বইমেলা

সপ্তম পর্ব : ছাত্র আন্দোলন, রাস্তায় মেলা

জালাল ফিরোজ | 7 Feb , 2019  


গ্রন্থমেলা ১৯৯০ : ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব
অধ্যাপক মাহমুদ শাহ কোরেশী বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক নিযুক্ত হন ১৯৯০ সালের ১লা জানুয়ারি। তিনি এরশাদ সরকারের আমলে নিযুক্ত একাডেমির সর্বশেষ মহাপরিচালক। তিনি একাডেমিতে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ছাত্র আন্দোলন হয়। ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব বাংলা একাডেমির গ্রন্থমেলার ওপরও পড়ে। ১লা জানুয়ারি নিযুক্ত হয়ে খুবই কম সময়ের মধ্যে মাহমুদ শাহ কোরেশীকে গ্রন্থমেলার আয়োজন করতে হয়। ৭ই ফেব্রুয়ারি বিকেলে গ্রন্থমেলা উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও গ্রন্থমেলার উদ্বোধক ছিলেন অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ। বক্তব্য রাখেন বাপুপ্রবিস-র মহাসচিব মো. আবু তাহের ও গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ও বাংলা একাডেমির উপপরিচালক আশফাক-উল-আলম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশের পাঠ-রুচি : সাম্প্রতিক প্রবণতা’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন সাংবাদিক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর। প্রধান অতিথির ভাষণে দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ বলেন :

…বাংলা একাডেমী একুশে গ্রন্থমেলা প্রবর্তন করার ফলে এতে লেখক ও প্রকাশক উভয়েই উৎসাহ লাভ করেছেন। প্রত্যেক বৎসরই এতে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে আমাদের দেশে পুস্তক-পুস্তিকার সমাদর ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে— তা স্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হয়।

পুস্তকের সমাদরের অর্থ হচ্ছে জ্ঞানের সমাদর এবং জ্ঞানের প্রতি আমাদের জীবনে আগ্রহ যত প্রবল হয়ে দেখা দিবে ততই আমরা জাতি হিসেবে উন্নত থেকে উন্নততর পর্যায়ে নিঃসন্দেহে আরোহণ করবো।…আমাদের মধ্যে জ্ঞানের জন্য যদি প্রবল বাসনা দেখা দেয়—¬তা’হলে আমাদের পক্ষে সে জ্ঞান আহরণ ও তাকে প্রকাশ করার জন্য পুঁথি-পুস্তক রচনা ও তা’ প্রকাশ করার অপ্রতিরোধ্য আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পাবে। তা’হলে আমাদের জীবনে গ্রন্থমেলা অনিবার্যভাবে দেখা দেবে। নানাবিধ অভাবের মধ্যে আমাদের দেশে শিক্ষিত লোকদের শতকরা হার অত্যন্ত নিম্নে বিধায় বাংলা একাডেমীকে এক প্রবল প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েই এ গ্রন্থমেলার আয়োজন করতে হয়। তবে তাদের এ আয়োজন যে সফল হচ্ছে তার প্রমাণ রয়েছে—এতে অংশগ্রহণকারী প্রকাশকদের সংখ্যার ক্রমশ বৃদ্ধিতে। এজন্য বাংলা একাডেমীকে আমাদের আন্তরিক অভিনন্দন।

সভাপতির ভাষণে মাহমুদ শাহ কোরেশী বলেন, একুশের চেতনা বাংলাদেশের বিদ্যাচর্চা ও জ্ঞানসাধনার পশ্চাৎপটকে সুসংহত করেছে। এই বিদ্যাচর্চা আর জ্ঞানসাধনার প্রতিফলন হলো একুশের বইমেলা। প্রকৃতপক্ষে ভাষা-আন্দোলনের অমর শহীদদের প্রতি সমগ্র জাতির শ্রদ্ধাঞ্জলির মূর্ত প্রতীক এই বইমেলা।
১৯৯০ সালে ১৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৫৪টি ছিল পুস্তক প্রকাশক-বিক্রেতা-পরিবেশক প্রতিষ্ঠান। বাকিগুলো ছিল অন্যান্য ধরনের। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তখন সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, আবৃত্তি, সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থাগুলো স্টল পেতো। এছাড়া ১৬টি খাবারের ও ১টি ফায়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠান স্টল পায়। পুস্তক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৮টি ‘ক’ (অর্থাৎ ৩ ইউনিট), ৪৫টি ‘খ’ (২ ইউনিট) এবং অন্যগুলোকে ‘গ’ (১ ইউনিট) শ্রেণির স্টল দেয়া হয়।

