আর্টস

মাজহারুল ইসলামের গল্প: একাত্তর

মাজহারুল ইসলাম | 27 Jan , 2019  


অলংকরণ: ফাহমিদা জামান ফ্লোরা

মুনার খালাতো ভাইয়ের এনগেজমেন্ট। আপন খালা না, মায়ের ফুপাতো বোন। গায়েহলুদ, এনগেজমেন্ট এসব অনুষ্ঠানে যেতে আজকাল একদম ভালো লাগে না। নেহায়েত মুনার কারণে আজ যেতে হচ্ছে। মুনা আমার স্ত্রীর নাম।
রাস্তায় প্রচণ্ড ট্রাফিক জ্যাম। বিজয় সরণীর মোড়েই চল্লিশ মিনিট গাড়িতে বসে আছি। তা ছাড়া রওনা হতেও কিছুটা দেরি হয়েছে। আজ ভাস্কর ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী না-ফেরার দেশে চলে গেলেন। জীবনসায়াহ্নে এসে মাত্র কিছুদিন আগে বীরাঙ্গনা থেকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলেন। আমার ও মুনার খুব পছন্দের মানুষ ছিলেন তিনি। দেখা হলে মুনাকে জড়িয়ে ধরে আদর করতেন আর আমাকে বলতেন, তুমি অনেকদিন আসো না। আমি বলতাম, এই তো কদিন আগে ঘুরে এলাম। আপা মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলতেন, ও তাই তো। বয়স হয়েছে, এখন অনেক কিছু মনে রাখতে পারি না। আমি বলতাম, কী এমন বয়স হয়েছে আপনার। আবার একদিন আসব।
শেষবার আসব বলে চলে আসার পর আর যাওয়া হয় নি। আজ তাঁকে শেষবারের মতো দেখতে গিয়েছিলাম। আপার মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর থেকেই মনটা বিষন্নতায় ভরে আছে। মুনার আত্মীয়ের অনুষ্ঠান না হলে আজ বাড়ি থেকে বের হতাম না।
কনভেনশন সেন্টারে পৌঁছাতে আমাদের রাত নটা বেজে গেল। অতিথিরা প্রায় সকলে চলে এসেছেন। আজকাল বিয়ে আর এনগেজমেন্ট অনুষ্ঠানের ধরন একই হয়ে গেছে। খাবারের মেন্যু, সাজসজ্জা প্রায় একইরকম।
মুনা খালাকে জড়িয়ে ধরে বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করল। খালা বললেন, আমার সঙ্গে আয়, এখনই এনগেজমেন্ট রিং পরানো হবে।
আমি স্টেজের ডান দিকটায় আমার শশুরমশাইয়ের পাশে গিয়ে বসলাম। তিনি খুব সময় মেনে চলেন। ঠিক সাড়ে সাতটায় চলে এসেছেন। ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণীর মৃত্যু তাঁকেও স্পর্শ করেছে। তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম শুনে খুশি হলেন। বললেন, খুব ভালো করেছ। তিনি তো আমাদের গর্ব। শশুরের সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে কথা বলছি আর মুনার ব্যস্ততা দেখছি। সে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে নানা বিষয় তদারকি করছে, আবার অনেকদিন পর দেখা হওয়া পরিচিতজনদের সঙ্গে কথাও বলছে। মুনার এই একটা বড় গুণ, এসব আয়োজনে সে নিজে থেকেই দায়িত্ববান হয়ে ওঠে। গাঢ় সবুজ রঙের সিল্ক শাড়ি পরেছে মুনা। খোঁপায় তাজা বেলি ফুলের মালা। সাদা পার্লের গহনা। কিছুদিন আগে অস্ট্রেলিয়া থেকে এই সেটটা আমি এনেছিলাম। সব মিলিয়ে মুনাকে খুব সুন্দর লাগছে।
শুরুতেই এনগেজমেন্ট রিং পরানো নিয়ে একটা গন্ডগোল লেগে গেল। পাত্র-পাত্রীরা একে অপরকে আংটি পরাবে সেটাই আগে থেকে ঠিক করা ছিল। কনের বাবা কিছুদিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। বড়চাচা এখন তাদের অভিভাবক। তিনি এটা মানতে রাজি না। তাঁর কথা হলো দুপক্ষের দুজন মুরব্বি কনে ও পাত্রকে আংটি পরাবেন এবং আশীর্বাদ করবেন। বিয়েশাদিতে মুরব্বিদের দোয়া খুব জরুরি। দু-একজন মুরুব্বি ছাড়া উভয়পক্ষের কেউই এটা মানতে রাজি না। তারা বলছে আজকাল এসব অচল। পাত্রের মার ইচ্ছাও তাই। এখন সবাই মেয়ের মার মতামত জানতে চায়। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ভাসুরের সিদ্ধান্তের উপর তার বলার কিছু নাই। পাত্রের বাবা মানে মুনার খালু এতক্ষণ কোনো কথা বলছিলেন না। চুপচাপ এক জায়গায় বসে ছিলেন। এবার তিনি উঠে এসে বললেন, বিয়াই সাহেব যেটা বলেছেন সেটাই হবে। এবিষয়ে কারও কোনো কথা আমি শুনতে চাই না। আমার ছেলের বউয়ের হাতে আমি আংটি পরাব। বিয়াই সাহেব তাদের জামাইকে আংটি পরাবেন।
এক মিনিটের মধ্যে সমস্যার সমাধান হয়ে গেল।
এরমধ্যে মুনা এসে আমার পাশে বসেছে। মিমি আপা আমাদের দেখে এগিয়ে এসে বলল, তোমরা কোন পক্ষ ?
