প্রবন্ধ

অমর একুশে বইমেলা : সত্তরের দশক

জালাল ফিরোজ | 2 Feb , 2019  

দুই.
বাংলা একাডেমিতে বইমেলা কীভাবে শুরু হয়েছিল এ-নিয়ে নানা মত, উপাত্ত ও ব্যাখ্যা রয়েছে। একাডেমিতে বইমেলার শুরু স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে। শুরু করেছিলেন প্রকাশনা সংস্থা মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা। এজন্য চিত্তরঞ্জন সাহাকে বইমেলার উদগাতা বলে গণ্য করা হয়। তবে বাংলাদেশে বইমেলার শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার বেশ আগেই। এ-ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমির এক সময়ের কর্মকর্তা এবং পরে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক ও কথাসাহিত্যিক সরদার জয়েনউদ্দিনের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। বিশিষ্ট গবেষক শামসুজ্জামান খান এ-বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন এভাবে :

বাংলাদেশে বইমেলার উদ্ভবের ইতিহাস খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। বইমেলার চিন্তাটি এ দেশে প্রথমে মাথায় আসে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সাবেক পরিচালক সরদার জয়েনউদদীনের। তিনি বাংলা একাডেমিতেও একসময় চাকরি করেছেন। বাংলা একাডেমি থেকে ষাটের দশকের প্রথম দিকে তিনি গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক পদে নিয়োগ পান। তিনি যখন বাংলা একাডেমিতে ছিলেন, তখন বাংলা একাডেমি প্রচুর বিদেশি বই সংগ্রহ করত। এর মধ্যে একটি বই ছিল Wonderful World of Books. এই বইটি পড়তে গিয়ে তিনি হঠাৎ দুটি শব্দ দেখে পুলকিত বোধ করেন। শব্দ দুটি হলো: ‘Book’ এবং ‘Fair’. কত কিছুর মেলা হয়। কিন্তু বইয়েরও যে মেলা হতে পারে এবং বইয়ের প্রচার-প্রসারের কাজে এই বইমেলা কতটা প্রয়োজনীয়, সেটি তিনি এই বই পড়েই বুঝতে পারেন। ওই বইটি পড়ার কিছু পরেই তিনি ইউনেস্কোর শিশু-কিশোর গ্রন্থমালা উন্নয়নের একটি প্রকল্পে কাজ করছিলেন। কাজটি শেষ হওয়ার পর তিনি ভাবছিলেন বিষয়গুলো নিয়ে একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করবেন। তখন তাঁর মাথায় আসে, আরে প্রদর্শনী কেন? এগুলো নিয়ে তো একটি শিশু গ্রন্থমেলাই করা যায়। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। তিনি একটি শিশু গ্রন্থমেলার ব্যবস্থাই করে ফেললেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি) নিচতলায়। যত দূর জানা যায়, এটাই ছিল বাংলাদেশের প্রথম বইমেলা। এটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬৫ সালে।

শিশু গ্রন্থমেলা করে সরদার জয়েনউদদীন পুরোপুরি তৃপ্ত হতে পারেননি। আরও বড় আয়োজনে গ্রন্থমেলা করার তিনি সুযোগ খুঁজতে থাকেন। সুযোগটি পেয়েও যান। ১৯৭০ সালে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সহযোগিতায় নারায়ণগঞ্জে একটি গ্রন্থমেলার আয়োজন করা হয়। এই মেলায় আলোচনা সভারও ব্যবস্থা ছিল। সে সব আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তৎকালীন প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুল হাই, শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ও সরদার ফজলুল করিম। এই মেলায় সরদার জয়েনউদদীন একটি মজার কাণ্ড করেছিলেন। মেলায় যে রকম বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন, উৎসুক দর্শকেরাও এসেছিলেন প্রচুর, বইয়ের বেচাকেনাও মন্দ ছিল না কিন্তু তাদের জন্য ছিল একটি রঙ্গ-তামাশাময় ইঙ্গিতধর্মী বিষয়ও। মেলার ভেতরে একটি গরু বেঁধে রেখে তার গায়ে লিখে রাখা হয়েছিল ‘আমি বই পড়ি না’। সরদার জয়েনউদদীন সাহেবের এই উদ্ভাবনা দর্শকদের ভালোভাবেই গ্রন্থমনস্ক করে তুলেছিল বলে অনুমান করি।

এখানেই সরদার জয়েনউদদীন থেমে থাকেননি। ১৯৭২ সালে তিনি যখন গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক, তখন ইউনেস্কো ওই বছরকে ‘আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করে। গ্রন্থমেলায় আগ্রহী সরদার সাহেব এই আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ উপলক্ষে ১৯৭২ সালে ডিসেম্বর মাসে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একটি আন্তর্জাতিক গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন। সেই থেকেই বাংলা একাডেমিতে বইমেলার সূচনা।

