চলচ্চিত্র

চলচ্চিত্র ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’ এবং একজন রঞ্জন পালিত

ফৌজিয়া খান | 29 Jan , 2019  


দেখার পর থেকে মাথায় ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’ নিয়ে ঘুরছি!
বেশ কদিন পার হলো, এখনও মাথায় ঘুরছে ছবিটি! ছবির নির্মাতা রঞ্জন পালিত।

রঞ্জন কোলকাতার মানুষ। ফেসবুকে আমরা বন্ধু। ফেসবুকে তো কত দেশের কতজনই আমার বন্ধুতালিকায় আছেন। রঞ্জনও তেমনই হতে পারতেন। হননি তার কারণ আমরা একই ফিল্ম স্কুলের শিক্ষার্থী- সেটা নয়। কারণ হলো, ফেসবুকের আগের যুগে যখন তাকে চিনি না- রঞ্জন পালিত নামটাও শুনিনি তখন ঘটনাচক্রে পরিচয় হয়েছিল। কোলকাতায় রাসবিহারী এভিনিউতে তার বাড়িতে কয়েকদিন থেকেছিলাম। কয়েক বছর পর আরও একবার তার রাসবিহারী এভিনিউর বাড়িতে গিয়েছি, থেকেওছিলাম। কথোপকথন তেমন হয়নি। তখন দেখেছি, রঞ্জন একটু সাইলেন্ট ধরনের মানুষ। তবে এরমধ্যে তার বানানো প্রামাণ্যচিত্র দেখেছি। দেখে ভালো লেগেছে তার ক্যামেরার কাজ এবং গল্প বলার ভঙ্গি। প্রামাণ্যচিত্রে চিত্রিত অন্য মানুষের জীবনের মধ্যে একটুখানি আলগোছে নিজেকে ঢুকিয়ে দেন তিনি। এই পারসোনিফিকেশনের ভঙ্গিটা আমার খুব ভালো লাগে।

তো রঞ্জন পালিতকে এইটুকুই জানা- অনেকটুকু না জানা। ২০০১ সালের পর আমাদের আর দেখা নাই। কথা তো দূরের কথা। এলো ফেসবুকের যুগ। এবার দেখি, রঞ্জন ফেসবুকে খুব সরব! নিয়মিত! রোমান হরফে অসম্পন্ন বাক্যে বাংলা এবং ইংরেজি মিলিয়ে পোস্ট লিখছেন। সাথে সেলফি। লম্বা চুল, সব সময় এলোমেলো, ঝুঁটি করে বাধা। আগে- ১৯৯৫ সালের মার্চ, তারপর ২০০১ সালে দেখা শান্ত নির্জন নিপাট রঞ্জন একটু যেন বদলে গেছেন!

রঞ্জন তার পোস্টে নিজের যেসব সেলফি দেন সেগুলোতে আলো উপচে পড়ে, অনেক সময়ই সূর্যের আলো ক্যামেরার চোখ ঢেকে দেয়। দেখে মনে হয়- এত এত এত আলো! ফ্রেমিং, আলো, অবজেকট- কোনো কিছুই ফিল্ম স্কুলে ক্যামেরা পড়া শিক্ষার্থীর মতোন নয়। ফিল্ম স্কুলে লেন্স থেকে আলোর গ্লেয়ার কেটে দৃশ্য ধারণ করাই তো শিখেছিলাম। তবে না বললেই নয় ফেসবুকে রঞ্জনের পোস্ট করা ছবিকে আনাড়ির হাতে পাওয়া মোবাইল ক্যামেরায় অনবরত তুলতে থাকা হযবরল ছবির সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। ফেসবুকের এই প্রগলভ রঞ্জনকে আগে সশরীর দেখা নির্জন মানুষ রঞ্জনের সঙ্গে মেলাতে মনে আমার একটু কিন্তু লেগে থাকে।