বললাম, পাত্রপক্ষ। আপনি নিশ্চয়ই কনেপক্ষ ?
আপা বললেন, হুম। আমার বান্ধবীর মেয়ে। তুমি তো চিনবে। এসো তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেই।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কে ?
আপা বলল, আগে আসো তো।
মিমি আপা আমার মেজোবোনের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। পেশায় ডাক্তার। তিনি আমাকে এবং মুনাকে নিয়ে গেলেন কনের মার কাছে। বললেন, দেখো তো চিনতে পারো কি না।
আমি বললাম, ঠিক চিনতে পারছি না।
আপা বললেন, ও তো রুমা। ইদ্রিস চাচার বড়মেয়ে। সারদা পুলিশ একাডেমি।
আমি সালাম দিয়ে বললাম, ও মাই গড! কত বছর পর দেখা হলো। রুনু কোথায় ? খালাম্মা কেমন আছেন ?
রুমা আপা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। বুঝতে পারছি তিনি আমাকে চিনতে পারছেন না। না-পারারই কথা। প্রায় সাতচল্লিশ বছর পর দেখা। মিমি আপা আমার পরিচয় দিতেই রুমা আপা আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তুই এত বড় হয়েছিস ?
আমি বললাম, আপা, সাতচল্লিশ বছর তো অনেক সময়। আমরা সবাই বড় হয়ে গেছি। মিমি আপা না থাকলে আপনাকেও চিনতে পারতাম না।
এরপর কুশল বিনিময়। দুবছর আগে খালাম্মা প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসারে মারা গেছেন। রুনু অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে গিয়ে আর দেশে ফিরে আসে নি। সেখানে এক ইন্ডিয়ান মেয়েকে বিয়ে করেছে। অস্ট্রেলিয়ান এক সফটওয়্যার কোম্পানিতে ভালো চাকরি করে। আমার মেজোবোন মিলি, রুমা আপা ও মিমি আপা একসঙ্গে স্কুলে পড়ত।
আপা জিজ্ঞেস করল, মিলি কোথায় আছে ? কী করে ? চাচা-চাচি কেমন আছেন লেন ?
আব্বা মারা গেছেন ১৯৯৬ সালে, বললাম। রুমা আপা আমাদের একটা খাবার টেবিলে নিয়ে বসালেন। খাবার দিতে বিলম্ব হচ্ছে এই ফাঁকে মুনা আবার তাঁর আত্মীয়দের সাথে দেখা করতে উঠে গেছে। সাতচল্লিশ বছর পর রুমা আপাকে দেখে আমার মনে পড়ে গেল একাত্তরের সেই ভয়াল দিনগুলির কথা।


কয়েকদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে দেশে যুদ্ধ লাগবে। যুদ্ধ কী এবং কেন হয় এটা বোঝার মতো বয়স তখনো আমার হয় নি। বড়রা এসব বিষয় নিয়ে কথা বলে, তখন কিছু কিছু কথা শুনি। আব্বা-চাচারা সারাক্ষণ এসব বিষয় নিয়ে শলা-পরামর্শ করে। শুনলাম পঁচিশে মার্চের রাত্রিতে রাজারবাগ পুলিশলাইনে বর্বরোচিত হামলা হয়েছে। অনেক পুলিশকে হত্যা করেছে পাকিস্তানি আর্মিরা। ওয়ারলেসে নাকি খবর এসেছে যে-কোনো মুহূর্তে সারদা পুলিশ একাডেমিতে হামলা হতে পারে। কয়েকদিন ধরেই আব্বাকে খুব চিন্তিত দেখছি। গতকাল রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় আম্মাকে বলছিলেন কয়েকটা ব্যাগে প্রত্যেকের কিছু কাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতে, যে-কোনো দিন আমাদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে হতে পারে। আব্বা ও চাচারা কোথায় গিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা যায় সেসব বিষয়ে সারাক্ষণ আলোচনা করছেন। ১২ এপ্রিল সকাল থেকেই শোনা যাচ্ছে আর্মিরা যে-কোনো সময় একাডেমিতে ঢুকে পড়বে। বানেশ্বরে আজ সকালে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে তারা খানিকটা পেছনে সরে গেছে, কিন্তু যে-কোনো সময় আবার হামলা করবে। তাই গভীর রাতে একাডেমিসংলগ্ন এক গ্রামে আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গ্রামের নাম থানাপাড়া।
