবে সে ব্যাপারেও নানা প্রশ্ন উঠেছে।

তিনি বলেন :
বাংলাদেশে যে শিক্ষিতের হার তাতে সম্ভব নয় সার্বক্ষণিকভাবে লেখাকে পেশা হিসেবে ধরে রাখা। সুতরাং বাংলা একাডেমী, লেখক, প্রকাশক সকলকে চিন্তা করে দেখতে হবে যে আমরা কিভাবে দেশে সাধারণ সাক্ষরতা বাড়াতে পারি। সকলের কাছে অ আ ক খ পৌঁছে দিতে পারি।

১৯৯২ সালে গ্রন্থমেলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে সামনের রাস্তায় বিস্তৃত হয়েছিল। ১৯৯৩ সালে এই বিস্তৃতি আরও প্রসারিত হয়। মেলা দোয়েল চত্বর থেকে টিএসসি পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। সদস্য-সচিবের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, এই বছর ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠানকে ৪৮৪টি স্টল বরাদ্দ দেয়াছিল। কিন্তু অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা থেকে দেখা যায়, প্রকৃত পক্ষে ৩৪৬টি প্রতিষ্ঠানকে স্টল দেয়া হয়েছিল। এবারের স্টল বরাদ্দের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বই প্রকাশনা ও বিক্রয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নেই, এমন অনেক প্রতিষ্ঠানকে স্টল দেওয়া হয়। মোট ৩৪৬ প্রতিষ্ঠানের ১৩২টি রাস্তায় স্টল পায় এবং এসব প্রতিষ্ঠান বই নয়, অন্য নানা জিনিস বিক্রির আয়োজন করে। অদ্ভুত সব নাম নিয়ে নানা ধরনের দ্রব্য রাস্তার স্টলগুলোতে বিক্রি হয়। কেবল অদ্ভুত নয়, কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম শ্লীলতার চৌহদ্দীও অতিক্রম করে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল এ-রকম : ‘প্রাণেশ্বরী মাচান’, ‘হাকুল্লা (বিদিশার দিশা)’, ‘ইস’, ‘খাবিনা ক্যান খা’, ‘হৃদয়ে রাজ্য’, ‘লাভ ৯৩ (আয় মন প্যাচ খাই)’, ‘স্বদেশ (গ্যাঞ্জাম)’, ‘ইম্পেরিয়াল ফ্যামিলি’, ‘সংসার’, ‘জে এস পুস্পবিতান’, ‘অপ্সরী’, ‘বেত্রালয়’, ‘প্রাঙ্গণে মোর’, ‘আমার কেবলই সমর্পণ’।

গ্রন্থমেলা ১৯৯৪ : অভাবনীয় বিস্তৃতি
১৯৯৪ সালের গ্রন্থমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয় ১লা ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায়। উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়া ১৯৯২ সালেও গ্রন্থমেলার উদ্বোধন করেছিলেন। কিন্তু সেই বছর থেকে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনীর ধারা শুরু হয়নি। কারণ ১৯৯৩ সালে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান মেলা উদ্বোধন করেন। ১৯৯৪ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক গ্রন্থমেলা উদ্বোধন করার রীতি ব্যতিক্রমহীনভাবে চলে আসছে। শুধু প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে উদ্বোধন নয়, ১৯৯৪ সাল থেকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বক্তা, সভাপতিত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রেও মৌলিক পরিবর্তন আসে। এর আগে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক বা বিশিষ্ট কোনো বুদ্ধিজীবী বা লেখক গ্রন্থমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করতেন। ১৯৯৪ সাল থেকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী সভাপতিত্ব করা শুরু করেন। এই সময় থেকে একাডেমীর মহাপরিচালকের স্বাগত ভাষণ দেয়ার রীতি চালু হয়। ১৯৯৩ সাল থেকে বাপুপ্রবিস-র কোনো প্রতিনিধিকে গ্রন্থমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে দেখা যায়নি। যাহোক, ১৯৯৪ সালে স্বাগত ভাষণ দেন একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বক্তব্য রাখেন গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব মুহম্মদ নুরুল হুদা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক জাহানার বেগম। প্রধান অতিথির ভাষণে খালেদা জিয়া বলেন :