তবুও আমি নিয়মিত তার পোস্ট পড়ি। দেখি, তিনি ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’ নামে একটি চলচ্চিত্র বানাচ্ছেন। বলছেন, আত্মজৈবনিক। কোলকাতায় রাসবিহারী অ্যাভিনিউর যে বাড়িতে গিয়েছিলাম তার পোস্টে সেই বাড়ির টুকরো টুকরো অংশ দেখি। আমি জানি, রঞ্জন প্রামাণ্যচিত্র বানান। তো ধারণা হলো, ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’ প্রামাণ্য চলচ্চিত্র। আগে তার যে কটা ছবি দেখেছি- দেখেছি, যে বিষয় নিয়েই ছবি বানান না কেন- সেইখানে, সেই বিষয়ের সঙ্গে নির্মাতার ব্যক্তি-অংশ ব্যক্তিগতভাবে ঢুকিয়ে দেন। ‘ঢুকিয়ে দেন’ কথাটা কেমন কানে বাজছে, মনে হচ্ছে নির্লজ্জের মতোন ক্যামেরার ফ্রেমে ঢুকে পড়েন। না, রঞ্জন এটা করেন না। বরং মানুষ ও নির্মাতা রঞ্জনের ব্যক্তিগত অন্তর্গত জগতে ঢুকে পড়ে নির্মীয়মান চলচ্চিত্রের বিষয় ও মানুষেরা। তারপর তারা প্রকাশিত হয় রঞ্জনের অব্যক্তিগত সময়ে, সমাজে, ইতিহাসে, সম্পর্কে, রাজনীতিতে। খুব ব্যক্তিগত ভঙ্গিতে রঞ্জন করেন এটা। পার্সোনাল, কিন্তু পার্সোনাল নয়; সাবজেকটিভ কিন্তু আসলে সাবজেকটিভ নয়। নৈর্ব্যক্তিকতার ঠাঁসবুননে ব্যক্তিস্বর কথা বলে এক হয়ে- ছবির চরিত্রের সাথে, বিষয়ের সাথে মিলেমিশে! তার ওই ছবিগুলোকে প্রামাণ্য চলচ্চিত্রই বলতাম আমরা।

তো গত দুই/তিন বছর ধরে ফেসবুকে তার পোস্টগুলো পড়ে পড়ে সেই রকম কোনো ছবির মতোন ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’কেও ভেবে রেখেছিলাম।

এই জানুয়ারিতে রেইনবো ফিল্ম সোসাইটির আয়োজনে ১৭তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উতসবে ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’ দেখানো হবে- ফেসবুকেই খবরটি জেনে ছবিটি দেখবো বলে ঠিক করে রাখলাম। আমি নিজেও প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের চর্চা করি। একটি ছবির সম্পাদনা চলছে এখন। সেদিন ১৬ জানুয়ারি, ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’ দেখানোর দিন সম্পাদনার কম্পিউটার বন্ধ করে শাহবাগের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। অদ্ভুদ যে, তখনও রাস্তা জ্যামে স্থবির হয়নি! আমি তাই পৌঁছে গেলাম একটু আগেই। ফেস্টিভাল ভেন্যুতে ঢুকেই দেখা হয়ে গেল রঞ্জনের সাথে!

তারপর জাতীয় জাদুঘরের মিলনায়তনে ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’-এর সাথে আড়াই ঘণ্টা, নিমগ্ন হয়ে, ঘোরগ্রস্ত হয়ে কাটল। এই ঘোর সম্পূর্ণ নতুন রকমের ছবি দেখার। এমন ওপেন পারসোনাল পোয়েটিক দার্শনিক ঘোরে ফেলা ছবি আগে দেখিনি!