অসংখ্য মানুষ পদ্মার পাড়ে জমা হয়েছে। অনেকে নিজস্ব গন্তব্যের উদ্দেশে হাঁটছে। আবার কেউ কেউ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে, কিন্তু তারা জানে না কোথায় তাদের নিরাপদ আশ্রয় হবে। সবার চোখেমুখে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ছাপ। পুলিশ একাডেমি ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু মানুষ এসে জড়ো হয়েছে এখানে। পদ্মার পাড়কে তারা নিরাপদ মনে করেছে। যে যা পেরেছে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। মধ্যরাতে পদ্মার পাড় দিয়ে হাজার হাজার মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। এই জনস্রোতে আমরা তিনটি পরিবারও আছি। এই তিন পরিবারের একটির বড় মেয়ে রুমা আপা। তাঁর ছোটভাই রুনু আমার বন্ধু। আরেক পরিবার হলো হরিপদ কাকার। তাদের তিন ছেলেমেয়ে। আমরা চার ভাইবোন। সব মিলে আমাদের তিন পরিবারের সদস্য সংখ্যা একেবারে কম নয়। পনেরোজন। আমার বড়ভাইয়ের মাথায় চালের বস্তা। মেজোভাইয়ের মাথায় হোলডোল, যার মধ্যে কয়েকটা বালিশ, কাঁথা, চাদর আছে। আব্বার এক হাতে চামড়ার স্যুটকেস অন্য হাতে কাপড়ের ব্যাগ। আরেক ভাইয়ের একহাতে একটা হারিকেন ও তেলের শিসি। ঘরবাড়ি ফেলে সবাই ছুটে চলেছি নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। আমি আম্মার হাত ধরে হাঁটছি। কখন থানাপাড়ায় পৌঁছে গেছি এবং ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। সকালে ঘুম ভাঙার পর বুঝতে পারলাম একটা বড় রুমের মধ্যে গাদাগাদি করে অনেকের সঙ্গে আমিও শুয়ে আছি।


ঘুম থেকে উঠে ঘরের বাইরে আসতেই খিচুড়ি ও মুরগির মাংস রান্নার ঘ্রাণ নাকে এল। আম্মার কাছে শুনলাম রুমা আপার আব্বা ইদ্রিস চাচা ও হরিপদ কাকা খুব ভোরে একাডেমিতে গিয়ে নিজেদের বাসায় পালা চারটা মোরগ ধরে এনেছে আর বাকি হাঁসমুরগিগুলোকে মুক্ত করে এসেছে। হরিপদ কাকার খুব প্রিয় টিয়া পাখিটা খাঁচা থেকে বের করে মুক্ত বাতাসে ছেড়ে দিয়েছে। যুদ্ধের সময় নাকি পশুপাখিকে আটকে রাখতে নাই। মা-খালাম্মারা একসাথে বসে রান্না করছেন। আব্বা ও দুই চাচা সেই সকাল থেকে রেডিও কানের কাছে ধরে চিন্তিত মুখে বসে আছেন আর কী সব শলা পরামর্শ করছেন। সবাইকেই খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে।
দুপুরের খাবার খেয়ে এখান থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে ঝিকরা নামক আরেক গ্রামে চলে যাব। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেব আব্বার পরিচিত। তিনি খবর পাঠিয়েছেন আমরা যেন তার ওখানে চলে যাই। ঘোড়ার গাড়িও পাঠিয়েছেন তিনি। থানাপাড়া পুলিশ একাডেমিসংলগ্ন হওয়ায় জায়গাটা নিরাপদ না। বাড়ির মালিকের বড়ছেলে আমার মামার বন্ধু। তার নাম বদিউর রহমান। আমরা বদি মামা বলে ডাকি। আমাদের বিপদের কথা শুনে এক রাতের জন্য থাকার ব্যাবস্থা করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাড়ির অন্য সবাই দুদিন আগেই দূরের কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন। আমাদের বিদায় করে মামা নিজেও এখান থেকে চলে যাবেন।
রান্না শেষ। বাড়ির উঠানে মাদুর বিছানো হয়েছে। সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া হবে। এরমধ্যে বদি মামা দৌড়াতে দৌড়াতে এসে খবর দিলেন পাকিস্তানি আর্মিরা পুলিশ একাডেমির কাছাকাছি চলে এসেছে। আপনাদের তাড়াতাড়ি এখান থেকে পালাতে হবে। তাঁর কথা শেষ না হতেই গুলির আওয়াজ কানে এল। মামা বললেন, এই মুহূর্তে আপনারা পূর্বদিকের জঙ্গলের ভেতর চলে যান। সেখানে একটা ট্রেন্স কাটা আছে, তারমধ্যে আশ্রয় নেন। যারা ট্রেন্স কেটেছিল তারা দূরের কোনো গ্রামে চলে গেছে। তাড়াতাড়ি প্রয়োজনীয় দু-চারটা জিনিস হাতে নিয়ে সবাই জঙ্গলের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। ইদ্রিস চাচা ও রুমা আপা ছাড়া অন্যরা সবাই ট্রেন্সের মধ্যে নেমে গেছে। তিনি খানিকটা পথ আসার পর ফিরে গেছেন কী একটা জিনিস ফেলে এসেছেন সেটা আনতে। গুলির শব্দ বাড়ছে। ইদ্রিস চাচা ট্রেন্সের সামনে এসে চাচিকে বললেন, এই জায়গা নিরাপদ না। আমি পদ্মার পাড়ে যাব। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ পদ্মার পাড়ে আশ্রয় নিয়েছে। রুনুকে নিয়ে উঠে আসো।
