স্মরণ

শতবর্ষ পরে স্ট্রিন্ডবার্গ বিতর্ক

আনিসুর রহমান | 25 Jan , 2019  


২০১২ সাল ছিল সুইডিশ নাট্যকার অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গের মৃত্যু শতবর্ষ। নাট্যকার হিসেবে তিনি সারা দুনিয়ায় পাঠ্য ও চর্চার বিষয়: বাংলাদেশ এবং জন্মভূমি স্ক্যান্ডিনেভিয়া তো বটেই। ২০১২ সালে প্রায় সব দেশেই তাঁকে অল্পবিস্তর স্মরণ করা হয়েছে।
২০১২ সালের শেষের দিকে নরওয়ের রাজধানী অসলোতে সুইডিশ দূতাবাস এবং ভকসেনাসেন সংস্কৃতি কেন্দ্র যৌথভাবে স্ট্রিন্ডবার্গ শতবর্ষের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আয়োজনের মধ্যে আলোচনা, তাঁর নাটকের মঞ্চায়ন এবং স্ট্রিন্ডবার্গের ক্যামেরায় ধারণকৃত আলোকচিত্রের প্রদর্শনী।

স্ট্রিন্ডবার্গের জন্ম ১৮৪৯ সালে এবং মৃত্যু ১৯১২ সালে। তাঁর সমসাময়িক আন্তর্জাতিক নাটক জগতের আরেক দিকপাল ইবসেনের জন্ম ১৮২৮ সালে এবং মৃত্যু ১৯০৬ এ। আর নোবেল পুরস্কারের প্রবর্তন ১৯০১ সালে। ধারণা করা হয়েছিল প্রথম সুইডিশ হিসেবে অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গ নোবেল পুরস্কার জিতে নেবেন। কিন্তু তা আর হলো না। পুরস্কারটা পেলেন তাঁর সমসাময়িক সুইডিশ লেখিকা সেলমা লেগারলক (১৮৫৮-১৯৪০) ১৯০৯ সালে। আর ১৯০৫ সালে নরওয়ের লেখক ইবসেন না পেয়ে পেলেন তাঁরই বন্ধু এবং প্রতিদ্বন্দী বুদ্ধিজীবি বিয়র্নসিয়ন বিয়র্নসেন (১৮৩২-১৯১০) ১৯০৫ সালে। স্ট্রিন্ডবার্গের মৃত্যুর পরের বছর ১৯১৩ সালে ইউরোপের বাইরের প্রতিভা হিসেবে প্রথম নোবেল পুরস্কার পেলেন আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
সাহিত্য বিচারের জন্যে নোবেল পুরস্কার বা অন্য কোনো পদক টদককে আমি তেমন কোনো বিবেচ্য মাপকাঠি মনে করি না। একজন পাঠক হিসেবে এরকম আমার মনোভাব। যেমন আমাদের রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পেলেও যা না পেলেও তা। ঠিক তেমনি অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গও। যাকে মনে করা হয় স্ক্যান্ডিনেভিয় অঞ্চলের শেক্সপিয়র (১৫৬৪-১৬১৬)। তবে প্রসঙ্গক্রমে বলে নেওয়া ভালো যে সময় চিহ্নিত করার সুবিধার্থে নোবেল পুরস্কারের কথা এখানে উল্লেখ করতে হচ্ছে।
স্ট্রিন্ডবার্গ ছিলেন আপাদমস্তক প্রথা এবং প্রতিষ্ঠাবিরোধী একজন লেখক। যেমন তিনি পরিবার প্রথাবিরোধী- তেমনি ধর্মাচার- যৌনাচার- সমাজ এবং রাষ্ট্রাচারেও। জেলে যাবার হুমকির মধ্যে থেকেছেন অনেকবার। পুলিশের ভয়ে সুইডেন থেকে ডেনমার্ক- ডেনমার্ক থেকে জার্মানী কিংবা ফ্রান্সে তাড়িত জীবনযাপন করেছেন।

