কবিতা

কাজী জেসিনের পাঁচটি কবিতা

কাজী জেসিন | 5 Feb , 2019  


ইতিহাস এক বিশাল ঘাতক

আমি জানি কোনো লেখাই আমার
কবিতা হয় না আর
শব্দগুলোকে যে তাও
রাখি যত্ন করে
অসুখ-বিসুখ ভালো করে
সাজিয়ে-গুজিয়ে
তালে -তালে
ত্রিভুবনে উল্টে-পাল্টে
রাখি থরে-থরে
জানি আর কোনো লেখাই কবিতা
হয় না আমার তবু কক্ষনো আর

মানুষ নিংড়ে যে-শব্দমালা
কর্পূরের মতো উড়ে যায়
ইয়েমেনে মৃত্যুগুলি যেভাবে বাজায় ঢোল পৃথিবীর
দুর্ভিক্ষের উপরে দাঁড়িয়ে
শিল্পের কামুক-চর্চা হয়
উত্তরে-দক্ষিণে আর পূর্বে ও পশ্চিমে
যেভাবে ফুটেছে যুগে-যুগে
জীবন্ত কঙ্কালে ছন্দ-রূপ
পাটাতনে
মাটির উলঙ্গ মঞ্চে
যুগে-যুগে
যুগে-যুগে

মানুষের অবতার যদি-বা মানুষ হয় কভু
তবু হায়
শত-শত পোড়ামুখ
মদের বোতল
নিজস্ব মুতের মতো গিলবে তারা,
গিলবেই। এবং
শেয়ালের সুশৃঙ্খল
কাব্যিক সমাজে
কবিতা আসে না আর
কাঁদার জন্যও যদি লাগে
সমূহ প্রস্তুতি
বিছানা বালিশ
স্যুটের গোপনে
লুকানো সুগন্ধি কাম
পাঁজাকোলা করে
তোমাকে ওড়ায়..
নিজস্ব হাড়ের উপরেই
কী যে গ্লামারাস তুমি

একদিন সমূলে ফেটে পড়বে
বয়ে যাবে রক্তের প্লাবন— এই গান
গাইতে-গাইতে আর
ইটালিকে লিখে-লিখে নিজের নামখানা
কত শত কবিতা প্রকাশ
করতে-করতে
আহা!
কত রক্ত ইতিহাসে তুলে রাখলে তুমি

কিন্তু ইতিহাস এক বিশাল ঘাতক
এখন নিজের শব্দ কোথায় পাব গো
কবিতা হয় না আর
তবে কি নিরুদ্ধ হবে শ্বাস?
কত প্রিয়, আহা কী যে আহ্লাদী আশ্বাস!
নিজস্ব নিশ্বাস ঠিক রাখার জন্যই
যদি পথচলা
তবে
বালের কবিতা
তা সে যতই নড়ুক
টলানোর ভঙ্গিও সে যতই করুক
তেনারে চুদি না!

মোরগ পোলাও খেতে খেতে

শাহী মোরগ পোলাও খেতে খেতে
আমরা বনে চলে যাবো
সেখানে বাঘের পাশে বসবো
বাঘেরা চ-যুক্ত কর্মে ব্যস্ত থাকবেন, সেসব যৌনকান্ড দেখে আমরা হিশফিশ করবো না
সব শব্দ আমরা মুখেও আনবো না।
নকশীকাঁথা জীবন নিয়ে মাঠে গিয়ে
মোরগ পোলাও খেতে খেতে আমরা বাঘের সাথে একসাথে ..
দূর থেকে হরিণেরা তাকিয়ে দেখবেন
আমরা একটুও হরিণ হরিণ ভাব করবো না তো!
বাঘের পাশে বসে বসে আমরা শাহি মোরগ পোলাও খাবো
বাঘ আমাদের খাবে না
কিংবা আমরাও বাঘকে খাবো না।
আমাদের চুক্তির মধ্য দিয়ে বৃষ্টি পড়বে।
ঝুম বৃষ্টি।
বাঘের জলতৃষ্ঞা দেখতে দেখতে আমরা ভিজে যাবো
সবাই তখন সমবেত স্বরে গাইতে থাকবো আয় বৃষ্টি ঝেপে ধান দেবো মেপে।
বৃষ্টি একদিন ঠিকঠিক আসবে
আরশে প্রেম ও পরিত্রাণ কালে বৃষ্টি আসে।

আমারেও কি দেবা গো বাঘ প্রেম ?
আমিও যে বয়ে নেই দুইশত ছয়খানা হাড়
হাজার বছর ধরে আমিও যে ছাড়খার। বাঁচি
নাই, তবু বাঁচার গরিমা আমার! বাঘ গো বাঘ
আল্লাহর আরশের তলে সমূহ বিস্ময় সহকারে তুমি দেবা গো আমারে একখানা চুমু?