আব্বা বললেন, ইয়াসিন সাহেব, পদ্মার চর ফাঁকা জায়গা। সেখানে যাওয়া নিরাপদ হবে না। তা ছাড়া দেখছেন তো গোলাগুলি শুরু হয়ে গেছে। আপনি ট্রেন্সের ভেতর চলে আসুন।
চাচি বললেন, সবাই যখন বলছে তুমি রুমাকে নিয়ে নেমে আসো।
চাচা আবারো বললেন, রুনুকে নিয়ে তুমি উপরে উঠে আসো। এখানে নিরাপদ না।
চাচি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন তার আগেই ইয়াসিন চাচা কোনো কথা না শুনে রুমা আপার হাত ধরে হনহন করে দ্রুত হেঁটে চলে গেলেন।
গুলির শব্দ আরও বেড়েছে। একপর্যায়ে মনে হলো বৃষ্টির মতো গুলি হচ্ছে। আমি ভয়ে মাথা তুলে তাকাতে পারছি না। আমার বন্ধু রুনু এতক্ষণ চুপচাপ থাকলেও এখন সে ভয়ে কান্না শুরু করেছে। সে বলছে, আমি আব্বার কাছে যাব। চাচি ওর কান্না থামানোর চেষ্টা করছে। বলছে, গুলি বন্ধ হলে আমরা তোমার আব্বার কাছে যাব।
এদিকে হরিপদ কাকার ছোটমেয়ে বুবলি বলছে তার বাথরুম পেয়েছে। কাকা বললেন, এখন কিছু করার নাই, অপেক্ষা কর মা। একটু পর আবার বলছে, বাবা, আমি এখনই বাথরুমে যাব। কাকা এবার গালে ঠাস করে একটা চড় দিলেন। বুবলি চিৎকার করে কান্না শুরু করল।
আব্বা বিরক্ত হয়ে বললেন, কী করছেন এসব ? বিপদের সময় মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়। মেয়ের কান্না থামান।
আম্মা আমাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে আছেন আর বিড়বিড় করে সূরা পড়ছেন। অন্যরাও দোয়া-দরূদ যা জানে পড়ছে। হরিপদ কাকার স্ত্রী জোরে জোরে বিভিন্ন দেব-দেবীর নাম জপছেন।
রুনুর মা ইদ্রিস চাচি কান্নাকাটি করছে।
আব্বা বলল, ভাবি, ইদ্রিস সাহেব তো কারও কথা শুনলেন না। আমরা এখন অনেক বড় বিপদের মধ্যে আছি। কান্নাকাটি বন্ধ করে দোয়া-দরুদ পড়েন। আল্লাহ-খোদার নাম নেন।
আবারও গুলির শব্দ।
আব্বা বললেন, দোয়া-দরুদ পড়েন মনে মনে । কোনো শব্দ করবেন না।


সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। অনেকক্ষণ ধরে গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ মানুষের পায়ে হাঁটার শব্দ। ভয়ে সবাই জড়সড় হয়ে বসে আছি আমরা। বদি মামা এসে দাঁড়ালেন। মামাকে দেখে আমরা আশ্বস্ত হলাম। বদি মামা বললেন, বড় রাস্তা ফাঁকা, কোনো গাড়ি চলাচল করছে না। আপনারা দ্রুত উপরে উঠে আসেন। এখনই রাস্তা পার হয়ে ঝিকরার দিকে রওনা হতে হবে।
আমরা একে একে ট্রেন্স থেকে এলাম। বদি মামা হরিপদ কাকাকে কাকির মাথার সিঁদুর মুছে দিতে বললেন। কাকা প্রথমে বুঝতে না পেরে হতভম্ব হয়ে বদি মামার দিকে তাকিয়ে আছেন। আব্বা বুঝিয়ে বললে কাকা নিজেই সিঁদুর তোলার কাজটি করলেন। কাকির চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ছে। ভয়ে মুখে কান্নার শব্দ নাই। ইদ্রিস চাচি পদ্মার পাড়ে চাচা ও রুমা আপাকে খুঁজতে যাবেন। বদি মামা বললেন, পদ্মার চরে হাজার হাজার মানুষ। ওখানে গিয়ে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তা ছাড়া ঐদিক থেকে এখনও গুলির শব্দ আসছে।
কিন্তু চাচি কোনো কথা শুনতে রাজি না। পদ্মার পাড়ে গিয়ে চাচা ও রুমা আপাকে খুঁজে বের না করা পর্যন্ত অন্য কোথাও যাবেন না তিনি। রুনুও চাচার জন্য কান্নাকাটি করছে।
আব্বা বললেন, ভাবি, আমরা আগে নিরাপদ আশ্রয়ে যাই। তারপর ইদ্রিস সাহেবকে খুঁজে বের করব। এখন পদ্মার পাড়ে গিয়ে খুঁজে বের করা সম্ভব হবে না। তা ছাড়া ওখানে যাওয়া এখন সবার জন্য বিপদজনক হতে পারে।