১৯৭২ সালে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলা একাডেমির একুশের অনুষ্ঠানে কোনো বইমেলা হয়নি। তবে বাংলা একাডেমির দেয়ালের বাইরে স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের রুহুল আমিন নিজামী তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রগতি প্রকাশনীর কিছু বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেন। তাঁর দেখাদেখি মুক্তধারা প্রকাশনীর চিত্তরঞ্জন সাহা এবং বর্ণমিছিলের তাজুল ইসলামও ওভাবেই তাঁদের বই নিয়ে বসে যান। ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে একটি বিশাল জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই মেলার উদ্বোধন করেন। সে উপলক্ষে নিজামী, চিত্তবাবু এবং বর্ণমিছিলসহ সাত-আটজন প্রকাশক একাডেমির ভেতরে পূর্ব দিকের দেয়ালঘেঁষে বই সাজিয়ে বসে যান। সে বছরই প্রথম বাংলা একাডেমির বইয়েরও বিক্রয়কেন্দ্রের বাইরে একটি স্টলে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। এভাবেই বিচ্ছিন্ন বই বিক্রির উদ্যোগের ফলে ধীরে ধীরে বাংলা একাডেমিতে একটি বইমেলা আয়োজনের জন্য গ্রন্থমনস্ক মানুষের চাপ বাড়তে থাকে।

১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত একুশের স্মারকগ্রন্থ ’৮৬-তে ‘গ্রন্থমেলা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ১৯৭২ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত গ্রন্থমেলার ইতিহাস লেখা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে ১৯৮০ সাল থেকে প্রতিবছরের ওপর আলাদা বিবরণ দেয়া হলেও ১৯৭২ থেকে ১৯৭৯ সালের গ্রন্থমেলার কথা সংক্ষেপে একটি অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে :

১৯৭২ সাল থেকে বাংলা একাডেমী তার নিজস্ব প্রকাশনা একুশ উপলক্ষে হ্রাসকৃত মূল্যে বিক্রয় করে আসছিলো। ১৯৭৪ সালে একুশ উপলক্ষে একাডেমীতে জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে একাডেমীর বই প্রদর্শিত হয়। ১৯৭৫ সালে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে অস্থায়ীভিত্তিতে একাডেমীর গেটের কাছে খোলা আকাশের নীচে একুশ উপলক্ষে মুক্তধারা একাডেমীর কাছে বই বিক্রির অনুমতি চায়। একাডেমী অনানুষ্ঠানিকভাবে অনুমতি প্রদান করে। ১৯৭৬ সালে মুক্তধারা এবং আহমদ পাবলিশিং হাউস অনুরূপভাবে বই বিক্রি করে। ১৯৭৭ সালে মুক্তধারা, আহমদ পাবলিশিং হাউস, নওরোজ, চলন্তিকা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান অনুরূপভাবে বই বিক্রি করে এবং এ ব্যবস্থা অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবেই একাডেমীর প্রকাশন মুদ্রণ বিক্রয় বিভাগের তত্ত্বাবধানে চলছিল। ১৯৭৮ সালে …একাডেমীর প্রকাশনা, মুদ্রণ ও বিক্রয় বিভাগ একুশ উপলক্ষে গ্রন্থমেলার আয়োজন করে। ১৯৭৯ সালে একাডেমীর উদ্যোগে আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সহযোগিতায় অনুমোদিত ব্যবস্থা হিসেবে একাডেমীর প্রাঙ্গণে পূর্ণাঙ্গ ২১-এর গ্রন্থমেলা শুরু হয়। ১৯৮৫-তে এই গ্রন্থমেলার নামকরণ করা হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’।

প্রথম মহাপরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর ড. মযহারুল ইসলামের অধীনে একাডেমি ১৯৭৩ সালে প্রথম একুশের অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে। নতুন মহাপরিচালক একুশের অনুষ্ঠানের ওপর জোর দেন। ১২ই ফেব্রুয়ারি মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায় ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে ‘বাংলা একাডেমী প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ শতকড়া ২০ ভাগ কমমূল্যে বিক্রয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’ কার্যনির্বাহী পরিষদের এই সভায় বাংলা একাডেমি ও প্রাক্তণ বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের প্রকাশিত সকল গ্রন্থের ১ কপি একাডেমির জীবন ও বার্ষিক সদস্যদের কাছে ১৫ শতাংশ কমিশনে বিক্রিরও সিদ্ধান্ত হয়।