১৯৯০ সালের একুশে ও বইমেলা উপলক্ষে বাংলা একাডেমিতে আনন্দপত্র কম্পিউটারে বাংলা ভাষা বিষয়ক একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে। আনন্দপত্র সম্পাদক মোস্তফা জব্বার উদ্ভাবিত আধুনিক কী-বোর্ড, বাংলায় অক্ষর বিন্যাস, টাইপসেটিং, তথ্য বিন্যাস, তথ্য বিশ্লেষণ ইত্যাদি বিষয়ে প্রদর্শনীতে কয়েকটি বুথ স্থাপিত হয় এবং তাতে অনেক দর্শক উপস্থিত হন।

১৯৯০ সালের বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় সরকারবিরোধী ছাত্র ও গণআন্দোলনের এক বিশেষ ও বিক্ষুব্ধ সময়ে। এই মেলা চলাকালে একাডেমির ৮ই ফেব্রুয়ারি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সঙ্গীত শিল্পী আব্দুল লতিফের বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাস সম্পর্কিত বক্তব্যে উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া ও উত্তেজনা দেখা দেয়। প্রতিবাদের মুখে শিল্পী গান বন্ধ করতে বাধ্য হন। ফলে অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটে বইমেলার ২৬শে ফেব্রুয়ারির আলোচনা সভায়। সভার সভাপতি আহমদ শরীফ তাঁর বক্তৃতায় বলেন, ‘বাংলা একাডেমী সরকারী নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। সরকারের কথা শুনবে, এমন লোককেই সরকার মহাপরিচালক করে পাঠান। …সরকারী সিদ্ধান্তে বাংলা একাডেমী চলছে বলে এখানে ভাল কিছু হতে পারছে না। ফলে বাংলা একাডেমীতে এই ধরনের সমাবেশে আমাদের সরকারী জুলুমের কথা, বঞ্চনার কথা, অত্যাচারের কথা বলতে হয়—এ আমাদের দুর্ভাগ্য। ’

গ্রন্থমেলা ১৯৯১ : মঞ্চ থেকে মহাপরিচালক অপসারিত

১৯৯১ সালে বিশেষ রাজনৈতিক পরিবেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র আন্দোলন সম্পর্কিত উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে গ্রন্থমেলা আয়োজিত হয়। ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। এরশাদ বিরোধী গণআন্দোলনে ছাত্রসমাজ, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ছাত্রদের এরশাদ-বিরোধী মনোভাবের প্রতিক্রিয়া এরশাদ-নিযুক্ত বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মাহমুদ শাহ কোরেশীর ওপর পড়ে। ৫ই ফেব্রুয়ারি গ্রন্থমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অধাপক মাহমুদ শাহ কোরেশীর সভাপতিত্ব করার কথা ছিল। তিনি সভামঞ্চে উপস্থিতও ছিলেন। কিন্তু উপস্থিত ছাত্র তরুণদের পক্ষ থেকে তাঁকে মঞ্চ থেকে অপসারণের দাবি ওঠে। ছাত্রদের দাবির মুখে তিনি মঞ্চ ত্যাগ করেন। পরে একাডেমির সচিব মঈনুল হাসান সভায় সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও মেলার উদ্বোধক ছিলেন অধ্যাপক ইন্নাস আলী। সভায় বক্তব্য রাখেন বাপুপ্রবিস-র মহাসচিব মো. আবু তাহের এবং গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ও একাডেমির উপপরিচালক মাহফুজুর রহমান। অনুষ্ঠানে শান্তনু কায়সার ‘গণচেতনা সৃষ্টিতে বইয়ের ভূমিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। প্রধান অতিথির ভাষণে অধ্যাপক ইন্নাস আলী জ্ঞানের ভাণ্ডার গড়ে তুলতে ইলেকট্রনিক মিডিয়া, টেলি-কমিউনিকেশন ও কম্পিউটারের ভূমিকা ও গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন :

বর্তমানে উন্নত দেশগুলিতে এমনকি কয়েকটি উন্নয়নকামী দেশেও বই-পত্রের পরিবর্তে জ্ঞানের ইলেকট্রনিক ভাণ্ডার তৈরি করা হচ্ছে এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে জ্ঞানের বাহন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তার মানে হল জ্ঞানকে কম্পিউটারের মাধ্যমে সঞ্চিত করা হচ্ছে এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া দিয়ে তা জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে এমন একটা অবধারিত সময় আসছে যখন সব আধুনিক জ্ঞান কম্পিউটারে সঞ্চিত হবে এবং এ জ্ঞান শুধু কম্পিউটার ও টেলি-কমিউনিকেশনের মাধ্যমেই পাওয়া যাবে। বই-পত্রে তখন আর কোন কার্যকর জ্ঞান সঞ্চিত হবে বলে মনে হয় না। সুতরাং সেই অবধারিত সময়ের জন্য আমাদের এখনই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।

তিনি বলেন :
এ বছরের গ্রন্থমেলার একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।
বহু-কাঙ্ক্ষিত অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রাক্কালে একটা ক্রান্তি-লগ্নে এ গ্রন্থমেলার দ্বার খোলা হচ্ছে এবং এটা চলবে প্রায় একমাস ধরে। তাছাড়া এ পর্যন্ত যত গ্রন্থমেলা সংগঠিত হয়েছে তাদের মধ্যে এ মেলা সর্ববৃহৎ, ১৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান এ মেলায় যোগ দিয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরের দিন ৬ই ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক নিযুক্ত হন।

১৯৯১ সালের বইমেলার আলোচনা ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে ৯০-এর গণআন্দোলনের প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ করা যায়। বিভিন্ন দিন গণ-অভ্যুত্থান, গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক সম্ভাবনা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা-সেমিনার-বক্তৃতা অনুষ্ঠিত হয়। যেমন, শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতার বিষয় বিষয় নির্ধারিত হয় ‘গণ-অভ্যুত্থান ৯০’। এছাড়া ১৬ই ফেব্রুয়ারি ‘আমাদের গণ-আন্দোলন ও চলচ্চিত্র’, ১৭ই ফেব্রুয়ারি ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ : শিল্প সাহিত্যের ভূমিকা’, ১৮ই ফেব্রুয়ারি ‘সাম্প্রতিক নাটকে প্রতিবাদী চেতনা’, ১৯শে ফেব্রুয়ারি ‘গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে শিক্ষা’ এবং ২১শে ফেব্রুয়ারি ‘নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান’ বিষয়ে আলোচনা/প্রবন্ধ পঠিত হয়।

১৯৯১ সালে গ্রন্থমেলা ৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে ২৫শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে বলে নির্ধারিত ছিল। কিন্তু ২৭শে ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্টল মালিক ও তাঁদের কর্মীরা এবং বাংলা একডেমির কর্মকর্তা কর্মচারীরা যাতে ভোট দিতে পারেন সেজন্য ২৪ ও ২৫শে ফেব্রুয়ারি মেলা অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে ২৩শে ফেব্রুয়ারি মেলা শেষ হয়।
গ্রন্থমেলা ১৯৯২ : বিস্তৃতি, ভেতর থেকে রাস্তায়
১৯৯২ সালে সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া গ্রন্থমেলা উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহানার বেগম। বক্তব্য রাখেন বাপুপ্রবিস-র মহাসচিব মো. আবু তাহের ও গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব মুহম্মদ নূরুল হুদা।। এবার প্রথম ‘সদস্য-সচিব’ পদের সৃষ্টি হয়। এর আগে বলা হতো গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটির ‘আহ্বায়ক’।

লেখক-বুদ্ধিজীবীর পরিবর্তে সরকার-প্রধানকে দিয়ে গ্রন্থমেলা উদ্বোধন করানোর জন্য অনেকে বাংলা একাডেমির সমালোচনা করেন। ছাত্রলীগ প্রধানমন্ত্রীর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আগমনের বিরোধিতা করে কালো পতাকা প্রদর্শন করে। তবে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ প্রথম সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর আগমন ও গ্রন্থমেলা উদ্বোধনকে একাডেমির বর্ধমান ভবনের ঐতিহ্য, গণবিরোধী স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে বাংলা একাডেমির অবস্থান, অন্য সরকার প্রধানদের একাডেমিতে আগমন ইত্যাদি পরিসরে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন :

আপনারা আপনাদের সামনে যে অট্রালিকা দেখতে পাচ্ছেন এর নাম বর্ধমান হাউস। এটিই বাংলা একাডেমীর আদি ভবন যার দৈন্যদশা আপনাদের অনেকেরই মনোপীড়ার কারণ। এই ভবনটি আসলে একটি জেদের নাম। বাঙালীদের যে জেদের ফলে আর্যদের এক হাজার বছর লেগেছিল এই গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলে আসতে, যে জেদের ফলে আর্যদের ধর্মীয় গ্রন্থে অভিব্যক্তি ঘটেছে বাঙালীদের প্রতি প্রবল ঘৃণা আর ক্রোধের। সে একই জেদ বাহান্নোর ভাষা আন্দোলনের পর দৃপ্তকণ্ঠে উচ্চারণ করলো, ভাষা শহীদদের রক্তে রঞ্জিত একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হবে কোন সুরম্য প্রাসাদে নয়, – সেই বাড়িটিতে যে বাড়িতে বসে তদানীন্তন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীন ছাত্রদের উপর গুলীর নির্দেশ দিয়েছিলেন। বাংলা একাডেমী এই জেদের গৌরবকে ধারণ করে আছে এর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে। এর এই গর্বিত আচরণ গণবিরোধী কোন শক্তিকে স্বাগত জানায় নি। এখানে সরকার প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এসেছেন, মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এসেছেন। আজ আপনিও এলেন জনগণের নির্বাচিত সরকার প্রধান হিসাবে। এ প্রাঙ্গণ স্বৈরশাসককে স্বাগত জানায় নি। বাংলা একাডেমীর এ ঔদ্ধত্য তাকে মহীয়ান করেছে।

প্রধান অতিথির ভাষণে খালেদা জিয়া বলেন,
বাংলাভাষা ও সাহিত্য চর্চা ও গবেষণার একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলা একাডেমীর স্বপ্ন প্রথম দেখেছিলেন আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় ভাষাবিদ ও শিক্ষাবিদ ড: মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। পবিত্র শহীদ মিনারের মতো এই বাংলা একাডেমীও আমাদের ভাষা আন্দোলনের ফসল। …দীর্ঘ নয় বছরের স্বৈরাচারী আমলে এই বাংলা একাডেমীকে কোন সাহায্য করা হয় নি। এই প্রতিষ্ঠান উপেক্ষিত ছিল। আমরা বলতে চাই, আজকে আমাদের সরকার একটি গণতান্ত্রিক সরকার। এই সরকারের সম্পর্ক এ দেশের মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে।

এই বছর ২৭০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এসব প্রতিষ্ঠান ৩৫০ ইউনিট স্টল বরাদ্দ পায়। মেলার স্থান একাডেমি প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে একাডেমির সামনের রাস্তায় সম্প্রসারিত হয়।

১৯৮৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্ররা এবং সাধারণ দর্শক-ক্রেতারা গ্রন্থমেলার আয়তন-স্বল্পতার কারণে এর আয়োজনে পরিবর্তন আনার কথা চিন্তা করতে থাকেন। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯২ সালে পরিস্থিতি আরও প্রতিকূলে যায়। এই সময়ের মধ্যে মেলার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি পায় এবং মেলায় স্টল নিয়ে ব্যবসা করার প্রতি মনযোগী যুবক-তরুণদের চাপও বাড়তে থাকে। এই অবস্থায় একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ তাঁর ভাষায় ‘সৃজনশীল তরুণ’দের জায়গা করে দেওয়ার জন্য মেলাকে একাডেমি চত্বরের বাইরে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন বলে সিদ্ধান্ত নেন। গ্রন্থমেলা সম্পর্কে মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদের চিন্তায় তরুণদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এ-সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা ও চিন্তার কথা তিনি ব্যাখ্যা করেন এভাবে :