চাচি আর কোনো কথা না বলে চোখের পানি মুছতে মুছতে আমাদের সঙ্গে রওনা হলেন। রুনু চাচির হাত ধরে আছে। ও মাঝে মাঝে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। বড় রাস্তার কাছাকাছি এসে আমরা দাঁড়ালাম। বদি মামা কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে চার পাকিস্তানি সৈন্য দেখে হাতের ইশারায় আমাদের রাস্তা পার হতে বললেন। একটা কাকপক্ষীও নাই রাস্তায়। চারদিকে শুনসান নিরবতা। আমরা দ্রুত রাস্তা পার হয়ে গ্রামের মধ্যে হাঁটতে শুরু করলাম। আধা কিলোমিটার হাঁটার পর মোল্লাবাড়িতে পৌঁছালাম। চেয়ারম্যান চাচা আমাদের নেওয়ার জন্য দুটা টমটম গাড়ি থানাপাড়া পাঠিয়েছিলেন। গোলাগুলি শুরু হওয়ায় বদি মামা টমটম থানাপাড়া পর্যন্ত না এনে মোল্লাবাড়িতে রাখার ব্যাবস্থা করেছেন। এখান থেকে আমরা টমটমে করে ঝিকরা যাব।
মোল্লাবাড়িতে রমিজুদ্দিন মোল্লা ছাড়া কোনো পুরুষমানুষ নাই। সবাই মুক্তিযুদ্ধে গেছে। বাড়ির বৌ-ঝিদের নিয়ে সত্তোরোর্ধ্ব রমিজুদ্দিন নিজ ভিটাতে পড়ে আছেন। তিনি গুড়, মুড়ি এবং ছাতু খেতে দিলেন আমাদের। আম্মা পানি ও গুড় দিয়ে ছাতু মেখে আমাকে ও রুনুকে খাওয়ালেন। সারা দিন কারও খাওয়াদাওয়া নাই। সবাই প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত। ছাতুমুড়ি খেয়ে খানিকটা সময় বিশ্রাম নিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে আমরা ঝিকরার উদ্দেশে রওনা হলাম। রাস্তা জনমানবশূন্য। হঠাৎ করে কারও সঙ্গে দেখা হলে তিনি জানতে চান আমরা কোথা থেকে আসছি। সেদিকের খবর কী ?
রাত প্রায় নয়টায় চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়িতে পৌঁছালাম। দীর্ঘপথ হাঁটার ক্লান্তি এবং সারা দিন খাওয়াদাওয়া না হওয়ায় সবার অবস্থা কাহিল। চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়িতে অসংখ্য মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। আব্বা বললেন, বাচ্চাগুলো সারা দিন না খেয়ে আছে। ওদের জন্য একটু তাড়াতাড়ি খাবারের ব্যবস্থা করলে ভালো হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে খাবার দেওয়া হলো। পানির মতো পাতলা খিচুড়ি। হাত দিয়ে তুলে খেতে পারছি না দেখে আম্মা আমাকে কাসার গ্লাসে খিচুড়ি খেতে দিলেন। আমি গ্লাস হাতে নিয়ে চুমুক দিয়ে খিচুড়ি খাচ্ছি। আম্মাকে বললাম, বদি মামা কি থানাপাড়ার বাড়িতে রান্না করে রেখে আসা মুরগির মাংসের তরকারি নিয়ে আসবেন ? আম্মা বিরক্ত হয়ে বললেন, জানি না বাবা, যা আছে এটা খেয়ে নাও। আমরা এখন বিপদের মধ্যে আছি। যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধের সময় অনেক কষ্ট করতে হয়। আমি আর কোনো কথা না বলে খাওয়া শেষ করলাম।
রাতে চেয়ারম্যান চাচাকে বলতে শুনলাম আজ থানাপাড়া-কুটিপাড়াসহ আশপাশের গ্রাম থেকে প্রায় দুই হাজারের বেশি লোক পদ্মার চরে জমা হয়েছিল। কারও কারও উদ্দেশ্য ছিল পদ্মা পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া। পাকিস্তানি হায়েনার দল খবর পেয়ে চরের দিকে এগিয়ে যায়। চরে বেশি নৌকা ছিল না। যা ছিল সেটা দিয়ে সবার পারাপার সম্ভব না। একপর্যায়ে পাকিস্তানি সেনারা পদ্মার পাড়ে চলে যায় এবং সবাইকে ঘেরাও করে ফেলে। সেখান থেকে মহিলা ও শিশুদের আলাদা করে সবাইকে গুলি করে হত্যা করেছে পাকিস্তানি সেনারা। কথাগুলো শোনামাত্রই শরীর কেঁপে ওঠে। ইদ্রিস চাচারও তো পদ্মার পাড়ে যাওয়ার কথা ছিল। যদি সত্যি গিয়ে থাকেন, তাহলে ইদ্রিস চাচাও কি…। রুমা আপার কী হলো! তিনি একা কোথায় গেলেন ? কীভাবে আমরা তাকে খুঁজে পাব। ইদ্রিস চাচি ও রুনু খবরটা এখনো জানে না। রুনু আমার পাশেই শুয়ে আছে। ও অনেক অগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমানোর আগে চাচার জন্য খুব কান্নাকাটি করছিল। রুনুর মুখের দিকে তাকাতে কষ্ট হচ্ছে। চাচা যদি আর ফিরে না আসে ?
