কবিতা

তিথি আফরোজের টংঘর, রহস্য ও প্রজাপতি প্রজাপতি খেলা

তিথি আফরোজ | 9 Feb , 2019  


টংঘর

অজস্র লজ্জার সাথে দ্বিধা লেপটে থাকে
শোন, সফেদ কবুতর বাকবাকুম করে
লোভাতুর রাতের বুকে নীল সমুদ্রজল
চাঁদের আলো পাহারায় থেকে হাই তোলে
অথচ পত্র-পল্লবের ঘ্রাণ ঘুমায় না, জেগে
থাকে কুসুম কুসুম প্রেম। লাল বালিশ
নীল বালিশের গল্প শুনে সাথে জাগে
শিহরণ। আরও লোমশ কালো ভয়:
এক মরুভূমিতে রোমিওর রক্ত;
কাটা মস্তকে আফ্রোদিতির পেলব ছোঁয়া।
জুলেখার উৎকণ্ঠায় এজিদের চিৎকার শুনে
উড়ে যায় অশ্রুকণা।

আরও একবার ব্যাবিলনের উদ্যান পুড়ে যাক
ধ্বংস হোক পম্পেই নগরী;
এসো, আমরা আবার বৃষ্টিতে ভিজি।

তোমার বুকের মধ্যে যেখানে মন আছে
তার ভেতর খড়কুটোর একটা টংঘর
এত যত্নে লুকিয়ে রেখেছো যে চড়ুই
সেও শুধু তোমাকেই খোঁজে
যেভাবে নিজের চোখ দেখা যায় না নিজে।

আবার একটা ঝড় আসুক
নার্গিস অথবা আইলা।
জলোচ্ছ্বাসে ডুবে ডুবে ঠিকই
ঘুমিয়ে যাব তোমার মনের টংঘরে।
তুমি বেশ ভালোই জানো:
অনন্ত ঘুমের নামও প্রেম।

প্রজাপতি প্রজাপতি খেলা

ভ্রমের ঘুমে তুমি আমি সাঁতরাই
টুপটাপ জল পড়ে আর পাতা নড়ে

বিরান মাঠের বুকে বৃষ্টি বৃষ্টি খেলায় সব সময়
আমি প্রথম। এইযে আমার প্রথম হওয়ার আনন্দে
তোমার চোখে প্রেম ওঠে তা বড়ই মধুর।

গোল্লাছুট ছিবুড়ি খেলায় জুয়েনা, খাদিজা অথবা ফাতেমা
প্রথম হতো: তাদের আনন্দ চোখে মেখে হাসিনি,
বিশ্বাস করো বরং চেয়ার খেলায় হেরে গিয়ে কেঁদে ফেলেছি
গ্রামসুদ্ধ মানুষের মাঝে একবার তো ডলির সাথে ঝগড়াই
বাঁধিয়ে দিলাম।

জীবনের মাঝপথে এই যে—
সব সময় প্রজাপতি প্রজাপতি খেলায় প্রথম হবো
আর বিনিময়ে অতিপ্রেম পাবো
যদি জানতাম তাহলে চোখের এক ফোঁটা জলও ঝরাতাম না,
কুড়িয়ে রাখতাম সব বেহিসাবী দিন। আঁচলের তলায় লুকিয়ে
রাখতাম লুট হওয়া মুক্তা।

তন্দ্রায় জলমগ্নতায় যে নেশাতুর চোখ তুমি আবিষ্কার করো
অক্ষিগোলকে তাতে তুমি তৃপ্তির হাসি হাসো, আহা সে হাসি
বড়ই মধুর!

খেলার নেশায় ঝিম ধরেছো; আফিম অথবা মারিজুয়ানার
মাদকতা হেরে গেলে
জেতাপর্বের নেশায় ছোঁয়াচে রোগের মতো নেশাগ্রস্ত
পিনিক পেয়েছো, সে কী অতি মাদকতা, ওফ্:
বড়ই মধুর…

এইসব খেলার তন্ত্রমন্ত্রে আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়,
ভরে যায় খাঁ-খাঁ মরুপ্রান্তর টইটুম্বুর বৃষ্টিতে ।
মধুমাসের মতো দুলতে দুলতে আম্রপালিও হয়ে য়ায়
রসের হাঁড়ি। ইস রস, বড়ই মধুর…