১৯৭৪ সালে দেশের সংস্কৃতি জগতের সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল বাংলা একাডেমি কর্তৃক জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন। ৮-দিনব্যাপী সাহিত্য সম্মেলনে দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গণের মানুষের বিপুল অংশগ্রহণ ছিল। এই সম্মেলন ১৪ই ফেব্রুয়ারি থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলে। সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সদ্য-স্বাধীন দেশের স্থপতি ও সরকারের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক সম্মেলনের উদ্বোধন ঘোষণা। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কবি জসিমউদদীন।

সাহিত্য সম্মেলন উপলক্ষে একাডেমি লোকশিল্প প্রদর্শন, গ্রন্থমেলা এবং ম্যুরাল চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। গ্রন্থমেলার উদ্বোধন করেছিলেন প্রফেসর আবু মোহামেদ হাবীবুল্লা। এই বছরের গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমির বই বিশেষ কমিশনে বিক্রি হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশের অনুষ্ঠানমালা শুরু হয়। অনুষ্ঠানমালার মধ্যে ছিলো সেমিনার, সাংস্কৃতিক পর্ব ও বিশেষ কমিশনে একাডেমির বই বিক্রির ব্যবস্থা। ৮ই ফেব্রুয়ারি অন্নদাশংকর রায়ের নেতৃত্বে ভারতীয় লেখকদের একটি প্রতিনিধি দল একাডেমির অমর একুশের অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। এই দলে অন্যদের মধ্যে ছিলেন লীলা রায়, মৈত্রেয়ী দেবী, মনোজ বসু, নরেশ গুহ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অমিত বন্দোপাধ্যায়, নীলরতন সেন, মুলুক রাজ আনন্দ, কৃষাণ চন্দর প্রমুখ।

একাডেমি প্রাঙ্গণে বিশেষ কমিশনে বই বিক্রির যে ব্যবস্থা করা হয়েছিলো তাতে অন্যান্য প্রকাশনা সংস্থাকে অংশ নিতে আহ্বান জানানো হয়। যেসব প্রতিষ্ঠান আগ্রহী তাদের একাডেমির সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও অনুরোধ করা হয়। একাডেমির আহ্বান ও অনুরোধে সাড়া দিয়ে কয়টি প্রতিষ্ঠান সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলো বা বই বিক্রিতে অংশ নিয়েছিলো তা জানা যায়নি। এই বছর একাডেমি প্রাঙ্গণে বই বিক্রির ব্যবস্থা সম্পর্কে কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়নি। তবে এই বছরই প্রথম একটি প্রকাশনা সংস্থা একুশে স্মরণে তিনজন কবির তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করে এবং সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এসব বই প্রকাশের খবর প্রচার করে। এর পূর্ববর্তী বছরগুলোতে কেবল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে প্রকাশিত ‘একুশের সংকলন’ নিয়ে প্রচার ও আলোচনা হতো। এই বছরই প্রথম একুশে উপলক্ষে সন্ধানী থেকে প্রকাশিত কবি শামসুর রাহমানের ‘আদিগন্ত নয় পদধ্বনি’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘প্রতিধ্বনিগণ’ এবং আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘কমলের চোখ’ এই তিনটি বই প্রকাশ বিষয়ক বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। একুশে উপলক্ষে বই প্রকাশের এই উদ্যোগ প্রসংশিত হয়। কেবল একুশের সংকলন নয়, ‘২১শে ফেব্রুয়ারীতে বই প্রকাশ করার এই রীতি অনুকরণযোগ্য’ বলে সংবাদপত্রে প্রশংসাসূচক মন্তব্য ছাপা হয়।

১৯৭৫ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উদ্যোগে চট্টগ্রামে ‘জাতীয় গ্রন্থমেলা’ অনুষ্ঠিত হয়। ১৫ই ফেব্রুয়ারি শ্রম, সমাজকল্যাণ, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী এই মেলা উদ্বোধন করেন। মিউনিসিপ্যাল মডেল হাইস্কুল প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এই মেলা এক সপ্তাহ ধরে চলে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবুল ফজল। উপস্থিত ছিলেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক সরদার জয়েনউদ্দিন। তখন মেলায় কেবল দেশি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো নয়, বিভিন্ন দূতাবাস থেকেও অংশ নেয়া হতো। এজন্য এই বছরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সোভিয়েট ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, পোলান্ড ইত্যাদি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

