বইমেলা

অমর একুশে বইমেলা : আশির দশক (তৃতীয় পর্ব)

জালাল ফিরোজ | 3 Feb , 2019  


গ্রন্থমেলা ১৯৮০ : অনুরোধে সময় বৃদ্ধি
বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে একাডেমী প্রাঙ্গণে ১৯৮০ সালের ‘বাংলা একডেমী গ্রন্থমেলা’ অনুষ্ঠিত হয়। ১৪ থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই মেলা হওয়ার কথা থাকলেও ‘অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের অনুরোধে এবং দর্শক ক্রেতাদের বিপুল সমাগমের কারণে মেলার সময়সীমা ২২ ফেব্রুয়ারী থেকে ২৯ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত বাড়ানো হয়।’ মেলার সার্বিক তত্ত্বাবধানের জন্য একটা ‘উপদেষ্টা গঠিত’ হয়। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক এই কমিটির আহ্বায়ক হন। কমিটিতে শিশু একাডেমী, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, মুক্তধারা, নওরোজ কিতাবিস্তান, বি বি আই, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড ও স্ট্যান্ডার্ড পাবলিকেশন্স-এর প্রতিনিধি সদস্য ছিলেন।

মেলায় ৩০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। একাডেমীর বড় একটি বিক্রয় কেন্দ্র ছিল। East Land Advertising Ltd.-এর মাধ্যমে গ্রন্থমেলার বিজ্ঞাপনাদি প্রচারিত হয়। খুচরা ক্রেতাদের জন্য ২০ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করা হয়।

গ্রন্থমেলা ১৯৮১ : সাহিত্য সম্মেলন, বিক্রি ‘সন্তোষজনক’
১৯৮১ সালের গ্রন্থমেলা ৭ থেকে ২৮শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। মেলার উদ্বোধন করেন সেই সময়ের সংস্কৃতি ও ক্রীড়া বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আমিরুল ইসলাম কালাম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি আ ফ ম আব্দুল হক চৌধুরী।

গ্রন্থমেলা পরিচালনার জন্য এই বছর ‘তত্ত্বাবধায়ক কমিটি’ গঠিত হয়। তত্ত্ববধায়ক কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। কমিটির সদস্য ছিলেন আহমদ পাবলিশিং হাউস, আদিল ব্রাদার্স, স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স, পাবলিশার্স এসোসিয়েশনস, নওরোজ কিতাবিস্তান, মুক্তধারা, শিশু একাডেমী, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড ও বাংলাদেশ বুকস ইন্টারন্যাশনাল-এর প্রতিনিধিরা। এই বছর ৬৫টি প্রতিষ্ঠানকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়।

মেলায় বাংলা একাডেমি-সহ সকল প্রতিষ্ঠান ১৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করে। তবে বাংলা একাডেমি পঁচিশ হাজার টাকার এককালীন ক্রেতাদের জন্য ৫০ শতাংশ কমিশন প্রদান করে। বইমেলার জন্য বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। মেলা সম্পর্কে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের ‘বই’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয় :

মেলা শুরুর প্রথম ক’টা দিন আবহাওয়া ছিল প্রতিকূল। কিন্তু মেঘ-বৃষ্টি কেটে যাবার পর সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী থেকে হাজারো গ্রন্থপ্রিয় মানুষ মেলায় এসে ভীড় জমিয়েছেন। দু’হাতে তাঁরা যেমন নিজেদের জন্য বই কিনেছেন, সন্তান প্রিয়জনদের বায়নাও রক্ষা করেছেন হাসি মুখে। এতগুলো নানা ধরনের বই এক সঙ্গে পাওয়া স্বভাবত মুশকিল। তার ওপর কমিশনের সুযোগ। নাড়াচাড়া করতে করতেই কেনা হয়ে গেছে এক গাদা বই। …এবার বেশ ক’টি নতুন প্রকাশনী সংস্থা স্টল সাজিয়ে ছিলেন। ভিন্টেজের বড় বড় সিনেমার পোষ্টার দেখে একটু কৌতুহলই জেগে ছিল। নানা ধরনের ক’টি সিনেমার বই এখান থেকে বিক্রি হয়েছে। ‘আনন্দ’ নামে একটি স্টল নানা কারণে বেশ চমক তুলেছিল। লাল আকর্ষণীয় প্যাকেটে চারজন কবির কবিতার বই এক সঙ্গে বিক্রি হয়েছে এখান থেকে।…এছাড়া তরুণ লেখকদের বই বিক্রি হয়েছে ‘দ্রাবিড়’, ‘প্রাক্সিস অধ্যয়ন সমিতি’ প্রভৃতি স্টল থেকে। এবার ফেব্রুয়ারীতে বেশ কিছু কবিতা ও গদ্যের বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে কবিতার বই-ই বেশি।