বাংলা একাডেমীর এই গ্রন্থমেলা শুধু এ দেশের নয় এ অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ বইমেলা। দেশের বুদ্ধিজীবী, পাঠক এবং কবি সাহিত্যিকদের এ এক মহামিলন কেন্দ্র। লাখ মানুষ এ মেলায় আসে। বই দেখে, বই কেনে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনায় অংশ নেয়। সব মিলে ভাব আদান-প্রদানের এক অপূর্ব পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এ পরিবেশ আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করছে।…একুশে উপলক্ষে আয়োজিত এই গ্রন্থমেলা একদিকে যেমন আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনকে স্মরণ করিয়ে দেয়, দেশী ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলে, তেমনি দেশে সংস্কৃতির বিকাশেও এটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। নানা মত ও নানা পথের সহুঅবস্থানের মাধ্যমে পরিমতসহিষুতা এবং গণতন্ত্র চর্চার একটি মিলন কেন্দ্র হিসেবে এই গ্রন্থমেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

১৯৯৪ সালের গ্রন্থমেলা একাডেমি প্রাঙ্গণের বাইরে টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত সম্প্রসারিত তো হয়-ই, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ও স্টলের সংখ্যাও অনেক বৃদ্ধি পায়। সদস্য-সচিবের ভাষায় এই বছর ‘মেলার ব্যাপকতা অভাবনীয়রূপে বৃদ্ধি’ পায়। প্রকৃত পক্ষেই এই বছরের গ্রন্থমেলার আয়তন, পরিসর ও স্টল সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। ১৯৯৩ সালে যেখানে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ছিল ৩৪৬টি, ১৯৯৪ সালে তা দাঁড়ায় ৬৭৬-এ। আগের বছরের মোট ৪৮৪টি স্টলের জায়গায় এই বছর ৮৪১টি স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়। এই বৃদ্ধিকে ‘মেলায় এদেশের তরূণসমাজ, বিশেষত ছাত্র সম্প্রদায় বিশেষ আগ্রহের সঙ্গে নিজেদেরকে নানাভাবে অন্বিত করে চলেছে’ বলে ব্যাখ্যা করা হলেও আসলে এই ‘ব্যাপকতর বৃদ্ধি’ মেলার গুণগত মান ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। গ্রন্থমেলা যত না বইমেলা তার চেয়ে বেশি ক্যাসেট, হস্তশিল্প, খাবার কিংবা আড্ডার মেলায় পরিণত হয়। গ্রন্থমেলার এই রূপ তীব্রভাবে সমালোচিত হয়। এই বছর বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত অনেক নেতিবাচক মন্তব্য থেকে সমালোচনার তীব্রতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কয়েকটি পত্রিকার মন্তব্য ছিল এ-রকম : ‘অধিক স্টল বরাদ্দ করে বাংলা একাডেমী গোলক ধাঁধার সৃষ্টি করেছে। ফলে ইপ্সিত স্টল খুঁজে পাওয়া কষ্টকর’ (দৈনিক বাংলা, ৩রা ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪)। ‘গ্রন্থমেলার একাডেমী চত্বরের বাইরে সবচেয়ে বেশি বিশৃংখল অবস্থা। সারাক্ষণ ক্যাসেট প্লেয়ারের একঘেঁয়ে প্রতিযোগিতার পরও উৎপাত বেড়েছে খাবার স্টলগুলোর যুবকদের। খাবার স্টলের যুবকদের এভাবে বেপরোয়া টানা হেঁচড়ার কারণে মেলার শৃংখলা লংঘিত হচ্ছে প্রতিদিন। কিন্তু একাডেমী কর্তৃপক্ষ এসব ব্যাপারে মোটেই মনোযোগী নয় বলে মনে হচ্ছে’ (দৈনিক খবর, ৭ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪)। ‘মেলার আয়োজন নিয়ে এবার মেলা সমালোচনা। কেউ কেউ মনে করেন বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ বইমেলা বসানোর বদলে একটা ‘ভুল ভুলাইয়া’ বানিয়েছেন’ (দৈনিক খবর, ৭ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪)। ‘গ্রন্থমেলার বিভিন্ন স্টলের নামকরণের দৈন্য লক্ষণীয়। এতে একুশের চেতনার প্রতি শ্রদ্ধা নেই, বাংলা একাডেমী কিভাবে এসব নাম অনুমোদন করলেন, তাই জিজ্ঞাসা?’ (দৈনিক দিনকাল, ১৬ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪)। ‘ক্রেতাদের দাঁড়াবার জায়গা নেই, বই নেড়েচেরে দেখবার সুযোগ পর্যন্ত নেই’ (সংবাদ, ১৭ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪)। ‘বইমেলার বাইরের স্টলের কারণে উৎকট পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলে অবাঞ্চিত ঘটনাও ঘটেছে। গানের সাথে ধেই ধেই নৃত্যও চোখে পড়েছে কোন কোন স্টলের সামনে। এর ফলে মেলার গাম্ভীর্য ও পবিত্রতা নষ্ট হচ্ছে’ (সংবাদ, ১৭ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪)। ‘ব্যাপারটি এক অর্থে চরম অপরাধের মতো, কিন্তু প্রায় প্রতিদিন ঘটছে বইমেলায় কেউ কিছু বলছে না। এমনকি একাডেমী কর্তৃপক্ষও না। তাহলো বইমেলায় উচ্চস্বরে উর্দু হিন্দি গান বাজানো’ (সংবাদ, ১৭ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪)। ‘ কয়েকজন তরুণকে নিয়মিত গাজার আড্ডা জমাতে দেখা যাচ্ছে রাস্তার ওপরে। (আজকের কাগজ, ১৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪)। ‘সন্ত্রাস টুকটুক করে মেলাকে কোলাকুলি দিচ্ছে’ (বাংলার বাণী, ১৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪)। ‘প্রয়োজনে ঢাকায় একটি সুবিশাল বারোয়ারি মেলার আয়োজন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক করা হোক। কিন্তু বাংলা একাডেমীর বইমেলার চরিত্র বিনষ্ট করে তা কেন করা?’ (ইনকিলাব, ২রা মার্চ ১৯৯৪)। ‘বইমেলা সম্পর্কে একজন প্রকাশকের মন্তব্য হচ্ছে, লেখক সৃষ্টি, পাঠক সৃষ্টির জন্য কোন যত্ন নেই, শুধু মেলার জন্য মেলা হলো এই আর কি?’ (যায় যায় দিন, ১লা মার্চ ১৯৯৪)।