ছবির শুরু হবার আগে মঞ্চে দাঁড়িয়ে রঞ্জন বললেন, এটা তার বায়োপিক। রঞ্জন নিজেই ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’-এর প্রধান চরিত্র।

ছবির বাস্তব বর্তমানে আর অতীতের স্মৃতিচারণায় ব্যক্তিগত রঞ্জন আছেন। আছে পরিবার। আছে তার পরিজনেরা। পরিবার পরিজনের বাইরে আছে তার জীবনে নানা সময়ে আসা নারীরা। কিন্তু তাদের কেউই সশরীরে নেই, একমাত্র প্রথম স্ত্রী রুমী ছাড়া।

‘লর্ড অব দ্য অরফানস’ ব্যক্তিগত- ভীষণই ব্যক্তিগত চলচ্চিত্র। কিন্তু ব্যক্তি রঞ্জন পর্দায় নেই। আমরা রঞ্জনের কণ্ঠ শুনি, দেখি না একবারও। ছবিতে তার কণ্ঠ আছে, তার সাথে সম্পর্কিত মানুষেরা আছে- আছে মানে তারাও সশরীরে নেই। বাবা, মা, মেয়ে, দিদিরা, সাবেক স্ত্রী, বর্তমান সঙ্গী এবং আর সব সঙ্গীরা- তারা আছেন অভিনয় শিল্পীর অবয়বে। এইসব মানুষের সাথে রঞ্জন যে জীবন কাটিয়েছেন, সেই যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতাজাত বোধ, অনুভব, স্মৃতির ভিতর দিয়ে আমরা- দর্শকেরা ক্রমশ ব্যক্তি রঞ্জনের জীবনের বাঁকে বাঁকে আমাদের নিজেদের নিয়ে বিলীন হতে থাকি। আমরা ভাবতে থাকি, ভাবনায় স্থিত হতে পারি না- আমরা প্রবেশ করি অনুভবের জগতে। সেইখানে সমাজ সংসারের খোলা দরজা জানালার ভিতরে লুকানো ব্যক্তিগত রঞ্জন তার জীবন খাতার এক একটা পাতা খুলে চলেন নির্দ্বিধায়। ‘ব্যক্তি আমিকে’ এমন করে খুলে খুলে জীবনকে ছুঁয়ে ছেনে দেখার জানার আনন্দ বিমূঢ়তায় মূঢ় করেন নির্মাতা রঞ্জন!

যে মানুষদের ভিতর থেকে আমরা এই ধরাধামে আসি, যারা আমাদের জীবনে আসে- আমরা সকলে মিলে এই আলোর ভুবনে, শব্দের ভুবনে, গন্ধের ভুবনে, স্পর্শের ভুবনে পরস্পরের নিকট হয়েছি, পরস্পরকে পরস্পরকে জেনেছি, পেয়েছি, ভালোবেসেছি এবং তারপর অন্যকিছুর আহবানে অন্যকিছুর খোঁজে চাতকের মতোন ছুটে চলেছি, ভাসছি, কাঁদছি, গাইছি জীবনের গান। মানুষ থেকে মানুষে, সম্পর্ক থেকে সংযোগের এই প্রবহমানতা- এটাই জীবন। রঞ্জন তার এই প্রবহমান জীবনকেই ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’ ছবির বিষয় করেছেন। এইখানে ব্যক্তি রঞ্জন বা রঞ্জনের ব্যক্তিগততা মুখ্য নয়- মুখ্য জীবনের প্রবহমানতা, মুখ্য জীবনের সঙ্গে জীবনের সংযোগ, সম্পর্ক।

জীবন যেমন মৃত্যুতে বিলীন হবার আগ পর্যন্ত ক্রমাগত বয়ে চলেছে ঠিক তেমনি বয়ে চলেছে ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’-এর ক্যামেরা। জীবনের এই প্রবহমানতার কথা শোনাতে, দেখাতেই কি রঞ্জন ক্রমাগত প্রথম থেকে শেষ শট অবধি ক্যামেরা নিয়ে প্রবহমান থেকেছেন? একবারও ক্যামেরাকে কোথাও বসতে দেন না?