স্ট্রিন্ডবার্গের অবস্থানকে কেন্দ্র করে ১৯ শতকের শুরুর দিকে সুইডেনের রাজনৈতিক অঙ্গন দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে- একদিকে শ্রমজীবি-সমাজবাদী-উদার গণতন্ত্রী প্রগতিশীল মেরু এবং অন্যদিকে রক্ষণশীল বুর্জোয়া পুুঁজিবাদী রাজনৈতিক বলয়। প্রগতিশীলরা স্ট্রিন্ডবার্গের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং রক্ষণশীলরা স্ট্রিন্ডবার্গের বিপরীতে অবস্থান নেয়। সুইডিশ একাডেমি বড় বড় প্রতিষ্ঠান এবং বাঘা বাঘা পণ্ডিতদের অবস্থান ছিলো স্ট্রিন্ডবার্গের বিরুদ্ধ শিবিরে। এমন কি স্ট্রিন্ডবার্গের মৃত্যুর পর তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা প্রদর্শন থেকেও সুইডিশ একাডেমি বিরত থাকে। ১৯০৯ সালে স্ট্রিন্ডবার্গকে না দিয়ে সেলমা লেগারলফকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হলে- স্ট্রিন্ডবার্গ মর্মাহত হন। আঘাতপ্রাপ্ত হন তাঁর ভক্ত-সমর্থকরাও। তাই ১৯১০ সালে তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে হাজার হাজার শ্রমজীবি ছাত্রজনতা রাস্তায় মিছিল করে স্ট্রকহোমে তাঁর বাসভবনের সামনে সমবেত হয় এবং তাঁদের সংগৃহীত টাকা থেকে স্ট্রিন্ডবার্গকে ‘বিরোধী’ নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। স্ট্রিন্ডবার্গের সৃষ্টকর্মের একটা বড় অংশেই তিনি তথাকথিত অভিজাত শ্রেণী প্রতিষ্ঠানকে প্ররোচিত করেছেন কিংবা উস্কানি দিয়েছেন। আর তা জোরালোভাবেই করেছেন তাঁর নাটক, উপন্যাস, গল্প এবং প্রবন্ধ-নিবন্ধে। পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে সারা দেশে ঝড় বইয়ে দিয়ের্ছিলেন। সময়টা ছিল ১৯০৭ সাল। এই প্রবন্ধকে কেন্দ্র করে ৩০০ লেখক এক হাজারেরও বেশি প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেন। আর এইগুলো দুই বছর ধরে ৮০টি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। স্ট্রিন্ডবার্গ নিজে লিখেন ৭৫টি প্রবন্ধ-নিবন্ধ। তিনি সোনা বানানোর গবেষণা শরু করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ থেকে ছিটকে পড়েছেন। আর্থিক টানাপোড়েন পিছু ছাড়ে নি। কিন্তু থেমে থাকেন নি। দমে যান নি। দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন- ডেনমার্ক-জার্মানি-ফরাসি দেশে। বিয়ে করেছেন তিনবার। প্রেমে পড়েছেন অসংখ্যবার। সমকামীতাকে সহ্য করতে পারেন নি। নিজের বোনের রূপে আকর্ষিত হলে- বোন এবং বোন জামাইয়ের সাথে সম্পর্কের ছেদ পড়ে। যদিও স্ট্রিন্ডবার্গের চরম দুঃসময়ে ঐ বোন দম্পতি ছিল তাঁর জন্যে পিতৃ-মাতৃসুলভ আশ্রয়। এরকম প্রত্যুৎপন্নমতিতার অভাবে তিনি বন্ধু, আত্মীয় এবং সংঘ থেকে ছিটকে পড়েছেন। ছিটকে পড়েছেন কর্ম থেকেও। বেকারত্ব তাঁর পিছু ছাড়ে নি। কাজের পরিধি ছিল চিত্রকর্ম, আলোকচিত্র থেকে শুরু করে লেখালেখির প্রায় সব শাখায়। স্বভাবে ছিলেন প্রচন্ডরকম একগুয়ে। পিতৃস্নেহ থেকে দূরে অস্ট্রিয়া থেকে তার মেয়ের পত্রের জবাব দিয়েছেন চাঁছাছোলাভাবে। অন্যদিকে তাঁর সমুদয় সাহিত্যকর্মের স্বত্ব বিক্রি করে যখন তিনি আর্থিকভাবে অনেকটা স্বচ্ছল জীবনের শেষের দিকে, সেই সময়ে সমুদয় টাকা সমান পাঁচভাগে ভাগ করে একভাগ নিজের জন্যে রেখেছেন, তিন ভাগ দিয়েছেন তিন সন্তানকে আর এক ভাগ দিয়েছেন তাঁর প্রথম স্ত্রী সিরিকে।

