প্রবন্ধ

অমর একুশে বইমেলা : অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

জালাল ফিরোজ | 1 Feb , 2019  


১লা ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে বইমেলা ২০১৯-এর শুরু। প্রতি বছর বইমেলা হয়। সারাবিশ্বের বাংলাভাষী মানুষের দৃষ্টি থাকে এই বইমেলার প্রতি। কিন্তু এই বইমেলা কীভাবে শুরু হয়েছিল? এখন কেমন হচ্ছে বইমেলা? এই মেলার ভবিষ্যৎ কেমন? বইমেলার সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে? অমর একুশে বইমেলা সম্পর্কিত এসব প্রশ্নের গবেষণালব্ধ উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন ড. জালাল ফিরোজ। জালাল ফিরোজ বাংলা একাডেমির একজন পরিচালক। তিনি গত পাঁচ বছর থেকে বইমেলার সদস্য-সচিবের দায়ত্ব পালন করছেন। তাঁর লেখাটি ২৮ কিস্তিতে শেষ হবে।

১. অমর একুশে বইমেলা : আগে যা লেখা হয়েছে
অমর একুশে বইমেলার ওপর এখনও কোনো বিস্তৃত গ্রন্থ রচিত হয়নি। তবে অমর একুশে বইমেলা নিয়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন ও প্রবন্ধ/নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। দেশের প্রখ্যাত কয়েকজন লেখকের কিছু প্রবন্ধ/বক্তৃতায় বইমেলা প্রসংগ এসেছে। বর্তমান লেখার এই অংশে বইমেলা নিয়ে আগে যেসব আলোচনা/বিশ্লেষণ হয়েছে সে সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

অমর একুশে গ্রন্থমেলার ওপর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন পত্রিকায় ফেব্রুয়ারি মাসে সংবাদ-প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। মেলার শেষ দিন গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। এসব প্রতিবেদনের বাইরে এখন পর্যন্ত গ্রন্থমেলার ওপর তিনটি বিস্তৃত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদন থেকে গ্রন্থমেলার ইতিহাস সম্পর্কিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।