এখন এই একুশ শতকে আর সব যন্ত্রকে আত্মীকরণ করে করে মোবাইল হয়ে উঠেছে আমাদের ২৪ ঘণ্টার সঙ্গী। মোবাইলে আছে ক্যামেরা। আছে শব্দধারণ করারও সুযোগ। হাতের মুঠোয় মোবাইল নেই এমন মানুষ আজকাল পাওয়া মুশকিল। ফেসবুকে পড়েছিলাম, রঞ্জন ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’ আইফোন দিয়ে শুট করছেন। ঢাকা এবার রঞ্জন বললেন, ৭ প্লাস আর ৮ প্লাস মডেলের আইফোন দিয়ে ছবির বিশ ভাগ অংশ শুট করেছেন। বাকিটা করেছেন সনির আলফা ৭এস২ মডেলের ক্যামেরায়। দুটোই পলকা ওজনের। প্রফেশনাল কাজ করিয়েরা এমন ক্যামেরায় চলচ্চিত্র বানাবার কথা ভাববেন না হয়তো। রঞ্জন পুরোদমে প্রফেশনাল মানুষ। তবে কিছুদিন পেশাগত কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন। নিজেকে সরিয়ে রাখাটা আদতে ছিল এক অসুখ। সেই অসুখ থেকে নিজেকে সারিয়ে তুলতে গিয়ে ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’ ছবির পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা, চিত্রনাট্য দানা বাঁধার পর ফান্ডিংয়ের জন্য অপেক্ষা করেননি। নিজের যা আছে তাই নিয়েই কাজে নেমে পড়েন। ওয়ান পারসন ক্রু হয়ে কাজ শুরু করেন। পরে বন্ধুরা কন্ট্রিবিউট করে, তারপর কিছু ফান্ডও যোগাড় হয়। সম্ভবত এই কারণেই তিনি আইফোন ও সনির এই পলকা ক্যামেরাকে চিত্রধারণের মাধ্যম করেছেন। সেইজন্যই হয়তোবা ছবিটি এমন অভিনব চিত্রভাষা নিয়ে দর্শকের সামনে আসতে পারল। ‘জীবন প্রবহমান’- এই সাধারণ অমোঘ দার্শনিক সত্য উদ্ভাষণে ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’-এর ক্রম চলমান ক্যামেরা দারুণভাবে কাজ করেছে। ফিল্ম স্কুলে ক্যামেরায় প্রশিক্ষিত রঞ্জন দক্ষ হাতে প্রবহমান জীবনের অলিন্দ থেকে অলিন্দে অনায়াসে নিবিড় ভালোবাসায় ট্রাভেল করেন দর্শককে সাথে নিয়ে। ক্রমাগত চলছে যে ক্যামেরা তার লেন্সে আলো উপচে উপচে পড়ে। প্রখর সূর্যের নিচে আলোয় জলে হাওয়ায় প্রবহবান যে জীবন আমাদের সেই জীবনে আলো এমন করেই তো ভাসিয়ে রাখে আমাদের। আলোর বন্যায় ঘটে যাওয়া বর্তমানের কিছু অংশ না-দেখার গহ্বরে চলে যায়। আবার অন্ধকার রাত কিংবা ভরা পূর্ণিমায় আবছা আলোয় না-দেখা থাকে বহুকিছু। বাস্তবে এমন আলোয় আর আঁধারে প্রবহমান আমাদের জীবন। ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’ও এমন আলো আর আঁধারকে নিয়ে প্রবহমান। এর শব্দও তেমনি। চারপাশে ঘটে যাওয়া বর্তমানে নানান শব্দ আমরা ক্রমাগত শুনি। শুনতে শুনতে একসময় আমরা কিছু অপ্রয়োজনীয় শব্দেও অভ্যস্ত হয়ে যাই। সেইসব শব্দের ভিড়ে আমাদের অনেক কথা মিলিয়ে যায়। শহর কোলকাতায় রাসবিহীরী অ্যাভিনিউর উপরে দাঁড়ানো ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’-এর বাড়িটিতে ঘটে চলা জীবন দেখতে দেখতে আমাদের কান কোলকাতার ভারী ট্রাফিকের গমগমে শব্দের সাথে অভ্যস্ত হয়, তার সেই অভ্যস্ততায় ওই বাড়ির মানুষগুলো কিছু কথা মিলিয়ে যায়, ঠিক মতোন শোনা হয় না।