সারা দুনিয়া জুড়ে স্ট্রিন্ডবার্গের অবস্থান পাকাপোক্ত হলেও সুইডেনে তাঁর উল্টো। এখানকার বেশিরভাগ মানুষ-বাঘাবাধা প্রতিষ্ঠান, মার্কামারা পণ্ডিত এবং বুক্তিজীবিরা স্ট্রিন্ডবার্গকে স্বীকৃতি দিতে কাচুমাচু করেন। অন্যদিকে অস্বীকারও করতে পারেন না। কিন্তু কেন? স্ট্রিন্ডবার্গ অভিজাত উঁচু শ্রেণিকে বিক্ষুব্ধ করেছেন, নিচে নামিয়ে দিয়েছেন, তাদের ভণ্ডামির মুখোশ খুলে দিয়েচেন। যে কারণে স্ট্রিন্ডবার্গ তাদের জন্যে যতো অস্বস্তির কারণ।
বিশেষ করে স্ট্রিন্ডবাগর্রে ‘লালঘর’ উপন্যাস, তাঁর অনেকগুলো নাটক নিম্নবিত্ত শ্রমজীবি মানুষদের সাথে উচ্চবিত্তদের ফস্টিনস্টির পর্দা খুলে নিয়ে এমনভাবে তুলে ধরেছেন-যা উঁচুতলার মানুষগুলো মেনে নিতে পারে নি। সেই মর্মজ্বালা আজও দৃশ্যমান এমনকি মৃত্যুর শতবর্ষ পরেও।

একই কারণে, সুইডেনে তো বটেই, এমনকি অন্যান্য দেশেও সাহিত্যের ডাকসাইটে পণ্ডিতরাও তাকে নারীবিদ্বেষী হিসেবে সহজেই মার্কা মেরে দেন। আদতে তিনি কি তাই? স্ট্রিন্ডবার্গের জীবনের একটা ঘটনা উল্লেখ করি- জার্মান প্রবাসের সময়- স্ট্রিন্ডবার্গের সঙ্গে পরিচয় হয় নরওয়ের চিত্রশিল্পী এডভার্ড মুঙক, পোল্যান্ডের লেখক স্ট্রেইনর্সলো প্রিবিসেবসকি নরওয়ের লেখিকা দগনি জুয়েলের সাথে। মুঙক এবং স্টেইনসলো এর সঙ্গে এই লেখিকার দ্বিচারি সম্পর্ক ছিল। অর্থাৎ সহজ সন্ধি- দুইজনের জ্ঞাতসারেই দুই জনের সঙ্গে প্রেম করেছেন। ব্যাপারটা স্ট্রিন্ডবার্গের কাছে ছিল অবাক করার মতো। অন্যদিকে ঐ লেখিকারও স্ট্রিন্ডবার্গ সম্পর্কে বিরুপ ধারণা ছিলো। পরে স্ট্রিন্ডবার্গ তার তৃতীয় প্রেমিক হয়েছিলেন। যদিও লেখিকাটি পোল্যান্ডের প্রেমিককে বিয়ে করে স্থিত হয়েছিলেন। সবই ছিল স্বাভাবিক তাদের কাছে। অজ্ঞাতসারে একজন পুরুষ যদি একাধিক নারীর সঙ্গে লীলাসঙ্গ চালিয়ে যেতে পারেন- সেখানে- একজন নারী নরওয়ের চিত্রশিল্পী-সুইডেনের নাট্যকার আর পোল্যান্ডের লেখকের সঙ্গে জ্ঞাতসারে মিলেছেন-মজেছেন- স্ট্রিন্ডবার্গ তা মেনে নিয়েছেন।