অমর একুশে উদযাপনের জন্য ১৯৭৬ সালে বাংলা একাডেমি আয়োজিত সপ্তাহব্যাপি অনুষ্ঠানমালার একটি অংশ ছিলো ‘বিশেষ কমিশন’-এ বই বিক্রি। অনুষ্ঠানমালার মধ্যে ১৫ থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারি আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। ১৫ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠানমালা উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা অধ্যাপক আবুল ফজল। উদ্বোধন ছাড়া সপ্তাহের বিভিন্ন দিন ‘বাংলাদেশের সাহিত্যের গবেষণা’, ‘মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী’, ‘বাংলাদেশের লোক সাহিত্য’, ‘মোহাম্মদ আবদুল হাই’, ‘সওগাত থেকে সমকাল’ ইত্যাদি বিষয়ে প্রবন্ধ পাঠ ও আলোচনা করা হয়। এছাড়া প্রতিদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত প্রতি বছর অমর একুশের অনুষ্ঠানে ভারতের অনেক লেখক ও বুদ্ধিজীবী অংশ নেন। ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ১৯৭৬ সালে ভারতের লেখক-সাহিত্যিকদের ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানমালায় অংশ নেওয়ার পরিস্থিতি আর থাকেনি। এই অবস্থায় একাডেমি বিদেশ থেকে অতিথি আসা সম্পর্কে ঘোষণা দেয়। ৩রা ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত একাডেমির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় : ‘এ বছর বিদেশ থেকে বাংলা একাডেমীতে কোন অতিথি আসছেন না।’

১৯৭৬ সালে একাডেমির অমর একুশে অনুষ্ঠানমালার একটি দিক ছিলো বিশেষ কমিশনে বই বিক্রি করা। বিশেষ কমিশনে বই বিক্রিতে অন্য প্রকাশকদের অংশ নিতে আহ্বান জানানো হয়েছিল কিনা এই তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সংবাদপত্রে বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন থেকে বোঝা যায় যে, একাডেমি ছাড়া অন্য কিছু প্রকাশনা সংস্থারও বই বিক্রির ব্যবস্থা ছিলো। ইত্তেফাক-এ ১৫ ও ২০শে ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির দুই কলাম ১০ ইঞ্চি সাইজের একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। এই বিজ্ঞাপনের শিরোনাম ছিলো ‘বাংলা একাডেমীর বই’। মাঝঝানে ছিলো একাডেমি থেকে প্রকাশিত ১৩টি গ্রন্থ, পত্রিকা ও সংকলনের শিরোনাম এবং লেখক/সম্পাদকদের নাম। নিচে লেখা হয় : ‘একুশের সপ্তাহে বাংলা একাডেমীর সকল বই বিশেষ কমিশনে বিক্রি হবে’। প্রকাশনী সংস্থা মাওলা ব্রাদার্স ও মুক্তধারার পক্ষ থেকেও একাডেমিতে বিশেষ কমিশনে বই বিক্রি হচ্ছে বলে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। মুক্তধারা-র বিজ্ঞাপনে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আয়োজিত রাজশাহী গ্রন্থমেলা এবং বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের বই বিক্রির কথা উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয় : ‘জাতীয় গ্রন্থমেলা উপলক্ষে ২১শে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত মুক্তধারার বই বাংলা একাডেমী ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ‘মুক্তধারা’র স্টলে ১৫% কমিশনে বিক্রী হচ্ছে।’ মাওলা ব্রাদার্সের বিজ্ঞাপনে কেবল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের বই বিক্রির কথা উল্লেখ করা হয়।

বিশেষ কমিশনে বই বিক্রির পাশাপাশি এই বছর একদিনের জন্য একটি পুস্তক প্রদর্শনী হয়। এতে কেবল শিশুদের বই প্রদর্শিত হয়। ১৬ই ফেব্রুয়ারি এই প্রদর্শনী উদ্বোধন করার কথা ছিলো কবি সুফিয়া কামালের। কিন্তু তিনি আসেননি বলে শিল্পী কামরুল হাসান প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন। বাংলা একাডেমি-সহ আরও কিছু প্রকাশনা সংস্থার বই প্রদর্শিত হয়। কোন কোন প্রকাশনা সংস্থার বই প্রদর্শিত হয়েছিলো তা জানা যায়নি। তবে প্রদর্শনীতে মোট প্রায় ২০০ বই প্রদর্শিত হয়েছিলো বলে সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে উল্লিখিত হয়।

১৯৭৬ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উদ্যোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জাতীয় গ্রন্থমেলা’ অনুষ্ঠিত হয়। ১৫ থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই মেলা চলে। ৭টি বিদেশি দূতাবাস-সহ ৩৮টি প্রকাশনা ও বিক্রয় সংস্থা এই মেলায় অংশ নেয়। এই বই মেলায় ৭ দিনে মোট ৩ লাখ টাকার বই বিক্রি হয়। সেই সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বইমেলা ‘সার্থক ও উদাহরণ সৃষ্টিকারী ঘটনা’ বলে বিবেচিত হয়। সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে এই মেলায় কত দর্শক-ক্রেতা অংশ নিয়েছিলেন, কত টাকার বই বিক্রি হয়েছিলো, দেশের গ্রন্থজগতের ও পাঠকদের সুবিধার জন্য ভবিষ্যতে কী করা উচিত ইত্যাদি বিষয়ও ওঠে আসে। একটি প্রতিবেদেওনে বলা হয় :