তানসেনের রাগ মেঘমালা রাগ দীপকে গান বেজে ওঠে
চারদিকে সুমধুর নৈপুণ্যে আর আমরা সৃষ্টি করি
সম্রাট আকবরের নবরত্ন সভার দ্যুতি; সেখানে—
সম্রাট সম্রাজ্ঞী তুমি আমি আর অদৃশ্য রাগের মূর্ছনা।
মূর্ছনা শীৎকার শীৎকার, মূর্ছনা শীৎকার…
অতি উচ্চমার্গীয়;
হৃদয়নিঃসৃত
মধুরতা
বড়ই
মধুর…

রহস্য

আর ধীরে ধীরে আমাদের সেই রহস্যজাল উন্মোচিত হচ্ছে
ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছি গুহা থেকে অতিগুহার পরে, যেখানে
জীবনের ফসিল- কিশোরী মেয়ের প্রথম রক্তস্রোত গ্রহণ করা
বাউলের অতি আত্মার ডাক শোনা যায়।

আমাকে আমি চেনার দীর্ঘ পরিক্রমায় সহায়ক মানবের মুখগুলো
বানর, শেয়াল অথবা কুকুর হয়ে গেলে চোখ বন্ধ করে
খোয়াজ খিজিরকে খুঁজি;
পানিতে ডুব দিয়ে আনাল হক, আনাল হক বলি।
আবার কোনো চেনামুখ নবী অথবা আউলিয়ার মুখ হয়ে গেলে
দাজ্জালের মুখের আওয়াজ শুনি।

গৌতম বুদ্ধ মাথায় হাত দিয়ে বলল, ‘বাছা, মানুষ খুঁজিস না,
পশু হজম কর, হজম কর, বৃক্ষ হ, শেকড় বিস্তার লভিবে
চিরআয়ু’।
যদ্যপি সুফলা বৃক্ষ না হচ্ছি চলবে রহস্যের উন্মোচন।

শার্লক হোমসের অন্ধকার ভেদ করে যে নাবিক
এগোচ্ছে, তার পেছনে আজ আর বসবাস করি না;
বরং এক ধাপ এগিয়ে যে তুমি ডানায় তুলেছো আমার
অতি আবেগী আত্মা, তার ডানা গজানোর বিদ্যা শিখি।
এইসব কর্মকাণ্ড কামাখ্যা দেবীর জানা ছিল না
কিন্তু তিনি জানেন।

সিলগালা করা সিন্দুক গভীর সমুদ্রের তলায় ফেলে এসেছি
জন্মের ঠিক দু’ মিনিট আগে; যখন আমার নিশ্বাস পৃথিবীকে
আন্দোলিত করেনি তখনও ছিলাম। সেই থাকা নিয়ে বেশি কিছু
বলতে চাইনি; তোমরা যারা কাঁকড়া ভাজো খাও আর কাঁকড়াবিদ্যা
শেখো তাদের জন্য নিশ্চয়ই এই সংক্ষেপিত বিদ্যা নয়। বরং তোমরা
পশুকে মানুষ আর মানুষকে পশু বলা শেখো: যদি তাদের তামাটে
চামড়ার নিচের চেহারা দেখতে পাও…
কেননা, ধর্ম তোমাকে সত্য বলতে বলেছে।

Flag Counter


1 Response

  1. Hassan Gorkey says:

    তিথি আফরোজের টংঘর, রহস্য ও প্রজাপতি প্রজাপতি খেলা কবিতা তিনটি পড়লাম। চমৎকার শব্দশৈলী, গভীর অর্থপূর্ণ উপমা এবং আঙ্গিকের অনবদ্য সাবলীলতা তার এই কবিতা তিনটিকে প্রাণ দিয়েছে। আবার কখনও তা বোধের সীমা অতিক্রম করেছে; যেমন কোন এক পাতালপুরীর সিন্দুকে বাঁধা থাকে জীবন রহস্য- “সিলগালা করা সিন্দুক গভীর সমুদ্রের তলায় ফেলে এসেছি
    জন্মের ঠিক দু’ মিনিট আগে”
    ধন্যবাদ কবি তিথি আফরোজ ।
    আরও লেখা পড়তে চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.