এসব বিরুপ ও নেতিবাচক মন্তব্য যেমন ছিল তেমনই কেউ কেউ ১৯৯৪ সালের মেলার প্রশংসাও করেছেন। প্রখ্যাত লেখক হুমায়ুন আজাদ বলেন, ‘মেলার স্টল বেড়েছে, জায়গা কমেছে— এটা কিন্তু আমার ভালো লাগে।– মেলার ভেতরে খালি জায়গা থাকলে যুবকরা নানারকম মত্ততায় মেতে ওঠে, এবার অন্তত মত্ততার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে।’ কবি শামসুর রাহমানের মন্তব্য ছিল এ-রকম : ‘মেলা যেটা হয়ে গেছে সেটাকে আমার মনে হয় বদলানো যাবে না। বদলানো ঠিকও হবে না। কারণ বইয়ের সঙ্গে অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রীও বই মেলাতে বাঙালি সংস্কৃতির একটি ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

গ্রন্থমেলা ১৯৯৫ : স্টল কমলো
১৯৯৪ সালের বইমেলা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার প্রভাব বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের ওপর পরে বলে অনুমান করা যায়। এজন্য ১৯৮৩ সাল থেকে প্রায় নিয়মিত প্রতি বছর যেখানে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ও স্টলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে সেখানে ১৯৯৫ সালে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রতিষ্ঠান ও স্টলের সংখ্যা কমে যায়। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠান ও স্টল ছিল যথাক্রমে ৬৭৬ ও ৮৪১টি। ১৯৯৫ সালে ৪৪১টি প্রতিষ্ঠানকে ৬০৩টি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। ৬০৩টি স্টলের ৩০০টি একাডেমি প্রাঙ্গণে এবং বাকি ৩০৩টি ছিল সামনের রাস্তায়। ১৯৯৪ সাল থেকে ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠান ও স্টল যথাক্রমে ৩৪.৭৬ ও ২৮.২৯ শতাংশ হ্রাস পায়।

১লা ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় গ্রন্থমেলার উদ্বোধন করেন সরকারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ। বক্তব্য রাখেন মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব গোলাম মঈনউদ্দিন ও বাপুপ্রবিস-র মহাসচিব আখলাকুর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক জাহানার বেগম। প্রধান অতিথির ভাষণে খালেদা জিয়া বলেন,