এ মেলা দেখিয়ে দিয়েছে গ্রন্থমেলা শুধু সার্থকভাবে অনুষ্ঠিতই হয় না, বইয়ের মেলায় বই বিক্রয় হয়, বিপুল সংখ্যক দর্শক সমাবেশও ঘটে। রাজশাহীর এই গ্রন্থমেলায় প্রতিদিন রারো থেকে চৌদ্দ হাজার লোক এসেছে ও মেলা দেখেছে। প্রায় এক লাখ বা দেড় লাখ লোক সাত দিনে মেলায় এসেছিলেন। এটা একটা অভূতপূর্ব ঘটনা। …প্রকৃতপক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত গ্রন্থমেলা মেলাই হয়ে উঠেছিল। উৎসবমুখর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কিংবা বইয়ের মেলায় সবাই বইয়ের কথা বলেছেন, বই কিনেছেন অথবা বই দেখেছেন। মেলা তো অনেক রকমের হয়, কিন্তু বইয়ের মেলা একটা ভিন্ন ব্যাপার, স্বাদে-গন্ধে রূপে একেবারে আলাদা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী ও অধ্যাপক-অধ্যাপিকাগণ ছাড়াও রাজশাহী শহরের লোকজনও মেলায় এসেছেন। …‘লোকে বই কেনে না’ এটাও আর সত্য নয়। বইয়ের পাঠক আছে, সমঝদার আছে। কিন্তু বইয়ের দাম কমানো দরকার, অথচ বইয়ের শোভন মুদ্রণকেও উৎসাহিত করতে হবে।…রাজশাহী গ্রন্থমেলার সার্থকতা দিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ রচিত হোক, এ কামনা জানাই আন্তরিকভাবে।

১৯৭৭ সালে অমর একুশে উদযাপনের জন্য বাংলা একাডেমি সপ্তাহব্যাপি অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে। এর মধ্যে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিতর্ক প্রতিযোগিতা ছিল। কিন্তু বইমেলা বা হ্রাসকৃতমূল্যে বই বিক্রির কোনো ব্যবস্থা ছিলো না। ১৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠানমালা চলে। ১৫ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠানমালা উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা অধ্যাপক আবুল ফজল। এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের খবর পরের দিন বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়। বাংলা একাডেমির অনুষ্ঠানমালার মধ্যে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্রদের জন্য ‘বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের সামাজিক প্রয়োজন মিটাতে ব্যর্থ হয়েছে’ শীর্ষক বিতর্ক প্রতিযোগিতা ছিলো বেশ আগ্রোদ্দীপক।

কেবল বাংলা একাডেমি নয়, অন্য কোনো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও এই বছর একাডেমি প্রাঙ্গণে বই বিক্রির কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এর প্রধান কারণ হতে পারে দেশের বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি। প্রেসিডেন্ট জিয়ার সামরিক শাসন তখনও ছিলো। ‘ঘরোয়া রাজনীতি’র বিশেষ অবস্থা হয়তো প্রকাশকদের কাছে বইমেলা বা বই বিক্রির আয়োজন করার জন্য উপযুক্ত মনে হয়নি। এই বছর জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উদ্যোগে খুলনায় ‘জাতীয় বইমেলা’ অনুষ্ঠিত হয়। এই মেলা বই বিক্রি ও দর্শক ক্রেতার অংশগ্রহণের দিক থেকে সফল হয় তা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লিখিত হয়। একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় :

আট দিন ব্যাপী মেলা হলো। প্রতিদিনই হাজার হাজার নর-নারীর ভিড়ে মেলা অংগন মুখর হয়েছে।… গ্রন্থমেলার সফলতার উল্লেখযোগ্য দিক হলো বই বিক্রি। অবশ্য প্রথম দু’দিন তেমন বই বিক্রি হয়নি।… কিন্তু তারপর যা হলো–দু’তিন দিনেই বই প্রায় শেষ।…বিভিন্ন শিল্প-কারখানা ও স্কুল-কলেজের লাইব্রেরীগুলোতে বই কেনার জন্য নতুন করে অতিরিক্ত বাজেট তৈরী করা হয়েছে। এ রকম অনেক সংস্থাই বই কেনার জন্য মেলায় এসেছেন। মেলার শেষ দিন রাত দশটায় শিপিং ইয়ার্ড থেকে লোক এলেন তাদের পাঠাগারের জন্য কয়েক হাজার টাকার বই কিনতে। স্টল বন্ধ হয়ে গেছে এবং ভালো বই ফুরিয়ে গেছে জেনে তারা প্রায় হতাশ হয়ে পড়লেন। শেষ পর্যন্ত বেছে বেছে কিছু বই তাঁদের দিতে হলো। …মোট কথা এবার খুলনা মেলায় বই-কেনা, বই বেচা, বই-এর গানে ‘নদে’ ভেসে গেল।