একবিংশ শতকে

কবিরাও পাখি হয় কখনও কখনও
খুলে পড়তে থাকে তাদেরও মাংস বিস্তার
একবিংশ শতকে
কবিদের গায়ের সুবাস ছড়ায়
তাদের কাব্যের সুবাসেরও আগে
একবিংশ শতকে
বন্ধুত্বের যেমন অনেক মানে হয়
পাখির মতন কবিরাও আসে যায়
জ্ঞানের দাপটে পিছলে যায় কবিকুল
আরও আরও উপ্রে যারা
যাদের যাদের চেয়ারগুলো উড়তে থাকে
মঙ্গলগ্রহে
তাদেরও গোঁফের আড়ালে কবিতা তরল দেখা যায়
ঘাসের উপরে কবিতারা ঘুরতে থাকে
তারা গ্রহে গ্রহে উড্ডীন ধুমকেতু
কবিরাও বক হয় কখনও সখনও
লম্বা ঠোঁটে ঠোঁট রেখে চুমু খায়
এবং আরও আরও চুমুর কথা রেখে যায়

একবিংশ শতকে
নদীর ভেতরে শব্দগুলো ছড়িয়ে কবিরা হেঁটে যান
কবিগণ ঘরে বসে বসে বিড়ি খান
তাঁদের গোঁফের নীচে গল্প জমে থাকে
লম্বা লম্বা চুল তারা চিরুনি করেন
না করলেও তাদের চুলগুলো আয়নায় দেখেন
তাদের কবিতাগুলো জমে যায়
জমে জমে যেনবা বরফ
পুঁজির বগলে চাপা পড়ে তারা কাঁদেন, কবিরা
একা একা
কাঁদেন!

আমাদের লেজ দিয়ে

গঙ্গার শীতল জল গড়িয়ে গড়িয়ে গল্প হয়ে যায়
আমাদের সেইসব মুলা ঝোলানোর দিনে
মেঘনা ফুটে থাকে রঙিন মানচিত্রে
মানুষও থাকে ফুটে
পাটাতনে নড়ে ওঠে আদিম অক্ষর।
আমাদের অধিকতর মেঘ হওয়া আকাশ তবুও
আকাশের মতো নীরব জ্বলজ্বল করে পুবে-পশ্চিমে
দখিনের মুলা ঝুলতে ঝুলতে সে উত্তরে চলে যায়
প্রসূতি কাতর হতে হতে
কাকভোরে জমিনে প্রসব করে যে শিশু
সেও মুলা দেখে
সাদাসাদা মুলার দুর্গন্ধে মরে যায়
মাকর্স ও তাঁর শিষ্যকুল

নবজাতকের হাত ধরে আমি মুলা বাগানের
মধ্য দিয়ে হেঁটে যেতে থাকি,
একখানা কবিতা লিখবো তাই।
বেগুনি ফুলেরা মরে যায়
ফুল হাতে দাঁড়ানো মানুষ নিথর হারিয়ে যায়
ভবিষ্যতের ঘাড়-ধরে আমরা শোয়াই
তাতে উঠে পড়ি
লাফাই।
আমাদের নবজাতক তখন গাইতে থাকে
থ্রি লিটল মাংকি জাম্পিং অন দ্য বেড
গাইতে গাইতে আমাদের মাংকি মুখ
জোছনার আলোকতলে গলাগলি করে
সাদাসাদা ফুলমালা পড়ে আমরা মঞ্চে লাফাই
আর আমাদের লেজ দিয়ে লিখে ফেলি আমাদের
ভবিষ্যৎ।

বাংলাদেশ

যে আমার কোন জন্ম নাই
সে আমারে কেন ফুল দাও বিরহী পতাকা?
কেন বা অজস্র চতুর্ভূজে ঘেরো
কোন আধুনিক যৌনজালিকার ঘোরে?