এই তিনটি প্রতিবেদনের প্রথমটির লেখক সেলিনা হোসেন। ১৯৮৪ সালের মেলার পর ‘অমর একুশে অনুষ্ঠানমালা ১৯৮৪ : একটি প্রতিবেদন’ শীর্ষক তাঁর প্রতিবেদন শামসুজ্জামান খান ও অন্যান্য (সম্পাদিত) একুশের স্মারকগ্রন্থ ’৮৫,-তে প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদনে অমর একুশের অনুষ্ঠানমালার প্রতিদিনের বিবরণ উল্লিখিত হয়েছে। গ্রন্থমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, অন্যান্য দিনের অনুষ্ঠান, বাংলা একাডেমির প্রতিদিনের বিক্রি ইত্যাদি বিস্তারিতভাবে এই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়। ১৯৮৪ সালে গ্রন্থমেলা শুরু হয় ৭ই ফেব্রুয়ারি এবং চলে ২১শে পর্যন্ত। তখন একাডেমির অনুষ্ঠানমালাকে দুই ভাগে ভাগ করা হতো। ৭ থেকে ১৪ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন মূল মঞ্চে নির্দিষ্ট একটি বই নিয়ে আলোচনা করা হতো। ১৫ থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হতো একুশের ‘মূল অনুষ্ঠান’। এই প্রতিবেদনে একাডেমির সেই সময়ের মহাপরিচালক মনজুরে মওলার যে বক্তব্য ছাপা হয়েছে, তা থেকে বোঝা যায় একাডেমি তখন কীভাবে অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করতো। তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘বাংলা একাডেমীর অনানুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান ১৫ই ফেব্রুয়ারী থেকে ২১ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত; অমর একুশের স্মৃতি স্মরণে ৭ ফেব্রুয়ারী থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত সভাপতিহীন, প্রধান অতিথিহীন, বিশেষ অতিথিহীন এই অনানুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান, যার মাধ্যমে অমর একুশের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদিত হবে।’ এই প্রতিবেদনে প্রতিদিন বাংলা একাডেমির কত টাকার বই বিক্রি হতো তা উল্লিখিত হয়েছে। প্রতিবেদন থেকে দেখা যায় ৭ই ফেব্রুয়ারি একাডেমির বিক্রির পরিমাণ ছিল ২,১৮৪.৬৩ পয়সা। আর মেলার শেষ দিন ২১শে ফেব্রুয়ারি বিক্রি হয় ১৩,৫০১.২৫ টাকার বই। দ্বিতীয় প্রতিবেদনটির শিরোনাম ‘গ্রন্থমেলা’। বাংলা একাডেমির একুশের স্মারকগ্রন্থ ’৮৬-তে এটি প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদনের লেখক হিসেবে কারও নাম নেই। তবে অনুমান করা যায় একাডেমিরই কোনো কর্মকর্তা এটি লিখেছেন। গ্রন্থমেলার ইতিহাস জানার জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিবেদন। এতে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত গ্রন্থমেলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ একটি পরিচ্ছদে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর প্রতি বছরের অর্থাৎ ১৯৮০, ১৯৮১, ১৯৮২, ১৯৮৩, ১৯৮৪, ১৯৮৫ ও ১৯৮৬ সালের গ্রন্থমেলার ওপর আলাদা বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। গত শতাব্দীর আশির দশকের শুরুর দিকে যখন গ্রন্থমেলার আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক গোড়াপত্তন হয় সেই সময়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এই প্রতিবেদনটিতে রয়েছে। এখানে উল্লিখিত কিছু তথ্য খুব সতর্ক বিবেচনায় খণ্ডনযোগ্য হলেও (এ বিষয়ে পরে আলোচনা করা হয়েছে) গ্রন্থমেলার প্রথম পর্যায়ের ইতিহাস জানার জন্য এটি অতি প্রয়োজনীয় একটি প্রতিবেদন। তৃতীয় প্রতিবেদনটির লেখক একাডেমির পরিচালক গোলাম মঈনঊদ্দিন। ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা : ১৯৯৪’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন একাডেমির স্মারকগ্রন্থ ’৯৪-তে প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদনে ১৯৯৪ সালের বইমেলা প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক উদ্বোধন, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান, মেলায় একাডেমির ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মোট বিক্রি, মেলা সম্পর্কে বিভিন্ন পত্রিকার বিরূপ মন্তব্য, এসব মন্তব্য সম্পর্কে একাডেমির অভিমত ইত্যাদি বিষয়ের বর্ণনা রয়েছে। এই তিনটি প্রতিবেদন ছাড়া বইমেলা নিয়ে কয়েকটি বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নধর্মী নিবন্ধ/প্রবন্ধও প্রকাশিত হয়েছে।

সাইয়িদ আতীকুল্লাহ রচিত ‘বাংলা একাডেমীতে ঊননব্বইর বর্ণাঢ্য বইমেলা’ শীর্ষক মূল্যায়নধর্মী লেখাটি প্রথমে দৈনিক সংবাদ (১লা মার্চ ১৯৮৯)-এ এবং পরে বাংলা একাডেমির একুশের স্মারকগ্রন্থ ’৮৯-তে প্রকাশিত হয়। এতে লেখক একুশে বইমেলা ১৯৮৯-এর নানাদিক নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি এই বছরের গ্রন্থমেলার প্রশংসা করেন। তবে মেলার কিছু সমস্যার প্রতিও আলোকপাত করেন। মেলার আয়োজক একাডেমি প্রশংসনীয় কাজ করলেও তারা কিছু ধিক্কারও পেয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, ‘প্রতি বছরই বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে বেশ কিছু লজ্জাজনক ঘটনা ঘটে। এ বছরও ঘটেছে। …এক মাসব্যাপী একটি বড়ো মাপের সাংস্কৃতিক ঘটনাকে প্রতিদিন রূপায়িত করার কাজটা খুব সহজসাধ্য নয়। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বাংলা একাডেমীতে অনুষ্ঠানাদি এবং বইমেলা যেভাবে মোটামুটি নির্বিঘ্নে হয়ে গেল তার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি সঙ্গত কারণে অনেক সাধুবাদ পাবার যোগ্য। সামান্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটি বিচ্যুতির জন্য কিছু ধিক্কারও জুটেছে বাংলা একাডেমীর।’

