আর্টস

বাঙালির জয় কবিতার জয়

তারিক সুজাত | 30 Jan , 2019  


৩৩তম জাতীয় কবিতা উৎসব-এর সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত কবিতা পরিষদের নেতৃবৃন্দ, কবিতাপ্রেমী সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা আপনাদের সকলকে জানাই শ্রদ্ধা, শুভেচ্ছা, অভিনন্দন।
জাতীয় কবিতা উৎসবের বিস্তারিত কর্মসূচি জানানোর জন্যে আজকের এই আয়োজন। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে শৃঙ্খল মুক্তির ডাক দিয়ে কবিতা উৎসবের শুরু হয় ১৯৮৭ সালে, কালের পরিক্রমায় সে উৎসব আজ আন্তর্জাতিক রূপ নিয়েছে।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ থেকে জন্ম নেয়া জাতীয় কবিতা উৎসব ও জাতীয় কবিতা পরিষদের নিরন্তর এই সংগ্রামের ইতিহাস আজ আর কারও অজানা নয়। আমরা অব্যাহতভাবে স্বৈরাচার, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের কথা বলে এসেছি। আপসের চোরাবালিতে হারিয়ে যাওয়ার কোনো নজীর সেই চর্যাপদের কবিদের মতো আমাদের কবিদের কখনো ছিল না। ‘সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে’ খুব স্বল্পে তুষ্ট থেকে আকাশ-সমান স্পর্ধিত সাহসে ভর করে আমরা আমাদের কথা বলে এসেছি। কবিদের দ্রোহের স্ফূলিঙ্গ থেকে জন্ম নিয়ে কী করে একটি উৎসব জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক উৎসবে রূপ নিলো তার ইতিহাসও কমবেশি আপনারা জানেন। অথচ পরিকল্পনাবিহীন বহু অনুষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় দেখে অনেক সময় আমরা বিস্মিত হই। সাংস্কৃতিক সংগ্রামের উজ্জ্বল ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আমরা আজও সেই পথেই মাথা উঁচু করে হাঁটছি– ’৫২-র ঊষালগ্নে আমাদের পূর্বসূরিরা যে পথ দেখিয়ে গেছেন। মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের মধ্য থেকে উৎসারিত সকল জাতীয় উৎসবের গৌরব ধরে রাখার দায়িত্ব সকলের।

বাংলাদেশের কবিরা চিরকালই প্রগতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিগত তিন দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও ভাষার সংগ্রামী কবিরা এই উৎসবে আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন। সত্য উচ্চারণের মধ্যদিয়ে এই মঞ্চকে আমরা কবিতার মিলনমেলায় পরিণত করতে পেরেছি। যেখানে নতুন লেখা একটি কবিতা পড়ার জন্য একজন নবীন কবি সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন।

ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর নানা সংকটকালে আমাদের কবি-লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের ত্যাগের ইতিহাস অম্লান; অমলিন। স্বৈরাচার ও মৌলবাদবিরোধী আন্দোলন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে বাংলাদেশের কবি-লেখক-প্রকাশক এবং মুক্তবুদ্ধির মানুষেরা বার বার আক্রান্ত হয়েছেন। দেশের জন্য আত্মোৎসর্গিত জ্ঞানতাপস এই মানুষেরা অনেক সময় তাদের প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এসেও সে রকম পরিস্থিতি আমাদের কাছে অনভিপ্রেত। কবিতা উৎসবের মঞ্চ থেকে গত ৩২ বছর আমরা নানা সংকট ও স্খলনের বিষয়ে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছি। যখন সামরিক সরকারের অগণতান্ত্রিক বহু বিষয় পরিহার করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিলো, আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলাম দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্যদিয়ে। আমাদের সৌভাগ্য বহু সংগ্রামের পর বাঙালির জয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আমরা আজ আমাদের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রের স্বরূপ ফিরে পেয়েছি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিজয়ী হয়েছে। আজও প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় একটি বিষয়ের প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই– আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি, রাষ্ট্রীয় পুরস্কারগুলোর ক্ষেত্রে সামরিক শাসন আমলে সৃষ্ট নীতিমালা ও পদ্ধতি গণতান্ত্রিক সরকারগুলোও অসতর্কতায় অনুসরণ করছে। অনেক ক্ষেত্রে এগুলোর বিচার প্রক্রিয়া যেমন স্বচ্ছ নয়, তেমনি যাঁরা যোগ্যতা বিচারের কাজে নিয়োজিত তাঁদের কারও কারও সততা ও যোগ্যতা নিয়েও সংশয় তৈরি হচ্ছে। যা কারো কাম্য নয়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে যেহেতু পুরস্কারপ্রাপ্তরা এই পুরস্কারগুলো গ্রহণ করেন তাই এর মান-মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বর্তায়, একই সঙ্গে এই বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতজনরা সঠিক মূল্যায়ন করতে না পারার দায় এড়াতে পারেন না। এই অগ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া যদি অব্যাহত থাকে তবে অদূর ভবিষ্যতে সত্যিকার মেধাবী-যোগ্যতাসম্পন্ন-সৃজনশীল-আত্মত্যাগী-জ্ঞানী মানুষদের কাছে এই পুরস্কারগুলো আর মর্যাদাপূর্ণ মনে নাও হতে পারে। তাই সৃজনশীল সংস্কৃতিবান্ধব সুস্থ-সমাজ বিনির্মাণের জন্য রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এই পুরস্কার-পদক ও সম্মাননাগুলোর মর্যাদা রক্ষায় কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
জাতীয় কবিতা উৎসব কবিতার বৃহত্তম এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন শুধু বাংলাদেশের নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এক অনন্য উৎসব যা ইতোমধ্যে সারা বিশ্বে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। সূচনালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি উৎসবে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার কবিতানুরাগী ও শ্রোতার অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে এই উৎসব যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তার নজীর পৃথিবীতে বিরল। আমরা জাতীয় কবিতা পরিষদের পক্ষ থেকে গত ১১ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে এবং ইতোপূর্বেও বেশ কয়েকবার ১লা ফেব্রুয়ারিকে সরকারিভাবে ‘জাতীয় কবিতা দিবস’ ঘোষণার অনুরোধ করেছি। এবিষয়ে পুনর্বার সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাই।
প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা, এবারও বিভিন্ন দেশ ও ভাষার কবিদের উৎসবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে যে সকল কবি-লেখক-শিল্পী তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছেন তাঁরা হলেনÑ ঔুড়ঃরৎসড়ু উধঃঃধ, গরহধশংযর উধঃঃধ, জধঃঁষ উবা ইধৎসধহ, ইরঃযর Jyotirmoy Datta, Minakshi Datta, Ratul Dev Barman, Bithi Chattopadhyay, Sebanti Ghosh (India), Claire Booker (UK), Tarik Gunersel (Turkey), Dr. Ali Al Shalah (Iraq), Kama Kamanda (Congo), Julio Pavanetti (Spain), Annabel Villar (Uruguay), Dr. Tanxian Cai (China), Malim Ghozali PK (Malaysia), Pushpa Khanal (Nepal).
প্রিয় সাংবাদিক ভাই-বোন, বন্ধুগণ, বরাবরের মতো এবারও আমরা আপনাদের সাহায্য ও সহযোগিতা চাই। আপনাদের তেজস্বী লেখনীর মাধ্যমে এবারের উৎসবের সকল সংবাদ দেশে-বিদেশে বাংলা ভাষাভাষী কবিতাপ্রেমী মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে সেই প্রত্যাশা নিয়ে আমার বক্তব্য শেষ করছি।
আপনাদেরকে আবারও ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

তারিক সুজাত
সাধারণ সম্পাদক
জাতীয় কবিতা পরিষদ
৩০ জানুয়ারি ২০১৯
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.