বই বিক্রির হার এবার মোটামুটি সন্তোষজনক। শিশুদের বই যেমন হু-হু করে কেটেছে, বড়দের কবিতা, গল্প, উপন্যাসও সমান মনযোগ আকর্ষণ করেছে সবার।

মোদ্দা কথা, ১৫% কমিশনের সুযোগ যেমন অনেকেই নিয়েছেন, ভারতীয় পুস্তকের দাম তিনগুণ বৃদ্ধির কারণে ক্ষুব্ধও হয়েছেন অনেকে। কিন্তু এসব তুচ্ছ করে, হাজার দর্শক যে বইয়ের প্রতি অনুরাগ দেখিয়েছেন, এটাই বড় কথা।

একুশে উপলক্ষে বাংলা একাডেমি ৮ দিনব্যাপি সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করে। ১৪ই ফেব্রুয়ারি এই সম্মেলন উদ্বোধন করেন ড. কাজী মোতাহের হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ড. মুহাম্মদ এনামুল হোক। ২১শে ফেব্রুয়ারি এই সাহিত্য সম্মেলন শেষ হয়। এই সম্মেলনে বিভিন্ন দিন ‘একুশের চিত্র প্রদর্শনী, ‘নাট্যসাহিত্য : রচনা, প্রযোজনা ও দর্শক’, ‘আমাদের কবিতা : ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্ক’, ‘আমাদের লোক সাহিত্যের ঐতিহ্য : পুনর্মূল্যায়নের প্রশ্ন’, ‘বাংলাদেশে শিশু সাহিত্যের বিষয়বস্তু’, ‘আমাদের সাংবাদিকতার মানোন্নয়নের প্রশ্ন’, ‘প্রবন্ধ ও গবেষণার সামাজিক উপযোগিতা’ ইত্যাদি বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপিত এবং প্রবন্ধের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

২৩শে ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে ‘এবারের বইমেলা’ শিরোনামে একটি আলোচনা সভা হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ফজলুল হালিম চৌধুরী। বক্তব্য রাখেন ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আল কামাল আবদুল ওহাব, মহিউদ্দিন আহমদ, চিত্তরঞ্জন সাহা ও মনজুরুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. আশরাফ সিদ্দিকী। বাংলা একাডেমির বইমেলা নিয়ে এটি ছিলো প্রথম কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভা যাতে দেশের প্রধান লেখক ও প্রকাশকদের প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন।

গ্রন্থমেলা ১৯৮২ : বইয়ের দাম কমানোর দাবি
১৯৮২ সালের গ্রন্থমেলা ৮ই ফেব্রুয়ারি শুরু হয়। একডেমির একুশের স্মারকগ্রন্থ ’৮৬-তে বইমেলা ২৮শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলে উল্লেখ করা হলেও দৈনিক সংবাদ-এর রিপোর্ট থেকে দেখা যায় গ্রন্থমেলা ১লা মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। বাংলা একাডেমি অমর একুশে উদযাপন কর্মসূচির অংশ হিসেবে বইমেলার আয়োজন করে। দৈনিক সংবাদ-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গ্রন্থমেলা উদ্বোধন করার কথা ছিলো রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারের। কিন্তু তিনি আসেননি। মেলা উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ফজলুল হালিম চোধুরী। একুশে উপলক্ষে বাংলা একাডেমি যে অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে তা উদ্বোধন করেন অধ্যাপক মহম্মদ মনসুর উদ্দীন।

১৯৮২ সালের বইমেলায় মোট ৭০টি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। এগুলোর মধ্যে ৫৪টি বই প্রকাশনা ও বিক্রয় প্রতিষ্ঠান। বাকিগুলো ছিলো খাবারের ও অন্যান্য পণ্য বিক্রয়ের স্টল।