গ্রন্থমেলা আয়োজনের সঙ্গে সঙ্গে একাডেমি দেশের প্রকাশনা খাত, গ্রন্থ জগৎ, পাঠক সৃষ্টি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে এই মেলার প্রভাব জানার চেষ্টাও করেছে। এজন্য দেশের সংশ্লিষ্ঠ লেখক/গবেষকদের গ্রন্থমেলা নিয়ে মূল্যায়ন ও আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। ১৯৯৪ সালে একাডেমির অমর একুশের আলোচনা অনুষ্ঠানে মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ‘পাঠক সৃষ্টিতে বাংলা একাডেমীর অমর একুশে গ্রন্থমেলার ভূমিকা’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। এই প্রবন্ধটি পরে একাডেমির একুশের প্রবন্ধ ’৯৪ গ্রন্থে প্রকাশিত হয়। এই প্রবন্ধে মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর পাঠক সৃষ্টিতে গ্রন্থমেলা কী কী উপায়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে তা বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, ঢাকায় পাঠক সৃষ্টিতে বইমেলা অবদান রাখছে। আর এই অবদান কম কথা নয়, তবে ‘ঢাকার বাইরের দিকেও আমাদের তাকাতে হবে।…ঢাকার বাইরে অন্যান্য মেলার আগ্রহী পাঠকেরা শুধু সংবাদপত্রে নতুন বইয়ের খবর পড়বেন, বাংলা একাডেমীর বই মেলা সম্পর্কে নানা চিত্তাকর্ষক ফিচার পড়বেন আর নিজেদের শহরে তার কোনো অস্তিত্ব দেখতে পারবেন না—এটা খুবই দুঃখজনক এবং আমাদের সকলের চরম ব্যর্থতা।’

বইমেলা নিয়ে একটি ছোট প্রবন্ধ লিখেছেন খালেদা এদিব চৌধুরী। ‘বাংলা একাডেমী এবং বইমেলা’ শীর্ষক তাঁর প্রবন্ধটি বাংলা একাডেমী স্মারকগ্রন্থ : চল্লিশ বর্ষ পূর্তি-তে প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে। এই প্রবন্ধে তিনি বাংলা একাডেমি গ্রন্থমেলার ইতিহাস নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি লিখেছেন : ‘…একাডেমী প্রাঙ্গণেই ১৯৭৪ সালে এদেশের প্রথম জাতীয় সাহিত্য সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিবছর বাংলা একাডেমীর একুশের বইমেলা জাতীয় মেলায় রূপ লাভ করেছে। তবে পূর্ণাঙ্গ মেলা শুরু হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। কেননা সে বছরই এ মেলাকে গ্রন্থমেলা হিসেবে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।’ ১৯৭৮ সালে পূর্ণাঙ্গ মেলা হয়েছিল এবং সেই মেলা জাতীয়ভাবে স্বীকৃত হয়েছিল এই তথ্য ও বিশ্লেষণ নিয়ে দ্বিমতের অবকাশ রয়েছে (এ-বিষয়ের আলোচনা পরের একটি অংশ রয়েছে)।