রঞ্জন অ্যাভেয়লেবল লাইটে শুট করেছেন- সে দিন কিংবা রাত যে দৃশ্যই হউক না কেন। একটি দৃশ্যে বড় এক মোমবাতির ব্যবহার ছাড়া এখন এই লেখা লিখতে বসে বাড়তি বা আয়োজন করে আলোর ব্যবহার মনে করতে পারছি না। সূর্য, চাঁদ, সড়ক বাতি এবং একবারমাত্র মোমের ব্যবহার- এই-ই রঞ্জনের আলোর উতস। আড়ম্ভর করে বাড়তি আলোর ব্যবহার না করে একদিকে রঞ্জন যেমন খরচ বাঁচিয়েছেন তেমনি ট্রু টু ফ্যাক্টও থাকতে পেরেছেন। পেরেছেন ক্যামেরাকেও অবিরাম ইচ্ছেমতোন প্রয়োজন মতোন চলমান রাখতে। আর সেটা পেরেছেন বলেই তিনি ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’কে এমন এক চিত্রভাষায় উপস্থাপন করেন যা এ যাবতকাল দেখা আর কোনো চলচ্চিত্রের সাথে মেলাতে পারি না।

অভিনব ফিকশন বানানোর কৌশল আর প্রামাণ্য উপকরণের অনন্য ব্যবহার- রঞ্জনের ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’কে করেছে ইউনিক। কাহিনী আর প্রামাণ্য মিলে মিশে এই ছবিতে। রঞ্জনের জীবনে ঘটেছে যা কিছু- তার কিছু ঘটনা আমরা জানি; যেখানে ঘটেছে- সেইসব জায়গা আমরা দেখি এই ছবিতে। তবে মানুষেরা আসেন অভিনেতার অবয়বে। তবে প্রথম স্ত্রী রুমী সিকোয়েন্সে বাস্তব রুমী ছিলেন ছবিতে। সবটা মিলিয়ে নতুন এক চলচ্চিত্র ভাষার মুখোমুখি হন দর্শক।

মনে পড়ছে, এর কাছাকাছি ট্রিটমেন্ট ফরাসি নির্মাতা আগাসে ভার্দার ‘বিচেস অব আগাসে ভার্দা’ ছবিতে দেখেছি। ভার্দা সেইখানে সশরীর পর্দায় আসেন, কথাও বলেন বাস্তব চরিত্র হিসেবেই। কিন্তু সেইখানে ভার্দা দর্শককে কাহিনী না প্রামাণ্য এই বিচারের এমন বিভ্রান্তিকর ঘোরে ফেলেন না। ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’ ছবির প্রদর্শনীর আগে রঞ্জন যদি না বলতেন যে এটা তার বায়োপিক, এটা তারই জীবনের কথা- তবে ইট কুড বি আ ফিল্ম অব অ্যানি থার্ড পারসন যেখানে পরিচালক ‘ফাস্র্ট পারসনে’ কথা বলার কৌশল নিয়ে কাহিনীচিত্রে প্রামাণ্য উপকরণ ব্যবহার করেছেন।