উড়ন্ত পতাকা
আমার আকাশে তুমি ওড়ো
তুমি ঘুড়ি
তোমার রুপালি সুতা
আমারে বাঁধে গো। তবু
মালতী ফুলের মতো দুলি
প্রেম জাগলে কেউ কেউ তোমারেও বলে ফুল
জানি, ও বন্দি বকুল

যে আমার কোন জন্ম নাই
সে আমারে কেন তালিকায় ভরো, বিস্তীর্ন পতাকা?

সংখ্যার পাদদেশে
পড়ে থাকি
জন্মাবারও আগে
এহেন নির্লজ্জ আমি
হেসে হেসে গড়ায়ে গড়ায়ে
পাথর কামড়ে ভাঙি দাঁত
ওগো চকমকে চামুচ
কবে তুমি আমারে খাওয়াবা
স্বাধীনতার দু’ফোঁটা দুধ?

যে আমার কোন জন্ম নাই
সে আমার কেন
ফোটে ফুল
ফোটে রক্তজবা চোখ
দেখি মানুষের মাঝে অজস্র মানুষ
লাশে ও বেলাশে
তারা হাসে
নিদারুণ কারাবন্দি
জন্মাবার আগেই যদিবা
জলে বেওয়ারিশ
তবে ওগো সার্বভৌম নদীজল
তুমি লজ্জা পাও?

নাকি তুমি বিশুদ্ধ বিশেষ্য এক
পতাকা আমার?
যে আমার কোন জন্ম নাই
তারে কেন দাও তব ফুল ও পতাকা?

Flag Counter


7 Responses

  1. শিমুল সালাহ্উদ্দিন says:

    বাহ্। দুর্দান্ত। অকপট কাজী জেসিন। সকল প্যারাডাইম ভেঙে কবিতা মুক্ত হোক এমন।
    কী লাইন! বাঘ গো বাঘ আল্লাহর আরশের তলে সমূহ বিস্ময় সহকারে তুমি দেবা গো আমারে একখানা চুমু?

    • কাজী জেসিন says:

      ধন্যবাদ শিমুল.. খুশি হলাম যে আপনার ভালো লেগেছে .. :)

  2. Flora Sarker says:

    কাজী জেসিনের কবিতা বরাবরই আমি পড়ি। সবাই কবি হয়ে জন্মায় না, কেউ কেউ জন্মায়। কাজী জেসিন সেই কয়েকজনের একজন। এখানে পাঁচটা কবিতাই অনন্য। তবে শেষের কবিতাটার কোনো তুলনাই হয়না।

    • কাজী জেসিন says:

      হায় হায়!
      অবাক করলেন..
      কবিতা ভালো লেগেছে জেনে খুশি হলাম।

  3. অগাস্টিন গোমেজ says:

    ভালো লাগল, জেসিন… এও একটা ধরন, কবিতার, এই হাল্কাপুল্কা হাওয়া-হাওয়া জামা গায়ে জীবন-রাজনীতির ভিতর দিয়ে চ’লে যাওয়া – চ’লে যাওয়া, ব’য়ে যাওয়া নয়…

    • কাজী জেসিন says:

      যখন কবি বললেন.. 🙂 থ্যাঙ্ক ইউ.. অনুপ্রাণিত হলাম ..

  4. সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল says:

    মোরগ পোলাও খেতে খেতে
    শাহী মোরগ পোলাও খেতে খেতে
    আমরা বনে চলে যাবো
    সেখানে বাঘের পাশে বসবো
    বাঘেরা চ-যুক্ত কর্মে ব্যস্ত থাকবেন, সেসব যৌনকান্ড দেখে আমরা হিশফিশ করবো না
    সব শব্দ আমরা মুখেও আনবো না।
    নকশীকাঁথা জীবন নিয়ে মাঠে গিয়ে
    মোরগ পোলাও খেতে খেতে আমরা বাঘের সাথে একসাথে ..
    দূর থেকে হরিণেরা তাকিয়ে দেখবেন
    আমরা একটুও হরিণ হরিণ ভাব করবো না তো!
    বাঘের পাশে বসে বসে আমরা শাহি মোরগ পোলাও খাবো
    বাঘ আমাদের খাবে না
    কিংবা আমরাও বাঘকে খাবো না।
    আমাদের চুক্তির মধ্য দিয়ে বৃষ্টি পড়বে।
    ঝুম বৃষ্টি।
    বাঘের জলতৃষ্ঞা দেখতে দেখতে আমরা ভিজে যাবো
    সবাই তখন সমবেত স্বরে গাইতে থাকবো আয় বৃষ্টি ঝেপে ধান দেবো মেপে।
    ———————————–
    বাহ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.