স্ট্রিন্ডবার্গের যতটুকু পছন্দ তা অকপটে সায় দিতেন আর অপছন্দটাকে একইভাবে দূরে ঠেলে দিতেন। আবার বাস্তবতা যাই হোক তার ভেতরের অনুভূতি অগ্রপশ্চাত বিবেচনা না করেই বলে ফেলতেন- তার ব্যক্তিজীবনেই হোক আর লেখালেখিতেই হোক। এক লেখা একবার লেখা হয়ে গেলে- দ্বিতীয়বার তা পড়ে দেখারও প্রয়োজন মনে করতেন না। অবস্থাটা এরকম ছিল- ‘যা হবার হবে’। তাঁর সমসাময়িক নাট্যকার ইবসেনের সাথে তাঁর সম্পর্কটা কেমন ছিল? ইবসেনের ব্রান্ড নাটক পড়ে মুগ্ধ হয়ে স্ট্রিন্ডবার্গ ইবসেনকে লিখেছিলেন, ‘আপনি আমার গুরু’। আহ্ এরকম যদি আমিও লিখতে পারতাম’। একই স্ট্রিন্ডবার্গ ইবসেনের ‘হেডা গ্যাবলার’ নাটক পড়ে ইবসেনকে লিখছেন, ‘আপনি আমার থেকে চুরি করেছেন’। তাঁরা একে অপরকে সমীহও করতেন- ঈর্ষাও করতেন। তাদের মাঝে সামান্য পত্রযোগাযোগ ছিল। দেখা হবার পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে নি। ইবসেন যখন ইতালিতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন- তখন ইবসেনের বাড়িতে স্ট্রিন্ডবার্গের আমন্ত্রণ ছিল। স্ট্রিন্ডবার্গ তখন ইতালি ভ্রমণ করছিলেন। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে স্ট্রিন্ডবার্গ ইবসেনের বাড়িতে যেতে পারেন নি।

১৮৯০ দশকে ইতালির নির্বাসিত জীবন চুকিয়ে ইবসেন নরওয়ে ফিরেছেন। এক চিত্রশিল্পীকে স্ট্রিন্ডবার্গের একটা আত্মকৃতি এঁকে দেবার জন্যে বায়না করেছেন। শেষতক ইবসেনের ছবিটি পছন্দ হয়নি, তিনি ছবিটি আর কিনলেন না। পরে একদিন ইবসেনের পুত্র সিগরুদ ছবিটা ক্রয় করেন এবং ইবসেনের জন্মদিনে ছবিটা উপহার হিসেবে দেন।
ইবসেন ছবিটা তার লেখালেখির ঘরে তার লেখার টেবিলে ঠিক মাথার উপরে টানালেন। অসলোর ইবসেন জাদুঘরে সেই ছবিটা একই জায়গায় আজও টানানো।
একবার জার্মান এক সাংবাদিক ইবসেনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন- স্ট্রিন্ডবার্গের ছবিটা এখানে কেন? ইবসেনের উত্তরটা ছিল এরকম- শত্রুকে পরাজিত করতে হলে-তার ছবিটা মনে রাখতে হয়।
সেই ইবসেন রাজনৈতিক বিচারে একজন নারীবাদী লেখক। আর অন্যদিকে স্ট্রিন্ডবার্গ হচ্ছেন সমাজবাদী শ্রমজীবি শ্রেণির। নাটক জগতে এই দুই দিকপালকে দুই মেরুতে রেখে বিবেচনা করে থাকেন কেউ কেউ। আর তাদের সহজ সরল হিসাব ইবসেন যেহেতু নারীবাদী স্ট্রিন্ডবার্গ তাই নারীবিদ্বেষী ইবসেন। এখন স্ট্রিন্ডবার্গের একটা মিলের কথা বলি। দুজনেই বুড়ো বয়সে প্রেমে পড়েছিলেন অল্প বয়সী তরুনীর সঙ্গে। ইবসেনের বয়স যখন ৬১ তখন তিনি এমিলি বারডাক নামের ১৯ বছর বয়সী অস্ট্রিয়ার এক মেয়ের প্রেমে মজেছিলেন ইতালিতে, তুমুল প্রেম, গোপন ও জমজমাট। অন্যদিকে স্ট্রিন্ডবার্গ তার জীবনের শেষের দিকে ফানি ফকনার (১৮৯১-১৯৬০) নামের ১৮ বছর বয়সের মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। তখন স্ট্রিন্ডবার্গের বয়স ৫৯। সে প্রেম গোপন কিছু নয়। কার্যত স্ট্রিন্ডবার্গের জীবনে গোপন বলে কোনো বস্তু নেই।