‘লর্ড অব দ্য অরফানস’ পরিবারের গল্প। রঞ্জনের পরিবারে, রঞ্জনের জীবনে বাবার দাগ বোধহয় অনেক বেশি। ছবিতে তাই বাবা আছেন অনেকটা জুড়ে। ‘বাবা’ চরিত্র রঞ্জন পুরোটাই দেখিয়েছেন কাহিনী চলচ্চিত্রের ‘অভিনেতা’ নামক উপকরণ ব্যবহার করে। বাবার পরে প্রথম স্ত্রী রুমীকে আমরা অন্যদের চেয়ে বেশি দেখি। প্রথম স্ত্রী রুমীর প্রসঙ্গ বলতে গিয়ে রঞ্জন কাহিনী-প্রামাণ্যের সংশ্লেষে অভিনব এক চলচ্চিত্র ভাষার মুখোমুখি (কিছুটাবা বিভ্রান্তও) করেন দর্শককে। পুরোনো স্থিরচিত্রের পথ বেয়ে তারুণ্যের রুমী অভিনয় শিল্পীর শরীরে পর্দায় আসেন। তারপর আমরা দেখি বাস্তব রুমীকে- যে আছে জীবনের শেষ বেলায়, অসুখে ভুগে বয়সকে ধারণ করে বর্তমানের ভাঙাচোরা চেহারা নিয়ে। জীবনের পড়ন্ত বেলায় রুমী মুখোমুখি হন নিজেরই তারুণ্যের। তরুণ রুমী পর্দায় আসেন অভিনয়শিল্পীর অবয়বে। আর বর্তমানের রুমী বাস্তব। এই দুই রুমী কথোপকথনে নির্মাতার লেখা সংলাপ বিনিময় করে। তখন বাস্তব প্রবীণ রুমীও আসলে অভিনয়শিল্পী রূপী তারুণ্যের রুমীর সাথে রঞ্জনের ছবির একটি দৃশ্যে অভিনয় করেন। বাস্তব রুমীর সাথে রুমী চরিত্রে অভিনয়শিল্পীর কনভারসেশন! আমি অন্তত আগে আর কোনো চলচ্চিত্রে দেখিনি এমন কৌশল!

চরিত্রের ভিতর থেকে একই চরিত্রের অন্য সত্তা অন্য অভিনেতার মাধ্যমে উপস্থাপনের এমন কৌশল ব্যবহার হতে দেখেছি ঢাকায়, নাটকের মঞ্চে। সেলিম আল দীনের লেখা নাটক মঞ্চায়নে ঢাকা থিয়েটার এই কৌশল হরহামেশা ব্যবহার করে। হয়তোবা পৃথিবীর অন্য কোথাওও এই কৌশলের ব্যবহার আছে। আমি কুয়োর ব্যাঙ আর কতটুকু কি দেখেছি! তবে ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’-এ রঞ্জন এই টেকনিক ব্যবহার করে দর্শককে যেনবা তার নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন; মনে করিয়ে দেন জীবনের অমোঘ উপলব্ধি। এই দৃশ্যে জীবনের ফেলে আসা দিন, সম্পর্ক, মানুষকে ইভালুয়েট করেন রুমী। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মানুষ যখন পিছন ফিরে তাকায়, জীবনকে বিচার আর বিশ্লেষণ করে করে দার্শনিক প্রজ্ঞায় উপনীত হয়। এই দৃশ্যে উড়ে উড়ে ভেসে ভেসে রঙিন এক জীবন কাটিয়ে মৃত্যুশয্যা স্থিত বাস্তব রুমীর মুখে বসানো সংলাপে প্রজ্ঞাবান উচ্চারণ শুনি। এই প্রজ্ঞা, জীবন বিষয়ে বীক্ষা রুমীর হয়তোবা। তবে তারও চেয়ে বেশি এটা পরিচালকের। আর কেবল রুমী নয়- ছবির প্রতিটি চরিত্রের সংলাপে, আত্মকথনে পরিচালক জীবন বিষয়ে তার বীক্ষা উপুড় করে দিয়েছেন দর্শকের দরবারে। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে প্রবীণ রুমী তরুণী রুমীকে বলে: ‘ইউ আর মাই পাস্ট, আই অ্যাম ইয়োর ফিউচার’। শৈশব লীন হয় যৌবনে, যৌবন হারায় বার্ধক্যে- তারপর জীবন বিলীন হয় মরনে। মৃত্যু জীবনের অনিবার্য পরিণতি- এটাই প্রবহমান জীবনের সারকথা। তবুও মানুষ জীবনকেই উদযাপন করে- প্রখর সূর্যের নিচে, পূর্ণিমার মায়াময় রাতে মানুষ বাঁচে, ভালোবাসে। তারপর মৃত্যু এসে তাকে নিয়ে যায় অনির্বার্য অন্ধকারে। রুমীগণ তাই একই ফ্রেমে রঞ্জনের ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’-এ পরস্পর কথোপকথন করে। আমরা সবাই জীবন আর মরনের অমোঘ অনিবার্য ঘূর্ণিপাকের মধ্যে আছি। তবুও আমরা বাঁচি, আমরা ভালোবাসি, আমরা ছেড়ে যাই, আমরা কাঁদি, কিংবা কাঁদি না, আমরা আবারও ভালোইবাসি। এইভাবে এখন যারা বেঁচে আছি, যারা আগে ছিল, যারা ভবিষ্যতে বাঁচবে- তারা একই ভাবে বাঁচবে, ভালোবাসবে এবং অবশেষে মৃত্যুতে বিলীন হবে- এই দার্শনিক বীক্ষা ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’-এর রুমীগণ চরিত্র মোক্ষম করে বলে। ফলে রঞ্জনের প্রথম স্ত্রী রুমী আর রঞ্জনকে ছেড়ে যাওয়া নারী রুমী থাকে না- সে হয়ে উঠে জীবনের সার উপলব্ধি করার এক প্রতীক।
এইভাবে, এমনি করে ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’-এ চিত্রিত ব্যক্তি রঞ্জনের স্বজন-পরিজনেরা ‘ব্যক্তি’তে সীমাবদ্ধ থাকেন না- তারা ইউনিভার্সাল ইনডিভিজ্যুয়াল হয়ে সামষ্টিক মানুষের যাপিত জীবনজাত অভিজ্ঞতার বোধের রূপে বিস্তৃত হন। এই বিস্তারে রঞ্জনের প্রবহমান ক্যামেরা তাই অনিবার্য চলচ্চিত্রিক টেকনিক হয়ে উঠেছে এই ছবিতে।