অমর একুশে গ্রন্থমেলা নিয়ে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন শামসুজ্জামান খান। তাঁর ‘বইমেলার ইতিহাস ও নতুন আঙ্গিকে বইমেলা’ শিরোনামের প্রথম নিবন্ধটি ছাপা হয় দৈনিক প্রথম আলো-তে, ৩১শে জানুয়ারি ২০১৪ সালে। বইমেলা আয়োজনের পটভূমি তিনি এই প্রবন্ধে বর্ণনা করেছেন। তারপর দেশের প্রকাশনা জগতের ওপর এর প্রভাব এবং অন্যান্য দেশের বইমেলার সঙ্গে এই বইমেলার তুলনা করে কিছু মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘বলা চলে এই মেলা উপলক্ষ করেই বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে গেছে। এখন অনেক নতুন প্রকাশক এই শিল্পে এসেছেন। পাঠকের সংখ্যাও প্রতি বছর বাড়ছে। এই মেলা এক মাস ধরে চলে। পৃথিবীতে আর কোনো বইমেলাই এত দিন ধরে চলে না। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে এটি পৃথিবীর দীর্ঘদিনব্যাপী আয়োজিত একটি বইমেলা।’ শামসুজ্জামান খান-এর দ্বিতীয় প্রবন্ধের শিরোনাম ‘বই এবং বইমেলা : কিছু ইতিহাস ও প্রত্যাশা’। এটি ছাপা হয় দৈনিক প্রথম আলো-য়, ২০১৬ সালের ২৯শে জানুয়ারি । এই প্রবন্ধে তিনি বই সৃষ্টির ইউরোপীয় প্রেক্ষাপট এবং বই মুদ্রণের সঙ্গে বইমেলার সম্পর্কের ইতিবৃত্ত তুলে ধরেছেন। ২০১৮ সালে প্রকাশিত প্রকাশিত হয়েছে শামসুজ্জামান খান-এর গ্রন্থ বই, বইমেলা ও সাংস্কৃতিক মুক্তধারা। এই গ্রন্থে বইমেলার ওপর শামসুজ্জামান খান-এর লিখিত উপর্যুক্ত দুটি ছাড়া আরও দুটি প্রবন্ধ রয়েছে। একটি প্রবন্ধের শিরোনাম ‘বই, বইমেলা ও সাংস্কৃতিক মুক্তধারা’ এবং অন্যটি ‘তিরিশতম বইমেলা (২০১৩)-এর প্রাক্কালে কিছু কথা’। ‘বই, বইমেলা ও সাংস্কৃতিক মুক্তধারা’-য় তিনি একুশের বইমেলা যে ‘তরুণ লেখক-প্রকাশক-বিক্রেতাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা, উদ্যম এবং সাংস্কৃতিক, জাতীয় ও রাজনৈতিক’ চেতনার ফসল তা দেখিয়েছেন। এই মেলা কীভাবে বাংলাদেশের এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে তা তিনি ব্যাখ্যা করেছেন।

বাংলা একাডেমি হীরকজয়ন্তী উপলক্ষে ২০১৬ সালে নিজের কাজের বিভিন্ন দিকের মূল্যায়ন করার চেষ্টা করে। এজন্য একাডেমির কাজের বিভিন্ন দিকের ওপর দেশের বিশিষ্ট লেখক-গবেষক-পণ্ডিতদের মূল্যায়নধর্মী আলোচনার আনুরোধ করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বদিউদ্দিন নাজির ‘বাংলা একাডেমির হীরক জয়ন্তী : অমর একুশে গ্রন্থমেলার অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। এই প্রবন্ধের প্রায় পুরোটায় তিনি অমর একুশে বইমেলার ইতিহাস লিখেছেন। তিনি ইতিহাস লিখতে যেয়ে ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান গ্রন্থাগার চত্বরে আয়োজিত বইমেলা, নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে অনুষ্ঠিত জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের বইমেলা, ১৯৬৭ সালে যশোহর পাবলিক লাইব্রেরির বইমেলা, ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজিত গ্রন্থমেলা ইত্যাদির উল্লেখ করেছেন। বদিউদ্দিন নাজির অনেক তথ্যের সমাহার ঘটিয়ে গ্রন্থমেলার একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস-রেখা প্রণয়নের প্রয়াস নিয়েছেন।