তখন একুশে উপলক্ষে বাংলা একাডেমিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আলোচনা সভা, সেমিনার ও বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করতো। ১৯৮২ সালের অমর একুশে উদযাপন ও বইমেলা উপলক্ষে একাডেমি প্রাঙ্গণে বাংলা একাডেমি ছাড়া বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি (বাপুপ্রবিস), জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মুক্তধারা এককভাবে সেমিনার, আলোচনা সভা, প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বাপুপ্রবিস ৯ই ফেব্রুয়ারি এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষা সচিব ড. আব্দুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন। সভায় ‘বাংলাদেশের প্রকাশনা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকাশক সৈয়দ ফজলুল হক। এই প্রবন্ধে তিনি বলেন, ‘বাংলা একাডেমি প্রকাশনা শিল্পকে চাঙ্গা করতে পারছে না’। ১১ই ফেব্রুয়ারি বাপুপ্রবিস একটি আলোচনা সভার আয়োজন করে। মুক্তধারা ১৩ ও ১৪ই ফেব্রুয়ারি আলোচনা সভা ও শিশুদের জন্য ‘আলোচনা প্রতিযোগিতা’-র আয়োজন করে। ১৩ই ফেব্রুয়ারি ‘মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার’ প্রদান করে। পুরস্কার পান কবি সুফিয়া কামাল ও অধ্যাপক মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীন। ১৪ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত তাদের আলোচনার শিরোনাম ছিলো ‘মুক্তধারার দশ বছর’। এতে প্রবন্ধ পাঠ করেন শামসুজ্জামান খান ও ড. নাজমা জেসমিন চৌধুরী। আলোচনা করেন রাহাত খান, আসাদ চৌধুরী ও হাশেম খান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ড. আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ। সভাপতিত্ব করেন কবি সানাউল হক। ২৬শে ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বাংলা একডেমি প্রাঙ্গণে ‘শিশু সাহিত্যের প্রকাশনা’ শিরোনামে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করে। এই সভায় একজন ক্ষুদে আলোচক তার বক্তব্যে উল্লেখ করে যে, ‘পৃথিবীতে প্রতি মিনিটে ২০৪টি বই বের হয়। এর মধ্যে মাত্র দশটি শিশুদের। আমাদের দেশে শিশু সাহিত্যের বই খুব কম। এগুলোর দামও আবার বেশী। তাই প্রকাশক ভাইদের কাছে আবেদন, শিশুদের জন্যে বেশী করে সস্তা দামের বই বের করুন। তা যেন জ্ঞানের হয়, রূপকথার নয়।’ এই বছর শ্রেষ্ঠ স্টলের পুরস্কার পায় ‘সন্ধানী’। বিশেষ পুরস্কার পায় মুক্তধারা ও বাংলা একাডেমি।

গ্রন্থমেলা ১৯৮৩ : কিছু নতুন নিয়ম, নতুন শর্ত কিন্তু ছাত্র আন্দোলনে ব্যর্থ
একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে ১৯৮৩ সালের গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ জেনারেল এরশাদের জারিকৃত সামরিক শাসন তখন বেশ কঠোরভাবে কার্যকর ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন তৈরির প্রস্তুতি চলছিল। মনজুরে মওলা ১৯৮২ সালের ৩১শে ডিসেম্বর বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক নিযুক্ত হন। তাঁর অধীনে এটি ছিল প্রথম গ্রন্থমেলা।

৭ই ফেব্রুয়ারি প্রধান অতিথি হিসেবে কবি সুফিয়া কামাল গ্রন্থমেলা উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ পাঠ করেন আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ। বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেল অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির মহাপরিচালক মনজুরে মওলা। ৭ থেকে ২২শে ফেব্রুয়ায়ারি পর্যন্ত গ্রন্থমেলা হওয়ার প্রথম সিদ্ধান্ত থাকলেও ‘দর্শক-ক্রেতাদের সমাগম লক্ষ্য করে এবং অংশ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের অনুরোধে ৫ মার্চ পর্যন্ত’ মেলার সময় বাড়ানো হয়। প্রধান অতিথির ভাষণে কবি সুফিয়া কামাল বাংলা ভাষায় কেন উন্নতমানের বই প্রকাশিত হচ্ছে না সে-বিষয়ে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, ‘সর্বস্তরে বাংলা চালু করা হোক’ কথাটি শুনতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কিন্তু বাস্তবে আমরা তা কতটুকু করতে পেরেছি তার মূল্যায়ন হয় না। সর্বস্তরে আজো বাংলা চালু হয়নি বলেই এদেশে এখনো উন্নতমানের বাংলা বই প্রকাশিত হচ্ছে না।