সাংসারিক কূটনীতিতে স্ট্রিন্ডবার্গ ছিলেন দারুন আনাড়ী, কবে কখন কতবার কিভাবে কোন নারীর সাথে মিশলেন তার স্ত্রী সিরির কাছে সব অকপটে স্বীকার করতেন, ব্যাখ্যাও দিতেন- কাছে থাকলে সরাসরি আর দূরে থাকলে পত্র লিখে, সেই সাথে ক্ষমাও চেয়ে নিতেন।

স্ট্রিন্ডবার্গ ছিলেন প্রচন্ড ঈর্ষাকাতর এবং সন্দেহপ্রবণ। তাঁর স্ত্রী সিরি কারো সঙ্গে কথা বললেই সে মেয়ে হোক ছেলে হোক, স্ট্রিন্ডবার্গ মন খারাপ করতেন প্রতিক্রিয়া জানাতেন। এখানে বলে নেয়া ভালো যে স্ট্রিন্ডবার্গের সাথে সম্পর্কের যখন টানাপোড়েন, তখন সিরি এক মহিলার সঙ্গে সমকামী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। স্ট্রিন্ডবার্গ এতোটাই ঈর্ষাকাতর হয়েছিলেন- তিনি সিরির বাড়ির মালিকের কাছে পত্র লিখে সিরির সমকামিতার অভিযোগ করেছিলেন। এরকম তিক্ত মধুর উত্থান আর পতনের সম্পর্ক ছিলো স্ট্রিন্ডবার্গের নারীদের সাথে।
একবার স্ট্রিন্ডবার্গ তাঁর নাটকের এক অভিনেত্রীর মঞ্চে অভিনয়কালীন তার পায়ের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রেমে পড়ে যান, যিনি নারীর প্রতি এতোটাই দুর্বল ও আকর্ষণবোধ করেন তাকে নারীবিদ্বেষী বলে পাইকারীভাবে চালিয়ে দিব কিভাবে?
স্ট্রিন্ডবার্গকে নারীবেদ্বেষী হিসেবে ধরে নিলে তার সৃষ্টির বিশালতা এবং ব্যক্তিমানুষকে খন্ডিত করা হবে। পাঠক হিসেবে এই খন্ডিতকরণ আমার জন্যে সুখকর উপলব্ধি নয়।

২০১২ সালের পুরোটা জুড়েই স্ট্রিন্ডবার্গের জীবন ও কর্মের নানা প্রসঙ্গ টেনে সুইডিস পত্র পত্রিকায় বিতর্ক চলেছে। স্ট্রিন্ডবার্গ এমন এক দুর্ভাগা অথবা সৌভাগ্যবান যার জীবনদ্দশায় তো বটেই তার মৃত্যুর শতবর্ষ পরেও সে বিতর্কগুলো থেমে নেই। আর এই বিতর্কই তাকে দেশে দেশে সময়ের কাছে দরকারি ও প্রাসঙ্গিক করে তুলছে। আরো একশ বছর পরেও এ বিতর্ক চলতে থাকলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না। কেননা তিনি জীবনের চিরন্তন যে বিষয়গুলোতে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন তা পুরোনো হবার নয়- যেমন শ্রেণি বিভাজন, বিত্তবানদের ভন্ডামী, যৌনতা, পারিবারিক ভাঙন ও সঙ্কট সর্বোপরি ব্যক্তি মানুষের টিকে থাকার প্রশ্ন, তার মুক্তির প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক নাটক ভূবনে স্ট্রিন্ডবার্গকে বাদ দিয়ে আলোচনা সম্ভব নয়। তার নাটকের সংখ্যা ৬১। তার স্বদেশ সুইডেনের মানুষ তাকে গ্রহণ করলেও যা বর্জন করলেও তা। নাট্যকার হিসেবে স্ট্রিন্ডবার্গ এখন আন্তর্জাতিক এবং অনিবার্য।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.