আমি মনে করি, এই ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ বাঙালির সৃজনী প্রতিভার মেলা।… আমরা এটিকে শাহবাগের মোড় থেকে হাইকোর্টের পূর্বপ্রান্ত পর্যন্ত নিয়ে যাবার কথা ভেবেছিলাম, অতটা পারিনি। কিন্তু অনেকখানি নিয়ে গিয়েছিলাম, এটার সমালোচনা হয়েছে। আমি এটা জানি।…আমি এটা ভেবেছি যে, তরুণদের প্রকাশের একটা সুযোগ করে দিতে হবে। তারা এখানে ছোটখাট বই নিয়ে বাইরে স্টল দিয়েছে, বই বিক্রি করেছে, হাঁড়-পাতিল বিক্রি করেছে, একটা ছেলে কিছু টাকা-পয়সা নিয়ে creative কিছু একটা করছে। এটাকে আমি খুব বড় করে দেখেছি। আমরা অসংখ্য মানুষের ঢল এখানে দেখেছি। এত মানুষ বাংলা একাডেমীতে অন্য কোনো সময় আসেনি। এই সময়টাতে হাজার হাজার মানুষ বাংলা একাডেমীর মেলায় এসেছে। এই রাস্তা দিয়ে হাঁটা যেত না, আমি এখনো মনে করি প্রয়োজন হলে সমগ্র সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অনেকখানি নিয়ে মেলাকে বিস্তৃত করা যায়। বইতো এখন খালি বই নেই। বইয়ের Hard Copy হয়। Soft Copy হয়। CD হয়। CD একটা প্রকাশনা, কেউ যদি একটা নতুন গান করে থাকে, সেটাই একটা প্রকাশনা। প্রকাশনার নানারকম দিক আছে। কেউ যদি একটা নতুন জামদানী শাড়ি বুনে থাকেন, কেউ যদি একটা ছবি এঁকে থাকেন, এগুলোও প্রকাশনার মতো দেখতে হবে। বাঙালি সৃজনী প্রতিভার প্রকাশ হিসেবে আমরা এই মেলাকে দেখতে চেয়েছিলাম, পরে খণ্ডিত হয়েছে।

বইমেলাকে একাডেমি প্রাঙ্গণের বাইরে রাস্তায় সম্প্রসারিত রূপ দেওয়ার পক্ষে আরও কিছু ব্যাখ্যা দেন ঐ বছরের গ্রন্থমেলার সদস্য-সচিব মুহাম্মদ ন্নূরুল হুদা। তাঁর মতে :

…বাংলা একাডেমীর দেয়ালঘেরা স্বল্প-পরিসর প্রাঙ্গণে এই মেলা আর আবদ্ধ থাকলো না। একাডেমীর দেয়াল ভাঙ্গা হলো, জনগণের জন্য প্রবেশ-দ্বার প্রসারিত হলো, আর মেলার একাংশ ছড়িয়ে পড়লো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান-সংলগ্ন রাস্তার দুপাশে। মিলন চত্বর থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত চিহ্নিত হলো ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’-র প্রাঙ্গণরূপে। বাংলা একাডেমীর ক্ষুদ্র প্রাঙ্গণে এই মেলার স্থান-সংকুলান করতে না পারার অজুহাতে মেলাকে বাংলা একাডেমী থেকে বিযুক্ত করে অন্যত্র সরিয়ে নেবার যে চক্রান্ত এঁটেছিলো স্বৈরশাসকগোষ্ঠী, এবারের গ্রন্থমেলা তার এক যোগ্য প্রত্যুত্তর। আসলে বাংলা একাডেমীর প্রাঙ্গণ কেবল বাংলা একাডেমীর দেয়ালের ভিতরেই সীমিত নয়, বাংলা একাডেমীর মানস-প্রাঙ্গণ বাংলাদেশের চুয়ান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে পরিব্যাপ্ত।

(অষ্টম পর্বে দেখুন : অভাবনীয় বিস্তৃতি, বারোয়ারি মেলা)

টীকা:
১. একুশের স্মারকগ্রন্থ ‘৯০, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ১৯৯০, পৃ. ১১৮
২. একুশের স্মারকগ্রন্থ ‘৯০, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ১৯৯০, পৃ. ১৬৯
৩. পূর্বোক্ত, পৃ. ১৮৯
৪. একুশের স্মারকগ্রন্থ ‘৯১, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ১৯৯১, পৃ. ৪৭ ও ৪৯
৫. একুশের স্মারকগ্রন্থ ‘৯২, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ১৯৯১, পৃ. ৮৮ ও ৮৯
৬. বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদের স্মৃতিচারণ। দেখুন, একুশের প্রবন্ধ ২০০৫, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ২০০৫, পৃ. ২৭-২৮
৭. দেখুন, একুশের স্মারক গ্রন্থ ’৯২, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ১৯৯২, পৃ. ৯৯-১০০

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.