গ্রন্থমেলা কেবল একটি বাণিজ্যিক আয়োজন নয়। এর রয়েছে শাশ্বত মূল্য। মানুষের জ্ঞান, জীবন-উপলব্ধি, সমাজ-সংস্কৃতির পরিচয় বইয়ের মাধ্যমেই শত সহস্র সছর ধরে বহমান থাকে। মানব জীবন সংক্ষিপ্ত কিন্তু বই বেঁচে থাকে অনন্তকাল। বই কাল থেকে কালান্তরে বয়ে নিয়ে যায় মানুষের জ্ঞান ও জীবন-অভিজ্ঞতা।…বইয়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করেই আমরা জাতীয় গ্রন্থনীতি প্রণয়ন করেছি। গ্রন্থনীতির মধ্যে আছে আন্তর্জাতিক মানের বই প্রকাশ করা, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের বই রফতানি করা।

মেলার পূর্ব-নির্ধারিত সময় ছিলো ১ থেকে ২২শে ফেব্রুয়ারি। প্রকাশকদের দাবির মুখে মেলা আরও ৩ দিন বাড়িয়ে ২৫শে ফেব্রুয়ারি শেষ হয়। মেলায় ৫ শত নতুন বই প্রকাশিত হয়। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় হুমায়ূন আহমেদের পেন্সিলে আঁকা পরী। এই বইয়ের ২৫ হাজার কপি বিক্রি হয়। বিক্রিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছিলো ইমদাদুল হক মিলনের কেন দূরে থাকো? এটি ১২ হাজার কপি বিক্রি হয়। ২১শে ফেফ্রুয়ারিতে কেবল একাডেমির ২ লাখ ৪৪ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়। এদিন একাডেমির ১ হাজার ২ শত অভিধান বিক্রি হয়। একদিনে এতো টাকা ও এতো বই বিক্রি ছিলো বইমেলার একটি রেকর্ড। পুরো মেলায় বাংলা একাডেমির মোট বিক্রি ছিলো ১৯ লাখ টাকার বেশি।

এ-বছর বইমেলায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে বাংলা একাডেমির বিশেষ কিছু বই নিয়ে বিভিন্ন দিন আলোচনা করা হয়। এছাড়া ‘শতবর্ষের আলোকে’ এবং ‘ঐতিহ্যের আলোকে’ বাংলাদেশের বিশিষ্ট লেখক-বুদ্ধিজীবীদের অবদান ও ভূমিকা নিয়ে সেমিনার হয়। বইমেলার সমাপনী দিনে একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ-হারুন-উর-রশিদ বলেন, একুশের বইমেলা কি নিছক একটি বইমেলা? পৃথিবীর কোথাও এত জনসমাগম—এত বড় বই মেলা হয় না। একে বোধ হয় আর নিছক বইমেলা বলা যাবে না। বাঙালির এই সর্ববৃহৎ অনুষ্ঠানে দেশের সর্বস্তরের মানুষের সমাবেশ ঘটে। বিশেষ করে, দেশের তরুণ সমাজ এই বইমেলায় অংশগ্রহণ করে তাদের প্রতিভা, মেধা ও মননের বিকাশ ঘটানোর সুযোগ পাচ্ছে। এদিন সভাপতির ভাষণে গাজী শামছুর রহমান বলেন, ‘বাইরে থেকে অনেকেই একাডেমী সম্পর্কে অনেক কথা বলে থাকেন। কিন্তু কিছু কিছু কাজ আছে যার প্রশংসা চরম শত্রুরাও করেন। এ রকম একটি কাজ হচ্ছে একাডেমীর অভিধান রচনা। বাংলা একাডেমী আর কিছু না করুক এই অভিধানের জন্য বেঁচে থাকবে।’