দুদিন পর একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানালেন তিনি নিজে দেখেছেন ইদ্রিস চাচাকে অন্যদের সঙ্গে লাইনে দাঁড় গুলি করে মেরেছে আর্মিরা। রুমা আপার কথা তিনি বলতে পারছেন না। আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে খোঁজ নেওয়া শুরু হলো। একদিন খবর এল পাঁচ মাইল দূরে হরিরামপুর গ্রামে হারিয়ে যাওয়া কয়েকজন কিশোরী প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার জলিল সাহেবের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে চেয়ারমান চাচা হরিরামপুর লোক পাঠালেন। সন্ধ্যায় সেই লোক ফিরে এসে জানাল ঘটনা সত্য, তবে ইদ্রিস সাহেবের মেয়ে রুমা নামে সেখানে কেউ নেই।
এভাবে প্রতিদিন খবর আসতে লাগল অমুক গ্রামে কয়েকজন মেয়েকে দেখা গেছে, তমুক গ্রামে কোনো মেয়েকে দেখা গেছে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেসব জায়গায় লোক পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু কোথাও রুমা আপাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
একদিন চেয়ারম্যান চাচার বাড়ির রাখাল মজিদ বলাবলি করছিল সে কারও কাছে শুনেছে, অনেক যুবতী ও কিশোরীকে নাকি আর্মিরা ধরে নিয়ে গেছে ক্যাম্পে। পাকিস্তানি হায়েনাদের নির্যাতনের শিকার হয়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরে কাটাখালি গ্রামে দুই মেয়ে আত্মহত্যা করেছে কদিন আগে। এই খবর শুনে ইদ্রিস চাচি খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। রুনু মার আড়ালে কান্নাকাটি করে আর সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড়ির দক্ষিণে বড় রাস্তাসংলগ্ন আমগাছের নিচে বসে বাবার জন্য অপেক্ষা করে। রুনুর বিশ্বাস তার বাবা এবং বোন নিশ্চয়ই ফিরে আসবে। একদিন আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমার বাবা কি আর ফিরে আসবে না ?
আমি ওর কথার কোনো উত্তর দিতে পারি নি।
সাত দিন পর খবর এল নয় মাইল দূরের এক গ্রামে কয়েকজন বিধবা এবং কিশোরী মেয়ে আছে। গ্রামের নাম আড়ানি। খুব ভোরে দুজন লোক চলে গেল সেই গ্রামে। সন্ধ্যার আগে তাদের সঙ্গে রুমা আপা ফিরে এল। তাকে দেখে চেনার উপায় নাই। এই কদিনে কাংকালসার শরীর, চোখে মুখে প্রচণ্ড ভয় ও আতংকের ছাপ। চাচি আপাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল। রুমা আপা বোবাদৃষ্টিতে চাচির দিকে তাকিয়ে আছে। তার মুখে কোনো শব্দ নাই। রুনু বারবার বলছে, আপু, আব্বা কোথায় ? চাচি বলছে, তোর আব্বাকে কোথায় রেখে এসেছিস ? রুমা আপা একবার চাচির দিকে একবার রুনুর দিকে তাকাচ্ছে। তার এই অবস্থা দেখে আমরা ভয় পেয়ে গেলাম।
কিছুক্ষণ পর রুমা আপা চিৎকার করে বললেন, মা, আব্বা নেই। আমার সামনে আব্বাকে গুলি করে…। কথা শেষ হওয়ার আগেই তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। অনেকক্ষণ মাথায় পানি দেওয়ার পর জ্ঞান ফিরে এলে এবার কান্না শুরু হলো। রুনু একবার মাকে একবার বোনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। তাদের সঙ্গে উপস্থিত অন্যরাও কান্নাকাটি শুরু করল। আশপাশের বাড়ির লোকজন জড়ো হয়ে গেল। চাচি ও রুমা আপার কান্নার শব্দে বাতাস ভারী হয়ে উঠল।


চেয়ারম্যান চাচার বাড়িতে দশ দিন থাকার পর একরাতে তিনি আব্বাকে ডেকে বললেন, আপনাদের এখানে থাকা আর নিরাপদ হবে না। কখন আর্মি চলে আসে ঠিক নাই। গ্রামে শান্তিকমিটি গঠিত হয়েছে। আমার বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা আসা-যাওয়া করে। কাজেই যে-কোনো সময় আমার এখানে হামলা হতে পারে। আপনারা অন্য কোনো নিরাপদ জায়গায় চলে যান।