১৯৭৮ সালের বইমেলা নিয়ে বাংলা একাডেমির অন্তত দুইটি প্রকাশনায় যেসব তথ্য দেয়া হয়েছে তা সেই সময়ের সংবাদপত্রসমূহে প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে অঙ্গতিপূর্ণ। একাডেমির একুশের স্মারকগ্রন্থ ’৮৬-র ১৭৩ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘১৯৭৮ সালে একাডেমীর তৎকালীন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকীর নির্দেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একাডেমীর প্রকাশনা, মুদ্রণ ও বিক্রয় বিভাগ একুশ উপলক্ষে গ্রন্থমেলার আয়োজন করে।’ ১৯৯৬ সালে একাডেমি থেকে প্রকাশিত বাংলা একাডেমী স্মারকগ্রন্থ : চল্লিশ বর্ষ পূর্তি গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত খালেদা এদিব চৌধুরীর ‘বাংলা একাডেমী এবং বইমেলা’ শীর্ষক নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘পূর্ণাঙ্গ মেলা শুরু হয়েছিল ১৯৭৮ সালে’ । প্রকৃত পক্ষে ১৯৭৮ সালে একাডেমিতে চিরায়ত অর্থে কোনো বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়নি। এই বছর একুশে উদযাপন কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাংলা একাডেমি প্রধানত সপ্তাহপব্যাপি আলোচনা সভার আয়োজন করে। এই কর্মসূচি ১৫ই ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে ২১শে ফেব্রুয়ারি শেষ হয়। ১২ই ফেব্রুয়ারি সংবাদপত্রসমুহে প্রকাশিত বাংলা একাডেমির এক সংবাদ-বিজ্ঞপ্তি সূত্রে প্রকাশিত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে, একাডেমি একুশ উদযাপনের অংশ হিসেবে পক্ষকালব্যাপি ‘হ্রাসকৃতমূল্যে পুস্তক বিক্রির’ ব্যবস্থাও করেছে। এভাবে হ্রাসকৃতমূল্যে বই বিক্রির ব্যবস্থা একাডেমি আগেও করেছে। এই বছর অন্য প্রকাশকদেরও হ্রাসকৃতমূল্যে বই বিক্রিতে অংশ নিতে আহ্বান জানানো হয়। একুশের স্মারকগ্রন্থ ’৮৬-তে একাডেমির ‘প্রকাশনা, মুদ্রণ ও বিক্রয় বিভাগ একুশ উপলক্ষে গ্রন্থমেলার আয়োজন করে’ বলে উল্লেখ করা হলেও আসলে ঐ বছর হ্রাসকৃতমূল্যে বই বিক্রিতে ‘যে সমস্ত প্রকাশনা সংস্থা বিক্রয়ে অংশ লইতে ইচ্ছুক তাহাদিগকে অবিলম্বে বাংলা একাডেমীর সংস্কৃতি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করার’ অনুরোধ জানানো হয়। দুই জায়গায় একাডেমির দুইটি বিভাগের নাম উল্লেখের প্রসংগ নিয়ে আলোচনার একটি তাৎপর্য আছে। একুশের স্মারকগ্রন্থ ’৮৬-তে ‘প্রকাশনা, মুদ্রণ ও বিক্রয় বিভাগ গ্রন্থমেলার আয়োজন করেছে’ বলে যে উল্লেখ করা হয়েছে তা যথাযথ নয়। আসলে ঐ বছর সংস্কৃতি বিভাগের অধীনে প্রধানত আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করা হয়েছিল। এসবের পাশাপাশি পক্ষকালব্যাপি হ্রাসকৃতমূল্যে বই বিক্রির ব্যবস্থাও ছিল। এটি সংস্কৃতি বিভাগের অধীনেই হয়েছিলো। এই বিক্রিতে অংশ নিতে অন্য প্রকাশকদের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্বও সংস্কৃতি বিভাগের ওপরই ছিল। পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থমেলা হলে এই দায়িত্ব প্রকাশনা, মুদ্রণ ও বিক্রয় বিভাগকে দেওয়া হতো। খালেদা এদিব চৌধুরীর লেখায় ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমিতে বড় আকারে বইমেলা হয়েছিল বলে যে উল্লেখ করা হয়েছে তা-ও সঠিক নয়। আসলে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উদ্যোগে বাংলা একাডেমিতে বড় পরিসরে বইমেলা হয়েছিল ১৯৭৯ সালে।