গ্রন্থমেলা ১৯৯৬ : অপ্রীতিকর পরিস্থিতি, হরতালে শুরু হরতালে শেষ
১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলা একটি বিশেষ ছাত্র ও রাজনৈতিক আন্দোলনগত পরিস্থিতিতে আয়োজিত হয়। এই পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বেশ অস্থিরতা বিরাজমান ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রধানমন্ত্রীর আগমন ‘নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন’ করার জন্য পুলিশ মেলা উদ্বোধনের আগের দিন রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে রেইড করে। সেখানে ‘তিনশ’ ছাত্র আহত, শতাধিক’ গ্রেফতার হন। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে। তা সত্ত্বেও ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে ২২শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেলা চলবে বলে ঠিক করা হয়। ৪৭৪টি প্রতিষ্ঠানকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। সদস্য-সচিবের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, এসব স্টলের দুই-তৃতীয়াংশ বইয়ের স্টল ছিল। এবারও গ্রন্থমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ একাডেমি প্রাঙ্গণ ও একাডেমির সামনের রাস্তায় স্টল নির্মাণ করে। টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত বিস্তৃত রাস্তা গ্রন্থমেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ১লা ফেব্রুয়ারি গ্রন্থমেলা উদ্বোধন করা হয়। প্রাধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সকাল সাড়ে ১১টায় মেলা উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক জাহানারা বেগম। স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মনসুর মুসা। আরও বক্তব্য রাখেন বাপুপ্রবিস-র মহাসচিব আখলাকুর রহমান এবং মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব মাহফুজুর রহমান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি খালেদা জিয়া বলেন :

বাংলা একাডেমীর বই মেলা এখন লেখক-প্রকাশক, শিক্ষাবিদ-শিক্ষার্থী, জ্ঞানপিপাসু মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে, যেখানে দলমত নির্বিশেষে সকলেই আসেন ও মত বিনিময় করেন।…বই মেলা একটি সমাজের জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিন্তা-চেতনা ধারাবাহিকভাবে পৌঁছে দেয় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। আর সেজন্যই চাই আরও বই, উন্নত প্রকাশনা ও বইয়ের ব্যাপক প্রসার। এবং সে ভূমিকা বহুলাংশে পালন করতে পারে এ ধরনের বই মেলা।…একুশ আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ, পরমতসহিষুতা আর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের শিক্ষাই দিয়ে থাকে। এই শিক্ষা আমাদের জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হোক এবং একুশের চেতনাই আমাদের অগ্রযাত্রার পাথেয় হয়ে উঠুক।

১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে গ্রন্থমেলা উদ্বোধন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত ছাত্ররা কালো পতাকা প্রদর্শন করে। রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি বাধাগ্রস্ত হয় একাডেমি আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানসমূহ। এসব অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ পাঠ করার জন্য কিংবা আলোচনা করা বা সভাপতিত্ব করার জন্য যেসব লেখক/বুদ্ধিজীবী সম্মতি প্রদান করেছিলেন তাঁদের অনেকেই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে অস্বীকার করেন। ফলে কিছু দিন প্রধানত বাংলা একাডেমির কর্মকর্তাদের দিয়ে অনুষ্ঠান কোনো রকমে চালিয়ে নেওয়া হয়। পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় ১২থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একুশের আলোচনা ও অনুষ্ঠানমালা চালিয়ে যাওয়াও সম্ভব হয়নি।

রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে গ্রন্থমেলা সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ষষ্ঠ পার্লামেন্টারি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ডাকে ফেব্রুয়ারি মাসের অধিকাংশ দিন ঢাকা শহর ও সারাদেশে হরতাল অবরোধ পালিত হয়। পরিস্থিতি কেমন ছিল তা অনুমান করা যখন সংবাদপত্রে এ-রকম শিরোনাম হয় যে, ‘২৯ দিনের মাসে ২৩ দিনই ছিল এই নগরী অচল’। এই অচলতার প্রভাব গ্রন্থমেলায় পড়ে। স্টলগুলো খোলা থাকলেও মেলায় পাঠক ক্রেতার উপস্থিতি বেশি ছিল না। এ-অবস্থায় স্টল মালিকদের দাবির মুখে মেলার সময় ৬ই মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তবু এই বছরের গ্রন্থমেলা সামগ্রিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। মেলা কেমন হয়েছিল সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় ‘অপ্রীতিকর ঘটনার রেকর্ড সৃষ্টি করে শেষ হলো বইমেলা’, সংবাদপত্রের এই রিপোর্ট থেকে। রিপোর্টে বলা হয়, ‘নানারকম অপ্রীতিকর ঘটনার রেকর্ড সৃষ্টি করে গতকাল বুধবার শেষ হলো মহান একুশের ঐতিহ্যমণ্ডিত বইমেলা। গতকাল সন্ধ্যার অনেক আগেই অধিকাংশ স্টল গুটিয়ে ফেলা হয়। গুটিকয়েক স্টল সন্ধ্যার পর বই সাজিয়ে বসেছিল। রাত ৮টার মধ্যে সব স্টলই বিদায় নেয় মেলা প্রাঙ্গণ থেকে।…কয়েকজন প্রকাশকের কাছে মেলার বই বিক্রির ব্যাপারে জানতে চাইলে বিভিন্ন জন বিভিন্ন রকম মন্তব্য করেন। কারো মতে গত বারের ৪ ভাগের ১ ভাগ বিক্রি হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন গতবারের তুলনায় এবার বই বিক্রির পরিমাণ প্রায় অর্ধেক। বিশিষ্ট প্রকাশক গাজী শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এবার বইমেলা এক কলংকজনক অধ্যায় যোগ করেছে। …এবারের বইমেলা শুরু হয়েছিল হরতালের মধ্যে, শেষও হলো হরতালের মধ্যে। এবং দুটি হরতালই ডাকা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান ঠেকানোর জন্য। হরতাল-অবরোধের জন্য এবার মেলা বন্ধ থাকে সবচেয়ে বেশি সময়। বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষও এবার আয়োজনে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। একজনের স্টল আরেকজন দখল করে নিলেও একাডেমি কোন ব্যবস্থা নেয়নি। এবারই দেশের নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিজীবী ও লেখকেরা বাংলা একাডেমির অনুষ্ঠান বর্জন করেছেন। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৯৬ সালে বাংলা একাডেমি স্টলে ৯ লক্ষাধিক টাকার বই বিক্রি হয়।

১৯৯৬ সালের বইমেলা রাজনৈতিক কারণে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি মেলায় বরাদ্দ দেওয়া বিভিন্ন স্টলের নামকরণ, মেলার সামগ্রিক পরিবেশ ইত্যাদি কারণে সমালোচিতও হয়। ১৯৯৬ সালের বইমেলায় দেওয়া কিছু স্টলের নাম ছিল এ-রকম : ‘হরতাল’, ‘পাইছি’, ‘আয় পাখি উইড়া যাই’, ‘আহেন ভাই’, ‘নাম কি দেব তোমায়’, ‘একুশের কষ্ট’, ‘ম্যাডাম শুভেচ্ছা সামগ্রী’ ইত্যাদি। বইমেলায় প্রাপ্য জিনিসের অনাকাঙ্ক্ষিত বিচিত্রতা, স্টলের নামে রুচিহীনতার সঙ্গে বইমেলার সামগ্রিক পরিবেশে এক ধরনের উৎকট উদ্দামতা যুক্ত হয়। একুশে উদযাপনের সঙ্গে বইমেলার যে স্বাভাবিক গাম্ভীর্য তা বিনষ্ট হয়। দীর্ঘদিন বাংলা একাডেমির বইমেলাকে কাছে থেকে দেখে এসেছেন এমন সাংবাদিক ও লেখক সাইয়িদ আতীকুল্লাহ তাঁর ‘উত্তেজক কার্নিভালের চরিত্র পাচ্ছে বইমেলা’ শীর্ষক লেখায় উল্লেখ করেন :

পশ্চিমী দুনিয়ার প্রায় সব দেশেই ‘কার্নিভাল’ নামে পরিচিত এক ধরনের জনরঞ্জক মেলা হয়। প্রতি বছর কয়েকটি, নানা উপলক্ষ্যে হয়। এসব জনরঞ্জক মেলা চড়া রঙের ব্যাপার আর অনেক সময়ই খুব স্থূল রুচির পৃষ্ঠপোষকতা করে। তবে নানা কারণে সব কার্নিভাল ওসব দেশে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

বাংলা একাডেমীর বার্ষিক বইমেলাটি কোন কালেই কার্নিভাল ছিলো না। অনস্বীকার্য বাংলা একাডেমীর বইমেলাতেও কখনো কখনো কার্নিভালের আবহাওয়া অল্পক্ষণের জন্য দেখা যেতো। তবে কোনো সময়েই বাড়াবাড়ি রকম খুব কিছু দেখা যায়নি। এটুকু মাত্রাজ্ঞান এই বইমেলার সঙ্গে টিকে থাকাতে বাংলা একাডেমীর মেলাটি এ যাবৎ সংস্কৃতি বিষয়ক সমাবেশ হিসেবে দেশে অত্যন্ত সমাদৃত হয়েছে। বিদেশেও বেশ কিছু সুনাম কুড়িয়েছে। কিছু উচ্ছাস, উদ্দামতা হৈ হৈ রৈ রৈ কাণ্ড হয় প্রতি বছরই। তরুণীদের উপদ্রব করার মধ্যেই এই উৎপাত মোটামুটিভাবে সীমাবদ্ধ ছিল।