দুদিন পর রুমা আপার বড়মামা এসে তাদের নিয়ে গেলেন রাজশাহী। আমরা চলে গেলাম দশ কিলোমিটার দূরে ঝলমলিয়ায় হরিপদ কাকার ভাইয়ের বাড়িতে। চেয়ারম্যান চাচা আমাদের জন্য একটা টমটম ঠিক করে দিলেন। যুবক ছেলেদের পেলেই গুলি করে হত্যা করছে পাকিস্তানি আর্মি। তাই সে যাত্রায় আম্মা ও হরিপদ কাকির সঙ্গে আমার বড়ভাইকেও বোরখা পরতে হলো। ঝলমলিয়া পৌঁছানোর দুই দিন পর খবর পেলাম মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার কারণে চেয়ারম্যান চাচাকে ধরে নিয়ে গেছে পাকিস্তানি আর্মিরা। রাতে তার বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলে শান্তিকমিটির লোকজন। পরদিন সকালে চাচার লাশ পাওয়া যায় সারদা পাইলট হাই স্কুলের মাঠে। খবর শুনে আব্বা ও ইদ্রিস কাকা খুব কান্নাকাটি করলেন।
কদিন পর এক সকালে হরিপদ কাকা হাত কচলাতে কচলাতে আব্বাকে বললেন, দুই-এক দিনের মধ্যে তারা সবাই ভারতে চলে যাবেন। তার বড়ভাই সব বন্দোবস্ত করে ফেলেছেন। এখানে তারা একেবারেই নিরাপদ না।
একদিন গভীর রাতে কাউকে কিছু না বলে গরুর গাড়িতে করে তারা গোদাগাড়ি বর্ডারের উদ্দেশে রওনা হলেন। শুধু আব্বা-আম্মা জানতেন বিষয়টা। আমরা জানলাম সকালে ঘুম থেকে উঠে। নাস্তা করার পর ঝলমলিয়া থেকে মুলাডুলি আমার বড়চাচার বাসায় চলে গেলাম।
কয়েকদিন পর শুনলাম হরিপদ কাকারা বর্ডার পর্যন্ত যেতে পারেন নি। রাস্তায় চেকপোস্টে ধরা পড়ে যাওয়ায় হরিপদ চাচা ও তার বড়ভাইকে পাকিস্তানি আর্মিরা হত্যা করেছে। কাকি ও অন্যদের কী অবস্থা জানতে পারি নি আমরা।


এরমধ্যে কখন খাবার পরিবেশন করেছে আমি লক্ষ করি নি। মুনা গেছে তার পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলতে। ফিরে এসে বলল, কী ব্যাপার তুমি খাবার না নিয়ে বসে আছো ?
বললাম, তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
মুনা আমার প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে বলল, খালা বলছিলেন তোমাকে নাকি খুব আনমাইন্ডফুল লাগছে।
আমি বললাম, কই না তো ?
খালা ঠিকই ধরতে পেরেছেন। আসলেই তো আমি আনমাইন্ডফুল। খাবার নিয়ে নাড়াচাড়া করছি। কোনো খাবারই ভালো লাগছে না।
মুনা বলল, তুমি খাচ্ছ না তো!
বললাম, শরীরটা ভালো লাগছে না। আসলে রুমা আপাকে দেখার পর থেকে আমি ফিরে গেছি বিভীষিকাময় একাত্তরে। কোনোভাবেই সেখান থেকে বের হতে পারছি না।
বেয়ারা ছেলেটা বলল, স্যার এইমাত্র গরম খাবার নিয়ে এসেছি, একটু দেই আপনাকে।
বললাম, আমার কিছু লাগবে না।
ছেলেটি আবারও বলল, স্যার কাচ্চির আলু দেই একটা ? বোরহানি দেব আরেক গ্লাস ?
এবার ছেলেটাকে ছোট করে একটা ধমক দিলাম, বলেছি তো কিছু লাগবে না। তারপরও বিরক্ত করছ কেন ?
এরমধ্যে রুমা আপা এসে খাবার ঠিকঠাক আছে কি না খোঁজ নিয়ে গেলেন।
মুনা জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে তোমার ? কিছুই খেলে না। শুধু শুধু ছেলেটাকে ধমক দিলে।
বললাম, ছেলেটা খুব বিরক্ত করছিল।
ফিরে আসার সময় একসঙ্গে পেলাম দুই বেয়ানকে। রুমা আপা ও মুনার খালা। আপা আমাকে দেখে বললেন, তোমাদের সাথে পরিচয় করে দেই। উনি হচ্ছেন আমার…।
আমি বললাম, আপনার বেয়ান, আমার রুমা আপা।
খালা বললেন, তাই নাকি ? আগে থেকে চেনো ?
আমি বললাম, জি। সাতচল্লিশ বছর পর আমাদের দেখা হলো। একাত্তরের পর আর দেখা হয় নি।
খালা বলল, এত দিন পর!