১৯৭৮ সালে সংস্কৃতি বিভাগের সঙ্গে কতটি প্রকাশনা সংস্থা যোগাযোগ করেছিল, কী কী শর্তে বা কী কী সুযোগ সুবিধা-সহ তাদের হ্রাসকৃতমূল্যে বই বিক্রিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল এসব সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সংবাদপত্রে প্রকাশিত কিছু বিজ্ঞাপন থেকে কতটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল এবং কতদিন বই বিক্রি চলেছিল এসব বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায়। প্রকাশকদের ‘হ্রাসকৃতমূল্যে পুস্তক বিক্রির’ আয়োজনে অংশ নিতে আহ্বান জানিয়ে বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে কোনো বিজ্ঞাপন প্রচারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে দৈনিক বাংলা-য় ২০শে ও ২৪শে ফেব্রুয়ারি এবং দৈনিক ইত্তেফাকে ২৩শে ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপন থেকে কয়টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল সে-সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বিজ্ঞাপনটিতে বলা হয় : ‘২১শে ফেব্রুয়ারী উপলক্ষে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে পুস্তক প্রদর্শনী ও ২০% কমিশনে বিক্রি।। অংশগ্রহণে : বাংলা একাডেমী, নওরোজ কিতাবিস্তান, খান ব্রাদার্স এন্ড কো:, বাংলাদেশ বুকস ইন্টারন্যাশনাল লি:, শিশু একাডেমী, বিশ্ব বিচিত্রা, চলন্তিকা বইঘর, আহমদ পাবলিশিং হাউজ ও অন্যান্য প্রকাশক।। ২৮শে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত।।’ ‘অন্যান্য প্রকাশক’ থাকায় মোট কতটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে অনুমান করা যায় সর্বোচ্চ ৫ জন অন্য প্রকাশক অংশ নিয়ে থাকলে মোট ১৪টি প্রতিষ্ঠান ১৯৭৮ সালের গ্রন্থমেলায় অংশ নিয়েছিল। এই বছরের মেলার একটি বিশেষ দিক হলো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে ২০% কমিশনে বই বিক্রি হচ্ছে এই বিষয়ে প্রচারণা চালানো। উপর্যুক্ত বিজ্ঞাপনটি কোন প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া হয়েছিল তা বিজ্ঞাপনটিতে উল্লিখিত ছিল না। তবে এটা নিশ্চিত যে বাংলা একাডেমি এই বিজ্ঞাপন দেয়নি। বাংলা একাডেমি দিলে এতে একাডেমির লগো, শ্লোগান ও বৈশিষ্ট্যধর্মী বক্তব্য থাকতো। সুতরাং কোনো প্রকাশনা সংস্থার পক্ষ থেকেই বিজ্ঞাপনটি প্রচারিত হয়েছিলো। এটি ছাড়া প্রকাশনা সংস্থা মুক্তধারা একটি বিজ্ঞাপন প্রচার করে। বিজ্ঞাপনটি ছিলো এ-রকম : ‘২১শে ফেব্রুয়ারী উপলক্ষে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে মুক্তধারার বই ও ২০% কমিশনে ২৮শে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে।।’ ১৫-২৮শে ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই বিজ্ঞাপন প্রায় প্রতিদিন বিভিন্ন পত্রিকায় প্রচারিত হয়। সেই সময়ের আর একটি বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আহমদ পাবলিশিং হাউজও একাডেমি প্রাঙ্গণে বই বিক্রি বিষয়ে একটি বিজ্ঞাপন প্রচার করে। তখন বিশ্বখ্যাত মুষ্টিযোদ্ধা মুহম্মদ আলী বাংলাদেশ সফর করছিলেন। মুহম্মদ আলীকে নিয়ে আহমদ পাবলিশিং হাউজ একটি বই প্রকাশ করেছিলো। এই বইয়ের প্রচারের জন্য এই সংস্থা একটি বিজ্ঞাপন প্রচার করে। তাদের দুই কলাম বিজ্ঞাপনটিতে বলা হয় : ‘প্রখ্যাত সাহিত্যিক শাহাবুদ্দীন আহমদ লিখিত মুহম্মদ আলী ও মুষ্টিযুদ্ধের দশ মহারথী প্রকাশিত হয়েছে। মুষ্টিযুদ্ধের চিত্র শোভিত অপূর্ব ভাষায় লেখা এই গ্রন্থের মূল্য : মাত্র চৌদ্দ টাকা।। ২১শে ফেব্রুয়ারী উপলক্ষে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে ১৫ই ফেব্রুয়ারী থেকে ২৮শে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য প্রদর্শনীতে আমাদের যাবতীয় গ্রন্থ ২০% কমিশনে বিক্রয় হচ্ছে।। আহমদ পাবলিশিং হাউজ, জিন্দাবাহার, ঢাকা।’ একাডেমিতে বই বিক্রি ও নতুন বইয়ের খবর বিয়ে আরেকটি দুই কলাম বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়েছিলো ইত্তেফাক-এ। এই বিজ্ঞাপনেও প্রচারকারী কোনো সংস্থার নাম ছিলো না। বিজ্ঞাপনটি ছিলো এ-রকম : ‘বই বই বই মোস্তফা হারূন অনূদিত মান্টো ও কালো শেলোয়ার।। ২১শে ফেব্রুয়ারী উপলক্ষে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গনে কমিশনে বিক্রি হচ্ছে।। বোর্ড বাঁধাই ছয় টাকা সুলভ ৫.০০।’