এই গ্রন্থমেলায় কিছু নতুন বিষয় প্রবর্তন করা হয়। যে সমস্ত প্রকাশকের অন্তত ৫টি মৌলিক গ্রন্থ প্রকাশের অভিজ্ঞতা রয়েছে কেবল তাদের মেলায় অংশ গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। গ্রন্থমেলা ও একাডেমির বই বিক্রি সম্পর্কে দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। গ্রন্থমেলায় স্টল নির্মাণের জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয় ঢেউ টিন প্রদান করে। গ্রন্থমেলার মাঝখানে একটি আলোকসজ্জা স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা স্তম্ভ নির্মাণের ব্যয় বহন করে। একটি প্রকৌশলী সংস্থা বিনা পারিশ্রমিকে স্তম্ভ নির্মাণের পরকল্পনা ও ডিজাইন তৈরি করে। ‘এবার গ্রন্থমেলায় আগের চাইতে বেশি সংখ্যক স্টল নির্মাণের ব্যবস্থা করা হয়’, এ কথা বলা হলে হলেও কত স্টল নির্মিত হয়েছিল তা জানা যায়নি। তবে মেলার আয়তন একাডেমির পুকুর পাড় পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। স্টলের এলাকা বাড়ানোর জন্য পুকুর আংশিকভাবে ভরাট করা হয়। বই পড়া, বই কেনা, একাডেমির বইয়ের প্রচার ইত্যাদি বিষয়ে ২০০ ব্যানার গ্রন্থমেলার বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শিত হয়। ১৯৮৩ সালে প্রথম লিটিল ম্যাগাজিন ও ছাত্রদের জন্য পৃথক স্থান বরাদ্দ করা হয়।

মেলার জন্য ‘পরিচালনা কমিটি’ গঠিত হয়। একাডেমির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, মেলা সংক্রান্ত বিষয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আলোচনা হয়। যেসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আলোচনা হয় সেগুলো ছিলো : জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র, বাংলা একাডেমী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, শিল্পকলা একাডেমী, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, নওরোজ কিতাবিস্তান, আহমদ পাবলিশিং হাউস, মুক্তধারা, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, চৌধুরী পাবলিশার্স, সন্ধানী প্রকাশনী, হাক্কানী পাবলিশার্স, চলন্তিকা বই ঘর, পুস্তক প্রকাশন সমিতি। প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম থেকে বোঝা যায় যে, গ্রন্থমেলা আয়োজনের শুরু থেকে সরকারি ও বেসরকারি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানসমূহ পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতা ও আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার রীতি গড়ে তোলে।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৯৮৩ সালে একটি বিশেষ রাজনৈতিক ও ছাত্র আন্দোলনের পটভূমিকায় গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিত হয়। অনুমান করা যায় যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ক্ষুব্ধ কোনো প্রতিক্রিয়া মেলায় যাতে না-পড়ে সেদিকে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি ছিল। সেজন্যই হয়তো ‘এ বৎসর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য হ্রাসকৃত হারে গ্রন্থমেলা ও ক্যান্টিনের স্টল’ এবং ‘ছাত্রদের জন্য পৃথক স্থান’ বরাদ্দ করা হয়ে ছিল। কিন্তু তবু ১৪ই ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলি এবং কয়েকজন ছাত্রের প্রাণহানির ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা চরমভাবে বিক্ষুব্ধ হয়। সরকার পরিস্থিতি মোকাবের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা এবং শহরে কার্ফু জারি করে। এসবের বিরুপ প্রভাব পড়ে একাডেমির একুশের অনুষ্ঠানমালা ও গ্রন্থমেলার ওপর। ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলি এবং ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীরা একাডেমির আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বর্জন করেন। সরকার একাডেমি কর্তৃপক্ষকে চাপ দিয়ে অনুষ্ঠান ও গ্রন্থমেলা স্বাভাবিকভাবে চালানোর চেষ্টা করে । কিন্তু তাতে ফল হয়নি। ২০শে ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাক-এ প্রকাশিত ‘মঞ্চও নাই প্যাণ্ডেলও নাই’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন থেকে এই সময়ের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় :

বাংলা একাডেমীর একুশের অনুষ্ঠান গতকালও (শনিবার) অনুষ্ঠিত হয় নাই। একাডেমীর অনুষ্ঠানের মঞ্চ, প্যাণ্ডেল [প্যান্ডেল], টেবিল ও চেয়ার সরাইয়া ফেলা হইয়াছে। অবশ্য একাডেমী প্রাঙ্গণের পুস্তক প্রদর্শনী গতকালও অব্যাহত ছিল। তবে ক্রেতা-দর্শকদের ভীড় ছিল একেবারেই কম।

বাংলা একাডেমীতে গতকালের সকালের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা ছিল সকাল ১০টায়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় উত্তীর্ণ হওয়ার পরেও প্রবন্ধকার, আলোচক কিংবা সভাপতি কাহাকেও উপস্থিত না হইতে দেখিয়া নেপথ্য হইতে মাইকে সকালের অনুষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ঐ সময় প্যাণ্ডেলের এক প্রান্তে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক কয়েকজন কর্মকর্তাসহ জনাকয়েক দর্শককে দাঁড়াইয়া থাকিতে দেখা যায়।