এ বছর দেখা যাচ্ছে বইমেলা একুশে ফেব্রুয়ারির ভাবগাম্ভীর্য ও পবিত্রতা আর যেন অক্ষয় রাখতে পারছে না। এর একটা গুরুতর কারণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। আস্তে ধীরে গত সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই বাংলা একাডেমীর পরিচ্ছন্ন বইমেলাতে নানা দিক থেকে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সুযোগে হতদর্শন এবং রীতিমতো কুৎসিৎ আবিলতা ঢুকছে আর বইমেলা চরিত্র হারিয়ে অতিদ্রুত ‘কার্নিভাল’-এর দিকে মোড় নিচ্ছে। এজন্য সবচেয়ে বেশি মার খাচ্ছে বইয়ের বিক্রি, অবশ্য অনেক বইও এতো সস্তা মানের ও রুচির যে বইগুলোও মেলায় কার্নিভাল আবহাওয়ারই পৃষ্ঠপোষকতা করছে।

এ বছর বইমেলায় বিদেশে ছাপা প্রায় অশ্লীল পোস্টারের দোকান হয়েছে প্রায় শ’ খানেক। অনেক তরুণ তরুণী যুবক এইসব পোস্টারে আকৃষ্ট হন। পোস্টারের বিক্রি ভালোই হচ্ছে। পকেটের টাকা পয়সার বেশ কিছুটা তরুণ তরুণীরা খরচ করেন রগ রগে পোস্টার কেনার জন্যে। আবার অনেক ক্রেতা আছেন যারা এই রকম হালকা রুচির ক্যাসেট কিনবার কাজে ব্যস্ত। এগুলো করার পর এইসব ক্রেতা বইয়ের খোঁজও করেন না। মেলায় বিস্তর ঘোরাঘুরি করেন নিছক একটা উৎসব পরিবেশের মধ্যে কিছুটা সময় নড়াচড়া করার জন্য। উত্তেজক ও লোকরঞ্জক বইয়ের বাইরে ভালো বইয়ের গা ছুঁইয়েও কেউ দেখতে চান না। কিছু কিছু ব্যতিক্রমও দেখা যায়। তুলনামূলকভাবে মহিলারা সিরিয়াস বই কেনেন বেশি। রোজকার জরিপে তাই দেখা যাচ্ছে।

বাংলা একাডেমীর বইমেলা যেন ‘কার্নিভাল’ জাতীয় প্রদর্শনী বা অনুষ্ঠানে অধঃপতিত না হয় সেই লক্ষ্যে বাংলা একাডেমীর
কর্তৃপক্ষ এখনি সচেতন না হলে এ সর্বনাশ রোধ করা সম্ভব হবে না তা বোঝা যাচ্ছে। তেমন হলে বাংলা একাডেমীকে শিগগিরই নাকের জলে চোখের জলে এক হয়ে দুর্দশা কবলিত হবার সমূহ সম্ভাবনা।

বইমেলা থেকে কার্নিভালের লক্ষণ যৎসামান্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে বইমেলাকে আর বইমেলা বলে চেনা যায় না। বাংলা একাডেমীর বইমেলা যদি তেমন দুরবস্থায় পৌঁছে যায়, তাহলে বইমেলাকে নামকরণ করতে হবে নতুন করে, তখন বাংলা একাডেমী বই মেলাটিকে বলা হবে একুশে ফেব্রুয়ারির সম্মানে অনুষ্ঠিত বাংলা একাডেমী বই কার্নিভাল।

এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য লেখক, প্রকাশক এবং সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে দাবি উঠতে থাকে। পরবর্তী বছর বাংলা একাডেমির নতুন মহাপরিচালক এ-বিষয়ে কিছু প্রতিশ্রুতি প্রদান ও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
(নবম পর্বে দেখুন : স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী, মেলার ‘ঘরে’ ফেরা)

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.