এই বছর একাডেমি প্রাঙ্গণে বই বিক্রির বিষয়টি প্রচারের জন্য বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা যেসব উদ্যোগ নিয়েছে সেই তুলনায় বাংলা একাডেমির ভূমিকা ছিলো অনেকটা নিস্পৃহ। ১৫ই ফেব্রুয়ারি একুশের অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একাডেমির মহাপরিচালক বেশ দীর্ঘ একটি বক্তৃতা দেন। এতে তিনি একাডেমির বিভিন্ন বিভাগের কার্যক্রম তুলে ধরেন। এই পুরো বক্তৃতা দৈনিক সংবাদ-এ ‘স্বাগত ভাষণ’ শিরোনামে ছাপা হয়। মহাপরিচালক তাঁর এই ভাষণে বইমেলা বা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিতব্য ‘হ্রাসকৃতমূল্যে পুস্তক বিক্রির’ বিষয়ে কিছু বলেননি। এতে বোঝা যায় সেই বছর একাডেমির বিবেচনায় বই বিক্রি বা বইমেলা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য ছিল না।

১৯৭৯ সালের বইমেলার আয়োজন সম্পর্কে বাংলা একাডেমির একুশের স্মারকগ্রন্থ ৮৬-তে বলা হয়েছে, ‘১৯৭৯ সালে একাডেমীর উদ্যোগে আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সহযোগিতায় অনুমোদিত ব্যবস্থা হিসেবে একাডেমীর প্রাঙ্গণে ২১-এর গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিত হয়।’ এতে ২২টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। এগুলো হলো : আহমদ পাবলিশিং হাউস, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, লালন সাহিত্য সংসদ, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বিক্রয় বিভাগ, বাংলাদেশ বুকস ইন্টারন্যাশনালস, আজিজিয়া কুতুবখানা, নূর লাইব্রেরি, নওরোজ কিতাববিস্তান, স্টান্ডার্ড পাবলিশার্স, বাংলা একাডেমি, মুক্তধারা, ইউনিভার্সিটি প্রেস, খান ব্রাদার্স, বিশ্ব বিচিত্রা, শিশু একাডেমী, সূবর্ণ প্রকাশনী, বুকস এন্ড পিরিয়ডিক্যালস, জাতীয় চার্চ পরিষদ, চলন্তিকা বইঘর, আধুনিক প্রকাশনী, স্টুডেন্ট ওয়েজ এবং আলীগড় প্রকাশনী। এই ২২টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ছাড়া টেবিল পেতে লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শণ ও বিক্রির ব্যবস্থা করেছিল উৎসাহী সাহিত্যামোদী তরুণরা। আয়তনের দিক থেকে বড় স্টল ছিল মুক্তধারার।

২৮শে ফেব্রুয়ারি মেলা শেষ হয়েছিল। শেষের দিন একটি বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। সেটি ছিল ‘লেখকদের স্বাক্ষরযুক্ত গ্রন্থ বিক্রির ব্যবস্থা’। কোন কোন লেখক অংশ নিয়েছিলেন বা একেক জন লেখক কতটি বইয়ে স্বাক্ষর করেছিলেন এসব তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের আমন্ত্রণে নিজ নিজ গ্রন্থে স্বাক্ষর দেয়ার জন্য অনেক লেখক উপস্থিত হয়েছিলেন। এই বইমেলায় বিভিন্ন স্টল কত টাকার বই বিক্রি করেছে এই তথ্য পাওয়া গেছে। মুক্তধারা একা বিক্রি করে ৫২ হাজার টাকার বই। বিক্রিতে দ্বিতীয় স্থান ছিল আহমদ পাবলিশিং হাউসের। দুই একটি সৌখিন এবং স্বল্পসংখ্যক বইসম্পন্ন স্টল ছাড়া প্রতিটি স্টলেই দশ হাজার টাকার উর্ধে বিক্রি হয়। ২১ দিনে মেলায় মোট বিক্রির পরিমাণ প্রায় চার লাখ টাকা। মেলায় বিশ্রাম, আড্ডা ও কফি বিক্রির ব্যবস্থা করেছিল ‘জাতীয় চার্চ পরিষদ’। তবে ‘কফির উচ্চমূল্যে সেখানে আড্ডা জমানোর উৎসাহ তরুণ কবি-সাহিত্যিকরা তেমন দেখাননি’।

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.