একাডেমীর বিকেলের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা ছিল সাড়ে ৪টায়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের আগে ও পরে কিছু সংখ্যক কৌতুহলী দর্শক-শ্রোতা সেখানে গিয়া মঞ্চ ও প্যাণ্ডেল খুলিয়া ফেলার দৃশ্য দেখিতে পান। সে সময় চেয়ার টেবিলও সরাইয়া ফেলা হইতেছিল। একাডেমীর কয়েকজন কর্মকর্তাও দর্শকদের মধ্যে ছিলেন। এ ব্যাপারে একাডেমী কর্তৃপক্ষ কোনরূপ ঘোষণা প্রদান করেন নাই। তবে একাডেমীর একটি সূত্র জানান : “আমাদিগকে ১৮ তারিখ অনুষ্ঠান পুনরায় শুরু করিতে বলা হইয়াছিল। অবস্থার প্রেক্ষিতে আজ দুপুরে আবার বন্ধ রাখিতে বলা হইয়াছে।” একাডেমীর অপর একটি সূত্রে বলা হয় : “অংশগ্রহণকারীগণ কেহই অনুষ্ঠানে যোগদান করিতেছেন না। এমতাবস্থায় মঞ্চ প্যাণ্ডেল মাইক বাবদ প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা গচ্চা দেওয়া নিরর্থক মনে করিয়া ঐগুলি খুলিয়া ফেলা হইয়াছে।”

এ-রকম অবস্থায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রন্থমেলা বন্ধ করা না-হলেও ১৪ই ফেব্রুয়ারির পর থেকে কার্যত মেলা দর্শক-ক্রেতা শূন্য হয়ে পড়ে। যদিও একাডেমি থেকে দাবি করা হয় যে, দর্শক ক্রেতা ও অংশগ্রহণকারীদের অনুরোধে মেলার সময় ৫ই মার্চ পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। অনুমান করা যায় যে, প্রকাশকদের পক্ষ থেকে মেলা আরও কয়েকদিন বাড়ানোর দাবি ছিল এবং একাডেমি তাঁদের দাবির মেনে মেলা ৫ই মার্চ পর্যন্ত বর্ধিত করে।

এখানে ১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালের বইমেলার নামকরণ এবং এই দুই বছরে ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র মিছিলে ট্রাক উঠিয়ে দেওয়ার কারণে বইমেলা বাতিল হওয়া প্রসঙ্গে একটু তথ্যগত ভ্রান্তি দূর করা যেতে পারে। কোনো কোনো লেখায় এসেছে যে, ১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমি প্রথম ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র আয়োজন সম্পন্ন করে। কিন্তু স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষা ভবনের সামনে ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলে ট্রাক তুলে দিলে দুজন ছাত্র নিহত হয়। ওই মর্মান্তিক ঘটনার পর সেই বছর আর বইমেলা করা সম্ভব হয়নি। প্রকৃতপক্ষে ১৯৮৩ সালে গ্রন্থমেলা ৭ই ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে ভালোভাবে শেষ হতে পারেনি। ১৪ই ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের মিছিলে পুলিশের গুলিতে জয়নাল, জাফর, দিপালী সাহা-সহ কয়েকজন ছাত্রের মৃত্যুর কারণে। অর্থাৎ ১৯৮৩ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারির ছাত্র সমাবেশে পুলিশের গুলিবর্ষণের পরে সৃষ্ট ছাত্র আন্দোলনের পটভূমিতে। আর এরশাদের পুলিশ বাহিনী ছাত্র মিছিলে ট্রাক উঠিয়েছিলো ১৯৮৪ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি। সেদিন ট্রাকের চাপায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সেলিম ও দেলোয়ার শহীদ হয়েছিলেন।
Flag Counter


1 Response

  1. Jehangir Alam says:

    Reading the article gives a good sense of feelings and understanding of Bangladeshi language and culture in it’s February setting. Respect the author for bringing many aspects of the existing society.

    With the changing political circumstances of Bangladesh and February setting of Bangladesh it seems there is a gap. Being an overseas Bangladeshi, I now feel shy express myself as Bangladeshi, it lowers my status in the society I live. I hear a lot about development in Bangladesh, but in its regular media, I see 95% negative news. Basically there is no news of development, only news of road accidents, extra judicial killings by the enforcement teams here and there, arrest, one blaming the other etc.

    I am not a fan of any Bangladeshi politics or any personality. I am a confused Bengali.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.