আমি বললাম, জি। সারদা পুলিশ একাডেমিতে আমরা পাশাপাশি বাড়িতে থাকতাম। সতেরো এপ্রিল উনিশ’শো একাত্তর একাডেমিতে পাকিস্তানি আর্মিরা অ্যাটাক করে। আগেরদিন রাতে আমরা একাডেমি থেকে পালিয়ে পাশের গ্রামে চলে যাই। পরদিন গোলাগুলি শুরু হলে জঙ্গলের ভেতর একটা ট্রেন্সের মধ্যে আশ্রয় নেই আমরা তিনটি পরিবার। হঠাৎ রুমা আপার আব্বা বললেন, তিনি এখানে থাকবেন না। এই জায়গা নাকি নিরাপদ না। তিনি পদ্মার পাড়ে যেতে চান। সবাই চাচাকে নিষেধ করলেন। তিনি শুনলেন না। রুমা আপাকে সঙ্গে নিয়ে পদ্মার পাড়ে চলে গেলেন।
খালা অবাক হয়ে বললেন, তখন তোমার বয়স কত ছিল ? সব মনে আছে দেখছি।
বললাম, সাড়ে আট বছর। সব মনে নেই। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কিছু ঘটনা মনে আছে। সেদিন পদ্মার চরে যারা আশ্রয় নিয়েছিল তাদের সবাইকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানিরা। তাদের মধ্যে রুমা আপার আব্বা ইদ্রিস চাচাও ছিলেন।
খালা বললেন, আমি শুনেছি একাত্তর সালে তিনি শহিদ হয়েছেন। এত বিস্তারিত জানতাম না।
রুমা আপাকে মনে হলো তিনি বিরক্ত হচ্ছেন। বললেন, এসব কথা থাক না!
আমি বললাম, আপনাকে দেখার পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোর স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠছে। চাচা সেদিন পদ্মার পাড়ে না গেলে হয়তো…।
আপা আবারও বললেন, থাক না এসব কথা!
আমি বললাম, সরি আপা। অনেকদিন পর আপনাকে দেখে খানিকটা নস্টালজিক হয়ে গেছি। আমরা খবর পেয়েছিলাম সেদিন পদ্মার চরে সব পুরুষ মানুষের সঙ্গে চাচাকেও লাইন করে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করা হয়।
খালা বললেন, বেয়ান সাহেব, আপনার সামনেই আপনার বাবাকে গুলি করলেন?
রুমা আপার চোখে পানি। আস্তে করে বললেন, জি।
খালা বললেন, সরি। আমি এত ডিটেইল জানতাম না।
আমি বললাম, খালা, আমরা কী যে টেনশনে ছিলাম! একেকটা রাত ভীষণ উৎকন্ঠার মধ্যে কাটছিল। চাচি খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিলেন। নানারকম গুজব কানে আসছে। সাত দিন পর রুমা আপাকে…।
রুমা আপা আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে প্রচণ্ড রেগে গিয়ে বললেন, তোকে বারবার বলছি এসব কথা শুনতে ভালো লাগছে না।
আমি অপ্রস্তুত হয়ে আপার দিকে তাকিয়ে দেখি তার কপাল কুঁচকানো, চোখমুখ শক্ত। তিনি আমাদের সঙ্গে কোনো কথা না বলে তার বিয়ানকে নিয়ে স্টেজের দিকে চলে গেলেন। খালাকে কিছুটা বিব্রত মনে হলো। চোখের ইশারায় তিমি আমাদের বিদায় দিলেন।
মুনা বলল, তোমার কথাগুলো উনি ভালোভাবে নেন নি। মনে হলো খুব বিরক্ত হয়েছেন।
আমি বললাম, বিরক্ত হবেন কেন? আমি তো কোনো মিথ্যা বলি নি। যা ঘটেছে তা-ই বলেছি। এতে রাগ করার কী আছে ? আপাকে দেখে আমি আমার শৈশবে ফিরে গিয়েছিলাম। ফিরে গিয়েছিলাম একাত্তরের ভয়াল দিনগুলিতে। আমার মাথা ঠিকমতো কাজ করছিল না। তাই কী বলা উচিৎ কী উচিত না সেসব ভাবতে পারি নি। তা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের কথা বলবো তাতে এত ভাবাভাবির কী আছে?


এয়ারপোর্ট রোড ধরে আমরা ধানমন্ডি ফিরছি। মুনা ফোনে তার মার সঙ্গে কথা বলছে। রাত এগারোটা বাজে, তারপরও রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম। অকারণে কেউ কেউ গাড়ির হর্ন বাজাচ্ছে। রাস্তার সোডিয়াম লাইটের আলো গাড়ির ভেতরে এসে পড়েছে। সে আলোয় মুনাকে অপূর্ব লাগছে। মুনা তার মাকে এনগেজমেন্ট অনুষ্ঠানে কী কী ঘটেছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে যাচ্ছে। লাইভ কমেন্ট্রি। আর আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে–মুক্তিযুদ্ধের সময় রুমা আপা সাত দিন নিখোঁজ ছিলেন, এ ঘটনাটা বলতে দিলেন না কেন? পদ্মার চরে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে ইদ্রিস চাচাকেও যখন হত্যা করা হয় তখন তিনি একা তাঁর সঙ্গে ছিলেন। চাচি ও রুনু আমাদের সঙ্গে। সেই সময় কিছুদিন নিখোঁজ থাকবেন এটাই তো স্বাভাবিক। এ কথা বলাতে তিনি এতটা বিরক্ত হলেন কেন?

[লেখকের প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থ ‘ঘটনা কিংবা দুর্ঘটনার গল্প’ থেকে নেওয়া]


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.