শামুজ্জামান খান ও অন্যান্য সম্পাদিত ও বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত Folklore in The Urban Context গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে শাহিদা খাতুন-এর প্রবন্ধ ‘Amar Ekushe Granthamela: A Center of Gravity for Enrichment of Commonness and Creativity’. এই প্রবন্ধে লেখক ফোকলোরের দুইটি ধারণা (concept) ‘commonness’ ও ‘creativity’-কে বাংলা একাডেমির গ্রন্থমেলার পরিসরে ব্যাখ্যা করেছেন। লেখক বলছেন, গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমি (স্পন্সরের সহায়তায়), লেখক, প্রকাশক ও গ্রন্থপ্রেমী মানুষ—এই চার-এর সমন্বয়ে যে অনুপম পরিবেশের সৃষ্টি হয় তা greatest commonness-এর জন্ম দেয় এবং এ ক্ষেত্রে একাডেমি নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করে। তাঁর মতে, এই চারটি গোষ্ঠী একটি সাধারণ লক্ষ্য অর্জনের জন্য বইমেলায় একত্রিত হয়। আর এই লক্ষ্য হলো বুদ্ধিবাদী সমাজ তৈরি করা (creation of intellectual society)। আর এই সমাজ তৈরি হবে পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি ও গ্রন্থ উন্নয়নের মাধ্যমে। গ্রন্থমেলা এসব সুযোগ সৃষ্টি করে থাকে। শাহিদা খাতুন তাঁর প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, গ্রন্থমেলার নজরুল মঞ্চের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান কীভাবে এক ধরনের লোর (lore)-এর জন্ম দেয় এবং বইয়ের লেখক, তাঁর শুভানুধ্যায়ী ও কিছু গ্রন্থপ্রেমী মানুষ কীভাবে এই অনুষ্ঠানের কারণে গর্ব অনুভব করেন।

বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলা প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে আরও কয়েকজন বিশিষ্ট লেখকের প্রবন্ধ ও বক্তৃতায়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : আব্দুল্লাহ আল-মুতী রচিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি : বাংলা ভাষা : বাংলা একাডেমী’ (একুশের প্রবন্ধ ’৯০, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ১৯৯০), রফিকুল ইসলামের ‘শহীদ মিনার, বাংলা একাডেমী ও বাংলাদেশ’ (একুশের প্রবন্ধ ’৯৪, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ১৯৯৪), সৈয়দ আবুল মকসুদ রচিত ‘আমাদের জীবনে একুশের তাৎপর্য’ (একুশের প্রবন্ধ ’৯৫, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ১৯৯৫) এবং শামসুজ্জামান খানের ‘বাংলা একাডেমীর ৪৫-তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী বক্তৃতা’ [সেলিনা হোসেন ও অন্যান্য (সম্পাদিত), একুশের স্মারকগ্রন্থ ২০০১, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ২০০১] ইত্যাদি।

একুশে গ্রন্থমেলার ওপর উপর্যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ, আলোচনা ও প্রতিবেদন সত্ত্বেও বর্তমান লেখাটি বিশেষ কিছু কারণে আকর্ষণীয় ও প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হতে পারে। প্রথমত. এর আগে কেবল একুশে বইমেলা নিয়ে কোনো বিস্তৃত গবেষণামূলক লেখা রচিত হয়নি। এই লেখায় প্রথম বিস্তৃত পরিসরে বইমেলার নানাদিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সুতরাং বইমেলার ওপর ব্যাপক অনুসন্ধানজাত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এতে পাওয়া যাবে। দ্বিতীয়ত. একুশে বইমেলার ওপর সীমাহীন তথ্য এতে পাওয়া যাবে। তৃতীয়ত. এই লেখায় বইমেলার ঐতিহাসিক শুরু, ক্রমান্বয়িক বিকাশ এবং বিভিন্ন সময় যুক্ত হওয়া নানা মাত্রিকতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। চতুর্থত. বইমেলা সম্পর্কে এর আগে পরিবেশিত অনেক তথ্য-ভ্রান্তি এই লেখায় উপযুক্ত প্রমাণের মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা করা হয়েছে। পঞ্চমত. অমর একুশে বইমেলা বাংলাদেশের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের মধ্যে থেকে কীভাবে শুরু ও বিকশিত হয়েছে সেই চিত্র পাওয়া যাবে। ষষ্ঠত. একুশে বইমেলা ভবিষ্যতে কী কী সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে এবং কীভাবে এসব মোকাবেলা করা যাবে সে-সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। বাংলা একাডেমির একজন কর্মী এবং গ্রন্থমেলার সদস্য-সচিব হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে লেখকের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক হয়েছে।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.