এইখানে, এইখান থেকে ওইখানে জীবনকে ছুঁয়ে ছেনে চেখে দেখে জেনে যাপনের অনুভব আর স্মৃতিকে ধারণ করে রঞ্জনের ক্যামেরা ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’-এ আলো-আঁধারির এক ঘোরলাগা জগতে দর্শককে আহ্বান করে। রঞ্জনের জীবন নদীর বাঁকে বাঁকে অকল্পনীয় ওপেননেসের মুখোমুখি হয়ে দর্শক আরো ঘোরের অলিন্দে যেতে যেতে ভাবে আচ্ছা বাবা, এইভাবে এমন করেও তবে বলা যায় নিজের কথা!

নিজ জীবন পরিভ্রমণে রঞ্জন যে সংবেদী কাব্যিক চিত্রভাষা রচনা করেন তা বুঝে উঠতে উঠতে মিলনায়তনে আড়াই ঘণ্টা পার হয়ে যায়। তারপর দর্শকের মাথায় অভিনব এই চিত্রভাষা ক্রমাগত ঘুরতে থাকে, দর্শক বিস্ময়বিমূঢ় হয়ে নিজের বোধের অলিতে গলিতে ভ্রমণ শুরু করেন। এই ভ্রমণ চলতে থাকে, চলতে থাকে, চলতে থাকে……….!

ফলে, সুনিপুণ পরিকল্পনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রে পাত্র-পাত্রীদের অভিনয়কৌশল, পোশাক পরিকল্পনা, সুবিন্যস্ত সম্পাদনা, তথাগত ননপ্রফেশনাল ক্যামেরায় অনন্য দৃশ্যের সৌন্দর্য, বাড়তি কোনো আলো ব্যবহার না করেও আলো এবং আঁধারির মায়াময় চিত্ররাজিতে সমৃদ্ধ ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’কে ক্রিটিক্যালি বিবেচনা করার অবসর তার মেলে না।

একক হাতে একক উদ্যোগে নিজস্ব বিনিয়োগে আরম্ভ করে এমন সংবেদী পারসোনাল পোয়েটিক চলচ্চিত্র করে তোলা ‘লর্ড অব দ্য অরফানস’ বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের পথ প্রদর্শক হয়ে থাকবে- এই ডিজিটাল কালে।

Flag Counter


1 Response

  1. bijan says:

    andre tarvoski jano alen ranjan dar lord of orphans jure,kudse madam

Leave a Reply to bijan Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.